বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৪
রানী আমিনা
মীরের ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখা মাত্রই ফারিশ ছিটকে সরে গেলো আনাবিয়ার থেকে। আনাবিয়ার চোখ জোড়া বিস্ফোরিত, অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে সে শূন্যের দিকে! দুঃসহ ত্রাসের তাড়নায় দরদর করে ঘামছে সে! ভয়ানক জোরে শ্বাস পড়ছে তার, হাত জোড়া থরথরিয়ে কাঁপছে অনবরত! সেই মুহুর্তেই জোরে শ্বাস টেনে আচমকা চোখ উলটে সে ঢলে পড়তে নিলো মেঝেতে।
মীর বিদ্যুৎ বেগে এসে দুহাতে আগলে নিলো ওকে নিজের সাথে। ফারিশ দিকবিদিকশুন্য হয়ে, কি করবে বুঝতে না পেরে চতুর্দিকে অস্থীর চোখে একবার দেখে নিয়ে ছুটে পালিয়ে যেতে নিলো কামরা ছেড়ে।
কিন্তু সেই মুহুর্তেই আনাবিয়াকে বা হাতে বুকের সাথে জাপটে নিয়েই মীর খামচে ধরলো ফারিশের ঊরু, ওর ক্ষুরধার নখর ফারিশের পোশাক ভেদ করে গেঁথে গেলো মাংসে! পরক্ষণেই হ্যাচকা টেনে ওকে মেঝেতে আঁছড়ে ফেললো মীর!
পরমুহূর্তেই ঊরু ছেড়ে ক্ষিপ্র বেগে খামচে ধরলো ফারিশের গলা! সাঁড়াশির ন্যায় আঙুলের তীক্ষ্ণ, ধারালো নখর ফারিশের গলার গভীরে গেঁথে দিতে দিতে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কি করেছিস তুই ওর সাথে? কি কি করেছিস সত্যি করে বল!”
“ক্-কিছু ক্-ক্-করি-নি….. জ্-জড়-য়িয়ে ধরে-ছি…. শ্-শুধু!”
অতি কষ্টে গলা দিয়ে শব্দ গুলো বের করলো ফারিশ। ফারিশের ‘শুধু’ শব্দটা শোনা মাত্রই ক্রোধে যেন উন্মাদ হয়ে উঠলো মীর, গর্জে উঠে সর্বশক্তি দিয়ে ফারিশের চোয়ালে এক তীব্র বেগের ঘুষি হাকালো সে। মুহুর্তেই ফারিশের ঘাড় বেকে মাথা আছাড় খেলো মেঝেতে! এক দলা রক্ত নিয়ে দুটো দাঁত ছিটকে বেরিয়ে এলো মুখের ভেতর থেকে!
মীর আবার খামচে ধরলো ওর গলা। ওর ধারালো নখর ক্রমশ ভেদ করতে রইলো ফারিশের খাদ্যনালী, শ্বাসনালী। কলকলিয়ে রক্ত বের হতে শুরু করলো ছিদ্র গুলো দিয়ে! ফারিশ শ্বাস নেওয়ার জন্য তড়পাতে শুরু করলো মুহুর্তেই। মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো তার!
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
জেসার আর জুনায়েদ ফারিশের দুই মেয়েকে নিয়ে খুঁজতে এসেছিলো ফারিশকে। কামরার সামনে এসে দাঁড়ানো মাত্রই ভেতরের দৃশ্য দেখে রক্ত হীম হয়ে এলো ওদের দুজনের। ফারিশের মেয়ে দুটো ফারিশকে এমন অবস্থায় দেখে ভয়ে আতঙ্কে কেঁদে উঠে আর্তনাদের স্বরে ডেকে উঠলো,
“বাবা, বাবা….!”
মীর ঘাড় ঘুরিয়ে ক্ষিপ্ত চোখে তাকালো সেদিকে, ওর ঝলসানো চোখ জোড়া চোখে পড়া মাত্রই জুনায়েদ ভয়ে, আতঙ্কে জমে গেলো নিজের জায়গায়! জেসার ওকে ধাক্কা দিয়ে জ্ঞানে এনে ঠেলে পাঠিয়ে দিলো নিচে গিয়ে জায়ানকে অবস্থার ভয়াবহতার কথা জানাতে! জুনায়েদ উর্ধশ্বাসে ছুটলো বাবাকে ডাকতে!
ফারিশের মেয়ে দুটো আর্তস্বরে চিৎকার করতে করতে বাবার কাছে ছুটে গেলো ভেতরে! মীর দাঁতে দাঁত চেপে ফারিশের রক্তাক্ত মুখশ্রীর দিকে কিছুক্ষণ ধ্বংসাত্মক চোখে চেয়ে থেকে আচমকা ছেড়ে দিলো গলা। ফারিশ গলা কাটা মুরগির মতোন ছটফট করতে শুরু করলো মুহুর্তেই। মেয়ে দুটো আর্তনাদ করে বাবার ওপর আছড়ে পড়ে যেন প্রশমিত করতে চাইলো বাবার যন্ত্রণা।
মীরকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখে দরজা থেকে সরে কাঁপা শরীরে আনুগত্যের সাথে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলো জেসার। মীর ওর দিকে একবার বিধ্বংসী দৃষ্টি দিয়ে আনাবিয়াকে বুকে নিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো কামরা থেকে। মীর বেরিয়ে যেতেই জেসার ছুটে ঢুকলো কামরায়! জুনায়েদকে ফোন দিয়ে বলল এখুনি ইমার্জেন্সি মেডিককে সংবাদ পাঠাতে।
আনাবিয়ার জন্য নির্ধারিত উইং এর বিরাট কামরার তুলতুলে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে আনাবিয়া। জ্ঞান ফেরেনি এখনো তার। গায়ের ভারী পোশাক খুলে পাতলা পোশাক পরানো হয়েছে তাকে। বুক পর্যন্ত চাদরে ঢাকা। সফেদ চুল গুলো আলগোছে পড়ে আছে বিছানার পাশে, মেঝে ছুয়ে দিচ্ছে তার শুভ্র কেশের অগ্রভাগ। ডাক্তার পর্যবেক্ষণ করছে তাকে, সাথে বেশ কয়েকজন নার্স দাঁড়িয়ে আছে জবুথবু হয়ে।
পাশেই কাউচে পিঠ ঠেকিয়ে বসে মীর, মুখখানা ভয়ানক থমথমে। তীক্ষ্ণ, শকুনি দৃষ্টি তার আনাবিয়ার ফ্যাকাসে মুখশ্রীর পানে৷
এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জায়ান আর জাভেদ। ফারিশকে শেষ মুহুর্তে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে সে এই মুহুর্তে। শ্বাসনালী মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত, ফুসফুসে বাতাস ঢুকে গেছে তার। খাদ্যনালীতে ইতোমধ্যে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়েছে। তাকে নিয়ে হাসপাতালে প্রচন্ড দৌড়ঝাপ হচ্ছে।
নওয়াস জাবিন আর ফারিশের স্ত্রী খবর পাওয়া মাত্রই ছুটে এসেছে হাসপাতালে, বাচ্চা মেয়েদুটো মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই যাচ্ছে তখন থেকে। বারংবার ওদের চোখের সামনে ভাসছে সেই বিভৎস দৃশ্য! জ্বর চলে এসেছে দুজনেরই, ডাক্তারের অবজারভেশনে আছে তারাও। জেসার, জুনায়েদ, কোকো সহ অনেকেই হাসপাতালে, এখনো ফেরেনি তারা।
আনাবিয়ার হাতে স্যালাইন চলছে, ডাক্তার নিজের কাজের পাট চুকিয়ে মীরের সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে আনুগত্য জানালো। মীর ইশারায় বসতে বলল তাকে। মীরের বিপরীতের একটি চেয়ারে জড়সড় হয়ে বসলে মীর গমগমে স্বরে বলে উঠলো,
“প্রেজেন্ট সিচুয়েশন বলুন।”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহজাদীর সিভিয়ার প্যানিক অ্যাটাক এসেছিলো, যার কারণে তিনি জ্ঞান হারিয়েছেন। তাঁর প্রিভিয়াস কেস স্টাডি করে যেটা জানতে পেরেছি, শেহজাদী একজন হাইলি সেনসিটিভ পারসন, এবং তাঁর আফেনফসমোফোবিয়া আছে। উনি স্পর্শকে মারাত্মক ভয় পান, বা ঘৃণা করেন। বিশেষ করে পুরুষের স্পর্শ।
সেখানে তাকে জোরজবরদস্তি করে স্পর্শ করা হয়েছে, তিনি এতে মারাত্মক ভয় পেয়েছেন। মস্তিষ্কে অতিরিক্ত চাপ পড়ায় তিনি সিচুয়েশন হ্যান্ডেল করতে পারননি, প্যানিক হয়ে গেছেন এবং শেষ পর্যন্ত জ্ঞান হারিয়েছেন।
এখন উনি বিপদমুক্ত, হয়তো কয়েক ঘন্টা পরেই তাঁর জ্ঞান ফিরবে৷ তবে আগামী কিছুদিন তাকে সিরিয়াস অবজারভেশনে রাখতে হবে, এবং এমন সিচুয়েশন ক্রিয়েট করা থেকে বিরত থাকতে হবে যাতে তার প্রেশার ফ্যিল হয়। নইলে আবারও উনি প্যানিক হয়ে গিয়ে জ্ঞান হারাতে পারেন৷”
মীর শুনে গেলো। হাত জোড়া একত্রিত তার, দাঁতে দাঁত চেপে, দু হাত শক্ত করে আঁটকে ধরে সে যেন আপ্রাণ চেষ্টা করছে নিজেকে সামলাতে। মন চাইছে এখুনি হাসপাতালে গিয়ে ফারিশ নামক জানোয়ারটার প্রাণের প্রদীপ নিভিয়ে দিতে! শুধু মাত্র মেয়ে দুটোর জন্য এবারের মতো বেঁচে গেলো সে! কিন্তু ওকে এরপর কোনোদিন জায়গা মতো পেলে মীর কোনোভাবেই ছাড়বে না, কখনোই না!
মীরের চেহারার এমন বিধ্বংসী ভাবমূর্তি দেখে জায়ানের দম বেরিয়ে যাবার উপক্রম! মীর ইশারায় প্রস্থান করতে বলল ডাক্তারকে। সে আনুগত্য জানিয়ে, দুজন নার্সকে সেখানেই রেখে বাকিদের নিয়ে বেরিয়ে গেলো উইং থেকে।
মীর আরও কিছুক্ষণ সেখানে চুপচাপ বসে থেকে অবশেষে উঠে দাঁড়ালো। জায়ানকে বলল,
“আমি এখন ওকে প্রাসাদে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে ওর ওপর কোনো প্রেশার ক্রিয়েট করতে চাইনা৷ আগামী এক সপ্তাহের জন্য ওকে তোমার দায়িত্বে দিয়ে গেলাম জায়ান সাদী। সপ্তাহান্তে আমি আবার আসবো, ওকে প্রাসাদে ফিরিয়ে নিতে।”
“আপনার যেমন আদেশ, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
“এই এক সপ্তাহ যেন ওর সেবা যত্নের তিল পরিমাণ ত্রুটি না হয়, ওর কিছু হলে তার কৈফিয়ত তোমাকে দিতে হবে জায়ান সাদী। তুমি ব্যাতিত আর দ্বিতীয় কোনো পুরুষ যেন পিচ্চির ত্রী সীমানায় না ঘেঁষে। নট ইভেন ইয়োর সানস্। এভং সে যদি তোমাকেও বরদাস্ত করতে ব্যর্থ হয় অথবা তোমার আশেপাশে ডিসকমফোর্ট ফ্যিল করে তবে তখুনি আমাকে ইনফর্ম করবে।”
বলেই বড় বড় পা ফেলে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেলো মীর।
ভোর হয়েছে মাত্রই। বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে আনাবিয়া, খোলা জানালা দিয়ে ভোরের মৃদু শীতল বাতাস এসে ছুয়ে দিচ্ছে তার শুভ্র মুখশ্রী। চোখ জোড়া কিঞ্চিৎ রক্তিম, নিচটা ফোলা। অধর দ্বয় শুকিয়ে গেছে কেমন!
বিছানার পাশেই চেয়ারে বসে ফ্যালকন, ক্ষণিক পূর্বেই সে আনাবিয়ার জ্ঞান ফেরার সংবাদ পাঠিয়েছে বাইরে, আনাবিয়ার জন্য নাস্তা তৈরির হিড়িক পড়েছে সাদী ম্যানসনের বিরাট কিচেনে৷
আনাবিয়া কেঁপে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে! ক্ষণিক পর পর গত রাতের অসহ্য স্মৃতি ভেসে উঠছে তার চোখে, শরীরের ভেতর এক দুর্বহ অস্বস্তি হচ্ছে তার! থেকে থেকে অস্থির হয়ে নিজের বাহুতে, কোমরে হাত ঘষে সে যেন চেষ্টা করছে ফারিশের স্পর্শ মুছে ফেলার!
ফ্যালকন নিরুপায় চোখে দেখে চলেছে সেসব! দুয়েকবার আনাবিয়ার কাছাকাছি যেতে চেয়েছে সে, কিন্তু আনাবিয়া জড়সড় হয়ে সরে গেছে দূরে, ফ্যালকনের দিকে এমন ভাবে তাকিয়েছে যেন সে ফ্যালকনকে চেনেই না! যেন ফ্যালকন দূরের কেউ, যেন সে ক্ষতি করবে তার কোনো!
ফ্যালকন আহত হয়েছে তাতে প্রচন্ড! কোকোকে তখুনি জানিয়েছে সে এসব সিচুয়েশনের ব্যাপারে৷ কোকো মসভেইলে খবর পাঠিয়েছে, লিন্ডা আর রেক্সা কিমালেবের উদ্দ্যেশ্যে রওনা দিয়েছে তখুনি।
ফ্যালকন দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো একটা। আনাবিয়ার সুন্দর মুখখানার এমন শুকনো দশা তার ভালো লাগছেনা, আনাবিয়ার এই ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকা সে নিতে পারছে না। বুকের ভেতর কষ্ট হচ্ছে তার! যখনি ওরা একটু ভালো থাকতে যায় তখনি কেন ওদের সুখ গুলো তছনছ হয়ে যায় তাসের ঘরের মতোন? নিজেকে প্রশ্ন করে কোনো উত্তর পেলোনা ফ্যালকন!
দরজায় নক পড়লো তখুনি। আনাবিয়া চমকে তাকালো সেদিকে, চাদর গায়ে জড়িয়ে জড়সড় হয়ে গেলো আরও। ফ্যালকন উঠে দরজা খুলতেই নাস্তা নিয়ে ভেতরে এলো একটি মেয়ে৷ আনাবিয়া তৎক্ষনাৎ আর্তনাদ করে চেচিয়ে উঠলো,
“বেরিয়ে যাও, কেউ আসবেনা আমার কামরায়! এখুনি বেরিয়ে যাও।”
মেয়েটি ভয় পেয়ে তড়িঘড়ি নাস্তার ট্রে ফ্যালকনের হাতে দিয়ে বেরিয়ে গেলো কামরা ছেড়ে। ফ্যালকন সেটা হাতে নিয়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সে কিভাবে খাওয়াবে শেহজাদীকে? শেহজাদী যে তার থেকেও দূরে চলে যেতে চাইছেন!
ফ্যালকন তবুও সাহস নিয়ে ধীর পায়ে এগোলো বিছানার দিকে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চেচিয়ে উঠে ওকে থামিয়ে দিলো আনাবিয়া, আর্তনাদ করে বলে উঠলো,
“কোকো কই, আমার কোকো কই?”
“আমি এখুনি ডাকছি তাকে, শেহজাদী! আপনি প্যানিক হবেন না, আমি এখুনি ডাকছি!”
ফ্যালকন ছুটে বেরিয়ে গেলো বাইরে, ভয়ানক কান্না পেলো তার! ডুকরে কেঁদে উঠলো সে, বাইরের এক কর্মচারী কে বলল কোকো কে এখুনি শেহজাদীর কামরায় পাঠিয়ে দিতে।
কোকো খবর পেয়ে ছুটে এলো তখুনি, ফ্যালকন তখনো বাইরে দাঁড়িয়ে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে থেকে থেকে। কোকোকে দেখতেই শব্দ করে কেঁদে উঠলো সে, কোকোর গায়ে আছড়ে পরে বলল,
“শেহজাদী আমাকেও কাছে যেতে দিচ্ছেন না ভাইজান! আমি কি করবো? আমার আম্মা আমাকে কাছে যেতে দিচ্ছে না! আমি মরে যাবো ভাইজান!”
কোকো ওকে শান্ত করে দ্রুত পায়ে ঢুকলো কামরায়। আনাবিয়া ঝুম বৃষ্টিতে ভেজা ছোট্ট চড়ুই পাখিটির মতো কেঁপে চলেছে তিরতির করে। আতঙ্কিত দৃষ্টি ফেলছে ফাঁকা ঘরের চতুর্দিকে। কিসের এক দুঃসহ শঙ্কা যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাকে!
কোকো দরজা খুললো ধীরে, যেন কোনো ভাবেই আনাবিয়া উত্তেজিত না হয়ে পড়ে! ধীর পায়ে প্রবেশ করে দাঁড়ালো আনাবিয়ার সামনে। দরজা খোলার শব্দে আনাবিয়া গায়ে চাদর মুড়িয়ে এক কোণে সেঁটে গেছিলো। কোকোকে দেখে একটু সাহস পেলো যেন! আতঙ্কে উঁচু হয়ে যাওয়া ভ্রুদ্বয় স্বাভাবিক আসলো তার ক্রমশ।
কোকো, ধীর কদমে বিছানার কাছাকাছি এসে মোলায়েম গলায় ডাকলো,
“আম্মা!”
আনাবিয়া বললোনা কিছুই, আস্তে আস্তে সোজা হয়ে বসলো শুধু। চোখে তখনো লেগে রইলো সতর্ক দৃষ্টি। কোকো খাবারের ট্রে টা হাতে নিয়ে উঠে বসলো বিছানার ওপর৷ আনাবিয়া পিছিয়ে গেলো তাতে। কোকো নরম স্বরে বলল,
“আম্মা, ক্ষিদে পেয়েছে না আপনার! এদিকে আসুন, আমি খাইয়ে দিবো আপনাকে।”
আনাবিয়া আসলোনা তবুও। কিন্তু সে যে পূর্বের চেয়ে একটু আস্বস্ত সেটা টের পেলো কোকো। ইলহানকে কালকের সব ঘটনা বিস্তারিত বলে খবর পাঠিয়েছে সে ভোরেই। সে বোধ হয় এসে পড়বে যখন তখন!
কোকো প্লেট থেকে ঘিয়ে ভাজা পরোটা ছিড়ে তাতে নরম মাংস ভরে এগিয়ে দিলো আনাবিয়ার দিকে, জড়ানো স্বরে বলল,
“ভয় নেই, আমি তো আপনার ছেলে আম্মা! আমাকে ভয় পাবেন না, খেয়ে নিন!”
আনাবিয়া চাদরে মুখ লুকিয়ে ছিলো, শুধু চোখ জোড়া বের করে সে দেখছিলো কোকোকে, পর্যবেক্ষণ করছিলো কোকোর চালচলন। কোকোর বাড়িয়ে দেওয়া খাবারের লোকমার দিকে একবার তাকিয়ে এগিয়ে এলো সে সামান্য, সতর্ক চোখে চেয়ে মুখ বাড়িয়ে কোকোর হাত খেয়ে খাবারটা নিয়ে নিলো নরম ঠোঁটের সাহায্যে।
কোকো স্বস্তির শ্বাস ফেললো! ফ্যালকনের মতো তাকেও যদি তার আম্মা দূরে সরিয়ে দিতো তবে কি করতো সে? কষ্টে হয়তো মরেই যেতো!
কোকো আর এক লোকমা খাবার আনাবিয়ার মুখে তুলে দেওয়ার পরমুহুর্তেই হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো ইলহান। আনাবিয়া কেঁপে উঠলো তাতে। কোকো দ্রুত আগলে নিয়ে শান্ত করলো ওকে।
কোকো ইলহানকে ইশারায় শান্ত থাকতে বলল। ইলহান বড় বড় শ্বাস ফেললো কয়েকবার। এইটুকু পথ সে কিভাবে ছুটে এসেছে নিজেও জানেনা। কোকোর থেকে পুরোটা শোনার পর থেকে রাগে তার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়৷
আনাবিয়া ইলহানকে দেখা মাত্রই ডুকরে কেঁদে উঠে ডাকলো,
“চাচাজি!”
ইলহান ভীষণ অসহায় বোধ করলো হঠাৎ। আনাবিয়া এভাবে, এমনভাবে কখনো ডাকেনি তাকে! ইলহানের বুক পুড়লো হঠাৎ, এমন শক্ত পোক্ত ছটফটে মিষ্টি মেয়েটির কি অবস্থা করে দিয়েছে ওই জানোয়ারের বাচ্চাটা!
এগিয়ে গেলো সে বিছানার দিকে, বিছানায় বসতেই আনাবিয়া কান্নাভেজা চোখে হাটুতে ভর দিয়ে বাচ্চাদের মতোন এগিয়ে এলো ওর কাছে। দুহাতে ইলহানের বাহু আকড়ে ধরে কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে সে ফুঁপিয়ে উঠে কাঁদতে শুরু করলো হঠাৎ।
ইলহান কিভাবে স্বান্তনা দিবে বুঝতে পারলোনা, গলা আঁটকে আসতে চাইলো ওর, শত চেষ্টা করেও আনাবিয়ার উদ্দ্যেশ্যে একটা স্বান্তনার বাণী উচ্চারণ করতে পারলোনা সে। তবুও আলতো করে আনাবিয়ার মাথা স্পর্শ করলো সে, ঠোঁট ছোয়ালো আনাবিয়ার চুলের ওপর, মোলায়েম, অস্ফুটস্বরে বলল,
“কাঁদে না, কাঁদে না আমার লক্ষীটি! সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কোকো খাবারের ট্রে টা এগিয়ে দিলো ইলহানের দিকে, ইশারায় বুঝিয়ে দিলো আনাবিয়া রাত থেকে অভুক্ত।
ইলহান সময় নিয়ে কান্না থামালো আনাবিয়ার, মোলায়েম স্বরে স্বান্তনা দিলো ক্ষণে ক্ষণে! আদুরে বাবার মতোন বুঝিয়ে সুঝিয়ে, কতই না অবুঝ কথা বলে পরোটা গুলো একটু একটু করে খাইয়ে দিলো আনাবিয়াকে। আনাবিয়া পেট ভরে খেয়ে অবশেষে ইলহানেরই বাহুর ওপর নিজের ক্লান্ত মাথাখানা ভর দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।
আনাবিয়া ঘুমোলে নিঃশব্দে চোখের কোণে জমা বাষ্পটুকু মুছলো ইলহান। কোকো ফ্যালকন সেদিন যেন আবিষ্কার করলো অন্য এক ইলহানকে, যার ভেতরে সুপ্ত ছিলো এক স্নেহশীল পিতৃসত্তা!
বেলা প্রায় এগারোটা। নিস্তব্ধ কামরার ভেতর কাউচের ওপর এলোমেলো ঘুমিয়ে আছে কোকো, ওর বুকের ওপর হাত পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে লুসি। কাউচের অপর পাশে ফ্যালকন ঘুমোচ্ছে বাচ্চাদের মতোন উপুড় হয়ে।
আনাবিয়ার বিছানায় গভীর ঘুমে ইলহান, ওর বাহুর নিকট গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে চাদরে মোড়ানো আনাবিয়া৷ ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে তার।
গত রাতের ঘুম হীনতায় ক্লান্ত সকলে, সকালে তাই আনাবিয়ার ঘুমের সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়েছে ওরা সকলেই, সকালের খাবার খাওয়ার সময়ও হয়নি কারো।
বাইরে হঠাৎ সামান্য শোরগোলের শব্দ শোনা গেলো তখন। ফ্যালকনের ঘুম পাতলা হয়ে এলো তাতে। ক্ষণিক পর আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতেই দরজায় মৃদু শব্দে নক পড়লো। ফ্যালকন উঠে গিয়ে সন্তর্পণে দরজা খুলতেই জেসার চাপা, আতঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৩
“শেহজাদা ইলহান কোথায়?”
“ঘুমোচ্ছেন তিনি, কেন? কি হয়েছে?”
জেসার দ্বিগুণ আতঙ্কিত হয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“হিজ ম্যাজেস্টি এসেছেন!”

Next part gulo taratari deben please