Home ফিরে গেছে কত আলো ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৩২

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৩২

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৩২
শানজানা আলম

এহসান অফিস শেষ করে এসেছে বড় ভাইয়ের বাসায়। আম্মা এখানেই আছেন। রাতে খাওয়ার সময় বড় ভাবী কথাটা তুললেন,
এহসান, এখন কী ভাবছ? বিয়ে শাদীর বিষয়ে? কবে করতে চাও?
এহসান বলল, ভাবী ভাবছি করে ফেলব শীঘ্রই।
ভাইয়া বললেন, তোর ভাবীর মামাতো বোন, নীলা, তোর জন্য আগেই বলেছিল, তখন তো মায়ের পছন্দ হলো ঐশিকে, এখনো নীলার বিয়ে হয় নি। আমি ভাবছিলাম নীলাকে নিয়ে আসি, ভালো মেয়ে, সংসারী মেয়ে, অনার্স পড়ছে, দেখতে।শুনতেও ভালো।সব চাইতে বড় কথা পরিবার আমাদের পরিচিত।
এহসান বলল, পরিবার দিয়ে কিছু হয় না। ঐশির পরিবার যথেষ্ট ভালো, কিন্তু ঐশি!

-এটা একটা এক্সিডেন্ট, এহসান,তুমি সম্মতি।দাও।
এহসানের মাও বললেন, রাজী হয়ে যা, কারো জন্য সময় নষ্ট করিস না।
এহসান ঝেড়ে কাশল। ভাইয়া আর মাকে সামনে রেখে বলল, আমি অথৈ।এর।কথা ভাবছি।
অথৈ!! ঐশির বোন! এটা কিভাবে হয়!
সবাই একসাথে প্রতিবাদ করে উঠলেন।
এহসান বলল, কেন হয় না? অথৈ রাজী হলেই হয়।
এহসানের বড় ভাইয়া বললেন, তাহলে সেটা মিন করে, অথৈ এর সাথে তোর কোনো সম্পর্ক আছে,এজন্যই ঐশিকে ছেড়ে দিয়েছিস।
এহসান বলল, সেটা সত্য না, অথৈ এর সাথে আমার এখনো তেমন কোনো সম্পর্ক।তৈরি হয় নি, তবে অথৈ ভালো মেয়ে, আমি জানি, আমার নতুন কাউকে বিয়ে করে রিস্ক নিতে ইচ্ছে করছে না।
এহসানের মা বললেন, অথৈ ভালো মেয়ে, আমিও জানি। কিন্তু ওর বাপ মা তোর সাথে বিয়ে দিবে না।।আর একশটা কথা হবে আত্মীয় স্বজনদের মাঝে। তাই।অথৈ বাদে ভাবতে হবে, পৃথিবীতে কি মেয়ের অভাব।নাকি?
ভাবী সরাসরিই বলল, বলেছিলাম,এহসান রাজী হবে না।

এহসান বলল, রাজী হওয়ার বিষয় না ভাবী, আমি চাচ্ছি অথৈকে বিয়ে করতে।
ভাইয়া বলেই দিলেন, অথৈকে বিয়ে করলে তুমি আমাদের পাশে পাবে না। যা করার একা করো। এমনিই এত কথা শুনতে হচ্ছে, আবার নতুন কাহিনি শুরু হবে, একশটা কথা ছড়াবে।
তোমার সম্পর্ক আছে কি নাই মানুষ বুঝবে না, তাছাড়া কাজিন হলেও হতো,আপন বোনের প্রাক্তন স্বামীকে কে কোনো মেয়ে বিয়ে করবে? করতে চাইলে বুঝতে হবে, কিন্তু আছে। মেয়েটাও ভালো না।
এহসান বলল, অথৈ এর সম্পর্কে তো তোমরা জানো না, তাহলে কেন বলে দিচ্ছ যে অথৈ ভালো না!
এহসানের মা বললেন, আমার মনে হয় না ওর বাবা মাও রাজী হবে, শুধু শুধু একশটা কথা ছড়ানোর।দরকার আছে কোনো? আমার কথা, নীলাকে দেখো। তোমার ভালোই চাই আমরা। আর অথৈকে বিয়ে করলে আমাদের পাশে পাবে না।
বের হওয়ার সময় ভাইয়া বললেন, সময় নে, তিন মাস শেষ হচ্ছে। এত তাড়াতাড়ি না হয় না ভাবলি, নীলার বাবাকে বলে কয়েকমাস পিছিয়ে দিই প্রয়োজনে।
এহসান ভালো বা মন্দ কিছুই বলল না, কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে বের হয়ে পড়ল।

ঐশি হঠাৎই বাড়িতে এসেছে, প্রাইভেট কারও না, বড় একটা মাইক্রো ভাড়া করে এসেছে। বাবা মা অথৈ সবার জন্য গিফট, জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে ফলের বাজার তুলে এনেছে, অন্যান্য অনেক অনেক বাজার করে নিয়ে এসেছে৷
এত জিনিসপত্র দেখে সবার চোখ কপালে উঠে গেছে।
তাহিরা বেগম জানতে চাইলেন, এত খরচ করছিস কিভাবে?
ঐশি বলল, মা, আমার তো কিছু টাকা আছে নাকি! আর শীঘ্রই একটা শো রুম দিচ্ছি বনানীতে।
অথৈ জিগ্যেস করল, ঢাকায় বনানীর মত জায়গায় শোরুম করতে যে টাকা লাগে, সেটা কোথায় পেয়েছিস আপু?

ঐশি বলল, এসব তুই বুঝবি না। সবার কি টাকা থাকে নাকি, ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করেছি। পার্টনার আছে, আমি কাজ করছি, আর একজন টাকা দিচ্ছে এই তো!
তোকে কেন ব্যাংক লোন দিবে? আপু, সত্যি বল তো, এত টাকা, এত শপিং, কিভাবে হচ্ছে?
ঐশি বলল, তোরা কেউ খুশি হতে পারিস নি? আমি এখানে থেকে পচে মরলে ভালো হতো?
নাকি এহসানের হাতে মার খেলে ভালো হতো?
অথৈ বলল, এহসান ভাই তোকে তো মারে নি কখনো?
সেটা তোর জানার কথা না অথৈ-
তাহিরা বেগম বললেন, ডিভোর্স হয়ে গেছে, এখন চাকরির চেষ্টা করতে পারিস, বা পছন্দের কেউ থাকলে বিয়ের কথা ভাব। উড়নচণ্ডী ভাবে থাকিস না। তোর একটা ছোট বোন আছে, ওর তো বিয়ে দিতে হবে নাকি!
পরিবারের সাথে জমে না ঐশির। এত গিফটেও অথৈ খুশি হতে পারে না।
অথৈ সব সময় বোনের পক্ষে কথা বলে এসেছে, আজ আর সুর মেলে না।
ঐশি অথৈ কে কনভিন্স করার চেষ্টা করে, এই অথৈ, কি হয়েছে তোদের? তোদের কি মনে হয়, আমি খারাপ কিছু করতেছি?

না আপু, সেটা না। কিন্তু তোমাকে বিপদে ফেলা সহজ, ডিভোর্সি মেয়েদের সুযোগ নেয় সবাই, যে বন্ধু তোমাকে সাহায্য করছে, কেন করছে, কেন ইনভেস্ট করছে সে, কবে ফেরত পাবে, কীভাবে পাবে?
উফফ অথৈ, অনেক বেশি বেশি কথা বলছিস দেখি!
ঐশি জমাতে পারে না। রাতে খেতেও গেল না ঐশি, কেউ ডাকলোও না। বাবা মা দ্বিধা কাটাতে পারে না। না জানি ওকে নিয়ে কত কথা শুনতে হবে মানুষের।
এহসান অথৈকে ফোন করল গভীর রাতে। অথৈ কেটে দিলো।
এহসান টেক্সট করল, কি হলো? রাগ করেছ? বিজি ছিলাম আজ, অফিসে জয়েন করেছি, ভাইয়ার বাসায় গিয়েছিলাম।

অথৈ রিপ্লাই করল, আপু এসেছে।
এহসান বলল, ওহ আচ্ছা। ঠিক আছে।
এহসান আর টেক্সট করলো না। অথৈ লিখল, বাসায় একটু অশান্তি হয়েছে, সে দুনিয়ার জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে, এত টাকা কিভাবে খরচ করছে, আব্বা আম্মা জিজ্ঞেস করেছে, তাই রাগারাগি করেছে!
এহসান লিখল, নতুন বয়ফ্রেন্ডের টাকা।
অথৈ বলল, আপনি সিওর?
না, আন্দাজ করলাম, নয়তো এত খরচ সে কিভাবে করে, তার তো কোনো টাকা জমা ছিল না। সবই শপিং করে ফেলত।
ও কি কোনো ট্রাপে পড়েছে?- অথৈ জানতে চায়।
এহসান বলল, জানি না, জানতেও চাই না। ওর বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই, ও আছে জানলে নকও করতাম না। গুড নাইট।
অথৈ লিখল, আপনি হাইপার হচ্ছেন কেন?

– ইউ নো হোয়াই!
-হুম।
এই অথৈ, এত রাতে কার সাথে চ্যাট করছিস? -ঐশি পাশ ফিরে জিজ্ঞেস করল।
অথৈ উত্তর না দিয়ে হাসল শুধু।
এহসান লিখল, আজ ভাইয়া একটা বিয়ের প্রপোজাল দিয়েছে, ভাবীর কাজিন।
-ভালো তো, রাজী হয়ে যান। জীবনটা গোছাতে হবে তো!
-রাজী হতে বলছ? সিওর তো?
– হ্যা, সিওর না হওয়ার কি আছে?
-কিছুই নেই?
– না, খুঁজে পাচ্ছি না তেমন কিছু, আপনি ভালো থাকুন এটাই চাই।
-আচ্ছা। অথৈ, আমার ভালো চাও তাহলে?
-হ্যা, সন্দেহ আছে?
-হুম, সন্দেহ দূর করে দাও।
-কিভাবে?
-অথৈ, আমাকে ভালো রাখতে….. না থাক কিছু না।
-কথাটা শেষ করুন?
– সব কথার শেষ হয় না অথৈ, কিছু কথা বুঝে নিতে হয়!
অথৈ কিছু লিখল না।

এহসান লিখল, ঘুমাও তাহলে, গুড নাইট। কথা বলতে পারলে ভালো লাগত।
অথৈ লিখল, গুড নাইট! – লিখে ফোনটা হাতে নিয়ে রাখল।
এহসান কিছু সময় পরে একটা টেক্সট লিখে ফেলল, “লাভ ইউ অথৈ!”
কিন্তু পাঠালো না। মুছে ফেলল। গতানুগতিক ভাবে বলতে ইচ্ছে করছে না।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৩১

ঐশি ঘুমিয়ে পড়েছে। অথৈ ফোনটা হাতে নিয়ে টেক্সট গুলো রিপিট করে পড়ে, অনেক কিছু বোঝা যায়, কিন্তু সরাসরি তো কিছু বলছে না এহসান ভাই, আর বলবেও না। না বলা কথা হয়ে দূরত্ব থেকে যাবে। দুজনার এমন সম্পর্ক, অথৈ দ্বিধাহীন ভাবে ভাবতেও ভয় পাচ্ছে। তবে এটা সত্য, এহসানকে ভালো লাগছে, তার টেক্সট ভালো লাগছে, কথা বলতেও ভালো লাগছে। যখন ঐশির হাজবেন্ড ছিল, তখনকার সম্পর্কের বাইরে এখন নতুন কিছু অনুভব করছে অথৈ, একদম অচেনা।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৩৩