Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ২

অস্তরাগের রঙ পর্ব ২

অস্তরাগের রঙ পর্ব ২
তেজরিন উম্মীদ

ফারাজ যখন খান বাড়িতে পা রাখল, তখন তার চোখেমুখে আগুন ঝরছে। ড্রয়িং রুমে ঢুকেই সে একপ্রকার যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিল। তার চিৎকারে পুরো খান বাড়ি যেন ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠল। রাইমা খান ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ফারাজের কানে তখন কোনো কথাই ঢুকছে না। তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সুযোগ পেলে সে মাইকিং করে পুরো এলাকাকে নিজের অপমানের কথা জানিয়ে দেবে।
দাঁতে দাঁত চেপে ফারাজ গর্জে উঠল,

“আম্মি! তোমাদের পছন্দের মেয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছ না ? আস্ত একটা বাচাল মেয়ে! কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই নুন্যতম শিক্ষা নেই তার। ভাবতে পারো আম্মি, ওই মেয়ে সরাসরি আমাকে রিজেক্ট করে দিয়েছে? হেহ! আমাকে রিজেক্ট করার সাহস পায় কোত্থেকে ও? কী লেভেলের বেয়াদব হলে একটা মেয়ে মুখের ওপর বলতে পারে— আমি আপনাকে রিজেক্ট করছি!”
ছেলের এমন রূপ দেখে রাইমা খানের ভ্রু কুঁচকে গেল। রুশদী যদি সত্যিই সরাসরি এমন কথা বলে থাকে, তবে কাজটা সে মোটেও ঠিক করেনি। তিনি ধীরকণ্ঠে শুধালেন,
“রুশদী কি সত্যিই তোমাকে সরাসরি এই কথা বলেছে?”

“হ্যাঁ আম্মি! তোমার সখের হবু পুত্রবধূ আমার মুখের ওপর বলে দিয়েছে সব। তার নাকি আমাকে পছন্দ হয়নি। কারণ কী জানো? আমি নাকি বুড়ো! তার থেকে দশ বছরের বড় বলে আমি বুড়ো লোক! লাইক সিরিয়াসলি আম্মি? আমি বুড়ো? এই মেয়ে বলে আমি বুড়ো!” ফারাজের কণ্ঠ দিয়ে যেন তখনো আগুন ঝরছিল।
ছেলের জেদ সম্পর্কে রাইমা খান ভালোভাবেই জানা। একবার যদি সে বেঁকে বসে, তবে তাকে ফেরানো অসম্ভব। তিনি নরম গলায় বললেন, “আচ্ছা, আমি রুশদীর সাথে কথা বলছি। তুমি আপাতত শান্ত হও তো।”
“কিসের শান্ত হব আম্মি? ওই মেয়ে আমাকে অপমান করেছে। আমি ওকে কোনোভাবেই বিয়ে করব না, ব্যস!”
রাইমা খান পরিস্থিতি সামাল দিতে আবারও বললেন, “বললাম তো আমি দেখছি বিষয়টা…”
কিন্তু কার কথা কে শোনে! মায়ের আশ্বাস ফারাজের কানেই পৌঁছাল না। সে নিজের উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“কিসের কথা আম্মি? ওই মেয়েকে আমি বিয়ে করছি না মানে করছি না। এখন ওই মেয়ে যদি আমার পা ধরেও মাফ চায়, তবুও আমি তাকে মাফ করব না। আস্ত একটা মেন্টাল মেয়ে! ন্যূনতম কমন সেন্স নেই ওর মধ্যে…”
ফারাজের রাগ মেশানো কথা গুলো ড্রয়িং রুমের দেয়ালগুলোতে আছড়ে পড়তে লাগল।আর রাইমা খান চুপ করে গেলেন ভাবলেন এই ছেলে সে বুঝাবে কি করে।

চিৎকার করতে করতেই ফারাজের চোখ আটকে গেল সোফায় গুটিসুটি মেরে বসে থাকা শের-এর ওপর। ছেলেটি মাথা নিচু করে মন খারাপ করে বসে আছে। বাবার নেওয়া এই সিদ্ধান্তে পুচকি শের-এর মনটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তার ছোট্ট মনে তখন একটাই হাহাকার—বাবা কেন ওই মম এর সাথে এমন রুড ব্যবহার করে এলো? এখন যদি রুশদী মম বাবাকে বিয়ে না করে, তবে এই পুচকি শেরটা আর কোনোদিন মা পাবে না।
ফারাজ দুই কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালো। শের-এর বিষন্ন মুখটার দিকে তাকিয়ে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। নিজের যত রাগই থাকুক না কেন, এই কলিজার টুকরা শের-এর মলিন মুখ দেখলে ফারাজের পৃথিবীটা এলোমেলো হয়ে যায়। ফারাজের সমস্ত জেদ আর অহংকার যেন ছেলের ওই এক ফোঁটা মন খারাপের কাছে এসে থমকে দাঁড়ায়।এই ছেলের জন্য ফারাজ সব করতে পারে… সব!

রাইমা খান ফারাজের দৃষ্টি লক্ষ্য করে শান্ত স্বরে বললেন, “আর কিছু বলবে?”
ফারাজ এবার কিছুটা উদাসীন ভঙ্গিতে মায়ের দিকে তাকাল। তার গলার স্বর আগের চেয়ে অনেক বেশি নরম হয়ে এসেছে। সে বলল, “ওর মন খারাপ দেখলে আমি সব কথা গুলিয়ে ফেলি আম্মি।”
রাইমা খান সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না। তিনি ধীর পায়ে ছেলের কাছে এসে বললেন, “তুমি তো জানো রুশদীকে ও-ই পছন্দ করেছে। আমরা কেউ তো রুশদীকে চিনতামই না। ও নিজে এসে রুশদীর কথা বলল বলেই আমরা খোঁজখবর নিয়েছি। জীবনে প্রথমবার ও কাউকে নিজের মা বলে মেনে নিয়েছে ফারাজ। এখন তোমার জেদের কারণে রুশদীর সাথে বিয়েটা না হলে শের বচেয়ে বেশি কষ্ট পাবে। এখন বাকিটা তুমিই ভেবে দেখো।”
এটুকু বলেই রাইমা খান ফারাজকে নিজের চিন্তার সাগরে ডুবিয়ে রেখে ঘর থেকে চলে গেলেন। ফারাজ বড় করে একটা শ্বাস টেনে নিজেকে কিছুটা সামলে নিল। তারপর ধীর পায়ে সোফায় বসে থাকা শের-এর কাছে গিয়ে তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। শের তখনও মুখ নিচু করে অভিমানী হয়ে বসে আছে। ফারাজ তার ছেলের ছোট্ট হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চুমু খেল। এরপর ভ্রু উঁচিয়ে আদুরে গলায় শুধাল, “তুমি কেন মন খারাপ করে আছো, পাপা?”

শের কোনো উত্তর দিল না, মাথাও তুলল না। ফারাজ আবার আদর মাখা স্বরে ডাকল, “কেন মন খারাপ পাপা?”
এবার শের খুব ভাঙা গলায় প্রশ্ন করল, “হোয়াই ওয়্যার ইউ রুড টু রুশদী মম, পাপা?”
ফারাজ অপরাধীর মতো মাথা নুইয়ে বলল, “আই এম সরিপাপা।”
শের-এর দুশ্চিন্তা তখনো কাটেনি। সে আবারও প্রশ্ন করল, “হোয়াট ইফ রুশদী মম ডাজ ন্ট ম্যারি ইউ নাউ?”
ছেলের আকুতি দেখে ফারাজ নিজেকে আর সামলাতে পারল না। সে আশ্বাস দিয়ে বলল, “আমি সব ঠিক করে দেবো। এখন তুমি খুশি?”
বাবার মুখে আশার বাণী শুনে শের এবার মুখ তুলে তাকাল। তার মলিন মুখটা মুহূর্তেই খুশির ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, “সত্যি পাপা? সত্যি তুমি মমকে নিয়ে আসবে?”

ছেলের এই স্বর্গীয় হাসিটুকু দেখেই যেন ফারাজ এর দেহে প্রাণ ফিরে পেল। এই একটুখানি হাসির জন্য ফারাজ দুনিয়ার সব অসম্ভবের সাথে লড়াই করতে রাজি। ফারাজ হাসিমুখে হ্যা সূচক মাথা নাড়ে। অমনি খুশিতে আত্মহারা হয়ে শের ঝাঁপিয়ে পড়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরল। ফারাজও পরম মমতায় ছেলেকে বুকে টেনে নিল।
শের তার বাবার কানে কানে ফিসফিস করে বলল, “থ্যাংকস পাপা। দেয়ার ইজ নো ওয়ান লাইক ইউ; ইউ আর দ্য বেস্ট ফাদার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।লাভ ইউ পাপা। ”

রেস্টুরেন্ট থেকে ফিরে রুশদী কাউকেই কিছু জানায়নি। নাহিদা বেগম তাকে হাজারটা প্রশ্ন করে ত্যক্তবিরক্ত করলেও সে মুখে কুলুপ এঁটে ছিল। বাড়ি ফিরেই সে যন্ত্রের মতো নিজের কাজে মগ্ন হয়ে পড়ল। বাইরে পোশাক বদলে একটা সাধারণ সুতি থ্রিপিস পরে নিয়েছে সে। ওড়নাটা কোমরে শক্ত করে পেঁচিয়ে,বাসন মাজতে থালা-বাসন পাহাড়সম স্তূপের সামনে গিয়ে দাড়ালো। কল ছাড়তেই সাবান-পানির ফেনা ছিটকে এসে তার পেটের কাছে জামাটা ভিজিয়ে দিল। কাজের মাঝেই কপাল থেকে চুইয়ে পড়া ঘাম মুছতে গেলে হাতের ফেনা মেখে গেল কপালে, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।
হঠাৎ ড্রয়িং রুম থেকে নাহিদা বেগমের চড়া গলা রুশদীর কানে এলো

“আচ্ছা, আপনি কোনো টেনশন করবেন না বিয়ান, আমি সবটা দেখছি।”
রুশদী বুঝতে পারল, খান বাড়ি থেকে ফোন এসেছে। নিশ্চয়ই এতক্ষণে ফারাজ তার কীর্তির কথা সব জানিয়ে দিয়েছে। মনে মনে রুশদী একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।যাক, বিয়েটা তবে ভেঙেই যাচ্ছে। এটাই তো সে চেয়েছিল।
এরই মধ্যে রান্নাঘরে নাহিদা বেগমের পদধূলি পড়ল। স্বাস্থ্যবতী এই মহিলার ফর্সা মুখটা রাগে এখন টকটকে লাল। তিনি এক হাত কোমরে দিয়ে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রুশদীর দিকে। রুশদী আড়চোখে তা দেখেও না দেখার ভান করে কাজে মন দিল। মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল, ‘ডাইনিটা কেমন তাকিয়ে আছে! ইচ্ছে করছে হাতের কড়াইটা দিয়ে এক বাড়ি মেরে মাথাটা দু’ভাগ করে দিই।’

“রেস্টুরেন্টে কী হয়েছে?” নাহিদা বেগমের কণ্ঠস্বর সাপের ফোঁসফানির মতো শোনাল রুশদীর কাছে।
রুশদী নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলল, “কী আর হবে? কিছুই হয়নি।”
“তবে ফারাজকে তুই কী বলেছিস?”
“যা বলার তাই বলেছি। বলেছি—আমি তাকে বিয়ে করতে পারব না।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই নাহিদা বেগম চিতার মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন রুশদীর ওপর। এক হ্যাঁচকায় রুশদীর চুলের মুঠি ধরে তাকে ঘুরিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,

“তুই বিয়ে করবি না? তোর ঘাড় করবে! তুই যদি এই ছেলেকে বিয়ে না করিস, তবে তোকে আমি জ্যান্ত আগুনে পুড়িয়ে মারব। এটা কি মামার বাড়ির মোয়া পেয়েছিস যে চাইলেই বিয়ে ভেঙে দিবি? তুই এই বিয়ে না করলে আমার ছেলের বিদেশে পড়তে যাওয়া হবে না, আমাদের ব্যবসাও ডুববে। এত সহজে আমি এই সোনার ডিম পাড়া হাঁস হাতছাড়া করব না সোনামণি! তোকে এই বিয়ে করতেই হবে।”
রুশদী নিজেকে ছাড়ানোর কোনো চেষ্টা করল না। সে দাঁতে দাঁত চেপে অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে নিল। কিন্তু তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা। সে ধীর স্বরে বলল,

“আমি মরে গেলেও এই বিয়ে করব না।”
“তুই মরলে দরকার হলে তোর লাশের সাথেই ওই ছেলের বিয়ে দেব আমি! মন্ত্রীর ছেলে বলে কথা, এই সুযোগ আমি কিছুতেই হাতছাড়া করব না।”
এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে রুশদী। তার দুচোখেও তখন ব আগুন। ঝাঝালো কণ্ঠে সে সাফ জানিয়ে দিল,
“বললাম তো, আমি বিয়ে করব না মানে করব না! আমার সিদ্ধান্ত বদলাবে না।”
নাহিদা বেগম দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “তেজ দেখাস? তোর তেজ আমি এক নিমেষেই বের করে দিচ্ছি। এই বিয়ে না করে তোর নিস্তার নেই।”

“এই ছেলেকে যদি আপনার এতই পছন্দ, তবে নিজেই বিয়ে করে নিন না! আমাকে কেন বারবার বলছেন?”
“কী বললি তুই, হারামজাদি!” নাহিদা বেগমের রাগের বাঁধ ভেঙে গেল।তিনি পশুর মতো হিংস্র হয়ে রুশদীর চুলের মুঠি আঁকড়ে ধরলেন এবং সর্বশক্তি দিয়ে তার মাথাটা পাশের দেয়ালের সাথে সজোরে আঘাত করলেন। একবার নয়, দুই-তিনবার বিরামহীনভাবে রুশদীর মাথাটা দেয়ালে ঠুকে দিলেন তিনি। ফলস্বরূপ, মুহূর্তেই রুশদীর কপাল ফেটে গলগল করে রক্ত ঝরতে শুরু করল। তীব্র যন্ত্রণায় রুশদী আর্তনাদ করে উঠল, “ও মা গো!”
সেই বুকফাটা চিৎকার শুনে ড্রয়িং রুম থেকে ছুটে এলেন আনাস হক এবং রুশদীর সৎ ভাই নাহিদ। নাহিদ দ্রুত গিয়ে মায়ের হাত থেকে বোনকে ছাড়িয়ে নিল। রক্ত বন্ধ করার জন্য সে নিজের হাত দিয়ে রুশদীর ক্ষতস্থানটা চেপে ধরল, কিন্তু ততক্ষণে রুশদীর শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। চোখ দুটো আপনা আপনি বন্ধ হয়ে আসছে, সে জ্ঞান হারানোর উপক্রম।
নিজের মেয়ের এমন রক্তাক্ত অবস্থা দেখেও পাষাণ বাবা আনাস হক টু শব্দটিও করলেন না। তিনি কেবল নির্বাক দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। নাহিদা বেগম তখনও রাগে ফুঁসছেন, “এখন বল, বিয়ে করবি কি না? বিয়ে তোকে করতেই হবে!”

অর্ধচেতন অবস্থায়, মরণাপন্ন যন্ত্রণার মাঝেও রুশদী অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল, “ম… মরে গেলেও বিয়ে করব না।”
তার মুখে জেদের কথা শুনে নাহিদা বেগম আবারও তাকে আঘাত করতে উদ্যত হলেন, কিন্তু এবার নাহিদ ঢাল হয়ে দাঁড়াল। সে তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে অস্থির হয়ে বলল, “আব্বু, দাঁড়িয়ে কী দেখছেন? ওকে ধরুন! প্রচুর রক্ত পড়ছে, এখনই হাসপাতালে নিতে হবে। দেরি হলে সিরিয়াস কিছু হয়ে যাবে!”
নাহিদ আর আনাস হক ধরাধরি করে রুশদীকে হাসপাতালের দিকে নিয়ে গেলেন।
সত্যিই, আনাস হকের মতো বাবা মেলা ভার। পৃথিবীর বুকে জন্মদাতা পিতার এমন নির্লিপ্ততা যেন এক বিস্ময়।নিজের গর্ভধারিণী মা-ও যদি কোনো সন্তানের সাথে এমন আচরণ করত, তবে যেকোনো বাবার পৌরুষ আর মমতা হয়তো রুখে দাঁড়াত, নয়তো প্রতিবাদে গর্জে উঠত। কিন্তু সেখানে একজন সৎ মা মেয়েটাকে এমন ভয়ংকর আঘাত করলো , অথচ আনাস হক একটি টু শব্দ পর্যন্ত করলেন না। নিজের রক্তকে এভাবে অন্যের হাতে কষ্ট পেতে দেখেও যার রক্ত হিম হয় না, তাকে বাবা বলে ডাকাও যেন পিতৃ শব্দের অবমাননা।

মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ নিয়েই আজ কলেজে এসেছে রুশদী। সামনে তার এইচএসসি পরীক্ষা, তাই এই মুহূর্তে কোনোভাবেই ক্লাস মিস দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে নাহিদা বেগম বলেছিলেন রুটি বানিয়ে রেখে যাওয়ার জন্য, কিন্তু রুশদী সেসবের তোয়াক্কা না করেই নাস্তা না বানিয়েই কলেজে চলে এসেছে। সে জানে, বাড়ি ফেরার পর কপালে নির্ঘাত জুটবে অমানুষিক নির্যাতন কিংবা বিষাক্ত সব কটু কথা। কিন্তু রুশদী এখন আর সেসব নিয়ে ভাবতে চায় না।

দুপুর একটা। আকাশ থেকে যেন আগুনের ঝরছে, সূর্যের তেজ আজ বড্ড বেশি প্রখর। কপাল ফাটা থাকার কারণে আগে থেকেই মাথার ভেতরটা টিসটিস করে ব্যথা করছিল, তার ওপর রুশদীর আছে পুরনো মাইগ্রেনের সমস্যা। তীব্র রোদ সেই যন্ত্রণাকে যেন তিনগুণ বাড়িয়ে দিল। প্রতিদিন সে হেঁটেই বাড়ি ফিরে,কিন্তু আজ এই অবস্থায় হাঁটা তার পক্ষে অসম্ভব। এই রোদে রাস্তায় যেকোনো সময় জ্ঞান হারানোর সম্ভাবনা আছে। তাই কলেজ ছুটি হতেই সে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো রিকশার জন্য। ছুটির সময় হওয়ায় গেটে ছাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়, এর মধ্যে অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থেকেও সে একটা খালি রিকশা পেল না। তীব্র মাথাব্যথায় তার চোখের সামনে পৃথিবীটা যেন ঝাপসা হয়ে আসছে।

হঠাৎ রুশদী অনুভব করল, একটা নরম আর ছোট্ট হাত তার বাম হাতটা জাপ্টে ধরেছে। যন্ত্রণায় কুঁচকানো চোখে সে নিচের দিকে তাকাল। দেখল, বছর চার-পাঁচেকের একটি বাচ্চা ছেলে তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটি মাথা উঁচু করে রুশদীর দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসল।তার সেই নিষ্পাপ হাসিতে সব কটি ছোট ছোট দাঁত ঝিলিক দিয়ে উঠল।
রুশদী ছেলেটিকে চেনে না, কিন্তু তার মনে পড়লো এ তো সেই মায়াবী ছেলেটি! গতকাল রেস্টুরেন্টে ফারাজের সাথেই সে এই বাচ্চাটিকে দেখেছিল। কিন্তু এই ভরদুপুরে ফারাজের ছেলে এখানে কী করছে? বিস্ময় আর কৌতূহল নিয়ে রুশদী যন্ত্রণাকাতর চোখে বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তীব্র মাথাব্যথা উপেক্ষা করেই রুশদী বাচ্চাটির সাথে কথা বলার জন্য একটু নিচু হলো। কোমল স্বরে শুধাল,

“তোমার নাম কী, বাবু?”
ছেলেটি উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে উত্তর দিল, “শেহরান খান শের।”
রুশদী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি এখানে কী করছো একা একা?”
শের একগাল হেসে উত্তর দিল, “তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি মম!”
‘মম!’শব্দটা রুশদীর কানে পৌঁছাতেই সে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল। এই পুচকি ছেলেটা তাকে ‘মা’ বলে ডাকছে! সে অবাক হয়ে আবারও জিজ্ঞেস করল, “তুমি কাকে মম বলছো?”
“তোমাকে! আচ্ছা, এখন কথা না বলে চলো তো আমার সাথে,”
বলেই শের তার ছোট্ট হাতে রুশদীর হাত ধরে টানতে শুরু করল। রুশদী বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে ছেলেটির কাণ্ড দেখছিল।সে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়েই বলল, “কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমাকে?”

“আহা, চলোই না!”
অগত্যা রুশদীও ছেলেটির পিছু পিছু হাঁটতে লাগল। কয়েক সেকেন্ড হাঁটার পর তারা কলেজ রোডের মোড়ে এসে থামল। সেখানে একটি দামি গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফারাজ। পরনে তার খয়েরি রঙের শার্ট আর ঢিলেঢালা কালো প্যান্ট। দুপুরের কড়া রোদ থেকে বাঁচতে চোখে কালো সানগ্লাস পরেছে সে। তবে তার চোখেমুখে একরাশ বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
শের রুশদীকে নিয়ে সোজা ফারাজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, কিন্তু তখনও সে রুশদীর হাতটা ছাড়েনি। ফারাজকে দেখামাত্রই রুশদীর বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে ফেলল। ফারাজও পাল্টা বিরক্তি প্রকাশ করে কোনো কথা না বলে গটগট করে গাড়িতে গিয়ে বসল।

শের তৎক্ষণাৎ পেছনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। কিন্তু রুশদী তখনও বাইরের কড়া রোদে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। তাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ডাকল, “মম, ভেতরে এসো!”
‘মম’ ডাকটা রুশদীর কানে কেমন এক অদ্ভুত সুরের মতো শোনাল। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাচ্চাটার ওপর সে রাগ করতে পারল না। এই ছেলেটার চেহারায় কী এক মায়া আছে, যা মুহূর্তে যে কারো মন গলিয়ে দিতে সক্ষম। রুশদী ভেতরে যাওয়ার কোনো আগ্রহ না দেখিয়েই জিজ্ঞেস করল,
“কোথায় যাব আমি?”
গাড়ির ভেতর থেকে ফারাজের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো, “তোমাকে নিয়ে পাচার করে দেব না, এটুকু নিশ্চিত থাকো।”
ফারাজের কথা শুনে রুশদীর রাগ সপ্তমে চড়লেও সে নিজেকে সামলে নিল। মাইগ্রেনের যন্ত্রণায় তার মগজ তখন ছিঁড়ে যাচ্ছে, এই অবস্থায় ঝগড়া করার মতো শক্তি বা ইচ্ছে কোনোটি-ই তার নেই। এরই মধ্যে শের আবার তার হাত টেনে আবদার করল,

“এসো না মম!”
রুশদী শের-এর চোখের দিকে তাকাল। সেই আকুতিভরা দৃষ্টির এক অদ্ভুত টানে সে আর না বলতে পারল না। যন্ত্রচালিত মানুষের মতো সে গাড়িতে উঠে বসল। রুশদী বসা মাত্রই কোনো কথা না বাড়িয়ে ফারাজ গাড়ি স্টার্ট দিল।
ফারাজ গাড়ির লুকিং গ্লাসে পেছনে বসে থাকা রুশদীর দিকে এক পলক তাকাল। সাদা কলেজ ড্রেস, পরিপাটি করে করা বেণি।সবই ঠিক আছে, কিন্তু তার কপালে ধবধবে সাদা ব্যান্ডেজ দেখে ফারাজের ভ্রু কুঁচকে গেল। গতকালও তো মেয়েটা দিব্যি ছিল, তবে হঠাৎ কী হলো? ব্যান্ডেজের ওপর দিয়ে লাল রক্তের ছোপ দেখা যাচ্ছে, যা দেখে বোঝা যায় আঘাতটা বেশ গুরুতর। ফারাজ মনে মনে ভাবল, ‘যাক, ভালোই হয়েছে। এই বেয়াদব মেয়েটার এমন একটা শিক্ষা হওয়া দরকার ছিল।’

ঠিক সেই মুহূর্তে রুশদীও লুকিং গ্লাসে তাকাল এবং দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। ফারাজ দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিলেও রুশদী তাকে বিড়বিড় করে কী যেন গালি দিল।
এদিকে শের রুশদীর কপালে হাত রেখে বিষণ্ণ গলায় শুধাল, “তোমার মাথায় কী হয়েছে মম? খুব লেগেছে?”
রুশদী আলতো করে শের-এর মাথায় হাত বুলিয়ে ম্লান হেসে বলল, “কিছু হয়নি , এমনি একটু লেগেছে।”
ফারাজ গাড়ি চালানোর ফাঁকে ফাঁকে বারবার আয়নায় রুশদীর ওই ব্যান্ডেজ করা মাথার দিকে তাকাচ্ছিল। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করছে। নিজেকে আর সামলাতে না পেরে অবশেষে সে গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করেই ফেলল, “তোমার মাথায় ব্যান্ডেজ কেন? কী হয়েছে?”

রুশদী মনে মনে বিরক্ত হলো। সব তো এই লোকের জন্যই! কাল রেস্টুরেন্টে একে অপমান করার দায়েই তো সৎ মায়ের হাতে মার খেয়ে এই দশা হতে হয়েছে তার। এখন আবার দরদ দেখিয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে! রুশদী তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “আপনাকে রিজেক্ট করার সৎ মা পুরস্কার হিসেবে আদর দিয়েছে।”
ফারাজ অবাক হয়ে বলল, “তোমার মা মেরেছে?”
রুশদী বলল, “জি?”
ফারাজ আয়নায় তাকিয়ে হাসির ছলে বলল, “তোমার মা তো দেখছি বেশ ডিয়ারিং মহিলা!”
রুশদী এবার রাগে জ্বলে উঠল। ,

” আপনারও কি আমাকে মারার ইচ্ছে আছে?”
“হোয়াট?” ফারাজ হকচকিয়ে গেল।
রুশদী ঝাঝালো কণ্ঠে যোগ করল, “সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালান। বারবার পেছনে তাকাতে গিয়ে নিজে তো মরবেনই, আমাকেও সাথে নিয়ে মরবেন!”
আসলে ফারাজের ওই চাহনি রুশদীকে খুব অস্বস্তিতে ফেলছিল। সেই অস্বস্তি ঢাকতেই সে কথাটা বলে ফারাজের ওপর দোষ চাপিয়ে দিল। ফারাজ আর কথা বাড়াল না, তবে তার দৃষ্টি তখনো মাঝে মাঝে আয়নায় স্থির হয়ে যাচ্ছিল।

রুফটপ রেস্টুরেন্টের খোলা বাতাসেও গরম ভাব টা কাটছে না। শের খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে অন্য টেবিলে বসেছে, যাতে ফারাজ আর রুশদী নিজেদের মধ্যে কথা বলার সুযোগ পায়। কিন্তু রুশদীর চোখেমুখে রাজ্যের বিরক্তি। সে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে, যেন এখান থেকে পালাতে পারলেই বাঁচে।
অবশেষে নীরবতা ভেঙে রুশদী রুক্ষ স্বরে প্রশ্ন করল, “আমাকে এখানে কেন এনেছেন?”
ফারাজ শান্ত থাকার চেষ্টা করে বলল, “তোমার সাথে একটা শান্তি চুক্তি করতে।”
“কিসের শান্তি চুক্তি?” রুশদীর কণ্ঠে উপহাস।
“তুমি আমাকে বিয়ে—”
ফারাজের কথা শেষ হওয়ার আগেই রুশদী তড়িৎ
বেগে বলে উঠল, “কালকেই তো বলে দিয়েছি, আমি আপনাকে বিয়ে করব না। ব্যাস, কথা এখানেই শেষ।”
ফারাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত রেখে,

“দেখো, আমি এখানে তোমার সাথে ঝগড়া করতে আসিনি।”
“আপনার কি মনে হয়, আমি আপনার সাথে ঝগড়া করার জন্য মরিয়া হয়ে আছি ” রুশদীর পাল্টা জবাব।
“প্লিজ, একটু শান্ত হয়ে কথা বলো।”
“পারব না।”
ফারাজ এবার একটু কড়া গলায় বলল, “দেখো মেয়ে, তেরামিতে তুমি আমার সাথে অন্তত পারবে না। তাই এই ত্যাড়া কথাগুলো বাদ দাও। আর শোনো, কালকের ব্যবহারের জন্য আমি দুঃখিত। সরি।”
রুশদী যেন আকাশ থেকে পড়ল। ভ্রু কুঁচকে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, “আপনি আমাকে ‘সরি’ বললেন? ঠিক শুনলাম তো?”
ফারাজ দাঁতে দাঁত চেপে রাগ নিয়ন্ত্রণ করে আবারও বলল, “হ্যাঁ, সরি! এখন শুনতে পেয়েছ?”
রুশদী এবার একটু হেলান দিয়ে বসল, মুখে জয়ের হাসি।

“হ্যাঁ, এবার স্পষ্ট শুনেছি। মেজাজটা একটু শান্ত হলো। এবার বলুন, কী বলবেন?”
“তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?” ফারাজ সরাসরি
প্রশ্নটা ছুড়ে দিল।
“না।”
বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে রুশদী মানা করে দিল।
ফারাজের ভেতরটা অপমানে রি রি করে উঠল। সে আজ নিজের স্বভাবের বাইরে গিয়ে প্রথম কারো সাথে এত নমনীয় সুরে কথা বলছে, আর এই মেয়ে তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে যাচ্ছে! শেরের মুখ চেয়ে সে তবুও দমে গেল না।
ধৈর্য ধরে ফারাজ বলল, “একটু ভেবে দেখো।”

“সব জায়গায় আমি আমার দামি ব্রেনটা খরচ করি না,” রুশদীর সপাট জবাব।
‘ব্রেন থাকলে তো ইউজ করবে বেয়াদব মেয়ে।
ফারাজ মনে মনে গালমন্দ করলেও মুখে শুধু বলল,
“দেখো!”
“আপনাকে দেখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই।”
ফারাজ এবার মরিয়া হয়ে উঠল, “আমার কথাটা তো শোনো!”
“আমি কানে একটু কম শুনি।”
“রুশদী, বোঝার চেষ্টা করো ।”
“দেখুন, আমার ম্যাট্রিক্সের স্যার সবসময় বলতেন
আমি নাকি একটু কম বুঝি। সুতরাং আপনার কথা বোঝার ক্ষমতা আমার নেই।”
ফারাজ নিজেকে শান্ত রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল, “দেখো, তুমি আমাকে যেমনটা ভাবছ, আমি কিন্তু আসলে তেমন নই।”

রুশদী চোখ বড় বড় করে বলল, “কেন? আপনি কি থার্ড জেন্ডার?”
ফারাজের ধৈর্যের বাঁধ এবার চিড় ধরল, “তুমি কিন্তু লিমিট ছাড়াচ্ছো!”
রুশদী নির্লিপ্ত স্বরে বলল, “আমি লিমিট ছাড়ানোর পর আপনার সাথে কথা বলা শুরু করেছি। তাই বলে লাভ নেই।”
ফারাজ কিছু বলতে গেলেই রুশদী আবারও শুরু করল, “আসলে আপনাদের মতো অহংকারী ছেলেদের আয়নার সামনে দাঁড়ানো উচিত। দেখবেন নিজের চেহারার বদলে সেখানে একটা বিশালাকার ইগো ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। আপনি তো ভাবছেন আপনি হিরো, কিন্তু আমার কাছে আপনার ভ্যালু জিরো!”

ফারাজ এবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, “তোর বিয়ের খেতা পুড়ি! তোর সাথে যতই ভালো ব্যবহার করতে চাচ্ছি, তুই ততই আমাকে জ্বালিয়ে মারছিস। শোন ডাইনি, আমি দরকার হলে কলাগাছকে বিয়ে করব, তবুও তোকে কোনোদিন বিয়ে করব না! সর সামনে থেকে!”
রুশদীও সমান তালে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “আমিও রাস্তার কোনো পচা মূলাকে বিয়ে করব, তবুও আপনার মতো অসভ্যকে বিয়ে করব না!”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১

“তোর সাথে ওই রাস্তার মূলা-গাজরই মানায়! এই ফারাজ খান নয়!” ফারাজ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল।
“ইউ…!” রুশদী আঙুল উঁচিয়ে কিছু বলতে চাইল।
ফারাজ তর্জনী উঁচিয়ে গর্জে উঠল, “তোর গুষ্টি ইউ!
তোর মতো ত্যাড়া মেয়েকে আমি দুই টাকায় গুনি না !”
পুরো রেস্টুরেন্টের মানুষ তখন অবাক হয়ে তাদের এই দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড দেখছে।

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৩