প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫৪ (২)
রোজ ও রুশা
চারপাশে তখন বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে নেমে এসেছে এক নির্মম হাহাকার। প্রিয়র রক্তে ভেজা হাত আর ভেজা মাটিতে ঢলে পড়ে রইল নাভানের নিথর দেহটা।
বন্ধুর এই হৃদয়বিদারক রূপ দেখে সৃজন নাভানকে জাপটে ধরল। তার দেখাদেখি অধীর আর ঝিনুকও বৃষ্টির মাঝে ডুকরে কেঁদে উঠল। সকালে অজ্ঞান হওয়ার পর ডাক্তার বার বার করে বলে দিয়েছে,আর একবার এমন হলে জীবন মরন রিক্স হয়ে যাবে নাভানের,তুষার ও চিন্তিত ছিলো অনেক, নাভানের এমন অজ্ঞান হওয়া দেখে। তার উপর নাক-মুখ দিয়ে ব্লাড বের হচ্ছে বার বার। এবার তো ব্লাড এর মাত্র তিব্র। সবাই ভয় পেয়ে যায় বন্ধুর এমন অবস্থা দেখে।
“এই স্টুপিড! হেরা তোর সব! আমাদের কিছু না।”
সৃজন নাভানের বুকের ওপর হাত রেখে চিৎকার করে বলল। ঝিনুক নাভানের রক্তাক্ত মুখটা নিজের দুই হাতে জড়িয়ে ধরে বলল—
“এই নাভান! ভাই, আমার দিকে তাকা চোখ খোল! ও হাতুড়ে ডাক্তার, আমার ভাই কথা বলছে না কেন? এই নাভান, ওঠ না দোস্ত! তোকে ছাড়া আমরা যে অসহায়… কীভাবে খুঁজব হেরাকে? এই হাতুড়ে ডাক্তার, ওকে চোখ খুলতে বলুন না!”
অধীর আতঙ্কে শিউরে উঠে কেঁপে বলল—–
“ভা… ভা… ভাই ওঠ, আমি ভয় পাচ্ছি! তোর গায়ে যে এত রক্ত! তুই জানিস না হারামি, আমি রক্ত দেখতে পারি না? ওঠ না ভাই, সত্যি আমার খুব ভয় করছে! তুই ছাড়া তো আমার ভয় কাটে না!”এই হারামি উঠ না!
রুশা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল—
“ও চকলেট হিরো, আমার হেরা পাখিকে খুঁজে বের করে দাও না! তুমি ওঠো না…”
রোজ এবার পরিবারের বড়দের দিকে ঘুরে তাকিয়ে কেঁদে উঠল—
“ভাই,এই ভাই ! আমার তো এই দুনিয়ায় কেউ নেই তোমরা ছাড়া। সবার সামনে বোনের পরিচয় দিয়ে এখন হারিয়ে যাচ্ছ ভাই? আমরা সবাই হেরাকে খুঁজে বের করব, তুমি নিজেকে ঠিক রাখ! ও মামণি, ও বড় বাবা, —আমি তো তোমাদের মেয়ে, তাই না? এ, এ, তো আমার ভাই! আমার ভাইয়ের কী হলো! তোমরা কিছু করো, আমার ভাইয়ের কষ্ট হচ্ছে! ও বড় বাবা, তোমার না অনেক ক্ষমতা? ফিরিয়ে এনে দাও না আমার ভাইয়ের অক্সিজেনকে!”
বড়রা নিজেদের শোক ও আতঙ্ক সামলাতে পারছিলেন না, বাচ্চাদের শান্ত করার ক্ষমতা তখন কারও ছিল না।
ঠিক তখনই প্রিয় নিজের কান্না চেপে, এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে উঠে সেনাপতি মতো গর্জে উঠলেন। উপস্থিত সিআইডি আর সেনাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে অফিশিয়াল চিল-চিৎকার করে বললেন—
“কাম ফাস্ট! ইমিডিয়েট নাভানকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে! কাম ফাস্ট! শান্ত, নাভানের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে সম্ভবত! জলদি ওকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করো, তা না হলে…”
গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শান্ত রহমান নিজের গায়ের পরিচয়পত্র (ID Card) সিআইডির প্রধানের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে শক্ত গলায় নির্দেশ দিলেন স্ট্রেচার এগিয়ে আনার জন্য। এতক্ষণে বাকি সিআইডি অফিসারদের ভুল ভাঙল—এরা সাধারণ কেউ নন, হাই-কমান্ড থেকে আসা স্পেশাল ইউনিট এর সদস্য।
প্রিয়র সেই গর্জন আর গমগমে আদেশ শুনে রুশা থমকে গেল। সে চোখ তুলে তাকাল সেই অপরিচিত নারী সিআইডি অফিসারের দিকে। হুট করেই চেনা ভয়েস, গলার টান… নিজের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিধস্ত কিন্তু শক্তপোক্ত বোনকে দেখে—যাকে সে এতদিন কোমায় চিকিৎসাধীন বলেই জানত—রুশা সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তার চোখের সামনে যেন সত্যি আর মিথ্যের সীমানা গুলিয়ে গেল!
এদিকে নাভানের নাক-মুখ দিয়ে ক্রমাগত রক্ত ঝরছে। প্রিয়র কঠোর নজরদারিতে সিআইডি ও সেনাবাহিনীর জোয়ানেরা নাভানকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে তড়িঘড়ি হাসপাতালের দিকে রওনা দিল।
ইতোমধ্যেই এই ঘটনার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।
গুলিবিদ্ধ হাত আর শরীরের ক্ষত নিয়েই প্রিয়ন্তী সিকদার প্রিয় এবং শান্ত রহমান কন্ট্রোল রুমে নির্দেশ পাঠালেন। দেশের প্রতিটি এয়ারপোর্ট, সীমান্ত এবং সমুদ্রবন্দর মুহূর্তের মধ্যে সিল করে দেওয়া হলো।
কিন্তু নিলয় তাদের সব হিসাব উল্টে দিয়েছিল। সে পাহাড়ি এলাকার এক গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখা তার নিজস্ব প্রাইভেট জেটে চড়ে সেন্সর ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে যায়।
মেঘের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া প্রাইভেট জেটের ভেতরে বসে নিলয়ের মুখে ফুটে উঠল এক হিংস্র হাসি। তার কণ্ঠে ভেসে এল চরম প্রতিশোধের প্রতিধ্বনি—
মেঘের ওপর দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে চলা প্রাইভেট জেটের বিলাসবহুল কেবিনে তখন এক থমথমে নীরবতা। বাইরের অন্ধকারকে চিরে বিমানটা সীমান্ত পার হওয়ার সাথে সাথেই পেছনের সিটে হেলান দিয়ে বসলো নিলয় আজমির। তার এক হাতে সুরাপাত্র( মদ এর গ্লাস) আর চোখে-মুখে এক হিংস্র, উন্মাদের মতো আত্মতৃপ্তির হাসি। নিজের শিকার এখন তার নাগালের মধ্যে, তার নিজস্ব খাঁচায় বন্দি!
হেরা পাশে অচৈতান অবস্থায় পড়ে আছে। সেদিকে এক নজর তাকিয়ে নিলয়ের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত অহংকার। নিজের বাবার ব্যর্থতা আর নাভানের পতন—দুইকে এক সুতোয় গেঁথে সে যেন আজ এক বিজয়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে। এক গভীর নিঃশ্বাস ছেড়ে, শূন্যে গ্লাসটি তুলে ধরে নিলয় স্বগতোক্তির সুরেই গর্জে উঠল, যার প্রতিটা শব্দে ফুটে বের হচ্ছিল দখলদারিত্বের চরম জেদ আর বিষাক্ত ভালোবাসা—
“বলেছিলাম না, আমি কেড়ে নেব! তোদের কাউকে আমি শান্তিতে থাকতে দেব না! আমার বাবা তোর মায়ের ভালোবাসা ছিনিয়ে নিতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু তার ছেলে তার যা পাওয়ার তা ঠিকই আদায় করে নিয়েছে। আমার বাবাকে দেশের মানুষ এর সামনে ছোট করেছো,অপমান করেছো? জারজ উপাধি দিয়েছো? জেলের শিকলে বন্দি করেছো। অ্যাডভোকেট এম এল এ কাজল খান ও শেহতাজ খান নাভান—আমাদের ভালো থাকার দিন এবার শুরু হলো! সব কিছুর প্রতিশোধ নিলাম এক ডিলে।
গ্লাসে এক চুমুক দিয়ে নিলয় এক উন্মত্ত হাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসিতে কোনো মমতা ছিল না, ছিল এক অন্ধ অধিকারবোধের গর্জন। সে কড়া চোখে বাইরে তাকিয়ে আবার বলতে লাগল—
“ভালবাসি বলে আমার বাবার মতো সময় আর সুযোগ দিলে জীবনেও প্রেমের বাজিমাত করা যায় না। যে ভুলটা আমার বাবা আজমির চৌধুরী করেছিল, সেই একই ভুল এই নিলয় আজমির কখনো করবে না! অধিকার চেয়ে পাওয়া যায় না, নাভান… অধিকার কেড়ে নিতে হয়! কেড়ে নিয়ে, আমার সোনার খাঁচায় বন্দি করে দরকার হয় জোর করে প্রেমের বাজিমাত করব। তাও আমার বেচে থাকার প্রানভ্রোমরাকে ছেড়ে দেব না ,
হেরার পবিত্র মুখখানার দিকে তাকিয়ে অপোলোক চেয়ে থাকে নিলয়। হেরা এই নিয়ে ৮ বার অজ্ঞান হয়েছে তার সৃতি যে ফিরে এসেছে, সে অজানা কথা তো নিলয় জানে না। হেরাকে জোর করে নিজের বাহুডরে আগলে রাখতে চাইছে কিন্তু হেরা তা দিচ্ছে না। তাই আপাতত হেরাকে হাইপার করতে চাচ্ছে না নিলয়,অজ্ঞানরত হেরার মুখে দিকে তাকিয়ে বির বির করে —
তোকে কখনোই ছেড়ে দেব না লাইফ লাইন, আমার অপবিত্র জীববের পবিত্র ফুল যে তুই।
নিলয় আজমির চৌধুরির জীবনে প্রথম নাড়ী তুই
যে কি না সার্থ, সৌন্দর্য, ছাড়া আমায় আপন করেছিস,কি করে ছেড়ে দেই তোকে বল।
নিলয়ের কণ্ঠের সেই অবেক্ত কথা প্রাইভেট জেটের বদ্ধ বাতাসে এক ভারী আশঙ্কার কালো ছায়া ফেলে দিল যেনো।
হাসপাতালের করিডোরে বাতাসের ভারী নিঃশ্বাস যেন জমাট বেঁধে গেছে। কাঁচের ওপাশের আইসিইউ কক্ষটা মৃত্যুপুরীর মতো নীরব, আর এপাশে স্বজনদের বুকের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
ডাক্তার বের হয়ে কাঁচের দরজাটা ভেজাতেই জাওয়াদ খান আর কাজল খান একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সামনে শুধু এক যন্ত্রণাদগ্ধ পিতা আর মাতা।
কাজল খানের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে—-
” জাওয়াদ… আমার ছেলেটার কী হলো? ও তো সবসময় আমার মতো শক্ত ছিল! এত বড় একটা মানসিক যন্ত্রণা ও কবে থেকে নিজের বুকের ভেতর এভাবে লুকিয়ে রেখেছিল, জাওয়াদ?” আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও! আমি মারা জাবো আমার ছেলের কিছু হলে! আমার ছেলের পরি বউ টাকে এনে দাও জাওয়াদ। ওর মনে এতো কষ্ট ছিলো। সব আমাদের দোষ। সব আমাদের দোষ।
প্রশ্নের ভার সইতে না পেরে জাওয়াদ খান ধপ করে ওখানেই ফ্লোরে বসে পড়লেন। তার দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া প্রতিটি ফোঁটা জল সাক্ষী দিচ্ছিল—ছেলের আজ এই নিথর, মলিন অবস্থার পেছনে তিনিও যে কম দায়ী নন!
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তৌহিদা জিহান ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন–
“আব্বাজান! আমার আব্বাজানের কী হলো? ও না উঠলে কে ওর পরি-বউকে ওই গুন্ডার হাত থেকে বাঁচাবে? এ কী হলো ভাই… এ ভাই, কিছু কর না! এই জিহান, তুমি কিছু করো!”আমার আব্বাজানকে অই গ্রাস এর কেবিন থেকে বের করতে বলো। ওর নাক মুখে কি হাবিজাবি দিয়েছে, ওর কিন্তু এসব পছন্দ না। সবাইকে অইসব সরাতে বলো। না সরালে হসপিটাল সহ উড়িয়ে দিবে কিন্তু রাগে হ্যাঁ। আব্বাজান পিপি মনি ডাকছি তো উঠে আয় তোর পরি বউ কে আনতে যাবো তো, আব্বাজান আব্বাজান।
বলতে বলতেই কান্নার তীব্রতায় তৌহিদা তালুকদার ঢলে পড়ে অচেতন হয়ে যান। একপাশে কাজল খানের নিজের শরীরও ভেঙে আসছিল, তাও তিনি ঝাপসা চোখে ধোঁয়াটে কাঁচের ওপাশে ছেলের ওই মলিন, নিষ্পাপ মুখটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন।
জাওয়াদ খান হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে কাজল খানের পা দুটো জড়িয়ে ধরলেন। গলার শব্দ কান্নায় বুজে আসছিল তার—
“আমায় মাফ করে দাও কাজলরেখা… আজ আমার ছেলের এই অবস্থার জন্য আমিই দায়ী। শুধু আমি…”
বাতাসে থমথমে নীরবতা নেমে এলো। কান্নার শব্দগুলো যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। সবার ভেজা চোখগুলোতে জমে উঠলো রাশি রাশি প্রশ্ন। জাওয়াদ খান মাথাটা নিচু করে, অতীতের সেই কালবোশেখী স্মৃতির গভীরে তলিয়ে যেতে লাগলেন…
ঝাপসা হয়ে আসা অতীতের পাতায় ভেসে ওঠে আগের দৃশ্যপট…
বিচ্ছেদের সেই বিষাক্ত দিনগুলোর কথা। যখন জানতে পারলেন তার বোন আর জিহান এই দুনিয়ায় আর নেই, তখন বোনের শেষ কথাটা রাখতে ছোট্ট হেরাকে কোলে তুলে নিয়ে অন্য এক দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন জাওয়াদ খান।
হেরার বয়স তখন মোটে পাঁচ এর মাঝামাঝি । অতটুকু মেয়ে, কিন্তু বুকে তার বিশাল এক শূন্যতা। না ছিল বাবা, না মা। এক অজানা দেশে গিয়ে কাজের লোক দিয়ে তাকে কোনোভাবেই শান্ত করা যাচ্ছিল না। দিন দিন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছিল মেয়েটা। কারণ, তার মিষ্টি ঠোঁটে দিনরাত একটাই জপ ছিল—’লাভান বর .. লা ভান…’ বর ।
একদিন হেরা এত অসুস্থ হয়ে পড়লো যে মনে হচ্ছিল এই বুঝি সব শেষ! জাওয়াদ খান তখন বাসায় ছিলেন না। অনু আপা—তাদের সেই পুরোনো কাজের মেয়েটি, যার মায়াময় হৃদয় পরিস্থিতিটা বুঝেছিল—অনেক কষ্টে নাভানদের বাসার ল্যান্ডলাইন নম্বর জোগাড় করে নাভানের সাথে কথা বলিয়ে দেয়। আর অনু আপাই ছোট নাভানকে শিখিয়ে দিয়েছিল–
“নাভান, কাউকে বলবে না কিন্তু আমাদের কথা হয়…” তাহলে তোমার পরি বউ এর সাথে আর কথা বলতে পারবে না।
কিশোর নাভান অনু আপার কথা অক্ষরে অক্ষরে রেখেছিল। বুকে আগুন চেপে রেখে, বাবা মায়ের আড়ালে সে দূর থেকেই হেরার ছায়া হয়ে রইলো।
বয়স যখন ১৩, নাভান বুঝতে পারলো—হেরা শুধু তার শৈশবের খেলার সাথী নয়, হেরা তার অস্তিত্বের অংশ। আর বয়স যখন ১৮ সিআইডি অফিসার তিহান জায়িনের সাহায্যে আড়ালে থেকে হেরাকে একনজর দেখার জন্য ছুটে গিয়েছিল সে। কিন্তু ভাগ্য তাদের ওপর নির্মম ছিল।
যেদিন জাওয়াদ খান হঠাৎ বাসায় ফিরে নাভানকে দেখে ফেলেন, রাগে অন্ধ হয়ে ১৭ বছরের ছেলেটাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন।
সেই দৃশ্য আজও যেন চোখের সামনে ভাসে—ছোট্ট হেরা তার বাবার পায়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছিল—
“বাবা, তুমি আমার লাভান বর কে তাড়িয়ে দিও না!”
কিন্তু জাওয়াদ খানের মন গললো না। দুই কিশোর-কিশোরীর কাঁচা মনটাকে তিনি নির্মমভাবে চুরমার করে দিলেন।
নাভানকে তাড়িয়ে দিতে দেখে হেরা এত কেঁদেছিল যে, নাভান হেরার এমন অবস্থা দেখে নিজেই রাস্তায় অসুস্থ হয়ে যায়। দুই দিন রাস্তায় কাটায় নাভান। নাভানের এমন পাগলামি আর মেয়ের পাগলামি দেখে ! জাওয়াদ খান হুমকি দিয়েছিলেন নাভানকে —
” যদি আর কখনো হেরার সামনে আসিস, ওকে নিয়ে এমন জায়গায় চলে যাব যেখানে তুমি কোনোদিন আর পৌঁছাতে পারবে না।
সেই ভয়ে নাভান আর সামনে আসেনি সারাদিন । কিন্তু সে জানতো, হেরা তাকে খুঁজছে।
সন্ধ্যা নেমে আসতেই হেরা পাগলের মতো ছাদে উঠে নাভানকে ডাকছিল—
“লাভান বর ! তুমি কোথায়?” ও লাভান বর!
আর নাভান? ছাদের নিচের আধাঁরে, দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে একাকী কাঁদছিল আর নিজের চোখের জল মুছছিল। বাবার দেওয়া হুমকির কাছে বন্দী ছিল তার ভালোবাসা। বয়সি তখন কতো অনু আপা আর তিহান জায়িন এর মাধ্যমে সে হেরা অব্দি এসেছিলো।
ঠিক তখনই ঘটেছিল সেই দুর্ঘটনা। ডাকতে ডাকতে ছাদের ভেজে রেলিং থেকে পা পিছলে হেরা নিচে পড়ে যায় দুই তলা থেকে নিচে বালি থাকায় শরীরে তেমন আঘাত পায় না কিন্তু একটা ইটের সাথে … মাথায় মারাত্মক চোট পায়। যেদিন হেরা সুস্থ হলো, সেদিন তার স্মৃতি থেকে মুছে গেছে নাভান নামের সবটুকু অধ্যায়। মুছে গিয়েছিলো পাগলামি করা নিশ্বপাপ ভালোবাসা। মুছে গিয়েছিলো লুকিয়ে কথা বলা,মুছে গিয়েছিলো, অপেক্ষা করা।
মাথায় মারাত্মক আঘাত পেয়ে সেদিনের স্মৃতি হারিয়ে ফেলা হেরাকে দেখে, ১৭ বছরের নাভানকে সেদিন রাস্তার কোণে বারবার চোখের জল ও রক্ত মাখা নাক মুছতে দেখেও জাওয়াদ খান পাত্তা দেননি। তিনি বুঝতেই পারেননি, এক কিশোরের হৃদয়ে মানসিক ট্রমার সেই ক্ষত কতটা গভীর হয়ে বসেছিল! সেদিন প্রথম বারের মতো নাক দিয়ে রক্ত বের হয়েছিলো নাভানের , কিন্তু মেয়ের চিন্তায় জাওয়াদ খান ছেলের দিকে পাত্তা দেয় নি। তখন দুই আগুনে জর্জরিত ছিলো জাওয়াদ খান,যে ছেলেকে নিজ ছেলের পরিচয় দিয়েছেন,কিন্তু সে নাকি তার ছেলে নয়। এই আগুন নাভানের প্রতি আরো ক্ষিপ্ত করে তুলেছিলো।
জাওয়াদ খানের বুকটা ঝাঝরা হয়ে যাচ্ছে অনুশোচনার নির্মম দাহনে।হসপিটালের করিডোর এর কোণে প্রিয় তখনো ডুকরে কেঁদে চলেছে—এক নিষ্পাপ, ভাঙা আত্মায় প্রতিধ্বনি হচ্ছে এক বাবার চরম নিষ্ঠুরতা। সেই রাতের প্রতিটি স্মৃতি এখন বিষাক্ত কাঁটার মতো বিধছে জাওয়াদ খানের মস্তিষ্কে।
কতটা অন্ধ, কতটা স্বার্থপর ছিলেন তিনি! রক্তের বাঁধনকেও সেদিন চিনতে পারেননি কেবল এক অন্ধ আক্রোশের বশে। অবুঝ কিশোর ছেলেটা কতবার হাঁটু গেড়ে বসেছিল মেঝতে, দু’হাতে বাবার পা দুটো জড়িয়ে ধরে রক্তবমি করার মতো আকুতিতে কেঁদেছিল। চোখ বন্ধ করে অতীত স্বরন করেন। নাভানের সেই আকুতি–
“বাবা, এতটা পাষাণ হয়ো না গো আমাদের প্রতি… আমি সত্যি এঞ্জেলকে ছাড়া নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। একটা দিন ওর গলা না শুনলে যে আমার বুকের ভেতরটা চুরমার হয়ে যায়, আমি যে ঘুমাতে পারি না বাবা! এঞ্জেল ওপাশে অঝোরে কাঁদছে, আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে বাবা… আমি শুধু একটাবার, এক মুহূর্তের জন্য ওর সাথে কথা বলেই চলে যাব, সত্যি বলছি! কত বড় আশা নিয়ে তোমার পায়ে পড়ে আছি বাবা, একটা বার দয়া করো…”
কিন্তু জাওয়াদ খানের হৃদয় সেদিন ছিল পাথরের চেয়েও কঠিন, ঘৃণায় অন্ধ। ছেলের সেই বুকফাটা আর্তনাদ স্পর্শই করতে পারেনি তাকে। উল্টো গর্জে উঠেছিলেন বিষাক্ত হুঙ্কারে—
“কোন মুখে এসেছিস আমার সামনে? তোর ওই বেইমান মা পাঠিয়েছে না তোকে নাটক করতে?”
” বাবা, মা এখানে আসেছি জানলে আমায় মেরেই ফেলবে, আমি তিহান এর বাসার কথা বলে এসেছি ! আল্লাহর কসম, মা কিচ্ছু জানে না! আমি নিজের বাবার টানে, বুকভাঙ্গা যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তোমার কাছে ছুটে এসেছি বাবা…”
“মিথ্যা বলবি না আমার সামনে! তোর এত সাহস হয় কী করে?”
“না বাবা, দোহাই তোমার, সত্যি বলছি…”
“চুপ কর! তুই আমার ছেলে নস! দূর হয়ে যা আমার চোখের সামনে আর আমার বাড়ি থেকে! এরপর যদি আবার কোনোদিন আমাকে ‘বাবা’ বলে ডাকার দুঃসাহস করিস, তবে হেরা আর অনুকে নিয়ে এমন জায়গায় হারিয়ে যাব—যেখান থেকে তোদের অস্তিত্বই মুছে যাবে। অনুকে চিরতরে দেশে পাঠিয়ে দেব!”দেখবো কিভাবে কথা বলিস আমার মেয়ের সাথে।
ছেলেটির পৃথিবী যেন চোখের সামনে নিমেষে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। কাঁপা কাঁপা হাঁটুতে ভর দিয়ে, অশ্রুভেজা চোখে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ভাঙা স্বরে বলে উঠেছিল—
“না বাবা… এমন নরকযন্ত্রণা আমাকে দিয়ো না… আমি যে এঞ্জেলকে না পেলে মরেই যাব বাবা! আমার বুকের ভেতরে তীব্র কষ্ট হচ্ছে… আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না বাবা…”
সেদিনের সেই নিষ্পাপ ছেলেটার বুকের অমানুষিক যন্ত্রণা আর বাবার নির্দয় প্রত্যাখ্যানের স্মৃতি আজ অন্ধকারের মতো চেপে বসেছে ঘরজুড়ে। জাওয়াদ খানের মনে হচ্ছে, তিনি শুধু নিজের সন্তানকেই তাড়িয়ে দেননি, নিজের হাতে খুন করেছেন একটা জীবন্ত কিশোর আত্মাকে। প্রিয় ভাঙা গলায় বলে এবার —
“শুধু এটাই নয় বড় বাবা …”
———–
(আগেই বলে রাখি একটা মিস্টেক হয়েছে,বন্ধুমহল জাওয়াদ খানকে বড় বাবা,আর এডভোকেট কাজল খানকে মামনি বলে ডাকবে। হেরা হায়দার চৌধুরীকে ছোট বাবা বলে ডাকবে। আগের পর্বে সব ঠিক করে দিবো। ধন্যাবাদ🥰)
————–
প্রিয় তার চোখ দুটো মুছে রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলো—
“নাভান হেরার জন্য শুধু মানসিক কষ্টই সহ্য করেনি, নিজের জীবনটা বাজি রেখে দিতে গিয়েছিল।”
সবাই চমকে উঠে প্রিয়র দিকে তাকালো।
প্রিয় তখন স্মৃতির পাতায় ডুব দিল–
“হ্যাঁ… তখন আমি আর বাবা ব্যবসার কাজে রাশিয়ায় গিয়েছিলাম। জাওয়াদ আংকেলের সাথে তখন আমাদের পরিচয়। রুশা বোডিংয়ে পড়তো। নাভানের সাথে আমার তখনই চেনা-জানা।”
প্রিয়র গলা কান্নায় ধরে এলো, সে আবার বলতে শুরু করলো–
“সেদিন হেরার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠেছিল। ডাক্তাররা স্পষ্ট বলে দিয়েছিল—বাঁচবার সম্ভাবনা মাত্র ১%, ৯৯% মৃত্যুর ঝুঁকি! আংকেলের ব্যবসাও তখন ভালো যাচ্ছিল না। হাসপাতালে এক মুহূর্তও টাকা ছাড়া চিকিৎসা চলছিল না, হেরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল। আংকেল যখন দিশেহারা, তখন আমার বাবা যা ছিল সব দিয়ে সাহায্য করেছিলেন, কিন্তু তাও কম পড়ছিল।”
“সবাই যখন আশা ছেড়ে দিয়েছিল, ওই ১৭ বছরের ছেলেটা দমে যায়নি। কোনো লাইফ রিক্সের পরোয়া না করে, নাভান তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় শখের বাইকটাকে বানিয়ে ফেললো মৃত্যু আর জীবনের জুয়া খেলার অস্ত্র! আর গিটার আর গান গাইয়ে, রাসিয়ার রাস্তায় রাস্তায় টাকা তুলতো! রাশিয়ার আন্ডারগ্রাউন্ডের ভয়ংকর সব ডেথ-রেসে নাম লেখালো সে। এমন সব বাইক রেস… যেখানে একটু ভুল মানেই শরীরের হাড়গোড় গুঁড়ো হয়ে যাওয়া, বা নিমিষেই লাশ হয়ে যাওয়া!” তিহান জায়িন এর সুত্রে বয়স বাড়িয়ে নাম দেয় রেসে নাভান।
প্রিয়র চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ছে, সে আর সামলাতে পারছে না নিজেকে–
“প্রতিটা রেসে নিজের জীবন বাজি রেখে জয়ী হয়ে, যে টাকা সে পেত—তা এনে গোপনে আমাদের হাতে তুলে দিত। কারণ সে জানতো, জাওয়াদ আংকেল জানলে সেই টাকা স্পর্শও করবেন না। যে ছেলেটা রক্তে ভেসে গিয়েও হেরার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিল মেটাতো, সে আড়ালে দাঁড়িয়ে শুধু প্রার্থনা করতো—আর বলতো!
‘পরি বউ যেন বেঁচে থাকে, আমাকে ভুলে গেলেও ক্ষতি নেই’…”
প্রিয়-র কথাগুলো যখন হসপিটালের থমথমে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল, তখন পুরো কক্ষ যেন এক নিঃশব্দ হাহাকারে জমে বরফ হয়ে গেল। ঘরের প্রতিটি কোণে এক পবিত্র, নিষ্পাপ অথচ কোনো এক অন্ধকার কানাগলিতে থমকে যাওয়া ভালোবাসার দীর্ঘশ্বাস ভারী হয়ে ফুটছিল। যে ছেলেটা নিজের অস্তিত্বকে ধূলিসাৎ করে, বুকের ভেতরের তপ্ত রক্ত জল করে এক ফোঁটা আলোর মতো বাঁচিয়ে রেখেছিল তার প্রিয় মানুষটাকে—আজ সে-ই আইসিইউ-এর নির্জন বিছানায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। সবার চোখে জমানো জল, আর হৃদয়ে একটাই তীব্র আকুতি—এই নিঃস্বার্থ প্রেম যেন অন্তত হেরে না যায়!
প্রিয়র থামার নাম নেই। তার কাঁপা কণ্ঠস্বর যেন ইতিহাসের এক গভীর ও অন্ধকার সত্যের পর্দা একে একে উন্মোচিত করছিল…
” ডাক্তারদের রক্তচক্ষু আর কঠোর হুঁশিয়ারি ছিল—হেরার সামনে অতীতের কোনো স্মৃতির সামান্যতম ধূলিকণাও আনা যাবে না। এক অচেনা ঝড়ের ঝাপটায় হেরার স্মৃতি থেকে ‘নাভান’ নামটা চিরতরে মুছে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হেরা জানতো না, যে নাম সে ভুলে গেছে, সেই নামটাই তার নিঃশ্বাসের আড়ালে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াত।
হেরা যখন হাসপাতালের হিমশীতল বিছানায় একটানা ৫টি মাস মৃত্যুর সাথে লড়ছিল, নাভান তখন ভাঙা হৃদয়ে অঝোরে কেঁদেছে। বড় বোনের মতো আমি তাকে সামলেছি। তাকে দেখেছে রাতের পর রাত নিঃশব্দে ফুঁকিয়ে কাঁদতে। কখনো নার্স, কখনো হাসপাতালের সাধারণ ক্লিনার—পোশাক বদলে কত শত ছদ্মবেশে নাভান একটুখানি দেখার জন্য ছুটে আসতো হেরার কেবিনে। দেশের বাইরে বড় বড় ডাক্তারদের কাছে আকুতি জানিয়েছে, কিন্তু সবার একই রায়—“হেরার স্মৃতিতে আঘাত করবেন না, জোর করে অতীত সামনে আনলে তাকে আর বাঁচানো যাবে না।”
নাভান বুঝেছিল, বাঁচতে হলে হেরাকে তার নামটা ভুলেই থাকতে হবে। কিন্তু হেরা ও তার ভাঙা পরিবারকে এক ছাদের নিচে আনার দাবানল তখনও নাভানের বুকে জ্বলছিল।
নাভান যখন সিভিল সিআইডি অফিসার হিসেবে যোগ দেয়, আমিও তার সাথে এই লড়াইয়ে হাত মেলাই। নাভানের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটি—এক, অতীতে হেরার ফ্যামিলির সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের আসল অপরাধী কে বের করা। মামনি আর বড় বাবার থেকে সত্য বের করা ও দুই, হেরার ওপর কোনো মানসিক আঘাত না এনে তাকে এই মিশনে টেনে এনে পরিবারকে এক করা।
আংকেল যে স্বেচ্ছায় কখনো সামনে আসবেন না, তা নাভানের ভালো করেই জানা ছিল। ওদিকে মামনিও নাভানের কাছে অতীতের কোনো রহস্য খুলছিলেন না। সত্য উন্মোচনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট অনুঘটকের প্রয়োজন ছিল—আর সেই অনুঘটক হয়ে দাঁড়াল অদম্য একটি পরিকল্পনা।
প্রিয় চোখ বন্ধ করে, জোরে শ্বাস টানে — এর পর আসে তাদের জীবনে নিলয়!
কলেজ জীবনে নিলয় এর চোখে ছিল ঈর্ষা ও উন্মাদনা। কলেজের সব মেয়ে যখন নাভানের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ, নিলয়ের একমাত্র জেদ ছিল—যেভাবেই হোক নাভানকে হারাতে হবে। একদিন প্রিয় নাভানের সাথে দেখা করতে কলেজে গেলে নিলয় তাকে প্রস্তাব দেয়, । নিলয়ের হাত থেকে প্রিয়কে বাঁচাতে নাভান তড়িঘড়ি করে প্রিয়কে নিজের ‘গার্লফ্রেন্ড’ হিসেবে পরিচয় দেয়।
আর এটাই নিলয়ের মাথার ভেতরের হিংসাকে আগুনে রূপ দেয়। প্রিয় যে বাসায় থাকত, সেখানে গিয়ে নিলয় প্রতিনিয়ত ডিস্টার্ব করা শুরু করে। একদিন রাস্তায় প্রিয়কে একা পেয়ে তাড়া করে নিলয়। প্রিয় প্রাণভয়ে ছুটতে গেলে নিলয় তার জামার হাতা ছিঁড়ে ফেলে এবং কলেজের একটি নির্জন রুমে নিয়ে মানহানি করার চেষ্টা করে। এনকাউন্টারের ঠিক শেষ মুহূর্তে নাভান এসে প্রিয়কে রক্ষা করে।
কিন্তু সেই বিভীষিকাময় ঘটনা প্রিয়র মানসিক দিক চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। একটানা এক সপ্তাহ প্রিয় বাকরুদ্ধ হয়ে ট্রমাটাইজড অবস্থায় অন্ধকার ঘরে পড়ে থাকে।
প্রিয়র এই ট্রমা আর জঘন্য আক্রমণকে নাভান নিজের চালের সবচেয়ে বড় দাবার ঘুঁটি বানায়। সে জানতো, হেরাকে ভালোবেসে বা সত্যি বলে দেশে আনা যাবে না, আবার অতীতের কথা মনে করালেও তার ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই হেরা যাতে নিজেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়, সেজন্য নাভান এক অবিশ্বাস্য মিথ্যা গল্প সাজায়।
হেরা জানত নাভান এক অহংকারী, মেয়েবাজ ও পাষাণ চরিত্র—যে কি না প্রিয়র মতো মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে। নাভান নিজের গায়ে এই নোংরা অপবাদটা নিজেই লেপে দেয়, যাতে হেরার হৃদয়ে চরম ঘৃণার জন্ম হয়। নাভান চেয়েছিল হেরা যেন এই প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠে দেশে আসে, নাভানকে নিচে নামানোর জন্য। আর প্রিয় এই নাটকের মুল চরিত্র ছিলো,এমন ভাবে হেরাকে বলে যাতে হেরা সত্যি যায় প্রতিশোধ নিতে, কারন প্রিয় হেরাকে নিজ বোনের থেকে বেশি ভালোবাসতো।
এমনকি প্রিয়র মিশনে যাওয়া নিয়ে সাজানো হয় আধিভৌতিক আরেক মিথ্যা। হেরাকে বোঝানো হয়—প্রিয় ট্রমাটাইজড, সে চলাফেরা করতে পারে না, তার পা অচল এবং সে ট্রিমেন্ট নিচ্ছে। সম্পূর্ণ বানোয়াট এই তথ্যটি হেরার মনে এত গভীর দাগ কাটে যে, সে প্রতিশোধের দায়ে অন্ধ হয়ে বাংলাদেশে পা রাখে। আর ফারুক সিকদারও সব জানতো। শুধু রুশা কিছু জানতো না। আর হেরা বাংলাদেশে পা রাখতেই নাভানের আসল চাল শুরু হয়।
বিয়ের নাটকীয় ফাঁদ পেতে নাভান শেষপর্যন্ত জাওয়াদ খানকে টেনে আনে বাংলাদেশে। সবার সামনে, পুরো পরিবারের সামনে জাওয়াদ খানকে দিয়ে অতীতের সব সত্যি স্বীকার করায়।
হেরা বাংলাদেশে এসেছে ঘৃণার বশে, সে ভেবেছে সে প্রতিশোধ নিচ্ছে—অথচ সে জানতোই না, সে হাঁটছিল নাভানেরই এঁকে দেওয়া নিখুঁত নকশায়! অতীতের কোনো স্মৃতি আঘাত করেনি হেরার মস্তিষ্কে, অথচ অতীতের সব হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে তার পরিবারকে এনে দেওয়া হয়েছে এক সুতোয়।
যে ছেলেটা নিজের আত্মসম্মান, নিজের ভালোবাসা, এমনকি নিজের চরিত্রকে হেরার চোখের সামনে কলঙ্কিত করেছিল শুধুই তাকে আর তার পরিবারকে বাঁচানোর জন্য—আজ সেই নাভান মৃত্যুর শেষ সীমান্তে দাঁড়িয়ে।
হাসপাতালের হিমশীতল করিডরে তখন এক থমথমে নীরবতা। আলো-আঁধারির সেই নির্জন পথটায় প্রতিটি মানুষের চোখ নোনা জলে ঝাপসা। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে যেন একটাই অশরীরী প্রশ্ন ঘুরে মরছে—যে ভালোবাসা নিজেকে ছাই করে অন্যের জীবনে আলো জ্বালিয়ে দেয়, সেই ভালোবাসা কি সত্যিই দিনশেষে হেরে যায়?
অতীত আর বর্তমানের তীব্র টানাফোড়েনে করিডরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। ঠিক তখনই জমে থাকা সেই স্তব্ধতা ভেঙে ঝিনুক তার ভেজা চোখ দুটো আলতো করে মুছে নিল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, কিন্তু প্রতিটি শব্দের অন্তরালে ফুটে উঠছিল এক নির্মম সত্য।
ঝিনুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“হ্যাঁ… আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম। নাভান নিজেকে বাইরে থেকে যতটা কঠিন আর নির্দয় করে দেখায়, সে আসলে ভেতরে তেমনটা নয়। তোরা কি সেই দিনের কথা ভুলে গেছিস ? যে দিন ভার্সিটিতে সবার সামনে হেরাকে অপমান করে থাপ্পড় মেরেছিলো, তার পরদিন নাভানের হাত ব্যান্ডেস ছিলো। যেদিন হেরা বুকে কামড় দিয়েছিলো সেদিন নাভান মুচকি হেসে প্রস্থান করেছিলো। আর যেদিন হেরাকে ভয় দেখিয়েছিল নাভান? অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো সেদিন আমায় ফোন দিয়ে হেরার কাছে যেতে বলে। আমি তখনি বুঝেছিলাম নাভান এর মনে অন্য কিছু আছে।
প্রিয় হাসে মলিন ন তার হাসি।
” আমি সব জানি প্রতি আপডেট নাভান আমায় দিতো। আমাদের প্ল্যান ঠিক মতই চলছিলো কিন্তু আবার নিলয় আমাদের মাঝে ঢুকে পড়ে, আর নাভানের কলিজায় হাত দেয়, নাভান তখন ভয় পায়,হেরাকে নিয়ে,তাই সারাক্ষন গার্ড দিয়ে পাহাড়া দিতো। নিলয় এর সাথে দেখলেই তার রাগ হতো,আর রাগের স্বীকার হতো হেরা। কিন্তু নাভান হেরাকে আঘাত বা অপমান করে নিজেই পুড়তো।
ঝিনুকের প্রতিটি কথা যেন করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর বুকে তীরের মতো গিয়ে বিঁধল। সৃজন আর অধীর চরম বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। তাদের চোখের সামনে নাভানের এতদিনের সেই ‘খলনায়ক’ রূপটা যেন এক নিমেষে চুরমার হয়ে যেতে লাগল।
সৃজন চরম বিষ্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে বলে উঠল—
তাহলে… কিডন্যাপের সেই ভয়ংকর কাহিনিটা? ওইটাও কি নাভানেরই সাজানো কোনো পরিকল্পনা ছিল?”
এবার নীরবতা ভেঙে মুখ খুলল প্রিয়। তার গলায় ছিল গভীর এক যন্ত্রণার ছাপ। সে মাথা নেড়ে বলল–
“না… কিডন্যাপের ঘটনাটা ওর প্ল্যানের মধ্যে ছিল না। কিন্তু হ্যাঁ, ওদের বিয়েটা সম্পূর্ণ পরিকল্পিত ছিল।”
সবাই অবাক, সবার আর বুঝতে বাকি নেই গোপন প্রেমিক নাভান অই। প্রিয় থামল না আজ । অতীতটা যেন ছবির মতো ভেসে উঠল সবার চোখের সামনে। প্রিয় বলে যেতে লাগল—
“সেদিন রক্তাক্ত অবস্থায় নাভান যখন মাথায় মারাত্মক আঘাত পেয়ে ঢলে পড়ছিল, চেতনা হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তটুকুর সময় যে সব প্ল্যান করে। অতোটা অসুস্থ্য সে হয় নি যতটা হেরার সামনে দেখিয়েছে। হেরা নরম ছিলো তাই নাভানের প্ল্যানবুঝতে পারে নি। জ্ঞান হাড়ানোর আগে ও খাজা বাবার কাছে নিজের সব পরিচয়, গোপন সত্য আর ভালোবাসার টান উজাড় করে দিয়েছিল। সব শুনে খাজা বাবাই সেই চরম সংকটের রাতে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন? হেরা যে ভেবেছিল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ছয় মাসের একটা সাধারণ চুক্তিপত্রে সই করছে—ওটা কোনো নির্বাচনী কাগজ ছিল না! ওটা ছিল নাভানের নিখুঁত কৌশলে তৈরি তাদের বিয়ের অফিশিয়াল রেজিস্ট্রি পেপার। হেরা অজান্তেই চিরদিনের জন্য নাভানের জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছিল।”
প্রিয়র কথা শেষ হতেই করিডরজুড়ে নেমে এলো এক অপার্থিব নীরবতা।
হঠাৎ করেই সবার মনের সব ভুল বোঝাবুঝি, সংশয় আর ক্ষোভ কর্পূরের মতো উড়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই একলা পথচলা ছেলেটার মুখ—যে বিশ্বসংসারের কাছে নিজেকে খলনায়ক বানিয়ে রেখেছিল, শুধু একটা মানুষকে আড়াল করে আগলে রাখবে বলে। নাভানের আত্মত্যাগী এই ভালোবাসার রূপ দেখে উপস্থিত সবার চোখ থেকে বাঁধভাঙা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। নাভান কোনোদিন তার ভালোবাসার কথা মুখে বলেনি, কিন্তু তার প্রতিটি রক্তবিন্দু আর গোপন আত্মত্যাগ চিৎকার করে বলে গেল—তার ভালোবাসা হারেনি, বিজয়ের অনন্য শিখরে পৌঁছে গেছে।
হাসপাতালের আইসিইউ’র বাইরের করিডোরটা যেন এক বরফশীতল শ্বশান। ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, কিন্তু নাভানের কোনো জ্ঞান নেই। হাসপাতালের সেই সাদা করিডোরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে করতে সবার পোশাক নোংরা, মুখচোখ বসে গেছে। এক কাপড়ে, নাওয়া-খাওয়া ভুলে সবাই যেন অনাথের মতো দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।
যে ছেলেদের বলা হয় “কান্না মানায় না”, আজ তাদের বাঁধ ভেঙেছে। অধীর চোখের পানি মুছতে ভুলে গেছে, সৃজনের চোখ দুটো লাল, তুষার আর শান্ত রহমান এক কোণে মাথা নিচু করে বসে নীরবে চোখের জল ফেলছে। বড় বড় অফিসাররা আসছে, সাংবাদিকরা রিপোর্ট করছে, প্রিয়ন্তি শিকদার একের পর এক ফোর্স লাগিয়েও কোনো ক্লু পাচ্ছে না।
হঠাৎ ডাক্তার আইসিইউ থেকে বের হয়ে ভারী গলায় দুঃসংবাদটা দিলেন—”
পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক, যেকোনো সময় খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে।”
কথাটা শোোনামাত্রই জাওয়াদ খান নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“এভাবে… এভাবে কাওকে ভালোবাসা যায়?”
তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এডভোকেট এম এল এ কাজল খান আর সহ্য করতে পারলেন না। হুট করে মাথা ঘুরে মাটিতে ঢলে পড়লেন তিনি। এক নিমিষে হাসপাতালের অস্থিরতা দ্বিগুণ হয়ে গেল, তাকেও তড়িঘড়ি করে আইসিইউ’র পাশের কেবিনে ভর্তি করা হলো।
৩ দিন কোনো উন্নতি নেই নাভানের।
আইসিইউ’র পাশের কেবিনে কাজল খান অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে আছে। অধীর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। রাগে-শোকে অন্ধ হয়ে সে মায়ের কেবিনের পর্দা টেনে ছিঁড়ে ফেলল, সজোরে ধাক্কা দিল পাশের মনিটরে।
জাওয়াদ খানের কষানো চড়ের বিষাক্ত প্রতিধ্বনিটা করিডোরের প্রতিটি ইটে এখনও বাজছে। লাইফ সাপোর্টে নাভান মৃত্যুর সাথে শেষ যুদ্ধ কাজল খানের বুকটা নির্দয়ভাবে ছারখার করে দিচ্ছে অধীরের চোখের হিংস্র ও ফ্যাকাশে অন্ধ অবিশ্বাসের আগুন।
যে অধীর কোনোদিন কাজলকে খানকে, মা, মাদার বাংলাদেশ,কিউটিপাই ছাড়া সম্বোধন করেনি—যার মুখের মিষ্টি ‘কিউটিপাই মাদার’ ডাকটা শুনে শুনে কাজল ভিলার প্রতিটা ইট-কাঠ বেঁচে থাকত, সেই অধীর আজ মায়ের মুখের ওপর ফোনটা প্রায় ছুঁড়ে মেরে বরফশীতল গলায় চেঁচিয়ে উঠল—
“তুমি কেন এমন করলে আম্মু? কেন?”
সেই কড়া, অচেনা আর কৃত্রিম ‘আম্মু’ শব্দটা কাজল খানের কানে বিষাক্ত তীরের মতো বিধল। অধীর এক পা এগিয়ে এসে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে তীব্র ঘৃণায় ফুঁসে উঠল।
“তুমি বলতেছ তুমি কিছু জানতে না? তুমি নেক্সট মেসেজের অপেক্ষা করছিলে? কিন্তু পুলিশ ট্র্যাক করে দেখেছে—নিলয় যখন বনুকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তার গাড়ির একদম নিখুঁত লোকেশন, সে কোন হাইওয়ে দিয়ে ওকে নিয়ে সরাচ্ছে, কত নম্বর সেফ হাউসে নিয়ে রাখা হয়েছে—তার প্রতিটি আপডেট প্রতি মুহূর্তে শামসুল আজমীর চৌধুরী তোমাকে সরাসরি পাঠাচ্ছিল! হেরা এখন কোথায়, কিভাবে বন্দি আছে, তুমি তার ইঞ্চি ইঞ্চি খবর জানো আম্মু! তাও তুমি পুলিশ, আর্মি, সিআইডিকে আমাদেরকে কিচ্ছু বলোনি! আমার ভাই পাহাড়ে পাগলের মতো সারাদিন ছুটেছে, নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। বনুর কিছু হয়েছে কি না ছটফট করেছে, আমার ভাইকে অই অবস্থায় দেখে তুমি তাও চুপ ছিলে কিভাবে পারলে। মায়া হয় নি তোমার?! বলো? কিভাবে তোমার পা জরিয়ে কেদেছিলো তুমি বলে দিতে পারতে বনু জিবিত আছে। তাহলে অত্যন্ত আমার ভাই এমন পাগলামি করে আইসি ইউ তে যেতো না। কেনো বললে না আম্মু কেনো বললে না!
অধীরের এই একটা কথায় পুরো ক্যাবিন যেন নরকের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠল। জিহান তালুকদার স্তব্ধ চোখে বোনের দিকে তাকালেন। সিআইডি অফিসাররা বিস্ময়ে হাত গুটিয়ে নিলেন।
“বলো আম্মু! জবাব দাও!”
অধীর কাজল খানের কাঁধ ধরে সজোরে ঝাঁকিয়ে উঠল, তার চোখে তখন রক্তের মতো লাল ক্ষোভ। ”
আমার ভাই আইসিইউতে মরে যাচ্ছে, আর আমার বনুকে নিলয় আজমীর পশুর মতো নিয়ে গেছে —তুমি জেনেও সেই গোপন ঠিকানা পুলিশকে দিচ্ছ না? ওই বদমাশ শামসুল আজমীর চৌধুরী তোমাকে শর্ত দিয়েছে, তুমি ওর কাছে জাপান চলে গেলে তবেই ওরা হেরাকে ছাড়বে? আর তুমি সেই শর্ত মেনে নিয়ে চুপ করে আছ? নিজের সংসার, ছেলে আর ঘরের বউকে বলি দিয়ে তুমি শেষ বয়সে সাবেক মন্ত্রী শামসুলের কাছে ফিরে যাওয়ার ছক কষছ?
কাজল খান স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। তার চোখ দিয়ে অনবরত নোনা জল গড়িয়ে নামছে, কিন্তু ঠোঁট দুটি যেন অলৌকিক এক অদৃশ্য সেলাইয়ে আঁটকা। তিনি ইচ্ছে করলেই এক বাক্যে পুলিশকে বলে দিতে পারেন হেরা কোথায় আছে, কিন্তু তিনি যে এক শব্দও উচ্চারণ করতে পারছেন না!
জাওয়াদ খান থুথু ফেলার ভঙ্গিতে মুখে হাত দিয়ে কাজলকে ধিক্কার দিয়ে উঠলেন—
“ছি কাজলরেখা! ছি! আজ যদি আমার ছেলের কিছু হয় তবে তোমায় আমি ক্ষমা করবো না। আমি নাহয় ভুল করে ছেলেকে দূরে ঠেলে দিয়েছি কিন্তু তুমি কি করছো। হেরার প্রতি আমার ছেলের টান তুমি জানো না কেমন তাও কেনো চুপ তুমি আন্সার দাও কাজল। বলো সব জেনে কেনো চুপ। শামশুল কি এমন বলছে যে তুমি তার কথায় বস হয়ে আছো? কিছু কাওকে বলছো না?
এডভোকেট কাজল খান মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছেন। হাত-পা বাঁধা থাকায় তিনি পুরোপুরি অসহায় ছিলেন। তবে তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে হেরাকে কারা তুলে নিয়ে গেছে এবং ঠিক কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এতটুকু তথ্য সত্য হলেও, শেষ পর্যন্ত শামসুল আজমির চৌধুরী কাজল খানকে আসল লোকেশন পাঠাননি। কিন্তু কাজল খানের এই রহস্যময় নীরবতা যেন কেউই মেনে নিতে পারছে না। চোখের সামনে নিজের ছেলেকে আহাজারি করতে করতে প্রায় নিঃশেষ হয়ে যেতে দেখেও তিনি টু শব্দ পর্যন্ত করেননি।
আসলে শামসুল আজমির চৌধুরীর কাছে কাজল খানের এমন কিছু গোপন তথ্য ছিল, যা তাকে সম্পূর্ণ চুপ থাকতে বাধ্য করেছিল। বুকের ভেতর তীব্র ও অসহ্য যন্ত্রণা চেপে রেখে ছেলের কান্নাকাটি দেখা ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না; তিনি কেবল মনে মনে আল্লাহকে ডাকছিলেন।
যে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাজল খানের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ তাদের থেকে অনেক দূরে চলে যেতে পারে, সেই গোপন সত্য কাজল খান কারও কাছে প্রকাশ করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন এই গোপন কথাটি চিরতরে লুকায়িত থাক। এই দুনিয়ার আকাশ বাতাশ একটা কাক পক্ষিও যাতে বা জানে সেই আসল সত্যি। তাই শামসুল আজমির চৌধুরীর নির্দেশনা মেনেই তিনি সব চেপে গেছেন। এমনকি হেরাকে কারা নিয়ে গেছে ও হেরা বেচে আছে —সেই কথাটি তিনি কাউকেই জানাননি। কারণ, সামান্য কিছু বললেই শামসুল আজমির চৌধুরীর লোকেরা সব গোপন তথ্য ফাঁস করে দিত। আর কাজল খান কখনোই চাননি তার ব্যক্তিগত জীবনের কোনো গোপনীয়তা জনসমক্ষে চলে আসুক।যা তাদের সুখের পরিবার এক মুহুর্তে শেষ হয়ে যাক।
অধীর অশ্রুসিক্ত চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। নাভানকে সে কতটা ভালোবাসে, তা আজ অধীরের এই লাল টকটকে চোখ দুটো দেখলেই বোঝা যায়। ভেতরে তার আত্মা যেন অনবরত চিৎকার করে কেঁদে মরছে।
তার ওই ‘হিরো’ ভাইটার যদি কিছু হয়ে যায়, তবে কি আর অধীর নিজে বাঁচতে পারবে? ভাইকে ছাড়া যে সে একটা মুহূর্তও ভাবতে পারে না! কার ভরসায় সে এই কঠিন দুনিয়ায় চলবে? কে তাকে চারপাশের সব বিপদ থেকে আগলে রাখবে? কে তার না-চাওয়া জিনিসগুলোও অলৌকিকভাবে সামনে এনে হাজির করবে? নাভানের মতো করে আর কে তাকে ননী-পুতুলের মতো ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখতে পারবে?
যদিও ওরা দু’জন সমবয়সী, তাও নাভান কখনো অধীরের গায়ে একটা আঁচড় পর্যন্ত লাগতে দেয়নি। রাজপুত্রের মতো যত্ন করে তাকে বড় করে তুলেছে। একটু ভুল করলেই কাঁধের ওপর তুলে রাখা, কিংবা ছোট ভাইয়ের মতো করে কত কত আবদার করা—এসব কি আর অন্য কেউ করবে? অধীর আজ ভাইয়ের ওই রক্তমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাঁদছে।
আর অন্যদিকে কাজল খান ? তিনি আজ দুই ছেলের টানাপোড়েনের মাঝে পড়ে একেবারে গুঁড়িয়ে যাচ্ছেন। একদিকে তার এক চাঁদ, অন্যদিকে আরেক চাঁদ । কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির আগুনে পড়ে দুই ছেলেই যে আজ মাকে তছনছ করে দিচ্ছে!
এডভোকেট কাজল খানের মতো মানুষের পক্ষেও কি দুই সন্তানের এই সহ্যনাতীত দূরত্ব মেনে নেওয়া সম্ভব? মায়ের দুটি হাত চেপে ধরে অধীর আবার কেঁদে ওঠে। ছেলেটা এমনিতেই বড্ড বেশি নরম মনের। নাভানের কিছু একটা হয়ে গেলে যে সে সত্যিই আর বেঁচে থাকতে পারবে না! কান্নাঝরা ভাঙা কণ্ঠে সে সবার কাছে একটাই আকুতি জানায়—কেনো করলো এমন তার ভাইয়ের সাথে?
তুমি অনেক মেসেজ ডিলেট করেছো? একের পর এক ঠিকানা দিচ্ছে তাও তুমি বলছো না? বলো শেষ ঠিকানা কই দিয়েছে। আমরা অইখানেই যাবো।
কাজল রেখা কান্নায় ভেঙে পড়ে শুধু ধুঁকে ধুঁকে বললেন—
“না… আমি… আমি কিছু বলতে পারব না…”আমি জানি না, আর আমায় শামসুল আজমীর চৌধুরী সঠিক ঠিকানা দিচ্ছে না অধীর তোমরা ভুল বুঝতেছো।
অধীর রেগে যায় এবার।
“আমার ভাবতেও গা ঘিনঘিন করছে তুমি আমার মা!” অধীর চাবুকের মতো ছিটকে সরে গেল।
“স্যার, আমার মা হেরা আর নিলয়ের ঠিকানা জেনেও লুকাচ্ছে। ওনার সাথে কথা বলে লাভ নেই। ওনি বিক্রি হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। নয়তো এমন কিছু গোপনীয়তা কিছু আছে শামসুল আজমীর চৌধুরী আর আনার মায়ের মধ্যে যা তিনি প্রকাশ করতে চান না,যদি সংসার ভেঙে যায়?
” অধীর ”
কাজল খান ছেলের এমন কথায় চেচিয়ে ওঠেন।
” কেনো চেচাচ্ছো? কি এমন বলছে অই শামসুল যার জন্য তুমি তোমার নিজের ছেলের কথা চিন্তা করছো না। কি এমন গোপনীয়তা আছে? আমাদের যানা মতে তেমন কিছুই নেই যার জন্য তোমায় ভয় পেতে হবে। শুধু তোমার আর অই শামসুল আজমীর চৌধুরীর খারাপ সম্পর্ক ছাড়া।
অধীরের মনের ভেতরের এই বিষাক্ত ভুল বোঝাবুঝিটাই কাজল খানকে জীবিত কবর দিয়ে দিল। সবাই কাজলকে এক , স্বার্থপর আর অপরাধী বানিয়ে করিডোর ছেড়ে চলে গেল।
কেউ জানল না তার অবস্থার কথা , কেন কাজল খান রক্তজবা চোখের জল নিয়েও হেরা কোথায় আছে সেই ঠিকানাটা বলতে পারলেন না।
শামসুল আজমীর চৌধুরী কাজলকে এমন এক নারকীয় জালে বেঁধেছে, যা কোনো মানুষের কল্পনারও বাইরে। শামসুলের শেষ মেসেজে স্পষ্ট লেখা ছিল—
“কাজল, হেরা কোথায় আছে তা আমি তোমাকে জানালাম। কিন্তু ভুলেও যদি পুলিশ বা জাওয়াদকে ওই ঠিকানা দাও, তবে হেরা আর নাভান তো মরবেই, তার সাথে পুরো পৃথিবীর সামনে প্রকাশ পাবে তোমার প্রিয় মানুষ এর আসল বংশপরিচয়! তোমার ওই আদরের অধীর যে এক বেশ্যার কুড়িয়ে পাওয়া অবৈধ সন্তান, তার সেই জন্ম-নথি আমি কাল সকালের পত্রিকায় ছাপিয়ে দেব। দেখা যাক, তোমারঅধীর নিজের এই আসল পরিচয় জানার পর আত্মহত্যা না করে বেঁচে থাকে কীভাবে!”
কাজল খান জানতেন, নাভান আর হেরার ওপর যে অত্যাচার হচ্ছে তা সামলে নেওয়া যাবে, কিন্তু অধীর—যাকে তিনি নিজের গর্ভের নাভানের চেয়েও বেশি ভালোবেসে, বুক দিয়ে আগলে বড় করেছেন, সেই অধীর যদি একদিন জানতে পারে , তার রক্ত নোংরা —তবে অধীর এক মুহূর্তও বাঁচবে না। অধীর ভেঙে গুঁড়িয়ে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
নিজের সন্তান নাভান আইসিইউতে মৃত্যুর মুখোমুখি, হেরা নিখোঁজ, আর যে অধীরকে বাঁচাতে কাজল আজ পুরো পরিবারের কাছে মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হলেন—সেই অধীরই তাকে অভিশাপ দিয়ে চলে গেল।
ফাঁকা, অন্ধকার আইসিইউর ঘরে নাভানের কপালে হাত রেখে কাজল খান হাঁটু গেড়ে লুটিয়ে পড়লেন মেঝের ওপর। ইসিজি মেশিনের কৃত্রিম ‘বীপ-বীপ’ শব্দের মাঝে এক মা নিজের আত্মাকে কুরবানি দিয়ে দিলেন। অধীর তাকে ঘৃণা করুক, চড় মারুক, তার মুখে থুথু দিক—তবুও তিনি অধীরের জন্মপরিচয়ের ওই বিষাক্ত সত্যের আগুন ছেলেটার গায়ে লাগতে দেবেন না। অপবাদের সব ডার্ক অন্ধকার কাজল খান একাই বইবেন।
সবাই কাজল রেখাকে একা রেখে চলে যায়! কাজল খান নাভানের রুমে গিয়ে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে—
“এ কেমন ভালোবাসা বাবা এতো বছর পরেও আমার জন্য তোকে সাফার করতে হচ্ছে। এই লজ্জা কোথায় রাখবো বাবা! আমি কি করবো এখন কিছু বুঝতে পারছি না! শেষ বয়সে এসেও কিশোর বয়সি কলঙ্ক মাথায় নিতে হচ্ছে। আমি কি করবো শেহতাজ তোর মা যে বড্ড ক্লান্ত। বাবা তুই সুস্থ্য হয়ে সব ঠিক করে ফেল, ধংস করে দে অই শামসুল আজমীর চৌধুরীকে।
আইসিইউর ঠান্ডা করিডোরে মায়ের নিষ্পাপ, ফ্যাকাশে চেহারার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দিয়ে বিষের মতো ঝরে পড়া কথাগুলো অধীরের বুকে এখন হাজারটা তলোয়ার হয়ে বিঁধছে। নিজের ওপর সীমাহীন অপরাধবোধ আর ভাই হারানোর আতঙ্কে ছেলেটার চোখ-মুখ কেমন যেন উন্মাদের মতো হয়ে গিয়েছিল। রুশা যদি শক্ত হাতে স তাকে টেনে বাড়িতে না নিয়ে আসত, অধীর হয়তো ওখানেই ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যেত।
বাড়িতে এনে নিজের হাতে অধীরকে গোসলে পাঠিয়ে দেয় রুশা। যে মেয়েটা জীবনে কোনো দিন রান্নাঘরের ওপাশটায় ঘাম ঝরায়নি, ঘরের কাজের মেয়েটা অসুস্থ শুনে আজ সে একা হাতেই হাড়িকাঠে দাঁড়িয়ে গেছে। রান্না করতে গিয়ে নিজের নরম ডান হাতটা অনেকটা পুড়িয়ে ফেলেছে রুশা, চুলোর আগুনের তাপে শরীর লাল হয়ে ফোসকা পরে গেছে, ননির পুতুল এর কি এসবে মানায়। হাতের চামড়া লাল হয়ে ফোসকা পড়ে গেছে। কিন্তু নিজের ভেতরের কষ্টের কাছে সেই পোড়া ক্ষত তার কাছে কিছুই না। ফ্রেশ হয়ে থালায় গরম খাবার বেড়ে অধীরের ঘরে ঢুকতেই রুশা দেখতে পায় এক অদ্ভুত দৃশ্য।
অধীর দেয়ালে টাঙানো একটা পুরোনো ছবির দিকে নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে আছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে—কোনো এক দুষ্টুমির অপরাধে নাভান অধীরকে থাপ্পড় মারতে উদ্যত হয়েছে, আর কাজল খান যেন এক চরম মায়ায় অধীরকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে আগলে রাখছেন। ছবিটার দিকে তাকাতেই অধীরের চোখ ফেটে জলের ধারা নেমে এলো। গলার স্বর বুজে আসা কান্নায় কাঁপতে কাঁপতে সে বলে ওঠে—
“কিরে গম্ভীরমুখো ভাই, তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যা না ভাই! কতদিন তোর ওই গম্ভীর কন্ঠের হাঁকডাক শুনি না! আই এম সরি মাদার, আই এম সরি… আমি ওইসব বাজে কথা বলতে চাইনি, কিউটিপাই, একদম সত্যি বলছি আমি ইচ্ছা করে বলি নাই…”আমায় মাফ করে দাও মা।
কথাগুলো বলতে বলতে অধীর ভাঙা কাঁচের মতো হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে পড়ছিল। ঠিক তখনই পেছনে এসে দাঁড়ায় রুশা। অধীরের কাঁধে একটা শক্ত কিন্তু কোমল হাত রেখে তাকে বুকের কাছে টেনে নেয়।
অধীর রুশাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে–
“লাল গোলাপি! আমার ভাইটা কবে সুস্থ হবে গো ? ওর মুখে কতদিন হলো আমার ডাক শুনি না! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে লাল গোলাপি, বুকটা ফেটে যাচ্ছে! আমার ভাই কি আর কোনোদিন কথা বলবে না? আমি এত করে ডাকছি, ও শুনছে না কেন? লাল গোলাপি, ও তো আমার জীবন! আমার শাসনকর্তা! যাকে ছাড়া এক মুহূর্ত পেটের ভাত হজম হয় না, সেই ভাইটা এমন নিথর হয়ে পড়ে আছে কেন?
রুশা নিজের চোখের জল গোপনে মুছে অধীরের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে শান্ত গলায় বলে—
” প্লিজ লাইভ টেলিকাস্ট, আপনি একটু শান্ত হোন! চকলেট হিরো ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে, আমাদের দোয়া কখনো বিফলে যেতে পারে না। আপনি এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে? আমার পাখিকে তো ফিরিয়ে আনতে হবে, নাকি? আমি কীভাবে শক্ত হয়ে আছি দেখুন! ভাইয়া সুস্থ হবে, তারপর আমাদের পাখিকে ফিরিয়ে আনবে। এই ভালোবাসার তো হার হতে দেওয়া যাবে না, লাইভ টেলিকাস্ট… শক্ত হোন!
অধীর তার ভিজে মুখটা রুশার কাঁধে গুঁজে আকুতি ঝরানো গলায় বলতে থাকে–
“আমার ভাইটার মনে যে এত গভীর ভালোবাসা, আমি জানতামই না লাল গোলাপ! ওর মুখ থেকে এক বার ‘ভালোবাসি’ শব্দটা শোনার জন্য কতো নাটকই না করেছি! কতো মেয়েকে ওর পিছু লেলিয়ে দিয়েছি। কিউটিপাই বনুকে ভালোবাসে কথা শুনার জন্য নাটক করলাম মিথ্যা জি ম্যান এর কিন্তু ও তো মুখে না বলেও ভালোবেসে গেছে… ভালোবেসে কত কিছু একা সাফার করেছে! এ কেমন ভালোবাসা লাল গোলাপি! জানো ছোটবেলা থেকে আমাকে একটা সামান্য আঁচড়ও লাগতে দেয়নি। যখনই ব্যথা পেতাম, ও এসে আমাকে আগলে ধরত। বাবার অভাব আমাকে কোনো দিন ফিল করতে দেয়নি ও, যা চেয়েছি চোখের সামনে হাজির করেছে! লাল গোলাপি, আমি আমার এই ভাইটাকে ছাড়া সত্যিই মরে যাব গো ! আমি বাঁচব না!
রুশার চোখেও এবার আর জল আটকে থাকে না। অধীরের চুলে বিলি কেটে মৃদু স্বরে বলে—
” জানি আপনার কেমন খারাপ লাগছে, আমারও ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে! আপনার মতো আমিও তো হেরার সাথেই প্রায় বড় হয়েছি। নাভান ভাইয়ার সাথে আমার সম্পর্কটাও তো এখন আমার কম গভীর নয়! আমার কি কষ্ট হচ্ছে না? কিন্তু কান্নাকাটি করে ভেঙে পড়লে চলবে না। আমাদের রক্ত গরম করতে হবে, ওই নিলয় আর শামসুলকে আজমির চৌধুরীর বিরুদ্ধে। লড়াই করতে হবে। চকলেট হিরোকে সুস্থ করে ফেরাতে হবে! অনেক কাজ এখন ভেঙে পরলে চলবে না!
কথাগুলো শেষ করে রুশা হাতের লোকমা বানিয়ে খাবারটা অধীরের মুখের সামনে তুলে ধরে বলল–
“অনেক হয়েছে, এবার লক্ষ্মী ছেলের মতো দুটো খেয়ে নিন তো। সকাল থেকে পেটে একফোঁটা দানাও পড়েনি।”
অধীর তখন আবেগের ঘোরে নিজের হাত দিয়ে রুশার হাতটা সরাতে যেতেই তার আঙুল গিয়ে লাগে রুশার ডান হাতে, ছ্যাঁকা লাগার মতো করে রুশা মুখ থেকে হালকা ‘আহ্’ শব্দ বের করে হাতটা সরিয়ে নিতে চায়।
অধীর সাথে সাথে থমকে যায়। রুশার চেহারার যন্ত্রণার ছাপ দেখে সে আঁতকে উঠে রুশার হাতটা জোর করে টেনে নিজের দিকে আনে। রুশার হাত এর চামড়া ফোসকা পড়ে লাল হয়ে গেছে। দৃশ্যটা দেখে অধীরের বুকের ভেতরটা দুমড়ে ওঠে।
“তুমি তু তুমি নিজের হাত পুড়িয়ে ফেলেছো লাল গোলাপি? তোমার হাতের এই অবস্থা কীভাবে হলো?”
অধীরের গলার স্বর কান্নায় বুজে আসে।
রুশা চোখ ঘুরিয়ে হাতটা লুকানোর চেষ্টা করে হেসে বলে—
“আরে তেমন কিছু না! চুলা জ্বালাতে গিয়ে একটু আঁচ লেগেছে, ও কিছু না। আপনি খেয়ে নিন তো।”
অধীর ছটফট করে রুশার লাল হয়ে যাওয়া পোড়া হাত দুটো নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে নেয়। তার চোখ থেকে টপটপ করে জল গিয়ে পড়ে রুশার পোড়া চামড়ায়।
যে মেয়েটা কোনো দিন রান্নাঘরের দরজায় পা দেয়নি, যে রুশা জীবনে একটা কাজের জন্য সিরিয়াস ছিল না, সেই রুশা আজকে হাত পুড়িয়ে আমার জন্য রান্না করতে গেছে ?
কেন তুমি রান্না করতে গেলে লাল গোলাপি, কেন?”
অধীর রুদ্ধশ্বাসে রুশাকে একবারে বুকের গভীরে জড়িয়ে ধরে।
” আপনি ক দিন ধরে ঠিক মতো খাচ্ছেন না তাই, ও কিছু না ঠিক হয়ে যাবে।
রুশার হাসি জবাব আজ বুঝতে পেরেছে নিজের হাতে প্রিয় মানুষকে রেঁধে খাওয়ানো মনের ভিতর তৃপ্ত তাই অন্যরকম। ওদের রুশার মুখ দুটো দুহাতে আজলায় তুলে চোখে বলে ওঠে —
“তুমি এত ভালোবাসো আমাকে? আমায় ক্ষমা করে দাও লাল গোলাপি। আমায় ক্ষমা করে দাও আমার জন্য তুমি!
রুশাও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। অধীরের পিঠ জড়িয়ে ধরে সে ফোঁপাতে ফোঁপাতে কেঁদে ফেলে। রুশার চোখের জলে অধীরের কাঁধ ভিজে ওঠে। সে কাঁদতে কাঁদতেই শক্ত গলায় বলে—
“ভালোবাসি তো! খুব ভালোবাসি আপনাকে… আপনাকে, নাভান ভাইয়াকে, আমার পাখিকে, গোপাল ফুলকে, ঝিনুক,তুষার ভাই,সৃজন ভাই, মামনি,বড়বাবা ছোট বাবা, এই পুরো পরিবারটাকে আমি আমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি! আর আপনাকেও খুব ভালোবাসি আমার বাস্তবিক হিরো। আপনার কষ্ট সহ্য করতে পারছি না।
অধীর রুশাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে। বুকের কষ্টটা লাঘব করার জন্য।
যে মেয়েটা কোনোদিন কোনো কিছু সিরিয়াসলি নেয়নি, সে আজ তার ভালোবাসার মানুষগুলোর বিপদে নিজেকে শক্ত করে সবার পাশে দাঁড়িয়েছে।
” আপনারা আমার অহংকার, আমার প্রাণ। আপনাদের ওপর কোনো আঁচ আসতে দেব না আমি! শুনুন লাইভ টেলিকাস্ট, কালকে থেকে আমাদের যুদ্ধ। আমাদের ভালোবাসার মানুষগুলোকে আমাদেরই সুস্থ করে ফিরিয়ে আনতে হবে। কোনো হাল ছাড়া যাবে না, বুঝলেন?”আবার পাখিকে আনতে হবে কই নিয়ে গেলো অই চুইংগাম হিরো নিলয় আজমির চৌধুরী।
অধীর রুশার কপালে একটা গভীর ভালোবাসার স্পর্শ দিয়ে তাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে। দুজনের চোখের জলে আজ মিশে যায় লড়াইয়ের অঙ্গীকার আর ভালোবাসার এক সীমাহীন রূপকথা।
৭ দিন পার হয়ে গেছে। অলরেডি একটা টিম জাপানে পৌঁছে গেছে। জিহান তালুকদার দেশের আইনি ও রাজনৈতিক দিক সামলাচ্ছেন,তৌহিদা তালুকদার অসুস্থ হয়ে বিছানায়। আর বাকি সবাই—জাওয়াদ খান, , অধীর, রুশা, ঝিনুক, শান্ত, প্রিয় এবং সিআইডির অফিসাররা জাপানের মিশনের জন্য গিয়েছেন । শামসুল আজমীর চৌধুরী, এডভোকেট কাজল খানকে জাপানে জাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই আমন্ত্রণের সুত্র ধরে, সবাই জাপানে যায়।
রোজ… এই পুরো ৭ দিনে হাসপাতাল থেকে এক পা-ও নড়েনি। নিজের নাওয়া-খাওয়া ভুলে সে নাভানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেমনটা এক আপন বোন তার ভাইয়ের জন্য করে।
৩ দিনের মাথায় নাভানকে সাময়িকভাবে একটু ঝুঁকিমুক্ত করে ঢাকায় আনা হয়েছে, কিন্তু আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ৭ দিন ধরে চোখের পাতা এক না করা সৃজন একটু ফ্রেশ হতে যায় নিজ বাড়িতে । এডভোকেট কাজল খানও অসুস্থ অবস্থায় একই হসপিটালের ভিতর, দুইজনকে রোজ দেখছে। কিন্তু হটাৎ অধীরের জরুরি ফোন পেয়ে যখন সৃজনকে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন রোজ বাধ্য হয়ে তুষারকে বলে সৃজনের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তুষার রোজের মাথায় হাত দিয়ে বলে!
“তুমি যাও বোন, আমি তোমার ভাইয়ের দিকে নজর রাখবো। নাভান যে আমার জন্য ঠিক কী… তা তুমি পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারবে না। দূর থেকে ওকে ভারী গম্ভীর একটা ছেলে মনে হয়, তাই না? কিন্তু অই গম্ভীর মুখটার আড়ালে যে কী অদ্ভুত একটা টান আছে! মন চায় আমার জীবনের সবটুকু ভালোবাসা ওর ওপর উজাড় করে দিই। ও এমন একজন মানুষ, যে সম্পর্কের মূল্য দিতে জানে।”তাই তো তাকে আমরা সবাই এতো ভালোবাসি।
তুষারের কথা শুনে রোজের চোখ দুটো জলে ছলছল করে উঠলো। কাঁপা কণ্ঠে সে বলে উঠলো—
“হ্যাঁ জিজু তুমি একদম ঠিক বলেছ। দেখো না, আমি আজ কোথায় পড়ে থাকতাম আর ভাইয়া আমাকে টেনে এনে কোথায় দাঁড় করালো! যে মূল্যহীন রোজের কোনো অস্তিত্বই কেউ মেনে নিতে পারতো না, সেই আমাকে আজ এই সমাজের সামনে এত বড় একটা পরিচয় দিল। এই ঋণের বোঝা আমি সারাজীবনে কীভাবে শোধ করবো বলতো?”
তুষার পরম মমতায় ওর মাথায় হাত রেখে বললো —
“তুমি ভুল ভাবছ বোন। নাভান কখনো না বুঝে বা হুট করে কোনো কাজ করে না। তুমি নিজেই এত ভালো একটা মেয়ে যে, তোমায় নিজের যোগ্য স্থানটাতেই নাভান বসিয়ে দিয়েছে। এখানে কোনো ঋণ নেই।”
তুষারের শেষ কথাটা শুনতেই রোজ আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। ফুপিয়ে কেঁদে ফেললো সে।
তুষার রোজের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে গলার স্বর কিছুটা শক্ত করে বললো —
“এখন ভেঙে পড়ার সময় নয় বোন, তোমাকে শক্ত হতে হবে। তুমি যাও, সৃজনকে গিয়ে খবরটা দাও—খুব জরুরি দরকারে ফোন দিয়েছিল অধীর ।”
সৃজন টানা ৭ দিন ঠিক মতো না ঘুমিয়ে এতটাই ক্লান্ত ছিল যে বাড়িতে এসে শাওয়ার নিয়ে খালি গায়েই বিছানায় ঢলে পড়েছিল। সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি কখন তার মামাতো বোন নুড়ি এসে তার পাশে শুয়ে পড়েছে।
রোজ যখন সৃজনের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল, ভেতরের দৃশ্য দেখে তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। সৃজন খালি গায়ে ঘুমিয়ে, আর তার গা ঘেঁষে শুয়ে আছে নুড়ি। হৃদয়ে এক তীব্র যন্ত্রণা চেপে ধরে ধরা গলায় রোজ ডেকে উঠল—
“মিঃ সৃজন সরকার…”
ডাক শুনে সৃজন আর নুড়ি লাফিয়ে উঠে বসল। সৃজন বিরক্ত হয়ে ঘুমু ঘুমু চোখে বলল—
” কিরে নুড়ি! তুই আবার আমার রুমে কেন?”আর আমার বেডে কি করছিস?
নুড়ি নিজের পাপ ঢাকতে এবার উল্টো সৃজনের ওপর দোষ চাপিয়ে বলে উঠল—
“কেন ভাইয়া? তুমিই তো আমায় ডাকলে! আর দিনে শুয়েছি দেখে এমন করছ? রাতে যে তোমার সাথে থাকি, ওইটাতে তো এমন করো না।
কথাটা শোনামাত্রই সৃজন সজোরে নুড়ির গালে এক থাপ্পড় মারল—
“মাথা ঠিক আছে তোর?” কি যা তা বলছিস রাতে ছি! নির্লজ্জ মেয়ে কোথাকার তোকে বোন বলতেও লজ্জা লাগছে।
ঠিক তখনই দরজায় এসে দাঁড়ালেন সৃজনের মা, শায়লা রহমান। তিনি বেশ দরদ দেখিয়ে বলে উঠলেন—
“এমন করছিস কেন সৃজন? নুড়ি তো ভুল কিছু বলেনি। তোদের যে এত গভীর সম্পর্ক, সেটা রোজকে জানাচ্ছিস না কেন? ওকে দেখে এতো গিলটি ফিল করার কি আছে? এখকার ছেলেরা দুইটা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরতেই পারে।আর বিয়ে তো কথাই নেই।
নিজের মায়ের মুখে এমন জঘন্য মিথ্যা শুনে সৃজন স্তব্ধ হয়ে গেল—
“মা! এ কি বলছ তুমি? তুমি মা হয়ে নিজের ছেলের নামে এমন অপবাদ দিচ্ছ?”
শায়লা রহমান কুটিল হেসে রোজের দিকে তাকিয়ে বললেন—
“সৃজন, তোর ভালোর জন্যই বলছি। এমন থার্ড ক্লাস মেয়ের সাথে কিছু সময় মজা নেওয়া যায়, কিন্তু ঘরের বউ করে আনা যায় না। তুমিও সেটা জাবো কিন্তু রোজ মেয়েটাকে আমার খুব মায়া হয়, তাই সত্যটা বলে দিলাম, যাতে মেয়েটা ভুল না করে।”পরে যাতে তোমায় বা আমাদের দিকে আঙুল তুলতে না পারে।
রোজের চোখের কোণ বেয়ে একবিন্দু জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। শায়লা রহমানের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল—-
“ধন্যবাদ আন্টি। আর হ্যাঁ, আমি কোনো ‘থার্ড ক্লাস’ মেয়ে নই। আমার একটা ভালো বংশপরিচয় আছে। আপনাদের পারিবারিক নোংরামি আর চালবাজির মধ্যে আমাকে টানবেন না প্লিজ আমি সৃজন সরকার কে চিনি না আর না তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক আছে।
তারপর সৃজনের দিকে ঘুরে ঠান্ডা গলায় বলল—
“মিঃ সৃজন সরকার, অধীর ভাইয়া আপনাকে ইমিডিয়েট কল করতে বলেছেন। আপনার ফোন বন্ধ ছিল বলেই আমার আসা। আমি আসছি আন্টি।” আল্লাহ হাফেজ আসসালামু আলাইকুম।
রোজ এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল।
রোজ চলে যেতেই সৃজন ক্ষোভে-যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। মায়ের কাঁধ ঝাঁকিয়ে কেঁদে ফেলে বলল—
“এ… এসব কী করলে তুমি মা? আমার ভালোবাসার মানুষের কাছে আমাকেই এত বড় অপরাধী বানিয়ে দিলে? তুমি জানতে না, এই মেয়েটাকে ছাড়া সৃজন বাঁচবে না? এমনি নাভানের এমন অবস্থা তার উপর তুমি এ কোন নতুন ঝামেলা লাগিয়ে দিলে। কেনো এতো খোব রোজের উপর। মেয়েটা এতিম মা আল্লাহ এমিমদের মাথার উপর হাত রাখলেই নাকি সোয়াব দেয় আর অই মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে তোমার ছেকে সারাদিন না খেয়ে থাকতে পারবে সেই ফুলটাকে তুমি কষ্ট দিচ্ছো। কেনো মা এমন করছো?
শায়লা রহমান ঠান্ডা গলায় বললেন—
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫৪
“তুমি ভুল করছো সৃজন।”ও এই বাড়ির বউ হবার যোগ্য নয়।
সৃজন চোখের পানি মুছে মায়ের দিকে তাকাল। তার চোখে আজ আর মায়ের প্রতি কোনো সম্মান নেই, আছে শুধু তীব্র ঘৃণা।
“আমি ভুল করছি না ঠিক করছি, এবার তুমি দেখবে। আর হ্যাঁ… আজ থেকে আমি তোমার ছেলে নই! যে মা নিজের পবিত্র সন্তানের নামে কলঙ্কর দাগ লাগিয়ে দেয় সে আর যাই হোক সম্মান অয়াবার যোগ্য না । তুমি তোমার এই নির্লজ্জ ভাইঝিকে কার সাথে বিয়ে দাও, আমিও দেখব। রোজ আমার পবিত্র ভালোবাসা, মিথ্যার কাছে তাকে আমি হারতে দেব না।
যাওয়ার আগে সৃজন মায়ের দিকে তাকিয়ে শেষ বাক্যটি বলল, যা শায়লা রহমানের বুকে তীরের মতো বিঁধল—
“তোমার মতো মা যেন আর কারও না হয়।”
