বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৮ (২)
রানী আমিনা
আনাবিয়া তৈরি হচ্ছে কামরায়, ছেলেরা কুরো আহমারের বার্ষিক আনন্দ মেলায় ঘুরতে যেতে চায় ওকে নিয়ে, বাইরে অপেক্ষা করছে সকলে। মীর এতক্ষণ কামরাতেই ছিলো, আধা ঘন্টা হলো সে আচমকা উধাও হয়েছে। আনাবিয়ার চোখ জ্বালা করছে, ঠান্ডা লাগার লক্ষণ। মীরের সাথে আজকে ওকে কতক্ষণ ভিজতে হয়েছে হিসাব নেই। কানে দুল পরতে পরতেই একবার হাচি দিলো সে।
চুলগুলো ভিজে এখনো, টুপটাপ পানি পড়ে চলেছে চুল থেকে। তোয়ালেত আরেকবার চুল মুছে হাতে সামান্য এলোমেলো করে নিল। সবশেষে তর্জনীর সাহায্যে ঠোঁটে ঘষে নিল সামান্য গ্লস। আয়নায় নিজেকে দেখে মিষ্টি করে হাসলো একবার, পরমুহূর্তেই বেরিয়ে এলো বাইরে৷
বাচ্চারা অপেক্ষায় ছিলো লিভিং রুমে, ওকে দেখা মাত্রই থমকে গেলো সকলে, ক্ষণিকের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেলো এতক্ষণ শোরগোলে মাতোয়ারা থাকা লিভিং রুম। আনাবিয়া অপ্রস্তুত হলো তাতে, ছেলেদের এমন হতভম্ব দৃষ্টি লজ্জায় ফেললো তাকে, সাজুগুজু একটু বেশি হয়ে গেলো কিনা সেই ভাবনায় পড়ে গেল।
আরেকটু এগিয়ে এসে গলা খাকারি দিলো আনাবিয়া। ছেলেরা যেন সম্বিত ফিরে পেলো তাতে! আরসালান দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে বলে উঠলো,
“আম্মা, আজকে ঘুরতে যাওয়া বাদ থাকুক!”
“ওমা, কেন?”
বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলো আনাবিয়া, আরসালান ইতস্তত স্বরে বলে উঠলো,
“আম্মা, আপনাকে এমন অবস্থায় বাইরে নিয়ে গেলে একটা না একটা সর্বনাশ হবে, বুঝতে পারছি।”
মিশআল ওকে ঠেলে এগিয়ে এলো তখন, পকেট থেকে রুমাল বের করে আনাবিয়ার মাথার ওপর রেখে পর্দার মত করে মুখখানা ঢেকে দিয়ে বলে উঠলো,
“এবার আর কোনো সমস্যা নেই, চলুন আম্মা। এই আরসালানের কথা শুনবেন না।”
আনাবিয়া খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো তাতে। ওর ঝর্ণার ন্যায় হাসি যেন দ্বিতীয় বার মুগ্ধ করলো ওদের। আরসালান মিশআলের দিকে চেয়ে দুদিকে মাথা নাড়ালো, বুঝিয়ে দিলো এমন সুন্দরী আম্মাকে লোকজনের ভেতর নিয়ে যাওয়া অসম্ভব!
সাইয়্যিদ তখনও বিমুগ্ধ চোখে চেয়ে আনাবিয়ার দিকে। ফিরাস ওকে একটা চাটি মেরে হুমকির স্বরে বলে উঠলো,
“একদম আমার আম্মাকে দেখবিনা, তোর চোখ গেলে দিব!”
“উনি তোর একার আম্মা না আমারও আম্মা, হুহ্!
“তোর দূরসম্পর্কের আম্মা।”
“যে সম্পর্কেরই হোক, আম্মা আম্মাই। এখন আমার সামনে থেকে সর, আম্মাকে দেখতে দে৷”
ফিরাস ওর চোখের ওপর হাত দিয়ে চেপে ধরলো, সাইয়্যিদ এক ঝটকায় সরিয়ে দিল ওর হাত। দুজন মিলে একটা মিছি মিছি কুস্তিও করে ফেললো তার ভেতর৷
আনাবিয়া ওদেরকে নিয়ে বাইরে বের হতে হতে জিজ্ঞেস করলো,
“বাবা কোথায়?”
“ওহ্, বলতে ভুলে গেছি আম্মা। বাবার হঠাৎ কি জরুরী কাজ পড়েছে। তবে বাবা কাজ শেষ করেই চলে আসবেন জানিয়েছেন। আমাদের আগে বেরিয়ে যেতে বললেন।”
বলল আরসালান৷ গাড়ির সামনে এসে আনাবিয়া চতুর্দিকে একবার চোখ বুলোলো, তারপর উঠে পড়লো গাড়িতে৷ ওরপাশে কে কে বসবে সেটা নিয়ে এক দফা ঝগড়াও হয়ে গেলো। মিশআল বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো, সাইয়্যিদ বসলো ওর পাশের সিটে৷ আরসালান আর ফিরাস ধস্তাধস্তি করতে করতে এসে বসলো মায়ের দু’পাশে। জিবরান আর কাসওয়ার শান্ত, ভদ্র ছেলেটির মত কোনো বাক্যব্যয় ছাড়াই বসে পড়লো ওদের পেছনে৷ কাসওয়ার পেছন থেকে আদুরে ভঙ্গিতে গলা জড়িয়ে ধরলো মায়ের, সেটা নিয়ে ফিরাসের সাথে সমস্ত রাস্তা ঝগড়া হলো তার৷ আনাবিয়া ছেলেদের অত্যাচারে রীতিমতো অতিষ্ঠ হয়ে নাকের পাটা ফুলিয়ে বসে রইলো সমস্ত পথ।
কুরো আহমারের জমকালো রাস্তা দিয়ে হেটে চলেছে আনাবিয়া, পেছনে ওর ছ’জন ছেলে। প্রতি পদক্ষেপে যেন ঝলমলিয়ে উঠছে ওর সমস্ত দেহ, হীরকখন্ডের ন্যায় ঝকমকে চোখে রাতের শহরের মুগ্ধতা। বিপরীতে ওর ছেলেদের দৃষ্টিতে বাবার মতোই খুনো দৃষ্টি, মা’কে আগলে রেখে শকুনি চোখে পরখ করে চলেছে রাস্তার প্রতিটি দৃষ্টিকে৷ সাদা রঙা পাতলা শার্টের ওপর দিয়ে ফুটে পড়েছে ওদের পেশিবহুল শরীর, হাতের ভাজে গা থেকে খুলে রাখা কোট৷ ওদের দীর্ঘ দেহ ছাড়িয়ে গেছে প্রায় সকল মাথা৷
রাস্তার প্রতিটা দৃষ্টি প্রথমেই আটকে যাচ্ছে এই ছয় দীর্ঘদেহী কিশোরের ওপর, পরমুহূর্তেই তাদের বিস্মিত দৃষ্টি থমকে যাচ্ছে তাদের সম্মুখে স্যাটিনের অফ হোয়াইট শেডের ঝকমকে পোশাকে মোড়া এক শুভ্র কেশাধিকারী পরমা সুন্দরীর ওপর। সেই মুহুর্তেই সারা শহর জুড়ে ধ্বনিত হলো একটি আর্টিফিশিয়াল ভয়েস,
“অ্যাটেনশন! অ্যাটেনশন! দ্যা দেমিয়ানস আর হেয়ার। প্লিজ বি অ্যালার্ট অ্যান্ড শো ইয়োর ডিউ রেস্পেক্ট।”
সতর্কবার্তা শোনা মাত্রই সমস্ত শহর যেন গমগম করে উঠলো একবার। সকলেই উৎসুক হয়ে উঠলো দেমিয়ান পরিবারের সদস্যদের এক পলক দেখার জন্য।
ওরা নিজেরাও শুনলো সেই সতর্কবার্তা, ওদের আশপাশটা থমকে গেলো ক্ষণিকের জন্য৷ রাস্তার লোকগুলো ওদের দিকে ক্ষণিক বিস্মিত চোখে চেয়ে রইলো, পরক্ষণেই মাথা নত করে আনুগত্য জানালো। আনাবিয়া মিষ্টি হেসে হাটতে রইলো সামনে, বাচ্চারা এগোতে রইলো মায়ের পেছন পেছন।
মেলার ভেতর ঢুকতেই আনাবিয়ার মাতৃ খোলস যেন খুলে পড়লো। আচমকাই এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে রইলো সে। একবার পুতুলের স্টল, তো আরেকবার জুয়েলারির; কখনো সিফুডের স্টল, তো কখনো আইসক্রিমের। ওকে আঁটকানো দূরুহ হলো ছেলেদের জন্য।
শেষ পর্যন্ত আরসালান হাত ধরে রইলো ওর, যেন ওদেরকে না জানিয়ে এদিক ওদিক চলে যেতে না পারে৷ কিন্তু তাতে আরও অশান্ত হয়ে উঠলো আনাবিয়া। কিছুক্ষণ পর পর বলতে রইলো, আমি আইসক্রিম খাবো, আমার ওই পুতুলটা চাই, আমি এইটা নিব, আমি ওইটা নিব, আমি নাগরদোলায় উঠবো, আমি কিং ক্র্যাব খাব; আরও কত কি।
প্রতিউত্তরে ওরা বলে চলল, বাবা বলেছেন আপনি এখন আইস্ক্রিম খেতে পারবেন না, নাগরদোলাটা ভালো নয় আম্মা, এখানের সি ফুড খেতে বাবা নিষেধ করে দিয়েছেন, এত ভিড়ের ভেতর ঢুকতে বাবা নিষেধ করেছেন; ইত্যাদি।
এত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আনাবিয়া চোখে যেটাই ভালো লাগলো কিনে নিলো, ছেলেরা হাত ভর্তি ব্যাগ নিয়ে ঘুরতে রইলো ওর পেছন পেছন, আরসালান তখনো ধরে রইলো ওর হাতে৷ সবশেষে ওরা গিয়ে উপস্থিতি হলো একটা প্লাশি টয়ের শপে। আনাবিয়া শপ দেখেই লাফাতে শুরু করলো, ওর হাত ধরে রাখা আরসালানকে প্রায় টেনে নিয়ে গেলো সেখানে৷
শপের সম্মুখে একটা বন্দুক রাখা, ভেতরের যত্রতত্র চলতে থাকা তিনটি টার্গেটে তিন বার শুট করতে পারলেই একটা টয় মিলবে। দোকানদার ওদেরকে দেখা মাত্রই এক কোণে সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, দোকানে থাকা অন্যরাও সরে গেলো আশেপাশে। লুকোচুরি ভঙ্গিতে দেখতে রইলো ওরা আনাবিয়াকে৷
দোকানদার ওদেরকে নিয়ম জানিয়ে দিলে কাসওয়ার পেছন থেকে বলল,
“আমাকে দিন আম্মা, আমি আপনাকে টয় জয় করে দিব, আপনি এমন ফ্রিকুয়েন্টলি মুভ করতে থাকা টার্গেটে কিভাবে শুট করবেন!”
“তুম লোগ বাস দেখতে রাহো।”
মুখ উঁচিয়ে গর্বভরে বলে উঠলো আনাবিয়া। পরক্ষণেই বন্দুক উঠিয়ে তাক করলো দ্রুতবেগে উপর নিচে ডানে বামে ছুটতে থাকা টার্গেটের দিকে। বাচ্চারা আশাহত চোখে চেয়ে রইলো সেদিকে। এই টার্গেটে ওদের আম্মা কিভাবে শুট করবে মাথায় এলোনা ওদের৷ তবুও অধৈর্য হলোনা, চুপচাপ দেখতে রইলো মায়ের কীর্তি।
সেই মুহুর্তেই বিকট শব্দে শুট করলো আনাবিয়া, ঝড়ের বেগে বুলেট গিয়ে এফোড় ওফোড় করে দিলো একটি টার্গেটের মধ্যখান। বাচ্চাদের আশাহত মুখে মুহুর্তেই ভর করলো বিস্ময়, স্তম্ভিত হয়ে একে অপরের দিকে তাকালো ওরা। আনাবিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো, পরক্ষণেই দ্বিতীয় বার শুট করার জন্য প্রস্তুতি নিলো সে। পরপর দুইটা শট এ দুইটি টার্গেটকেই এফোড় ওফোড় করে দিলো। শুট শেষ হতেই খুশিতে দুইহাত ওপরে তুলে আনন্দধ্বনি করলো ও, পরমুহূর্তেই দোকানের পাশে ঝোলানো প্লাশি গুলো থেকে নিজের পছন্দের প্লাশিটা লুফে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো। মুখে ফুটে রইলো বিজয়ীর হাসি। ছেলেদের দিকে চেয়ে দাঁত মেলে হেসে বুঝিয়ে দিল ওর খুশির পরিমাণ।
আরসালান ওর হাত থেকে প্লাশিটা নিয়ে ব্যাগে রাখতে চাইলো, কিন্তু আনাবিয়া দিলনা। সেটাকে বুকে জড়িয়ে দ্রুত পায়ে হারিয়ে গেলো ভিড়ের ভেতর৷ কাসওয়ার আর মিশআল তৎক্ষনাৎ ছুটলো ওর পেছনে, নইলে আজ মাকে হারালে বাবার মার একটাও মাটিতে পড়বেনা৷ জিবরান দ্রুত টাকা পরিষোধ করে বাকিদের নিয়ে এগোলো ওদের খুঁজতে।
এদিকের রাস্তা প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে। লোকজন সবাই মূল শহরের দিকে। ওরা সাতজন ধীরে ধীরে হেটে চলেছে রাস্তায়। আনাবিয়ার হাতে আইসক্রিম, তাকে কিনে দিতেই হয়েছে, নইলে সে নাকি মেলা থেকে বাসায় যাবেনা৷ আইসক্রিমের স্টলের সামনে ঠোঁট ফুলিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিল। বাধ্য হয়ে ওকে আইসক্রিম কিনে দিয়েছে ওরা,হাতের টা সহ তিনটা হচ্ছে৷
আনাবিয়া অল্প অল্প করে আইসক্রিম খেয়ে চলেছে। নাক লাল হয়ে এসেছে তার, একটু পর পর হাচি দিচ্ছে তবুও আইসক্রিম খাওয়ায় কোনো বিরতি নেই৷ ফিরাস বার কয়েক আইসক্রিমটা নিয়ে নিতে চেয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি, সে কোনো ভাবেই দিবেনা।
হাটতে হাটতে আচমকাই থমকে দাঁড়িয়ে মুখ থেকে অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠলো আনাবিয়া৷ বাচ্চারা সচকিত হয়ে গেলো মুহুর্তেই, কাসওয়ার এগিয়ে এলো তৎক্ষনাৎ, মাকে আগলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কোনো অসুবিধা হচ্ছে আম্মা?”
মায়ের গায়ে হাত রেখেই বুঝলো শরীর গরম তার। শঙ্কিত স্বরে সে বলে উঠলো,
“আম্মা! আপনার গায়ে তো জ্বর চলে এসেছে!”
জ্বরের কথা শুনতেই এগিয়ে এলো মিশআল, মায়ের কপাল স্পর্শ করে নিশ্চিত হলো সত্যিই তার গায়ে উত্তাপ! একে অপরের দিকে ভীত চোখে তাকালো ওরা। আসার পূর্বে বাবা বার বার করে সতর্ক করেছে যেন মা’কে ওরা কোনোভাবেই আইসক্রিম বা ঠান্ডা জাতীয় কিছু খেতে না দেয়। সেখানে ওদের আম্মা তিন তিনটা আইসক্রিম খেয়ে নিয়েছে শুনলে বাবা আজ আর আস্ত রাখবে না৷ ওদের চোখাচোখির মাঝেই আনাবিয়া ভ্রু কুচকে বলে উঠলো,
“আমার পায়ে জ্বালা করছে!”
জিবরান এসে খুলে নিলো এর জুতাজোড়া, গোড়ালির ওপর জুতোর ঘষা লেগে লেগে ছিলে গেছে৷ এত হাটাহাটির পরেও পা জোড়া যে আস্ত আছে এটাই অনেক। জিবরান জুতা জোড়া হাতে নিয়ে বলে উঠলো,
“আম্মা, জুতা আর পরতে হবে না, আপনার পা ছিলে যাচ্ছে।”
আনাবিয়া বেজার মুখে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ফিরাস প্রায় চাপা সুরে জিবরানকে বলল,
“জুতা জোড়া জুতোর দোকানের মালিকের মুখে ছুড়ে মেরে আয়৷”
পরক্ষণেই এসে কোলে তুলে নিলো আনাবিয়াকে। এগোতে এগোতে বলল,
“আর শহর ঘুরতে হবে না আম্মা, আমরা ফিরে যাই চলুন।”
আনাবিয়া দুহাতে ফিরাসের গলা জড়িয়ে ধরে ভার হয়ে যাওয়া মাথাটা এলিয়ে দিলো ওর বুকের ওপর৷ গলা ব্যাথা হয়ে গেছে। আইস্ক্রিমের বাকি অংশটা এখনো হাতের মুঠোয়, ফেলে দিতে কষ্ট হচ্ছে, আবার ফুলে ওঠা গলা দিয়ে নামবে বলেও মনে হচ্ছে না৷ সেদিকে একবার আফসোসের চোখে তাকালো আনাবিয়া। আরসালান জিজ্ঞেস করলো,
“আম্মা, আপনার কি শীত করছে?”
“একটু!”
নিভে যাওয়া স্বরে বলল আনাবিয়া। ফিরাস ওকে আরও আগলে নিয়ে হাটতে রইলো। কিছুক্ষণ নিরবে অতিবাহিত হওয়ার পর পেছন থেকে জিবরান হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,
“আম্মা, আপনাকে এমন শুট করা কে শিখিয়েছে?”
“তোমাদের বাবা৷ আমি জীবনে যা কিছুই শিখেছি সবই তোমাদের বাবার কাছে৷ এমনকি রান্নাটাও।”
আনাবিয়ার কথায় মৃদু হাসলো ওরা, চোখাচোখি হলো ওদের৷ কাসওয়ার গলা খাকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“বাবা আপনাকে আর কি কি শিখিয়েছেন, আম্মা?
“অনেক কিছু, প্রায় সব! তলওয়ার চালানো, তায়কোয়ানডো, বক্সিং, লাঠি খেলা, আর্চারি, মাছ ধরা, সাঁতার… আরও অনেক কিছু। ও আমাকে অনেক আজেবাজে কাজও শিখিয়েছে, এই যেমন সিঁটি বাজানো, হাতের সব আঙুল কটাস কটাস কিরে ফোটানো, তুড়ি বাজানো, চোখ মারা, এক ভ্রু নাচানো, তারপর…. আমরা একসাথে অনেক দুষ্টুমিও করেছি। একবার মাঝ রাতে রাজমহলে যাওয়ার পথে রাস্তায় যতগুলো বাড়ি দেখেছিলাম সব গুলোতে বেল বাজিয়েছিলাম। ধরাও পড়েছিলাম, যদিও তোমাদের বাবা আমাকে বাঁচিয়ে নিয়ে গেছিলো। সে অনেক কাহিনী!”
“আপনারা এসবও করেছেন?”
“ওরে বাবা! করিনি কি সেটাই তো মনে পড়েনা৷ আমরা আগে হুটহাট পিকনিক করতাম। কোকো, ফ্যালকন, লিও, কাঞ্জি, এরা সবাই তখন অনেক ছোট, ওরা সবাই তখন প্রাসাদে থাকতো। সবাই মিলে পিকনিক, ঘোরাঘুরি, আড্ডাবাজি; অনেক মজা হতো!”
“বাবা ওনাদের প্রাসাদে থাকতে দিয়েছিলেন?”
ফিরাসের গলায় বিস্ময় ঝরে পড়ে৷ পাশ থেকে আরসালান বলে উঠলো,
“বাবা তো পারলে ফিরাসকেই প্রাসাদ থেকে বের করে দেন, সারাদিন রেড জোনে টো টো কম্পানি করার কারণে।”
সাইয়্যিদ ওপাশ থেকে বলল,
“বাবা তো জঙ্গলের কোনো প্রাণীকে দেখতেই পারেন না, ফিরাসের গিরগিটি ফেলিক্স তো বাবার দুচোখের বিষ, পারলে ওকে ছেঁচে দেন!”
ফিরাস ওর থেকে কথা ছিনিয়ে নিয়ে বলল,
“বাবার রেড জোনের প্রাণীদের ওপর এমন আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখে লিও আর কাঞ্জিকে কিভাবে প্রাসাদে বহাল রেখেছেন এটাই বুঝতে পারতাম না তখন! এই তাহলে ব্যাপার!”
আনাবিয়া রিনরিনিয়ে হেসে ওঠে ওর কথায়, বলে,
“সে আর এক কাহিনী। তোমাদের বাবা তো ওদের কোনো মতেই রাখবে না প্রাসাদে! তার একটাই কথা, জঙ্গলের পশু প্রাসাদে নিয়ে এসে প্রাসাদের পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না। কিন্তু আমি তো নাছোড়বান্দা, জীবনেও শুনবনা। বাধ্য হয়ে রাজি হয়েছিলো তোমাদের বাবা। আরও মজার ব্যাপার, ওরা যে কামরায় থাকত তার নাম কি ছিলো জানো?”
“কি ছিল?”
“দ্যা রয়্যাল জ্যু! তোমাদের বাবা ইয়া বড় বড় করে লিখে দিয়েছিলো ওপরে, যেন কারো বুঝতে বাকি না থাকে এখানে একটা চিড়িয়াখানা আছে।”
বলতে বলতে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো আনাবিয়া৷ ওর বাচ্চারাও হেসে উঠলো সশব্দে। আনাবিয়া বলতে রইলো,
“কোকোকে তো তোমার বাবা সহ্যই করতে পারতনা। ও ছিলো আমার প্রথম কোনো পোষা প্রাণী, আমাদের বিয়ের দিনে ওকে সমুদ্রের ধারে পেয়েছিলাম। তোমাদের বাবার প্রায় হাতে পায়ে ধরে ওকে আমি প্রাসাদে তুলেছিলাম, কিন্তু তোমার বাবা সুযোগ পেলেই ওকে বাইরে ফেলে দিয়ে আসত। নোমান নামে একজন খোঁজা দাস ছিলো, ওর গায়ে ছুড়ে মারত।”
আনাবিয়ার মুখে হাসি লেপ্টে রইলো। শৈশবের মধুময় স্মৃতি যেন মাদকতায় বুদ করে দিল ওকে। অকস্মাৎ হাচি দিল ও আবার। গুটিয়ে গেলো ফিরাসের বুকের ভেতর। ফিরাস শঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“শীত বেশি লাগছে আম্মা?”
“হু!”
আরসালান ওর হাতের ভাজে থাকা কোটটা আনাবিয়ার ওপর চড়িয়ে দিলো তৎক্ষনাৎ। শুভ্র চুলের ভাজে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“বিশ্রাম করুন আম্মা, বেশি কথা বলতে হবে না।”
এমন সময় মীরের গাড়িটা ঝড়ের বেগে এসে সশব্দে ব্রেক কষলো ওদের পাশে, মীর ঝটিতি বেরিয়ে এলো গাড়ি থেকে। আনাবিয়া লাল হয়ে যাওয়া চোখ জোড়া মেলে দেখলো ওকে একবার। মীর ফিরাসের দিকে চেয়ে আশঙ্কিত স্বরে শুধোলো,
“কি হয়েছে তোমার আম্মার? শরীর খারাপ লাগছে?”
“জ্বি বাবা, আম্মার গায়ে.. অনেক জ্বর এসেছে হঠাৎ।”
অপরাধী স্বরে বলল ফিরাস। মীর ফিরাসের কোল থেকে আনাবিয়াকে উঠিয়ে নিজের কোলে নিল, গায়ের উত্তাপে চমকালো সে। আনাবিয়াকে জিজ্ঞেস করলো,
“আইসক্রিম খেয়েছো?”
আনাবিয়া নিষ্পাপ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো দুদিকে, বুঝিয়ে দিল আইসক্রিম সে ছুয়েও দেখেনি৷
মীর তাকালো ওর ছেলেদের দিকে, সকলে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে সটান। ভাবটা এমন যেন কেউ কিছুই জানেনা, জ্বরটা হঠাৎ উড়ে এসে পড়েছে মায়ের ওপর৷ পেছন থেকে সাইয়্যিদ সবার অগোচরে ওপর নিচে মাথা নাড়িয়ে বাবাকে জানিয়ে দিল আসলেই আম্মা আইসক্রিম খেয়েছে৷
মীর ছেলেদের দিকে চেয়ে গমগমে স্বরে বলে উঠলো,
“আজ থেকে মা’কে নিয়ে বের হওয়া বন্ধ। যেদিন থেকে মায়ের দায়িত্ব নিতে পারবে সেদিন থেকে মা’কে নিয়ে বের হবে, তার আগে নয়৷”
ছেলেদের সাথে এমন গম্ভীর স্বরে কথা বলার অপরাধে আনাবিয়া ওর বুকে মৃদু হাতে কিল বসালো, চেয়ে দেখলো একবার বাচ্চাদের দিকে৷ নত মুখে দাঁড়িয়ে আছে সবগুলো, আরসালান আড়চোখে পর্যবেক্ষণ করছে বাবার মুখের ভাব। আনাবিয়া ছেলেদের এমন ভারী চেহারা লক্ষ্য করে দুর্বল হাতে মীরের শার্টের কলার চেপে ধরলো, হুমকি দিয়ে বলে উঠলো,
“ওরা যা করেছে বেশ করেছে, আমার যা ইচ্ছে হবে খাব, তোমার কি? একদম আমার ছেলেদের বকবেনা বলে দিলাম!”
“শাটাপ৷”
আনাবিয়ার তুচ্ছ হুমকিকে এক শব্দে থামিয়ে দিল মীর। আনাবিয়া ঠোঁট উল্টালো তাতে, পরক্ষণেই ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“নামিয়ে দাও আমাকে, থাকবনা আমি তোমার কোলে।”
মীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, ছেলেদের দিকে তাকাতে দেখলো গোফের তলা হাসছে সবগুলো। নিজের কপালকে মনে মনে আচ্ছামত বকাবকি করে বলল,
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৮
“তোমরা চাইলে এখানেই থাকতে পারো, আমি তোমাদের মা’কে মহলে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।”
বলেই কোলের ভেতর বিদ্রোহ করতে থাকা আনাবিয়াকে গাড়ির ভেতর জবরদস্তি বসিয়ে নিজে গিয়ে বসলো ড্রাইভিং সিটে। তারপরই সবেগে গাড়ি হাকালো রাজ মহলের দিকে।
