বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪৭
সুমি চৌধুরী
নিজের শ্রবণেন্দ্রিয়কেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না বৃষ্টি। আকাশ কানাডায়। তাও আবার তার একেবারে সম্মুখে। বিস্ময়ে স্থির হয়ে যায় তার সমগ্র সত্তা। তবে কি এ স্বপ্ন নয়? এ কি সত্যিই বাস্তব?হ্যাঁ, এ স্বপ্ন নয়।আকাশ সত্যিই তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।অবিশ্বাস আর বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে কোনো রকমে তোতলাতে তোতলাতে কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারণ করে বৃষ্টি,
” স্যার… স্যার, আপনি কি সত্যি? ”
বৃষ্টির কথায় ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে দু-পা এগিয়ে আসে আকাশ। এসে থামে একেবারে রমণীর মুখোমুখি। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে,
” কেন, বিশ্বাস হচ্ছে না? ”
সহসাই চোখ নামিয়ে নেয় বৃষ্টি। আকাশের দৃষ্টি যেন তার বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা সমস্ত অস্থিরতাকে উন্মোচিত করে দিচ্ছে। হৃদয়টা এমনভাবে ধুকপুক করছে, যেন বুকের পাঁজর ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।কয়েক মুহূর্তের নীরবতা ভেঙে আকাশ মৃদু স্বরে বলে ওঠে,
” কেমন আছো,? ”
জিভ দিয়ে শুকিয়ে আসা অধরদ্বয় ভিজিয়ে নেয় বৃষ্টি। বুকের ভেতর জমিয়ে রাখে সামান্য সাহস। তারপর আকাশের দিকে না তাকিয়েই মৃদু কণ্ঠে জবাব দেয়,
” ভালো স্যার। আপনি? ”
” ভালো। রেডি হও। ”
আকাশের সংক্ষিপ্ত কথায় বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে তাকায় বৃষ্টি। কিছুই বুঝতে না পেরে কৌতূহলী কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
” কেন? ”
আকাশের কণ্ঠে ভেসে আসে সংক্ষিপ্ত উত্তর,
” বের হবো। ”
বিস্ময়ে পুনরায় বড় হয়ে যায় বৃষ্টির আঁখিপল্লব। আকাশের কথার মর্ম যেন কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না সে। কৌতূহল আর দ্বিধায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে মন। আমতা আমতা করে বলে,
” কিন্তু আমি কেন রেডি হবো, স্যার? ”
মুখাবয়বে কোনো পরিবর্তন আসে না আকাশের। দৃষ্টিতে সেই চিরচেনা কঠোরতা, কণ্ঠে অটুট দৃঢ়তা। কোনো রকম ব্যাখ্যার অবকাশ না রেখে বলে,
” তোমাকে নিয়েই বের হবো। প্রশ্ন না করে রেডি হও। আঙ্কেলের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ”
কথাগুলো শুনেও কৌতূহল দমন করতে পারে না বৃষ্টি। অজানা গন্তব্যের ভাবনায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে মন। আবারও সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করে,
” কোথায় যাবো স্যার? ”
প্রশ্নটি শুনে কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত হয় ভ্রুযুগল আকাশের। দৃষ্টিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিরক্তির ছাপ। অধৈর্য কণ্ঠে বলে,
” এডিয়টের মতো এত প্রশ্ন করো কেন তুমি? চুপচাপ কথা শুনতে পারো না? ”
কথাগুলো কানে যেতেই মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায় বৃষ্টি। আর একটি বাক্য উচ্চারণ করার সাহসও পায় না সে। নত হয়ে আসে আঁখিপাতা।পরক্ষণেই আকাশের হাত থেকে কাগজটা ছিনিয়ে নেয় বৃষ্টি। এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে কাগজটা হাতে নিয়েই দ্রুত পায়ে ছুটে যায় ওয়াশরুমের দিকে।দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। পরক্ষণেই বন্ধ হয়ে যায় দরজাটা।দরজার ওপাশে এসে থেমে যায় বৃষ্টির ছুটে চলা পা। বুকের ভেতর তীব্র ছন্দে ধুকপুক করতে থাকে হৃদয়। আকাশের হঠাৎ আগমন, তার সঙ্গে একসঙ্গে বের হওয়ার কথা সবকিছু মিলিয়ে অদ্ভুত এক আলোড়ন বয়ে যায় বৃষ্টির অন্তরে।
চোখ বাঁধা অবস্থায় নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রূপা। আঁখিপল্লবের ওপর শক্ত করে বাঁধা কাপড়ের আড়ালে একটুও দেখতে পাচ্ছে না সে। কী কারণে বাঁধন হঠাৎ তার চোখ বেঁধে এভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছে, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না।মনের ভেতর জমতে থাকা প্রশ্নগুলো আর সংবরণ করতে না পেরে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যায় রূপা। তার আগেই বাঁধনের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে,
” চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক, মাফিয়ার বা’চ্চা। প্রশ্ন করবি তো গালে চড়িয়ে দাঁত ফেলে দেবো। ”
হুমকির সুরে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে রূপার। ভয়ের চোটে আর কোনো কথা মুখে আনে না সে। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। মনে মনে শুধু অপেক্ষা করে দেখা যাক, এরপর কী হয়।অন্যদিকে একই সময়ে বৃষ্টিকেও নিয়ে এসে তার চোখ বেঁধে দেয় আকাশ। বৃষ্টি স্বভাবসুলভ বকবক শুরু করতে গেলেই দু-হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরে আকাশ। প্রতিবাদে ছটফট করতে থাকে বৃষ্টি। চোখ বাঁধা, মুখ বন্ধ কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছে না সে।অজানা আশঙ্কায় বুকের ভেতরটা ক্রমশ ভারী হয়ে আসে। ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে যায় শিরদাঁড়া বেয়ে। তবু আকাশের শক্ত হাতের মুঠো থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না বৃষ্টি।কিছুদূর নিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে একটি নির্দিষ্ট স্থানে এসে থামে আকাশ। জোর করে বৃষ্টিকে সেখানে দাঁড় করিয়ে দেয় সে। তারপর অপর দিক থেকে রূপাকেও নিয়ে এসে বৃষ্টির ঠিক সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দেয় বাঁধন।দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই রমণী তখনও অন্ধকারের আড়ালে। কেউই জানে না, পরমুহূর্তে তাদের চোখের সামনে কী অপেক্ষা করছে।
হঠাৎ একই সঙ্গে উচ্চারিত হয় আকাশ আর বাঁধনের কণ্ঠ,
” এখন চোখের কাপড় খুলো। ”
একসঙ্গে চোখের বাঁধন খুলে ফেলে রূপা আর বৃষ্টি।কাপড়ের আড়াল সরে যেতেই আচমকা মুখোমুখি হয়ে যায় দুজন। মুহূর্তেই যেন সময় থমকে দাঁড়ায়। একে অপরের মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে তারা। বিস্ময়ে স্থির হয়ে যায় আঁখিপল্লব, স্তব্ধ হয়ে আসে নিঃশ্বাস।সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না কেউ। এতদিনের বিচ্ছেদ, এতটা দূরত্ব পেরিয়ে প্রিয় মুখটি যে সত্যিই এই মুহূর্তে চোখের সামনে এই সত্যটুকু হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতেও যেন কয়েকটি মুহূর্ত লেগে যায়।নিস্তব্ধতার ভেতর কেটে যায় কয়েকটি সেকেন্ড।হঠাৎ একই সঙ্গে আনন্দে ফেটে পড়ে দুজনের কণ্ঠ।
” রূপা ”
” বৃষ্টি ”
পরক্ষণেই আর কোনো অপেক্ষা নয়। দুজনেই ছুটে যায় দুজনের পানে। পরস্পরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। দীর্ঘ বিচ্ছেদের সমস্ত হাহাকার, অগণিত অপেক্ষা আর জমে থাকা অভিমান যেন এক নিমিষেই গলে যায় সেই উষ্ণ আলিঙ্গনে।বৃষ্টির চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসে অশ্রুধারা। বন্ধুকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে আবেগে কাঁপা কণ্ঠে বলে,
” তোকে ভীষণ মিস করেছি, দোস্ত। ”
রূপার বুকও কান্নায় ভারী হয়ে আসে। বৃষ্টিকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসিক্ত হাসিতে বলে,
” আমিও তোকে ভীষণ মিস করেছি, দোস্ত। ”
কথা শেষ হওয়ার আগেই দুজনের বুকের ভেতর জমে থাকা আবেগ বাঁধ ভাঙে। পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে ঢুকরে কেঁদে ওঠে তারা। কতদিন পর এই স্পর্শ, কতদিন পর এতটা কাছে দাঁড়ানো সেই অনুভূতির তীব্রতায় কান্নাও যেন আনন্দের ভাষা হয়ে ওঠে।কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে নীরবে পুরো দৃশ্যটা দেখছে আকাশ। দুই বন্ধুর চোখের জল আর আনন্দমাখা মুখ দেখে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে তৃপ্তির মৃদু হাসি।
কিছুক্ষণ পর তাদের আবেগঘন মুহূর্তে মৃদু স্বরে বলে ওঠে,
” সারপ্রাইজটা কেমন লাগল? ”
কথাটা কানে যেতেই রূপার আলিঙ্গন ছেড়ে দেয় বৃষ্টি। চোখেমুখে তখন উচ্ছ্বাসের ঝিলিক। মুহূর্তের মধ্যে ছুটে যায় আকাশের দিকে।আকাশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই দু-হাত বাড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বৃষ্টি।হঠাৎ এমন কাণ্ডে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে যায় আকাশ। আর বৃষ্টি তখন আনন্দে আত্মহারা। চোখেমুখে কৃতজ্ঞতার দীপ্তি, কণ্ঠে উপচে পড়া আবেগ।
” থ্যাংক ইউ স্যার। আমার বেস্টির সঙ্গে দেখা করিয়ে দেওয়ার জন্য আপনাকে সত্যিই অনেক ধন্যবাদ। ওকে খুব মিস করছিলাম। ”
রসগোল্লার মতো গোল গোল হয়ে যায় রূপার চোখ। বিস্ময়ের ঘোরে যেন চোখের পলক ফেলতেও ভুলে যায় সে। বৃষ্টি যে আকাশকে এভাবে জড়িয়ে ধরেছে, দৃশ্যটা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না রূপা।কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় তার সমগ্র সত্তা। কাঁপতে থাকে অধরদ্বয়। দৃশ্যটার প্রতিবাদে কিংবা অবিশ্বাসের বিস্ময়ে কিছু একটা বলতে মুখ খোলে রূপা। সহসা এগিয়ে আসে বাঁধন। মুহূর্ত দেরি না করে পাঁচ আঙুল দিয়ে রূপার মুখ চেপে ধরে সে। রূপার বিস্ফারিত আঁখিতে কেবলই বিস্ময়।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইন একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। কেউ এদিকটায় আর তাকায় না। যে যার মতো নিজেদের নানান কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।ভাবখানা এমন এইমাত্র তারা এখানে কিছুই দেখেনি।বাঁধনও আকাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। তারপর বুড়ো আঙুল তুলে এমন ভঙ্গিতে ইশারা করে, যেন পুরো ব্যাপারটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। ঠোঁট নেড়ে বলে,
” কিছু দেখিনি, জাস্ট চিল। ”
কথা শেষ করেই আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ায় না বাঁধন। হঠাৎ করেই রূপাকে কোলে তুলে নেয়।ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই রূপা দেখতে পায়, তারা সেই জায়গা থেকে বেশ খানিকটা দূরে চলে এসেছে।বিস্ময়ে বড় হয়ে যায় রূপার চোখ। বাঁধনের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
” কী হলো? এভাবে কোলে করে আমাকে এখানে নিয়ে এলেন কেন? ”
রূপার প্রশ্ন শুনে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে তাকে মাটিতে নামিয়ে দেয় বাঁধন। তারপর ভ্রু কুঁচকে এমন এক দৃষ্টিতে তাকায়, যেন প্রশ্নটিই তার কাছে বিরক্তিকর। অতঃপর গম্ভীর মুখে বলে,
” তো কী করব? ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অন্য কারও রোমান্স দেখব? এডিয়ট ”
মুখের ভাবান্তর গোপন করতে ব্যর্থ হয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় রূপা। কিছুক্ষণ নীরব থেকে মনে জমে থাকা কৌতূহলটুকু আর চেপে রাখতে পারে না। অবশেষে বাঁধনের দিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করে,
” বৃষ্টি আকাশ ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরল কেন? ”
বাঁধনের ঠোঁটের কোণে খেলে যায় বাঁকা হাসি। রূপার প্রশ্ন শুনে গম্ভীর থাকার ভান করে বলে,
” তোর সঙ্গে দেখা করিয়ে দিয়েছে আকাশ , এই আনন্দেই জড়িয়ে ধরেছে। ”
একটু থেমে রূপার দিকে তাকায় বাঁধন। দৃষ্টিতে এবার দুষ্টুমির ঝিলিক।
” এখন বল, বৃষ্টি তো আকাশের পাওনা দিয়েই দিল। আমি যে তোকে এমন একটা সারপ্রাইজ দিলাম, তার বিনিময়ে আমাকে কী দিবি? ”
ভ্রুযুগল কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত করে বাঁধনের দিকে তাকায় রূপা। কথাটার মর্ম যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
” আমি কী দেব? ”
বাঁধন নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,
” কিছুই দিবি না আমাকে? ”
রূপা এবার খানিকটা বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকায় তার পানে। কণ্ঠে ফুটে ওঠে দ্বিধা আর কৌতূহল,
” কী চান আপনি? ”
বাঁধনের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে রহস্যময় হাসি। দৃষ্টিতে খেলে যায় দুষ্টু ঝিলিক।
” ডার্ক রোমান্স। ”
লজ্জায় কর্ণদ্বয় যেন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে রূপার। মুহূর্তেই লজ্জার রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ে গণ্ডদেশজুড়ে।
“ছিঃ, অসভ্য”
শব্দদ্বয় উচ্চারণ করেই সেখান থেকে সরে আসার জন্য ঘুরে দাঁড়ায় রূপা। কিন্তু এক পা এগোনোর আগেই তৎক্ষণাৎ তার হাতটি মুঠোয় আবদ্ধ করে টেনে নিজের বুকের কাছে আছড়ে ফেলে বাঁধন। আচমকা সেই টানে কেঁপে ওঠে রূপার সমস্ত দেহমন। পরক্ষণেই দুহাতে কোমর জড়িয়ে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয় বাঁধন।অপ্রত্যাশিত নৈকট্যে শিহরণের ঢেউ খেলে যায় সর্বাঙ্গে রূপার। হৃদস্পন্দন হয়ে ওঠে দুরন্ত, নিঃশ্বাসে জমে ওঠে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। কিছু বলার অভিপ্রায়ে ওষ্ঠদ্বয় মেলতেই বাঁধন তর্জনী তুলে আলতো করে চেপে ধরে তার অধর। নিমিষেই স্তব্ধ হয়ে যায় রূপার সমস্ত প্রতিবাদ।
ধীরে ধীরে মুখখানি ঝুঁকিয়ে রূপার কানের কাছে নিয়ে আসে বাঁধন। অধরের কোণে খেলে যায় মৃদু হাসি। কণ্ঠে নেমে আসে কোমলতার আবরণ, সেই কোমলতার অন্তরালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক দুর্নিবার আসক্তির ছায়া।অতি নরম মোহনীয় স্বরে বলে,
“তোকে দেখতে দেখতে দিন দিন অসভ্য হয়ে যাচ্ছি। নিজেকে কন্ট্রোল করাটাও যেন আরও বড্ড কঠিন হয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত নেশা বুঝি তোর মাঝেই সঞ্চিত। এত নেশা কেন তোর মাঝে? তোকে দেখলেই কেন জানি আমার সমস্ত সংযম মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। মনে হয়, তুই সামনে থাকলেই আমার সমস্ত বোধ-বুদ্ধি, সমস্ত নিয়ন্ত্রণ কোথায় যেন হারিয়ে যায়।”
বৃষ্টি তখনও আকাশকে জড়িয়ে ধরে আছে। আনন্দের আতিশয্যে মেয়েটি যেন তাকে ছেড়ে দিতেই ভুলে গেছে। চারপাশের পৃথিবীটাও যেন সেই মুহূর্তে থমকে দাঁড়িয়ে আছে, নিঃশব্দে সাক্ষী হয়ে আছে তাদের অপ্রত্যাশিত আনন্দের।
হঠাৎই বৃষ্টির মনে হয়, চারপাশটা কেমন যেন অস্বাভাবিক রকম নিস্তব্ধ। মুহূর্তেই যেন তার সমস্ত উচ্ছ্বাসের ঘোর কেটে যায়। নিজের কাণ্ডের কথা মনে পড়তেই সম্বিৎ ফিরে আসে তার। কী করে ফেলেছে এতক্ষণ। ভাবনাটুকুই যেন লজ্জায় তার প্রাণ ওষ্ঠাগত করে তোলে।তড়িঘড়ি আকাশকে ছেড়ে এক লাফে বেশ খানিকটা দূরে সরে যায় বৃষ্টি। বুকের ভেতর ধুকপুক করতে থাকে হৃদয়। সংকোচে চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকাতেই দেখে, ভ্রু কুঁচকে একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে মানুষটা।
লজ্জায় রক্তিম হয়ে ওঠে গণ্ডদেশদ্বয়। দৃষ্টি নত করে মাথাটা নিচু করে ফেলে। কণ্ঠেও জড়িয়ে যায় জড়তা। আমতা আমতা করে বলে,
“সরি স্যার… আসলে খুশিতে?”
বাক্যটি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই শান্ত কণ্ঠে বলে ওঠে আকাশ,
“ইট’স ওকে, বাট আই ওয়াজ অ্যাকচুয়ালি এনজয়িং ইট।”
কথাগুলো কানে পৌঁছাতেই ধীরে ধীরে মাথা তোলে বৃষ্টি। বিস্ময়াবিষ্ট চোখে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। যেন কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝে উঠতে পারছে না কিছুতেই।
“মানে?”
দু-হাত ধীর ভঙ্গিতে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নেয় আকাশ। মুখের কোণে ফুটে ওঠে অস্পষ্ট, রহস্যময় হাসি। তারপর সামান্য কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,
“কিছু না।”
রেস্টুরেন্টের প্রশস্ত কক্ষে একটি টেবিল ঘিরে বসে আছে সবাই। চারপাশে মানুষের মৃদু কোলাহল, থেমে থেমে ভেসে আসছে হাসির রেশ। অথচ সেসবের কোনো কিছুই যেন স্পর্শ করছে না রূপার মনকে। তার সমগ্র মনোযোগ নিবদ্ধ হয়ে আছে সামনের মানুষটির দিকে।বিস্ময়াবিষ্ট দৃষ্টিতে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে রূপা। চোখেমুখে এখনও কাটেনি অবিশ্বাসের ঘোর। সত্যিই বৃষ্টি কানাডায়।এত দূরের এক দেশ থেকে হঠাৎ এভাবে সামনে এসে বসবে, সেটা যেন এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না।রূপার অপলক দৃষ্টিটা ঠিকই লক্ষ করে বাঁধন। অধরের কোণে ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটিয়ে শান্ত স্বরে বলে,
“তাকানোর কিছু নেই। বৃষ্টি ওর বাবার সঙ্গে একেবারেই কানাডায় চলে এসেছে।”
কথাটা কানে যেতেই মনের ভেতরটা কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে আসে রূপার। একেবারেই কানাডায় চলে এসেছে। তাহলে কি আর বাংলাদেশে ফিরবে না বৃষ্টি?ভাবনাটা বুকের ভেতর অদৃশ্য এক বিষাদের জন্ম দেয়। এতক্ষণকার উচ্ছ্বাস কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। চুপচাপ ক্যান্ডির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আনমনে প্রশ্ন করে,
“বৃষ্টি কি তাহলে বাংলাদেশে যাবে না?”
প্রশ্নটা শুনে আড়চোখে আকাশের দিকে তাকায় বাঁধন। সেই দৃষ্টির ইঙ্গিত যেন বুঝে ফেলে আকাশ। অধরের কোণে চাপা এক হাসি খেলে যায়। কিছু না বলে নীরবে কফির কাপে চুমুক দেয় সে।অ্যান্সি অবশ্য নীরব থাকার মানুষ নয়। কথাটা শুনেই কফির কাপে চুমুক দিয়ে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
“কী বলছে যাবে না। বৃষ্টি না গেলে আকাশের বিয়ে কীভাবে হবে?”
কথাটা শুনে যেন মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যায় রূপা। সংবাদটি এতটাই আকস্মিক যে তার মস্তিষ্ক পর্যন্ত কয়েক সেকেন্ডের জন্য কথার অর্থ গ্রহণ করতে পারে না।আকাশের বিয়ে?চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে স্থির হয় আকাশের দিকে। বিস্ময় আর অবিশ্বাসে ভারী হয়ে আসে কণ্ঠস্বর।
“আকাশ ভাইয়ার বিয়ে মানে?”
অ্যান্সির মুখে তখনও বিন্দুমাত্র অস্বাভাবিকতা নেই। কফিতে আরেকবার চুমুক দিয়ে নির্বিকার স্বরে জানিয়ে দেয়,
“আকাশ বিয়ে করতে চলছে।”
কথাটা কানে যেতেই বৃষ্টির বুকের ভেতরটা যেন আচমকাই মোচড় দিয়ে ওঠে। পাঁজরের নিচে কোথাও অচেনা এক ব্যথা চিনচিন করে ছড়িয়ে পড়ে। আকাশের বিয়ের কথা শুনে কেন এতটা কষ্ট হচ্ছে, তার কোনো ব্যাখ্যাই খুঁজে পায় না সে। শুধু মনে হয়, বুকের ভেতরটা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে, শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে।ছলছল চোখে আকাশের দিকে তাকায় বৃষ্টি। অথচ মানুষটা সম্পূর্ণ নির্বিকার। যেন কিছুই ঘটেনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কফির কাপে চুমুক দিয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখেও কিছুতেই নিজের মনের অস্থিরতা সামলাতে পারে না সে।
মাথার ভেতর যেন একসঙ্গে অসংখ্য প্রশ্নের ভিড়। কেন এত কষ্ট হচ্ছে? কেন আকাশের বিয়ের কথা শুনে বুকটা এমন ভার হয়ে এলো? উত্তরহীন সেই প্রশ্নগুলোই আরও বেশি অস্থির করে তোলে তাকে।নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বৃষ্টি। কিন্তু অনুভূতির কাছে যুক্তি যেন বড়ই অসহায়। বুকের গভীরে জমে থাকা যন্ত্রণাটা কিছুতেই প্রশমিত হয় না। তবু নিজের দুর্বলতার বিন্দুমাত্র প্রকাশ ঘটাতে চায় না সে।নিজেকে খুশি দেখানোর জন্য যন্ত্রণার মাঝেই ফিক করে হেসে দেয় বৃষ্টি। হাসতে হাসতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
“কংগ্রাচুলেশন স্যার।”
এতটাই জোরে হাসতে থাকে বৃষ্টি যে মুহূর্তেই চারপাশের কথাবার্তা থেমে যায়। টেবিলে বসে থাকা সবাই একসঙ্গে ঘুরে তাকায় তার দিকে।কিন্তু বৃষ্টি থামে না। যেন হাসির আড়ালেই নিজের ভেতরের সমস্ত অস্বস্তি ঢেকে ফেলতে চাইছে। হাসতে হাসতেই একসময় পেছনের দেয়ালে মাথা ঠেকাতে যায় সে।
তৎক্ষণাৎ রূপা হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির মাথার পেছনে রেখে দেয়। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে,
“তুই ঠিক আছিস? এমন পাগলের মতো হাসছিস কেন?”
রূপার কথায় অবশেষে থামে বৃষ্টি। ঠোঁটে তখনও হাসির ক্ষীণ রেখা। নিজের অস্বস্তি আড়াল করে স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে বলে,
“আরে খুশিতে।আকাশ স্যার বিয়ে করতে চলছে, সেই খুশিতে।”
বৃষ্টির মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে বাঁধন। তার চোখেমুখে যেন সন্দেহের ছায়া। ভ্রু কুঁচকে সরাসরি প্রশ্ন করে,
“বৃষ্টি, আর ইউ ওকে?”
মুহূর্তেই মুখে আবার কৃত্রিম স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনে বৃষ্টি। মাথা নাড়িয়ে দ্রুত বলে,
“হ্যাঁ হ্যাঁ ভাইয়া, আই অ্যাম ওকে।”
বৃষ্টির কথাগুলো শেষ হতেই আকাশ কিছুক্ষণ নীরব থাকে। তারপর কফির কাপটি ধীরে টেবিলের ওপর নামিয়ে বৃষ্টির মুখাবয়বের দিকে দৃষ্টিপাত করে। কণ্ঠে অদৃশ্য এক কৌতূহল মিশিয়ে প্রশ্ন করে,
“আমি বিয়ে করলে তুমি খুব খুশি হবে, বৃষ্টি?”
প্রশ্নটা কর্ণগোচর হতেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে বৃষ্টির। ক্ষণিকের জন্য যেন থমকে যায় তার সমস্ত অনুভূতি। কিন্তু সেই অস্বস্তির লেশমাত্রও মুখের অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পেতে দেয় না সে। অধরের কোণে ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বরে বলে,
“কেন খুশি হবো না স্যার? খুব খুশি হবো।”
উত্তরটা দিতে গিয়ে বুকের গহিনে জমে থাকা ব্যথাটাকে আরও একবার গোপন করে বৃষ্টি। বৃষ্টির উত্তর শুনে আকাশের দৃষ্টিতে কৌতূহল আরও ঘনীভূত হয়। কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে পুনরায় প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
“আমার কার সঙ্গে বিয়ে, সেটা জানার চেষ্টা করবে না?”
প্রশ্নটা যেন বৃষ্টির অন্তর্লোকে আবারও অদৃশ্য এক আলোড়ন তোলে। তবু নিজের মনের সেই দুর্বলতাকে প্রকাশ্যে আসতে দেয় না সে। মুখের স্বাভাবিকতা অক্ষুণ্ণ রেখে হালকা হাসে।
“জানার কী আছে স্যার? আপনার বউ অবশ্যই একজন সুন্দরী হবে। এটা না জেনেও আন্দাজ করা যায়।”
বৃষ্টির কথায় মুখ টিপে মৃদু হাসে আকাশ। সেই হাসির আড়ালে যেন লুকিয়ে থাকে কোনো অজানা অনুভব। অতঃপর শান্ত স্বরে বলে,
“ঠিক বলেছো। সে সত্যিই সুন্দরী। এতটাই সুন্দর আর মায়াময় যে, তার মায়ায় আজ আমি অচিন দেশে।”
আকাশের প্রতিটি শব্দ বৃষ্টির হৃদয়পটে যেন ধারালো আঘাতের মতো এসে বিঁধতে থাকে। কথাগুলো যতবার কানে প্রতিধ্বনিত হয়, ততবারই বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে ওঠে। কেন জানি মনে হচ্ছে, আর এক মুহূর্তও নিজেকে সামলে রাখতে পারবে না সে।চোখের কোণে জমে ওঠে অশ্রুর চিকচিকে রেখা। কান্নাটা যেন কোনোভাবেই আটকে রাখতে পারছে না বৃষ্টি। আর একটু থাকলেই সবার সামনে কেঁদে ফেলবে সে। না, এখানে আর থাকা যাবে না। এই মুহূর্তে নিজের অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা তার পক্ষে অসম্ভব।
আচমকাই টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ায় বৃষ্টি। কণ্ঠে কাঁপন লুকিয়ে অনেক কষ্টে বলে,
“আপনারা থাকুন, আমি একটু আসছি।”
কথাটা শেষ করেই আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করে না। দ্রুত পায়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে যায় বৃষ্টি। বাইরে বেরিয়েই দৌড়াতে শুরু করে। একবারও পেছনে ফিরে তাকায় না। পা থামানোর কথা যেন মনেই আসে না তার।দৌড়াতে দৌড়াতে অবশেষে গাড়িতে উঠে বসে। তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা নিজেদের ফ্ল্যাটের উদ্দেশে রওনা হয়।
ফ্ল্যাটে পৌঁছে দ্রুত ভেতরে ঢোকে সে। লিভিং রুমের সোফায় বসে ফোনে কারও সঙ্গে আলাপ করছিলেন হায়দার শেখ। বৃষ্টিকে এভাবে হঠাৎ ঘরে ঢুকতে দেখে সঙ্গে সঙ্গেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে উঠে দাঁড়ান তিনি।
বৃষ্টির মুখের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন করেন,
“কী হয়েছে? এভাবে হুট করে বাসায় চলে এলি যে?”
মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিজের অস্থিরতা আড়াল করার চেষ্টা করে বৃষ্টি। ক্ষীণ স্বরে বলে,
“কিছু না বাবা।”
কথাটা বলেই নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতে নেয় সে। কিন্তু পেছন থেকে সঙ্গে সঙ্গেই হায়দার শেখের কণ্ঠ ভেসে আসে,
“দাঁড়া বৃষ্টি, কথা আছে তোর সাথে।”
পা-জোড়া থেমে যায় বৃষ্টির। কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে ঘুরে তাকায়। কণ্ঠে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে এনে বলে,
“বলো বাবা।”
হায়দার শেখ ধীর পায়ে এগিয়ে আসেন। কাছে এসে স্নেহভরে বৃষ্টির মাথায় হাত রাখেন। কণ্ঠে এবার মিশে যায় এক ধরনের গাম্ভীর্য।
“তোর কাছে আমার কিছু চাওয়ার আছে। দিবি আমায়?”
বৃষ্টির কণ্ঠে ক্ষীণ কাঁপন জেগে ওঠে। বাবার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করে,
” বলো বাবা, কী চাও তুমি? ”
হায়দার শেখ কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থাকেন মেয়ের মুখাবয়বের দিকে। তাঁর দৃষ্টিতে এক ধরনের স্থিরতা। তারপর গভীর স্বরে বলেন,
“আমি তোর বিয়ে ঠিক করেছি। ছেলেটা খুব ভালো। আমার নিজেরও বেশ পছন্দ হয়েছে তাকে। আমার বিশ্বাস, সে তোকে খুব সুখে রাখবে। আশা করি, আমার এই সিদ্ধান্তে তুই কোনো আপত্তি করবি না। ”
বাক্যগুলো শ্রবণেন্দ্রিয় স্পর্শ করতেই সহসা থমকে যায় বৃষ্টি।
মনে হয়, মুহূর্তের মধ্যে পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে তার।
আকাশ থেকে যেন বজ্রাঘাত হয়ে নেমে আসে বাবার কথাগুলো।
ধক করে ওঠে হৃদয়। বুকের গহিনে তীব্র এক হাহাকার জেগে ওঠে। কিছুক্ষণ আগেও যে হৃদয় অন্য এক যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত, সেই হৃদয়েই যেন আবার নতুন করে বিষাদের ছুরি বসে।বাবা তার বিয়ে ঠিক করেছেন। ভাবনাটুকুই বৃষ্টির সমস্ত সত্তাকে বিমূঢ় করে দেয়।চোখের পাতা স্থির হয়ে যায়। অধর কিঞ্চিৎ ফাঁক হয়ে থাকে। কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না সে। যেন কণ্ঠস্বরও আচমকা রুদ্ধ হয়ে আসে।নিথর, নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বৃষ্টি।আঁখিপল্লবের নিচে টলমল করতে থাকে অশ্রু। সেই অশ্রুবিন্দুগুলোকে দৃষ্টির আড়ালে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে সে। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা ব্যথা ক্রমেই সংযমের বাঁধ ভাঙার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।মেয়ের এমন স্তব্ধতা দেখে ভ্রুযুগল কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত হয় হায়দার শেখের। পুনরায় প্রশ্ন করেন তিনি,
” কী হলো? চুপ করে আছিস কেন? উত্তর দে। ”
অবনত হয়ে আসে বৃষ্টির মুখ।চোখের সামনে সবকিছু কেমন আবছা হয়ে আসে। বুকের ভেতরটা যন্ত্রণাদগ্ধ হয়ে ওঠে। মনে হয়, হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনের সঙ্গে সঙ্গে কেউ যেন নিঃশব্দে তার সমস্ত স্বপ্নকে চূর্ণ করে দিচ্ছে।তবু বাবার সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ইচ্ছের কথা বলার সাহস হয় না তার।চোখ দুটো মুদে নেয় বৃষ্টি। বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটাকে কোনো রকমে গিলে ফেলে। অশ্রুসিক্ত আঁখিপাত আড়াল করে নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করে।
তারপর অত্যন্ত কষ্টে, রুদ্ধ কণ্ঠে বলে,
” তুমি যা ভালো মনে করো, বাবা, তাই করো। তোমার সিদ্ধান্তের ওপর আমার কোনো আপত্তি নেই। তুমি যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই আমার সিদ্ধান্ত। ”
মেয়ের মুখ থেকে কথাগুলো শুনে স্বস্তির ছায়া নেমে আসে হায়দার শেখের মুখাবয়বে। চোখেমুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির আভা।স্নেহভরে মেয়ের মাথায় হাত রাখেন তিনি। তারপর বৃষ্টির কপালে আলতো করে চুমু এঁকে মৃদু হেসে বলেন,
” আমার লক্ষ্মী মেয়ে। এবার কাপড়চোপড় গুছিয়ে নে। আমরা বাংলাদেশে ফিরছি। রাত আটটায় আমাদের ফ্লাইট। ”
সকাল ১০টা।
সকাল গড়িয়ে প্রখর হয়ে উঠছে রোদের আভা। বাইরে ব্যস্ততা শুরু হলেও বাড়ির লিভিং রুমজুড়ে বিরাজ করছে এক অস্বস্তিকর নীরবতা।গম্ভীর মুখে লিভিং রুমের সোফায় বসে আছে ইশতিয়াক। মুখাবয়বে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা, দৃষ্টিতে একরাশ অস্থিরতা। তার সামনের সোফায় গালে হাত রেখে চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে আছেন ইশতিয়াকের মা, বিলকিস বানু। আশপাশে সীমার বাবা, মা ও দাদিও নীরব মুখে বসে আছেন। প্রত্যেকের মুখেই দুশ্চিন্তার স্পষ্ট ছাপ।কারণ একটাই।ইশতিয়াক সীমাকে সঙ্গে করে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু সীমা কিছুতেই যেতে রাজি নয়। অভিমানে নিজের ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে বসে আছে সে। বাড়ির যে-ই তাকে বোঝাতে যাচ্ছে, দরজার ওপাশ থেকে একই কথা ভেসে আসছে,
” ইশতিয়াককে চলে যেতে বলো তোমরা। আমি যাব না। ”
বারবার ডেকেও সীমাকে ঘর থেকে বের করতে পারছে না কেউ। নিজের সিদ্ধান্তে অনড় হয়ে আছে সে।এদিকে ইশতিয়াকও জেদ ধরে বসে আছে। বউকে ছাড়া সে বাড়ি ফিরবে না। সীমাকে সঙ্গে নিয়েই বাড়ি ফিরবে। এই একগুঁয়ে সিদ্ধান্তেই স্থির হয়ে বসে আছে সে।ছেলের এমন হঠাৎ বউ-পাগল আচরণে বিরক্তির ছাপ ফুটে ওঠে বিলকিস বানুর মুখাবয়বে। এতদিনের ঘটনাগুলো যেন একে একে মনে পড়ে যায় তাঁর। অবশেষে আর নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,
” এখন বউ বউ করছিস কেন? যখন দিনের পর দিন মেয়েটার ওপর অত্যাচার করেছিস, তখন কি বউয়ের কথা মনে ছিল না?”
মায়ের মুখ থেকে কথাগুলো শুনতেই কিঞ্চিৎ থমকে যায় ইশতিয়াক।মুহূর্তেই নরম হয়ে আসে তার কঠিন মুখাবয়ব। দৃষ্টি অবনত হয়। অনুশোচনার ভার যেন এক নিমেষে সমস্ত অহংকারকে ম্লান করে দেয়।সহসাই সোফা থেকে উঠে মায়ের কাছে গিয়ে তাঁর পা দুটো আঁকড়ে ধরে ইশতিয়াক। কণ্ঠস্বর কেঁপে ওঠে তার। ব্যাকুল স্বরে বলে,
” ও মা, আমি ভুল করেছি। অনেক বড় ভুল করেছি। এর জন্য তুমি আর তোমার বউমা আমাকে যে শাস্তিই দাও, আমি মাথা পেতে নেব। তোমরা যে শাস্তি দেবে, আমি হাসিমুখে মেনে নেব। তবুও আমার বউটাকে একটু বোঝাও, মা। আমি সত্যিই ওকে ছাড়া থাকতে পারব না। ”
বিলকিস বানু মুখ ফিরিয়ে নেন অন্যদিকে। অধরে কোনো শব্দ ফুটে ওঠে না। তাঁর নীরবতাই যেন সমস্ত কথার উত্তর হয়ে দাঁড়ায়।মায়ের এমন নিশ্চুপতায় মুহূর্তেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে ইশতিয়াক। আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে মায়ের পা-জোড়া। কণ্ঠে ফুটে ওঠে শিশুসুলভ আকুলতা। অনেকটা ছোট্ট শিশুর মতো অনুনয়ের সুরে বলে,
” ও মা, বলছি তো, আমি ভুল করেছি। আমাকে মাফ করে দাও। আর জীবনে এমন ভুল কখনো করব না। প্লিজ, আমার বউটাকে এনে দাও। নাহলে কিন্তু আমি দরজা ভেঙে ওকে তুলে নিয়ে যাব। ”
ছেলের এমন বেপরোয়া কথায় বিলকিস বানু এবার মুখ ফেরান। ভ্রুযুগল কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত হয়। গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,
” বুকের পাটা থাকলে নিয়ে যা দেখি, কেমন পারিস”
মায়ের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া কণ্ঠ শুনে চকিতে মাথা তোলে ইশতিয়াক। চোখেমুখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে ওঠে তার।
” তুমি কি আমাকে চ্যালেঞ্জ করছ, মা? ”
বিলকিস বানুর মুখাবয়বে বিন্দুমাত্র ভাবান্তর ঘটে না। দৃঢ় স্বরে বলেন,
” চ্যালেঞ্জ করছি না। তোর সাহসটা দেখতে চাইছি। ”
কথাটা কানে যেতেই আর এক মুহূর্তও স্থির হয়ে বসে থাকে না ইশতিয়াক।তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ায়।চোখে-মুখে ফুটে ওঠে একরাশ জেদ। দৃপ্ত পদক্ষেপে সীমার ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,
” দেখো আমার সাহস। ”
কথাটা বলেই সীমার ঘরের দরজার সামনে এসে থামে ইশতিয়াক।এক মুহূর্তও দ্বিধা করে না।কোনো শব্দ ব্যয় না করে হঠাৎ সজোরে পা বাড়িয়ে দরজায় লাথি বসায় সে। ধড়াম।প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। দরজার খিল খুলে যায় মুহূর্তেই।দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে ইশতিয়াক।ঘরের এক কোণে বিছানার ওপর গুটিসুটি মেরে বসে ছিল সীমা। দরজা ভেঙে ইশতিয়াককে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখে চকিতে উঠে দাঁড়ায় সে।ভীত-সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে দু-পা পিছিয়ে যায় । কণ্ঠে ফুটে ওঠে অভিমান আর বিরক্তির মিশেল।
” কেন এসেছেন? চলে যান। আমি আপনার সঙ্গে যাব না। ”
এখানেও আর একটি বাক্য উচ্চারণ করে না ইশতিয়াক। সহসাই যেন দুরন্ত ঝড়ের বেগে এগিয়ে আসে সে। মুহূর্তের মধ্যেই এক ঝটকায় সীমাকে কাঁধে তুলে নেয়।আকস্মিকতায় সম্পূর্ণ হকচকিয়ে যায় সীমা। বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে ওঠে তার আঁখিপল্লব। নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই ছটফট করতে শুরু করে সে। চার হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে ইশতিয়াকের পিঠে ধুমধাম করে কিল-ঘুষি দিতে থাকে । কণ্ঠে ফুটে ওঠে ক্ষোভ, উৎকণ্ঠা আর অসহায় ব্যাকুলতা।
” কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? নামান বলছি। ভালো হবে না কিন্তু। ”
সীমার আকুল আর্তিতে বিন্দুমাত্র ভাবান্তর আসে না ইশতিয়াকের মুখাবয়বে। কোনো জবাবও দেয় না সে। নীরব, দৃঢ় পদক্ষেপে কাঁধে সীমাকে নিয়েই সবার সামনে দিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যায়।ইশতিয়াকের এমন দুঃসাহসিক কাণ্ডে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যান বিলকিস বানু। তাঁর মুখাবয়বে জমাট বাঁধে বিস্ময়। তিনি ভেবেছিলেন, তার ছেলে হয়তো সত্যিই এমন কিছু করবে না। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কোনোভাবে সীমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। কিন্তু ইশতিয়াক যে সত্যিই তাঁর ধারণার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে এমন কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি তিনি।
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪৬
কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে ছেলের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন বিলকিস বানু। তাঁর ভ্রুযুগল কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত, মুখে স্পষ্ট বিস্ময়ের ছাপ।পাশেই বসে থাকা সীমার দাদি অবশ্য পুরো ঘটনাটিকে বেশ উপভোগের দৃষ্টিতেই দেখেন। মুখে পান চিবুতে চিবুতে ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি। তারপর বিলকিস বানুর দিকে তাকিয়ে গর্বভরা কণ্ঠে বলে ওঠেন,
” দেখ বিলকিস, আমার নাতির সাহস। এই না হলো আমার নাতি। ”
