Home বিয়ে পাগলি বিয়ে পাগলি পর্ব ৬

বিয়ে পাগলি পর্ব ৬

বিয়ে পাগলি পর্ব ৬
নিলুফা নাজমিন নীলা

সায়রা বসে আছে একেবারে ফুলে ভরা সাজানো রুমে। বিছানায় ফুল, চারপাশে ফুল, এমনকি দেওয়ালে ঝোলানো শাওনের ছবিগুলোতেও যেন ফুলের ছোঁয়া আছে। লেহেঙ্গা পরা অবস্থাতেই কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে সে, অথচ এখনো শাওনের দেখা নেই।
হঠাৎই সায়রা দাঁড়িয়ে গেল। রাগে, অস্থিরতায় রুমে এদিক-সেদিক হাঁটতে লাগল। মনে মনে নিজেকেই বলল,
“মনটা চাইতাছে ওই খচ্চর বেডারে টেনে এই রুমে নিয়ে আসি, তারপর একদম উত্তম-মাধ্যম দিই।”
ঠিক তখনই দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল। সায়রা হকচকিয়ে তাকাতেই দেখে শাওন ঢুকছে।
সায়রা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কণ্ঠে ঝড় তোলা গলায় বলল,

“এসে গেলেন? আর এক মিনিট দেরি হলে কাল নিউজে হেডলাইন হতো স্বামী দেরিতে বাসর ঘরে ঢুকার কারণে নববধূর হাতে স্বামীর খু’ন!”
শাওন ধীর, শান্ত গলায় বলল,
“এসব কি সায়রা? তুমি কি কোনো বাংলা ছবি দেখোনি নাকি?সেখানে নায়িকারা কত সুন্দর করে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে।”
সায়রা ঠোঁট কামড়ে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ দেখেছি! তাই তো ভেবেছিলাম আমি হবো শাবানা। কিন্তু কি হলো? শেষমেষ আপনি তো আমাকে শাবনূর বানিয়ে ছাড়লেন!”
সায়রা কথা শেষ করে গিয়ে বিছানার মাঝখানে বসে পড়ল মাথায় লম্বা ঘুমটা দিয়ে।শাওন হা করে তাকিয়ে আছে,এসব কি!

সায়রা বলল বোকার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে আমার মাথার গুমটাটা শরীয়ে আমাকে উদ্ধার করেন।
শাওন সায়রার কথায় পাত্তা না দিয়ে বলল
“আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি আর তোমার লেহেঙ্গাটা খুলে ফেলো।”
সায়রা লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল,
“লেহেঙ্গা খুলে ফেলব?”
শাওন কিছুই বুঝলোনা এভাবে লজ্জা পাওয়ার কি আছে।
“আমি তোমাকে লেহেঙ্গা খুলে অন্য পোশাক পড়ার কথা বলেছি।”
শাওন ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।সায়রা অবলার মতো তাকিয়ে আছে। তারপর সায়রাও লেহেঙ্গা চেঞ্জ করে লম্বা টপস প্যান্ট পড়ে নিল।
শাওন এসে বলল,

“সায়রা এখন ঘুমিয়ে যাও এখন আমরা দুজনেই ট্রায়াট।”
শাওন শুয়ে পড়ল।কিন্তু সায়রা এখনো দাড়িয়ে আছে।শাওন চেয়ে দেখল মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে সায়রা।
শাওন বলল,
“এ্যানি প্রবলেম?”
“আমার একটা কাজ আছে।”
শাওন ভ্রু কুঁচকে সায়রার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি কাজ?”
“আপনাকেও যেতে হবে, চলুন।”
শাওন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“যা কাজ করার সকালে হবে এখন ঘুমাও।”
সায়রা বলল,

“সকালে করলে হবেনা এসব কাজ রাতেই করতে হয়।”
শাওন চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে,
“কি বলছো কি তুমি!যা বলার সরাসরি বলো।”
“আমরা এখন চুরি করতে যাবো।”
শাওন থমকে সায়রা সামনে দাঁড়ালো বলল,
“তুমি চুরিও করো ছিহ্ ছিহ্ শেষ পর্যন্ত চুন্নি বউ বিয়ে করলাম!”
“এত কথা বাদ এখন চলেন চুরি করতে যাব।যদি না যান তাহলে…”
শাওন পকেটে হাত ঠুকিয়ে বলল,
“তাহলে কি করবে?”
সায়রা একটা অদ্ভুত হাসি দিয়ে বলল,
“তেমন কিছু না শুধু চিল্লাতে থাকবো।”
শাওন বলল,

“তুমি পাগল হয়ছো?তুমি বুঝতে পারতেছো আজকে রাতে চিল্লাতে থাকলে মানুষ কি ভাববে?”
সায়রা নিজের কথায় অটল থেকেই বলল,
“আমি বুঝেই বলেছি।এবার বলুন আপনি রাজি আছেন কি না?”
শাওন কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল সে বুঝতে পারছে কিছু করার নেই রাজি তাকে হতেই হবে না হলে যে পাগল মেয়ে!
“আচ্ছা ঠিক আছে কি চুরি করবা।”
সায়রা মুচকি হেসে বলল,

“আম।”
শাওন বলল,
“তুমি আম গাছ কোথায় দেখলে আর এখন আমের সিজন না গাছে আম এখনো হয়নি।”
“জ্বি না এক ডজন।গাড়ি দিয়ে আসার সময় আপনাদের বাড়ির পাশেই যে বাড়িটা সেই বাড়ির গেইটের সাথেই আম গাছ আছে।”
“তুমি না কাঁদতে ছিলা তাহলে এসব আম কখন দেখলা।”
“এত কিছু আপনাকে ভাবতে হবেনা এখন চলুন যাই।”
শাওন আর সায়রা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সায়রা লাফাতে লাফাতে হাঁটছে। শাওন বলল,
“তুমি ব্যাঙের মতো লাফাচ্ছো কেন সোজা হয়ে হাঁটো। ”
“আমি সোজা হয়ে হাঁটতে পারিনা আপনার কোনো সমস্যা? ”
“ও তুমি যদি প্রতিবন্ধী হও তাহলে সমস্যা নেই।”
সায়রা রাগে তাকিয়ে রইল।সায়রা বলল,
“আপনাকে কলেজের একটা কাহিনি শুনায়।”

শাওন কোনো কথা বলল না। সায়রা শাওনের উত্তরের আশায় না থেকে বলল,
“কলেজে পড়াকালীন আমি আর ঝিনুক চুরি করতে গিয়েছিলাম।অবশ্য ঝিনুককে আমি জোর করেই নিয়ে গিয়েছিলাম।কলেজের পাশেই একটা বাড়ি ছিল বাড়িতে শুধু একটা মহিলা থাকত।তার ছেলে মেয়ে সবাই বিদেশে থাকত।ঘরের সামনেই একটা লিচু গাছ।আমি আর ঝিনুক চুরি করে বাড়িতে ঢুকে লিচু পারছিলাম তখনি মহিলা দেখে নিয়ে ঝাড়ু নিয়ে দৌড়ে আসে।আমি তো দেওয়াল টপকে বেরিয়ে আসি।কিন্তু ঝিনুক সেখানেই ছিল।পরে মহিলা ঝিনুককে না মেরে ঘরের সব তালা বাসুন ধুইয়ে তারপর ছেড়েছিল।”
বলেই সায়রা হাসতে শুরু করল।
শাওন পকেটে হাত টুকিয়ে হাঁটছিল বলল

“বেচারি ঝিনুক। ”
তারা চলে আসে সেই বাড়ির সামনে।সায়রা বলল,
“দাড়ান এটাই সেই বাড়ি।”
শাওন দেখল আম গাছটা গেইটের অপারে।গেইটের উপরে উঠে তারপর আম পারতে হবে।শাওন বলল,
“বউ ভালো আমার চলো চলে যায়। তোমাকে বাজার থেকে যত মন চায় তত আম কিনে দিব।”
সায়রা শাওনের মুখ থেকে বউ ডাক শুনে লজ্জা পেল কিনা বুঝা গেলনা বলল,
“বউ ডেকে লাভ নেই আমাকে। আমি এখনি গাছ থেকে দিতে হবে।”
শাওন বিরবির করে বলল,
“আল্লাহ গো কোন ভুলের শাস্তি দিচ্ছো।”
সায়রা বলল,
“কিছু বলছেন?”
“না না কি বলবো!বলছিলাম আমার কপালটা কতো ভালো শান্ত শিষ্ট একটা বউ পেলাম।”
সায়রা মুখ ভেংচি কাটলো।শাওন গেইট বেয়ে উঠে গেল।শাওনের বুক ধরপর করছে।দুইটা আম পেরে উপর থেকে নিচে ফেলল সায়রা তা ধরে নিল।তৃতীয় নাম্বার আম পারতে যাবে তখনি ভেতর থেকে কেউ বলছে,

“এ্যাই কে রে এখানে।”
বলে লাইট নিয়ে লোকটা এদিকেই আসছে।শাওন বুঝে পাচ্ছে না সে কি করবে।সায়রা বলল,
“তাড়াতাড়ি নামুন ধরলে কিন্তু আর রক্ষে থাকবেনা।”
শাওন তাড়াতাড়ি নেমে গেল।ইতিমধ্যে দুজন লোক প্রায় গেইটের কাছে।শাওন নামতেই সায়রা শাওনের হাত ধরে দৌড়ে যেতে লাগল।পেছনে দাড়োয়ান বলল,
“এ্যাই কে দাঁড়া বলছি।”
কিন্তু ততক্ষণে শাওন সায়রা অনেকটা চলে গেছে।অনেকটা যাওয়ার পর তারা দু’জন গিয়ে হাটুতে হাত দিয়ে ধম নিতে লাগল।শাওন সায়রার দিকে তাকালো রাগী দৃষ্টিতে আর সায়রা দাঁত খিলখিল করে হাসলো।

নিচে ড্রয়িংরুমে মোজাম্মেল হোসেন সোফায় হেলান দিয়ে চা খাচ্ছিলেন, হাতে খোলা খবরের কাগজ। পাশে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে রেহানা বেগমের কড়াই নেড়েচেড়ে রান্না করার শব্দ। তিনি সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত। অন্যদিকে সুভা আর শুভ্র প্রতিদিনের মতোই কোন এক তুচ্ছ বিষয়ে তুমুল ঝগড়ায় লিপ্ত এটা তাদের নিত্যদিনের ব্যাপার।
ঠিক সেই সময় সবার দৃষ্টি চলে গেল সিঁড়ির দিকে। সায়রা নামছে সিঁড়ি বেয়ে ধীর পায়ে। গায়ে হালকা রঙের শাড়ি, মাথার খোলা চুল দু’পাশ বেয়ে ঝরে পড়েছে। শাড়ির কুঁচি এক হাতে ধরে নামছে, তবুও পায়ের নিচে বারবার আটকে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, যে কোনো মুহূর্তে শাড়িটা খুলে যাবে।
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আবার মুচকি মুচকি হাসতেও লাগল। মোজাম্মেল হোসেন একটু হাসি চেপে খবরের কাগজ টেবিলে রেখে উঠে গেলেন নিজের রুমে। শুভ্র এখনো কিছুই বুঝতে পারেনি, মোবাইল কানে নিয়ে ডুবে আছে।
সুভা তখন হঠাৎ চোখ বড় বড় করে শুভ্রকে বলল,

“শুভ্র, তুই ঘরে যা।”
শুভ্র অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
“কেন? এখন আবার কি হলো?”

সুভা তাড়াহুড়ো করে বলল,
“আমার হেডফোনটা রুমে পড়ে আছে, গিয়ে নিয়ে আয়।”
শুভ্র বিরক্ত মুখে রুমে দিকে হাঁটল। আর সুভা তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে সায়রাকে ধরে দিল নিচে নামাতে। যদি ধরত না, এতক্ষণে হয়তো সিঁড়ি ভেঙে গড়াগড়ি খেত সায়রা।
সুভা ঠাট্টাস্বরুপ হেসে বলল,
“ভাবি, এত সুন্দর করে শাড়ি পরা কে শিখালো? আমাকেও একদিন শিখিয়ে দিও।”
সায়রা ঠোঁট ফুলিয়ে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বলল,
“বাড়িতে তো মা-ই পরিয়ে দিতেন। আমি কোনোদিন একা একা শাড়ি পরিনি।”
সুভা বলল,

“কেন ভাইয়াকে বলতে পারলে না পরিয়ে দিতে? এত লজ্জার কি আছে?”
সায়রা ঠোঁট বাঁকিয়ে উত্তর দিল,
“তোমার ভাই আবার শাড়ি! এ নাম্বারের আনরোমান্টিক!”
শেষের কথাটা ফিসফিস করে, আস্তে বলল সে।
ঠিক তখনই সেখানে রেহানা বেগম এসে হাজির হয়ে বললেন,
“শাড়ি পরতে পারোনা এখনো?”
সায়রা চুপ করে রইল, কিছুই বলল না।রেহানা বেগম একটু হাসি চেপে বললেন,
“আচ্ছা ঠিক আছে, এসো, আমি পরিয়ে দিচ্ছি।”
তারপর তিনি ধীরে ধীরে সায়রাকে শাড়ি পড়িয়ে দিতে লাগলেন।
শাড়ি পড়ানোর সময় সায়রা একটু কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“শাশুমা… আমার শ্বশুর মশাই কি আপনাকে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছিলেন বিয়ের পর?”
রেহানা বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললেন,

“এসব কি আজেবাজে কথা! লজ্জা করছেনা এসব প্রশ্ন করতে?”
সায়রা মুচকি হেসে বলল,
“লজ্জা পাওয়ার কি আছে! শুধু বলুন না, পরিয়ে দিয়েছিলেন তো?”
রেহানা বেগম মাথা নেড়ে ধীরে বললেন,
“হ্যা, দিয়েছিলেন। আমি শাড়ি পরতে পারতাম, কিন্তু তবুও উনি নিজের হাতে পরিয়ে দিয়েছিলেন আমাকে।”
সায়রা এবার গম্ভীর মুখে বলল,

বিয়ে পাগলি পর্ব ৫

“তাহলে আপনার ছেলে এতো গম্ভীর আর আনরোমান্টিক কেন?”
রেহানা বেগম বিরক্ত হয়ে গলা নামিয়ে বললেন,
“সেটা তোমার স্বামীকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করো।”
রেহানা বেগম শাড়ি পড়িয়েই চলে গেলেন আর বললেন,
“ কি মেয়েরে বাবা! এমন মেয়ে বাপের জন্মে দেখিনি।”

বিয়ে পাগলি পর্ব ৭