বজ্রমেঘ পর্ব ৪০ (২)
ফাবিয়াহ্ মমো
শাওলিন আরেকটু হলে জোরে শব্দ করে ফেলত। কিন্তু ওপাশ থেকে তখনই ফিসফিসিয়ে বলল,
– ভাবীজান, আমি, রাবেয়া। ভাইজান পিয়ানো বাজায়। শুনতাছেন? শুনতাছেন আপনে?
শাওলিন কলটা কানে ধরে নিচুস্বরে বলল,
– মাঝরাতে পিয়ানো বাজাচ্ছে? কেন?
– আপনে জানেন না?
– আমি তো এটাই জানি না বাড়িতে পিয়ানো আছে।
– কন কী! এইবার খাগড়াছড়িত আইয়েন। আমি দেখাবানি। অনেক বড়ো পিয়ানো!
শাওলিন থমকে গেল। আমেরিকায় বেড়ে ওঠা মানুষটা এই নির্জন রাতে পিয়ানো বাজাচ্ছে, এটাও কী অতীতের আরেক টুকরো, যা শাওলিন জানে না? ঐশ্বর্য কণ্ঠ খাদে রেখে বলল,
– অনেক সুন্দর বাজাচ্ছে! আমার হাতে কাঁটা দিচ্ছে দ্যাখ।
শাওলিন প্রত্যুত্তর করল না। পিয়ানোর ছন্দময় সুর হালকা হয়ে কমে যাচ্ছে। বুকে ঢিপঢিপে স্পন্দন নিয়ে শাওলিন বলল,
– দুটো বকা দিতে পারলি না? এতো রাতে জেগে আছে!
রাবেয়া ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,
– ও মা গো! আমি পারুম না ভাবী। আপনে কবে আইবেন?
– কাল পরীক্ষা শেষ। ছুটি বুঝে আসব।
– শুক্কুর শনি বন্ধ দেয় না? আইয়া পড়েন হেসুম। ভাইজান আপনেরে পাইলে যে কী খুশি হইব!
– উনি হাসে কোথায় যে খুশি হয় বুঝিস?
– পুরুষ মাইষ্যের হাসন লাগে নাকি? দেখলেই বুজন যায়।
শাওলিন চোখ কোলে ফেলল। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। শান্ত গলায় বলল,
– রাবেয়া, এখন রাখি। ঘুমোতে হবে। রাকেয়া জাগার আগেই ফোনটা রেখে দে।
– আইচ্ছা, ভাবী। ভালো থাকেন। আর তাড়াতাড়ি আইয়া পইড়েন। দেরি কইরেন না।
শাওলিন কল কেটে তাকাল। ঐশ্বর্য জুলজুল চোখে তাকিয়ে দেখছে। শাওলিনের দিকে অদ্ভুত মোহগ্রস্ত সুরে বলল,
– ঝগড়া হয়েছে? আজও কল করতে দেখিনি। কিন্তু মাঝরাতে পিয়ানো বাজাচ্ছে। তাও তোর পছন্দের গানে সুর তুলে!
শাওলিন ভ্রুঁ কুঁচকে অকারণ বিরক্তির সুরে বলল,
– কালকের টপিক নিশ্চয় এগুলো থেকে আসবে না? শুয়ে পড় তো।
ঐশ্বর্য থতমত খেলে শাওলিন অন্যপাশ ফিরে শুলো। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি, সুখমাখা আলোড়ন ছড়িয়ে যাচ্ছে। কাঁথাটা মুঠো করে চোখ বন্ধ করল শাওলিন। হঠাৎ মনে পড়ল ডায়েরির হলুদ পাতায় লিখেছিল,
আজ বহুদিন পর একটা গান পছন্দ হলো। মেহবুবা ম্যায় তেরি মেহবুবা। কিন্তু আমি কার হৃদয়ের মেহবুবা? গানটা সুন্দর।
রাবেয়া কল কাটতেই মেঝেতে ছায়া দেখল। দীর্ঘদেহী অবয়ব। চিনতে পেরে পিঠের শিরদাঁড়া কেঁপে উঠল। রাবেয়া ঢোক গিলতে গিলতে মাথা তুলে তাকাতেই অবশ সুরে বলল,
– ভভভাইজান,
শোয়েব পিয়ানো ছেড়ে কখন উঠেছে খেয়াল করেনি। ঘরের ভেতর হলুদাভ আলো দীর্ঘ দেহটার গা ঠিকরে রাবেয়ার মুখে পড়েছে। রাবেয়ার দিকে লম্বা বলিষ্ঠ হাত বাড়াল শোয়েব। রাবেয়া কাঁপতে কাঁপতে হাতের বাটন ফোনটা পৌরুষ থাবায় তুলে দিল। শোয়েব ফোনের শেষ কলটা দেখলে রাবেয়া থতমত সুরে বলল,
– ভাবীরে কল দিছি, ভাইজান। ভাবী আপনের কণ্ঠ শুনতে চায়।
পাক্কা মিথ্যাটা ঝেড়ে দিয়ে রাবেয়া মাথা নিচু করল। এক্ষুণি রামধমকটা খায় কিনা ভয় হচ্ছে। শোয়েব এ কথায় ভ্রুঁটা কুঁচকেই রইল। ভারি গলায় শুধাল,
– মিথ্যা বলছিস?
রাবেয়া ঝড়ের গতিতে মাথা দুপাশ হেলিয়ে বলল,
– না না, ভাইজান। মিথ্যা কমু ক্যান? ভাবী আপনের সাথে কথা বলতে চায়। আপনের চিন্তায় রাইতে ঘুমাতে পারে না।
শোয়েব ফোনটার কোণে ছোট্ট নামটা দেখল। বৃদ্ধাঙুল ছুঁয়ে যেন নাম নয়, কল্পনায় নরম ঠোঁটদুটো ছুঁয়ে দিল। অন্য মনটা রাবেয়ার দিকে বলল,
– তুই এদিকে কী করছিস? রাতে এখানে কী?
রাবেয়া বগল তলে একটা খাতা এনেছিল। খাতাটা শোয়েবের দিকে বাড়িয়ে বলল,
– এইটা দেখাইতে আনছিলাম। খাতাডা একটু দেখেন ভাইজান। রোকেয়াবু এই খাতায় কী জানি লেইখা থোয়।
শোয়েব চোখ সরিয়ে খাতাটা দেখল। সেলাই করা সাদা খাতা। ভেতরে খুলে খুলে দেখতেই হঠাৎ এক জায়গায় চোখ আঁটকাল। চশমা ঢাকা চোখ তীক্ষ্ম হলো। তর্জনীতে ইঙ্গিত করে বলল,
– ফাইরুজ… এই নামটা। চিনিস?
– না ভাইজান। কিন্তু একটা কথা আছে। বুবু যেই পাঠশালায় পড়তে যাইতো সেইখানে এর সাথে কথা হইছে।
– কী কথা?
– সেইটা তো বলতে পারুম না। বুবু কইছিল খাতাডা একসময় আপনেরে দেখাইব। কিন্তু ভাইজান, বুবু কিছু জানে। আজকা যখন পাঠশালা থিকা আসতাছিল কিছু ব্যাডা বুবুর পিছু নিছিল। আল্লার রক্ষা মতিন ভাই নিতে আইছে।
শোয়েব খুব অবাক হলো। খাতাটা রোল করে ডানহাতে নিয়ে রাবেয়াকে ঘুমোতে যেতে বলল। দ্রুত ফিরে এল কামরায়। পিয়ানোর সামনে খাতাটা রেখে দ্রুত একটা কলম দিয়ে কিছু দাগ টানল। রোকেয়া খুব ছোটো ছোটো অক্ষরে লিখেছে পাহাড়ে এই লোকগুলা কেরা? কেন মাইয়াগো ওই জায়গায় লইয়া যায়? ভালা টাকা দিতাছে। কিন্তু টাকা দিতাছে কিল্লিগ্গা? ওই মাইয়ারা কী করতাছে? কথাগুলো পরপর পড়ে শোয়েব স্থির হয়ে গেল। রোকেয়া কী কোনো বিপদের দ্বার খুলেছে? ফাইরুজকে চিনতো?
খাগড়াছড়ির সকালটা অন্যরকম স্নিগ্ধ। রোদে ডোবা বজ্রমেঘ বাংলো দাপুটে আদল বোঝাচ্ছে। নিচতলার হলঘরে ফাতিমা নাজ সোফায় বসে আছেন। এমন সময় পেছনে কারোর উপস্থিতি টের পান। হাতের বইটা রেখে পিছু তাকাতেই ফাতিমা ভিড়মি খেয়ে তাকান। দেখলেন শোয়েব দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ হাসতে গিয়ে থমকালেন ফাতিমা। ভ্রুঁ দুটো সতর্কভাবে কুঁচকে বললেন,
– কী হয়েছে, ফারশাদ?
শোয়েব অফিসের পরিপাটি বেশে নিচে নেমে এসেছে। বাঁহাতে ধূসরবর্ণ স্যূট। পরনে গাঢ় মেরুন শার্ট, স্যূটের রঙে ধূসর প্যান্ট। ফাতিমা একটা বিপদ আঁচ করে শুধালেন,
– সমস্যাটা কী?
পুরুষালী চোয়াল এভাবে যে কঠোর হতে পারে, দৃশ্যটা না দেখলে বিশ্বাস করতেন না তিনি। ভয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন ফাতিমা। হাত থেকে বইটা সোফায় ছেড়ে বললেন,
– আমি কিছু করেছি? তুমি রেগে আছ দাদু!
নীল চোখের পলক পড়ল না। স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে শোয়েব হিমকণ্ঠে বলল,
– বুকশেলফ থেকে ডায়েরি নিয়েছ?
ফাতিমা চোখজোড়া বিস্ফোরিত করলেন। পরক্ষণেই শান্ত, স্বাভাবিক হয়ে বললেন,
– ওই ডায়েরি তোমার না।
– ওটা আমার।
– কীভাবে এটা বলো? ওটা শাওলিনের না!
– শাওলিন আমার বউ। ওর সবকিছুতে আমার অধিকার। ডেষ্কের ড্রয়ার খুলে ছবিগুলো নিয়েছ কেন?
ফাতিমা থতমত খেয়ে বললেন,
– কোন ছবি? আমি কোনো ছবি দেখিনি। আমি শুধু ডায়েরিটা পেয়েছি। ওটা ওর লাগেজে ঢুকিয়ে দিয়েছি।
শোয়েবের মুখ টকটকে লাল। চোখজোড়া এমনভাবে এঁটে দিয়েছে যেন ওই চোখ দিয়েই খুন করবে। ফাতিমা সাহসী সুরে বললেন,
– তুমি জেদ করছ ফারশাদ। এই জেদ ভালো হবে না। সময় আছে সবকিছু জানিয়ে দাও। শাওলিন বিচক্ষণ। আমার বিশ্বাস, সময় নিবে, কিন্তু বুঝবে ও।
– পরামর্শ চাই না। শুধু স্পষ্ট করতে চাই, এই চাপ্টার থেকে দূরে থাকো। তোমাকে এই পর্যন্ত জায়গা দিয়েছি, নিজের ক্ষতি ডেকো না।
স্যূটটাকে হাত বদল করল শোয়েব। সকালের হিমস্নিগ্ধ বাতাসে কপালে ছোটো চুলের লুকোচুরি। ডানহাতে ব্যাকব্রাশ করে শোয়েব হাঁটা দিল। বাইরে এক পা পড়বে হঠাৎ দাদীর গলা ভেসে এল,
– সবার মুখ বন্ধ করতে পারবে না। কেউ না কেউ ঝাপসা তথ্য দেবেই। শাওলিন এখনো জানে না, আর রেবেকা কিছুই জানায়নি। তুমি অন্ধকারে রেখে মেয়েটাকে কষ্ট দিবে না।
শোয়েব গতিরোধ করে মাথা পিছু করল। সোনালি রোদ তার কাটাকাটা চোয়াল ঘেঁষে দাদীর চোখে পড়ল। শোয়েব কিছুক্ষণ হিম দৃষ্টিতে তাকিয়ে অদ্ভুত শান্ত গলায় বলল,
– যদি কেউ সীমানা ভুলতে চায়, ফারশাদকে যেন স্মরণ করে। তোমার মেয়ে তাহমিনা আমাকে অন্ধকারে রেখেছিল। তাহমিনার ছেলে তাহমিদের কী হয়েছে তোমার অজানা নেই।
– সবাই নিজের স্বার্থটা দেখে। তুমিও স্বার্থটাই দেখছ। তাহমিনাকে দোষী বলে নিজের দোষ ঢাকছ? তোমার উচিত না ওকে সব বলা?
– যে স্রষ্টা মানো, তার কসম। না বলার জন্য যা করতে হয় সব করে ছাড়ব। কোনো মির্জাকে যদি দেখি এই কাজ করেছে, জীবনের মেয়াদ বেশিদিন টিকবে না।
অদ্ভুত স্বরে বলে শোয়েব মাথা ফেরাল। বুটের গটগট শব্দ ছেড়ে বাইরে মিলিয়ে গেল। ফাতিমা হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, হিংস্র পশুর মতো ছোটো নাতী কথাগুলো বলল। যে হিংস্রতা সাড়ে চার বছর ধরে চাপা পরেছিল, সেটা আজ মুখোশ খুলে বেরুল।
একইদিন ঢাকায় শাওলিনের ইনকোর্স পরীক্ষা শেষ হলো। রেবেকা ধানমণ্ডির মর্তুজা মেনশনে যেতে বলেছে। চারদিনের মিলাদ বাবদ অনুষ্ঠান আজ। বিভিন্ন মানুষ ভীড় করবে। বিয়ের দিন যে অপমানের শিকার হয়েছিল শাওলিন পণ করেছিল আর কখনো মর্তুজা বাড়িতে যাবে না। কিন্তু সকাল থেকে রেবেকাল কল,
– পরীক্ষা শেষ কয়টায়? তুমি এখানে আসছ কখন?
শাওলিন বিরক্ত চেপে বলল,
– এগারোটায় শেষ হবে। হল থেকে ব্যাগ গুছিয়ে বের হব।
– তাড়াতাড়ি করো। তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
কল কাটার পর শাওলিন হল থেকে ছোটো কাপড়ের ব্যাগটা নিয়ে বাস ধরল। ক্যাম্পাসের বাসের অপেক্ষায় থাকলে দেরি হবে। ধানমন্ডি পৌঁছে যখন মর্তুজা মেনশনের ভেতরে ঢুকল, শাওলিন দেখল প্রচুর মানুষ। সাংবাদিকদের একটা দল একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। শাওলিন চারিদিক দেখতে দেখতে তিনতলা ভবনের ভেতরে ঢুকে গেল। একজন ওকে দেখে বলল,
– এই মেয়েটা কে?
অন্যজন চোখের কোণ দিয়ে দেখে বলল,
– তাহমিদের পাত্রী! বিয়েটা মামাতো ভাইয়ের সাথে হয়েছে।
শাওলিন কথাটা শুনেও না শোনার মতো পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি ধরল। নিচতলায় অতিথিদের সমাগম। দোতলায় আরো মানুষ দেখে তিনতলায় উঠে গেল। রেবেকার ঘরে গিয়ে দেখল সেখানেও তিল ধারণের জায়গা নেই। মহিলারা বাচ্চা নিয়ে বাজার গরম করে রেখেছে। শাওলিন একজনকে জিজ্ঞেস করল,
– রেবেকা মণিকে দেখেছেন?
বাচ্চাকে কোলে দোল দিতে দিতে একজন শাওলিনকে দেখে বলল,
– তুমি শোয়েবের বউ?
অপ্রত্যাশিত প্রশ্নটা শুনে শাওলিন বিব্রত হলো। খেয়াল করল যে ঘরটা গমগম করছিল এখন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। শাওলিন মাথা নাড়িয়ে বলল,
– জ্বি। রেবেকা মণি কোথায় বলতে পারবেন?
– রেবা মোর্শেদ খালার সাথে রান্নাঘরে। থাকলে ওখানেই আছে।
– আচ্ছা। ধন্যবাদ।
শাওলিন পা ঘুরিয়ে যেতেই শ্রবণপথে এল,
– রাশি খারাপ। রেবেকা কষ্টে বিয়ে ঠিক করছিল। কপাল দেখো, তাহমিদকে শেষ করছে।
শাওলিন দমবন্ধ করে কথাগুলো না শোনার চেষ্টা করল। রান্নাঘরেও ভীড়। কয়েক মুহুর্ত দাঁড়াতেই রেবেকা ওকে দেখে বাইরে বেরিয়ে এল। ছোটো ন্যাপকিনে হাত মুছতে মুছতে বলল,
– খাবার দিচ্ছি। হাতমুখ ধুয়ে খেয়ে নাও।
শাওলিন এমন অস্বাভাবিকতা দেখে খুব আশ্চর্য হলো। রেবেকার দিকে অবাক স্বরে বলল,
– আপনি আমাকে বিরিয়ানী কোরমা খেতে ডেকেছেন?
হাত থমকাল রেবেকার। চারপাশে কয়েকজনকে তাকাতে দেখে দ্রুত শাওলিনের ডান কবজি ধরে হনহন করে বাইরে নিয়ে গেল। করিডোরে দাঁড়িয়ে কপাল কুঁচকে বলল,
– অসভ্যের মতো কথা বলো কেন? তুমি কী জানো না বাড়িতে কী?
– আপনি কীভাবে আশা করেন যে বাড়িতে অপমান করল, সেখানে চুপচাপ খেতে বসব?
রেবেকা কঠিন চোখে তাকাল। রাগ সামলে বলল,
– কী চাও তুমি? ফ্যাসাদটাকে শোয়েবের মতো ঝুলিয়ে রাখতে চাও? এগুলো শিখিয়ে পাঠিয়েছে?
– আপনি উনাকে টানছেন কেন?
– টানব না কেন? ছোটো ভাইকে দেখতে এল না! নরপিশাচ শয়তান!
শাওলিন বহু কষ্টে শান্ত থাকল। এক মুহুর্ত স্থির হয়ে বলল,
– আপনি আমার সামনে গাল দিচ্ছেন মণি! আপনি নিজেও জানেন এই বাড়িতে কেন আসতে চাইনি!
রেবেকা আকাশ থেকে পরার মতো অবাক হলো। কণ্ঠে বিস্ময় জড়িয়ে বলল,
– মগজ ধোলাই করা শেষ? স্বামীর দুর্নামে পিণ্ডি জ্বলছে?
– এই বাড়িতে আপনার সামনে আমাকে অপমান করল, আপনিই উনার সাথে বিয়েটা দিলেন। নিজেই মগজ ধোলাইয়ের প্রশ্ন করেন? একমুখে কতবার কথা ঘুরাবেন?
কথাটা মাটিতে পরতে পারেনি, ঠাস করে এক থাপ্পড় শাওলিনের গালে পড়ল। নরম চামড়া আগুনের মতো জ্বলে উঠল। গালে হাত দিয়ে শাওলিন নির্বাক। রেবেকা কঠিন চেহারায় ফুঁসছে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
– মুখে মুখে তর্ক করো? দুদিনের মেয়ে আমাকে শেখাও? হ্যাঁ?
শাওলিন এই রেবেকাকে চিনে না। শায়খ দাদা এই নারীকে বিয়ে করেনি। গালের ভেতর মাংস কেটে রক্তের স্বাদ পাচ্ছে। হঠাৎ চোখ পরল রেবেকার পেছনে থাকা মোর্শেদার দিকে। মোর্শেদা কিছু মহিলাদের সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছিলেন। শাওলিন এতোগুলো চোখের সামনে মরমে ছোটো হয়ে গেল। মোর্শেদা রেবেকাকে টেনে নিয়ে গেলেন। শাওলিন পা ঘুরিয়ে ছাদে ওঠার সিঁড়ি ধরল।
ছাদের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল শাওলিন। চোখে ছলছল করছে অশ্রু। ডানহাতের উলটোপিঠে বারবার মুছেও লাভ হচ্ছে না। মানুষ ভাবে, যে সবকিছু সহ্য করে তার কোনো অনুভূতিই নেই। শুধুমাত্র একটা মানুষকে মায়ের মতো বিশ্বাস করতে চেয়েছিল। কারণ দাদা নেই। কেউ নেই! রেবেকাকে আর চিনতে পারছে না শাওলিন। সে কী সত্যিই ওর পাশে ছিল? যে ভালোবাসে, কিন্তু অপমানের সময় চুপ করে থাকে। একবারও বলেনি, শাওলিনের দোষ নেই, ওকে বিয়েতে আমি রাজি করিয়েছি। ঠোঁট কাঁপছে, চোখে ঝাপসা পর্দা। দমকা বাতাস বেনী থেকে ছুটে আসা চুল উড়িয়ে দিচ্ছে সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে। বাঁহাতে চোখ মুছে ডানকাঁধে ঝোলানো টোটব্যাগ থেকে ফোন বের করল। কাউকে নয়, শুধু একজনের কাছেই কলটা করল। ধরল না। বাজতে বাজতে কেটে গেল। শাওলিন ফুপিয়ে উঠল। চোখ খিঁচিয়ে অন্তঃমনে বলছিল, ধরুন … ধরুন। দ্বিতীয়বারও কলটা কেটে গেল। চোখ ঝাপসা! স্ক্রিনের Call ended লেখাটা আর স্পষ্ট দেখল না। দাঁত দ্বারা নিচের ঠোঁট কামড়াল শাওলিন। প্রচণ্ড ব্যথা হলো, জিভে রক্তের স্বাদ পেল। বুকের ভেতর যে ব্যথা হচ্ছে সেই ব্যথা তো ইঞ্চিও কমলো না। চোখের সামনে ফোনের স্ক্রিন নিভল। কিন্তু পর মুহুর্তেই হঠাৎ চমকাল শাওলিন। টকটকে লাল চোখে ফোনটা বাজতে দেখল। দ্রুত কলটা রিসিভ করল। ওপাশে সাড়া নেই, শুধু চেনা নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে এল। শাওলিন ঠোঁট কামড়ে সামলাতে চাইল। কিন্তু পারল না। নিজের অজান্তেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠল শাওলিন। সংযমের বাঁধ ভেঙে গেল। শুধু ভাঙা কণ্ঠে বলতে পারল,
– আমি.. আর পারছি না জানেন. .
কণ্ঠে যেন বিষম ব্যথা। শাওলিন চোখ কুঁকড়ে অশ্রুরুদ্ধ হয়ে বলল,
– আমিই কেন . . বারবার আমিই কেন?
শোয়েব কোনো কথা বলল না। বুকের ভেতর ঝড়। চোখ স্থির। দুপুরের খাবার খেতে বসেছিল। মুহুর্তেই বিস্বাদ ঠেকল সব। নিঃশব্দে ঠোঁটদুটো নড়ল, শাওলিন। শাওলিন শুনতে পেল না। কলের সাড়াহীন নিষ্ঠুরতায় ভেঙে চূর্ণ হয়ে বলল,
– যাদের আপন ভেবেছি, আজ তাদেরই চিনতে কষ্ট হয়..
শেষ কথাটা বলতে মাথা নুয়ে ফেলল শাওলিন। আজ যেন দুচোখে অশ্রুর প্রতিযোগিতা। বারবার চোখ ডলায় ত্বক জ্বলছে। শাওলিন অশ্রু গিলে বলল,
– সবাই আমার সামনে দেয়াল তুলে দেয়। যেন আমি পাথর, দেয়াল ভেঙে ওপাশে কী আছে জেনে যাব। কেউ মানুষ মনে বলেই করে না।
চোখের পানি জামার হাতা ভিজিয়ে দিচ্ছে। শাওলিন নিঃস্ব ঠুনকো সুরে বলল,
– যার যখন ইচ্ছে হয় কথা শোনায়। কথা না শুনলে খারাপ আমি। আমার দিকটা কেউ ভেবে দেখে না। মুখে বলে ‘শুধু তোমার জন্য ভাবি’। আদতে কেউ আমার জন্য নেই।
শাওলিন সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে শব্দ কমানোর জন্য। গলায় ঢোক গিলতে কষ্ট! চোখ ডলে ভেজা বাম হাতা রেলিংয়ে নামাল। ফোনের ওপাশ থেকে তবু কথা বলল না। শাওলিন নিগূঢ় ব্যথায় শেষ অবধি কলটা কেটে দিল। ফোনটা চালু রাখল না। টোটব্যাগের চেইন আঁটকে ব্যথাতুর ঠোঁটে আঘাত করল শাওলিন। জিভে রক্তের স্বাদ বাড়তে লাগল।
অপরপ্রান্তে, শোয়েব কান থেকে ফোন নামাল। খাবারের প্লেট ধাক্কা দিল ধাম করে। ছিঁটকে পানির গ্লাস কাত হয়ে একটু পর চুরমার শব্দ হলো। হাতের মুঠো এমনভাবে পাকিয়ে এসেছে, সবকটা নীল শিরা চামড়ার ওপর ফুলে উঠেছে।
রেবেকাকে দোতলার একটা ঘরে আনলেন মোর্শেদা। দরজা চাপিয়ে মেয়ের দিকে হুঙ্কার গলায় বললেন,
– কী করলে রেবা? মেয়েটাকে ওভাবে মারলে?
রেবেকা রাগে কাঁপছিল। মায়ের দিকে হিসিয়ে বলল,
– কী করতে বলো? মুখের ছিরি দেখেছ? বস্তি কোথাকার! কীভাবে আমার মুখে মুখে তর্ক করল!
মোর্শেদা মেয়ের উগ্রতায় স্তব্ধ। নির্বাক হয়ে বললেন,
– তুমি শাওলিনকে বস্তি বলছ? রেবা, এগুলো কেমন ভাষা!
রেবেকা বিছানায় গিয়ে বসল। চেহারায় ঘাম, রাগের আঁচ। ঘন ঘন শ্বাস টানছে সে। কেমন উগ্ অস্থির ভঙ্গি। মোর্শেদা মেয়ের দিকে ক্ষুদ্ধ গলায় বললেন,
– মা মরা মেয়েটার গায়ে হাত তুললে, রেবা! এমন শিক্ষা তোমাকে দিয়েছি?
রেবেকা হিংস্র দৃষ্টিতে চোখ উঠাল। মায়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সে। নাক ফুলিয়ে দম ছেড়ে বলল,
– আমি ওকে বুকে করে রেখেছি। সেই মেয়ে আমার বুকের ভেতর বুলেট ঢুকিয়ে দিচ্ছে! আমার! এই রেবেকার!
মোর্শেদা মেয়ের ক্রোধ দেখে চুপ হন। এই মেয়ে উনার কথা শুনতে নারাজ। মোর্শেদা কয়েক মুহুর্ত নীরব থেকে বললেন,
– যে থাপ্পড় তুমি দিলে সেই থাপ্পড় যদি শোয়েব দিতো? তখন কী করতে?
রেবেকা চোখ গরম করে তাকাল। দাঁত চিবিয়ে বলল,
– রেবেকা নেওয়াজ কে, বুঝিয়ে দিতাম।
মোর্শেদা কিছু বললেন না। মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। স্থির চোখে বললেন,
– তুমি কী করেছ টের পাচ্ছ না। ভাবছ, ননদকে চড়-থাপ্পড় মারলে কিছুই হবে না।
রেবেকা কথার আগপাশ বুঝল না। মায়ের দিকে কয়েক সেকেণ্ড তাকিয়ে থাকল। কণ্ঠে তেজ নিয়ে শাষাল,
বজ্রমেঘ পর্ব ৪০
– প্যাঁচানো বন্ধ করো। মাথা গরম আছে কিন্তু!
মোর্শেদা নির্বিকার কণ্ঠে বললেন,
– শোয়েব যদি জানে তুমি কী করেছ, আজ রাতে ওর জীপ এখানে দেখবে রেবা।
মোর্শেদা ঘড়ির দিকে তাকালেন। তারপর দেখলেন রেবেকাকে। তিনি কিছু না বলে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন।
