Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮২

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮২

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮২
নূরজাহান আক্তার আলো

কাফনের কোণা টানতেই নিষ্পাপ মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। ​শীতলের মুখ দিয়ে কোনো শব্দই বের হলো না। গলার স্বরও যেন নিজের অজান্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। সে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে ​মানুষটার বুকের ওপর হাত রাখল। নিজের সঙ্গে একপ্রকার যুদ্ধ চালিয়ে কোনোমতে একটি শব্দই উচ্চারণ করল,
-‘বা..বাবা!’
প্রাণপ্রিয় বাবাকে দেখে শীতল হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইল। বাবার কি হলো? এভাবে শুয়ে আছে কেন? তিনদিন আগে না ফোনে কথা হলো? কত কী বলে তাকে বুঝ দিলো। দ্রুত আসার প্রতিশ্রুতি দিলো তাহলে এসব কি? সে বিরবির করে বলল,

-‘চিটিং হচ্ছে বাবা..এটা কিন্তু কথা ছিল না।’
একথা বলে একটু কাছে ঝুঁকে বাবার গাল ধরতেই ভেজা অনুভব করল। চোখের সামনে এনে দেখে রক্ত। মাথা থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে কান বেয়ে রক্ত আসছে। রক্ত কেন? কোথায় ব্যথা পেয়েছে বাবা? ভাইয়ের রক্তের দাগই তো মুছে নি এরমধ্যে বাবারও..? আর প্রাণপ্রিয় বাবা না কিছুক্ষণ আগে মিশনে গিয়েছিল? যাওয়ার আগে তাকে কথা দিয়েছিল যেভাবে যাচ্ছে সেভাবেই ফিরে আসবে। তিনদিন আগেও কথা দিলো দেশে ফেরামাত্রই তার কাছে যাবে। সব সমস্যার সমাধা করে দিবেন। বাবা সবসময় তার পাশে আছে। তবে কি বাবা মিথ্যাে বলেছিল? কিন্তু বাবা তো কখনোই মিথ্যা বলে না। সে আর ভাবতে পারল না আস্তে করে বাবার বুকে মাথা রাখতে গিয়ে টের পেল শক্ত কিছু সাদা ব্যান্ডেজ দিয়ে বাঁধা বাবার বুক। ব্যান্ডেজ উতলে রক্ত ভেসে উঠেছে। না জানি বাবা কত ব্যথা পেয়েছে।
সে আর সহ্য করতে পারল না বাবার হাত আঁকড়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। কি করুণ সেই কান্না সুর। তার কান্নার শব্দে চারপাশটা আরো ভারি হয়ে উঠল। শারাফাত চৌধুরী দৌড়ে এসে শীতলকে বুকে জড়িয়ে নিলেন ঠিকই কিন্তু এক শব্দ ব্যয় করে কিছু বলতে পারলেন না। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তিন ভাই অনেক কষ্টে নিজেদের পরিবারকে সামলে রেখেছিলেন। দূরে থাকলেও উনার সম্পর্ক আগের মতোই ছিল।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শাহাদত চৌধুরী দুই সন্তানের বাবা তবুও এখনো আগের মতোই উনাকে মান্য করে। একবার যদি মুখ ফুটে বলেন, ‘শাহাদত এটা করলে কেমন হয়?’ উনার বলতে দেরি সেকাজ করতে দেরি হয় না।’ শীতলকে বুকে আগলে উনি চোখের পানি ছেড়ে দিলেন। চাকরির কারণে শীতল,স্বর্ণ কখনোই বাবাকে কাছে পায় নি। স্বর্ণ বুঝদার কিন্তু শীতল বরাবরই বাবা পাগল। মাঝেমধ্যেই আবদার করে বসে বাড়ি আসার জন্য। কিন্তু চাইলে তো যাওয়া যায় না আবার মেয়ের কান্নাও সহ্য করতে পারেন না। তখন উনাকে ফোনে করে বলে, ‘ভাই, আমার পাগলি মেয়েটা কাঁদছে।’ এইটুকু বলে চুপ করে যেতেই তখন উনি নিজে বুঝে নিতেন উনাকে কিছু একটা করতে হবে। সেই অনুযায়ী বাড়ির সবাইকে নিয়ে হয় ঘুরতে বের হতেন। নয়তো বাড়িতে কোনো প্রোগ্রাম এরেঞ্জ করতেন। আবার তিনমাস পার হয়ে গেলে যখন বলতেন, ‘কতদিন হলো বাড়ি আসবে না?’ উনার কথা শুনে শাহাদত চৌধুরী মলিন হাসতেন। উনিও বুঝে নিতেন ভাই দায়িত্বের কাছে বন্দি। আর এ দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে গিয়েছিলেন মিশনে। আর উনার মিশনে যাওয়া নিয়ে আপত্তি করার মতো যুক্তি ছিল না। কারণ শাহাদত চৌধুরী শুনতেনও না।

মিশনে যাওয়া নিয়ে যদি কিছু বলতে হয় তাহলে বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। আর এই স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে যারা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বীর সদস্যরা। শুধু যে দেশের সীমানা তা নয় জাতিসংঘ যখন কোনো দেশের শান্তি ফেরাতে রক্ষাকর্মী চায় তখন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী বুকভরা সাহস নিয়ে সবার আগে এগিয়ে যায়। সর্বদা প্রস্তুত থাকে ‘আমরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে রক্ষা করি’ ঠিক এই সংকল্পে। আর শাহাদত চৌধুরী ছিলেন বরাবরই দক্ষ ও সাহসী এক অফিসার। যার কারণে মালির মতো দুর্গম এবং ঝুঁকিপূর্ণ মিশনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

প্রায় একুশ দিন আগে ১২০ থেকে ১৫০ জন সৈনিক নিয়ে তিনি রওনা দিয়েছিলেন মালির উদ্দেশ্যে। মালি হলো আফ্রিকার একটি দেশ। এটি সাহারা মরুভূমির বিশাল অংশ জুড়ে অবস্থিত। তবে অনেক বছর ধরে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের অত্যাচারে জর্জরিতসেখানকার মানুষ। সেখানে শান্তি বলতে কিছু নেই বরং বাতাসের চেয়ে বারুদের গন্ধ বেশি পাওয়া যায়। সাহারার উত্তপ্ত বালু যেমন শরীরের চামড়া পুড়িয়ে দেয়, তেমনি বছরের পর বছর চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত কতশত মানুষের স্বপ্নগুলোকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শারাফাত চৌধুরীরসহ উনার পুরো টিম যেখানে অবস্থান করছিলেন, সেটি ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। সেখানে চারিদিকে শুধু ধুধু বালুচর আর রুক্ষ পাহাড়ের সারি। দিনে সূর্যের তেজ এত প্রখর যেন গায়ে পড়লে মনে হয় কেউ আগুনের হলকা ঢেলে দিচ্ছে। গ্রামগুলো একটি থেকে অন্যটি মাইলের পর মাইল দূরত্ব। মাঝখানে জনমানবহীন মরুভূমি। আর এখানে সবচেয়ে আতঙ্ক ছিল চোরাগোপ্তা হামলা। চোরাগোপ্তা হামলা মানে অতর্কিত হামলা।

আরো সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এখানে মাইলের পর মাইল বালুচর মানুষজনের চিহ্নমাত্র নেই। অথচ বালুর স্তূপে মাইন (IED) পুঁতে রাখা। কিংবা পাহাড়ের খাঁজে স্নাইপার তাক করে রাখা যেটা দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই। অথচ পা রাখলেই মৃত্যু। এমন প্রতিকূল পরিবেশে শারাফাত চৌধুরীর টিম শুধু সাহসের ওপর ভর করে টিকে ছিলেন।
কিন্তু রোজ কাউকে না কাউকে হারাতে হতো। এমনও হয়েছে উনার সৈনিক উনার হাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। আবার এমনও হয়েছে চোখের পলকে কারো না কারো দেহ ছিন্নভিন্ন হতে দেখেছে।এমতাবস্থায় অনেকে হাল ছেড়ে দেশে ফিরতে চেয়েছিল। বুঝিয়ে সাহস জুগিয়েছেন।
আর এসব মিলিয়ে উনার দিনগুলো ভয়াবহ কাটছিল। যদিও নিজেকে নিয়ে ভাবার কিছু ছিল না। কারণ পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে একদিন কণ্ঠছেড়ে বলেছিলেন,

‘আমি শপথ করিতেছি যে, আমি বাংলাদেশের প্রতি অনুগত থাকিব। জল, স্থল ও অন্তরীক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করিব। ইহার জন্য যদি নিজের জীবন উৎসর্গ করিতে হয়, আমি পিছপা হইব না।’
সেই শপথের কথা স্মরণ করে উনার এখন দুটো লক্ষ্য হায়েনাদের কাছে হার মানবে না৷ দ্বিতীয়ত সঙ্গের সৈনিকগুলোকে সহি সালামতে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। এখানে এসে উনি টিমের সবার সঙ্গে খুব সাধারণ ভাবে মিশতেন। যখন দেখতেন সৈনিক হাল ছেড়ে দিচ্ছে বা ভয় পাচ্ছে, তখন কত রকমের গল্প শোনাতেন। সৈনিকরাও খুব পছন্দ করত উনার সঙ্গ। কিন্তু হঠাৎ দেশ থেকে আসা কলিজার টুকরো মেয়ের খবর শুনে চতুর মানুষটা ভেতর ভেতর কেন জানি মনোবল হারাচ্ছিলেন। নিজেকে বুঝিয়ে সন্মানিত পোশাকটির দিকে তাকিয়ে ব্যক্তিগত জীবনকে সাইডে সরিয়ে দিতেন। কিন্তু পোশাকের নিচে রক্তে, মাংসে গড়া একটা শক্ত বুক ছিল। সেখানে যত্ন করে গাঁথা ছিল পরিবার নামক একটি দূর্বল কুঠির। বাড়ি থেকে দুরে থাকলেও অসীম ভালোবাসা,যত্ন জমা রাখেন সেখানে। কিন্তু যখন দেখেন কলিজার টুকরো মেয়ে বিপদে পড়ে উনাকেডাকছে। আকুতি ভরা সুরে বলছে, ‘বাবা এসো, তাড়াতাড়ি এসো প্লিজ।’

এতদিন যাদের বুক দিয়ে আগলে রাখতেন তারা বিপদে পড়ে সরাসরি উনারই সঙ্গ চাচ্ছে। পাশে চাচ্ছে। বাইরের অপবাদ থেকে মুখ লুকাতে বাবার ছায়ায় মুখ লুকাতে আকুতি জানাচ্ছে। আরেক সন্তান হসপিটালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। পরিবারের উপর দিয়ে একের পর এক বিপদের ঝড়
ধেঁয়ে আসছে। এসব জেনে-শুনে কতক্ষণ ঠিক থাকা যায়? যায় না৷আর ঠিক না থাকাটা উনার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। ​নিজের মনোবলের ভীত নড়ে গেল।
সেদিনের লোমহর্ষক ঘটনা,
রোজকার মতো ওই মুহূর্তেও ছিলেন সংঘর্ষের এক পর্যায়ে। রাস্তার বাম পাশের ছোট টিলার আড়াল থেকে ধোঁয়া উড়ছে। ল্যান্ডমাইন বিষ্ফোরণে
প্রথম গাড়িটা ছিঁটকে পড়েছে রাস্তার ধারে। মুহূর্তের মধ্যে চারিদিক স্তব্ধ।
মেশিনগানের তপ্ত গুলিতে পরিবেশ আরো ভয়াবহরুপ ধারণ করেছে।

তখনও ​বিদ্রোহীরা পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে ছিল। নজর রাখছিল উনাদের প্রতি। তবুও শাহাদত চৌধুরী এক মুহূর্তের জন্য বিচলিত হলেন না। বরং সাহসী বজ্রধ্বণিতে হুকুম দিলেন,
‘ডিসমাউন্ট! সেকশন ওয়ান বাম দিকে কভার নাও। আমরা ওদের পিন ডাউন করব। কোনো বেসামরিক মানুষ যেন ক্রসফায়ারে না পড়ে!’
উনার কথামতো অন্যরা পজিশন নেয়। চারপাশ তখন ধুলোর মেঘ আর বারুদের কটু গন্ধের ছড়াছড়ি।পরিস্থিতি তখন আরো ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে। এরপর চোখের সামনে উনাদের আরো দুটো গাড়ি ল্যান্ডমাইনে উড়ে গেল। ওই গাড়িতে ছিল বাংলাদেশের বীর সন্তান রিফাত, জামিল, কাদের, মনির, কার্তিক, সবুজ, মিনার, রাতুল নামের বীর সৈনিক। এক মুহূর্তে তাদের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। তাদের অবস্থা দেখে আরিয়ান ছলছল চোখে তাকাল শাহাদত চৌধুরীর দিকে। একের পর বিষ্ফোরণে
কানে তালা লাগানোর অবস্থা সঙ্গে আছে এলএমজির গর্জন। শাহাদত চৌধুরী আরিয়ানকে চোখের ইশারায় সাহস জুগিয়ে বজ্রকন্ঠে পুনরায়
আদেশ দিলেন,

-‘কভার! ওয়ান ও ক্লক পজিশন থেকে ফায়ার আসছে! সবাই পজিশন…!’
বাকি কথা শেষ করার আগে হঠাৎ একটি বুলেট গেঁথে গেল উনার ডান বাহুতে। ভিজে গেল বাহুর কাছের পোশাকটি। ​উনার থেকে কয়েক হাত দূরে আরিয়ান গোঙাচ্ছে, ওর দুই পায়ে গুলি লেগেছে। চারদিকে করুন আর্তনাদ। পাহাড়ের খাঁজে বিদ্রোহীরা মাথা তুললেই খুলি উড়িয়ে দেবে। একটা গুলি খেয়ে শাহাদত চৌধুরী দমলেন না বরং হাত থেকে ছিঁটকে পরা উনার এম-ফোর রাইফেলটা শক্ত করে ধরলেন। মনে মনে ওয়াদা করে নিলেন প্রাণ গেলে যাক তবুও এই হায়েনাদের দমন করতেই হবে। সঙ্গে আসা নিজের একটা সৈনিককেও এখানে ফেলে যাওয়া যাবে না। নিজের ওয়াদা রাখতে রাখতে। দেশে ফিরতে হবে। পরিবারকে বিপদ থেকে বাঁচাতে হবে। মনে মনে এসব ভেবে উনি সেকশন কমান্ডারকে ইশারায় জানালেন ফ্লাঙ্কিং করার জন্য। এক হাতে গ্রেনেড বের করে পিন খুললেন তিনি, অন্য হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন মাটি। ​অতঃপর সেটা নিশানা বুঝে ছুঁড়তেই জায়গা মতোই লাগল। মিনিট দশেক পর কোথাও থেকে আচমকা একটা বুলেট এসে গেঁথে গেল উনার বুকের। আরেকটা এসে লাগল মাথার পেছনের দিকে। মাথায় বুলেট গেঁথে সেখানেই থেকে গেল আর আর বুকেরটা পিঠের মাংস থেতলে বেরিয়ে গেল।মুহূর্তেই মুখ থুবকে পড়লেন শাহাদত চৌধুরী। আকাশপানে একবার তাকালেন। দু ফোঁটা অশ্রু গড়াতেই কানে প্রতিধ্বণির মতো বাজতে লাগল, ‘বা..বাবা এসো, একটু তাড়াতাড়ি এসো প্লিজ।’ কিন্তু উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা উনার নেই। চোখের সামনে মৃত্যুর দূত। আর কি যাওয়া হবে? কলিজার টুকরো মেয়েরা, একসঙ্গে পথচলার সঙ্গী, সুন্দর পরিবার; পরিবারের সদস্যদের সবার মুখগুলো স্মরণ করার সময়টুকু হলো না উনার। তার আগেই শেষ নিংশ্বাস ত্যাগ করলেন শাহাদত চৌধুরী। ফেরা হলো না আপন দেশে। যদিও বা ফিরলেন দেহে প্রাণটি রইল না।

এদিকে শীতলকে সামলানোর দায় হয়ে পড়েছে। বাবার বুকে মাথা রেখে চিৎকার করে কাঁদছে। শারাফাত চৌধুরী বসে থাকতে পারলেন না উঠে চলে গেলেন। শুদ্ধ তখন জরুরি কল সেরে এসে দাঁড়াল শীতলের কাছে।
শীতলের আধাঘন্টা থাকার আদেশ থাকলেও এক ঘন্টা করা হলো। এই সময়টুকু বাড়াতে শুদ্ধকে খসাতে হলো দেড় লক্ষ টাকা। কথায় বলে না, হাতি যখন কাঁদায় পড়ে তখন চামচিকাতেও লাথি মারে। তাদের অবস্থা হয়েছে সেইরকম। টাকার হিসাব বাদ যাক কাজ হয়েছে এটাই অনেক।
শুদ্ধ শাহাদত চৌধুরীর বুক থেকে সরাতেই শীতল উঠল না। বরং বাবার বুক আঁকড়ো ধরে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

-‘ বোনকে বিধবা হওয়া থেকে বাঁচাতে আসামি হলাম। বাড়ি ফিরে দেখি আমার মা..আমার মা বিধবা হয়ে বসে আছে। এই….এই দৃশ্য কিভাবে সহ্য করব আমি? কিভাবে নিজেকে বুঝ দেবো আমার বাবা আর নেই রে। আমার বাবা, আমার কলিজার টুকরো বাবা আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। আমি বাবা ডাকব কাকে? কে আমার ডাকে সাড়া দেবে? কার কাছে মায়ের নামে অভিযোগ করব আমি? কে আমার শক্তি হবে? কে আমাকে সাহস জোগাবে? তাড়াতাড়ি আসার কথা দিয়ে একেবারেই চলে গেল আমার বাবা। বাবা, বাবা উঠো, বাবা! বাবা না থাকার অভাবে অভাবী কোরো না রে, বাবা। এ অভাব লাগব করার ক্ষমতা আমার নেই।
বাবা..তোমাকে সাদা কাফনে দেখতে পারছি না আমি। আমার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে বাবা। আমার দম আঁটকে আসছে।’

শুদ্ধ জোর করে শীতলকে সরিয়ে আনল সেখান থেকে। শুদ্ধকে আঁকড়ে ধরে কাঁদল মেয়েটা। উপস্থিত প্রতিটা মানুষ তার কান্নায় চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। তখন ধীর পায়ে স্বর্ণ এলো। শীতল বোনকে দেখে কান্না ভুলে গেল। বোনের এ রুপ সহ্য করার মতো না। চেহারার কি হাল!
স্বর্ণএবার নিজেও বসে পড়ল শীতলের পাশে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাবার মুখের দিকে। শুদ্ধ তখন দু’বোনের মাথাতে ভরসার হাত রাখল। তার নিজেরও কন্ঠরোধ হয়ে আসছে। বাড়িতে দুজন মানুষের কাছে সব কথা শেয়ার করে পারত। যে কোনো ব্যাপারে সহজে আলোচনা করতে পারত। তারা হলো শাহাদত চৌধুরী আর সায়ন। অথচ তাদের একজন বর্তমানে কোমায় আর আরেকজন একেবারে ফাঁকি দিয়ে চলেই গেল। তারা ফাঁকি দিলেও সে তো পারবে না। যত ঝড় আসুক সবটা তাকেই সামলাতে হবে। সবাই খুব কাঁদছে, অভিযোগ দিচ্ছে কিন্তু সে পারছে না।
এই না পারাটা যে কতটা যন্তণার হারে হারে টের পাচ্ছে।তবে যেদিন সব সমস্যার সমাধান হবে। বিপদের মেঘ কেটে নতুন সূর্য উদয় হবে সেদিন সেও কাঁদবে, খুব কাঁদবে। ততদিন যত যা কিছু ঘটে যাক দু’হাতে সামলে নেবে, নিতেই হবে। এসব ভেবে শীতল আর স্বর্ণের মাথায় হাত রাখলে দুজনই ঘুরে তাকাল তার দিকে। তখন শুদ্ধ বলল,

-‘শহীদ শাহাদত চৌধুরীর মেয়ে তোমরা। ভেঙে পড়লে চলবে? কেউ না জানুক তোমরা তো জানো তোমাদের বাবা হাল ছাড়ার মানুষ না। তবে তোমরা কেন ভেঙে পড়ছো? বাবার মেয়েরা বাবার মতো হতে হবে না?
মায়ের কথা ভাবতে হবে না? উনাকে তো তোমাদেরই সামলাতে হবে।’
মায়ের কথা বলতেই শীতলের টনক নড়ল সে উঠে বাড়ির ভেতর গেল। সিমিন দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। চোখের পানি অঝরে ঝরে যাচ্ছে। শীতলকে আসতে দেখে ছোটো বাচ্চার মতো ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দিলেন। শীতল মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেই বসে রইল। সিমিন জমে থাকা কান্না উগড়ে দিলো মেয়ের কাছে। মাকে কাঁদতে দেখে শীতল আর কাঁদল না। এদিকে ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে ছুটে চলেছে ঘন্টার কাঁটার দিকে। এভাবে কিছুক্ষণ পাথর হয়ে মায়ের কাছে থাকল শীতল। দু’জন মহিলা পুলিশ দাঁড়াতেই বুঝল সময় শেষ। সে মায়ের কপালে চুমু দিয়ে কান্নাভেজা স্বরে থেমে থেমে বলল,

-‘ সাবধানে থেকো। আপুর খেয়াল রেখো।’
সিমিন মেয়ের কাঁধ থেকে মুখ তুলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। এই কোন পাপের শাস্তি পাচ্ছে উনি? মাথার উপর থেকে ছায়াটা সরে গেল, বড় মেয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যত, ছোটো মেয়ের এই দশা! এতদিন কি এই দিনের জন্য বেঁচে ছিলেন? শীতল সিতারা আর সিরাতের দিকে তাকালে
উনারা শব্দ করে কেঁদে ফেললেন। কথা দিলেন তার মা বোনের খেয়াল রাখবে। এইটুকু প্রতিশ্রুতি পেয়ে শীতল পুনরায় ওর বাবার কাছে এলো।
বাবার হাত আঁকড়ে ধরে ঝুঁকে চুমু খেলো বাবার কপালে। কানে কানে ফিসফিস করে বলল,

-‘শেষ যাত্রায় একটা সিক্রেট কথা শুনে যাও বাবা। কথাটা হয়তো বলতে চেয়েও কোনোদিন মুখ ফুটে বলা হয়নি কিন্তু আজ চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, ‘তোমায় অনেক ভালোবাসি বাবা! সারাটা জীবন তুমি শুধু আমাদের ফাঁকিই দিয়ে গেলে। কখনও দেশ, কখনও দেশের মানুষ, আর কখনও ওই জলপাই রঙের পোশাকটার দোহাই দিয়ে আমাদের থেকে দূরেই থাকলে। বাবার আদর ঠিকমতো পাওয়ার আগেই তুমি কর্তব্যের চাদরে মুখ লুকালে। ​আমার ওপর যদি তোমার সামান্যতম দাবি থাকে বাবা, তবে ফিরে এসো। এবার বাবা হয়ে নয়, আমার সন্তান হয়ে আমার কোলে ফিরে এসো। আমি তোমায় আর একটি মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেব না। সেই সবটুকু সময় আমি তোমায় দেব, যা তুমি আমাকে দিতে পারোনি। ফিরে এসো বাবা, ফিরে এসো।’

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮১

একথা বলে এবার শুদ্ধর দিকে তাকাল। তারপর থেমে থেমে বলল,
-‘আমার বাবার শরীরে আজ না জানি কত আঘাত। কত ব্যথা। আপনারা যখন ধরবেন একটু আস্তে করে ধরবেন আমার বাবাকে। যত্ন করে শুঁইয়ে দিয়ে আসবেন শক্ত মাটির বিছানায়। আমি মেয়ে হয়ে তো সেসব পারব না তাই সবার মতো আপনার ঘাড়ে দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে গেলাম, আসছি আমি।’

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮৩

16 COMMENTS

  1. আলো আপু আসসালামু আলাইকুম। আপু প্লিজ পরের পার্টটা দিয়ে দেও। আর আগের মতো শীতলের পরিবারকে সুখী করে দেও। প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ

  2. সবারি পারসোনাল লাইফ আছে আপনার আমার মতো কেউ বেকার বসে থাকে না যে শুধু সারাদিন গল্প আপলোড করবে।। আর তাছাড়া ও গল্প লেখা মুখের কথা না।।। মন দিয়ে গল্প ভাবতে হয়,,, প্লট সাজাতে হয়।।।।।।।

Comments are closed.