Home বাবুই পাখির সুখী নীড় বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৭

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৭

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৭
ইশরাত জাহান

আজ দুদিন হলো শোভা ও দিজার খোঁজ নেই।দর্শন আর তুহিন মিলে হন্যে হয়ে খুঁজছে ঢাকা শহর।শামীমের কাছ থেকেও জানতে পারে শোভা ওই বাড়িতে নেই।ফরাজি বাড়িতেও নেই।অনেক খোঁজাখুঁজির পর আজকে যশোর এলো দুজনেই।তুহিনকে সাথে দেখে কেউই সন্দেহ করলো না বরং তুহিনের ভালোবাসার পরীক্ষা নিচ্ছে।দর্শন ফরাজি বাড়িতে এসেই এক মিনিটের জন্যও না দাঁড়িয়ে বাইরে চলে যায় তাড়াতাড়ি করে।পারুল বেগম কিছু বলতে নিলেও শুনলো না দর্শন।দর্শনের সাথে গেলো তুহিন।

আজ দর্শন হাঁফাতে হাঁফাতে ছুটে এলো নিজের জন্মদাত্রী মায়ের নিকট।সেই মা যার সম্মুখীন হতে দর্শনের ঘৃণা করে।যার মাধ্যমে মেয়েদের প্রতি ঘৃণা জন্মেছে দর্শন ফরাজির মনে।বিধ্বস্ত মহিলার দিকে এক পলক তাকালেও মায়া কাজ করলো না দর্শনের।নিজের ছেলের উন্নতি সম্পর্কে জানেন দর্শনের মা।আফসোস হয়।খুব আফসোস।নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে মন চায় কিন্তু উপায় তো নেই।ছেলেকে তুচ্ছ করেছিল একটা সময়।বলেছিলো এই ছেলে হবেও তার বাপের মতো বলদ।বাপের মতো বিশ্রী দেখতে এমনকি সমাজে চলতেও পারবে না।বরিশালের ধাঁচ পাবে।গেঁয়ো ভূত একটা।এর বউ থাকবে না।প্রথমে বিয়ে হলেও বাপের হেংলা স্বভাব পেলে বউ পালাবে।আরো তুচ্ছ করার মতো কথা শুনে দর্শন তখন নিজেকেই ঘৃণা করতে শুরু করে।ফলস্বরূপ আজ সে সুদর্শন পুরুষ। জিম করে নিজেকে ফিট রাখে।রুড আচরণ দিয়ে পরিবেশ দমিয়ে রাখে।নিজের যোগ্যতায় চাকরি করে।তবুও ওই তিক্ত কথা কানের কাছে বারি দেয়।বিশেষ করে শোভা যখন দর্শনকে ইগনোর করে দর্শন বোধ করে সে হেংলা হয়ে যাচ্ছে।নিজের মায়ের দেওয়া আঘাত ব্রেনে বাজেভাবে গেঁথে রেখেছে।আজ মা ছেলে মুখোমুখি।সেই বিলাসবহুল বাড়িতে না।আজ ওরা আছে একতলা দেয়াল ভাঙ্গা বাড়িতে।গরিবের জীবনযাপন তাকে আরো বেশি বিধ্বস্ত করেছে।দর্শনকে দেখেই বলে, “বসো।”
দর্শন বসে না বরং বলে,“আপনার মত মহিলার বাসায় দাঁড়াতেই আমার গা গুলিয়ে আসছে।কিছু জানার ছিল।সেগুলো জানতেই আসা।”

“কি বিষয়ে?”
“আমার স্ত্রীকে দুদিন ধরে খুঁজে পাচ্ছি না।পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে আপনাদেরও সন্দেহের তালিকায় রাখা আছে।যেহেতু আপনার স্বামীর ক্ষতি আমার কারণেই হয়েছে।বলা তো যায়না নতুন করে আমার স্ত্রীর ক্ষতি আপনারাই করলেন।”
হেঁয়ালি হাসলে দর্শনের মায়ের এই ঘরের মেয়ে মানে দর্শনের সৎ বোন।বিদ্রুপের সাথে বলে,“দেখো গিয়ে তোমার বউ ভেগে গেছে নতুন আশিক পেয়ে।”
দর্শনের রাগ চড়াও হলো।তেড়ে আসলো মেয়েটার দিকে।গলা টিপে হুঙ্কার দিয়ে বলে,“আমার বউ রাস্তার মেয়ে না যে বর ছেড়ে ভেগে যাবে।আমার বউকে নিয়ে নোংরা কথা বললে তোর এই জিহ্বা ছিঁড়ে কুত্তাকে খাওয়াবো।”
মেয়েটা ছটফট করতে শুরু করে।দর্শনের হাত ধরে ঝাঁকালো।দ্রুত এগিয়ে এলো দর্শনের মা।পারল না ছাড়াতে।অসহায় দৃষ্টিতে পুলিশের দিকে চেয়ে বলে,“আপনারা আইনের লোক হয়েও মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়া ব্যক্তির শাস্তি দিবেন না?”

পুলিশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে দেখে দর্শন বাকা হেসে বলে,“আইন!আইন মানেন আপনি?যদি তাই মানতেন তাহলে আইনের বাইরে গিয়ে পরকীয়া করতেন না।”
“এখানে বাইরের মানুষ আছে।”
তুহিনের উদ্দেশ্যে বললেও দর্শন ধমকে বলে,“মানে লাগছে খুব?কেন লাগছে?পাপ করার সময় তো মান ইজ্জত নিয়ে ভাবেননি।পাপ করলে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়।বাই দ্যা ওয়ে আমার এত জ্ঞান দেওয়ার সময় নেই আমি কিছু কথা জানতে চাই।”
“বলো?”
“আমার বউকে আপনারা কিডন্যাপ করেননি তো?”
ভ্র কুঁচকে তিনি বলেন,“আমরা কেন কিডন্যাপ করতে যাবো?”

“আগেই ক্লিয়ার করে বলেছি কোন উদ্দেশ্যে করবেন কিডন্যাপ।এতটা ইনোসেন্ট সেজে কথা বলবেন না।”
এবার নিজেকে দমিয়ে রাখলেন তিনি।শান্ত চোখে চেয়ে বলেন,“আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমি করতে শুরু করেছি।তোমার পথের কাঁটা কোনো কালে হইনি আর হবো না।এটুকু নিশ্চিত থাকো।”
তুহিন এগিয়ে এসে বলে,“পুলিশ ওনাদের ফোন ঘেঁটেছে এমনকি পুরো বাড়ি তল্লাশি করেছে।কিছুই খুঁজে পায়নি।সন্দেহ কমলেও একেবারে নিশ্চিত না।”
দর্শন গলা ছেড়ে দেয়।বড় বড় শ্বাস ছেড়ে বলে,“আমার বউয়ের কিডন্যাপের পিছনে আপনারা যদি না থাকেন তাহলে বেঁচে যাবেন কিন্তু যদি এর পিছনে আপনি থেকে থাকেন তো আমাকে জন্ম দিয়েছেন বলে এতদিন ছেড়ে দিলেও এবার সন্তানের হাতে মায়ের খুন হতেও সময় লাগবে না।”

হুমকি দিয়ে বেড়িয়ে এলো দর্শন ও তুহিন।দর্শনের মায়ের চোখ বেয়ে পানি।লোকমুখে শুনেছে দর্শন একদম বাবার বিপরীত।একদম।কিন্তু এত বিপরীতেও একটা জিনিস মিল আছে।বউকে অন্ধের মতো বিশ্বাস।দীপ্ত ফরাজি তো ঠকেছিল দর্শনও কি ঠকবে?ভাবতেই আতকে উঠলেন।ঘৃণিত মা হয়েও ছেলের সংসার ভেঙে যাবে ভাবতেও যেনো কেঁপে উঠলেন।জন্ম দিয়ে কি এই টান?তবে কোথায় ছিল এই টান যখন একটা বাচ্চা ছেলেকে ছেড়ে চলে এসেছিল তিক্ত কথা শুনিয়ে।তখন কেন মস্তিষ্কে ঘুরত প্রেমিকের সাথে বাস করার জেদ?জেদ!এই জেদ তাকে ধ্বংস করে দেয়।বাবা মা জোর করে বিয়ে দেওয়ার ঘৃণায় ঘৃণায় সংসার করলেও সুদর্শন পুরুষের লালোসায় পড়ে চলে এলো।মূলত ঘৃণা ছিল বাবা মায়ের প্রতি।জেদ উঠেছিল বাবা মায়ের বিরোধ হবার।শয়তানে ধরেছিল সংসার ছেড়ে আসার।তাই তো আজ এই পরিণতি।চোখের পানি ফেলে দুয়ারে দাঁড়িয়েই হাউমাউ করে কান্না করছেন।পিছনে দাঁড়িয়ে গলায় হাত রেখে হাঁফাতে থাকা মেয়েটাও দেখছে মাকে।

পুলিশের তদারকি এখনও চলছে।দর্শনের প্রতিটি শত্রুদের উপর সন্দেহ করে এগোনো হচ্ছে।বর্তমানে ফাঁকা মাঠে বসে আছে দর্শন ও তুহিন।দুজনেই হাঁফিয়ে উঠেছে।তবুও নিজেদের চেষ্টা থামায়নি।পুলিশ ব্যতীত নিজেরাও একেক জায়গায় ছুটে গেছে।এক সপ্তাহের ছুটিতে আছে তুহিন।তার এত ছুটাছুটি শুধুমাত্র দিজার জন্য।যেটা নজর এড়ায়না দর্শনের।মাঠের মধ্যে সূর্যের তাপে দুজনের শরীর ঘেমে গেলেও সেদিকে গুরুত্ব নেই।আলসেমি ধরেছে যেনো।সূর্যের তাপ চোখে আসাতে চোখ ছোট ছোট করে দর্শন চাইলো তুহিনের দিকে।প্রশ্ন করে,“দিজাকে বিয়ে করবি?”
তুহিন নরম চাহনি দেয়।নীরবতা ভেঙে বলে,“ওকে খুঁজে পাওয়াটাই জরুরি।”
“কথা এড়াবি না।”
“যদি বলি করব বিয়ে তো?কি করবি তুই? খুন করবি আমাকে?”
“ইচ্ছে তো করছে তোকে খুন করতে।তোর কারণেই এতকিছু।কি করতে রিজেক্ট করলি আমার বোনকে?”
তুহিন অবাকের সাথে বলে,“এখন সব দোষ আমার?তুই নিজেই তো মানতে পারিসনা বন্ধু আর বোনের সম্পর্ক।”
“কোথায় অন্য ছেলেরা আর কোথায় তুই!”
“আমার উপর আস্থা আছে তোর?”

দর্শন উত্তর না দিয়ে মাথা উপর নিচ করে।তুহিনের ঠোঁটে হাসির দেখা মেলে।দর্শন আবারও তাকালো।তুহিনকে আনন্দে বসে থাকতে দেখে ধমকে বলে,“আগে আমার বোনকে খুঁজে বের কর তারপর নাহয় খুশি হবি।”
“তাকে খুঁজতেই তো আমার এতদূর ছুটে আসা।”
“আচ্ছা,একটা বিষয় খেয়াল করলাম।শামীম ভাইজানের মধ্যে বোনকে হারানোর আতঙ্ক দেখলাম না।এমনটা তো আগেরবার ছিলো না।”
“ব্যাপারটা আমার কাছেও খটকার লাগছে শুধু তাই না প্রেমাকে নিয়ে আন্টির মধ্যেও দুশ্চিন্তা নেই।আংকেল,আন্টি এমনকি পুরো পরিবার বাড়িতেই বসে আছে।কি অদ্ভুত!”
দর্শন ভাবনায় পড়লো।একটু ভেবেই আচমকা মুখের ভঙ্গি পরিবর্তন করে।তুহিন তাই দেখে প্রশ্ন করে,“কি হলো তোর?”

“এটা কি আসলেই কিডন্যাপ নাকি কোনো ট্র্যাপ?”
“মানে?”
“আসার সময় দাদাজানকে কিছু লোকাতে দেখেছিলাম।”
তুহিন বিরক্তির সাথে বলে,“মিষ্টির ঠোঙা ছিল।তুই সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে গেছিলি তখনই সুযোগ বুঝে নিচে লুকিয়ে রাখে আর আমি তো সোফায় বসে পুলিশের সাথে কথা বলছিলাম।এজন্য দেখতে পাই।”
“মিষ্টির ঠোঙা!”
“তো!মিষ্টির ঠোঙা নিয়ে পড়লি কেন হঠাৎ?”
বলতেই তুহিন থমকে তাকালো দর্শনের দিকে।এই বিপদের সময় মিষ্টি খাওয়ার হুজুগ কার!তুহিন একধাপ এগিয়ে বলে,“যখন বাড়িতে ঢুকেছিলাম দাদাজান চোরের মতো মুখ লুকিয়েছিল।এমনকি তোদের যে বাজার করে দেয় উনি ঠিক ওই মুহূর্তেই বলেছিলো পাঁচ কেজি গরুর মাংস কিনেছে।পুরো সিনার মাংস।আন্টি চোখ গরম দিতেই উনি থেমে যায়।আমি গুরুত্ব দেইনি কিন্তু এখন তো তোর কথা শুনে আমাকে ভাবাচ্ছে।”
দর্শন হাতমুঠ করে ঘাস ছিঁড়ে বলে,“আমি মরছি আমার বোন আর বউকে খুঁজে না পেয়ে এদিকে আমার বাড়ির লোক মিষ্টি আর গরুর সিনার মাংস খাচ্ছে!”

“এমন তো হবার কথা না।বাসার সবাইকে দুশ্চিন্তা হতে না দেখে বরং তোকে শান্তনা দিতে দেখলাম।একমাত্র দাদাজান কটাক্ষ করেছিল।”
দাদাজানের কটাক্ষ করা কথা মনে পড়তেই দর্শনের মনে পড়ল দাদাজান বলেছিলো তোমার ফোন অন্য নারীর কাছে থাকে কিভাবে?এবার বোঝ ঠেলা।দর্শন সব মিলিয়ে বলে,“ডালমে কুচ কালা হে।”
“কি করবি?”
“পুলিশের খোঁজ চলুক আমরা বাড়িতে যাই।”
“প্রেমা?”
“ইডিওট,তোর প্রেমার সাথে আমার বউটাও আছে।তাই বেশি না ভেবে ব্রেনকে শর্টকাটে কাজে লাগা।”
“ব্রেন কাজে লাগার মতো পরিস্থিতিতে থাকলে আমি আজ সকালেই সব ধরতে পারতাম।আমার তো মাথা কাজ করা বন্ধ হয়েছে।”

“এই ভুলটা আমারও হয়েছে বিধায় আমার নাকের ডগা দিয়ে আমার বউকে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে।অথচ আমি কি না ভাবলাম আমার বউকে কেউ কিডন্যাপ করেছে!”
“ভাই শোন,শিওর না হয়ে কি কিছু বলা ঠিক?”
“শিওর হতে বাকি কি?ভাইয়ের মধ্যে বোনের জন্য চিন্তার চ দেখতে পারছি না।আমি দিজার জন্য যদি খোঁজ চালাই তবে দিদার কেন নীরব?শোভার জন্য শামীম ভাই কেন নীরব?ভাব একবার।”
তুহিন ভাবনায় পড়ে বলে,“চল তাহলে বাড়িতে।”
দুজনেই উঠল একসাথে।গাড়িতে বসে রওনা দেয় ফরাজি বাড়ির দিকে।বাড়ির গলির দিকে গাড়ি ঘুরাতেই তুহিনের চোখ গেলো চায়ের দোকানের দিকে।দিদার হাসতে হাসতে কথা বলছে বন্ধুদের সাথে।চাও আছে ওদের হাতে।তুহিন হাত দিয়ে দর্শনকে ইশারা করতেই দর্শন দাঁতে দাঁত চেপে বলে,“খাওয়াচ্ছি তোকে চা।”
তুহিন থামিয়ে দিয়ে বলে,“মাথা ঠাণ্ডা রাখ ভাই।মারামারি না করে ওটাকে চেপে ধর।এমনিতেই আসল সত্যিটা সামনে আসবে।”

দর্শন সম্মতি দিয়ে গাড়ি থেকে নামে।সাথে নামলো তুহিন।দুজনেই দাঁড়ালো দিদারের সামনে। দর্শনকে সামনে দেখে দিদার কাপতে শুরু করে।এতটাই কাপছে যে হাত থেকে চা মাটিতে পড়ে যায়।দর্শন ভ্রুকুটি করে দেখছে।আচমকা ভ্রু নাচাতেই উল্টো দৌড় দেয় দিদার।পিছন পিছন ছুটলো দর্শন ও তুহিন।দর্শন ধমকে বলে,“দাড়া বলছি।আমার কথা না শুনলে ফল খারাপ হবে বলে দিলাম।”
দিদার ছুটছে আর বলছে,“সে আমি এমনিতেই ঠাওর করতে পারছি।”
“একবার হাতের নাগালে পাই তোকে,তোর ঠেঙ যদি না ভেঙেছি আমার নাম দর্শন ফরাজি না।”
তুহিন নিজেও দৌড়াতে থাকে আর বলে,“ধমকে কি সমাধান হয়?মাথা ঠাণ্ডা কর।ভালোভাবে বুঝিয়ে বল।”
“ও বুঝবার ছেলে না।যদি তাই হতো আমাকে দেখে ভয় পেয়ে আগেই দৌড় দিতো না।”
ফরাজি বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে দিদার দরজা খুলতে নিলেই দর্শন বামহাত দিয়ে দিদারের কলার ধরে উল্টো টান দিয়ে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়।দিদারের নাকেমুখে ঘুষি দিতে নিলেই তুহিন আটকে বলে,“স্থির হ।তোর ভাই হয়।”

“শালার উপর আগে থেকেই দরস বাড়ছে নাকি?”
“দেখ ভাই রাগারাগি করলে সময় ব্যয় হয়।কাজের কাজ কিছুই হয়না।যদি হতো তাহলে তোর সাথে ভাবীর সংসারে এখনও অশান্তি থাকতো না। তোদের একই ঝামেলা প্রতিদিন রিপিট হতো না।”
“এখন আমার সংসার নিয়েও কথা শুনতে হবে?”
দর্শনকে ধাক্কা দিয়ে তুহিন দ্বিগুণ রেগে বলে,“তোর এই রাগটাই তোর সংসারের কাল সাথে আমার ভালোবাসার কাল।তোর সাথে আমি বন্ধুত্ব বজায় রাখতে এত মরিয়া যে নিজের ভালোবাসাকে কুরবান করে দিলাম কিন্তু তুই কিছুই না দেখে শুধু আমার দুটো কথার উল্টো মানে করে নিলি।তোর নিজেরও বোঝা উচিত তোর রাগ কতটা ভয়ানক।তুই এতই একগুঁয়ে রাগী যে কোনো সম্পর্ক স্থির থাকতে পারেনা।যে কেউ তোকে ভালোবাসতে চাইবে কিন্তু বেশিদিন স্থির থাকতে পারবে না একমাত্র তোর ভয়ানক আচরণের জন্য।তুই আসলে কাউকে আপন করতেই পারিসনা।এই কারণেই তো আজ তোর ভাইও তোকে দেখামাত্র ভয়ে পালাতে শুরু করে।ভাব তোর বউ কেন পালাবে না?”

দর্শনের কপালের রগ ফুলে উঠেছে।চোখের সাদা মনিতে লাল দাগ দেখা যাচ্ছে।ঘেমে একাকার হয়ে মাথার সামনের চুলগুলো মিশে আছে কপালের সাথে।যেই তুহিনকে আক্রমণ করতে নিবে বন্দুকের গুলি এসে ক্রস করে দর্শন ও তুহিনের মাঝ বরাবর। একটুর জন্য দর্শনের হাত ঝাঁঝরা হওয়া থেকে রক্ষা পেলো।পাশ ফিরে তাকাতেই সবাই চুপ।দাদাজান বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে।মুখে রাগ ফুটে আছে।মুরুব্বির গুটিয়ে যাওয়া চামড়া কাপছে।বড় বড় নিশ্বাস ছাড়ছে।পাশেই হুইল চেয়ারে আছেন দীপ্ত ফরাজি সাথে আছে পারুল বেগম ও শামীম,মিতুর কোলে মৌলি।দর্শন কিছু বলতে নিলে দাদাজান ধমকে বলেন,“এটা আমার বাড়ি,গুন্ডামি করার স্থান না।”
দর্শন হাত ঝাড়া দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলে,“গুন্ডামি করার শখ আমারও নেই কিন্তু বাধ্য তোমরাই করছো।”

“তুমি কে যে আমরা তোমাকে বাধ্য করবো?”
“দাদাজান!”
“এখন কি আমাকেও মারবে?বউয়ের জন্য?তাহলে সেই বউকে আগলে রাখতে পারোনা কেন?”
“কে বলেছে পারিনা?”
“এতই যখন পারো তখন একটা সাদাসিদা মাটির মত মেয়ে কিভাবে তালাক চায় তোমার থেকে?”
“ওকি নিজের মুখে বলেছে তোমাকে?”
“না,কিন্তু তোমাদের দৈনন্দিন ঝামেলা আমি শুনতে শুনতে তিক্ত।”
দর্শন নিজেকে শান্ত করে বলে,“শোভা কোথায় দাদাজান?”
“তোমার বউ কোথায় এটা কি আমার জানার কথা?”
“তোমাদের হাবভাব আমাকে এটাই বুঝতে সাহায্য করছে।”
“এতকিছু বোঝো কিন্তু তাকে বোঝো না যার জন্য এত ধকল গেলো তোমার?”
“কি বোঝাতে চাও?”
“কেমন লাগলো বউকে ছাড়া তিনটে দিন?”
দর্শন করুন চোখে তাকালো দাদাজানের দিকে।হেঁয়ালি সহ্য করতে না পেরে শামীমের দিকে চেয়ে বলে,“ভাইজান আপনি নাহয় বলুন আপনার বোন কোথায়?”
শামীম চুপসে গেলো।মুখ নিচু করে বলে,“আমি সত্যিই জানিনা আমার বোন কোথায়।”
“কেমন ভাই আপনি ওর?”

দাদাজান শাসিয়ে বলেন,“একদম ধমকে কথা বলবে না।”
“ঠিক আছে বলব না ধমকে।এবার অন্তত বলো শোভা কোথায়?”
“সে তোমার কাছে ফিরবে না।তাকে মুক্তি দেও।”
দর্শন আবারও রেগে গেলো।দরজার পাশে থাকা গাছে জোরে লাথি দিয়ে বলে,“মগের মুল্লুক পেয়েছো তোমরা!দুঃখিত,আমি তোমাদের আবদার মানতে পারলাম না।আমি আমার বউকে মুক্তি দিতে পারব না।পারবো না আমি শুনেছো?”
পারুল বেগম আতকে উঠলেন।এগিয়ে আসতে নেন দর্শনের দিকে।দীপ্ত ফরাজি আটকে নিলেন।যদিও পারুল বেগম জানেন না কোথায় আছে ওরা দুজন।কারণ দাদাজান ইচ্ছাকৃত জানাননি।শামীম ও পারুল বেগম হলেন অতিরিক্ত নরম মনের।দর্শনের এই অসহায় রূপ দেখেই গলে যাবে।দাদাজান শিওর এই দুজনের একজনের থেকে দর্শন সব জানতে পারবে তাই দাদাজান বুদ্ধি করে চেপে রেখেছেন।

পারুল বেগমের যে দর্শনকে দেখে কষ্ট হচ্ছে এটা বুঝতে পেরে দাদাজান আদেশ করেন,“ছেলের দুঃখ দেখে কষ্ট পাওয়ার দরকার নেই।ছেলেকে বোঝাও তার রাগ দমাতে।ধৈর্য শুধু নারীর জন্য না পুরুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।”
পারুল বেগম অশ্রুসিক্ত নয়নে দর্শনের দিকে চেয়ে বলেন,“ছেলেটা মরে যাবে আব্বা।”
দাদাজান কঠোর চোখে বলেন,“এই ছেলে যা শুরু করেছে তাতে সবাই মরবে তবুও কারো পরোয়া করবে না সে।সুতরাং এই ছেলেকে নিয়ে আমিও পরোয়া করিনা।”
“এমন বলবেন না আব্বা।ও আমার প্রথম সন্তান।”

“কখনও তোমাকে মা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে সে?ইগোর কাছে নিজেকে দমিয়ে রেখেছে।”
“নিজের মাকে যেভাবে ঘৃণা করে এসেছে আমাকে কিন্তু তাও করেনি।ও তো চাইলেই পারতো আমাকে এই বাড়িতে থেকে তাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা।করেনি তো।ও ওর মতো চাপা থেকেছে।আব্বা একেকজনের কষ্ট একেক রকম।ওর কষ্টটা আমরা কেউই বুঝব না আব্বা।ও আসলেই শোভাকে ভালোবাসে।আমাকে ভালোবাসে।আপনাকে ভালোবাসে।পুরো পরিবারকে ভালোবাসে।নাহলে কি আর সেদিন রাতে আমরা ওর সাথে শোভার বিয়ে দিতাম?”
দর্শন অবাক চেয়ে বলে, “মানে?”

পারুল বেগম চোখের পানি মুছে বলেন,“আমার সাথে শোভার কথা বলার সময় আমার চোখ তোমার দিকে যায়।আমি দেখেছিলাম তুমি মেয়েটার দিকে কীভাবে তাকিয়ে ছিলে।সেদিন শোভা রাস্তা পাড় হবার সময় এক বৃদ্ধকে বাঁচায়।আমি খেয়াল না করলেও তোমার নজরে আসে।সেই নজর দিয়েই আমি শোভাকে দেখতে পাই।ব্যাগ আর বোরকা দেখেই বুঝে যাই এটা শোভা।তাই তো তোমাকে দার করিয়ে ওর সাথে কথা বলি।আর তোমার দৃষ্টিভঙ্গি খেয়াল করি।তোমার যে ওর আচরণের প্রতি ভালোলাগা কাজ করে এটা আমি অনুমান করেছিলাম।আব্বাকে জানাই।আব্বাও তোমার পিছনে লোক লাগিয়েছিল।সেদিনের পর তুমি শোভাকে দেখতে পাওনি কিন্তু স্কুলের আশেপাশে যেতে।শোভা যাবেই বা কিভাবে ওর তো সেদিন আঘাত লাগায় জ্বর আসে।এরপর হঠাৎ সেদিন লোকজন তোমাদের নিয়ে নোংরা কথা বললে আমি আর দীপ্ত মিলে তোমাদের বিয়ে দিতে চাই।কারণ তুমি যে রাগী এই ঝামেলার বোঝা এড়াতে তুমি দেখা গেলো শোভাকেই হারালে।তোমাকে আর কোনোকিছু হারাতে দিতে চাইনি।চেয়েছি একটা পরিপূর্ণ হাসিখুশি জীবন গড়ে দিতে।সৎ মা হই না কেন মা তো তাই স্বার্থপর হয়েছিলাম।সন্তানের সুখ দেখার লোভে সেদিন আমি আব্বাকে ডেকে বিয়ের ব্যাবস্থা করি।ভেবেছিলাম যে মেয়ের আচরণে চাপা ছেলেটা বারবার একটা স্কুলের সামনে আসে মুখে প্রণজ্জল হাসি ফোটায় সে যদি মেয়েটাকে সামনাসামনি পায় তাহলে কতই না প্রাণবন্ত থাকবে।মানুষ চিরসুখী থাকে না কিন্তু একটু তো সুখ পায় জীবনে।শোভাকে দিয়ে তোমার সেই সুখটা আনতে চেয়েছিলাম।আমি জানি আমি তোমাকে তখন চাপে ফেলেছিলাম কিন্তু নিজের স্বার্থে না তোমার স্বার্থে তোমাদের স্বার্থে।আল্লাহর উপর ভরসা করে আমি এগিয়েছিলাম।”
“আপনিই তাহলে বিয়ের আসল কারণ?”

“উছিলা আমার বৌমা।পুরোপুরি না।আংশিক।সেদিন তোমার নিয়তি তোমার সাথে খেলেছিল।নাহলে যে ছেলে মেয়েদের ত্রিসীমানায় থাকেনা সেই ছেলেকে নিয়ে বদনাম আসার মতো কাণ্ড ঘটবে কেন?”
দীপ্ত ফরাজি এবার মুখ খুললেন।নিজের বাবাকে থামাতে বলেন,“আর কত কষ্ট দিবে ছেলেটাকে?”
দাদাজান গর্জে উঠে বলেন,“কষ্ট শুধু তোমাদের হয়?আমার হয়না?আমি চাইনা আমার নাতির সুখ দেখতে?আমারও তো ইচ্ছা করে আমার বড় নাতি সুখে সংসার করবে।ওদের ভবিষ্যৎ সন্তান নিয়ে ওদের জীবনটা হাসিখুশিতে ভরে থাকবে।এগুলো আমি তোমাদের থেকে বেশিই চাই।কিন্তু পেয়েছি কি?ওদের সুযোগ দিয়েও হিতে বিপরীত।এতদিন তোমার ছেলে বউ মানিনা করতো এখন আবার সে বউকে পেয়ে কদর হারায়।শুধু তাই না বউকে কারণে অকারণে আঘাত করে।এগুলো কোনো সংসারের কাতারে পড়ে?”
পারুল বেগম জানান,“আর পাঁচটা ছেলের সাথে আপনি আপনার নাতিকে মেলাবেন না আব্বা।ওর কাছে সম্পর্কের গভীরতা আমাদের থেকেও বেশি।যদি সেটা অপরপ্রান্ত থেকে রক্ষা করতে জানে তো।”

“এখন কি ওই মেয়েটার উপর সব দোষ চাপাচ্ছ?”
“আমি মোটেও একতরফা দোষ দিচ্ছি না।এমনকি আমি ও দোষ দিবই না।এটাই ওদের জীবন।ওরা যেভাবে শুরু থেকে এগিয়েছে সেখানে অতি সহজে মিলেমিশে থাকাটা সম্ভব না।সব সম্পর্কের মধ্যে একটা বোঝাপড়া প্রয়োজন।আপনার সাথে আম্মার ছিলো আমার সাথে আপনার ছেলের ছিল।এই জন্যই কিন্তু আমাদের জটিল সম্পর্ক স্বাভাবিক।ওরা পারেনি নিজেদের স্বাভাবিক করতে।একটা গোমরা চাপা স্বভাবের ছেলে যে শিখেছে মেয়েদের ঘৃণা করতে যে এতদিন থেকেছে নিজের আত্মীয় স্বজন এমনকি পরিবার থেকে দূরে দূরে।একটা ঈদেও যে পারেনি ভাইবোনদের সাথে হেসেখেলে বেড়াতে।আমাদের পরিবারের অনুষ্ঠানের সময় নিজেকে ঘরে রেখে বইতে ব্যাস্ত থাকতো।নিজের মত করে একা একা নিজেকে তৈরি হওয়া ছেলের দ্বারা কি সম্ভব তার বউকে নিজের বিপরীতে রাখা?আর শোভা?ও তো সহজ সরল মেয়ে কিন্তু অভিমান ওর মধ্যেও অনেক।ওকে ভালোবাসলে ও নিজেও দ্বিগুণ ভালোবাসতে জানে ওকে কেউ অপমান করলে হয় তাকে এড়িয়ে যাবে নাহয় তাকে দ্বিগুণ অপমান করবে।শামীমা ওকে এই শিক্ষাটাই দিয়েছে আব্বা।শোভা সাংসারিক হলেও অনেক আত্মসম্মানের অধিকারী।কেউ আঘাত করলেও ও ভেঙে যাবে না।সেই মেয়ে আমার ছেলের সংসার করেছে একমাত্র আমি ওকে অনুরোধ করি তাই।আমার উপর ওর একটা দুর্বলতা আছে।ওর মাকে খুঁজে পায় আমার মাঝে তাই তো মেয়েটা আত্মসম্মানের কথা ভুলে আমার ছেলের সাথে সংসার করেছে।এখানে ভালোবাসা ছিল ঠিক কিন্তু একতরফা চাপা।গোপনে ভালোবাসা ছিল আমার ছেলের তরফ থেকে।ভালো না বেসেও সংসার করার স্বপ্ন দেখেছিল আমার বৌমা।তাই তো জটিল হয়েছে এই সম্পর্ক।”

“তাহলে তুমিই বলো সমাধান কি?”
“আমি আমার ছেলের সাথে আলাদা কথা বলতে চাই।”
দর্শন নরম চাহনি দিয়ে তাকালো।শীতল কণ্ঠে বলে,“আমার সাথে?”
“কেন মা কি পারেনা ছেলের সাথে আলাদা কথা বলতে?”
দর্শন উত্তর না দিয়ে মুখ ঘোরালো।চলে গেলো ভিতরে।পিছন ছুটলো পারুল বেগম।সবাই ভিতরে যেতে নেয়।দাঁড়িয়ে আছে একা তুহিন।দাদাজান বলেন,“এই যে আমার না হওয়া নাতজামাই।”
তুহিন নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে,“আমি?”
“হ্যাঁ,আপনি জনাব।”
“আমি না হওয়া নাতজামাই!”
“আমার নাতনীকে বিয়ে করেছো এখনও? করোনি তো।করবে কবে এর তো ঠিক ঠিকানা নেই তাই তুমি আমার না হওয়া নাতজামাই।”
“প্রেমা কোথায় দাদাজান?”
“সে তো তোমার হৃদয়মাঝে বাস করতে শুরু করেছে।এখন ওসব প্রেমের আলাপ বাদ।ভিতরে চলো।তোমার সাথেও বোঝাপড়া আছে।”
“বোঝাপড়া!”
“অবশ্যই বোঝাপড়া।আমার নাতনীকে ভালোবাসবে আর আমি বোঝাপড়া করবো না?”
তুহিন সাহসিকতার সাথে বলে,“বেশ তবে চলুন।ভালো যখন বাসার সাহস রেখেছি বোঝাপড়া করার জন্য প্রস্তুত আছি।”

“আরেক হিরো!নাতির বন্ধু বলে কথা।চলো ভিতরে।”
দাদাজান আর তুহিন ভিতরে ঢুকলো।দুজনেই সোফায় বসে।তুহিন মনে মনে ভিত থাকলেও নিজেকে সাহসিকতার সাথে রাখে।দাদাজান একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলে,“সই করো।”
“কিসের কাগজ?”
“আমার নাতনীকে এতদিন খাইয়ে পড়িয়ে মানুষ করেছি।এবার আমরা ছুটি চাই।তারই চুক্তিনামা।”
তুহিন চশমার মাঝেই ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই দিদার কল দেয় তুহিনের মা তাহমিনার কাছে।তিনি ভিডিও কলে আসতেই তুহিন বলে,“তুমি?”
“হিবা আমাকে সব জানিয়েছে।”
“হিবা কে?”
“তনয়ার বান্ধবী।শোভার সাথেই পড়ে।আরে সেদিন যখন তানিয়া তোর সাথে কথা বলছিল হিবা ওদের সাথে ছিল।তোদের সমস্ত ঘটনা তনয়ার কাছে বলে দেয়।যেহেতু তুই আরও তনয়া খালাতো ভাইবোন তাই হিবাও তোকে ভালোভাবে চেনে।সব শুনে আমি যোগাযোগ করি তালই সাহেবের সাথে।”
“কিন্তু মা..
“কোনো কিন্তু না।দর্শন তোমাদের মধ্যে বাধা হতে আসছে না তুহিন।দিজার বাবা মা জীবিত।তারা নিজেরাই রাজি এই প্রস্তাবে।দুজন দুজনকে ভালোবাসো তোমরা।এতদিন ছেলেকে গুমড়ে থাকতে দেখতাম।কাহিনী খুঁজতাম।আজ যখন সব জানতে পারলাম মা হয়ে ছেলের সুখটাই দেখবো।ছেলের বউকে যখন আমার খুব প্রয়োজন সে তো হতে হবে আমার ছেলের প্রিয়জন।”
তুহিন হাসিমুখে মাথা নিচু করে বলে,“এভাবে বিয়ে না করে দর্শনের সম্মতিতে সবাই শামিল থেকে বিয়ে করতে চাই।”
“সেটাও হবে।তোমার বাবা দেশে আসলেই হবে।ততদিন তো আর তোমাকে সিঙ্গেল রাখতে পারিনা।আজকে তোমরা রেজিস্ট্রি করো।তোমার বাবা আসলেই অনুষ্ঠান করবো।”

“দর্শন আসুক আগে।”
দাদাজান তাড়াহুড়ো করে বলেন,“আমার নাতির তোমার দিকে খেয়াল নেই বাপু।তুমি তোমার কাজ সারো।যার জন্য অপেক্ষা করবে সে নিজের বউয়ের খোঁজ পেলে তোমাকে এখানে রেখেই ছুট লাগাবে বাতাসের গতিতে।”
“প্রিয় বন্ধুকে রেখে বিয়ে করে নিবো?”
“যেখানেই যাও বন্ধু বন্ধু করা লাগবে তোমার?”
“আমার জীবনে আর অবদান অনেক দাদাজান।”
“তোমার হাবভাব আমাকে ভাবাচ্ছে।”
“কেন দাদাজান?”

“যেভাবে বন্ধু বন্ধু কর মনে তো হয়না বন্ধুকে রেখে বাপ হবার উদ্যোগে পা দিবে।”
তুহিন কিছুই বুঝলো না।একটু ভাবতেই জিহ্বা কামড়ে বলে,“কি যে বলেন না দাদাজান।”
“চুপ!বিয়ে করবে তুমি,তোমার বন্ধু না যে এত মিনমিন করছো।”
দীপ্ত ফরাজি দাদাজানকে থামিয়ে বলেন,“সই করে নেও।দর্শনকে আমি দেখছি।এমনিতেই আমি থাকতে দর্শন দ্বিমত করবে না।”
“আমি ওকে আমার আপনজনের থেকেও ভালোবাসি আংকেল।ওর মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।”
দাদাজান চমকে বলেন,“তুমিও কি আমার নাতির মতো তার ছেড়া?বিয়ের পর আমার নাতনীকে নিয়ে পাগলামি করবে না তো!তাহলে এই বিয়ে বাতিল।”
বলেই কাগজ নিতে নিলে তুহিন আটকে বলে,“একদম না দাদাজান।আমি প্রেমাকে আমার সবটুকু দিয়েই আগলে রাখবো।ওর জন্য হয়তো পাগলামি করতে পারি কিন্তু ওর উপর প্রভাব ফেলতে পারিনা।”
“তাহলে সই করে আমাকে উদ্ধার করো।তোমাদের প্রেম পিরিতির নাটক দেখতে মন চায়না আমার।সব কয়টা দূরে গিয়ে অসুখে থাকলেও আমার সামনে সুখে থেকো।”

তুহিন আহম্বক হয়ে শুনলো।দীপ্ত ফরাজি হেসে দেন আর বলেন,“সই করো বাবা।আমার বেয়াইয়ের সাথে কথা হয়েছেন।তিনি দুইমাস পর আসবেন।তখন ধুমধাম করে আয়োজন হবে।”
তুহিন দ্বিধাদ্বন্দ্বে না পরে কাগজে সই করতে নিলে দেখে দিজার সাক্ষর।আলতো হেসে সই করে দেয়।
পারুল বেগমের কথা শুনে দমে যায় দর্শন।তিনি বোঝালেন শোভাকে জোর করে জেদ থেকে না ভালোবেসে ধৈর্যের সাথে নিজের কাছে রাখতে হবে।তবেই শোভা দর্শনের হতে পারবে।সম্পর্ক ধরে রাখতে হলে ধৈর্যের অনেক প্রয়োজন।দাঁত খিচে হলেও তার করা অপছন্দ কাজকে পছন্দ করে নেওয়া লাগবে প্রিয়জনকে খুশি করতে হবে।কেন হলো,কি হলো,কীভাবে হলো এই ব্যাপারে আমাদেরকে ভেবেচিন্তে পরবর্তী সিদ্ধান্তে পদক্ষেপ নিতে হবে।হঠকারিতায় কোনোকিছু সমাধান হয়না।শোভা একা না দর্শনকেও মানিয়ে নিতে হবে।দুজনেই মানিয়ে চললে সুখে থাকবে।সব মুখবুজে শুনে দর্শন তাকায় জানালার বাইরে।পারুল বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন,“পারবে না নিজের জীবনকে রঙিন করতে একটু ধৈর্য ধরতে?”

দর্শন মৃদু হেসে বলে,“আমার করা অনিহা সহ্য করেও যদি আপনি ধৈর্য ধরতে পারেন আমাকে আপনার সন্তান বলে দাবি করতে পারেন তবে আমি কেন আপনার বৌমার ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরবো না?”
“সম্পর্কের চাবিকাঠি হলো ধৈর্য ও সম্মান।ধৈর্যের ফাটল দেখা দিলে সব শেষ।”
“আমাকে একটু একা সুযোগ দেওয়া যায় কি?”
“অবশ্যই।তুমি বিশ্রাম নেও।আমি নিচে যাচ্ছি।”
যেতে নিয়েও একটু থেমে বলেন,“আজকে তুহিনের সাথে দিজার রেজিস্ট্রি হচ্ছে।”
দর্শন কিছুই বলল না।পারুল বেগম জিজ্ঞাসা করলেন,“আপত্তি নেই তোমার?”
“সন্তানের জন্য বাবা মা ভালোটাই নির্বাচন করেন।যেমনটা আমার বেলায় করেছেন।তাই আমার বোনের বিয়েতে আপত্তি করার কারণ দেখিনা।”
“ভালো লাগলো তুমি বুঝেছো।”
দর্শন মাথা উপর নিচ করতেই চলে যান পারুল বেগম।নিচে এসে দাদাজানের জানান,“ছেলেটা নিস্তেজ হয়েছে।আর রাগ দেখাবেন না আব্বা।”
“তোমার ছেলে বুঝলেই ভালো।”
চুপ করে থাকল সবাই।দাদাজান ফের জিজ্ঞাসা করেন,“ছেলেকে জানাও বোনের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।”
“জানিয়েছি।”

তুহিন দাঁড়ালো সাথে সাথে।বলে,“কি বলল?”
দাদাজান চোখ উপর করে তুহিনের দাঁড়ানো দেখে বলে,“বিয়ে তো হয়েছেই এখনও কিসের আতঙ্ক?”
পারুল বেগম দাদাজানকে এড়িয়ে বলেন,“আমাদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন সবকিছু।”
খানিক বাদে নীরবতার মাঝে ছুটে আসে দর্শন।দাদাজানের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,“আমার ওয়াইফি কোথায় দাদাজান?”
দাদাজান রসিকতা করেন,“বউ তোমার তার খোঁজ আমি কি করে জানবো?”
“তুমিই ওকে লুকিয়ে রেখেছো।”
“লও ঠেলা,খেলাম এবার আমিই মামলা।”
“দাদাজান দোহাই তোমার।বলো না কোথায় আমার বউ?”
“বেশরইম্মা ব্যাটা মানুষ গুরুজন মানে না।বাবা মা দাদার সামনে বউ বউ করে।”

“তিনটে রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি তার জন্য।খাওয়া কি ঘুম কি একদম ভুলে গেছি।তাকে দেখার আশায় এদিক থেকে ওদিক ছুটছি।নিজেকে হারিয়ে ফেলছি আমি।আর কিসের পরীক্ষা নিবে তোমরা আমার?এবার অন্তত আমাকে তার কাছে নিয়ে চলো।আমি নাহয় ধৈর্যের আরো পরীক্ষা দিবো কিন্তু চোখের সামনে তাকে তো দেখতে পাবো।”
দাদাজান এবার তুহিনের দিকে চেয়ে বলেন,“তুমিও কি বউকে দেখতে না পেয়ে পানিশূন্যতায় ভুগছো?”
তুহিন অনুরোধের চোখে তাকিয়ে বলে,“বুজতেই তো পারছেন জীবনটা আপনার নাতনীর জন্য শুকিয়ে আছে।”
“বেশ, চলো তোমাদের বউদের কাছে।”

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৬ (২)

বলেই ড্রাইভারকে কল দিলেন পিরোজপুর যাওয়ার জন্য।দর্শন বলে,“আমার গাড়িটা গলির মাথায় আছে।”
“আমাদের ড্রাইভার গিয়ে নিয়ে এসেছে।”
দিদার বলতেই থামলো দর্শন।সবাই এবার পিরোজপুরের উদ্দেশে রওনা দেয়।

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৭ (২)