Home বিয়ে পাগলি বিয়ে পাগলি শেষ পর্ব 

বিয়ে পাগলি শেষ পর্ব 

বিয়ে পাগলি শেষ পর্ব 
নিলুফা নাজমিন নীলা

রান্নাঘরে রান্না করছে সায়রা আর ঝিনুক। দু’জনেরই ভিন্ন ভিন্ন ব্যস্ততা একজন রান্নায়, আরেকজন কেবল দুষ্টামিতেই!
ঝিনুক রুটি বেলার কাজে মন দিচ্ছে, আর সায়রা আটার গুড়ার মধ্যে আঙুল ঘুরাচ্ছে।
ঝিনুক বিরক্ত হয়ে বলল,
“সমস্যা কি তোর? ঠিক করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারিস না নাকি?”
সায়রা মুখ ফুলিয়ে বলল,

“কেন? তুই দেখতে পাচ্ছিস না আমি যে কাজ করছি?”
ঝিনুক সায়রার দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল সায়রার পুরো মুখ ভর্তি আটার গুড়া।ভ্রু কুঁচকে ঝিনুক বলল,
“রুটি বানাচ্ছি আমি, তোর মুখে আটা কেন?”
সায়রা হেসে উত্তর দিল,
“বুঝিস না? এখন যদি কেউ রান্নাঘরে ঢোকে, তখন আমাকেই দেখেই বলবে বাড়ির বড় বউ রান্নায় কত কাজের!”
ঝিনুক চুপ করে রুটি বানাতে লাগল। কিন্তু সায়রা সুযোগ ছাড়ল না এক চিমটি গুড়া নিয়ে ঝিনুকের গালেও মাখিয়ে দিল।
ঝিনুক এবার রেগে দাত খিঁচিয়ে বলল,

“তুই এখন একটা লাত্থি খাইবি, সায়রার বাচ্চা!”
সায়রা গম্ভীর ভঙ্গিতে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“ভুলে যাস না, আমি তোর বড় জা। সম্মান কর, শালী!”
ঝিনুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আল্লাহ, তোর এই জ্বালাতন কতদিন সহ্য করতে হবে কে জানে।”
সায়রা চোখ টিপে উত্তর দিল,
“সারাজীবন!”
ঝিনুক বিরক্ত স্বরে বলল,

“হু, তা তো করতেই হবে। জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করলাম ভাবছিলাম তুই বিয়ে হয়ে গেল এই বোধহয় একটা পাগলির হাত থেকে মুক্তি পেলাম।তখন কি জানতাম, আবার সেই পাগলির কাছেই ফিরে আসতে হবে!”
সায়রা ভ্রু কুঁচকে জবাব দিল,
“আমার দেবরকে বিয়ে করার সময় কথাটা মনে রাখা উচিত ছিল!”
এদিকে ঝিনুক বিরক্ত হয়ে বারবার গাড় চুল সরাচ্ছে চুলগুলো এসে চোখ-মুখ ঢেকে দিচ্ছে।
ঝিনুক বলল,

“সায়রা, আমার চুলগুলো বেঁধে দে।”
সায়রা দুষ্টু হেসে বলল,
“দেবর সাহেবকে ডাক দিব নাকি?”
ঝিনুক লজ্জায় লাল হয়ে বলল,
“তোকে যা বললাম, তাই কর।”
সায়রার দুষ্টামিতে কখনই ঝিনুক রাগ করেনা বরং আনন্দ উপভোগ করে এমনকি বাড়ির সবাই।
ড্রয়িংরুমে বাড়ির সবাই বসা রেহানা বেগম,মোজাম্মেল শুভ্র এবং শাওন।সবাই গল্প করছে।হঠাৎ দুতলা থেকে কিছু একটার আওয়াজ হলো।সাথে সাথে সবার মুখের রং পাল্টে গেছে।একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে রইল তারপরই শাওন উঠে দৌড়ে গেল উপরে সাথে শুভ্রও।রেহানা বেগমের বয়স হয়েছে তবুও তিনি গেলেন ছেলেদের পেছনে।

শাওন দৌড়ে গিয়ে সোজা ঢুকল তার রুমে।রুমে ঢুকে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে তাকলো।সামনে তাকিয়ে দেখল মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুনয়না।শাওনের একমাত্র প্রান বাড়ির সকলের চোখের মনি।
মাত্রই ঘুম থেকে উঠেছে।শাওন কাছে যেতে যেতে বলল,
“আমার রাজকন্যা উঠে পড়েছে!”
সুনয়না কোমড়ে হাত দিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল,
“একদম আমার কাছে আসবেনা পাপা। আমাকে একা রুমে রেখে কোথায় গিয়েছিলে?”
পরমুহূর্তেই এসে হাজির হলো রেহানা বেগম এবং শুভ্র। শাওন বলল,
“আমার রাজকন্যা তো ঘুমিয়ে ছিল তাই।ঠিক আছে সরি কেমন?”
রেহানা বেগম নাতনির কাছে গিয়ে কোলে তুলে নিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলল,

“আমার সকলেই সরি আর কখনো একা রেখে এক পা-ও যাবনা।”
সুনয়না এবার শুভ্রর দিকে তাকালো বড়দের মতো মুখ করে বলল,
“চাচ্চু এদিকে আসো।”
শুভ্র মাথা নিচু করে বলল,
“জ্বি জনাবা বলুন।’’
“আমার জন্য চকলেট এনেছো?”
“এটা কীভাবে ভুলব বলো।অবশ্যই এনেছি।’’
সুনয়না মুচকি হেসে বলল,
“গুড বয়।”

সুনয়নার বয়স মাত্র ছয় বছর।তবে এই বয়সেও একদম বুড়ি যাকে বলে।বড়দের মতো আচরণ করে এখনি।মেয়েটার চোখ গুলো নীলরঙা তাই তার নাম রাখা হয়েছে সুনয়না। গায়ের রং ধবধবে সাদা।
ড্রয়িংরুমে খেলা করছে সুভা আর সুনয়না। দুজনের মাঝে যেন বেশ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।
বাড়িতে অন্য কোনো বাচ্চা না থাকায় সারাদিন সুনয়না সুভার সাথেই খেলে।সুভাকে সুনয়না সুন্দরী বলেই ডাকে।
হঠাৎ সুনয়না সুভাকে ডেকে বলল,
“আচ্ছা সুন্দরী, আমি যখন জন্মেছিলাম তখন কি হয়েছিল?”
সুভা মুচকি হেসে সুনয়নাকে কোলে নিয়ে সোফায় বসলো।
সে নরম স্বরে বলল,

“তুমি যেদিন জন্মেছিলে, সেদিন তোমার পাপা খুব কান্না করেছিল।”
সুনয়না ভ্রু কুঁচকে মুখ ফুলিয়ে বলল,
“কি? আমি পৃথিবীতে প্রথম আসলাম, আর পাপা খুশি না হয়ে কান্না করলো? তার মানে পাপা খুশি ছিল না?”
সুভা দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আরে না না! সবাই তখন অনেক খুশি ছিল।কিন্তু তুমি যখন মাম্মার পেটে থেকে দুষ্টামি করে বক্সিং করছিলে, তখন মাম্মা খুব ব্যথা পেতো আর কাঁদতো। সেই ব্যথা দেখে তোমার পাপাও কেঁদেছিল।”
সুনয়না কিছুক্ষণ চুপ থেকে ছোট্ট করে বলল,

“মানে আমি মাম্মাকে ব্যথা দিয়েছিলাম…”
এই বলে সুনয়না মুখ গম্ভীর করে উঠে গেল সুভার পাশ থেকে।
সোজা চলে গেল রান্নাঘরে, যেখানে সায়রা রান্না করছে।
সে মিষ্টি গলায় ডাক দিল,
“মাম্মা!”
সায়রা মেয়ের কণ্ঠ শুনে পেছনে তাকালো।কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে আদর করে বলল,
“কি হয়েছে আমার সোনামণির?”
সুনয়না ভ্রু কুঁচকে লাজুক গলায় বলল,
“স্যরি…”
সায়রা অবাক হয়ে হেসে জিজ্ঞেস করল,
“স্যরি কেন বলছে আমার বাবু?”
সুনয়না গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,

“সুন্দরী বলেছে আমি নাকি তোমাকে পেটে থাকতে ব্যথা দিয়েছি।”লেখিকার পেইজ: Nilofa Najmin Nila
সায়রা হাসিমুখে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“এখন সরি বললে কি হবে? একটা কাজ করো তোমার পেটে আমি ঢুকে যাই, তারপর তোমাকেও একটু ব্যথা দিই। তাহলেই সমান সমান।”
সুনয়না সাথে সাথেই নিজের জামা তুলতে তুলতে বলল,
“আসো মাম্মা, ঢুকে পড়ো।”
সুনয়নাকে দেখে সায়রা আর ঝিনুক দুজনেই হেসে উঠলো।
ঝিনুক মজা করে বলল,
“সায়রা, তোর মেয়েও দেখি তোর মতোই পাগলি হয়েছে।

দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে সকলে এক সাথে বসল।কি সুন্দর একটা পরিবার। সবাই মুগ্ধ হই তাদের সম্পর্ক দেখে পাড়াপ্রতিবেশি অনেকে আবার হিংসাও করে। অনেকের আবার অন্যের সুখ সহ্য হয়না।প্রতিদিন তারা দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর এক সাথে বসে হাসি মজার আড্ডা করবে।কিন্তু আজ রেহানা বেগম গম্ভীর মুখে বসা।
সবাই তাকিয়ে আছে অবাক হয়ে।রেহানা বেগমই প্রতিদিন সবার আগে শুরু করবে আর দুষ্টুমিতে শেষ করবে সায়রা।
সায়রা এবার বলল,
“শাশুমা আপনার মুখে কি পিঠার জন্য চাল ভিজিয়ে রেখেছেন?কিন্তু সমস্যা নেই ভালোই লাগছে আমাদের সুনয়নার মতো।”

সকলেই সায়রার কথায় হাসলো শুধুমাত্র রেহানা বেগম ছাড়া।সুনয়না এবার মুখ ফুলিয়ে বলল,
“মাম্মা বুড়ির সাথে আমাকে কেন তুলনা দিচ্ছো?”
রেহানা বেগম এবার মুখ খুললেন বললেন,
“আমি রাগ করেছি?”
সায়রা রসিকতার স্বরে বলল,
“কেন শাশুমা কি হয়ছে?আমার শ্বশুর মশাই কি কিছু বলেছে নাকি?”
রেহানা বেগম আবার রাগী কন্ঠে বলল,

“সবাই থামো আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করব।”
সবাই থেমে গেছে।রেহানা বেগম বলল,
“সায়রা তোমার সমস্যা কি?সকাল থেকে দেখছি তুমি কোনো দুষ্টামি করছো না? কেন?”
শাওন বলল,
“কেন মা সায়রা আজ একটু চুপ আছে আমরা তো খুব শান্তিতেই আছি।”
রেহানা বেগম ধমক দিল বলল,
“চুপ কর সায়রা দুষ্টামি আমার ঔষধে পরিণত হয়েছে ও দুষ্টামি না করলে আমার শরীর খারাপ লাগে।”
ঝিনুক এবার বলল,
“মা তুমি মনে হয় আজকে রান্না ঘরের কাহিনি দেখোনাই তাই এসব বলছো।রান্না ঘরে তোমার বউমা আমাকে জ্বালিয়ে মেরেছে।”

সুনয়না সকলের মাঝে দাড়িয়ে গেল বলল,
“নাহ দাদু আমি এটা মানতে পারলাম না।আমি দুষ্টামি করব এটা আমার বয়স দুষ্টামি করার।মাম্মা কেন করবে?এতে কি আমাকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে না?”
শাওন সুনয়নাকে কাছে টেনে বলল,
“একদম ঠিক বলেছে আমার রাজকন্যা। আমার রাজকন্যা একমাত্র দুষ্টামি করার অধিকার রাখে।”
সায়রা এবার কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“দেখলেন শাশুমা আমাকে এই বাড়ির কেউ গুরুত্ব দেয়না এক মাত্র আপনি ছাড়া।সবাই আমাকে মিষ্টি ছাড়া মধু মনে করে।”
ঝিনুক ভ্রু কুঁচকে বলল,

“এটা আবার কি নতুন কথা মিষ্টি ছাড়া মধু আবার কি?”
সায়রা শুরু করেছে তার কামাল সবাই মিলে হাসছে।
শুধু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে শাওন আর সুনয়না।
সুনয়নার হিংসে হচ্ছে তাকে রেখে কেন তার মাম্মা দুষ্টামি করবে।
“পাপা আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি থানায় গিয়ে শিশু নির্যাতনের মামলা করব বুঝলা।”
মেয়ের কথা শুনে শাওন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোমাকে কে নির্যাতন করল?”

“তোমার কি মনে হচ্ছে না আমি নির্যাতিত হচ্ছি?দেখো দেখো এই বাড়ির সবচেয়ে ছোট্ট সদস্য হলাম আমি আর বাড়ির সবাই আমাকে রেখে তোমার বউকে নিয়ে পড়ে আছে।”
শাওন মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ঠিক বলেছো আমাকেও যেতে হবে পুরুষ নির্যাতনের মামলা করতে।”
সুনয়না কিছুক্ষন চিন্তায় মগ্ন থেকে বলল,
“আচ্ছা পাপা দুষ্টামি করলে কি সবাই ভালোবাসে?”
“সবাই ভালোবাসে কিনা জানিনা তবে আমাদের বাড়িতে বাসে।”

বিয়ে পাগলি পর্ব ৯

সুনয়না গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলল,
“পাপা মাম্মা এতো দুষ্টামি কীভাবে করে আমি বুঝিনা।”
“তোমার মাম্মা তো #বিয়ে_পাগলি তাই এতো দুষ্টামি করে।”
সুনয়না ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,
“তাহলে আমিও #বিয়ে_পাগলি হবো।”

বিয়ে পাগলি সিজন ২