প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯৫
সাইয়্যারা খান
পিচ ঢালা রাস্তাটা আজ ভেজা। থেমে থেমে ভীষণ বৃষ্টি কিন্তু মূহুর্তের মাঝেই কড়কড়ে রোদ। এমন অহেতুক আবহাওয়া না বৃষ্টির ভেজা ভাব অনুভব করতে দিচ্ছে, না দিচ্ছে রোদের পরিপূর্ণ তপ্ততা। শুধু গা জ্বালানো এক গরম। ফজর থেকে মাগরিব অব্দি এমনই আবহাওয়া কেটেছে। সন্ধ্যার পর থেকে কিছুটা স্বস্তি। গাড়িতে বসে ঢুলছে পৌষ। মাথাটা কাত করে আছে এক প্রকার। তৌসিফ আলগোছে তা টেনে নিলো নিজের কাঁধে। তুরাগ বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে হসপিটালে গিয়েছে আবার। তিশা, তাহিয়া সাথে আছে। তৌসিফ হেমন্তকে দিয়ে পৌষকে পাঠাতে চেয়েছিলো। পরপর পৌষ আর তুরাগের জোরাজুরিতে বাসায় যেতে রাজি হয়েছে। আগামী কাল তুহিনের রিলিজ হবে। আজ দুই ভাই থাকবে তুহিনের সাথে। তুহিনকে ঘুমে রেখে পৌষ এসেছে। চাইলেও আর থাকাটা সম্ভব হচ্ছিলো না। কোমড় থেকে নিয়ে ঘাড় তার মটমট করছে। মুখে না বললেও তৌসিফ তা দেখেই বুঝেছিলো। এক প্রকার জোর করে বাসায় পাঠাচ্ছে ওকে।
“হানি, কিছু খাবে?”
“ফুচকা।”
“আমি যতটুকু জানি তোমার পছন্দ না ততটা।”
“হুঁ, হঠাৎ মন চাইলো।”
“বুয়াকে বলে যাব আমি।”
“রাস্তারটা খেতে মন চাইছে কিন্তু খাব না আমি।”
কথাটা বলে পৌষ চুপ রইলো। তৌসিফ ফ্রন্ট সিটে ড্রাইভারের সাথে বসা হেমন্তকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“হেমন্ত, সামনে বামে গাড়িটা থামাও৷ ওখানে একটা কাবাবের দোকান আছে।”
“আমি খাব না।”
পৌষ দ্বিমত পোষণ করলো তবে তৌসিফ শুনলো না। তার ভরসা, পৌষের পছন্দ হবে এবং হয়েছেও তাই। পৌষ ভালোই খেয়েছে। বাসায় থাকা সবার জন্যও তারা খাবার নিয়েছে। তৌসিফ পৌষকে গাড়িতে বসিয়ে আরো কিছু কেনাকাটা করেছে। এই বোধহয় প্রথম তার শালাশালীরা থাকছে তাদের বাসায়। তৌসিফ তাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। তারা না থাকলে কার ভরসায় পৌষকে বাসায় রাখতে তৌসিফ?
গাড়িটা যখন তালুকদার বাড়ীর গেট দিয়ে ঢুকছিলো তখনই তৌসিফ তাহমিনাকে দেখেছে। হয়তো আগ বাড়িয়ে আসতে পারে নি তাহমিনা। যাকে একদিন সে নিজে হ’ত্যা করতে চেয়েছিলো সে আজ যখন নিজে ম’রতে বসেছিলো তাকে কিই বা জিজ্ঞেস করার থাকতে পারে ওর? তৌসিফ পৌষকে নিয়ে উপরে গেলো। দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা লাগে নি ওদের। উন্মুখ হয়ে আছে পাঁচটি মুখ। নাহ্, পাঁচটি বললে ভুল হবে। সাতটি মুখ। মায়ের কোলে থাকা ছোট্ট শ্রেয়ানও তো অপেক্ষায় ছিলো। কতবার নরম ঘাড় তুলে এদিক ওদিক খুঁজেছে তার বাবার বড় মেয়েটাকে। তার ফুপিকে।
সিঁড়ি বেয়ে যখন দ্বিতীয় ধাপ উঠতে যাবে তখনই চিৎকার শোনা গেলো, “আপা!”
পৌষের ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠলো। কি বিশ্রী কান্ড! ছিঃ ছিঃ, পৌষ কি ছিদকাদুনে হয়ে গেলো নাকি? এই পাকবাহিনী তো আগে থেকেই আপা আপা ডাকতে থাকে৷ এতদিন পর এদের ডাকে এসব আবেগ কেন চলে আসছে? পৌষের বোধহয় বাকি পথ একদমই কষ্ট হলো না। তৌসিফ ওকে ধরা অথচ তার পাঁচ ভাই-বোন এগিয়ে নিচ্ছে তাকে। ঐ তো পেছনে হেমন্তও আছে।
পৌষকে রুম পর্যন্ত দিয়ে ভদ্রসভ্য তার ভাই-বোনেরা বেরিয়ে এসেছে। গায়ে থাকা ওরনা খুলে পৌষ আলমারি খুললো। শরীর ভালো লাগছে না এখন। রাতটা তৌসিফ ছাড়া থাকতে হবে। মানুষ ঠিক বলে, মানুষ অভ্যাসের দাস হয়ে যায়। পৌষের দারুণ অভ্যাস এই তৌসিফ। রাতে যতবার পৌষের ঝামেলা হয়, শরীরটা ব্যথা হয় তখন তৌসিফ নিজে থেকেই বুঝে যায়। আগ বাড়িয়ে পৌষের যত্ন করে। পৌষের নিজের কাছে এটা অবাক করা বিষয় যে সে এখন থেকেই তৌসিফ থাকবে না ভেবে মন খারাপ করছে। তার মন খারাপি প্রকাশ পাচ্ছে হাঁটাচলায়৷ কি বিস্মিত কান্ড! পৌষের কি না এত ছোট কারণে মনটা কেমন কেমন লাগছে? পৌষ তৌসিফের জন্যও কাপড় বের করলো। লোকটা গোসল করে যাবে।
“হানি?”
তৌসিফ খালি গায়ে বাথরুম থেকে ডাক দিলো। হাতে টাওয়াল। পৌষ কাপড় গুলো নিয়ে এগিয়ে যেতেই তৌসিফ কাপড় নিয়ে রাখলো। পৌষের হাত ধরে ভেতরে নিলো। পানির বালতিতে হাত দিয়ে তাপমাত্রা আরেকবার পরখ করে নিলো। পৌষের চুলগুলো বেণী করা। তৌসিফ ওকে বসিয়ে বেণী খুলতে খুলতে নরম স্বরে বলতে লাগলো,
“রাতে আমি থাকব না তোতাপাখি কিন্তু কল দিব। কাল হয়তো দুপুর দিকে তুহিনকে ডিসচার্জ দিবে। তুমি রাতে ঘুম ভাঙলে শুধু মিনুকে ডাকবে। আমি বুয়াকে বলে দিয়েছি। শুনো, পেটে চাপ লাগবে এমন ভাবে শুবে না৷ আমি থাকব না, নিজের খেয়াল রাখবে। রনি রাতে নিচেই থাকবে অফিসে। যখন যা লাগবে আনাবে। আমার শালা, শালীরা প্রথমবার থাকছে। কমতি যাতে না থাকে।”
“মাত্র একটারাত। এত নসিহত করছেন যে।”
“একটারাত তাও তুমি ছাড়া। আমার জান গলায় আটকে আটকে আসছে।”
তৌসিফ পৌষের পরণে থাকা গোল ফ্রকটা খুলে দিলো। চুল ভেজালো পানি দিয়ে। শ্যাম্পু গুলিয়ে ধীরে ধীরে পেছন থেকে চুল পরিষ্কার করতে লাগলো। হাজার হোক, হসপিটালে ছিলো। কোন রোগজীবাণু চলে এলে সাথে? কপাল বেয়ে ফ্যানা আসতেই কুনুই দিয়ে মুছলো তৌসিফ। তার পৌষরাতের চুল বেশ বড়। ঘন আর লম্বা। তৌসিফ ত্বকে এমন ভাবে আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে দিচ্ছে যে পৌষের চোখে ঘুম ঘুম ভাব চলে আসছে। ধীরে ধীরে পানি ঢালছে তৌসিফ। একটা হাত দিয়ে আবার কপালের উপর ঢেকে রেখেছে যাতে চোখে না যায়। কোনদিন যদি তৌসিফ গোসল করায় তবে এভাবেই করাবে। লোকটা যত্ন করে পৌষকে। এত বড় পৌষকে এভাবে গোসল করায় সে অথচ জন্মের পর নাজুক পৌষকে আদৌ কেউ এভাবে গোসল করিয়েছিলো কি না কে জানে। চুলে কন্ডিশনার লাগিয়ে পৌষের পায়ের নখ ব্রাশ করলো তৌসিফ। গোড়ালি ঘষলো নরম হাতে। পা শুকিয়ে যায় প্রায় প্রায়, তৌসিফ গরম পানিতে ওর পা ডুবিয়ে রাখলো। পৌষ চোখ খুলে বুজে আসা কণ্ঠে বললো,
“আপনিও ক্লান্ত, আজ কি দরকার ছিলো?”
“নেই বলছো?”
“হুঁ।”
“অথচ আমি দেখছি আছে। তোমার মুখ বলছে আছে, চোখ বলছে আছে। পেটে থাকা আমার দুই বাচ্চা বলছে তাদের মায়ের খুব প্রয়োজন আছে একটু যত্নের।”
পৌষ পেটে হাত রাখলো। বললো,
“কবে জানি চলে আসে ওরা।”
“এই তো, এলো বলে।”
চুল ধুয়ে স্টিক দিয়ে পেঁচিয়ে দিলো তৌসিফ অতঃপর বডি ওয়াশ দিয়ে সারা শরীর ভালো মতো মাখাতে লাগলো। তার হাত দুটো এখন পৌষের মুখে ঘুরছে। কি সুন্দর লম্বা লম্বা আঙুল দিয়ে নাক, থুতনি, গাল ডলে দিচ্ছে। পেটে আলতো হাতে আদর করে করে বডি ওয়াশ মেখেছে। উষ্ণ পানিতে পৌষকে পুরোপুরি গোসল করিয়েছে তৌসিফ। চুলে একটা টাওয়াল পেঁচিয়ে আরেকটা দিয়ে চেপে চেপে মুছে দিলো ওকে। কাপড় পড়িয়ে হাতটা ধরে বাইরে এনে বিছানায় বসিয়ে অতঃপর নিজে গেলো গোসল করতে।
নিজ প্রতিবিম্ব আয়নায় দেখলো পৌষ। স্বামী সোহাগি পৌষরাত হক যার নিকট স্বামী সরূপ তৌসিফ তালুকদার রয়েছে। পেটে হাত রেখে মলিন কণ্ঠে পৌষ বললো,
“কোনদিন বাবাকে কষ্ট দিবে না। কোনদিন বাবার উপর কথা বলবে না৷ কোনদিন বাবার কথার পৃষ্ঠে কিন্তু তুলবে না। জানবে, এই যুগের এক সেরা স্বামী সে। আমি পৌষরাত লিখিত দিতে পারব, আমার স্বামীর মতো ভালোবাসাময় আর কাউকে পাই নি আমি। তোমাদের জন্য তার বুক ভরা ভালোবাসা, আদর আর প্রেমটুকু আমার জন্য। আমি থাকি বা না থাকি, বাবাকে নিজেদের সবটুকু দিয়ে আগলে রাখবে। ভালোবাসবে। তোমাদের মা তাকে পা’গলের মতো ভালোবাসে। তার চোখে স্বর্গ দেখে। তার অস্তিত্বে নিজেকে খুঁজে। কোনদিন হয়তো তাকে বলা হবে না, তাকে ভালোবাসা দিতে দিতে পৌষ শূন্য হয়ে যাবে তবুও ভালোবাসা দেওয়া থামাবে না।”
চোখ দিয়ে পানি গড়াতো বুঝি কিন্তু গড়ালো না। তার চোখের পানি জমে আছে বুঝি কোটরে। গড়িয়ে পড়ার সাহস দেখায় নি।
টেবিলে খাবার সাজানো হয়েছে। তৌসিফের ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি। কতগুলো পাখি কিচিরমিচির করছে তার আঙিনায়। গলা ধরে ঝুলে আছে ইনি, মিনি৷ প্রশ্ন একটাই,
“তুমি কই ছিলে?”
“একটু বাইরে ছিলাম সোনারা। দেখো, চলে এসেছি।”
“যাবা গা?”
“একটু যাব আবার কাল চলে আসব। তোমরা থাকবে তো। আপাকে দেখে রাখবে।”
“তুমি থাতবে না কে?”
“একটু কাজ আছে।”
“না যাউ, পিলিচ।”
কথাটা বলেই গলা জড়িয়ে আছে দু’জন। তৌসিফ ওদের কোলে নিয়েই টেবিলে এসেছে। হেমন্তকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“হেমন্ত, আমার শালীদের যাতে মন খারাপ না থাকে। তাদের পছন্দের সব আনা হবে। বলো, কি চাই তোমাদের?”
ইনি, মিনি মাথা তুললো। দুলাভাই তাদের এমন কঠিন কঠিন প্রশ্ন করে ভাবনায় ফেলে দেয়। কি চাইবে তারা তা তো জানে না। তৌসিফ ডাকলো,
“পিহা? পিহা, এখানে এসো তো।”
হাতে বাটি নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো পিহা। তৌসিফ জিজ্ঞেস করলো,
“কি কি লাগবে দুলাভাইকে বলো। দুলাভাই পাঠিয়ে দিব।”
“কিছু লাগবে না দুলাভাই। আপনার কিছু লাগবে? আপনাকে কি স্পেশাল কিছু রান্না করে দিব?”
পিহা হাসিমুখে বললো। তৌসিফ বসলো ইনি, মিনিকে নিয়ে। তার বুকটায় এত শান্তি লাগে মাঝেমধ্যে। জটিলতা না থাকলে আর অবাঞ্চিত না হলে তার তো ইচ্ছে এদের সারাজীবনের জন্য নিজের কাছে রেখে দিতো তৌসিফ। এতটুকু পিহা তাকে উল্টো জিজ্ঞেস করে তৌসিফ কিছু খাবে নাকি? একে একে সকলে বসলো টেবিলে। পৌষ আড়চোখে তাকিয়ে ধমক দিলো,
“কিরে, নাম আমার জামাইয়ের কোল থেকে।”
“ইত্তুই তো উঠসি।”
“ইট্টুও উঠবি না৷ নাম!”
“দুলাভাই নিলো।”
“নিক, এবার নাম।”
“আহা, পৌষরাত। থাক না।”
“থাকি আপা?”
চোখ দুটোয় মায়া ঢেলে বললো দু’জন। পৌষ মানলো না। চেয়ারে বসালো ওদের। শ্রেয়া খাবার বাড়তে বাড়তে বললো,
“শ্রেয়ান সারাটাক্ষন খুঁজেছে তোমাকে অথচ এখন ঘুমাচ্ছে।”
“একটুও কোলে নিতে পারলাম না আজ।”
“কাল নিও।”
তৌসিফ খেতে খেতে শালা-শালীদের সাথে নানান কথাবার্তা বললো। পৌষ শ্রেয়াকে বলে তুহিনের জন্য খাবার গুছিয়ে দিলো। এই তুহিন যা ঘাড়ত্যাড়া, দেখা যাবে খাচ্ছে না হসপিটালের খাবার। দুপুরে তো কম ঝামেলা করলো না। পৌষ নিজে আর তেমন খেলো না৷ পেটটা ভরা তার। তৌসিফ মুখ মুছে উঠে রান্নাঘরে বুয়াদের সাথে কিছু কথাবার্তা বলেছে। ড্রয়ার থেকে একটা চাবি তাদের হাতে দিয়ে কিছু বলেছে। পৌষ শুনে নি ততটা।
বিদায় নিয়ে যখন বের হবে তখনই জানতে পারলো হেমন্ত নিজে থাকবে না এখানে। তৌসিফ বেশ অবাক হয়ে বললো,
“বাড়ীতে একটা পুরুষ মানুষ নেই হেমন্ত। বড় ভাই হসপিটালে আছেন। রনি শুধু নিজে। দারোয়ানের ভরসায় ওদের রেখে যাব আমি?”
“আমি তাহলে নিচে অফিসে থাকব ভাই।”
“পা’গল হলে হেমন্ত! কি বলছো তুমি?”
“আপনি বুঝবেন না ভাই৷ প্লীজ।”
“আমি কেন বুঝব হেমন্ত। তুমি কি অযৌক্তিক কথা বলছো?”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯৪
হেমন্তের মুখচোখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে সে অটল। তৌসিফ হয়তো কিছু বুঝলো তাই চাপা শ্বাস ফেলল। হেমন্তের কাঁধে হাত দিয়ে বললো,
“তুমি তোমার স্ত্রী, সন্তান নিয়ে তোমার বোনের বাসায় আছো। দয়াকরে, কারো কথা মনে রেখে কিছু করো না।”
“আমি থাকব ভাই। আপনি সাবধানে যান।”
তৌসিফ পা বাড়িয়ে পৌষের কাছে এলো। মাথায় হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বললো,
“আসছি তাহলে।”
“সাবধানে যাবেন।”
