Home ফিরে গেছে কত আলো ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৮

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৮

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৮
শানজানা আলম

ঐশির গাড়ি এসে এহসানের এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের সামনে থামল। কিন্তু সিকিউরিটি গার্ড গাড়ি আটকে দিলো, ঢুকতে দিলো না। ঐশি চলে গেছে প্রায় পাচ ছয় মাস আগে, কোম্পানি থেকে নিত্য নতুন ডিউটিতে লোক আসে, নতুন সিকিউরিটি ঐশিকে জিজ্ঞেস করল কোন ফ্লোরে যাবেন?
-৫০১ এ যাবে। তুমি নতুন?
-জি, একটু দাঁড়ান ইন্টারকমে ফোন দেই।
-না, দরকার নেই। এটা আমার বাসা।
-আপনার বাসা, আপনাকে তো কখনো দেখি নাই ম্যাডাম! এহসান স্যারের বাসায় যাবেন?
ঐশি বলল, হ্যা।

-ম্যাডাম, আমি একটা কল দিই, আমাদের তো ডিউটি করতে হয়, নাইলে চাকরি থাকব না।
ঐশি বলল, দুলাল কই, দুলালকে ডাকো। কল দিতে হবে না।
দুলাল, এই দুলাল, ঐশি নিজেই ডাকল। দুলাল বিল্ডিংয়ের কেয়ার টেকার, নিচেই থাকে সবসময়।
দুলালের রুম থেকে দুলাল বের হয়ে এসে গেট খুলে দিলো, ম্যাডাম, আপনি! ভালো আছেন?
-হুম, সরো। কি সব লোক রাখো, কথা বোঝে না।
ঐশি ছুটে দৌড়ে লিফটে উঠে গেল। অথৈ একা থাকলে ওকে ধরে নিয়ে যাবে। এখন এহসানের অফিসে থাকার কথা।
দুলাল তাকিয়ে রইল-এহসান স্যার ম্যাডামের বোনকে বিয়ে করে নিয়ে আসছে, বুয়া কালকে বলছে। আজকে ম্যাডাম আসছে, কি না কি হয়, আল্লাহই জানে, খু*ন খারাবি ও হইতে পারে।
সিকিউরিটি গার্ড ছেলেটাকে দুলাল বলল, ওনি এই বাসার মালকিন ছিল, তালাক হইছে।

-ওহ, স্যারে না নতুন বউ আনছে?
-হুম। এনার বোন, এই জন্যই তো আইসে লাফাইতে লাফাইতে। বদ মেয়েছেলে, রাত দুপুরে অন্য ব্যাডার গাড়ি থিকা নামত, ঢলাঢলি করত!
মাইর পিট দিয়া দিসে তালাক দিয়া, উচিৎ কাজ হইসে।
-হ, চেহারাই খবিসের মতন চিনায়- সিকিউরিটি স্বগতোক্তি করে।
ঐশি লিফট থেকে নেমে ফ্লাটের সামনে ধুমাধুম বারি দিতে লাগল দরজায়। কলিংবেল বাজালো টানা কয়েকবার অনবরত।
এহসান আর অথৈ তখনো শুয়ে ছিল। অনবরত কলিংবেল শুনে, অথৈ বলল, কে বাজাবে এতবার!
অথৈ উঠে যেতে চাইল কিন্তু এহসান আটকে দিলো।
-দাঁড়াও, আমি দেখি, এটা বুয়া না, হাতা গুটিয়ে এহসান দরজার ফাঁকে দেখল ঐশি।
এহসান দরজা খুলতেই ঐশি হন হন করে ভেতরে চলে এলো। এহসান দরজা লাগিয়ে দিলো দ্রুত। চিৎকার চেঁচামেচি হলে আসেপাশের লোক জড়ো হবে, যাই হোক, ঘরের ভেতরে থাকুক।
-সরো, এহসানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ঐশি বলল, অথৈ কই! কোথায় রেখেছ ওকে?
অথৈ ঐশির গলা শুনে বের হয়ে এলো। অথৈয়ের পরনে রাতের পোশাক। ওকে আর এহসানকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তারা ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ছিল, রুমের দিকে তাকিয়ে ঐশি দেখল বিছানা ফুল দিয়ে সাজানো। ঐশি এগিয়ে এসে অথৈ কে একটা থাপ্পড় মারল।

নির্লজ্জ মেয়ে কোথাকার, বোনের স্বামীর সাথে রাত কাটিয়েছিস, অসভ্য মেয়ে একটা!
অথৈ টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল, এহসান দৌড়ে এসে অথৈ কে ধরে তুলল। এই দ্বিতীয়বার অথৈ মার খেলো এহসানের জন্য, এহসানের রাগ উঠে গেল। কিন্তু নিজেকে সামলাতে হবে, মেয়েদের গায়ে টোকা লাগলেও বলে দিবে নারী নির্যাতন হয়েছে। ঐশি তো সেই রকম বেহায়া।
স্টপ ইট ঐশি, বোনের স্বামী মানে, কে কার স্বামী! আমার বাসায় এসে, আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার রাইট তোমাকে কে দিলো?
-তোমার স্ত্রী, ও আগে আমার বোন, লজ্জা লাগে না, শ্যালিকার সাথে , ছি ছি ছি! তোমার এই চরিত্র আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিল, নোংরা ছেলে একটা। বলদ মেয়েটাকে ফুসলিয়ে নিয়ে এসেছ!
-ঐশি, স্যাট আপ! এবার আমি তোমাকে মা★রব, এমন পেটাব, যে সুন্দর চেহারা চেনা যাবে না, আউট ফ্রম মাই হাউজ!

-মাই হাউজ! এ্যাই, তুই বোনের সংসার দখল করেছিস, এই প্রত্যেকটা জিনিস আমার কেনা। সেগুলোই ব্যবহার করছিস, একটুও লজ্জা করল না?
– অথৈকে বলল ঐশি।
অথৈ এবার মুখ খুলল, আপু, তোর কেনা হতে পারে কিন্তু টাকা এহসানের কারন তুই কিছু করতিস না।তোর আগ্রহও ছিল না এগুলোর প্রতি, থাকলে সব নিয়ে যেতি গয়নাগুলোর মতই।
-অথৈ, স্যাট।আপ! – ডাইনিং থেকে ফুলদানিটা ছুড়ে টিভিতে মারল ঐশি, টিভি ফুলদানি দুটোই ভেঙে গেল।
এহসান বলল, এই মুহুর্তে না থামলে আমি ৯৯৯ কল
করব।
-করো,তোমাদের এই প্রেমলীলা এডাল্ট্রির অভিযোগ
আমিও করব। আমাকে ঠকিয়ে আমার বোনের সাথে প্রেম করেছ, এখন ডিভোর্স দিয়ে ওকে বিয়ে করেছ।
এহসান বলল, ওহ রিয়েলি, তাহলে তো আমিও অভিযোগ করব, আমার স্ত্রী থাকাকালীন তুমি নাসিরের সাথে রাত কাটিয়েছ, তদন্ত হলে বের হবে, আমাদের
ডিভোর্স ৫ মাস হয়ে গেছে, আর তোমার নাসিরের সাথে ব্যাংকক ট্যুরের ডিটেল পাওয়াও মিডিয়ার কোনো ঘটনা না। নাসিরকে ফাঁসাতে তোমার চরিত্র নিয়ে মিডিয়া একটা ভালো গেম খেলবে, ডান? কল দিই!
ঐশি গ্লাস তুলল ছুড়তে, অথৈ ঐশির হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে নিলো।

-উহু আপু, আমার যথেষ্ট ক্ষতি করা হয়েছে, আর একটা জিনিসও ভাঙবে না। এখন এই বাসার সব কিছু শুধু আমার এবং এহসানও আমার। তোমার স্বামী থাকা অবস্থায় আমি এহসানের সাথে কথা বলিনি, সেটা আমার আর এহসানের কললিস্ট বের করলেই জানা যাবে। তুমি কিছুই করতে পারবে না। তোমারই ছিল সব, তোমাকে বুঝিয়েছিলাম, তুমি থাকো নি। আর বাবা মা কে আমি বলিনি, তোমার ফ্যাশন হাউজের কোটি
টাকার উৎস কি, বলিনি তুমি ব্যাংকক ট্যুরে এত শপিং কিভাবে করলে। এহসানের টাকা তো এত নয়, যেটা
তুমি পেয়োছ! বাবা মায়ের কাছে নিজের ইমেজ ভালো রাখতে চাইলে আমাকে আর এহসানকে বিরক্ত করবে না।বুঝতে পেরেছ?
ঐশি ভাষা হারিয়ে ফেলল, এই কোন অথৈ, যে বোন তার সব সমস্যার সমাধান করে দিত, টাকা বাবা না দিলেও মায়ের থেকে নিয়ে পাঠাত! সব সময় আপুর পছন্দকে প্রায়োরিটি দিত। ঐশির হঠাৎ বুক ভেঙে কান্না আসে। এই কান্নার কারন সে বুঝতে পারে না, এটা কি এহসানের জন্য, নাকি এই সংসারের জন্য, যা তার তিলে তিলে গড়ে তোলা ছিল।
কই এতদিন তো খারাপ লাগে নি, আজ কেন মনে হচ্ছে সব হারিয়ে গেছে। নাকি কেউ নিয়ে নিলো বলে এমন লাগছে! নাকি একমাত্র বোনটা পর হয়ে গেল!

তবে অথৈ এর কথা মিথ্যে নয়, নিজের বোনকে তো চেনে ঐশি, এহসানের সাথে ওর আগে কিছু ছিল না, যে সময়টা ঐশি, এহসান অথৈ দুজনের।থেকে সরে
নিজে আলাদা জগতের বাসিন্দা হয়েছে,সেই সময়টাতেই ওরা কাছাকাছি এসেছে।
তবে এভাবে কিছু হবে না। অথৈ কে এহসানের হতে দেওয়া যাবে না। এই সম্পর্ক ঐশি ভাঙবেই!
ঐশি বের হয়ে যেতে যেতে বলল, আমি তোকে এই সংসার করতে দেব না, তুই বুঝবি এহসান কতো বড় শয়তান, সেদিন আমার কথা মনে করবি,আমি তোকে বোঝাব অথৈ, রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। তোর পাশে এহসান থাকবে না সবসময়।
অথৈ বলল, আমাকে ভালো থাকতে দাও আপু,আমি বাবা মাকে।কিছুই বলব না। তুমিও বরং সেটল করার চেষ্টা কর।

ঐশি বলল, ভুলের জগতে আছিস অথৈ!
এহসান বলল, ঐশি, আমি তোমার পতন দেখার অপেক্ষায় থাকব। এমন একটা দিন আসবে সারা দেশ বাসী তোমার চরিত্র জানবে। আমি কিছুই করব না।।শুধু অপেক্ষা করব।
ঐশি চারপাশে তাকিয়ে দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে গেল।
এহসান দরজা আটকে এসে অথৈকে আলিঙ্গন করে বলল, ভাগ্যিস আমি অফিসে যাইনি এখনো। আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। ঝড়টা দুজন মিলে সামলাতে পারা গেল।
অথৈ হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৭

এহসান বলল, চোখ মোছ অথৈ, কেবল তো ঝড়ের শুরু, অনেক ধাক্কা সামলে তোমাকে কাছে পেয়েছি।
তোমাকে একটা কথা বলি, ঐশির কাছে এখন অনেক টাকা। কোনো অবস্থাতেই তুমি ঐশিকে বিশ্বাস করবে না। প্রমিজ করো!
অথৈ আস্তে বলল, প্রমিজ।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৯