Home ফিরে গেছে কত আলো ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৩৭

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৩৭

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৩৭
শানজানা আলম

অথৈ কোচিং এর পরীক্ষা দিয়ে বের হয়েছে৷ সহজ প্রশ্ন হয়, সম্ভবত ভাইভা কঠিন হতে পারে। সহজ একটা চাকরির জন্য কম প্যারা নয়। শুধু বসে না থেকে ব্রেন বিজি রাখা।
অথৈ ভাবছিল, সাদিকের পরিবার কয়েকবার যোগাযোগ করে করে চুপ হয়ে গিয়েছে। কোনো বিয়ের প্রপোজাল অথৈ শুনতে চাচ্ছে না। পরে, পরে বলে এভয়েড করছে। এর কারন কি, এহসান?
অথচ এই মানুষটার সাথে তার একটা অতীত তিক্ত সম্পর্ক আছে। এহসান কখনো বোঝায় নি, অথৈকে নিয়ে তার কোনো অনুভূতি আছে, হয়তোবা সেটা বোঝানো শালীনতার পর্যায়ে পড়ে না। দুয়েকবার দুয়েকটা কথা অবচেতন মনে বলে ফেললেও সেটা নিয়ে কথা আগায় নি। আজও কথা থেকে সরে গিয়ে ফোন রেখে দিয়েছে। অথৈ সরে আসতে পারছে না কেন!

কথা না বললে কি হয়? অথবা বললেও বা কি হয়?
শুধু কথা দিয়ে কি কিছু হয়, নাকি কথাই সবকিছু!
এক্সিউজ মি, আপনি অথৈ?- অপরিচিত একটি ছেলে অথৈকে ডাকছে। ছেলেটি একটা লাল রঙের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে, বেশ লম্বা, পোশাক আশাক পরিপাটি। এই এলাকার কেউ বলে মনে হচ্ছে না।
জি, আমি অথৈ, কেন বলুন তো?- অথৈ জানতে চাইল।
আমাকে আপনি চিনতে পারেন, আবার নাও চিনতে পারেন, আমি আসলে আপনাদের এলাকায় অতিথি বলতে পারেন। আমার নাম নায়েব, নায়েব পাশা।
ওহ আচ্ছা, জি না, আমি আপনাকে চিনতে পারছি
না, আপনি আমাকে কিভাবে চেনেন?
দাঁড়িয়ে কথা বলবেন? নাকি কোথাও বসবেন?
অথৈ ফোনে সময় দেখল, তিনটা বেজে গেছে, খুবই অসময়।
আমার সাথে আপনার কোনো কথা আছে- অথৈ এর ব্ল্যাংক লুক দেখে নায়েব পাশা অবাক হলো। সে ভেবেছিল অথৈকে ঐশি নাম ধাম বলে দিবে, আর তার নাম শুনে অথৈ বেশ পুতুপুতু একটা ভাব নেবে।
না আসলে কোনো কথা নেই, আবার কথা আছে।আপনার সাথে দেখা করতেই এসেছি!- নায়েব পাশা বলল।
আমার সাথে- অথৈ অবাক হলো।

আপনি ঐশির বোন তো?
জি, আমিই ঐশির বোন।
আচ্ছা, আমাকে ঐশি পাঠিয়েছে। তবে সে যে আপনাকে কিছু বলে নি, সেটা আমি জানতাম না।
আমাকে কিছুই বলে নি, কি প্রয়োজন বলুন?
প্লিজ আসুন, কোথাও বসি?
অথৈ হেসে বলল, এখানে তো বসে কথা বলার মত তেমন জায়গা নেই, আপনি বরং বাসায় চলুন। ওখানে বসে কথা বলা যাবে।
নায়েব পাশা বলল, বাসায় চলে যাওয়াটা বোধহয় ঠিক হবে না।
নায়েবপাশা এখানে আসার পেছনের ঘটনাটা বলা যাক। অথৈ এর ছবি আর বায়োডাটা মাকে দেখিয়েছিল নায়েব। বোন বলেছে, এত সাধারণ পরিবার থেকে মেয়ে নিয়ে এলে, সেটা কেমন হবে, নায়েবের জন্য যথেষ্ট অভিজাত পরিবার থেকেই মেয়ে পাওয়া যাবে।

তবে মা বলেছে, ঠিক আছে, একটু সামনাসামনি দেখে তারপরে না হয় ভাবা যাবে, সাধারণ মেয়েরা সংসারী হয়। তার উড়নচণ্ডী উড়ু উড়ু মনের ছেলের জন্য ঘরের লক্ষী দরকার। সেই প্রেক্ষিতেই খোঁজ নিয়ে এখানে এসেছে নায়েব৷ একা আসেনি, আরো ছেলেপেলে আছে সাথে। তবে সবাইকে আলাদা রেখে অথৈয়ের সাথে কথা বলতে এসেছে নায়েব।
অথৈ বলল, আচ্ছা একটু পাশে সরে দাঁড়িয়ে তাহলে কথা বলি, কারন দুপুর হয়ে গেছে, আপনার কি খুব জরুরি বিষয়ে আলাপ? আপুর পরিচিত আপনি, বাসায় যেতেই পারেন, কোনো সমস্যা নেই কিন্তু।
নায়েব বলল, ঠিক আছে, আসুন গাড়িতে।
অথৈ ইতস্তত করে বলল, আপনি তিনরাস্তার মাথায় ডানের দিকে চিকন গলিতে ঢুকবেন। ওখানে দোতলা বাসাটা আমাদের। বাড়ির সামনে তাহিরা ভবন লেখা আছে, বাগান বিলাশ আছে, আমি রিক্সায় চলে যাই, আপনি আসুন।

আপনার গাড়িতে আসতে আপত্তি আছে?
না মানে বোঝেনই তো, একদম মফস্বল এলাকা, কে কি ভাবে নেয়!
তাহলে আমি রিক্সায় আসি?
অথৈ হেসে বলল, সেটা আরো সমস্যা হতে পারে।
নায়েব বলল, আপনি আমাকে এখনো চিনতে পারেন নি!
জি না।
আচ্ছা পরিচয় দিচ্ছি, আমার বাবা পূর্তমন্ত্রী আশফাক আহমেদ।
অথৈ এবারে চিনতে পারল, এই সেই মন্ত্রীর ছেলে, যার জন্য আপু বিয়ের কথা বলেছিল গতকাল।
অথৈয়ের ব্যাগে এহসানের জন্য কেনা শার্ট, কুরিয়ার করে বাসায় ফিরবে ভেবেছিল, এখন তো এখানে দাঁড়াতে হচ্ছে।

এবারে চিনতে পেরেছেন?
অথৈ একটু বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, আপু আপনার বিষয়ে মায়ের সাথে কথা বলেছিল আসলে। আমি জানতাম না আপনার আসার কথা!
আসলে আপনার আপুও জানে না। এখন সময়টা তো বেশ এগিয়েছে, কিছু ভাবার আগে নিজেদের চেনা জানা জরুরি।
অথৈ বলল, আচ্ছা, তবে আপনি একটু জানিয়ে এলে ভালো হতো। বিষয়টা নিয়ে এখনো তো কোনো কথা হয় নি, বা আমিও কিছু জানি না।
এখন তো জানলেন, বসা যাবে কোথাও?
নায়েব পাশার ব্যবহার অথৈয়ের খারাপ লাগে না। মনের মধ্যে এহসানের জন্য কেমন একটা পিছুটান লাগছে।
অথৈ বলল, আচ্ছা চলুন। মার্কেটের দোতলায় একটা কফিশপে বসল অথৈ আর নায়েব।
আপনি কি পড়ছেন? – নায়েব জানতে চাইলো।

-না পড়া শেষ, প্রাইমারিতে পরীক্ষা দিব, তাই কোচিং করছি।
নায়েব পাশা বলল, আচ্ছা, পরীক্ষা কবে, আপনার এডমিট কার্ডের ছবি দিতে পারেন আমাকে।
অথৈ জিজ্ঞেস করল, কেন? এটা দিয়ে কি করবেন?
নায়েব হেসে বলল, এত কষ্ট করছেন, সেটা বিফলে না
যায়, সেটা দেখব।
ওহ আচ্ছা-
নায়েব বলল, সরি অথৈ, না জানিয়ে চলে এসে আপনাকে বিব্রত করেছি।
না বিব্রত করেন নি, তবে সত্যি বলতে আপনি তো মেয়ে দেখতে এসেছেন, জানিয়ে এলেই ভালো হতো, তাহলে হয়তো আসতে হতো না।
কেন এ কথা কেন বলছেন?
অথৈ বলল, আপনার বিষয়ে কথা বলেছে আম্মার সাথে, আমি আসলে ডিটেল শুনি নি, কথাও হয় নি, আপনি হয়তো ঐশির পরিচিত। আমি বিয়ের বিষয়ে আগ্রহী না।
নায়েব একটু অবাক হলো।

তাই? কেন? তাহলে ঐশি কেন আপনার কথা বলল?
আপুর সাথে আমার বেশ কিছুদিন কম কথা হচ্ছে।
আচ্ছা। তবে অথৈ, এত দূরে এসেছি, বুঝতেই পারছেন, কিছু ভেবে এসেছি। আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। আমি বরং আপনার বাসায় কথা বলি?
অথৈ ইতস্তত করে বলল, আমার কিছুটা সময় প্রয়োজন। আমি না হয় আপুকে জানাব?
কেন, অন্য কারো মাধ্যমে জানতে হবে বলুন তো, এসেই তো পড়েছি। আপনি আপনার ফোন নম্বরটা আমাকে দিন। বা আমার কার্ড রাখুন। আমাকে জানাতে পারেন নির্দ্বিধায়।
অথৈ কার্ডটা নিয়ে বলল, আজ উঠি তাহলে।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৩৬

অথৈয়ের কুরিয়ারে যাওয়া হলো না। সে বাসার উদ্দেশ্যে রিকশা নিলো।
নায়েব আশা করে নি, মন্ত্রীর ছেলেকে অথৈ হোল্ড করে রাখবে। বিশেষ করে ঐশির বোন! ঐশি নিজে তো ল্যাভিস লাইফস্টাইলে আছে,আর বোন কিংবা পরিবার একদম সাধারণ সাদামাটা ভাবে এখানে থাকছে। এসে ভালো হয়েছে, অথৈকে ভালো লেগেছে! শহরে সব সময় সাজানো গোছানো ঝকঝকে ফুল দেখার পরে মাঝে মাঝে পথের পাশে ফুটে থাকা অচেনা রঙিন বুনোফুল নজর কেড়ে নেয়। অথৈ না বললেও, নায়েব বাসায় প্রস্তাব পাঠাবে, আর অন্তত পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড জেনে বিষয়টা না করবে না অথৈ ঐশির পরিবার।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৩৮