Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৩

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৩

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৩
ইশরাত জাহান জেরিন

হাসপাতালের করিডরে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে চিত্রা। ফারাজের ইমারজেন্সি অপারেশন হবে। সার্জন বজ্র কায়সার অপারেশনটা করবে। ফারাজের শরীরের বিশেষ কোনো জায়গায় গুলিটা লাগেনি। গুলি তার বুক ঘেঁষে চলে গেছে। করিডোরের সামনে অভ্র দাঁড়িয়ে আছে। তার শরীর জুড়ে রক্তের দাগ। এখনো বুঝতে পারছে না কি থেকে কি হয়ে গেল। এই যে তার শরীর জুড়ে যেই রক্তের দাগ এসব তার ফারাজ ভাইয়ের রক্ত। অভ্র হাতের দিকে তাকালো একবার তারপর চোখ মেলে ফারাজকে অপারেশন থিয়েটারটিকে বাইরে থেকে দেখল। বাসায় খবর যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মোহনা, নদী সবাই চলে এসেছে। রোশান করিডোরের এদিক-ওদিক পায়চারি করছে। জুনায়েদ এলো না। এলো না রাজনও।

তাঁদের কাছে জোহান সব কিছু। ফারাজের তো বাঁচার একটা সুযোগ আছে তবে জোহানের? ভাই হয়ে ফারাজ এটা কি করে পারল? বউয়ের জন্য ভাইকে খুন করল? সামান্য একটা মেয়ে চিত্রা। আহামরি তেমন কিছুই নয়। ওমন মেয়ে রোজ রাজনের বিছানায় টাকার বিনিময়ে আসে। মুতের সঙ্গে রাজন কত এমন মেয়েদেরকে ভাসিয়েছে! রুমানাও এলেন না। চিত্রা এমনিতেও চায় না তারা কেউ আসুক। তার স্বামীর জীবনটাকে যারা শেষ করে ফেলেছে তাদের কোনো অধিকার নেই এখানে আসার। দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা পর বজ্র ভেতর থেকে বের হয়ে আসতেই চিত্রা সহ বাকিরা তাকে ঘিরে ধরল। বজ্র চিত্রার সেই কান্নায় মলিন হয়ে যাওয়া নমনীয় চোখ দু’টোর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চিন্তার কিছু নেই ভাবী। ফারাজ ঠিক আছে। আল্লাহর লাখ লাখ শুকরিয়া গুলি বুকের কাছ ঘেঁষে ছিটকে গেছে। ‘
চিত্রা মিইয়ে যাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘আমি কি দেখা করতে পারব?’

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘এখন না। আপাতত না যাওয়াই ভালো। ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে।’
অভ্রটা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। আয়েশা চিত্রাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি জানতাম আপা ফারাজ ভাই তার আগুন সুন্দরীকে রেখে এভাবে ছোটলোক গিরি করে কোথাও যেতে পারে না।’
চিত্রা তবুও বজ্রকে জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু কতগুলো রক্ত গেল। সে সত্যি ঠিক আছে তো?’
‘তেমন কিছুই হয়নি। আর আপনার স্বামীর আবার এসব গুলি-টুলি সহ্য করার দারুন প্রতিভা আছে। এখন যেহেতু সব জানেনই তাহলে আর বলতে বাঁধা কিসে? অস্ত্র সে বানায়,সাপ্লাই দেয়। তার যেমন অস্ত্রের ভয়াবহতা নিয়ে খেলার অভ্যাস আছে তেমনি অস্ত্রের ভয়াবহতা সহ্য করবারও প্রবল শক্তি আছে।’
চিত্রা তবুও থিয়েটারের জানালার ফাঁক দিয়ে ফারাজের মুখটা দেখার চেষ্টা করল। আহারে কতখানি মায়া ওই মুখটায়। কে জানত ওই মুখটা জান টেনে হিঁচড়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে আনতে পটু? আসলে কেউ তো আর খারাপ নয় কিংবা খারাপ হয়ে জন্মায়না। আমাদের উচিত মানুষকে ভালোবাসা, ঘৃণা করলেও তাকেই করা। কারণ মানুষের অতীত তার বর্তমান কিংবা ভবিষ্যত কখনোই নির্ধারণ করতে পারে না। তবে বিষয় যদি হয় নারী তাহলে কথা ভিন্ন। কারণ সমাজ নারীর গুন কখনোই মনে রাখে না। যা রাখে তা কেবলই দোষত্রুটি।

অক্টোবর প্রায় শেষ। দীর্ঘ নয়টা দিন চিত্রা দমবন্ধ হয়ে পড়েছিল অসুস্থ ফারাজের পাশে। হাতের মুঠোয় বিষের শিশিটা চেপে ধরে বিরবির করে কতবার যে শুধালো, ‘ফারাজ এলাহী আপনিহীন এই আমিটার অস্তিত্ব নেই খোদার সৃষ্টি এই নশ্বর ভুবনে। আপনিহীন আমি এক মৃত কাঠামো। চোখ খোলা থেকেও অন্ধ, নিঃশ্বাস নিলেও প্রাণহীন। আপনি যদি না থাকেন তবে এই পৃথিবীর আলো-হাওয়া, এই আকাশ-জমিন আমার কাছে কেবল এক শূন্যতার কারাগার হয়ে থাকবে।’

সেই রাতে তালুকদার বাড়ির সামনেই ফারাজের গায়ে গুলি লাগল। বুকের কাছ ঘেষে গেছে সেই গুলি। নইলে কখনোই আর তার সুন্দর সকাল দেখার সৌভাগ্য লাভ হতো না। বজ্র আর অভ্র সেদিন ফারাজকে না বাঁচালে কী হতো? এই দুই দিন বজ্রর দায়িত্বে ছিল ফারাজ। ফারাজের সার্জারিটাও সেই করেছে। সবগুলো মানুষ একেবারে ফারাজের সঙ্গে কেমন যেন ভেতর থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। সেই ঘটনার পর দীর্ঘ নয় রাত নিদ্রাহীন চিত্রাঙ্গনা হাসপাতালে ফারাজের বিছানার সঙ্গেই হারিয়ে যাওয়া বর্ণমালার মতো লেপ্টে ছিল। তবে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখময় দিনটি বোধহয় আজকেই। ফারাজ আজকে বাড়ি ফিরবে। সে এখন সুস্থ। পুরোপুরি সুস্থ। গুলিটা সেদিন বেকায়দায় ছোঁড়া হয়েছিল দেখেই ঠিক জায়গায় লাগেনি। যদি একবার লাগত? ভাবলেই গা কেঁপে উঠে চিত্রাঙ্গনার। সেই রাতে বৃষ্টির সময় জ্ঞান হারানোর পর যখন অপারেশন হলো। জ্ঞান ফিরল। চিত্রা পাশে এসে বসতেই দেখল ফারাজের চোখের কোণে জল। সে নিজের অসুস্থের বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আমার পৃথিবীর চোখে জল কেন? সে ভেঙে পড়লে আমি কখনো ফিরতে পারব?’

ফারাজকে আজকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হবে। কিছুদিন বেড রেস্টে থাকবে সে। তবে শুয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন একেবারে পিঠ বসে যাচ্ছে তার। এত শুয়ে-বসে থাকার অভ্যাস ফারাজ এলাহীর কোথায়? তবে এখন তো আর আগের সেই ফারাজ এলাহী নেই। এখন সে সিগারেটটাও ছোঁয় না ঠিক করে, মানুষ খুনের কথা মাথায় আনে না। মাথাভর্তি টেনশন কেবল চিত্রাকে নিয়ে। এই মেয়েটার জন্য ফারাজ চোখ বুজে ভালো হতে পারবে আবার চোখ বুজেই পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ হতে পারবে। নিষ্ঠুর হৃদয়ও প্রেমের ছোঁয়ায় কোমল হয়ে ওঠে। ভালোবাসা খারাপ মানুষকে বদলায় না, বরং তার ভেতরের লুকানো ভালো মানুষটাকে জাগিয়ে তোলে। গাড়ির মধ্যে চিত্রা ফারাজের পাশে বসতেই ফারাজ বলে উঠল, ‘এই বউ কতদিন ধরে গরম গরম শরম ছাড়া প্রেম করি না একবার ভেবে দেখেছো? কি ছোটলোকি কারবার বলো দেখি? না বউ আর পারব না।’
চিত্রা চোখ সরু করে বলল, ‘হায় খোদা আপনি আজকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ পেয়েছেন। আর গাড়ির মধ্যে এসব কি বলছেন? ড্রাইভার কি ভাববে?’

‘ভাববে ফারাজ এলাহীর এনার্জির লেভেল তুঙ্গে। ২০-৩০ টা বিয়ে করলেও এই এনার্জি কমাতে পারব না বোধহয়। তোমার ওপর অনেক লোড যায় তাই না? করবো নাকি গোটা বিশেক বিয়ে? বস্তিতে খাবার পানি সংগ্রহের লাইনের থেকেও লম্বা লাইন দিয়ে মেয়েরা আমার জন্য বসে আছে।’
‘বাসায় নতুন একটা রাম দা আনা হয়েছে। ধার কেমন একটু পরীক্ষা করে দেখতে হবে বুঝলেন তো।’
‘এই আবুলের নাতনি! ভয় পাই তো।’ ফারাজ চিত্রার আপাদমস্তক একবার পরখ করতেই চিত্রা নাক কুঁচকে বলল, ‘ছ্যাহ বাবা কেমন করে নজর দিচ্ছেন? বউয়ের দিকে কেউ এমন করে নজর দেয়?
‘আমি ফারাজ দেই। তুমি বউ নজর দেওয়ার মতোই আগুন সুন্দরী। তবে তোমার ওপর নজর দেওয়ার দায়িত্বটা কেবল আমার। অন্য কেউ দিলে সেও থাকবে না আর চোখও না।’ বলেই ফারাজ চিত্রাকে কোনো সুযোগ না দিয়ে দখল করে নিলো তার ঠোঁট জোড়া। চিত্রা ‘ছাড়ুন দারাজ এলাচী’ বলে শব্দ করতেই ফারাজ আরো শক্ত করে দখলদারি চালালো। একবার থেমে গিয়ে কানের কাছে এসে বলল, ‘আগুন সুন্দরী শব্দ করো না। ফ্লিম বানাচ্ছিনা আমরা।’

সামনের সিট থেকে হঠাৎ অভ্র বলে উঠল, ‘ভাই আমিও ফ্লিম দেখতে বসিনি। আপনার বাড়ির অভাব নেই, বিশাল একটা রুম আছে। দয়া করে যদি বাসার কাজ বাসাতেই সারতেন।’
ফারাজ বিরক্ত নিয়ে অভ্রের দিকে তাকালো। চিত্রা লজ্জায় কি বলবে জানে না। হঠাৎ না পারতে বলে উঠল, ‘অভ্র ভাই আপনি পেছনের সিটে আসবেন? আমি সামনে বসতাম আর কি!’
অভ্র আতঙ্কে পেছন ফিরে বলল, ‘না ভাবী মাফ চাই। আমার বউ আছে ফারাজ ভাইয়ের সঙ্গে ফ্লিমে অভিনয় করার কোনো শখ নেই।’

এই এলাহী বাড়িটা আর যেন আগের মতো নেই। বাড়িতে এসেই ফারাজ চিত্রাকে নিয়ে প্রথম যেই রুমটায় গেল তাতে ফারাজের মায়ের জিনিসপত্র গুলো রাখা। সেই তিন তলার তালাবদ্ধ রুমটা। চিত্রা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব দেখল। সেখানে একটা পিয়ানো আছে। তাতে ধুলোজমে আছে। চিত্রা ফারাজকে জিজ্ঞেস করল, ‘মা কী খুব ভালো গান গাইতে পারতেন?’

‘হুম। তার শৈশব থেকেই ওইসবের প্রতি নাকি একটা ঝোঁক ছিল।’
‘আপনি পারেন বাজাতে?’
‘পারি তো সব কিছুই বাজাতে। তবে কেউ কোথায় দিচ্ছে কোথায় বাজাতে?’
‘আপনার মাথায় দুষ্টু কথা ছাড়া কিছু আসে না।’
হঠাৎ ফারাজ বুকে হাত দিয়ে বুকটা চেপে ধরতেই চিত্রা চিন্তিত ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘হায় খোদা কি হয়েছে? আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে।’
‘এই বউ জলদি চুমু দাও। বুকের ব্যথাটা বেড়েছে।’ ফারাজ চোখ মারতেই চিত্রা তার দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘এসব মশকরা করবেন না। নইলে খারাপ হবে বলে দিচ্ছি।’
‘এই যে তুমি আমায় গরম গরম আদর করতে দিচ্ছো না এর চেয়ে খারাপ কি বা হওয়ার বাকি আছে বিবিজান?’
‘দেব ধরে একটা। ‘

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬২

‘হ্যাঁ বউ ধরেই দিও। আমি কী ছেড়ে দিতে বলেছি নাকি?’
চিত্রা বুঝতে পারল এই লোকের লাগামহীন বেহায়াপনা শুধরোবেই না। বুকে এখনো ব্যথা সে নাকি গরম আদর করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে। তবে কথা হচ্ছে এই গরম গরম আদরটা আবার কী? জলন্ত চুলার ওপর বসে আদর করাকে কি গরম আদর বলে? উঁহু ওটা তো আগুন রোমান্স। তাহলে গরম আদর?
‘কি ভাবছো?’ ফারাজ চিত্রাকে প্রশ্ন করল।
চিত্রা ফারাজের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল, ‘ভাবছি এই গরম আদর আবার কী?’
‘রুমে চলো বুঝাই।’

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৪