Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯২

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯২

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯২
রানী আমিনা

“শিনজো, ঘুম থেকে উঠো। বিকেল পড়ে গেছে, সারাদিন এভাবে ঘুমোলে চলবে কি করে। উঠো, হাটাহাটি কর‍তে হবে।”
আনাবিয়ার ফোলা চোয়ালে আলতো চাপড় দিতে দিতে কথা গুলো বলল মীর৷ আনাবিয়া কপাল কুচকে মুখখানা অন্যদিকে ফিরিয়ে ঘুমোতে নিল আবারও।
বিগত দুমাস ধরে হঠাৎই ঘুম আর ক্ষুধা বেড়েছে তার। সারাদিন সারারাত ঘুমোচ্ছে, খাওয়ার সময় হলে তাকে ডেকে ডেকে উঠিয়ে খাওয়াতে হচ্ছে মীরের। একবার খাওয়া শুরু করলে আর থামাথামির নাম নেই, প্রতিবেলা সাত আট কেজি লাল মাংস সে একাই সাবাড় করছে, মাংস ব্যাতিত অন্য কিছু তাকে খাওয়ানো দুষ্কর। তারপর আবার ঘুম!
তার প্রাত্যহিক জীবনের সব কাজ গুলো মীরকেই করে দিতে হচ্ছে আজকাল, রাজদরবারে সময় দিচ্ছেনা বললেই চলে৷ আনাবিয়া নিজের জ্ঞানে চলছেনা, তাকে যেটা করতে বলা হচ্ছে ঘুমের ঘোরে সে সেটাই করছে, এর বাইরে কিছু করার ক্ষমতা আচানক লোপ পেয়েছে তার। ঘুম আর খাবার কাজটাই একমাত্র নিজ ইচ্ছেতে করছে৷

আনাবিয়াকে টেনে উঠাতে হল। ঘুমের ঘোরে থাকা আনাবিয়াকে বুকের ওপর নিয়ে, নিজের পায়ে ওপর ওর পায়ের ভর রেখে দাঁড়া করিয়ে হাটতে হাটতে বাইরে নিয়ে এলো মীর। মৃদু শাসনের স্বরে বলল,
“সারাদিনে একটুও মুভমেন্ট না করলে শরীর যে খারাপ হবে এটা বুঝোনা কেন?”
আনাবিয়া ঘুমে এখনো, ক্লান্তিতে চোখ মেলা দায়। ভারী পেটের কারণে নিজে নিজে হাটতে পারেনা সপ্তাহ দুই হল। ঘুমের মাঝেই যন্ত্রণায় অস্ফুটস্বরে শিউরে উঠে সে আজকাল। বিছানাতেও এদিক ওদিক ফিরতে হাঁফিয়ে উঠে, অগত্যা মীরকেই পাশ ফিরিয়ে দিতে হয় তাকে।
মীর এক হাতে ঠাঁই দিল আনাবিয়ার অতিকায় পেটের নিচে৷ আনাবিয়ার কুচকে থাকা কপালে স্বস্তির আভাস দেখা দিল তৎক্ষনাৎ।

বারান্দাতে শেহজাদা সাইয়্যিদকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো শেহজাদার দুধমা, মাহ্‌নূর, গল্প করছিল মহসিনের সাথে৷ আজকাল মহসিনের সাথে বেশ ভাব হয়েছে তার। বৃদ্ধ মহসিন এই সন্তানহারা অল্পবয়সী মেয়েটিকে অত্যাধিক স্নেহ করতে শুরু করেছে হঠাৎ। নিজের একটা পরিবার থাকলে এমনই একটা মেয়ে হয়তো তার ঘরেও থাকতো। মাহ্‌নূরের সন্তান হারানোর বেদনা, স্বামীর এমন দুরবস্থার কথা অন্তরে পীড়া দেয় মহসিনের৷ মেয়েটিকে যথাসম্ভব সহানুভূতি দেওয়ার চেষ্টা করে সে।
আচমকা হিজ ম্যাজেস্টি আর তার বেগম বেরিয়ে আসায় চমকে তাকাল দুজনে। আনাবিয়ার শরীরে কাপড়ের স্বল্পতা। তা দেখামাত্রই দৃষ্টি নামিয়ে নিল মহসিন। মাহ্‌নূর অপলক চেয়ে রইলো সফেদ, সুন্দর মেয়েটির দিকে। এখানে এসে প্রথমবার যেদিন দেখেছিল সেদিন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছিল তার৷ এমন রূপকথার পরীর মতো মেয়ের অস্তিত্ব যে বাস্তবেও আছে সেটা সে সেদিনই জেনেছিল। এখনো, এতবার দেখার পরও চোখ ফেরানো দায় হয় তার!
মহসিন চাপা সুরে ধমকে তাকে বলল,

“দৃষ্টি নামাও মাহ্‌নূর, হিজ ম্যাজেস্টি দেখলে রেগে যাবেন। কামরায় চলো এখনি।”
মাহ্‌নূর থতমত খেয়ে দৃষ্টি নামালো তৎক্ষনাৎ, মহসিন তাকে নিয়ে দ্রুত বেগে ঢুকে পড়লো কামরার ভেতর৷
মীর আনাবিয়াকে বুকের ওপর নিয়ে হেটে চলল বারান্দা জুড়ে, হাটতে হাটতে বলল,
“এখন আর ঘুমোনো যাবেনা, রাতের খাবার খেয়ে তবেই ঘুমোবে আবার। ততক্ষণ হাটতে হবে৷”
আনাবিয়া চোখ মেলতে ব্যর্থ হল, শরীরের সম্পুর্ন ভর মীরের ওপরেই ছেড়ে রাখলো সে। হাটতে হাটতে ওকে নিয়ে লিফটের নিকট গেলো মীর৷ ভেতরে ঢুকে টেরেসের সুইচ টিপে দিল। কয়েক সেকেন্ড পরেই খুলে গেলো লিফটের দরজা।
আনাবিয়াকে নিয়ে মীর ছাদ জুড়ে হাটাহাটি করল অনেকক্ষণ। শেষ বিকেলের রক্তিম আলো এসে পড়তে রইল আনাবিয়ার ফোলা ফোলা গালের ওপর। মীর অপলক চোখে দেখে গেলো ওর আলোকে উজ্জ্বল হয়ে যাওয়া শরীর, বন্ধ চোখের পাতায় ছুয়ে দিল ঠোঁট। আনাবিয়া ঘুমের ঘোরে লেপ্টে রইল মীরের বক্ষপরে।
রাতের খাবারের পূর্বে হেকিম এলো চেক আপের জন্য। ক্ষণিকের পরীক্ষা নীরিক্ষার পর জানালো কোনো এক অজানা কারণে আনাবিয়ার শরীর শক্তি জমা করছে। যতটা সম্ভব ঘুমিয়ে, মুভমেন্টে অনাগ্রহ দেখিয়ে এবং মাত্রাতিরিক্ত প্রোটিন খেয়ে সমস্ত ক্যালরি জমা করে চলেছে তার দেহ। হয়তো আসন্ন প্রসবের জন্য প্রস্তুত নিয়ে চলেছে তার শরীর।

আনাবিয়ার অস্বাভাবিক ক্ষুধা আর ঘুম ভীতি জাগিয়েছিল মীরের মনে। এখন সেটা দৃঢ় হল আরও। প্রসবকালীন সময়ে ঠিক কি কি বিপদের সম্মুখীন হতে হবে ভেবে পেলোনা সে৷ সাত মাস অতিক্রম করেছে সবে, হাতে সময় কম! ঠিক কখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ চলে আসবে জানেনা মীর। বুকের ভেতর আজকাল অকারণেই ঢিপঢিপ করে তার৷
হেকিম প্রস্থান করলে মহসিন আজও নিয়মমাফিক হরেক রকমের মাংসের পশরা নিয়ে হাজির হল। মাংস ছাড়া অন্য কিছুই মুখে তুলবেননা তাদের শেহজাদী। কিন্তু আজ খাবারের উপস্থিতিতেও আনাবিয়ার কোনো নড়চড় পাওয়া গেলোনা। মীর নিজের বুকের ওপর এলিয়ে থাকা আনাবিয়াকে ডাকাডাকি করল কয়েকবার, আনাবিয়া বার কয়েক কোনোরকমে চোখ মেলে আবার তলিয়ে গেলো ঘুমে।
মীর মাংসের টুকরো গুলো নিজ দাঁতে ছিড়ে আরও ক্ষুদ্র করে খাইয়ে দিল ওকে৷ আনাবিয়া ক্ষণিক পর পর ঘুমের ঘোরেই চিবোলো একটু একটু করে। খাবার মুখে রেখেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো অনেক বার৷ মীর বারংবার জাগালো তাকে, শেষে নিজেই চিবিয়ে খাওয়াতে শুরু করলো ওকে।

অকস্মাৎ স্মৃতিপটে ভেসে উঠলো কিছু পুরোনো দৃশ্য। ফিরে গেলো সে প্রায় শত বৎসর পূর্বে, যখন ছোট্ট আনাবিয়া ঠিক এভাবেই খেতে খেতে ঘুমিয়ে যেত তার বক্ষপরে। মীর তখন পরম যত্নে নরম খাবার গুলো হাতে টিপে আরও নরম করে অল্প অল্প করে খাওয়াতো ওকে, ঘুমের ঘোরেই টেরাকোটা রঙা ছোট্ট ঠোঁটজোড়া নাড়িয়ে নাড়িয়ে খাবার খেতো আনাবিয়া। সেই ছোট্ট অধরদ্বয়ের নিষ্পাপ, আদুরে মিষ্টতায় ঘায়েল হয়ে সে তখন বসিয়ে দিত স্নেহভরা চুম্বন।
আধো ঘুমে খেতে খেতে একটা বাজালো আনাবিয়া৷ মীর ওকে আজ নিজ কামরায় নিয়ে শুইয়ে দিল, কাজ বাকি তার অনেক, সে পর্যন্ত চোখের সামনেই থাকুক।
চেয়ারে বসে টেবিলের ওপর ঢিবি করে রাখা কাগজপত্র গুলো একবার ক্লান্ত চোখে দেখলো সে৷ একটা শ্বাস ছেড়ে কাজে লেগে পড়লো তৎক্ষণাৎ। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে দেখতে রইলো সে আনাবিয়াকে।
ক্ষণিক পরপরই পাশ বদলে চলেছে আনাবিয়া। ভারী পেট নিয়ে পাশ বদলানো তার জন্য আজকাল ভীষণ কষ্টকর কয়ে, তবুও নড়েচড়ে এদিক ওদিক সরে সরে ঘুমোচ্ছে সে৷
ওকে অশান্ত হতে দেখে উঠে পড়লো মীর। কাছে গিয়ে ঝুঁকলো ওর মুখের ওপর, মনোযোগ দিয়ে দেখলো শুভ্র মুখখানা। ঘুমিয়ে আছে সে, কপাল কুচকানো, ভ্রু জোড়াতে অস্বস্তির ভাজ। মীর হাত রাখলো ওর কপালপরে, মোলায়েম স্বরে ডেকে বলল,

“শিনজো, কি হচ্ছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে? এদিকে দেখো তো, আমার দিকে দেখো একবার! কোথায় কষ্ট হচ্ছে বলো!”
আনাবিয়া সাড়া দিলনা, আরও কয়েকবার ডাকাডাকির পর চোখ জোড়া সামান্য মেলে তাকালো আনাবিয়া, ঘুম জড়ানো ক্লান্ত গলায় বলল,
“ভালো ঘুম আসছে না! পেটে ব্যাথা করে!”
মীর গায়ের রোবটা খুলে ছুড়ে দিলো কোথাও, শুয়ে পড়লো আনাবিয়ার পাশে। দুহাতে টেনে ওকে নিয়ে এলো নিজের কোলের ভেতর, পেটে আলতো স্পর্শে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কপালে ঠোঁট ছুইয়ে চেপে ধরলো সে। কোমল স্বরে বলল,
“সব ঠিক হয়ে যাবে, ঘুমোও তুমি।”
আনাবিয়া নড়েচড়ে সরে এলো মীরের আরও কাছে, মীর জড়িয়ে নিলো ওকে তৎক্ষনাৎ। মীরের উন্মুক্ত বক্ষে মাথা গুজে দিতে দিতে অস্ফুট আবদারের স্বরে বলে উঠলো,
“ল্যালাবাই গাও!”
মীরের অধর জোড়া চওড়া হলো তাতে, স্নিগ্ধ হাসিতে পরিপূর্ণ হলো তার মুখখানা। আনাবিয়ার নাকের ডগায় ছোট্ট চুম্বন দিয়ে মৃদুস্বরে সে গেয়ে উঠলো,

“ঘুম যা রে বিবিয়া
ঘুম যা রে বিবিয়া…
আঁধি রাতে চাঁদ তুই আজ
ঘুম দে রে আঁকিয়া
ঘুম যা রে বিবিয়া
ঘুম যা রে বিবিয়া…
দিবো সাগর পাড়ি,
তোর মুখ খানি, বুকের পানে লইয়া
আবার ভোর হইলে,
ফিরবো যদি থাকে জান জাগিয়া…
ঘুম যা রে বিবিয়া
ঘুম যা রে বিবিয়া…
একুল ওকুল নাহি দেখি,
ঝড়ের লগে যুঝতেছি
মন আমার কেমন করে,
ফিরার লাগি তোর কাছে
সারা রাতের ঘুম আমার,
সারা দেহের যত গ্লানি
ভুলে যাই সব, যখনি
দেখি মুখ তোর একটু খানি
ঘুম যা রে বিবিয়া
ঘুম যা রে বিবিয়া….. (বিবিয়া —শূণ্য)

গর্ভের তীব্র যন্ত্রণার তোপে আচমকা ঘুম ভেঙে গেলো আনাবিয়ার, ঘুমের সমস্ত রেশ উড়ে গিয়ে সজাগ, সতর্ক হয়ে উঠলো সে তৎক্ষণাৎ! অনেক কষ্টে হাতে ভর দিয়ে উঠে বসলো সে, যন্ত্রণায় কুচকে এলো তার ভ্রুজোড়া, ঠোঁট গোল করে শ্বাস নিতে রইলো জোরে জোরে। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলো একবার, একটা পাতলা, স্বচ্ছ গাউন জড়ানো গায়ে! জোরে দম ফেলতে ফেলতে বিছানা থেকে নামলো সে, দুর্বল পায়ে হেটে সামনে গিয়ে হাতড়ে হাতড়ে একটা রোব গায়ে জড়িয়ে নিল।
এক হাতে পেট আঁকড়ে ধরে, অন্য হাতে দেয়ালে অবলম্বন দিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে সে গেলো বেলকনিতে। সেখানে দাঁড়িয়ে মৃদু, অস্ফুটস্বরে ডেকে উঠলো,
“ফ্যালকন!”
রেড জোনের গভীরে, ডার্ক ফরেস্টের সুউচ্চ রেড উড গাছের মগডালের বাসাটিতে কানে হেডসেট গুজে বসে থাকা ফ্যালকন চমকালো তাতে৷ কান থেকে হেডসেট সরিয়ে সতর্ক চিত্তে সে কান পাতলো বাতাসে, কেউ কি ডাকলো তাকে? তখনি আবার এক দুর্বল, ভঙ্গুর কন্ঠে ভেসে এলো তার নাম,
“ফ্যালকন!”

ফ্যালকন আতঙ্কিত হলো! এটা তো ওর শেহজাদীর গলা! তার কি কিছু হলো? মুহুর্তেই বাসা থেকে বেরিয়ে ডানা মেলে আকাশে উড়াল দিল ফ্যালকন, তারপর সবেগে উড়ে চলল প্রাসাদের দিকে। ক্ষণিক পরই সফেদ প্রাসাদের মার্বেল পাথরের ওপর পড়া সূর্যালোক প্রতিফলিত হয়ে চোখে লাগলো তার, পরক্ষণেই চোখে পড়লো ব্যালকনিতে রেলিঙ ধরে কুকড়ে দাঁড়িয়ে থাকা আনাবিয়াকে।
আঁতকে উঠলো ফ্যালকন, দ্রুত বেগে গিয়ে ব্যালকনিতে নেমেই এগিয়ে এসে উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“শেহজাদী, আপনি ঠিক আছেন? আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কোনো অসুবিধা হচ্ছে?”
আনাবিয়া আচমকা এক হাতে আঁকড়ে ধরলো ওর বাহু, দম নিতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে তার, ভ্রুতে বিধ্বংসী যন্ত্রণার ভাজ ফেলে সে কোনো রকমে বলল,
“ফ্যালকন! আমার ট্রি হাউজটা প্রস্তুত করে রাখবি, আমার আর আমার পাঁচ শেহজাদার জন্য! আর রেড জোনের সবাইকে এই এরিয়া থেকে নিরাপদ দুরত্বে চলে যেতে বলবি, কেউ যেন এইদিকে না আসে! জলদি!”
বলেই ফ্যালকনকে দ্বিতীয় প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো ব্যালকনি থেকে। ফ্যালকন তৎক্ষনাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে পেরিগ্রিণ রূপে পরিবর্তিত হয়ে সবেগে উড়ে চলল রেড জোনের ভেতর, তীক্ষ্ণ স্বরে ডেকে সতর্ক করে চলল সবাইকে।

দুর্বল পা জোড়া টেনে টেনে কামরার বাইরে বেরিয়ে এলো আনাবিয়া। বাইরে ঝলমলে রোদ, মীর নেই এদিকে। হয়তো রাজদরবারে চলে গেছে সে। আনাবিয়া পা চালালো দ্রুত, মীর টের পাওয়ার আগেই প্রাসাদ ছাড়তে হবে তাকে। কিন্তু ক্লান্তিতে, যন্ত্রণায় পা ফেলানো দায়! এখুনি হয়তো মুখ থুবড়ে পড়বে এখানে!
নার্স গুলো দাঁড়িয়ে ছিল বাইরেই। আনাবিয়াকে এভাবে দেখা মাত্রই দৌড়ে ধরতে গেল তারা৷ কিন্তু তারা নিকটে আসা মাত্রই আনাবিয়া বাঁজখাই কন্ঠে চেচিয়ে বলে উঠলো,
“কেউ কাছে আসবেনা আমার!”
নার্সগুলো থেমে গেলো তৎক্ষনাৎ, অসহায় চোখে দেখতে রইলো আনাবিয়ার চলে যাওয়া৷ শব্দ পেয়ে বেরিয়ে এলো লিও কাঞ্জি। আনাবিয়াকে দেখেই ছুটে এলো দুজনে। কাঞ্জি এসে আনাবিয়ার হাত ধরে অবলম্বন দিয়ে শঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“শেহজাদী, এ অবস্থায় আপনি কোথায় যাচ্ছেন? কোনো অসুবিধা হচ্ছে? হিজ ম্যাজেস্টিকে সংবাদ পাঠাবো?”
“আমাকে যেতে হবে! ওরা…. ওরা আসছে, আমি… আমি এখানে থাকতে পারবনা….! আমাকে ক্রিস্টাল পুলে নিয়ে চল, দ্রুত!”

মৃদু অস্ফুটস্বরে কথাগুলো বলে উঠলো আনাবিয়া। লিও কাঞ্জি চোখাচোখি করলো তৎক্ষনাৎ, লিও দ্রুত আনাবিয়ার বাহু আঁকড়ে ধরে অবলম্বন দিল তাকে। বলল,
“শেহজাদী, আমি হিজ ম্যাজেস্টিকে সংবাদ পাঠানোর ব্যাবস্থা করছি!”
“কোনো প্রয়োজন নেই!”
আবারও বাঁজখাই স্বরে চেচিয়ে উঠলো আনাবিয়া। চেচিয়েই হাঁফাতে শুরু করলো আবারও। লিও চুপ হয়ে গেলো। আশেপাশে চেয়ে দেখলো মহসিন আছে কিনা, সে থাকলেও অন্তত সংবাদ পৌছানোর কাজটা করতে পারতো। কিন্তু তাকে দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে লিও কাঞ্জি মিলে আনাবিয়াকে নিয়ে এগোলো ক্রিস্টাল পুলের উদ্দ্যেশ্যে।

পুলের কাছাকাছি আসা মাত্রই লিও কাঞ্জির থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল আনাবিয়া। একা একাই দুর্বল পা জোড়া টেনে টেনে পুলের দিকে এগোতে এগোতে বলে উঠলো,
“তোরা…. তোরা চলে যা এখান থেকে!”
“শেহজাদী! আপনাকে এখানে একা রেখে কিভাবে যাব!”
অসহায় স্বরে বলে উঠলো লিও! আনাবিয়া পেছনে তাকাল না, ভীষণ বিধ্বংসী যন্ত্রণায় ছিড়ে যেতে চাইলো তার গর্ভ! পুলের দিকে এগোতে এগোতেই প্রচন্ড ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠলো সে! তবুও এগিয়ে যেতে রইলো সামনের দিকে৷ লিও এগিয়ে গেলো দ্রুত পায়ে, আনাবিয়া টের পেয়েই বাঁজখাই গলায় আবারও চেচিয়ে উঠে আর্তনাদের সুরে বলল,

“কেউ আসবিনা! চলে যা এখান থেকে, এখানে থাকা কারো জন্য নিরাপদ নয়! চলে যা!”
লিও কাঞ্জি ওর যাওয়ার দিকে চেয়ে অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই! কেউ নেই আশেপাশে, সবই ফাঁকা! কি করবে, কোথায় যাবে, কাকে ডাকবে, কিছুই বুঝতে পারলনা।
আনাবিয়া অসহ্য যন্ত্রণায় কুকড়ে যেতে রইলো ক্রমে! তীব্র বেদনার তোপে আর্তনাদ করতে রইলো সে। নিজেকে এক প্রকার টেনে নিয়ে গেলো ক্রিস্টাল পুল পর্যন্ত, অনেক কসরতের পর পুলের পানিতে নামতে সক্ষম হলো সে। ব্যাথার তীব্রতা সেই মুহুর্তেই বাড়লো আচমকা, লক্ষ্য ছুরিকাঘাতের ন্যায় সে ব্যাথায় তৎক্ষনাৎ রক্তশূণ্য হয়ে এলো আনাবিয়ার মুখ! ভীষণ বিস্ময় ভর করলো তার চোখে, এক মুহুর্তের জন্য এই বিধ্বংসী যন্ত্রণাটিকে যেন অবিশ্বাস্য মনে হলো তার! পরমুহূর্তেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো আনাবিয়া!

অকস্মাৎ রেড জোন জুড়ে শুরু হলো তীব্র ঝড়ো বাতাস! উঁচু উঁচু গাছ গুলোর ডালপালাকে নুইয়ে দিতে রইলো বাতাসের তীব্র প্রকোপ! প্রচন্ড ব্যাথায় চিৎকার দিয়ে বারংবার কেঁদে উঠলো আনাবিয়া! তার বিধ্বংসী আর্তনাদে ভারী হয়ে এলো সম্পুর্ন রেড জোন, একই সাথে বাড়লো ঝড়ের বেগ!
দুহাত মুঠি করে পুলের আশেপাশের গুল্ম গুলোকে সজোরে আঁকড়ে ধরলো সে! ব্যাথা গুলো ঠিক ঢেউয়ের মত করে তেড়ে আসতে রইলো যেন! প্রতিটা ঢেউয়ে যেন প্রাণটা টেনে বের করে নিতে চাইলো তার!
হাঁফাতে রইলো আনাবিয়া, চোখের সম্মুখে আঁধার নেমে এলো তার! যন্ত্রণা একটু কমলো যেন এবার। কিন্তু এবার ভয় হলো তার, ভীষণ ভয়! কেউ নেই এখানে তার, কেউ না! চতুর্দিকে ফাঁকা, ভীষণ রকম ফাঁকা। কোথাও কোনো প্রাণের চিহ্ন অব্দি নেই, তাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য আজ কেউ নেই এই পৃথিবীতে!
ভীষণ রকম কান্না পেলো ওর হঠাৎ! ঠোঁট ভেঙে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। এক হাতে পেটে অবলম্বন দিয়ে অন্য হাতে গুল্ম গুলোকে আরও জোরে আঁকড়ে ধরলো!
চতুর্দিকে অসহায়ের মত চেয়ে দেখলো আরও একবার! ঝড়ের তোপে চোখে দেখা যাচ্ছেনা কিছুই, এখন আবার শুরু হয়েছে বৃষ্টি! কেউ নেই এদিকে, সব ফাঁকা….সব! ভীষণ শোকে ঠোঁট কাঁপতে রইলো তার, অসহায় স্বরে একবার নিজের অজান্তেই সে ডেকে উঠলো,

“মীরি…!
সে ডাকে সাড়া দিল না কেউ! চতুর্দিকে চেয়ে এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সে! ব্যাথার ঢেউটি সেই মুহুর্তেই ফিরে এলো আবার, এবার যেন ভেঙে দিতে চাইলো ওর বুক পাঁজর!
আকাশের দিকে চেয়ে প্রচন্ড ব্যাথায় চিৎকার করে উঠল আনাবিয়া। কিন্তু ঝড়ের তোপে চাপা পড়ে গেলো তার অসহায় আর্তনাদ! গুল্ম গুলোকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে একটা হাত বাড়িয়ে দিলো সে সম্মুখে। মূহুর্তেই ক্রিস্টাল পুলের চতুর্দিক থেকে এক বিশাল এরিয়া নিয়ে উঠে এলো এক ঝাঁক কণ্টকাকীর্ণ শক্ত, কঠিন লতা!
সেগুলো একত্রিত হয়ে ক্রমশ তৈরি করলো এক বিশাল গম্বুজাকৃতির ছাদ! আনাবিয়াকে আড়াল করে নিল তারা সম্পুর্ন রেড জোন থেকে! ঘন লতাগুলো একটার ওপর একটা উঠে গবাক্ষ পরিমাণ স্থানও ফাঁকা রাখলো না!
আনাবিয়া অসহায় দৃষ্টিতে তখনও চেয়ে আকাশের দিকে, যন্ত্রণায় গলার স্বরটা অব্দি যেন লোপ পেয়েছে তার! লতা গুলো সুউচ্চে উঠে আড়াল করে দিতে চলেছে আকাশ! এখুনি ভেতরের সবটুকু স্থানে নামবে আঁধার!
কণ্টকাকীর্ণ লতা গুলো বাড়তে বাড়তে ক্রমশ ঢেকে দিলো কালো মেঘে ঢাকা আকাশের শেষ চিহ্ন টুকু। আনাবিয়া সেদিকে চেয়ে ভীষণ শোকে, অসহায়ত্বে, একাকিত্বে ডুকরে কেঁদে উঠলো আবারও!
সেই মুহুর্তেই সুউচ্চ ডোমের শীর্ষের সর্বশেষ ক্ষুদ্র ফাঁকা স্থানটি ছিড়ে ফুড়ে সবেগে মাটিতে নামলো মীর! নেমেই ছুটে এসে পুলের পানিতে লাফিয়ে নেমে আনাবিয়াকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে শাসনের স্বরে বলে উঠলো,

“এই মেয়ে, আমাকে না জানিয়ে এখানে একা একা চলে এসেছো, এত সাহস তোমার! হ্যাঁ?”
ওকে দেখা মাত্রই ভীষণ স্বস্তিতে ভরে উঠলো আনাবিয়ার বক্ষ, ডুকরে কেঁদে উঠলো সে আবারও! এতক্ষণ মীরকে দূরে রাখার প্রবণতা টুকু মুহুর্তেই উবে গেলো তার। দুহাতে মীরকে আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠে সে বলল,
“আমার খুব ভয় লাগছে মীরি! আমি বোধ হয় এবার মরেই যাব!”
মীরের মুখখানা পাংশুবর্ণ হয়ে গেলো মুহুর্তেই, আনাবিয়াকে নিজের বুকের সাথে আরও জোরে চেপে ধরে দৃঢ় গলায় বলে উঠলো,

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯১

“তোমার কিছুই হবেনা, প্রাণ আমার! আমি আছি তো এখানে, তোমার সাথেই!”
আনাবিয়ার কপালে নিজের ভেজা ঠোঁট চেপে ধরলো সে। ফুপিয়ে উঠে মীরের আলিঙ্গণের ভেতর নিজেকে আরও লুকিয়ে নিলো আনাবিয়া —ঠিক যেন ছোট্ট বেলার জানালায় থাকা কাল্পনিক মনস্টারের নাগাল থেকে পালিয়ে মীরের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেললো সে আবারও, যেন কোনো মনস্টার আর কখনো নাগাল না পায় তার!

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯২ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here