Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৮

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৮

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৮
রানী আমিনা

দুপুরে খাবার সময় রাজমহলে এসে উপস্থিত হলো আরসালান আর জিবরান। বাবার অনুপস্থিতিতে সাম্রাজ্যের ভার ওদের ওপর। একবার শিরো মিদোরি তো আরেকবার কুরো আহমার করেই কেটেছে ওদের গত দেড় দু মাস৷ বাবা মা’কে ছেড়ে যেতে রাজি হননি, যাবতীয় দায়িত্ব ওদের দুজনের ওপর ন্যাস্ত করে দিয়েছেন; কখনো কোনো আলোচনা, কোনো সিদ্ধান্ত, কোনো আদেশের প্রয়োজন হলে দিয়েছেন, কিন্তু ডাস্কমায়ার ছেড়ে যাননি৷
রাজমহলের বিরাট ডাইনিং হলে চেয়ার টেনে বসলো ওরা দুজন। কাসওয়ারের হাতে বই, চোখে চশমা। খেতে খেতেও বইয়ের দিকেই দৃষ্টি তার৷ আরসালান কাসওয়ারের পাশে বসলো, চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“আম্মার জ্ঞান ফিরেছে শুনলাম, কখন?”
“গত রাতে, এক্স্যাক্টলি কখন সেটা বলতে পারিনা।”
“আম্মা কেমন আছেন এখন? তোদের সাথে দেখা হয়েছে?”
“উহুম, আমার সাথে হয়নি, সাইয়্যিদ দেখেছে আম্মাকে, ভোরে। আম্মা ভালো আছেন, এখন ঘুমোচ্ছেন। আমরা কেউ দেখা করতে পারিনি, বাবা বলেছেন পরে দেখা করতে। আম্মার এখনো অল্প স্বল্প মাথা ব্যাথা হচ্ছে, হেকিম আরেকটু বিশ্রাম নিতে বলেছেন।”
বই থেকে মুখ না তুলেই এক নাগাড়ে কথা গুলো বলে গেলো কাসওয়ার৷
“ওদের দুজনের একটা ব্যাবস্থা করা দরকার৷”
মুখের ভেতর একটা আস্ত নান রুটি চেপে চেপে পুরতে পুরতে বলল ফিরাস। সাইয়্যিদ পাশ থেকে ওকে একটা চাটি মেরে বলে উঠলো,
“আস্তে খেতে পারিস না? গরুর মতো সব একবারে খেতে চাস!”
“তাতে তোর কি সমস্যা? আমি সব একবারে খাব। তোর ইচ্ছে হলে তুইও খা৷”
মিশআল ওদের ঝগড়ায় বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,
“কোনো একদিন কি একটু শান্তিতে খেতে পারবনা তোদের জন্য?”
“শান্তি চাইলে জঙ্গলে চলে যা। ল্যাংটা হয়েও থাকতে পারবি৷”
বলেই মুখে আরেকটা নান রুটি পুরে দিল ফিরাস। আরসালান পাশ থেকে ফোড়ন কেটে বলল,

“তুই তো জঙ্গলেই থাকিস, ল্যাংটা হয়েই থাকিস নাকি? এই কারণেই বলি, এই নোরা বিল্লু সবসময় তোর কোলে কেন বসতে চায়। এতদিনে আসল রহস্য ভেদ হলো।”
“আমার তোদের মত ল্যাংটা হওয়া লাগেনা, আমার চেহারা দেখেই অর্ধেক জঙ্গল ফিদা হয়ে যায়৷”
“জঙ্গল বলেই সম্ভব হয়েছে, কোনো সভ্য সমাজের মানুষ তোকে পছন্দ করবে বলে আমার মনে হয়না৷”
“হ্যাঁ, আমাকে কেন করবে? তোমার মতো দাবার বোর্ডকে পছন্দ করবে। সাদা কালা দুই ফ্লেভার।”
“এই তোরা থামবি?”
ধমকে বলে উঠলো মিশআল। ওর ধমকে চুপ হলো দুজনেই। ফিরাস একটা ভেড়ার রান মুখে পুরে চিবোতে শুরু করলো তৎক্ষনাৎ। সাইয়্যিদ আরেকবার ওকে আস্তে খেতে পরামর্শ দিলো, কিন্তু ফিরাস ওর পরামর্শকে সম্পুর্ন অগ্রাহ্য করে দ্বিগুণ জোরে খেতে রইলো। মিশআল তখন শুধোলো,
“তুই তখন কি বলছিলি, কাদের ব্যাবস্থা করতে হবে?”
“আম্মা আর বাবার৷”
“কি ব্যাবস্থা?”

“সকালে সাইয়্যিদ যখন আম্মাকে দেখেছে ওপর তলার বারান্দায়, আম্মা তখন নাকি হেটে কোথাও যাচ্ছিলো, অন্য দিক থেকে বাবা আসছিলো। বাবাকে দেখামাত্রই আম্মা নাকি পেছন ফিরে দৌড় দিয়েছে৷”
“কেন?”
“আমি কি করে জানবো? সাইয়্যিদকে জিজ্ঞেস কর৷”
সকলে এতক্ষণ ফিরাসের দিকে চেয়েছিলো, এবার সাইয়্যিদের দিকে তাকালো। সাইয়্যিদ অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
“আরে… আমি শুধু অতটুকুই দেখেছি। কেন সেটা আমি কিভাবে জানবো? তবে আম্মাকে দেখে মনে হলো বাবার সামনে পড়তে চাননা, মানে বাবাকে একদম এড়িয়ে গেলেন। বাবা যদিও দেখতে পেয়েছিলেন বলেই মনে হলো, কিন্তু উনি এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিলেন না, বেরিয়ে গেলেন।”
“বাবার মুখের ভাব কেমন ছিলো? ভালো? মানে গুড মুড?”
“মনে নেই, ভাই। আর তখন অত ভালোভাবে দেখাও যাচ্ছিলো না, আমি কি অত খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেছি নাকি?”
ফিরাস তখন এক ঢোকে সব খাবার গিলে বলে উঠলো,
“আমি বলছি, আমার ধারণা আম্মা বাবাকে ভয় পান। বাবা সবসময় যেমন ডাইনোসরের মত মুখ করে থাকেন তাতে যে কেউ ভয় পাবে৷ এদের দুজনকে একসাথে আঁটকানো উচিত, যাতে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।”
“এক সাথে আঁটকালে সমস্যার সমাধান কিভাবে হবে?”
চশমার ফাঁক দিয়ে ভ্রুতে ভাজ ফেলে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো কাসওয়ার।
ফিরাস নাকের পাটা ফুলিয়ে তাকালো ওর দিকে। বাঁজখাই গলায় বলে উঠলো,

“তুই শুধু পড়াশোনাই কর!”
“সিরিয়াসলি ভাই! বল, একসাথে আঁটকে রাখলে তো সমস্যা আরও বাড়বে! ঝগড়া বেশি হবে।”
মিশআল পাত্তা দিলনা ওর কথা, জিজ্ঞেস করলো,
“কিন্তু সেটা কিভাবে? আম্মা তো বাবার ধারে কাছেও আসতে চাইছেননা দেখি!”
“কিছু একটা করতে হবে।”
আরসালান জুসের স্ট্রতে চুমুক দিতে দিতে একবার মিশআল, আরেকবার ফিরাসের দিকে তাকিয়ে মনোযোগী হয়ে শুনছিলো। কৌতুহলের স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“কি করতে চাস?”
“যা-ই করতে চাই তোদের হেল্প লাগবে।”
“কিন্তু কাজটা কি?”
“এমন কিছু করতে হবে যাতে বাবা স্বেচ্ছায়, বা বাধ্য হয়ে আম্মার কাছে চলে আসে। তারপর একটা ট্র‍্যাপে ফেলা যাবে৷”
সাইয়্যিদ পাশ থেকে গলা খাকারি দিয়ে ইতস্তত স্বরে বলে উঠলো,

“ভাই তোরা কিসব আলোচনা করছিস? বাবা-মা হন তারা আমাদের! আমার নিজেরই লজ্জা লাগছে, আর তোরা এমন সিরিয়াস মুখে, এত সহজে এসব কথা বলে চলেছিস!”
আরসালান স্ট্র থেকে মুখ উঠিয়ে ওর দিকে ফিরে বললো,
“এখানে লজ্জা না পাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে, আপনি রিমাইন্ডার না দিলে খুশি হব৷”
সাইয়্যিদ এক হাত কপালে ঠেকিয়ে চোখ আড়াল করলো যেন অন্যদের সাথে ওর দৃষ্টি মেলানোর প্রয়োজন না হয়৷ কাসওয়ার ব্যাপারটা বোঝার জন্য দ্বিধান্বিত চোখে সবার মুখের দিকে একবার করে তাকালো, কিন্তু কেউ ওকে পাত্তা দিল বলে মনে হলোনা৷ অধৈর্য হয়ে শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করলো,
“কিন্তু এখানে লজ্জা পাওয়ার কি আছে? একসাথে আঁটকালে তো আম্মা আরও ভয় পাবে! তখন কি হবে? লজ্জা না পেয়ে তো আমাদের টেনশন করা উচিত৷”
“তুই একটা কথাও বলবিনা, কাসওয়ার! লাস্ট ওয়ার্নিং!”
মাত্র খাওয়া রানের হাড্ডীটা অস্ত্রের মতো উচিয়ে হুমকির স্বরে বলল জিবরান।
ফিরাস হঠাৎ উঠে পড়লো, হাতের মুঠোয় দুই তিনটে নান নিয়ে তার ভেতর ভেড়ার রানের মাংস পুরে রোল করে নিয়ে বলে উঠলো,
“আমি একটু জঙ্গলে গেলাম, তোরা অপেক্ষা কর। ফিরে এসে বাকি প্লান বলবো।”

খাস কামরায় ফুল ভিউ মিররের সম্মুখে দাঁড়িয়ে নিজের সফেদ, রেশমি চুলের বেণী খুলছে আনাবিয়া। ক্ষণে ক্ষণে আয়নায় দেখছে নিজেকে। গলাতে মীরের গতরাতের উত্তাল আদরের চিহ্ন জ্বলজ্বল করছে এখনো। মন, মস্তিষ্ক হাজার বিদ্রোহ করলেও শরীরটা পেরে ওঠেনা মীরের ওই পাগলাটে স্পর্শের সাথে। রাতের কথা ভাবতেই গালটা আচমকা রাঙা হয়ে এলো আনাবিয়ার। আয়নাতে নিজের দিকে তাকানোও দুষ্কর হয়ে উঠলো যেন, একই সাথে ভয়ানক মেজাজ খারাপ হলো মীরের ওপর।
সারাদিন ঘুমিয়ে কাটিয়েছে, মাঝখানে একবার খাসবাদী এসে ঘুম থেকে তুলে খাবার খাইয়েছে ওকে, তারপর আবার ঘুম৷ গোসলটাও হয়নি এখনো৷ বিগত দেড়টা মাস নাকি সে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই কাটিয়েছে, অথচ এখনো চোখে ঘুমের কমতি নেই। ইচ্ছে করলে এখন থেকে আগামী কাল সকাল পর্যন্ত সে একটানা ঘুমোতে পারবে৷
দরজায় নক পড়লো এমন সময়ে। আনাবিয়া দ্রুত ওয়ারড্রব থেকে একটা স্কার্ফ বের করে ঢেকে নিলো নিজের গলা, পিঠ। আগন্তুকের উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠলো,

“এসো!”
দরজা ঠেলে ভেতরে এলো আরসালান৷ আনাবিয়া ওকে দেখা মাত্রই ছুটে গেলো, দুহাতে জড়িয়ে নিলো ছেলেকে। আরসালান নিজেও সজোরে মা’কে চেপে ধরলো বুকে। ছেলে নিজের থেকেও লম্বা হয়ে গেছে দেখে আনাবিয়ার মুখে হাসি ধরলো না৷ আরসালান স্নেহের স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“আম্মা, কেমন আছেন আপনি? আপনার শরীর কেমন লাগছে এখন?”
“অন্নেএএএক ভালো! তুমি একা এসেছো? ওরা কোথায়? ওরা আসেনি?”
“ওরাও আছে আম্মা, আমি আর জিবরান ছাড়া সকলে এখানেই ছিলো, আপনার সাথে৷ আমরা শুধু ছোটাছুটি করছি, একবার এখানে আরেকবার ওখানে।”
“বাবা খুব খাটাচ্ছে?”
ঠোঁট উল্টে আদুরে ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো আনাবিয়া। আরসালান হেসে ফেললো তাতে, আনাবিয়ার চোয়ালে চুমু খেলো সশব্দে৷ জিজ্ঞেস করলো,
“কি করছিলেন আপনি?”
“এইতো, গোসল দিব।”

আনাবিয়া আবারও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বেণী খুলতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। আরসালান এসে দখল করে নিলো ওর সফেদ চুল। নিজ হাতে বেণী খুলে দিতে দিতে বলে উঠলো,
“আম্মা, আপনার চুল গুলো অনেক সুন্দর। অনেক অনেক৷”
আনাবিয়া রিনরিনে শব্দে হেসে উঠলো তাতে। ছেলের মাথার চুল গুলো আদুরে ভঙ্গিতে এলোমেলো করে দিল একবার৷ বেণী খোলা শেষে মায়ের চুলে চিরুনী চালাতে চালাতে আরসালান জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি কি কখনো চুল কেটে ফেলেছিলেন আম্মা?”
“হ্যাঁ, কেটেছিলাম একবার। কিন্তু সেটা তো অনেক আগে, তোমাদের জন্মেরও। কেন?”
“বাবার কামরায় আপনার চুলের মতোই চুল দেখেছিলাম একবার। বাবা সিন্দুকে ভরে রেখেছেন৷ বাবা সিন্দুকে কেন এক গোছা হোয়াইট হেয়ার এত সুন্দর বেণী করে তুলে রেখেছেন তখন মাথায় আসেনি। এখন ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো।”
আনাবিয়া বিস্মিত হয়ে তাকালো ওর দিকে, দ্বিধান্বিত গলায় বলে উঠলো,
“কিন্তু আমি তো আমার সব চুল জানালা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলাম, অত উঁচু থেকে ফেললে তো সারা জঙ্গলে ছড়িয়ে যাওয়ার কথা!”

আরসালান নিজেও বিস্মিত হলো শুনে, পরক্ষণেই ঠোঁট উল্টিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো সে। আনাবিয়া লজ্জা পেলো তাতে, গলা খাকারি দিয়ে লেগে পড়লো নিজের শরীরে ভরা ছোট ছোট গহনা গুলো খুলতে৷ গহনা গুলো সে নিজে পরেনি, অ্যাক্সিডেন্টের সময়েও কানে দুজোড়া হীরের ছোট্ট দুল ছাড়া কিছুই ছিলনা। কিন্তু গররাতে ঘুম থেকে উঠে এগুলো নিজের শরীরেই দেখেছে সে। এসব যে মীরের কাজ বুঝতে বাকি নেই ওর৷ তখনি কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই কামরায় হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লো ফিরাস, ওর পেছন পেছন অন্যরাও।
ফিরাস এসে আনাবিয়ার ওপর হামলে পড়লো এক প্রকার৷ দুহাতে মাকে জড়িয়ে নিয়ে চুমুতে ভরিয়ে দিল। আনাবিয়া অতিষ্ঠ হয়ে গেলো ছেলের পাগলাটে আদরে৷ নাক মুখ কুচকে অস্থির স্বরে বলে উঠলো,
“উহ্‌, ফিরাস! ছাড়ো আমাকে, আমার পাজরে ব্যাথা!”
ফিরাস ছেড়ে দিল ওকে তৎক্ষনাৎ। আনাবিয়া হাতের আংটি টা খুলতে উদ্যত হলে ফিরাস নিজেই খুলে দিলো। সম্মুখে ধরে বলে উঠলো,

“আম্মা, এত সুন্দর আংটি আপনি কোথায় পেয়েছেন?”
আনাবিয়া আংটিটা দেখলো একবার৷ মীরের স্মৃতি হারানোর পর বেস্ট শেফ এর খেতাবে ভূষিত করার সময় এই আংটিটাই উপহার দিয়েছিলো ওকে। আনাবিয়া মিষ্টি হেস বলে উঠলো,
“তোমাদের বাবা দিয়েছিলেন, রান্নায় খুশি হয়ে৷”
“আপনি রান্না করতে জানেন আম্মা?”
আনাবিয়া হঠাৎ থমকালো। আজ পর্যন্ত ওর রান্না খাবার খাওয়ার সুযোগ হয়নি ওর ছেলেদের। ওর ছেলেরা জানেইনা সে রান্নাও পারে, যে রান্না খেয়ে ওদের বাবার মন ভরে যেত! আচমকা ভীষণ দুঃখবোধ হলো ওর, মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেলো, সেখানে ভর করলো তীব্র অবসাদ।
ফিরাস মা’কে এভাবে মিইয়ে যেতে দেখে শঙ্কিত স্বরে বলে উঠলো,
“আম্মা! আপনি ঠিক আছেন? আমি কি আপনার মন খারাপ করার মত কিছু বলে ফেলেছি?”
আনাবিয়া মাথা নাড়ালো দুদিকে। মিশআল চিন্তিত হয়ে শুধোলো,
“আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে আম্মা? হেকিমকে খবর দিব?”
আনাবিয়া মৃদু হেসে ওর গালে আদর করে দিয়ে বলে উঠলো,
“কোনো প্রয়োজন নেই, আমি একদম ঠিক আছি।”

ওদের কথার মাঝেই ফিরাস আরসালানকে ইশারায় বলল কিছু৷ আরসালান সহ সকলে মিলে অকস্মাৎ বিরক্ত করতে শুরু করলো মা’কে। মায়ের গহনা গুলো একটা একটা করে খুলে, চুল গুলো আরেকবার আঁচড়ে দিয়ে আনাবিয়ার গাল টিপে, চুমু খেয়ে অস্থির করে তুললো। ফিরাস সটকে পড়লো সেখান থেকে। ক্ষণিক পরেই উদয় হলো আবার। ফিরেই সবাইকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে মায়ের থেকে ছাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে উঠলো,
“আম্মা, আপনার গোসল শেষ হলে সবাই মিলে ঘুরতে যাব। বাবার থেকে পার্মিশন নিতে যাই।”
“আচ্ছা, যাও!”

হাসিমুখে বলল আনাবিয়া। বাচ্চারা বেরিয়ে গেলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেন! ভালোই হয়েছে ও এই বিচ্চু গুলোর সাথে থাকেনি, নইলে রোজ আদরের নামে এমন মিষ্টি অত্যাচার চালাতো ওর ওপর৷ এই পাঁজি গুলোকে মীর একা কিভাবে সামলেছে এতদিন ভেবে কূল পেলোনা। গোসলের প্রস্তুতি নিয়ে ঢুকলো হাম্মামে৷
ক্ষণিক পরেই ভেসে এলো আনাবিয়ার তারস্বরে চিৎকার। তার এক চিৎকারেই সচকিত হয়ে উঠলো সম্পুর্ন রাজমহল! মীর পড়ি কি মরি করে ছুটে এলো কামরায় তৎক্ষনাৎ, আনাবিয়া কোথায় আছে খুঁজতে খুঁজতে আতঙ্কিত স্বরে বলে উঠলো,
“এই কি হয়েছে? তুমি কোথায়? তোমাকে খুঁজে পাচ্ছিনা কেন?”
বলতে বলতে হাম্মামের ভেতর ঢুকে পড়লো মীর। হাম্মামের ভেতর রাখা ড্রেসিং টেবিলের ওপরে উঠে স্পাইডারম্যান ভঙ্গিতে দেয়াল জাপটে ধরে সিঁটিয়ে আছে আনাবিয়া। আতঙ্কিত চোখ ওর মেঝের দিকে৷
মীরের হাসি পেলো, কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে আনাবিয়ার কাছে গিয়ে ওকে কোলে তুলে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলো,

“ভূত দেখেছো? এভাবে কেউ চিৎকার করে? আরেকটু হলে আমাকে হার্ট অ্যাটাক দিয়ে দিচ্ছিলে!”
“বিছাপোকা!”
আর্তনাদের স্বরে বলে উঠলো আনাবিয়া। মীর মেঝেতে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“কই বিছাপোকা, কিছুই তো দেখিনা! আর এখানে বিছাপোকা আসবে কই থেকে? তুমি ভুলভাল দেখেছো!”
“আমি চশমা পরতে পারি কিন্তু কানা নই! আমি স্পষ্ট দেখেছি, এত্ত বড়! আমি এখানে আর এক মুহুর্ত থাকব না! অসম্ভব! আমাকে নিয়ে চলো এখুনি!”
“গোসল দিবে না?”
“না৷ কিভাবে দেব? ও যদি আমার গায়ে উঠে!”
“এখানে কিছুই নেই শিনজো!”
“আছে! বলছি বিশ্বাস করছো না কেন?”
“আচ্ছা, দেখছি আমি।”

মীর ওকে নামিয়ে দিতে গেলো কোল থেকে। কিন্তু আনাবিয়া দুহাতে আষ্টেপৃষ্টে ওকে জড়িয়ে ধরে দুই পা দিয়ে মীরের কোমর শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সজোরে মাথা নাড়ালো দুদিকে। কোনো মতেই সে নামবে না।
মীর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ওকে বুকে করেই চতুর্দিক মনোযোগী চোখে দেখতে রইলো। আনাবিয়া ওর গলা আরেকটু জোরে জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ওটা ওখানের শোপিসটার নিচে গেছিলো, ওখানে দেখো।”
মীর বিরাট রাজহংসীর শোপিসটির নিচে দেখতে গেলো। আনাবিয়া তার আগেই মীরের গলায় মুখ লুকিয়ে চোখ মুখ কুচকে পড়ে রইলো, যেন ওই নিকৃষ্ট জীবকে তার দেখা না লাগে। মীর শোপিসটার আশেপাশে খোজাখুজি করতেই তড়াক করে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো একটা বিরাট সাইজের বিছা, মীর সেটাকে পায়ের তলে পিষে আধমরা করে সুড় ধরে উঁচু করে বলে উঠলো,

“পেয়েছি শালাকে৷”
আনাবিয়া গুটিয়ে গিয়ে মীরকে জড়িয়ে ধরলো আরও। মীর পোকাটা বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল,
“নামো এবার, গলা টিপে আমাকে তো মেরেই ফেলবে মনে হচ্ছে।”
আনাবিয়া নেমেও শান্ত হতে পারলোনা। গায়ের ভেতর কিরিমিরি করতে রইলো তার। মেঝেতে দাঁড়াতে পর্যন্ত পায়ের ভেতর শিরশির করতে রইলো। মীর ওকে কিছুক্ষণ এভাবে ফড়িং এর মতো ছটফট করতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,

“এখন আবার কি হচ্ছে?”
“এখানে যদি আরও থাকে?”
দুহাতে নিজের বাহু জড়িয়ে ধরে ভীত স্বরে বলল আনাবিয়া৷ মীর একটা শ্বাস ফেলে বেরিয়ে গেলো, পরক্ষণেই একটা চেয়ার নিয়ে ফিরলো হাম্মামে৷ আয়েস করে বসে বলল,
“এখানেই আছি। এবার গোসল দাও, দেখি৷”
“তোমাকে আমি বিছাপোকা উদ্ধার করতে ডেকেছি, আমার গোসল দেখতে নয়!”
“ওই একই হলো। তোমার এত উপকার করলাম, বিনিময়ে এটুকু তো আমার প্রাপ্য!”
“হ্যাঁ তা তো! জীবনে স্বার্থ ছাড়া তো কিছুই করতে দেখলাম না তোমাকে!”
“অফকোর্স, স্বার্থ আছে বলেই তো এতকিছু। এখন গোসল দাও।”
আনাবিয়া ওর দিকে ক্ষণিক কটমট করে তাকিয়ে বাথটাবের সামনের পর্দাটা সজোরে টেনে দিলো। মীর হতাশ হলো তাতে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে শরীর এলিয়ে চেয়ারের ওপর থেকে মাথা এলিয়ে দিলো।
আনাবিয়া পানি ছাড়লো, ক্ষণিক পর আবার বন্ধও করে দিলো। ওর কোনো সাড়া শব্দ না মেয়ে মীর মাথা তুলে জিজ্ঞেস করলো,

“কি হলো আবার?”
“যদি পানির ভেতর থাকে!”
“নেই!”
“যদি থাকে?”
“আমি আসব?”
“না!”
“কেন?”
“তুমি কথা বলো।”
“কি বলবো?”
“যা খুশি তাই, গান, কবিতা, ছড়া।”
“হাট্টিমাটিম টিম শুনবে?”
“না! ভালো কিছু বলো৷”
আনাবিয়া গায়ে লুফা ঘষতে শুরু করলো। মীর মাথা চুলকে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলে উঠলো,
“একটা নতুন কবিতা শুনেছি, বলবো?”
“বলো।”

“My name is Diego and my life is so sick
I have a lot of money and I have a big…এহেম… house
I’m telling you now, all the other lovers suck
Come into my bed so me and you can… এহেম.. talk-” (collected, slightly changed)

আনাবিয়া নাকের পাটা ফুলোলো, পর্দার ওপাশে থাকা মীরের উদ্দ্যেশ্যে বাঁজখাই গলায় বলে উঠলো,
“থামো! অসভ্য কোথাকার! তুমি চুপচাপই বসে থাকো!”
“মানুষের ভালো করতে নেই।”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৭ (৩)

মীর বসে রইলো চুপচাপ। ক্ষণিক বসে থাকার পর আচমকাই উঠে দাঁড়িয়ে গা থেকে শার্টটা খুলে ছুড়ে দিলো কোথাও। বাথটাবের পর্দা এক টানে সরিয়ে গলা অব্দি পানিতে ডুবে থাকা আনাবিয়াকে চমকানোর সুযোগ টুকুও দিলো না।

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৮ (২)