Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭২

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭২

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭২
রানী আমিনা

আনাবিয়ার ঘুম ভাঙলো বেশ বেলাতে। বাইরে রোদ ঝলমল করছে। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতেই দেখলো সে নিজের কামরাতেই। গত রাতের স্মরণে আসতেই চোখ গেলো পায়ের দিকে। গোড়ালি নাড়িয়ে দেখলো, ব্যাথা নেই।
স্থীর হয়ে কিয়ৎক্ষণ বিছানায় বসে রইলো সে, গত রাতে মীরের করা প্রশ্ন গুলো একবার মনে মনে আওড়ালো। কিভাবে এই প্রশ্ন গুলো থেকে বাঁচবে বুঝতে পারলোনা। মীর সুযোগ পেলেই আবার এসে জেরা শুরু করবে, তখন কি উত্তর দিবে ও? কি বলবে? ডিটেকটিভের মতোন সব খুঁজে খুঁজে বের করতে করতে কবে না জানি কি বের করে ফেলে!

আচমকা কিছু মনে পড়তেই নড়েচড়ে বসলো আনাবিয়া, ওদের বিয়ের কাগজপত্র! সেগুলো কোথায়? মীর কোথায় রেখেছিলো সেগুলো? ওগুলো মীরের হাতে পড়ে গেলে কি হবে? সত্য লুকানোর জন্য আনাবিয়াকে মাথায় তুলে আছাড় দিবে নিশ্চিত। কষিয়ে থাপ্পড়ও দিতে পারে সেদিনের মতো! থাপ্পড়ের কথা মনে পড়তেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা’গালে হাত চলে গেলো ওর।
মীরের জরুরি কাগজপত্র রাখার ড্রয়ার গুলো খুঁজে দেখতে পেলে হতো। কিন্তু সেগুলো যদি কামরাতেই থাকতো তবে অনেক আগেই মীরের হাতে লাগতো। নিশ্চয় সেগুলো অন্য কোথাও রাখা আছে! মীরের গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র আর কোথায় থাকতে পারে? কোথায় রাখতে পারে জরুরি নথিপত্র গুলো?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

কোকো… কোকো জানে সব। মীরের সাথে তো ও-ই বেশি থাকতো। কোকোর সাথে একবার যোগাযোগ করতে পারলে হতো! কিন্তু ফোনটা তো নেই। সেটা যে রেস্টুরেন্টেই থেকে গেছিলো, ওর টোটব্যাগটার ভেতর। আরমান নামের ছাগলটা রেস্টুরেন্টের বারোটা বাজাতে গেছিলো, ওর কাছে জিজ্ঞেস করলে পাওয়া যাবে।
আনাবিয়া নামলো বিছানা থেকে। ক্ষিদে লেগেছে অনেক, পেটের ভেতর গুড়ুগুড়ু করছে। কিন্তু আরমানের সাথে দেখা করা জরুরি। হাত মুখ ধুয়ে গায়ের টি শার্ট বদলে একটা মেঝে ছোঁয়া গাউন পরে নিলো। চুলগুলো হাতখোপা করে একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে নিলো গায়ে।

দরজা ঠেলে বেরোতেই চোখে পড়লো দুজন দাসীকে। হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা। আনাবিয়াকে দেখা মাত্রই ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে গেলো তারা; অপলক, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো আনাবিয়ার মুখপানে! এমন সময় পেছন থেকে মহসিন এসে ধমকে বলে উঠলো,
“অ্যাই মেয়েরা! এক মাস ধরে কি শিখিয়েছি তোমাদের হ্যাঁ! আদব লেহাজের কোনো ঠিক নেই! মাথা নিচু করো!”
মহসিনের ধমকে মেয়েদুটো থতমত খেয়ে চোখ নামিয়ে নিলো, ভীতসন্ত্রস্ত গলায় বলল,
“ক্ষমা করবেন শেহজাদী!”

আনাবিয়া হাসলো বিনিময়ে, মহসিনকে চোখ গরম দিলো এভাবে ধমকানোর জন্য। মহসিন অপরাধবোধে স্মিত হেসে মাথা নত করে আনুগত্য জানালো ওকে। বলল,
“শেহজাদী, আপনার খাবার প্রস্তুত হয়ে গেছে। দয়া করে খেয়ে বের হোন! নইলে হিজ ম্যাজেস্টি আমাকে বকাবকি করবেন।”
“ঠিক আছে, বারান্দায় রাখো, আমি আসছি।”

বলল আনাবিয়া। মহসিন মেয়েদুটোকে ইশারায় খাবার নিয়ে রাখতে বলল বারান্দা চত্বরের কফি টেবিলের ওপর। মেয়েদুটো ত্রস্ত ভঙ্গিতে এগোলো সেদিকে। ভয়ে ভয়ে খাবার ট্রে থেকে নামিয়ে রাখলো একে একে। মহসিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে ওদের কাজ, এদিক ওদিক হলেই এবার একটা রাম ধমক দিবে ভেবে অপেক্ষায় আছে সে।
আনাবিয়া ধীর পায়ে এসে বসলো কাউচের ওপর, তার প্রতি পদক্ষেপে মেঝেতে হওয়া রুমরাম শব্দে মেয়েদুটো আচমকা চমকে তাকালো। মহসিন নিঃশব্দে চোখে ধমকালো আবারও।
কাঁপা হাতে পানি ঢালতে গিয়ে আচমকা কিছু পানি ছলকে পড়লো টেবিলের ওপর। মহসিন গা ঝাড়া দিয়ে, নাক মুখ কুচকে বিরাট এক ধমক দিতেই যাবে তখুনি তার চোখ গেলো আনাবিয়ার দিকে। শকুনি চোখে তাকিয়ে আছে সে মহসিনের দিকে।

দমে গেলো মহসিন, আনাবিয়া আঙুলের ইশারায় ওকে এই এলাকা ছাড়তে বলল। বাচ্চা মেয়েদুটোকে অকারণে ভয় দেখাচ্ছে। কতই বা বয়স হবে, ষোলো সতেরো! মহসিন চলে গেলে আনাবিয়া পানি ঢালতে থাকা মেয়েটিকে মোলায়েম স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“কি নাম তোমার?”
মেয়েটি যেন চমকে উঠলো, এমন মিষ্টি কন্ঠ সে কখনো শুনেছে কিনা মনে পড়লোনা। ইতস্তত, কাঁপা গলায় সে উত্তর দিলো,

“ফি্‌-ফিলোমেলা, শেহজাদী!”
“তুমি…. তুমি বহির্বিশ্ব থেকে এসেছো?”
“জ-জ্বি শেহজাদী, মাছ ধরারা পেয়েছিলো আমাকে, প্রাসাদের এক লোক বাজারে আমাকে দেখে প্রাসাদে নিয়ে এসেছিলেন।”
“গ্রিস থেকে এসেছো?”
“জ্বি, শেহজাদী।”
“ফিলোমেলা’কে ছিলো জানো?”
“ক্ষমা করবেন শেহজাদী, আমার জানা নেই!”
“আচ্ছা, সময় করে একদিন তোমাকে বলবো ফিলোমেলার গল্প। এখন আমার একদম সময় নেই৷”
আনাবিয়া খাওয়া শুরু করলো। মেয়েদুটো একভাবে দেখতে রইলো ওকে। সারাজীবন রূপকথার রাজকন্যার গল্ল শুনে গেছে ওরা, আজ যেন চোখের সামনে দেখছে! এ বুঝি সত্যিকারের রূপকথার রাজকন্যা৷
মুগ্ধ হয়ে দেখলো ওরা আনাবিয়ার চামচে করে স্যুপ তোলা, গ্লাস টা লম্বা লম্বা নরম আঙুলে ধরে টেরাকোটা রঙা পাতলা ঠোঁটে ছোয়ানো। তার যেন সবই সুন্দর, সমস্তই সুন্দর, সমস্তই মনকাড়া, সমস্তই শিল্প!

আরমানকে পাওয়া গেলো রয়্যাল ফ্লোরের কয়েকটি ফ্লোর বাদে অবস্থিত পুরুষ রাজ কর্মচারীদের আবাসে। আরমান সবেমাত্র সকালের খাবার খেতে বসেছিলো, আচমকা রয়্যাল মেম্বার ইন্ডিকেটরে একটি আর্টিফিশিয়াল ভয়েস বলে উঠলো,
“অ্যালার্ট, বি প্রিপেয়ার্ড, অনারেবল শেহজাদী অ্যান্ড বেগাম আনাবিয়া ফারহা দেমিয়ান।”
আরমানের হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠলো। দ্রুত হাতে খাবার গুলো ঢেকে রেখে পাশ হাতড়ে একটা শার্ট নিয়ে গায়ে চড়িয়ে বোতাম আটকাতে আটকাতে ছুটে বেরিয়ে এলো বাইরে। ফ্লোরে তখন প্রায় কেউই নেই, সকলেই যার যার কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে বাইরে। আনাবিয়া করিডোরে পা রাখতেই আরমান ছুটে এগিয়ে এসে আনুগত্য জানিয়ে আনত চোখে বলল,

“শেহজাদী!”
“তোমার কাছে আমার দরকার ছিলো আরমান, সময় হবে তোমার?”
মোলায়েম গলায় বলল আনাবিয়া, আরমান ভীষণ লজ্জা পেলো। মাথা আরও নিচু করে বলল,
“ছিঃ ছিঃ শেহজাদী, আপনার জন্য জান কুরবান। আপনার জন্য যদি কখনো আমার সময় না হয় তবে আপনি বিনা দ্বিধায় আমাকে মৃত্যুদন্ড দিতে পারেন।”
আনাবিয়া হাসলো, আরমান একপলক চোখ তুলে আনাবিয়াকে দেখে আবার চোখ নামিয়ে নিয়ে আনুগত্যের সুরে বলল,

“আপনি আমাকেই ডেকে পাঠাতেন, শেহজাদী! এত কষ্ট করে এই পর্যন্ত কেন আসতে গেলেন?
“এমনিতেই, ভাবলাম একটু ঘুরে আসি। জানো, আমার মনে হচ্ছে তোমাকে আমি কোথায় যেন দেখেছি, তোমাকে কেমন পরিচিত পরিচিত লাগছে।”
আরমান কি বলবে বুঝতে পারলোনা, আনাবিয়া আবার শুধোলো,
“তুমি কোন আইল্যান্ড থেকে এসেছো?”
“কুরো আহমার, শেহজাদী।”
“আচ্ছা! বাবার নাম কি তোমার?”
“আরিশ শেহজাদী, আরিশ ফেরহান।”
আনাবিয়া ভ্রু কুচকে রইলো, নামটা কেমন যেন শোনা শোনা লাগছে। আরমান তখন আবার বলল,
“উনি ইম্পেরিয়াল ক্রেস্টে পড়াশোনা করেছেন, তারপর রিগালিয়া ইউনিভার্সিটিতে স্নাতক, স্নাতকোত্তর শেষে দাদাজানের বিজনেস ধরেছিলেন।”

আনাবিয়ার মুখখানা হঠাৎ চমক দিলো, মিষ্টি হেসে বলল,
“আরে! তুমি আরিশের ছেলে! তবে তুমি তো আমারও ছেলে! তোমার বাবার সাথে আমি পাঁচ বছর পড়াশোনা করেছি ইম্পেরিয়ালে। তাই তো বলি, এই হ্যান্ডসামের সাথে কার জানি মিল পাই!”
আরমান লজ্জা পেলো, ফর্সা গাল লাল হয়ে উঠলো তার। আনাবিয়া আবার জিজ্ঞেস করলো,
“কি করছে তোমার বাবা এখন? কেমন আছে?”
“বয়স হয়েছে, এখন সবকিছু থেকে অব্যহতি নিয়েছেন। তাছাড়া এখন বেশিরভাগ সময় অসুস্থ থাকেন। হাটাচলা করতে পারেননা তেমন। আম্মা মারা গেছেন কয়েক বছর হলো, তিনি মারা যাবার পর বাবা আরও একা হয়ে গেছেন। একা একা থাকেন, হেল্পিং হ্যান্ড থাকে সবসময় আশেপাশে। এভাবেই চলছে…. আরকি!”
“বাবার বিজনেস এখন কে দেখছে?”

“বড় ভাইজান দেখেন ওসব, আমার ওসবে তেমন ইন্টারেস্ট নাই, আমি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছি। কিন্তু বেশি পড়ে ফেলার কারণে উকিলের পরিবর্তে অন্যকিছু হয়ে গেছি। এখন আমি নতুন নতুন আইন লেখি।”
আনাবিয়া শব্দ করে হাসলো, আরমান যোগ দিলো তার হাসিতে। আনাবিয়া বলল,
“আচ্ছা, তোমার কাছে যে কারণে এসেছি, সেসিন রেস্টুরেন্টে তুমি কি কোনো টোটব্যাগ পেয়েছিলে?”
“জ্বি শেহজাদী, কিন্তু সেটা তো হিজ ম্যাজেস্টির নিকট আছে। আমি সেদিন রাতেই গেছিলাম ব্যাগটা ফেরত দিতে, কিন্তু লিও আর কাঞ্জি ভাইজান আমার থেকে সেটা কেড়ে নিয়েছিলো। কিন্তু হিজ ম্যাজেস্টি হঠাৎ চলে আসায় ব্যাগটা তারা হিজ ম্যাজেস্টির কাছেই হস্তান্তর করেছিলো। আপনি হিজ ম্যাজেস্টির কাছে খুঁজলেই পেয়ে যাবেন।”
আনাবিয়ার মুখের রঙ উড়ে গেলো! ব্যাগে মীরের কালো মলাটের ডায়েরিটা আছে! ওইটা মীরের হাতে পড়ে গেলে আনাবিয়ার জীবন এখানেই শেষ! মীর সব জানতে পারলে রেগে আগুন হয়ে যাবে, কি করে বসবে সে নিজেও জানেনা! আনাবিয়া কিভাবে ডায়েরি টা উদ্ধার করবে ভেবে পেলোনা। আচমকা খেয়াল এলো তার পার্পল মলাটের ডায়েরি টা গতদিন পালানোর সময়ে ব্যাগে ঢুকিয়েছিলো। সেটা কোথায়? ব্যাগেই আছে তো? ঘুম থেকে উঠেই তো ছুটেছে এদিকে!

ওকে এমন স্থির হতে দেখে আরমান বলল,
“শেহজাদী, কোনো সমস্যা হলে বলুন আমাকে! আমি সমাধান করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো!”
আনাবিয়া ভীত চেহারায় তাকালো একবার ওর দিকে, পরক্ষণেই দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলো ফ্লোর থেকে। ফিলোমেলা আর অন্য মেয়েটি বাইরেই ছিলো, আনাবিয়াকে এভাবে বের হতে দেখে ওরাও মুখ চাওয়াচাওয়ি করে ছুটলো আনাবিয়ার পেছনে৷
আনাবিয়া কামরায় ফিরেই খুঁজলো গতরাতের ব্যাকপ্যাকটা, দ্রুত হাতে জিপার টেনে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজলো ডায়েরি টা। নেই! কোথাও নেই! কোথাও না!

রাত নেমেছে কিছুক্ষণ আগেই। অস্ত্রাগারের ভল্টের ভেতর রাখা চেয়ারে বসে আছে মীর। সাম্রাজ্যের কাজ শেষ করে আজ আর রয়্যাল ফ্লোরে ফেরেনি। সরাসরি এখানেই এসেছে। সামনের টেবিলের ওপর রাখা আনাবিয়ার ফোন, চার্জ হচ্ছে। এক কোণায় অনাদরে পড়ে আছে টোটব্যাগটা। সেটা হাতে নিয়ে উপুড় করে ঢেলে দিলো মীর। ভেতর থেকে ধাম শব্দে টেবিলের ওপর আঁছড়ে পড়লো একটা কালো মলাটের ডায়েরি। সাথে পড়লো কয়েকটা মেয়েলি জিনিসপত্র। কয়েকটি চুলের ক্লিপ, হেয়ারব্যান্ড কতকগুলো, একটা লিপগ্লস, একটা কাঠের তৈরি চিরুনি, সিল্কের ন্যাপকিন, কয়েকটি ডার্ক চকলেট বার। মীর একটা প্যাকেট ছিড়ে এক কামড়ে অর্ধেক চকলেট হাওয়া করে দিয়ে দেখতে রইলো অন্যান্য জিনিস পত্র গুলো।

ডায়েরিটা হাতে নিতেই বিস্মিত হলো, এটা তো তারই হারিয়ে যাওয়া ডায়েরি। উপরে ধাতব পাত দিয়ে লেখা ‘SHINZO’ শব্দটা দেখে একটু অবাকই হলো! মীর সরিয়ে রাখলো সেটা, সেলফোনটি চার্জ থেকে খুলে অন করতেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট চাইলো। ক্ষণিক ভেবে মীর নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলির স্পর্শ দিতেই খুলে গেলো লক।
মীর হাসলো মৃদু, ঢুকলো বার্তার ভেতর। ভেতর থেকে কেউ নীতিকথা শোনালো— অন্যের ব্যাক্তিগত বার্তা দেখা খুবই গর্হিত কাজ! পরক্ষণেই ভেতরের অন্য সত্তা নীতিকথা শোনানো সত্তাকে ধমকে বলে উঠলো — কিসের আবার ব্যাক্তিগত? ওর মানেই আমার! বেশি বুঝোস।
নীতিকথার সত্তাটি এমন ধমকে চুপসে গেলো বোধ হয়, টু শব্দট করলো না!
মীর নিজের দ্বৈত সত্তার ঝগড়াতে মজা পেলো বেশ, ফিচেল হেসে দেখতে রইলো কাকে কাকে বার্তা পাঠিয়েছে আনাবিয়া। কোকো, লিও, ফ্যালকন, কাঞ্জি, ইলহান ইত্যাদি ইত্যাদি। স্ক্রল করে নিচে যেতে যেতে এক স্থানে গিয়ে থামলো সে— ‘কালাভুনা’।

লাস্ট কনটাক্টেড ডিসেম্বর ২০২১।
এটা কে?
মীর আইডি সংখ্যা দেখলো। এটাতো তারই ব্যাক্তিগত আইডি! কিন্তু কালাভুনা? এত কিছু থাকতে কালাভুনা কেন? সে কি কালাভুনার মতো? মানে কোন দিক থেকে? সে কালো বলে কালাভুনা? নাকি সে কালাভুনার মতোন টেস্টি?
মীর বেজার হলো, তবুও কৌতুহল নিয়ে ঢুকলো বার্তার ভেতরে৷ আনাবিয়ার বার্তা দিয়েছে তাকে,
— কোথায় আছো? তোমাকে খুঁজে পাচ্ছিনা কেন?
মীর বেরিয়ে এলো মেসেজ বক্স থেকে। এবার ঢুকলো গ্যালারিতে৷ ফোল্ডার অপশনে যেতেই চোখ আঁটকালো ‘uss’ নামক এক ফোল্ডারে, পাশে একটা কালো রঙা ভালোবাসার ইমোজি। ভেতরে ঢুকলো মীর, কোন এক ফটোতে স্পর্শ করতেই বিষম খেলো।

ঘুমিয়ে আছে সে আনাবিয়ার বুকের ওপর, ঠোঁট জোড়া ছোয়ানো আনাবিয়ার উন্মুক্ত বক্ষবিভাজিকায়। আনাবিয়ার মুখে চাপা হাসি, হয়তো লুকিয়ে ঘুমন্ত মীরের ফটোশ্যুট করার উত্তেজনায় বেরিয়ে আসতে চাইছে দুষ্টু হাসির চ্ছটা, অধর জোড়ায় সেটুকু প্রাণপণে আঁটকে রাখার চেষ্টা তার৷
তবে সে আনাবিয়ার সাথে যা-ই করেছে তাতে আনাবিয়ার শতভাগ সম্মতি ছিলো? তবে কোন কারণে তার ওপর মেয়েটির এত অভিমান? কেন সে সর্বদা পালিয়ে বেড়ায় মীরের থেকে?

মীর স্মিত হাস্যে একের পর এক দৃশ্য বদলাতে রইলো, কোথাও মীর কাজে ব্যাস্ত উন্মুক্ত শরীরে, দূর হতে তাকে ক্যামেরাবন্দি করে ঠোঁট চেপে হাসছে আনাবিয়া। কোথাও মীর মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে তাকে, তার অগোচরেই মুখভর্তি খাবার নিয়ে বসে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা! কোথাও সমুদ্র পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজন, কোথাও মীরের হাতে একটা বিরাট কিং ক্র‍্যাব, মুখে বিশ্বজয়ীর হাসি, আরও অনেক অনেক অনেক দৃশ্য!
মীরের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ফুটে রইলো এক চিলতে সুখের হাসি। ওরা দুজন তবে এমনই ছিলো? এমনই উচ্ছল, প্রাণবন্ত, মুক্ত পাখির মতোন! তবে কোন কারণে আনাবিয়া দূরে চলে গেছিলো? কোন কারণে বিচ্ছেদ হয়েছিলো তাদের? কোন কারণে মেয়েটি আসতে চাইতোনা তার কাছে? কোন কারণে সর্বক্ষণ পালিয়ে বেড়ায় সে?
ফোনটা রেখে দিয়ে আনাবিয়ার পার্পল রঙা ডায়েরি টা হাতে তুলে নিলো মীর, মেয়েটি এখানে কি লিখেছে দেখা দরকার, হয়তো কোনোভাবে এই স্তবক গুলো থেকে তার দূরে থাকার রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হবে!

ডায়েরির পাতা উল্টালো মীর, প্রথম দিকে কিছুই লেখা নেই, সবই ফাঁকা, সাদা পৃষ্ঠা৷ একের পর এক যেতে যেতে একসময় কাঙ্খিত স্থানে এসে পৌছোলো মীর। মেয়েটি মধ্যিখান থেকে কেন লেখা শুরু করেছে এর কারণ খুঁজে পেলোনা৷ খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করলো সে আনাবিয়ার গোটাগোটা হস্তাক্ষরে লেখা স্তবক গুলো।
কিন্তু যতটা উৎসাহ নিয়ে পড়া শুরু করেছিলো, তা ক্রমশ বদলে একসময় পরিণত হলো অস্থিরতা, উদ্বেগ, শঙ্কা, উৎকন্ঠায়! ঝড়ো গতিতে প্রতিটা পৃষ্টা এক প্রকার প্রায় গলাধঃকরণ করে সে সশব্দে মেলতে রইলো একের পর এক পাতা! ক্রমশ কপালে ভাজ পড়তে রইলো তার, ভ্রুজোড়া কুঞ্চিত হতে রইলো ধীরে ধীরে!
কিছু বুঝলো, কিছু বুঝলোনা। তবুও প্রাণপণে স্মরণ করার চেষ্টা করলো এগুলো সে কবে করেছে! কবে কখন কিভাবে আঘাত দিয়েছে ছোট্ট মেয়েটিকে, কেন করেছে? কি প্রয়োজন পড়েছিলো তার? তার কোন আঘাতে এত অভিমানে ভর্তি কথা লেখার প্রয়োজন পড়েছে মেয়েটির!

মীর শেষ করতে পারলোনা ডায়েরিটা, সশব্দে বন্ধ করে রেখে ক্ষণিক বন্ধ চোখে চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে বসে রইলো। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে আবার বসলো সোজা হয়ে বসলো। কিয়ৎক্ষণ এক নজরে পার্পল ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে থেকে হাতে তুলে নিলো তার কালো মলাটের ডায়েরি।
হাতে নিতেই অজানা উত্তেজনায় আচমকা বুক কেঁপে উঠলো তার! সশব্দে ডায়েরির প্রথম পাতা মেললো সে, মেলতেই চোখে পড়লো আনাবিয়ার ছোট্ট বেলার একটা মিষ্টি ফটোগ্রাফ! শুয়ে আছে সে বিছানায়, বুক ভরা উৎসাহ নিয়ে দুহাতে ধরতে চাইছে ক্যামেরার পেছনে থাকা মানুষটিকে! গায়ে বেবি পিংকের ড্রেস, দাঁতহীন আদুরে গালে প্রাণোচ্ছল হাসি, ঝলমলে চোখ জোড়া যেন ঝিলিক দিচ্ছে! কি আদুরে, কি আদুরে!
মীর স্নিগ্ধ হাসলো, চোখ জোড়াতে ভর করলো একরাশ মায়া, আদর! বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা ফটোগ্রাফের ওপর দিয়েই আনাবিয়ার ফোলা ফোলা মিষ্টি গাল দুটোয় হাত বুলালো সে। চোখ ভর্তি কৌতুহল, আগ্রহ আর একঝাক মিষ্টি অনুভূতি নিয়ে সে মেলতে রইলো একের পর এক পাতা, ধারণাও করতে পারলোনা অদূর পাতাগুলোতে কোন বিভীষিকা অপেক্ষা করছে তার জন্য!

রাতের শেষ প্রহর। ভল্টের ভেতর পিনপতন নিরবতা। মীর স্তব্ধ হয়ে বসে চেয়ারে। হাতের মুঠিতে তার আর আনাবিয়ার বিয়ের দিনের একটা ফটোগ্রাফ, যা লটকানো ছিলো ডায়েরিরই কোনো এক পাতায়। টেবিলের ওপর মেলানো কালো মলাটের ডায়েরির শেষ লেখা পৃষ্ঠাটি! এখনো সম্পুর্ন ব্যাপারগুলো মস্তিষ্কে প্রক্রিয়াকরণ করতে পারেনি সে। সব অবিশ্বাস্য ঠেকছে তার নিকট, ঠেকছে ধোঁয়াসার মতোন!
অবিশ্বাসী চোখে ফটোগ্রাফটা আরেকবার সামনে ধরে দেখলো মীর, আনাবিয়ার গায়ে সাদা রঙা ঝকমকে গাউন, পাথর গুলো রোদ পড়ে ঝিকিমিকি করছে, শিশুসুলভ, উচ্ছ্বসিত মুখে প্রাণবন্ত হাসি। মীরের রুষ্ট মুখেও লেগে আছে এক চিলতে কোমল, স্নিগ্ধ হাসি! চোখ জোড়া নিবদ্ধ আনাবিয়ার শুভ্র চেহারার দিকে; কত মোহাবেশ, মুগ্ধতা নিয়েই না সে দেখছে আনাবিয়ার হাসিমুখখানা!

কত বাচ্চা ছিলো মেয়েটা! পাতলা, অপরিপক্ক শরীর, অনাবিল হাসি, হীরক খণ্ডের ন্যায় চোখ জোড়ায় কত মনোরম ভঙ্গিতেই না সে কাজল পরেছে! কে পরিয়েছিলো এ কাজল? কে এত মনোমুগ্ধকর, এত হৃদয়গ্রাহী, এত রমণীয় করে সাজিয়েছিলো তাকে? মীর বোধ হয় সারাটা ক্ষণ শুধু ওই মোহনীয়া চোখ জোড়াই দেখে গেছিলো বিমুগ্ধ নয়নে!
আনাবিয়ার অমন প্রফুল্ল, তৃপ্ত চেহারার দিকে চেয়ে মীরের বুকের ভেতর মোচড় দিলো! এত কিছু হয়ে গেছে তার জীবনে? এত কিছু করে ফেলেছে সে? এত কিছু ঘটেছে তার ছোট্ট সংসারে? এত যন্ত্রণা দিয়েছে সে মেয়েটিকে, এত যন্ত্রণা পেয়েছে সে নিজে? অথচ সে এসব জানেনা, কিছুই না! কিন্তু কেন জানেনা? একসাথে এত স্মৃতি ভুলে যাওয়া কি কখনো স্বাভাবিক? শুধু নির্দিষ্ট কাউকে ভুলে যাওয়া কি কখনো স্বাভাবিক?
সহসা কিছু স্মরণে আসতেই মীরের কুঞ্চিত, বেদনাতুর ভ্রুযুগল স্বাভাবিক হয়ে এলো, মিলিয়ে গেলো কপালে ফুটে ওঠা যন্ত্রণার ভাজ! পাথরের মতোন নিশ্চল, স্থির হয়ে ভাবলো সে কিছুক্ষণ। ভাবনার গভীরতা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে ক্রমশ শক্ত হয়ে এলো তার হাতের মুষ্টি! পরক্ষণেই উঠে দাঁড়িয়ে সশব্দে ডায়েরিটা বন্ধ করে বেরিয়ে এলো ভল্ট থেকে। অস্ত্রাগার পেরিয়ে বেজমেন্টের গুপ্ত পথ ধরে সরাসরি এগোলো রেড জোনের উদ্দ্যেশ্যে।

শুকনো পাতার মর্মর শব্দে আচমকা সচকিত হয়ে উঠলো গাছের ডালের ফাঁকে, খড়কুটোর বাসায় থাকা পাখি গুলো। ভয়, কৌতুহল নিয়ে তারা উঁকি দিলো নিচে, স্বর্ণাভ চোখের মালিককে দেখা মাত্রই নিশ্চিন্তমনে আবার গেলো ঘুমোতে।

মীর হেটে চলেছে ব্যাস্ত পায়ে, চোখে মুখে কিসের এক অস্থিরতা, অশান্তি ফুটে আছে তার! কোন অজানা ব্যাথা বারংবার শূলের মতোন বিঁধছে তার বক্ষমাঝে। অথচ এই ব্যাথার হেতু তার জানা নেই!
দূর হতে তার উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই জেগে উঠলো ঘুমন্ত লাইফট্রি, ক্রমশ নড়েচড়ে উঠলো তার ডালপালা গুলো, উজ্জ্বল স্বর্ণালি আলোকে আলোকিত হয়ে উঠলো তার প্রাচীন দেহ৷ মীর ক্লান্ত পায়ে এসে দাঁড়ালো লাইফট্রির সম্মুখে, চোখে ফুটে রইলো এক নামহীন অসহায়ত্ব!
মীরের যন্ত্রণাবিদ্ধ চেহারা মুহুর্তেই পড়ে ফেললো সে। পাতায় জড়ানো নমনীয়, দৃঢ় লতাগুলো সে এগিয়ে দিলো মীরের দিকে, মীরের রুক্ষ—কর্কশ চোয়াল স্পর্শ করলো সেগুলো, লতায় পাতায় ফুটিয়ে তুললো একটি জিজ্ঞাসা,

“ইয়্যু ইন পেইন?”
মীর উত্তর করলোনা এ প্রশ্নের, উত্তর করার প্রয়োজন বোধ করলোনা, ক্ষণিক লাইফট্রির দিকে রুষ্ট চোখে চেয়ে সে ক্লিষ্ট স্বরে পালটা প্রশ্ন করলো,
“হোয়াট হ্যাভ ইয়্যু ডান টু মি?”
“তোমার মস্তিষ্কে কিছু পরিবর্তন এনেছি।”
“তুমি কি জানতেনা এগুলো রুলসের এগেইন্সটে? তবুও কেন করেছো?”
“আমাকে ব্লাকমেইল করা হয়েছিলো।”
“কে করেছিলো? কার কথাতে আমার অনুমতি ব্যাতিত আমার শরীরে চেঞ্জেস এনেছো তুমি?”
“আমার শেহজাদী, আমার বেইবি গার্ল!”
মীর স্থীর হয়ে রইলো, ক্রমশ চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার। চোখ জোড়া জ্বলে উঠলো দপ করে। শক্ত গলায় সে প্রশ্ন করলো,

“টু হুম ডু ইয়্যু বিলং?”
“আ’ বিলং টু ইয়্যু, ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
“তবে দেমিয়ান রুলসের বাহিরে গিয়ে আমার বডিতে চেঞ্জেস এনেছো কোন সাহসে?”
“আমি চেঞ্জেস এনেছি, কিন্তু রুলসের বাহিরে যাইনি।”
“ওহ আচ্ছা! কি আদেশ করেছিলো সে তোমাকে?”
“তার যত স্মৃতি আছে সবই তোমার মস্তিষ্ক থেকে ডিলিট দিতে।”
“আর তুমি দেমিয়ান রুলসের বাহিরে গিয়ে, কোনো বিবেচনা ছাড়াই সেটাই করেছো?”
“না, আমি এমনটা করিনি। আমি তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারিনা।”
মীর সশব্দে, তাচ্ছিল্যভরে হাসলো। এক অব্যক্ত যন্ত্রণার নিদারুণ উপস্থিতি যেন ভেসে উঠলো তার এ অবজ্ঞার হাসিতে! তার আশেপাশের কেউই আর তার বিশ্বাসভাজন নয়, এমনকি স্বয়ং লাইফট্রিও না! আবার তাদের দাবী তারা কেউই বিশ্বাসঘাতক নয়, শুধুই পরিস্থিতির শিকার! হাস্যকর…!
তাচ্ছিল্যভরেই সে জিজ্ঞেস করলো,

“বিশ্বাসঘাতকতা করোনি? তবে কি করেছো?”
“আমি স্মৃতি গুলো ডিলিট দেইনি, লুকিয়ে রেখেছি মাত্র! তালাবদ্ধ করে রেখেছি তোমার মস্তিষ্কেই, উইদ আ টাইমার। নির্দিষ্ট সময় পর তুমি আবারও ফিরে পেতে তোমার সকল স্মৃতি।”
“আ’ নিড অল অব মা’ মেমোরি ব্যাক, রাইট নাও!”
“ইয়্যু হ্যাভ টু ওয়েট অ্যাট লিস্ট টু অ্যান্ড আ হাফ ইয়ার্স, ইয়্যু কান্ট আন্ডারগো টু মেজর অপারেশন উইদিন ফাইভ ইয়ার্স। ইট উইল বি হার্মফুল ফ’ ইয়্যু।”
“আ’ ডোন্ট কেয়ার ইফ ইটস হার্মফুল অর নট, আমার এখনি চাই, অ্যান্ড ইটস অ্যান অর্ডার!”
ঝাঝিয়ে বলে উঠলো মীর৷ লাইফট্রি ক্ষণিকের জন্য স্থীর হয়ে রইলো, সময় নিয়ে নিজের ভেতর প্রসেস করলো সে কিছু। কিছুক্ষণ বাদে নিজের নমনীয় লতাগুলো দিয়ে একটা বার্তা লিখলো,
“হোয়াই ইয়্যু নেভার লিসেন টু মি? ইটস ফ’ ইয়োর য়্যোন গুড!”
মীর অধৈর্য হয়ে উঠলো, দাঁত মুখ শক্ত করে সে আচমকা বজ্র গলায় বলে উঠলো,

“আই সেড ইটস অ্যান অর্ডার!”
“ওকেই ওকেই, কাম ডাউন! বাট আ’ম ওয়ার্নিং ইয়্যু, ইট উইল বি ভেরি পেইনফুল, ইয়্যু কান্ট ইমাজিন হাউ পেইনফুল ইট উইল বি!”
“আ’ ডোন্ট কেয়ার!”
গর্জানো স্বরে বলল মীর! জেদ চেপেছে তার, ভীষণ জেদ! এর শেষ সে দেখবে এবার! কাউকে ছেড়ে দিবে না সে, কাউকে না! আনাবিয়াকেও না, তার সাথে এমন দুঃসাহসিক কাজের ফল তাকে ভোগ করতেই হবে!
লাইফট্রি বোধ হয় হাল ছেড়ে দিলো এবার, ক্রমশ নির্জীব হয়ে আসতে রইলো সে, অনুভূতি থাকলে বোধ হয় কাঁদতে শুরু করতো সে! আচমকা তার শরীরের বাকল গুলো চিরতে শুরু করলো একটু একটু করে, জমকালো স্বর্ণালি আলো বিচ্ছুরিত হতে রইলো তার শরীরের ফাঁকফোকর দিয়ে। ধীরে ধীরে একটি দরজার ন্যায় প্রসারিত হলো স্থানটি। একটি কাঁচের ন্যায় স্বচ্ছ সিঁড়ি নেমে এলো তার ভেতর থেকে। মীর কিয়ৎক্ষণ এক অনুভূতি হীন, নির্বিকার, অটল দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সিঁড়িটির দিকে, পরক্ষণেই দ্বিতীয় বার না ভেবে বাড়িয়ে দিলো পা!

রাতের প্রায় তিন বাজলো, মীর এখনো ফেরেনি কামরাতে৷ আনাবিয়া ঘরময় অস্থির পায়চারিতে ব্যাস্ত! দুশ্চিন্তা ক্রমশ গ্রাস করছে তাকে। এমন ভাবে না বলে কয়ে কখনো বাইরে থাকার মানুষ তো সে নয়! তবে কোথায় গেলো? এখনো কেন ফিরলো না? ডায়েরি টা মিসিং, সারা কামরা খুঁজেও পায়নি সে, মীরের কামরায় যাওয়ার সাহস হচ্ছে না, হঠাৎ যদি ফিরে আসে!
এলোমেলো ভাবনার মাঝেই আচমকা দরজায় করাঘাত পড়লো সজোরে! সচকিত হলো আনাবিয়া, সন্তর্পণে এগিয়ে গিয়ে দ্বিধাভরে ডাকলো,
“ফিলোমেলা?”
ওপাশ থেকে উত্তর এলোনা কোনো, আনাবিয়া ঢোক গিললো, ডাকলো আবার,
“মহসিন?”
এবারও কেউ উত্তর করলো না তার ডাকে! আনাবিয়া হাত বাড়ালো দরজার দিকে, নব ঘুরিয়ে সন্তর্পণে খুললো দরজা। ওপাশে ধরা দিলো এক সুদীর্ঘ, কালো ছায়া। বন্ধ চোখ, যেন এক পাহাড়সম ক্লান্তি তার চোখ জোড়ায়!

“মীর….!”
স্বগতোক্তি করলো আনাবিয়া। বাইরে টা ঘোর অন্ধকার, কোথাও কোনো আলো নেই! আনাবিয়া যেন হাতড়ে এগোলো ছায়াটির দিকে, শুকনো ঢোক গিলে কাছে গিয়ে স্পর্শ করলো ছায়াটির দেহ।
“কোথায় ছিলে এতক্ষন? প্রাসাদে ফেরোনি কেন? কোথাও যেতে হলে বলে তো যাবে!”
উদ্বিগ্ন গলায় বলল আনাবিয়া। মীরের ছায়াটি নড়লো না একচুল, দাঁড়িয়ে রইলো সুস্থির হয়ে! আচমকা দুর্বল পায়ে প্রায় হোচট খেয়ে এগিয়ে এলো সে আনাবিয়ার দিকে, বন্ধ চোখ জোড়া মেলে তাকালো আনাবিয়ার শঙ্কিত দৃষ্টিতে!
আঁতকে উঠলো আনাবিয়া, স্বর্ণাভ চোখ জোড়ায় যেন রক্ত জমে আছে, যেন উপচে পড়বে এখুনি! মুখখানায় ছাপানো বিধ্বংসী যন্ত্রণা! দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণা টুকু গিলে ফেলার প্রাণপণ চেষ্টা করছে মীর, ফুলে উঠেছে তার কপালের শিরা গুলো!

আনাবিয়া আতঙ্কিত, উৎকন্ঠিত স্বরে প্রায় আর্তনাদ করে উঠলো,
“এই কি হয়েছে তোমার? ঠিক আছো তুমি? তোমাকে এমন লাগছে কেন?”
শঙ্কিত মুখে ত্রস্ত দুহাতে মীরের মুখখানা পরম যত্নে আগলে ধরলো সে, স্পর্শ মাত্রই হাতে ঠেকলো চটচটে তরল! চমকে হাত জোড়া আবার নিজের সামনে নিয়ে এলো আনাবিয়া, শুভ্র হাতের তলায় মেরুণ রঙা তরলের উপস্থিতি টের পেতেই বক্ষমাঝে তুফান শুরু হলো তার!
ভয়ে, ত্রাসে ক্ষণিকের জন্য আড়ষ্ট হয়ে গেলো সে, এক অবর্ণনীয় ভীতি সঞ্চার হলো তার চক্ষু যুগলে। পরক্ষণে আতঙ্কিত, বিস্ফোরিত দৃষ্টি মীরের দিকে যেতেই দৃষ্টিগোচর হলো মীরের দুচোখ বেয়ে প্রবল স্রোতের ন্যায় উপচে পড়া গাঢ় লোহিত তরল! সেই বিভৎসতাকে সঙ্গী করেই মীর ক্ষীণ ক্লান্ত হাহাকারের স্বরে বলে উঠলো,
“হোয়াট হ্যাভ ইয়্যু ডান টু মি!”

কথাটি বলার জন্য মুখ খোলা মাত্রই ওষ্ঠাধার বেয়ে গলগলিয়ে নেমে এলো রক্তের স্রোত! পরক্ষণেই নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়লো সে আনাবিয়ার বুকের ওপর! হতভম্ব আনাবিয়া মীরের এমন ভয়ানক, বিভৎস অবস্থায় স্তম্ভিত হলো ক্ষণিক, দুহাতে প্রাণপণে জাপটে ধরে রইলো তাকে বুকের সাথে! পরক্ষণেই ভয়ে, আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সে!
মুহুর্তেই এক বিকট চিৎকারে ঘুম ভেঙে ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়লো আনাবিয়া! হাঁফাচ্ছে সে ভীষণ রকম, আতঙ্কে এখনো দুরুদুরু করছে বুকটা, গলা শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেছে! বাহিরে ফিলোমেলা ছিলো, আনাবিয়ার চিৎকার শোনা মাত্রই দ্রুত দরজা ঠেলে ভেতরে এলো, উদ্বিগ্ন গলায় শুধোলো,

“শেহজাদী, আপনি ঠিক আছেন?”
আনাবিয়া আতঙ্কিত, পাংশু মুখে তাকালো ওর দিকে, অস্ফুটস্বরে বলল,
“পানি…. পানি খাবো!”
ফিলোমেলা ব্যাস্ত পায়ে স্ফটিকের গ্লাসে পানি ঢেলে দিলো এগিয়ে দিলো। ঢক ঢক করে পানি খেলো আনাবিয়া, উর্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করলো,
“মহসিন কোথায়?”
“উনি কামরায় আছেন শেহজাদী, ডেকে দিবো?”
“হ্যাঁ ডাকো!”
আনাবিয়া দুহাতে মাথা চেপে ধরে বসে রইলো কিছুক্ষণ, পরমুহূর্তেই বিছানা ছেড়ে গায়ের ওপর সাটিনের রোব জড়িয়ে বেরিয়ে এলো সে বাইরে। মহসিন ত্রস্ত পায়ে আসছিলো এদিকেই, আনাবিয়াকে বাইরে দেখে আনুগত্য জানিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“শেহিজাদী, আপনি ঠিক আছেন? আপনার শরীর খারাপ লাগছে?”
“ঠিক আছি আমি, মীর কোথায়? সে ফিরেছে?”
“ক্ষমা করবেন শেহজাদী, তিনি রাতে প্রাসাদে ফেরেননি!”
আনাবিয়ার ভয় বাড়লো, ভীত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“লিও কাঞ্জি কোথায়? মীরের সাথে আছে?”
“না শেহজাদী, তারা কামরাতেই আছেন!”
আনাবিয়া ওই অবস্থাতেই উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ছুটলো লিও কাঞ্জির কামরার দিকে। দরজায় করাঘাত করলো সজোরে। আতঙ্কিত স্বরে ডাকলো,

“লিও, লিও…. কাঞ্জি….!”
ক্ষণিকের ভেতরেই হুড়মুড়িয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো লিও, তার পেছন পেছন কাঞ্জি। আনাবিয়াকে এমন আতঙ্কিত হতে দেখে শঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“শেহজাদী, সব ঠিক আছে? আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?”
“মীর কোথায় গেছে?”
“আম্‌-আমাদের তো বলেননি, উনি শুধু বললেন প্রাসাদে ফিরে যেতে, তার কাজ আছে কিছু শেষ করে ফিরবেন বললেন!”
“সে তো এখনো ফিরেনি! কি কাজে গেছে? কোথায় গেছে? তোরা কেন যাসনি তার সাথে? কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস কেন করিসনি?”

উন্মাদের ন্যায় জিজ্ঞেস করলো আনাবিয়া, অদ্ভুত শোনালো তার কন্ঠ! লিও কাঞ্জি কি বলবে বুঝতে পারলোনা, হিজ ম্যাজেস্টিকে প্রশ্ন করার স্পর্ধা কি আর তাদের আছে? তিনি কোথায় যাবেন সেটা তাদের না জানালে তারা জানবে কিভাবে? লিও গলা খাকারি দিয়ে নরম গলায় বলল,
“শেহজাদী, আপনি চিন্তা ক্‌-”
তার বাক্য শেষ করতে দিলোনা আনাবিয়া, তার আগেই ঝাঝিয়ে বলে উঠলো,

“কেন তোদেরকে আমি সর্বক্ষণ ওর সাথে রেখেছি? যেন তোরা ওর ছায়া হয়ে ফিরিস! ও কোথায় যাচ্ছে, কি করছে, ওর কোনো বিপদ হলো কিনা নজরে রাখিস! আর তোরা কি করছিস? এইখানে নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিস? এই তোদের দায়িত্বজ্ঞান! রাতের তিনটা বাজে এখনো সে ফেরেনি! কোথায় আছে কি করছে কিচ্ছু জানিনা আমি!
এখন, এই মুহুর্তেই আমার ওর খোঁজ চাই, যেখান থেকে পারিস আমাকে ওর সংবাদ এনে দিবি, ভালো সংবাদ!”
লিও কাঞ্জি মাথা নিচু করে রইলো, আনাবিয়া রাগে যন্ত্রণায় শ্বাস ফেলতে রইলো ঘন ঘন! চোখ ভর্তি হয়ে এলো আচমকা, বাইরে শুরু হলো ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি! অদ্ভুত এক যন্ত্রণা হচ্ছে ওর বুকে, যেন কিছু একটা ঠিক নেই, কোথাও কোনো গরমিল হয়েছে! দুঃস্বপ্নটির কথা মনে পড়লেই ভয়ে ওর গলা শুকিয়ে আসছে, এক অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে ফেলতে চাইছে ওকে!

“আপনি শান্ত হোন শেহজাদী, আমরা এখনি খোঁজ লাগাচ্ছি হিজ ম্যাজেস্টির অবস্থানের ব্যাপারে!”
আনুগত্যের সাথে বলল কাঞ্জি। আনাবিয়া চোখ মুছলো অপ্রকৃতিস্থের মতোন! উদ্বিগ্ন, অস্থির পায়ে সে পায়চারি করতে শুরু করলো বারান্দায়, ছটফটিয়ে উঠতে রইলো ক্ষণে ক্ষণে!
লিও কাঞ্জি তৈরি হয়ে বাইরে বেরোতে নিতেই আনাবিয়া এগিয়ে আঁকড়ে ধরলো লিওর বাহু, লিও থেমে মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, আনাবিয়া নিজের মোলায়েম হাতে ওর মুখখানা স্পর্শ করে কম্পিত, জড়ানো গলায় বলল,

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭১

“বকা দিয়েছি বলে আমার ওপর অভিমান করিস না! আমার চিন্তা হচ্ছে বলে বকা দিয়েছি, দ্রুত ফিরে আসবি, আমি কিন্তু অপেক্ষা করবো!”
লিওর ঠোঁট ফুলে উঠতে গিয়েও উঠলোনা, প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে সংবরণ করলো সে, অস্ফুটস্বরে বলল,
“চিন্তা করবেন না শেহজাদী, আমরা দ্রুতই ফিরবো। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন, জেগে থেকে শরীর খারাপ করবেন না!”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭৩