Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮১

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮১

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮১
নূরজাহান আক্তার আলো

দুপুর ২:৩০ মিনিট।
জুম্মার নামাজ শেষ। শীতলের বয়স যেহেতু কম তাই তাকে সরাসরি আনা হয়েছে শিশু আদালতে। যেটা সাধারণ আদালতের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানকার পরিবেশ এমনভাবে তৈরি করা যাতে শিশু কিংবা কিশোর ঘাবড়ে না যায়। ভয়ে নিজেকে অপরাধী অনুভব না করে। তাতে তারা মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ে। মূলত তাদের কথা চিন্তা করেই এভাবে সাজানো।

শীতল এসে দোতলার করিডোর রাখা একটা বেঞ্চের উপর বসে আছে। উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাঁধাচূড়া গাছের একটি ডালে। সেই গাছে একটি কাকের বাসা দেখা যাচ্ছে। বাসায় দুটো ছানা। একটুপরে একটি কাক এসে বাচ্চাদের মুখে মুখ দিয়ে আহার করাতে লাগল। কিছু একটা মুখে নিয়ে দুটো ছানার মুখে দিচ্ছে। বাচ্চা দুটো খাচ্ছে। নিচুস্বরে ডাকছে নিজ স্বরে। তখন আরেকটা কাক এসে মুখে করে আরেকটা ফল বাসায় রেখে চলে গেল। এই কাকটি কি ছানাদের বাবা? মা খাওয়াচ্ছে, বাচ্চারা খাচ্ছে আর বাবা খাবার যোগান দিচ্ছে। দৃশ্যটুকু দেখে শীতলের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। চোখের কোণা আপনাআপনিই ভিজে উঠল।
সে ঝটপট মুখ ফিরিয়ে নিল। বাবা-মায়েরা বোধহয় এমনই হয়। সন্তান যেমন হোক বুকে আগলে রাখার ক্ষমতা শুধুমাত্র বাবা-মায়েরই আছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

বলতে লজ্জা নেই,সেও ভীষণ মিস করছে বাবা-মাকে, তার পরিবারকে।
ইচ্ছে করছে মায়ের বুকের ভেতর গুঁটিয়ে যেতে। কিন্তু মা আসে নি কেন জানে না। সে আশেপাশে আরেকবার খুঁজেও পেল না। তার মা এতটাও পাষাণ না। যতই মারুক, বকুক, গালি দিক পরে ঠিক আগলে নেয়। তবে কি তার মা মুখ ফিরিয়ে নিলো? নাকি অন্যকিছু? বোন ঠিক আছে তো?
এসব ভেবে শীতল ভেতর ভেতর অস্থির হলেও কোনো জবাব পেল না৷
তবে জানতে হলে শতরুপা কিংবা শুদ্ধর সঙ্গে আগে কথা বলতে হবে।

সে আসার আগে শুদ্ধ আর শতরুপা এসেছে এখানে। চোখাচোখি হলেও কথা হয় নি তাদের সাথে। আদালত চত্বরের এক কোণে তারা নিচু স্বরে কী নিয়ে যেন আলোচনা করছে। দুজন উকিল কাগজ খুলে কিসব যেন দেখাচ্ছে। সে অবশ্য এই মুহূর্তে একজনের অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছে, সেটা হলো তার বাবা। বাবার সাথে তার কথা হয় নি। বাবা এই ঘটনা কি
শুনেছে? শুনলে আসছে না কেন? ​শীতল যখন মনে মনে এসব ভাবছিল
তখন দূর থেকে শুদ্ধ একবার শীতলের দিকে তাকাল। একবার না বার বার তাকিয়ে নজর রাখছিল। শীতলের অস্থিরভাব খুব ভালোভাবে তার নজরে পড়ল। উকিলের সাথে কথা সেরে গেল দায়িত্বরত এসআই-এর দিকে। উনাকে কিছু বলায় শীতলের দিকে একবার তাকিয়ে কেবল মৃদু মাথা নাড়ালেন। মাথা নাড়ানো মানে শীতলের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা সেরে নিতে পারে। অনুমতি পেয়ে ​শুদ্ধ ধীরপায়ে শীতলের কাছে এলো। বেঞ্চে বসা প্রিয়শীর পাশে নিজেও বসল। শুকনো মুখটার দিকে কেবল তাকিয়ে নরম সুরে সালাম দিলো,

-‘আসসালামু আলাইকুম মিসেস শোয়াইব। কেমন আছেন?’
শীতলও কয়েকপল প্রিয় মুখটার দিকে তাকিয়ে সালামের জবাব দিলো।
তবে বলা হলো না কেমন আছে। শুদ্ধর নির্ঘুম চোখ দেখে নরম সুরে প্রশ্ন করল,
-‘দুপুরে খেয়েছেন?’
-‘হুম।’
-‘ভাইয়া কেমন আছে?’
-‘ ভালো আছে৷ দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।’

কথা বলতে বলতে শুদ্ধ পকেট থেকে ফোন বের করে একবার চারপাশ দেখে নিল। যদিও পুলিশের অনুমতি নেওয়া আছে তবে সময় খুব অল্প। সে ​ফোন কান থেকে নামিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, ‘কথা বলো।’ শীতল কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা কানে ধরল। ওপাশ থেকে একটা খুব পরিচিত মমতামাখা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
-‘শীতল? আম্মু আমার?’
​বাবার কণ্ঠ শোনা মাত্রই পাথর হয়ে থাকা বুকের ভেতরটা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে কোনোমতে কান্না আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। ধরা গলায় অনেক কষ্টে উচ্চারণ করল, ‘বা..বাবা।’
শাহাদত চৌধুরী কান থেকে ফোন সরিয়ে পরপর ঢোক গিললেন। ভেজা চোখ দুটো দুই আঙ্গুলের সাহায্যে চেপে ধরে বললেন,

-‘​কাঁদে না মা। তুমি না আমার সাহসী মেয়ে? আমি তো জানি, আমার আম্মাজান সহজে ভেঙে পড়ে না। আমি সব সময় তোমার পাশে আছি মা। কখনো ভাববে না তুমি একা। পুরো পৃথিবী মুখ ফিরিয়ে নিলেও বাবা সব সময় তোমার সঙ্গে আছি।’
-‘(….)’
-‘ তুমি যা করেছো, সেটা করার কলিজা সবার থাকে না। জীবনে বাঁচতে গেলে কতরকম পরীক্ষা দিতে হয়। ধরে নাও এটাও একটা পরীক্ষা। সব পরীক্ষায় ভালো ফল পেতে আগে ধৈর্য্য ধরতে হয়। তুমি ধৈর্য্য ধরো মা।
খবরদার ভেঙে পড়বে না। ভীতুরা যুদ্ধের মাঠে গিয়ে যুদ্ধ করার আগেই হার মেনে নেয়। জীবন হচ্ছে তেমনই যুদ্ধক্ষেত্র। তুমি হচ্ছো একজন বীর সৈনিক। সত্য হচ্ছে তোমার অস্ত্র। বীর, অটল, অনল থাকো সত্য তোমার কাছে মাথা নোয়াবেই। সব বিপদ কেটে যাবে। এইটুকু মনে রাখবে, আই এম প্রাউড অফ ইউ, মা! রিয়েলে প্রাউড অফ ইউ।’

​বাবার কথাগুলো শীতলের মনে ম্যাজিকের মতো কাজ করল। সাহস জোগাল। টিভিতে দেখা আদালত আর আদালতে এসে বসে থাকা দুটো ভিন্ন জিনিস। ভিন্ন অভিজ্ঞতা। সে ফোনটা একটু শক্ত করে ধরে কম্পিত সুরে ফিসফিসিয়ে বলল,
-‘বাবা এসো, একটু তাড়াতাড়ি এসো প্লিজ।’
-‘আসব মা। আগামীকালই দেশে ফিরব আমি। তুমি কিন্তু ভয় পাবে না। আমার মেয়ে ভয় পেয়ে গুঁটিয়ে গেলে এটা আমার জন্য মেনে নেওয়া কষ্টকর হবে। বাবা আছি, সবসময় তোমার পাশে আছি মা।’
সময় যেহেতু কম তাই শাহাদত চৌধুরী দ্রুত কথা শেষ করলেন। শীতল​ শুদ্ধকে ফোনটা ফিরিয়ে দিলো। ​শুদ্ধ শীতলকে উঠিয়ে পিলারের পেছনে দাঁড়াল। দায়িত্বরত পুলিশ দেখেও কিছু বলল না। বরং বুঝল কিছু তাই
দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। শুদ্ধ শীতলকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কপালে চুমু এঁকে বলল,

-‘ চোখে পানি কেন? বলেছি না, যতক্ষণ আমি আছি ততক্ষণ ভয় নেই।’
শীতলের চোখের কোণা বেয়ে অঝরে জল গড়িয়ে গেল। কেঁপে উঠল ওষ্ঠজোড়া। ভেজাসুরে বলল,
-‘খান নি কেন আপনি? কি ভেবেছেন আপনার মিথ্যে আমি ধরতে পারব না?’
শুদ্ধ মৃদু হাসল। যত্ন করে চোখজোড়া মুছে দিলো। কি করে বোঝাবে যে গলা দিয়ে কিছুতেই খাবার নামবে না। সম্ভবই না! সে প্রসঙ্গ চেঞ্জ করতে বলল,
-‘ গিয়ে খাব। এবার আমি কিছু কথা বলি ম্যম, একটু মন দিয়ে শুনুন?’
-‘হুম।’

-‘এখন আমাদেরকে ভেতরে যেতে হবে। ভেতরে একজন ম্যাজিস্ট্রেট থাকবে। উনাকে দেখে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। মনে করবে স্কুল/কলেজে যেমন বড় স্যাররা মৌখিক পরীক্ষা নেন, এটাও তেমনই একটা পরীক্ষা। তাড়াহুড়োর দরকার নেই। ধীরে ধীরে কথা বলবে। ভয় লাগলে বুক ভরে একটা লম্বা শ্বাস নেবে।’
এইটুকু বলে শুদ্ধ থামল। শীতলের চুলগুলো একটু গুছিয়ে দিয়ে আবার বলল,
-‘​সত্যি বলতে ভয় নেই। সত্য বললে মানুষের বুক কাঁপে না। শুধু মনে রেখো, তুমি যা করেছ তোমার ভাইকে বাঁচানোর জন্যই করেছ। উনি যা জিজ্ঞেস করবে এক কথায় উত্তর দেবে। বেশি কথা বললে মানুষ খেই হারিয়ে ফেলে। ওখানে নানান প্রশ্ন উঠবে এমনও হতে পারে আমাকে নিয়ে কথা উঠতে পারে। আমাদের বিয়ে নিয়ে কথা হতে পারে৷ চুপ করে শুনবে। যেটাই বলুক রেগে তর্ক করা যাবে না। সব জায়গায় রাগ/জেদ দেখাতে নেই। আর হ্যাঁ, ওখানে গিয়ে ভুলেও কাঁদবে না। আবেগ নিজের একান্ত ব্যক্তিগত এটা সবাইকে দেখাতে নেই। দেখালে দুর্বল ভাববে। যা বলবে বিনয়ের সাথে মাথা উঁচু করে দৃঢ় স্বরে বলবে। তাহলে উনি ভাববে যা বলছ, সত্যি বলছ। সত্যের স্বর সবসময় উঁচু হয়।’

-‘আপনি থাকবেন না?’
-‘থাকব। শুধু আমি না আমাদের পুরো পরিবার তোমার সাথে আছে। স্বর্ণ একটু অসুস্থ, আম্মুর প্রেসার বেড়েছে তাই মেজো মা, ছোটো মাকে বাড়িতে রেখে এসেছি। বাবা আর মেজো চাচ্চু হসপিটালে তাই আসতে পারে নি। অর্করা বারবার ফোন করে খোঁজ নিচ্ছে। আজম তোমার জন্য দোয়া পাঠিয়েছে। ওরা স্বশরীরে আসতে পারছে না কারণ এখানে বেশি মানুষ এলাও করবে না। তারা কেন আসে নি এটা ভেবে ভুলেও কষ্ট পেও না।’
শুদ্ধ নিজের কথা শেষ করে শীতলের ঘামার্ত মুখটা মুছে দিলো। মাথার ওড়না টেনে দিতেই পুলিশের গলা খাঁকারি দিয়ে বুঝল সময় শেষ। শুদ্ধ পুলিশ সদস্যের ইশারায় শীতলকে নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কামরায় প্রবেশ করল। ​শীতল চোখ বুলিয়ে নিলো। দোতলার একদম কোণের কক্ষটি ম্যাজিস্ট্রেটের খাস কামরা। ছুটির দিন বিধায় করিডোরগুলোতে ভিড় নেই। তবে ম্যাজিস্ট্রেটের কক্ষের সামনে পুলিশের কড়া পাহারা। ঘরের ভেতরটা বেশ ছিমছাম তবে গাম্ভীর্যে ভরা। ​রুমের মাঝখানে বিশাল এক মেহগনি কাঠের টেবিল। টেবিলে ওপর সারিবদ্ধভাবে সাজানো ফাইল,

অন্যপাশে পেন হোল্ডার এবং একটি কাঁচের পেপারওয়েট। টেবিলের ঠিক ওপরে বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক সংবলিত ছোট ডেক্সটপ ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড। দেয়ালের এক পাশে সারিবদ্ধ বুকশেলফ, যেখানে মোটা মোটা আইনের বই। এককোণে থাকা বড় জানালার এক পাল্লা খোলা। সেখান থেকে বাইরের রাঁধাচূড়া গাছের একটি ডাল দেখা যাচ্ছে। দেয়াল জুড়ে টাঙানো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতির ছবি। সে আরেকটা জিনিস খেয়াল করল, সাধারণ আদালতের মতো এখানে উঁচু কাঠগড়া, বড় ডক বা বিচারকের জন্য উঁচু আসন নেই। ম্যাজিস্ট্রেটের বড় রিভলভিং চেয়ারটির ঠিক উল্টো পাশে তিনটি কাঠের চেয়ার। এক পাশে ছোট একটি সোফা রাখা সম্ভবত আগত বিশেষ অতিথিদের জন্য।
সে একনজরে এসব দেখে টেবিলের ওপাশে থাকা ম্যাজিস্ট্রেটের দিকে তাকাল। ​বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয় কিছু একটা লিখছিলেন। কারো উপস্থিতি অনুভব করে কলমটি রেখে চশমা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। ঠোঁটে হাসি এঁটে বললেন,

– ‘আজকের অতিথি তো দেখতে ভীষণ মিষ্টি। নাম কী তোমার?’
একদম সাবলীলভাবে কথা শুরু করলেন উনি। যাতে মেয়েটা ঘাবড়ে না যায়। যদিও এটা একটা কৌশল। কৌশল জানলে সামনের মানুষকে খুব সহজে বশে আনা যায়। খুব সহজে পেটের কথা বের করা যায়। বাচ্চারা তো এটাতেই কাবু। মেয়েটার বয়স কম আইনের চোখে এখনো বাচ্চাই।
উনার কথার প্রেক্ষিতে ​​শীতল সালাম দিয়ে বিনয়ীসুরে জবাব দিলো,
-‘ আমার নাম সুবহানা চৌধুরী শীতল।’
-‘ভীষণ সুন্দর না। পড়াশোনা করো?’
-‘জি স্যার।’

উনি এভাবে আরো দু’একটা কথা বললেন যাতে শীতল সহজ হয়। বুঝে যে এখানে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এরপর ধীরে ধীরে কথা তুললেন,
-​’শীতল, মা কাকটা যখন তার বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছিল, তখন তোমার কেমন লাগছিল? তুমি অনেকক্ষণ ধরে ওটা দেখছিলে, তাই না?’
​শীতল অবাক হয়ে তাকাল। উনি জানল কিভাবে? তখন তো করিডর ফাঁকা ছিল। তবে বুঝতে বাকি রইল এখানে সবকিছু তীক্ষ্ণ নজরে নোট করা হয়। তাই সে নিচু স্বরে বলল,
-‘ভালো লেগেছে। মা তো এমনই হয়।”

-‘ঠিক বলেছো। আচ্ছা মা, তুমি কি জানো তোমার মা আজকে কেন আসতে পারেনি? উনি খুব অসুস্থ। কেন জানো? কারণ মা তোমাকে খুব ভালোবাসে। আর এই ভালোবাসার মানুষগুলোর যখন বিপদ হয়, তখন আমরা শান্ত থাকতে পারি না। তখন আমরা ঝোঁকের বশে অনেক কঠিন কাজ করে ফেলি না?’
শীতল ক্যাচ করল উনার কথা। স্পষ্টও হলো উনি ইমোশনকে তীরবিদ্ধ করতে চাচ্ছে। যাতে আবেগী হয়ে ওঠে সে। অথচ শুদ্ধ বলেছে তার মা অসুস্থ নয় বরং বোন অসুস্থ বিধায় আসতে পারে নি। বোনটা প্রেগনেন্ট অসুস্থ হওয়া স্বাভাবিক। শুদ্ধর কথামতো সে ছোট করে উত্তর দিলো,
-‘জি।’
-‘শীতল, আমি মানলাম তুমি তোমার ভাইকে খুব ভালোবাসো। আচ্ছা, যখন ওই ভয়ঙ্কর মুহূর্তটা এসেছিল, তখন তোমার কি একবারও নিজের কথা মনে হয় নি? এখন যা পরিস্থিতি তোমার ভাইটা বেঁচে গেলেও তুমি
তো ফেঁসে যাবে। আফসোস হচ্ছে না?’

​- “না স্যার। তখন শুধু মনে হচ্ছিল, আমার ভাইয়াকে বাঁচাতে হবে। ওই মুহূর্তে আমার কাছে আমার ভাইয়ার চেয়ে বড় আর কিছু ছিল না। আর আমার ভাই যদি বেঁচে যায় আর আমার যদি জেল হয়, তাহলেও আমি খুশি।’
-‘কেন? তোমার কি ভালো থাকার ইচ্ছে নেই। পড়াশোনা করে নামডাক করতে চাও না? তোমার বাবা একজন সম্মানিত ব্যক্তি উনার মেয়ে খুনি, এটা কি একজন বাবার কাছে ভালো কিছু হতে পারে?’
-‘আমার বাবার শিক্ষা পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ নেওয়া। আমি শুধু তাই করেছি স্যার।’

বিচারক খুব সাধারণ প্রশ্ন করছে কিন্তু প্রশ্নের ওজন অনেক বেশি। তবে শীতলও চেষ্টা করছে গুছিয়ে উত্তর দেওয়ার। শুদ্ধ শুধু দেখে যাচ্ছে তার ব্যাঙাচির চেষ্টা। সে জানত, সে যেটা বলবে শীতল অক্ষরে অক্ষরে সেটা পালন করবে। যখন সরাসরি বিচারক কথা বলেন তখন উকিলদের কিছু বলার থাকে না। তাই উনারা আপাতত নিশ্চুপ। বিচারক এবার নড়েচড়ে বসলেন। বুঝলেন মেয়েটা শক্ত আছে তাই পরের তীরটা ছুঁড়লেন,
-‘শীতল, তোমার ভাইকে বাঁচানোর আবেগটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু ওই মুহূর্তে তোমার হাতে একটা ‘টিজার’ ছিল। ওই যন্ত্রটা সাধারণ কোনো কিশোরীর কাছে থাকার কথা নয়। ওটা কোথায় পেলে? ওটা কি আগে থেকেই তোমার কাছে ছিল? কে দিয়েছিল?’

​শীতল জানত এই প্রশ্নটা আসবেই। তবে তাড়াহুড়ায় উত্তর দিলো না চুপ রইল দেখে বিচারক আবার বললেন,
​-‘ওটা কি সায়নের ছিল নাকি তুমি নিজের নিরাপত্তার জন্য ওটা সংগ্রহ করেছিলে? আর সেটার ব্যবহার করার সাহস বা কৌশল কোথায় থেকে শিখলে?’
শীতল বুঝতে পারল যার নাম নিবে তার ওপরে আইনি ঝামেলা বাড়তে পারে। তাই সে পরিষ্কার গলায় বলল,
​-‘না স্যার, ওটা সায়ন ভাইয়ার ছিল না। ওটা আমি ওদিন রাস্তায় পড়ে পেয়েছিলাম।’
​বিচারক ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে এবার একটু কড়া গলায় বললেন,
​-‘রাস্তায় পড়ে পেয়েছিলে? এটা কি কোনো খেলনা যে রাস্তায় পড়ে থাকবে? আর তুমি জানলে কীভাবে ওটা কী জিনিস? কিভাবে ব্যবহার করতে হয়?’

​-‘একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে একটা প্যাকেট পড়ে পেয়েছিলাম।
কৌতূহল থেকে ওটা বাসায় নিয়ে আসি। প্রথমে বুঝতে পারিনি ওটা কী,
পরে ইউটিউবে সার্চ দিয়ে জানতে পারি এটা একটা ইলেকট্রিক টিজার।
ওটা কীভাবে অন করতে হয়, কীভাবে প্রয়োগ করে, ইন্টারনেটে ভিডিও দেখে শিখে নিয়েছিলাম। আজকাল আমরা মেয়েরা কোথাও সেভ না তাই ভেবেছিলাম এটাকে কাজে লাগাব কারণ দিনশেষে আমিও মেয়ে। আমারও একা চলতে ফিরতে হয়। তবে লুকিয়ে রাখতাম কারণ বাড়ির কেউ জানলে কেড়ে ফেলে দিত।’

​এভাবে আরো দুএকটা কথা হলো।একপর্যায়ে পুলিশ কেস তদন্তের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চাইল। শীতল যেহেতু অপ্রাপ্তবয়স্ক লক-আপে একা জিজ্ঞাসাবাদের পারমিশন নেই। তবে তদন্তের স্বার্থে একজনপুলিশ অফিসার ও প্রবেশন অফিসার উন্নয়ন কেন্দ্রে গিয়ে শীতলের সাথে কথা বলতে পারবে। এবং ঘোষণা দিলেন পরের শুনানিতে তদন্তের অগ্রগতি দেখে কেস এগোবে। ততদিন শীতলকে রাখা হবে গাজীপুরের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে। কেন্দ্রটি মূলত কোনো জেলেখানা নয় বরং এটি সরকারি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মিশ্রণ। আইনের ভাষায় এটাকে এখন ‘শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র’ বলা হয়। অতঃপর বিচারকের নির্দেশ অনুযায়ী শীতলকে গাজীপুরের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

_’সিদ্দিক ভাই সায়নের বইনের জামিন হই নাই?’
ঠোঁটে ধরা সিগারেটে পরপর কয়েক টান দিয়ে হাসল সিদ্দিক। বারবার সায়নকে বলেছিল বাড়াবাড়ি না করতে। কিন্তু ছেলেটা কথা শুনলই না।
ভাইয়ের কথায় দল আলাদা করল। নির্বাচনে দাঁড়াল। তার ভাই শুদ্ধও কৌশলে তাকে দল থেকে বহিঃস্কার করে ছাড়ল। কি ভেবেছে শুদ্ধ সে জানতে পারবে না? ভাইকেই শুধু রাজনীতির মাঠে একা রাজ করাবে?
এত সোজা? আর সায়নের এত জোর কেন? কারণ তার পাশে তার ভাই আছে। বাজপাখির মতো নজর রাখে সায়নের প্রতিটা পদক্ষেপে।নয়তো সায়নের আজ যা অবস্থা এটা আরো আগে হওয়ার কথা ছিল। শুধুমাত্র
শুদ্ধ , শাহাদত চৌধুরী তার সায়নের চালাক বউটা তার চারপাশে শক্ত একটা বলয় তৈরি করে রেখেছিল। সায়ন কখনোই লোক নিয়ে ঘুরাঘুরি পছন্দ করে না তাই কৌশলে সায়নের দলের মধ্যে শুদ্ধর ঠিক করা কিছু লোক ঢুকিয়েছিল। সে কখন কোথায় যায়, কি করে, সব খবরই তাদের কাছে থাকে৷ নতুবা তারা টের পেত না সায়নের মাথার উপরে মরণ ফাঁদ প্রস্তুত। তারা আন্দাজ করেছিল বলেই নির্বাচনের বাহানায় শুদ্ধকে পার্টি অফিসে দেখা যেত। প্রায়ই সময় ভাইয়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকত। নতুবা সে দূর থেকে ধূর্ত চাল চালালেও খুব একটা পার্টি অফিসে আসত না। যাতে কেউ টের না পায় এসবের মধ্যে সে জড়িত। তবে এটা বলতে বাধ্য শুদ্ধ
ভাইকে সত্যিই ভালোবাসে। ভাইয়ের ভালো চায় বলে এসব করে নাহলে তার যা মেধা এসবে কেন জড়াবে? ইগরের থেকেও শুনেছে শুদ্ধ নাকি
খুব মেধাবী। বর্তমানে সে যেসব রিসার্চ করছে যদি নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকতে পারে তাহলে দেশ না বিশ্বব্যাপী তার গুনে সবাই তাকে চিনবে।
ছেলেটা কেন যে নিজের ভালো না বুঝে শুধু শুধু এসবে জড়াচ্ছে কে জানে? তবে চিন্তা নেই, তাকেও টপকানোর বিশেষ এক প্রস্তুতি চলছে।

তিনদিন পরের ঘটনা,
আদালতের রায় অনুযায়ী শীতল আছে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে। এখানে এখানকার রুটিন মাফিক চলতে হচ্ছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এখানে আসার পর কেউ তাকে দেখতে আসে নি। সম্ভবত সপ্তাহে একদিন দেখা করার সুযোগ দেয়। এখানে আসার তিনদিন পার হয়েছে কেবল আরো চারদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে প্রয়োজনীয় সবকিছুই পেয়ে গেছে। শুধু সায়নের কোনো খবর পায় নি। অথচ এই খবরটুকু পাওয়ার জন্যই চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছে। আজ সকাল থেকে কেন জানি মন কু-ডাকছে। বারবার মনে হচ্ছে খারাপ কিছু একটা হবে। সে বারবার মন শক্ত করে নিজেকে শাসাচ্ছে কিচ্ছু হবে না। সারাদিন কাটলেও বিকেলে
তাকে ডেকে একটা গাড়িতে তোলা হলো। কেস শুনানির ডেট নেই, তবে কোথায় যাচ্ছে? সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে গাড়ি বাড়ির পথে যাচ্ছে দেখে বিষ্ময় নিয়ে বলল,

-‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
তার পাশে বসা সিভিল ড্রেসের পুলিশ মহিলাটি ভীষণ বদমেজাজি।
সামান্য একটা কথা বলাতেও খুব বিরক্ত হলো। তবুও খ্যাক খ্যাক করে বলল,
-‘তোমার বাড়িতে।’
বাড়ির কথা শুনে শীতল আরেকদফা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
-‘আমার কি জামিন হয়ে গেছে?’
এবার মহিলা পুলিশটির বিরক্তির মাত্রা দ্বিগুন হলো। দাঁতে দাঁত পিষে জবাব দিলো,
-‘তোমার কে যেন মরেছে। লাশের মুখ দেখে চলে আসবে। সময় মাত্র আধাঘন্টা। খবরদার বলছি, আসার সময় কোনোরকম নাটক করবে না।’
এইটুকু বলে পুনরায় বিরবির করলেন,

-‘জনে জনে মরবে আর আমাদের হয়েছে যত জ্বালা। তাকে নিয়ে চলো রে। মরাকান্না দেখ রে। এসব দেখতে দেখতে জীবনের অর্ধেকটা গেল।’
উনার একটি বাক্যতে শীতলের পুরো পৃথিবী যেন দুলে উঠল। ​’কে যেন মরেছে’ এই কথাটা তার মাথায় গেঁথে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল ভাইয়ের রক্তাক্ত মুখ। ভাইয়া কি তবে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়েই দিল? শুধু
তাকে বাঁচাতে গিয়ে খুনি হলো আর সেই ভাই তাকে ছেড়েই চলে গেল? এ কষ্ট মানবে কিভাবে সে? কিভাবে সহ্য করবে? সে আর ভাবতে পারল না স্থির হয়ে বসে রইল। নীরবে গাল বেয়ে অঝরে অশ্রু গড়াতে লাগল।
এগুলো কোন পাপের শাস্তি পাচ্ছে সে? কেন তার বেলাতেই সময় নিষ্ঠুর রুপ দেখাচ্ছে? গাড়িটা যখন চৌধুরী বাড়ির গেটে থামল তখন বাড়িভর্তি মানুষ। চারদিকে চাপা গুঞ্জন। পুলিশের সঙ্গে নামল শীতল। তার হাতে হ্যান্ডকাপ পরানোর নিয়ম না থাকলেও পরানো হলো। গতসপ্তাহে এক মেয়ের বোন মারা যাওয়াতে দেখতে নিয়ে গিয়েছিল। পরে সুযোগ বুঝে মেয়েটা পালিয়েছিল আর বাড়ির লোক তাকে লুকিয়ে রেখেছিল। পরে অনেক কষ্টে তাকে খুঁজে বের করেছিল। এই রিস্ক নেওয়া যাবে না দেখে মূলত হ্যান্ডকাপ পরানো হয়েছে।

বাগানের মাঝখানে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটি খাটিয়া রাখা। সিতারা বেগমের চাপা কান্না ভেসে আসছে। ​শীতল ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল। তার পা যেন আর চলছে না। প্রতিটি পদক্ষেপে
যেন কেউ বুকের ভেতর ছুরি চালাচ্ছে। সাদা কাপড়ের কাছে পৌঁছে সে হাঁটু গেড়ে বসল। পুরো শরীর কাঁপছে থরথর করে। বাড়ির ভেতর খবর চলে গেছে শীতল এসেছে। খবর পেতেই শখ দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে নিলো বুকে। সাম্য, সৃজন, ঐশ্বর্যও জড়িয়ে ধরল। কি করুণ সুরে কাঁদছে তারা।ওদের কান্নার শব্দে চারপাশ যেন থমকে গেছে। শারাফাত চৌধুরী, সাফওয়ান চৌধুরী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। নীরবে কেঁদে যাচ্ছে। স্বর্ণকে দেখা গেল দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে পাথর হয়ে বসে আছে।

তার দেহে যেন প্রাণ নেই। তার সমস্ত শক্তি টুকু কেউ যেন শুয়ে নিয়েছে। সে বোনের দিক থেকে সরিয়ে তাকাল খাটিয়ার দিকে। ভাইয়াকে জিজ্ঞাসা করবে, কেন ফাঁকি দিল? পরিস্থিতি যা ছিল সে পারে নি ভাইকে আঘাত পাওয়া থেকে বাঁচাতে, তাই বলে সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হবে? এত নিষ্ঠুর কবে হলো তার সায়ন ভাই? এর জবাব তাকে দিতেই হবে। একথা ভেবে ​সে ধীরে ধীরে সাদা কাফনের একটা কোণা ধরল। বুকের ভেতর তখন প্রলয় চলছে। চোখে ঝরছে নোনাজল। কাফনের কোণা টানতেই
নিষ্পাপ মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। ​শীতলের মুখ দিয়ে কোনো শব্দই বের হলো না। গলার স্বরও যেন নিজের অজান্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮০

সে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে ​মানুষটার বুকের ওপর হাত রাখল। নিজের
সঙ্গে একপ্রকার যুদ্ধ চালিয়ে কোনোমতে একটি শব্দই উচ্চারণ করল,
-‘বা..বাবা!

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮২

14 COMMENTS

Comments are closed.