Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯২ (২)

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯২ (২)

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯২ (২)
রানী আমিনা

প্রসববেদনা ক্রমে গুরুতর হলো আনাবিয়ার, একই সাথে বাড়লো তার ব্যাথাতুর আর্তনাদের জোর! মীরের বুকের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে রেখে নিজেকে সে প্রস্তুত করলো ওয়াটার বার্থ এর জন্য। মীর শক্ত করে জাঁপটে ধরে রইলো ওকে নিজের সাথে, আনাবিয়ার যন্ত্রণাপূর্ণ মুখপানে চেয়ে, ওর অসহায় আর্তনাদে বারংবার অভিশাপ দিতে রইলো নিজেকে!

আনাবিয়া ভয়ে, আতঙ্কে, যন্ত্রণায় ঝড়ের কবলে পড়া ছোট্ট চড়ুইটির মত ছটফটিয়ে উঠতে রইলো ক্ষণে ক্ষণে, নিজেকে যেন ঠেলে ঢুকিয়ে ফেলতে চাইলো মীরের বুক পাজরের ভেতর! কিন্তু ওর ওই যন্ত্রণাবিদ্ধ মুখপানে অসহায়, থমথমে চোখে চেয়ে থাকা ব্যাতিত মীরের আর কিছুই করার রইলো না৷
ডোবার পানি ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, যেন আলো ঠিকরে বের হতে রইলো তা থেকে। নাতিশীতোষ্ণ পানি উষ্ণ হয়ে উঠলো ক্রমশ। মীর আনাবিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে সাহস দিতে রইলো, চেষ্টা করতে রইলো ওকে সম্পুর্ন সজাগ রাখার। প্রচন্ড প্রসববেদনায় দাঁত লেগে যেতে চাওয়া আনাবিয়ার হঠাৎ মনে হলো এই সমস্ত ফেলে সে চলে যায় কোথাও! এত যন্ত্রণা সে কিভাবে সইবে? যন্ত্রণায় জ্ঞানলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হচ্ছে যে তার!

অবশেষে এলো সেই কাঙ্খিত ক্ষণ! আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে, ডোবার উজ্জ্বল পানিকে রক্তাক্ত করে আনাবিয়া জন্ম দিলো এক শেহজাদার! মুহুর্তেই শেহজাদার শরীর হতে নির্গত তীব্র দৃশ্যমান রেডিয়েশনে পরিপূর্ণ হয়ে এলো কণ্টকাকীর্ণ শক্ত লতায় ঘেরা সম্পুর্ন স্থানটা! উজ্জ্বল বেগুনি আলোকে আলোকিত হয়ে এলো সমস্তটা।
মীর তৎক্ষনাৎ এক হাতে পানি থেকে তুলে নিল তাকে। খোলা বাতাসের সংস্পর্শে আসা মাত্রই তারস্বরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো শেহজাদা! শরীর হতে তার বেরোতে রইলো নীলচে উজ্জ্বল দ্যুতি! চতুর্দিকের রেডিয়েশন তৎক্ষনাৎ দ্যুতি ছড়াতে রইলো আরও প্রকটভাবে।
বহুল আকাঙ্ক্ষিত সন্তানের ক্রন্দনধ্বনিতে যেন শীতল হয়ে এলো আনাবিয়ার বক্ষ! মীরের বুকে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে বিশ্রাম নিলো সে ক্ষণিক। ভীষণ ক্লান্তিতে চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে আসতে চাইলো তার! মীর ডাকলো দুবার,

“শিনজো! শিনজো, আমার প্রাণ! চোখ খোলো!”
সাড়া দিলনা আনাবিয়া, ক্রমশ ছেড়ে দিতে রইলো তার শরীর, যেন ডুবে যাচ্ছে সে কোনো সমুদ্রের কালচে অতলে! এতটুকু বল খুঁজে পাওয়া দায়!
মীর আতঙ্কে পাংশু হয়ে গেলো মুহুর্তেই! হাতের শেহজাদাকে ডোবার পাড়ে রেখে দিয়ে আনাবিয়াকে নিজের দিকে ফিরিয়ে চোয়ালে আলতো চাপড় দিতে দিতে আতঙ্কিত, অস্থির স্বরে ডাকলো,
“শিনজো, শিনজো তাকাও আমার দিকে! চোখ খোলো! এই শুনতে পাচ্ছো তুমি আমাকে? এই কথা বলো! শিনজো!”
আনাবিয়ার চোখ উল্টে যেতে রইলো। মীরের বাহু আঁকড়ে ধরা হাতখানা শিথিল হয়ে এলো ক্রমে, মুষ্টি আলগা হয়ে আচমকা হাতখানা পড়ে গেলো নীচে!
প্রমাদ গুণলো মীর! বিস্ফোরিত চোখে আনাবিয়ার ফ্যাকাসে মুখপানে চেয়ে উচ্চস্বরে আর্তনাদ করে ডেকে উঠলো,

“শিনজো! প্রাণ আমার চোখ খোলো! চোখ খোলো শিনজো!”
আনাবিয়া সাড়া দিলনা, ক্রমশ নেতিয়ে এলো তার শরীর! বিড়বিড়িয়ে বলতে চাইলো কিছু, কিন্তু সম্পুর্ন করতে পারলোনা বাক্য, তার পূর্বেই জ্ঞান হারিয়ে আছড়ে পড়তে নিলো সে পানির ভেতর!
মীর অস্থির হয়ে প্রাণপণে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলো ওকে, কিন্তু জ্ঞান হারাতেই সশব্দে ডুকরে কেঁদে উঠলো মীর! আনাবিয়াকে সজোরে বুকের ভেতর টেনে নিয়ে ওর কপালে একটা জোরালো চুম্বন বসিয়ে ওর শরীরটা ঝাঁকিয়ে জাগানোর চেষ্টা করলো বার! উন্মত্তের ন্যায় ডাকলো যেন শতকোটি বার! কিন্তু সামান্য সাড়া টুকুও দিলনা আনাবিয়া।
মীর আচমকা উন্মাদের ন্যায় চুমু খেলো ওর মুখজুড়ে, তারপর ওর হাত জোড়া ডোবার কিনারে থাকা লতাগুল্মের সাথে শক্ত করে বেঁধে দ্রুতবেগে উঠে এলো ডোবা ছেড়ে। উদ্দ্যেশ্য তার লাইফ ট্রি —আনাবিয়ার তৈরি কাঁটায় মোড়া লতার গম্বুজের ঠিক বাহিরেই!
ছুটে গিয়ে নিজের সমস্ত শক্তিতে মীর ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলো ডোমের একাংশ। ইস্পাতের ন্যায় দৃঢ় লতাগুলোতে বর্শার ফলার মতোন তীক্ষ্ণ কন্টকে ক্ষতবিক্ষত হলো ওর হাতের মুষ্টি! পেছন ফিরে একবার দেখলো আনাবিয়াকে। ঘাড় টা নেতিয়ে ঝুঁকে আছে সামনের দিকে, জ্ঞানহীন! লতাগুল্ম গুলো কোনোরকমে ধরে রেখেছে তার শিথিল দেহ।

মীর অশান্ত, অস্থির, বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো! তীব্র শোকে, ক্ষোভে যেন ক্রমশ উন্মাদ হলো সে। নিজের বজ্রমুষ্ঠির একের পর এক সজোর আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে ফেললো সে ডোমটিকে! ক্ষতবিক্ষত হাত হতে স্রোতের ন্যায় বইতে রইলো মেরুণ রঙা তরল!
মূহুর্তেই ডোমের ভেতরে থাকা সমস্ত রেডিয়েশন তীব্র বেগে ছড়িয়ে পড়তে রইলো রেড জোন জুড়ে! তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে উঠলো লাইফ ট্রি! নিজের চিরাচরিত স্বর্ণাভ দ্যুতি ছড়িয়ে সে বাড়িয়ে দিলো নিজের সরু ডাল গুলো।
মীর ডোম ভেঙে বাইরে বেরিয়েই হাঁফাতে রইলো, নীলচে বেগুনি রেডিয়েশন গুলোকে এভাবে ছড়িয়ে পড়তে দেখে ক্ষণিকের জন্য থমকালো সে। কিন্তু আনাবিয়ার মুখখানা মনে পড়তেই কোনো কিছুরই পরোয়া করলোনা আর! লাইফট্রি মুহুর্তেই নিজেকে নিয়োজিত করলো আরেকটি নতুন ডোম তৈরিতে। কিন্তু মীর তা দেখা মাত্রই সবেগে ছুটে গিয়ে চেপে ধরলো লাইফট্রির শক্ত, নমনীয় ডালগুলো। ভ্রুজোড়াতে কঠোরতার ভাজ ফেলে কর্কশ স্বরে বলে উঠলো,

“শী ইজ নট রেসপন্ডিং! ডু সামথিং!”
“ইউ নেভার লিসেন টু মি, সো ডু হোয়াট ইউ ক্যান ডু। আই হ্যাভ মাই প্রায়োরিটিস।”
লাইফট্রি পালটা উত্তর দিলো তাকে আজ। পরক্ষণেই লেগে গেলো ডোম তৈরির কাজে৷ মীর ক্রোধে যেন উন্মাদ, অন্ধ হয়ে গেলো হঠাৎ। সবেগে লাইফট্রির একটি ডাল সজোরে চেপে ধরে হিংস্র পশুর মতন কাঁমড়ে ছিড়ে আলাদা করে ফেললো সে। লাইফট্রি ডোম তৈরি রেখে পরখ করলো মীরকে ক্ষণিক, কিন্তু মীরের ব্যাবহারে কোনো পরিবর্তন না দেখে নিজের সমস্ত ডালপালা দিয়ে আচমকা আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেললো মীরকে। কিন্তু অশান্ত মীর নিজের ধারালো নখর দিয়ে ছিড়ে ফেলতে রইলো লাইফট্রির সরু ডালগুলো, কামড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেললো লাইফট্রিকে! তাকে আঁটকে রাখাই যেন দূরুহ হলো!
লাইফট্রি স্থীর হয়ে ক্ষণিক যেন পর্যবেক্ষণ করলো ওকে। মীর নিজেকে লাইফট্রির বন্ধন হতে ছাড়ানোর চেষ্টায় ধারালো দাঁতে লাইফট্রির একটি সরু ডাল সজোরে কামড়ে ধরে শকুনি চোখে চেয়ে রইলো লাইফট্রির দিকে। যেন সরাসরি যুদ্ধে আহ্বান করছে সে লাইফট্রিকে, হয় সে কথা শুনবে নয়তো মীর তাকে ছেড়ে দিবে না।
লাইফট্রি ওকে আঁকড়ে ধরে রেখেই বলে উঠল,

“ইউ রিমেইনড জাস্ট অ্যাজ স্টাবর্ণ ইয়োর হ্যোল লাইফ! অ্যান্ড অফকোর্স, ইউ আর দ্যা অনলি পা’সন হু’জ এভার পিকড আ ফাইট উইদ মি। অ্যান্ড অভিয়াসলি আই লাভ ইউ।”
লাইফট্রি ছেড়ে দিল মীরকে। ডোম তৈরি রেখে সে মীরকে লতায় জড়িয়ে টেনে নিয়ে গেলো আনাবিয়ার নিকট৷ এক ধাক্কায় ওকে ডোবার ভেতর ফেলে দিয়ে নিজের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্বর্ণাভ লতা গুলো দিয়ে আনাবিয়াকে বেঁধে নিলো মীরের সাথে৷ মীর প্রায় নিস্পন্দ আনাবিয়াকে দ্রুতহাতে তৎক্ষনাৎ জড়িয়ে নিলো নিজের বুকের ভেতর। স্বস্তির শ্বাস ফেলে মুখ ডুবালো আনাবিয়ার গ্রীবায়!
ক্ষণিকের ভেতরেই মীরের কুচকুচে কালো শরীর হতে এক স্বর্ণাভ রশ্মির দ্যুতিময় স্রোত বেরিয়ে ক্রমশ প্রবাহিত হতে রইলো আনাবিয়ার সমস্ত শরীর জুড়ে৷ যেন মীরের শরীর হতে শক্তি শুষে নিতে রইলো একটু একটু করে!
মীর আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিলো আনাবিয়াকে। কিছুক্ষণ বাদেই ধীরে ধীরে সাড়া দিতে রইলো আনাবিয়া, আস্তে আস্তে সম্পুর্ন জ্ঞান ফিরে পেতেই জোরে জোরে দম ফেলে নিভু নিভু, আতঙ্কিত চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো সে একবার মীরকে। মীর সজোরে চেপে ধরলো ওকে বুকপরে, কম্পিত স্বরে বলে উঠলো,
“ভয় নেই, আমি আছি।”

এরপর কয়েক মিনিটের বিরতিতে, প্রচন্ড প্রসববেদনায় রেড জোন কাঁপিয়ে চিৎকার করে আনাবিয়া একে একে জন্ম দিলো তার বাকি সন্তানদের! উচ্চস্বরে কেঁদে উঠে ধরণীর বুকে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে রইলো তার পাঁচজন শেহজাদা! মুহুর্তেই সমস্তটা পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো নীলচে বেগুনি রঙা তীব্র রেডিয়েশনে৷ লাইফট্রি নিজ শক্তিতে তৈরি করে ফেললো আরও একটি ডোম। যেন রেডিয়েশন কোনোভাবেই রেড জোনকে আক্রান্ত করতে না পারে।
শেহজাদাদের ক্ষুধার্ত ক্রন্দনধ্বনি ছড়িয়ে পড়লো সমস্ত রেড জোনে। আনাবিয়া নিভু নিভু চোখে দেখলো একবার ওদের, পরক্ষণেই ঝাপসা হয়ে এলো ওর দৃষ্টি। মীরের বক্ষপরে এলিয়ে পড়লো সে, শরীর শিথিল হয়ে পড়ে যেতে নিতেই মীর জাপটে ধরলো ওকে৷
শরীর হতে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি বেরিয়ে যাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর হল তার জন্যও! কাঁপতে শুরু করলো তার বলিষ্ঠ পা জোড়া, বুজে আসতে চাইলো চোখজোড়াও, তবুও প্রাণপণে নিজেকে সজাগ রাখলো মীর। এক হাতে আনাবিয়াকে সজোরে বুকে চেপে ধরে অন্য হাতে ডাঙায় শুইয়ে রাখা ক্রন্দনরত শেহজাদাদের আগলে নিল সে।

কিন্তু দুর্বল শরীরটা আর পেরে দিলনা, হাল ছেড়ে দিতে রইলো! চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে এলো ক্রমশ, তবুও ডাঙায় থাকা লতাগুল্ম গুলোর এক ঝাঁককে অবলম্বন করে চেষ্টা করলো দাঁড়িয়ে থাকার। প্রাণপণ চেষ্টা বিফলে গিয়ে ক্ষণিক পরেই জ্ঞানলুপ্তি হলো তার, কিন্তু মুঠি দুর্বল হলোনা। সজোরে মুঠির ভেতর ধরে রইলো লতাগুল্ম গুলোকে! জ্ঞানহীন আনাবিয়া লেপ্টে রইলো তার বুকপরে।
লাইফট্রি ধীরে ধীরে বাড়িয়ে দিলো নিজের ডালপালা গুলো। আলতো করে পানি হতে দুজনকে টেনে উঠিয়ে নিয়ে এলো পাড়ে৷ শেহজাদাদের নাড়ী তখনো সংযুক্ত আনাবিয়ার শরীরের সাথে৷ লাইফট্রি বিচ্ছিন্ন করে দিলো সেগুলো। ক্রন্দনরত বাচ্চাগুলোকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে উষ্ণতায় ভরিয়ে তুললো।
মাটিতে আনাবিয়াকে জড়িয়ে পড়ে থাকা মীরের আলিঙ্গন থেকে ওকে ছাড়িয়ে নিয়ে পরীক্ষা করতে চাইলো একবার। কিন্তু মীরের শক্ত, দৃঢ় আলিঙ্গন থেকে আনাবিয়াকে ছাড়ানো সম্ভব হলোনা! অগত্যা মীরকে সহই আনাবিয়াকে নিয়ে নিলো সে নিজের ভেতর।

জ্ঞান ফিরে পেয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে পড়লো মীর৷ চারদিকে ঘন আঁধার দেখে হঠাৎ দিশেহারা হয়ে উঠলো, আনাবিয়াকে মনে পড়তেই উতলা হলো আরও। অস্থির হয়ে পাশে তাকাতেই আনাবিয়ার উজ্জ্বল সফেদ শরীর চোখে পড়লো তার। ঘুমিয়ে আছে সে, মুখখানা তৃপ্তিতে মোড়ানো৷ বাচ্চারা লেগে আছে আনাবিয়ার উন্মুক্ত শরীরের সাথে, কেউ বুকের ওপর, কেউ ওর হাতে, কেউ বা তলপেটের ওপর। এলোমেলো ঘুমিয়ে আছে সকলে।

তখনি চারদিকটা হয়ে উঠলো আলোকিত। মীর হঠাৎ আলোকে চোখ কুচকে নিলো তৎক্ষনাৎ। আলোটা সয়ে যেতেই চারদিকে চেয়ে দেখলো সে। ছোট্ট একটি কামরা সদৃশ কোটর, দেয়াল জুড়ে অদ্ভুত সুন্দর লতার নকশা। মীর বিছানার দিকে দেখলো একবার। নরম, মখমলের মতোন সবুজ শ্যাওলার আস্তরণে মোড়া এক বিরাট বিছানা, মোলায়মে বিছানায় সে ডুবে যাওয়ার উপক্রম!
কামরার এক কোণে দেয়াল বেয়ে নেমে এসেছে একটি জীবন্ত, উজ্জ্বল সফেদ রঙা লতা, যা থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ছে বিশুদ্ধ, মিষ্টি পানি।
মীর উঠে পড়লো বিছানা ছেড়ে। ঠিক কোথায় আছে ঠাহর করতে পারলোনা প্রথমটায়৷ লতা থেকে ঝরে পড়া পানিটির কাছে গেলো একবার। নকশাদার সিরামিকের এক বিরাট পাত্র টইটম্বুর হয়ে আছে স্বাদু পানিতে।
মীর সন্দেহের চোখে মনোযোগী চোখে দেখলো সেদিকে। না, কোনো পার্টিকেল চোখে পড়ছেনা, অতএব পানিটা নিরাপদ।

মীর কিভাবে পানি খাবে ভাবতেই একটি লতা এঁকেবেঁকে এসে এগিয়ে দিলো একটি সিরামিকের গ্লাস। মীর খপ করে ধরে ফেললো লতাটি। সেটি সাঁপের মতো কিলবিলিয়ে উঠে ছাড়া পেতে চাইলো মীরের হাত থেকে৷
মীরের কপাল টানটান হয়ে এলো। দ্রুত হাতে পানিটুকু খেয়ে নিয়ে সে খুঁজলো বাইরে বের হওয়ার দরজা, পেয়েও গেলো। দরজা ঠেলে বাইরে পা রাখতেই চমকালো সে।
নিচের মেঝেটা অদ্ভুত; কোথাও শক্ত মসৃণ কাঠের স্পর্শ, আবার তার ভেতরেই, স্থানে স্থানে চকচকে মেটালিক অ্যালয়ের শীতল স্পর্শ। বিস্মিত চোখে কিছুক্ষণ সেটা পরখ করে সম্মুখে তাকালো মীর।
চতুর্দিকে অদ্ভুতুড়ে সবুজাভ, শ্যাওলা ধরা দেয়াল। সেগুলো বেয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে হাজারো লতাগুল্ম। ভালো ভাবে লক্ষ্য করতেই দেখলো সেগুলো আসলে সম্পুর্নটা লতা নয় —ফাইবার অপটিক ক্যাবলের সাথে জীবন্ত শিকড় জড়িয়ে আছে আষ্টেপৃষ্টে! কোনটা প্রকৃতি আর কোনটা প্রযুক্তি তা আলাদা করা যেন অসম্ভব। সেই ক্যাবল আর শিকড়ের ধমনী বেয়ে বয়ে চলেছে নীল আর নিয়ন-সবুজ রঙা উজ্জ্বল তরল আলো!
মীর অবশেষে বুঝতে পেলো সে ঠিক কোথায় আছে। আনাবিয়া তার স্মৃতি মুছে দেওয়ার আগ মুহুর্তে ঠিক এমনই দৃশ্য দেখেছিলো সে! মীর বিস্ময় নিয়ে এগোলো সামনের দিকে। আলো আঁধারিতে যেন গা ছমছম করে উঠলো তার!

ভেতরটা সম্পুর্ন আলোকিত হয়ে আছে সেই নীলচে মায়াবী দ্যুতিতে! কান পাতলে শোনা যাচ্ছে কোন এক অদ্ভুত, মৃদু, ছন্দময় শব্দ, যেন গাছের শরীরের পানি প্রবারের শব্দের সাথে মিশে গেছে প্রাচীন সার্ভারের শান্ত গুঞ্জন। পুরো গাছটা যেন গভীর ঘুমে মগ্ন কোনো বিশাল জীবন্ত প্রাণী, যে প্রতিনিয়ত শ্বাস নিচ্ছে তালে তালে!
​ভেতরের দিকে আরও হেঁটে যাওয়ার পর মীরের চোখে পড়লো মাথার ওপরের ছাদ সদৃশ স্থান হতে ঝুলে আছে স্ফটিকস্বচ্ছ লতানো পাতার ঝাঁক! ভেতরে প্রবাহমান মৃদুমন্দ বাতাসে সেগুলো চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে হালকা হলোগ্রাফিক আলো, এক অদ্ভুত শো শো ভেসে আসছে তা থেকে!
​বাতাসটা এখানে যেন একদমই অন্যরকম। হাজার বছরের পুরোনো এয়ার ফিল্টারিং সিস্টেম আর গাছের সালোকসংশ্লেষণ মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে গেছে। প্রতি নিঃশ্বাসে ফুসফুসে প্রবেশ করছে এক অদ্ভুত, ভারী, শীতল হাওয়া। মীরের কষ্ট হলো প্রথমটায়, ক্রমশ এই অদ্ভুত পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিলো তার ফুসফুস।

মাথার ওপর তাকাতেই দেখলো নিঃশব্দে উড়ে চলে যাচ্ছে কিছু ছোট্ট ছোট্ট রোবোটিক পতঙ্গ। কৌতুহলী চোখে তাদেরকে দেখে চললো মীর, শরীরটা ধাতব ড্রোনের মতোন, অথচ ডানাগুলো তৈরি নিখুঁত সবুজ পাতা সদৃশ বস্তু দিয়ে৷ উড়ে উড়ে তারা করে চলেছে সম্পুর্ন গাছের অভ্যন্তরীণ পরিচর্যা। মীর হাসলো, আনাবিয়া দেখলে নিশ্চয় কয়েকটাকে চুরি করে নিজের জামার ভেতর পুরে নিয়ে যেতে চাইবে ভেবে পুলকিত হলো।
​অবশেষে এই মহাবৃক্ষের একদম কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে থমকে দাঁড়িয়ে গেলো মীর। সেখানে গাছের মূল শিকড়গুলো চতুর্দিক থেকে এসে জটলা পাকিয়ে শক্ত বন্ধনে ধরে রেখেছে একটি বিশাল, ভাসমান কোয়ান্টাম ক্রিস্টাল! ক্রিস্টালটি হালকা বেগুনি আলো ছড়িয়ে কেঁপে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে, ঠিক যেন হৃদস্পন্দন।
মীর স্থীর, অবাক চোখে দেখে চলল সেটি! কোনো এক নস্টালজিয়ায় যেন হারিয়ে গেলো সে! সহস্রাব্দ ধরে একা হয়ে থাকা সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিভাবে এই অজানা বৃক্ষের মস্তিস্কে পরিণত হয়ে উঠেছে সেটা ভেবে কূল কিনারা পেলোনা!

আচমকা পেছন হতে কারো টোকা পেয়ে চমকে উঠে ঘুরে তাকালো মীর, এক গুচ্ছো লতা খাবার ভর্তি ট্রে হাতে ঘুরে চলেছে। মীর তাকাতেই ঢাকনা খুলে গেলো ট্রের। অন্যান্য লতাগুলো মিলে মিশে চোখের সামনে আঁকলো একটি বার্তা,
“ইয়োর ফেভরিট ফুড, ঈট আপ বয়।”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯২

খাবার দেখতেই ক্ষুধাটা যেন পেটের ভেতর অ্যানকন্ডার মতো পেঁচিয়ে উঠলো। মীর সেদিকে এগোতে গিয়েও থেমে গেলো আবার, তারপর পেছন ফিরে ঠিক যে পথে এসেছিলো সে পথেই ছুটে গেলো আনাবিয়াকে খুঁজতে।
লতাগুলো ক্ষণিক সেদিকে চেয়ে রইলো যেন, ব্যাপারটা বুঝতে পারা মাত্রই দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো একটা, তারপর খাবারের সম্পুর্ন ফ্যামিলি প্যাক নিয়ে এগোলো মীরের পিছু পিছু।

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here