Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ১

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১
তেজরিন উম্মীদ

“আব্বু আমি কোনো ডিভোর্সি এবং এক বাচ্চার বাপকে বিয়ে করতে পারবো না।”
নিজের ভেতরের সবটুকু রাগ আর ক্ষোভ এক ঝটকায় উগরে দিল রুশদী। পিতা আনাস হকের সামনে দাঁড়িয়ে তার কন্ঠস্বর কাঁপছিল অভিমানে। যে মানুষটার আশ্রয়ে সে বড় হয়েছে, সেই আজ তাকে ঠেলে দিতে চাইছেন এক সন্তানের জনকের কাছে।

আনাস হক অস্থির হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার স্বরে বললেন,
“সমস্যাটা কোথায় মা? মন্ত্রীর ছেলে সে,টাকা-পয়সা কোনো অভাব হবে না তোর। ছেলেটার বয়সটাও তো তেমন বেশি না, শুধু আগের পক্ষের একটা ছেলে আছে এই তো! তুই সুখে থাকবি মা। উনারা নিজ থেকে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। এমন ঘর আর পাবি না, রাজি হয়ে যা।”
পিতার মুখের এই যুক্তিগুলো রুশদীর কানে সীসার মতো বিঁধল। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তার জন্মদাতার দিকে। মানুষের লালসা যে কতটা কুৎসিত হতে পারে, তা আজ সে নিজের ঘরে বসেই টের পাচ্ছে। স্রেফ টাকার লোভে একজন বাবা তার মেয়েকে একজন ডিভোর্সি লোকের হাতে তুলে দিতে চাইছেন? মুহূর্তের জন্য রুশদীর মনে সন্দেহ জাগল—ইনিই কি তার সেই বাবা? মা মারা যাওয়ার পর সৎ মা ঘরে আসার পর থেকেই সব বদলে গিয়েছিল, কিন্তু সেই বদল যে এতটা ভয়ংকর হবে তা সে কল্পনাও করেনি।
রুশদী শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করল,

“আব্বু, তুমি আসলেই আমার জন্মদাতা পিতা তো?”
আনাস হক কিছুটা থতমত খেলেন, তারপর কাঁচুমাচু করে বললেন,
“এভাবে বলিস না মা! দেখ, ঘরে তোর সৎ মা, দাদি, ছোট ভাই সবার খরচ সামলানো আমার একার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না রে। তুই বিয়েটা করলে তুইও সুখে থাকবি, আমাদেরও সুদিন ফিরবে। ওনারা নগদ টাকা আর প্রচুর সোনা-গয়না দেওয়ার কথা বলেছেন…”
বাবার মুখ থেকে নগদ টাকা আর গয়নার কথা শুনে রুশদীর ঘেন্নায় গা গুলিয়ে উঠল। তার মনে হলো, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কোনো পিতা নন, বরং এক কসাই যে নিজের মেয়ের কপালে দামের ট্যাগ ঝুলিয়ে দিচ্ছে।যে বেশি দামে কিনতে পারবে তার জন্যই কোরবানি করে দিবে।
রুশদী ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল। পরক্ষণেই আবার তীব্র আক্রোশে বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

“জীবনে অনেক লোভী মানুষ দেখেছি আব্বু, কিন্তু তোমার মতো নীচ আর লোভী কাউকে দেখিনি। যে টাকার নেশায় নিজের সন্তানকেও বাজারে বেচে দিতে দ্বিধা করে না!”
রুশদীর কন্ঠের তীব্র ঘৃণা আনাস হকের গায়ে লাগল না। লোভ মানুষের বিবেককে কতটা অন্ধ করে দিতে পারে, তিনি তার জ্যান্ত প্রমাণ। মন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে পারলে শুধু তার অভাব ঘুচবে না, বরং সারা জীবনের জন্য পকেটটা বেশ গরম থাকবে।এই এক চিন্তায় তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছেন।
নিজের নির্লজ্জতা আড়াল করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে তিনি আবারও বললেন,
“মা রে, আমার কথাটা শোন। ছেলেটার সাথে অন্তত একবার দেখা কর। ও আজই তোর সাথে কথা বলতে চেয়েছে।হয়ত তোর মত বদলে যেতে পারে।”
রুশদী সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জেদি গলায় বলল,
“অসম্ভব আব্বু! আমি ওই লোকের সাথে দেখা করব না। যাকে বিয়ে করার প্রশ্নই ওঠে না, তার সাথে দেখা করে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।”
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে পর্দার আড়াল ঠেলে বেরিয়ে এলেন রুশদীর সৎ মা নাহিদা। বাঁকা হেসে টিপ্পনী কেটে বললেন,

“আরে রাখো তো তোমার জেদ! রাজপুত্তুরের মতো ওরকম একটা ছেলে কি আর এই জন্মে তোমার কপালে জুটবে? অত কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ ছেলেটার সাথে দেখা করতে যাও।”
নাহিদার কথাগুলো তপ্ত তেলের মতো রুশদীর গায়ে গিয়ে লাগল। সে ক্ষিপ্ত হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“তোমার বউকে চুপ করতে বলো আব্বু! আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি আমি ওই লোককে বিয়ে করব না, মানে করব না!”
নাহিদা দমে যাওয়ার পাত্রী নন। তিনি এবার গলা আরও উঁচিয়ে কর্কশ স্বরে বললেন,
“বিয়ে করবে না মানে? এই ছেলেকে বিয়ে না করলে এ বাড়িতে আর ভাত জুটবে না তোমার, সেটা বলে দাও তো তোমার আদরের মেয়েকে!”
রুশদী চরম অপমানে মুখ বাঁকিয়ে পালটা জবাব দিতে চাইল,

“নিজের এতই যদি পছন্দ হয় তবে আ….”
কথাটা শেষ করার আগেই আনাস হক রুশদীর হাত চেপে ধরলেন। প্রায় অনুনয়-বিনয় করে মেয়ের পায়ে পড়ার মতো অবস্থা করে বললেন,
“মা রে, আর তর্ক করিস না। দোহাই লাগে তোর, আমার মানটা রাখ। অন্তত একবার ছেলেটার সাথে দেখা কর, তারপর যা করার করিস।”
বাবার অনুরোধ দেখে রুশদীর ভেতরটা গুমরে উঠল। ঘৃণা আর ক্ষোভের সংমিশ্রণে সে বাবার দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। শেষমেশ মন না চাইলেও এই অনুরোধটা সে ঠেলতে পারল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্লান্ত স্বরে বলল,
“ঠিক আছে, দেখা করতে যাব। কিন্তু মনে রেখো আব্বু, আমি শুধু দেখা করতেই যাচ্ছি, বিয়ে আমি কিছুতেই করব না।”

খান বাড়ির দ্বিতীয় তলার সেই বিশাল ঘরটা এখন অন্ধকারাচ্ছন্ন। পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা ম্লান আলোটুকুও যেন ফারাজের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারছে না। ফারাজ নিজের রুমে উপুড় হয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে, আর তার ঠিক পাশেই গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে ছোট্ট শের।ফারাজের কলিজার টুকরো ছেলে।
দুই বাপ-ছেলের ঘুমের ধরন দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো মহাযুদ্ধ জয় করে গভীর বিশ্রামে মজেছে তারা। ঠিক সেই মুহূর্তে রুমে ঢুকলেন রাইমা খান। লাইটটা অন করতেই পুরো ঘরের অবস্থা দেখে তার চোখ কপালে উঠে গেল। বিছানাময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে চিপসের খালি প্যাকেট আর কোকাকোলার ক্যান। রাইমা খান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বড় বড় পা ফেলে বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।

“ফারাজ রুমের এ কি অবস্থা করে রেখেছো তোমরা দুজন? ফারাজ, ওঠ! বলছি ওঠ! কটা বাজে খেয়াল আছে?”
রাইমা খান ফারাজের শরীরে ধাক্কা দিয়ে উচ্চস্বরে ডাকতে লাগলেন।
“এখনো মরার মতো পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছ? মনে নেই আজ রুশদীর সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা? তাড়াতাড়ি ওঠ! এই শের, তুমিও ওঠ!”
ফারাজ একটু নড়াচড়া করল ঠিকই, কিন্তু চোখ মেলার নাম নেই। আধো ঘুমে আচ্ছন্ন গলায় বিড়বিড় করে বলল,
“উফ আম্মি… ঘুমাতে দাও না প্লিজ! যাও এখান থেকে।”
বাপের দেখাদেখি পুচকি শের-ও চোখ না মেলেই বলে উঠল, “দাদু, ডোন্ট ডিস্টার্ব আস!”
রাইমা খান এবার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। জেদি দুই বাপ-ছেলের কান্ড দেখে তার মেজাজ এখন তুঙ্গে।
“বাপ যেমন হয়েছে, ছেলেও হয়েছে ঠিক তেমন! এই যে তোমরা উঠবে? আমি আর ডাকব না কিন্তু।”
রাইমার শেষ সতর্কবাণীও কোনো কাজে এল না। দুই বাপ-ছেলে যেন ঘুমের রাজ্যে আরও গভীরে ডুব দিল। রাইমা বেগম এবার মরিয়া হয়ে শেষ চালটা চাললেন।

“ফারাজ! তোমার যদি রুশদীর সাথে দেখা করতে যেতে দেরি হয়, তবে তোমার আব্বু আমাকে এক গাদা কথা শোনাবে। অন্যের জন্য আমি কেন কথা শুনব? তুমি কি নিজের ইচ্ছেয় উঠবে নাকি তোমার বাবাকে ডেকে আনব? ফারাজ, বলছি ওঠ!”
ফারাজ কানে বালিশ চেপে ধরে বিরক্তিমাখা স্বরে বলল, “রুশদী কে আম্মি?”
ছেলের এমন স্মৃতিভ্রম দেখে রাইমা খানের মেজাজ সপ্তমে চড়ল। তিনি প্রায় চিৎকার করে বললেন,
“রুশদী কে মানে? ফারাজ, তুমি কি আমায় খেপিয়ে দেওয়ার কায়দা শিখছ? যার সাথে তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে, তার নামটাও কি ভুলে গেছ?”
ফারাজ এবার অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠে বসল। মায়ের ওপর চূড়ান্ত বিরক্তি ঝেড়ে বলল,
“উফ আম্মি! এই অসময়ে না ডাকলে কী হতো? আরেকটু ঘুমাতে দিলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত?”
রাইমা খান কঠোর গলায় নির্দেশ দিলেন,
“উঠেছ যখন, এখন বাজে বকবক না করে ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে নাও।”
বলেই তিনি গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ফারাজ দুহাতে চোখ কচলে নিজের ঘুমটা তাড়ানোর চেষ্টা করল। একটা দীর্ঘ হাই তুলে পাশে শুয়ে থাকা শেরকে টোকা দিয়ে ডাকল, “পাপা, ওঠো। চলো, মিটিংটাকে সেটিং করে আসি।”

কিছুক্ষণ পর রাইমা খান আবারও ফারাজের রুমে এলেন। ততক্ষণে কাজের লোক এসে ছড়ানো-ছিটানো ঘরটা পরিপাটি করে গুছিয়ে দিয়ে গেছে। ফারাজ আর শের বাপ-ছেলে দুজন মিলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ব্রাশ করছে। শেরকে রাজপুত্রের মতো পরিপাটি হতে দেখে রাইমা খান ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন,
“শের তুমি কোথায় যাচ্ছ?”
শের দাদীর দিকে ফিরে চটপটে গলায় উত্তর দিল, “পাপার সাথে যাচ্ছি।”
রাইমা খান এবার ফারাজের দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বললেন, “ফারাজ, তুমি একটা মেয়ে দেখতে যাচ্ছ, বলতে গেলে ডেটে যাচ্ছ! সেখানে শেরকে কেন নিতে হবে?”
ফারাজ আয়না থেকে চোখ না সরিয়েই চুলে ব্রাশ চালাতে চালাতে পালটা প্রশ্ন করল,
“সো হোয়াট? তাতে সমস্যা কোথায়?”
“ফারাজ! তোমা এই হবুহিন ভাবলেশহীন কথাবার্তা আমার একদম ভালো লাগে না। তুমি কি বুঝতে পারছ না বাচ্চা সাথে নিয়ে গেলে পরিবেশটা কেমন হবে?”
ফারাজ এবার ব্রাশটা রেখে মায়ের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। তার চোখেমুখে এখন গভীর গাম্ভীর্য। সিরিয়াস ভঙ্গিতে সে বলল,

“আমি গেলে শেরও যাবে আম্মি। তোমাদের পছন্দের সেই মেয়ের আগে থেকেই জেনে রাখা উচিত যে তার হবু স্বামীর একটা ছেলে আছে। বিয়ের পর হঠাৎ করে জানবে, আর তখন আমার শেরে এর সাথে রুড বিহেভ করবে,এসব আমি একদম মেনে নেব না। তোমাদের জোরাজুরিতে আমি এই বিয়েতে রাজি হয়েছি, নইলে তো ‘ম্যারেজ ইজ ফুড’ আমার কাছে। আমি যেমন, ওই মেয়েকে আমাকে সেভাবেই মেনে নিতে হবে। এন্ড…”
ছেলের যুক্তি আর জেদের সামনে রাইমা খান হার মানলেন। তিনি হাত তুলে বললেন,
“ওকে ওকে, কুল! ঠিক আছে, তুমি যা ভালো মনে কর তাই কর। ওকেই সাথে নিয়ে যাও, তাও অন্তত দেখা করতে তো যাও!”
ফারাজ এবার বিজয়ী হাসি হেসে বলল, “দ্যাটস লাইক মাই মম!”

ঢাকার এক ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্টের কেবিনে রুশদী এখন শারফারাজ খানের মুখোমুখি বসে আছে। ফারাজের ঠিক পাশেই বসেছে তার মিনি ভার্শন শের। দুই বাপ-ছেলের পরনে একই রকম নীল-সাদা চেক শার্ট। তারা যেন একে অপরের কার্বন কপি।
রুশদী তীক্ষ্ণ চোখে তাদের লক্ষ্য করছে। কিন্তু ফারাজ বা শের, কারোরই মনোযোগ তার দিকে নেই। দুজনে মিলে মহাব্যস্ত হয়ে সামনের খাবারগুলো সাবাড় করতে লেগেছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তাদের খাওয়ার ধরনটাও একদম এক রকম। মাঝেমধ্যে বাপ-ছেলে একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় যেন কোনো গোপন সংকেত আদান-প্রদান করছে।

রুশদীর মেজাজ ক্রমশ তেতো হয়ে উঠছে। এই লোক কি কোনো ম্যানার জানে না? সামনে একজন লেডি বসে আছে, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।নিজের ছেলের সাথে চটপটে ভঙ্গিতে খাবার গিলছে! ফারাজের এই খামখেয়ালি আর বিদঘুটে আচরণ রুশদীর মনে শুরুতেই একটা নেতিবাচক ছাপ ফেলে দিল। সে মনে মনে ভাবল, “অসভ্য আর ম্যানারলেস একটা লোক! প্রথম দেখাতেই মন মেজাজটা বিষিয়ে দিল।”
ফারাজ দেখতে সুদর্শন হতে পারে, মন্ত্রীর ছেলেও হতে পারে, কিন্তু রুশদীর মাপকাঠিতে সে একদমই জিরো। ফারাজের ওপর যে বিরক্তির দেয়ালটা রুশদী মনে মনে তৈরি করে ফেলেছে, তা সহজে ভাঙার নয়।
খাওয়া শেষ করে ফারাজ এবার আয়েশ করে বসল। সে হাত গুটিয়ে নিজের চিরাচরিত ‘অ্যাটিটিউড’ নিয়ে রুশদীর চোখের দিকে তাকাল। রুশদীর চোখেমুখে তখন স্পষ্ট বিরক্তি আর অবহেলার ছাপ। অন্যদিকে, ছোট্ট শের বড় বড় চোখে একবার বাবার দিকে তাকাচ্ছে, তো পরক্ষণেই রুশদীকে দেখছে। দুজনের মাঝে বিরাজমান এই অদ্ভুত নীরবতার মানে বাচ্চাটার ছোট্ট মাথায় ঠিক ঢুকছে না। সে হয়ত ভাবছে, এরা কথা না বলে এভাবে মূর্তির মতো একে অপরের দিকে কেন তাকিয়ে আছে?

ফারাজ টেবিল থেকে হাত নামিয়ে একটু আয়েশ করে নড়েচড়ে বসল। পিনপতন নীরবতা ভেঙে অনেকটা সরাসরিই রুশদীকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“আমাকে বিয়ে করতে আপত্তিটা ঠিক কোথায়?”
রুশদী ত্বরিত উত্তর দিল না, বরং পাল্টা প্রশ্ন করল, “আপনার বয়স কত?”
“২৯।”
“আপনি আমার থেকে পাক্কা ১০ বছরের বড়ো।”
ফারাজ যেন আকাশ থেকে পড়ল। ভ্রু কুঁচকে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, “সো? তাতে কী হয়েছে?”
“সো, আমি আপনাকে বিয়ে করব না। ব্যাস!”
ফারাজ চরম বিরক্তি নিয়ে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কন্ঠস্বর কিছুটা চড়িয়ে বলল, “তোমার কাছে কি আর কোনো বেটার অপশন আছে? যত্তসব স্টুপিড কথাবার্তা!”
ফারাজ একবার আড়চোখে ১৯ বছরের মেয়েটিকে পরখ করে নিল। হলদেটে ফর্সা গায়ের রঙ, ডাগর ডাগর চোখ।মেয়েটি দেখতে নিঃসন্দেহে সুন্দরী। তবে মেয়েটার হয়তো ইগো প্রবলেম আছে। ফারাজ পরক্ষণেই চোখ সরিয়ে নিল। আবার যখন তাকাল, দেখল রুশদী রাগে রীতিমতো ফুঁসছে। রাগের কারণটা ফারাজ বুঝতে পারল তাকে ‘স্টুপিড’ বলা হয়েছে।
রুশদী দাঁতে দাঁত চেপে কিটমিট করে বলল,

“আমি স্টুপিড? আপনি নিজেকে কী মনে করেন? খুব স্মার্ট, তাই না?”
ফারাজের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
“অবভিয়াসলি, আই অ্যাম!”
রুশদী মুখটা বিকৃত করে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“কই আগরতলা আর কই চৌকির তলা!”
ফারাজ সবটা পরিষ্কার শুনতে না পেলেও আঁচ করতে পারল। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“এই মেয়ে, বিড়বিড় করে কী বলছ শুনি?”
রুশদী ভেংচি কেটে বলল,
“আপনি তো খুব স্মার্ট, তাই আপনার একটু প্রশংসা করলাম আরকি!”
ফারাজ এবার সোজা হয়ে বসল। কণ্ঠস্বর কিছুটা গম্ভীর করে বলল
“দেখো মেয়ে, তুমি কি আমার সাথে ঝগড়া করার তাল খুঁজছ? বলে দিচ্ছি, তোমার সাথে তক্কাতক্কি করার মুড আমার একদম নেই।”
“আমারও বয়েই গেছে আপনার সাথে ঝগড়া করতে! আমার না আপনার উপর মুড আছে, আর না আপনার ঝগড়ার উপর। ”

“আমার ওপর মুড নেই মানে?এই মেয়ে, নিজের চেহারা কোনোদিন আয়নায় দেখেছ? তোমার চেয়ে হাজার গুণ সুন্দরী একশটা মেয়ে এই শারফারাজ খানের পেছনে চব্বিশ ঘণ্টা লাইন দিয়ে ঘোরে। এটা তোমার নেহাত কপাল যে আমি তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছি, নয়তো…”
কথাটা শেষ না করেই একটা বিদ্রূপাত্মক হাসি হাসল ফারাজ। তারপর অবহেলার ভঙ্গিতে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
রুশদীও ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তুলল। পালটা আঘাত করে বলল,
“একবার ভেবে দেখুন তো আপনার কপালটা ঠিক কতটা খারাপ হলে ওই একশটা মেয়েকে রেখে আমার মতো একটা মেয়ের কাছে আপনার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতে হয়!”
ফারাজ চোখ রাঙিয়ে বলল,

“এই মেয়ে, তুমি কিন্তু বড্ড বেশি কথা বলছ!”
রুশদী এবার কৃত্রিম হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলল,
“ওটা আমার জন্মগত স্বভাব, আমি একটু বেশিই কথা বলি। তবে এই বেশি কথার মাঝে আপনাকে একটা জরুরি কথা বলে রাখি—আমার চেয়ে আট বছরের বড় কোনো ‘বুড়ো’ লোককে বিয়ে করার শখ আমার নেই। আর সেই লোকটা যদি আপনি হন, তবে তো প্রশ্নই ওঠে না। কারণ আপনি স্রেফ একজন বেয়াদব আর ম্যানারলেস লোক!”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল রুশদী। তার প্রতিটি শব্দ ফারাজের কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। ফারাজ রাগে ফেটে পড়ার উপক্রম হলো। সে কেবল শের-এর মুখের দিকে তাকিয়ে এই বিয়েতে রাজি হয়েছিল। ছোট্ট শের প্রায়ই তার কাছে আবদার করে—তার একটা ‘মা’ চাই। মূলত শেরই একপ্রকার রুশদীকে তার মা হিসেবে পছন্দ করে বসে আছে, নইলে এমন ঠোঁটকাটা মেয়ের সাথে ফারাজ কফি খেতে বসতেও ঘৃণা বোধ করত।
ফারাজ এবার তুরি বাজিয়ে রুশদীর দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধরল। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“শোনো মেয়ে, আমি নিজের জন্য কোনো বউ না, আমি আমার ছেলের জন্য একজন মা খুঁজছি। বুঝতে পেরেছ, স্টুপিড গার্ল? তোমার প্রতি আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। তাই আমার বয়স নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালেও চলবে।”

রুশদী ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল, “আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাচ্ছেন?”
“সহজ কথা। আমাদের বিয়ে হলে তুমি হবে শুধুই আমার ছেলের মা, আমার বউ নও!”
শুনে রুশদী হো হো করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে ছিল চরম বিদ্রূপ।
“বাহ! চমৎকার যুক্তি! তার মানে বিয়েটা আরও করা যাবে না। আমি আপনাকে বিয়ে করব অথচ আপনি আমার স্বামী হবেন না, আমি হবো শুধুই আপনার ছেলের আয়া মার্কা মা।এটা কি পৃথিবীর কোনো মেয়ে মেনে নেবে ভেবেছেন? আর শোনেন ভাই, আপনার সাথে আমার বয়সের পার্থক্য কম থাকলেও, আপনার যদি কোনো ছেলে না-ও থাকত কিংবা আপনি ডিভোর্সি না-ও হতেন—তবুও আমি আপনাকে বিয়ে করতাম না। কারণ কী জানেন? আপনি একটা কাণ্ডজ্ঞানহীন ম্যানারলেস লোক! প্রথম দেখায় একটা মেয়ের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই ন্যূনতম জ্ঞানটুকুও আপনার নেই। সো, আমি আপনাকে রিজেক্ট করছি!”
ফারাজ এবার পুরোপুরি মেজাজ হারিয়ে ফেলল। এতক্ষণ কেবল ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সে নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটাকে চেপে রেখেছিল, কিন্তু রুশদীর শেষ কথাগুলো তাকে চেতিয়ে দিল। ফারাজ আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে চিৎকার করে বলে উঠল,

“তোমার মতো একটা স্টুপিড, ইডিয়ট আর ননসেন্স মেয়েকে বিয়ে করার শখ আমারও নেই! তুমি আমাকে রিজেক্ট করার কে? আমিই তোমাকে রিজেক্ট করলাম!”
বলেই ফারাজ এক ঝটকায় শের-এর হাত ধরে নিজের সিট থেকে উঠে দাঁড়াল। ফারাজেকে দেখে রুশদীও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়, সে-ও পাল্লা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ফারাজ যখন শেরকে এক প্রকার টেনে নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো, তখন রুশদী পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলল,
“আপনি একটা স্টুপিড! আপনি ইডিয়ট, আপনি একটা আস্ত ননসেন্স! আপনার মতো অসভ্য বুড়ো লোককে মরে গেলেও আমি বিয়ে করব না!”

ফারাজ মাঝপথে থেমে পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখেমুখে চরম তাচ্ছিল্য। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“হাহ! তোর মতো মেন্টাল আর তারছিঁড়া মেয়েকে কে বিয়ে করবে? মন্ত্রীর ছেলে আমি, এক তুড়িতে তোর মতো দশটা মেয়েকে আমি হাজির করতে পারি। যা, ভাগ এখান থেকে!”
গটগট করে পা ফেলে ফারাজ রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেল। রুশদী পেছন থেকে আরও অনেকগুলো কড়া আর উল্টোপাল্টা কথা শোনাল বটে, কিন্তু ফারাজ তার একটাও কানে তুলল না। তবে যাওয়ার সময় ছোট্ট শের বারবার পেছন ফিরে রুশদীর দিকে তাকাচ্ছিল। সেই নিষ্পাপ চোখের দৃষ্টিতে ছিল এক বুক হাহাকার আর অদ্ভুত এক মায়া। বাচ্চাটা মুখ কালো করে বিষণ্ণ মনে তার বাবার সাথে চলে যাচ্ছিল।

শের-এর ওই করুণ চাউনি দেখে রুশদীর মুখের সব তপ্ত বাক্য যেন মাঝপথেই আটকে গেল। কিছুক্ষণ আগে যে মেয়েটা তেজি গলায় ফারাজকে তুলোধুনো করছিল, সে হঠাতই স্তব্ধ হয়ে গেল। শের-এর জন্য তার বুকের গহীনে কেমন একটা মোচড় দিয়ে উঠল।অজানতেই জন্মানো এক অদ্ভুত মায়া। রুশদী দীর্ঘক্ষণ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে অপলক চোখে শের-এর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।

অস্তরাগের রঙ পর্ব ২