Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩৩

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩৩

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩৩
ইসরাত জাহান দ্যুতি

কিন্তু বাক্যটা শেষ হওয়ার আগেই এক অনাহুত আগন্তুকের কণ্ঠ ওদের একান্ত মুহূর্তের রেশটুকু ছিঁড়ে দিল। এক ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ পর্যটক দম্পতি তাদের দুই ছোটো সন্তানকে নিয়ে ঠিক ওদের পাশেই এসে দাঁড়িয়েছেন। ভদ্রলোকের পরনে খাকি হাফপ্যান্ট আর গলায় ঝুলছে দামী ক্যানন ক্যামেরা। তিনি কিছুটা ইতস্তত করে ইংরেজিতে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলে উঠলেন, “আই অ্যাম সো সরি টু ইন্টারাপ্ট ইউ, বাট আর ইউ আশফি আনজার? দ্য অ্যাডভেঞ্চারার ফ্রম ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক?”

​বাক্যের শেষ অংশটুকু তখন গলার কাছে দলা পাকিয়ে আটকে রইল মারিশার। সে দেখল, ভদ্রলোকের ছোটো ছেলেটি উত্তেজনায় কাঁপছে। আশফির মতো একজন এক্সট্রিম ট্রাভেলার, যার এভারেস্ট বেসক্যাম্প কিংবা আমাজনের গহীন জঙ্গলে কাটানো দিনগুলোর ডকুমেন্টারি সারা বিশ্বের মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখে — তাকে এভাবে চোখের সামনে দেখে বাচ্চাটির চোখেমুখে যেন রূপকথার নায়ককে দেখার মতো বিস্ময়।
​আশফি মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ওর চোখে তখন মারিশার না বলা কথাগুলো জানার প্রবল তৃষ্ণা৷ কিন্তু একজন ইন্টারন্যাশনাল ফিগার হিসেবে সে অভদ্রতা করতে পারল না। নিজের অস্থিরতাটুকু চেপে রেখে একটা লম্বা শ্বাস ফেলল। এরপর ওই শ্বেতাঙ্গ ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে মার্জিত এক চিলতে হাসি দিয়ে মাথা নাড়ল। ভদ্রলোক তখন ভীষণ উত্তেজিত হয়ে ওঁর সন্তানদের সাথে একটা ছবি তোলার জন্য বিনীত অনুরোধ করতে লাগলেন।
আশফি তখন মারিশাকে চোখের ইশারায় বোঝাল, “দুটো মিনিট অপেক্ষা করো প্লিজ!”
​মারিশাও তখন মুচকি হেসে চোখের ইশারাতেই বোঝাল, “কোনো ব্যাপার না।”
এরপর ওই সোনালি চুলের বাচ্চা দুটোর কাঁধে হাত দিয়ে আশফি যখন ক্যামেরার সামনে মুচকি হাসিতে পোজ দিতে লাগল, মারিশার তখন কেন জানি মনে হলো, ওদের মাঝখানের ব্যবধানটা এক নিমিষেই কয়েক আলোকবর্ষ বেড়ে গেছে যেন।

​ঠিক সেই মুহূর্তে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দিশানের চড়া গলা ভেসে এল, “ওহ, তো তোরা এখানে? আর আমরা পুরো রিসোর্টে তোদের তন্নতন্ন করে খুঁজছি!”
মারিশা ​তাকিয়ে দেখল দিশানের সঙ্গে দিব্য, হৃদয় আর দিলিশাও এগিয়ে আসছে। পর্যটকদের সাথে আশফিকে ছবি তুলতে দেখে দিশান দূর থেকেই চড়া গলায় টিপ্পনী কাটল, “আহারে আমার সেলিব্রিটি ভাই! বেচারা বউটাকে নিয়ে একটু নিরিবিলিতে দু-দণ্ড জিরোবে, সেখানেও কি না প্রাইভেসির বারোটা বেজে গেছে!”
​কথাগুলো বাংলায় বলায় ওই ব্রিটিশ দম্পতি তার অর্থ উদ্ধারে ব্যর্থ হলেন। তবে ওদের হাসাহাসি করে এগিয়ে আসতে দেখে এটুকু আঁচ করতে পারলেন যে, এরা আশফিরই আপনজন। তাই আর বেশিক্ষণ বিরক্ত করলেন না ওকে। কৃতজ্ঞতা জানিয়েই তারা বিদায় নিলেন।
​আশফি যখন ঘুরে মারিশার কাছে ফিরে এল, ততক্ষণে ওদের সেই একান্ত মুহূর্তটুকু হারিয়ে গেছে। দিশানরা একদম ওদের কাছে চলে এসেছে। বিদেশি ওই দম্পতির ওপর যে বিরক্তিটা সে সৌজন্যের খাতিরে উগরে দিতে পারেনি, তার সবটুকু এবার গিয়ে পড়ল নিজের ভাইয়ের ওপর। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দিশানের দিকে তাকিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে রুক্ষ স্বরে ধমকে উঠল, “তোরা এখানে কেন? তোদের কাজ কী এখানে? গিভ আস সাম প্রাইভেসি। জাস্ট গেট আউট অব হিয়ার!”

​ধমকটা খেয়ে দিশান দমল না, বরং ওর ঠোঁটের কোণে একটা টিটকারিমাখা হাসি ফুটে উঠল। পকেটে হাত গুঁজে ঘাড়টা একটু ত্যাড়ছা করে দাঁড়িয়ে ডানে-বামে দুলতে দুলতে রগড় করার সুরে বলল, “ওহ্, তাই? ঠিক আছে, তোর সারপ্রাইজের ঠেলা তবে তুই একাই সামলাস। একাই সব প্ল্যানিং করিস, আমরা চললাম। সত্যি বলতে, আমিও এখানে বোর হচ্ছি।”
​কথাটা বলেই সে দিব্য আর হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল, “তার চেয়ে চল ভাই, একটু ক্লাব ক্যাটওয়াক থেকেই ঘুরে আসি। শরীরটা বহুদিন দুলানোর সুযোগ পাচ্ছি না, একটু বিট দরকার।”
​দিব্য মুখটা বিকৃত করে বলে উঠল, “সে আমি এমনিতেই যাব। তোর ভাইয়ের এই আদিখ্যেতাকে সঙ্গ দেওয়ার কোনো খায়েশ নেই আমার।”
​ওদের কথায় আশফির যেন হঠাৎ টনক নড়ল। মারিশার সঙ্গে সবটা নতুন করে শুরু করা দিনটাকে স্মরণীয় করে রাখতেই ও মনে মনে একটা বিশাল পরিকল্পনা সাজিয়েছে। দিশানকে এই সারপ্রাইজের আয়োজন সামলাতেই তো ডেকে আনা। কিন্তু একদিকে মারিশার না বলা জরুরি কথাগুলো শোনার তীব্র তৃষ্ণা, অন্যদিকে দিশান শয়তানটা যদি এখন বিগড়ে যায় তবে সারপ্রাইজের বারোটাও বেজে যাবে। কী এক অদ্ভুত টানাপড়েন! নিজের ওপরই ওর একরাশ বিরক্তি জাগল ওর।

​নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে মারিশার সামনে এসে বসল আবার। অপরাধীর মতো মুখ করে ওর নরম হাত দুটো নিজের তালুবন্দি করল। তারপর কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে নিচু স্বরে বলল, “সোনা, প্লিজ রাগ কোরো না। তোমার কনফেশনটা জানার জন্য আমি ছটফট করছি। কিন্তু শুনলে তো, ওদের নিয়ে প্ল্যানটা এখনই গুছিয়ে না ফেললে সব ভণ্ডুল হয়ে যাবে। বড্ড দেরিও হয়ে যাবে৷ আমি একেবারে ফ্রি হয়ে, একদম নিরালায় বসে তোমার সব কথা শুনব। কথা দিচ্ছি, ওকে?”
বুকের ভেতরটা হতাশায় হু হু করে উঠল মারিশার। অনেক কষ্টে নিজেকে প্রস্তুত করেছিল সত্যিটা প্রকাশের জন্য। তবু নিজেকে সামলে নিল। মৃদু হেসে মাথাটা নেড়ে আশফির কথাতে সায় জানাল।
​সবাই এরপর ধীর পায়ে হেঁটে রিসোর্টের মেঠো পথটা ধরে ফিরতে শুরু করল। সামনে দিশান, আশফি আর দিব্যও ওদের সাথে হাঁটছে। তা দেখে আলোচনা শুরুর আগে দিব্যকে একটা খোঁচা মেরে বলল আশফি, “আমাকে কোনো হেল্প না করলে আমার সাথে থাকছিস কেন? তোর দেশে ফেরার টিকিটটা কেটে দিই, কী বলিস?”
দিব্য ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “তোর টাকায় আছি আমি, যে তোর কথামতো চলে যাব?”

“কিন্তু আছিস তো আমার সাথেই। তোর টাকায় তুই নিজের মতো আলাদাভাবে ঘোরাফেরা কর!”
দিব্য তির্যক একটা চাউনি ছুড়ে মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। তারপর গলার স্বরে বিরক্তি মেখে কর্কশ গলায় বলল, “কী করতে হবে বল? সারপ্রাইজ তো দেওয়ার কথা ছিল আরও এক সপ্তাহ পর৷ তো এত আগেভাগে প্ল্যানিং করার ভূত মাথায় চাপল কেন, শুনি?”
মুখ থেকে হাসির রেশটুকু মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল আশফির। সেখানে জায়গা করে নিল এক জমাটবদ্ধ উদ্বেগ। কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম খাঁজগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল ওর, “আমার ধারণা, মাহি আর মিরানের কোনো পুরনো শত্রুপক্ষ মাহিকে নিয়মিত স্টক করছে। কাল রাতে যার সাথে আমার মারামারিটা হলো, আমার গাট ফিলিংস বলছে লোকটা ডেঞ্জারাস। মাহিকে এখন সিকিউরিটির মাঝে রাখাটা ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার জন্য। মিরান যাওয়ার আগে খুব প্রেশার দিয়েছে যেন যত দ্রুত সম্ভব ওকে নিয়ে দেশে ফিরি। এজন্যই সারপ্রাইজের ব্যাপারটা কালকের মধ্যেই সেরে ফেলতে চাই। আর তার পরদিনই ফ্লাই করব। আমার ভুল হয়ে গেছে লোকটাকে কাল ছেড়ে দেওয়া।”
ওর কথায় দিশানের মুখ থেকেও হাসির রেশটুকু উবে গেল। সে বেশ চিন্তিত গলায় বলল, “সারা রিসোর্টে তো আজ খোঁজ নিলাম সবাই। কোথাও তো তাকে দেখলাম না। আমার মনে হয় সে মিথ্যে বলেছে। তোদের ওপর নজর রাখছে ঠিকই, কিন্তু আড়াল থেকে।

​আশফি ছোটো করে মাথা নাড়ল, “হুঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে।”
​একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দিশান আফসোসের সুরে বলল, “আমার ভাবতেই খুব খারাপ লাগছে রে! এতটুকু একটা মেয়ের ওপর দিয়ে এই চার বছরে না জানি কত বড়ো বড়ো ঝড়-তুফান বয়ে গেছে। এখন যে একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নেবে, সেই নিরাপত্তাটুকুও নেই? ওর বদলটাও ভালো লাগছে না আমার৷ তার ওপর খুব ডিপ্রেসড লাগছে ওকে৷”
​দিব্যর কাছে পুরো ব্যাপারটা তখনো অর্থহীন মনে হচ্ছিল। সে তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, “নিরাপত্তা যদি এতই ইস্যু হয়, তবে এই সারপ্রাইজের ছাতার মাথার কী প্রয়োজন? উচিত তো আজই টিকিট কেটে ফ্লাইটে চেপে বসা।”
​কথাটা শুনেই আশফির মেজাজটা আবারও চড়তে যাচ্ছিল, কিন্তু দিশান পরিস্থিতি সামলাতে হাসতে হাসতে দিব্যর কাঁধে হাত রাখল। কৌতুকমাখা গলায় বলল, “দিব্য ভাই, একটু লজ্জাশরম কর। যাকে নিয়ে জেলাস তুই, সম্পর্কে তুই তার ভাসুর হোস। ভাসুর হয়ে ছোটো ভাইয়ের বউয়ের দিকে এরকম কুটিল নজর দিলে চৌধুরী বংশের ইজ্জত আর থাকবে?”

দিব্য আর কোনো কথায় বলল না৷ আশফিও এরপর আসল আলোচনাতে ঢুকল।
পাহাড়ের এই দিকটায় রোদের তেজ মরে গিয়ে এক ধরনের কমলা রঙের আভা ছড়িয়ে পড়েছে। চারপাশটা দেখতে দেখতে মারিশা ওদের থেকে বেশ কয়েক পা পিছিয়ে একাই হাঁটছে।
​তার থেকে কিছুটা পেছনে পড়ে আছে হৃদয় আর দিলিশা। মন ভাঙা দিলিশার অনুরোধেই আজ ওকে একটুখানি সময় দিচ্ছে হৃদয়। খুব যত্ন নিয়ে ওকে বোঝাচ্ছে সে, “এবার তোমার মুভ অন করা উচিত, দিলিশা। আর কতদিন দেবদাসিনীর মতো থাকবে? দেখছ তো ওরা এখন পুরোপুরি হাসবেন্ড ওয়াইফ হিসেবেই দুজন দুজনকে ট্রিট করছে। আশফিকে পাওয়ার দুরাশা এবার অন্তত ত্যাগ করা উচিত তোমার। এই অরণ্যে রোদন করে লাভ নেই। বরং ওকে ভুলে ভালো একটা ছেলে দেখে বিয়ে করে নাও এবার।”

কথাগুলো শুনতে শুনতে দিলিশার চোখের পাতা হঠাৎই ভিজে ভারী হয়ে এল। ঝাপসা দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে দেখতে লাগল আশফিকে৷ ধরে আসা গলায় হৃদয়কে বলল, “ভুলে যাওয়া কি এতই সহজ, হৃদয়? জানো? আমি আশফিকে সেই কিশোরী বয়স থেকে ভালোবাসি। দীর্ঘ দশটা বছর! আর মারিশা ওকে ভালোবেসেছে মাত্র চার বছর। আমার এক দশকের একনিষ্ঠ ভালোবাসার চেয়েও ওর চার বছরের ভালোবাসা কি খুব বেশি গভীর? আমার এতগুলো বছরের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে মাত্র একটা দিনও কি অনুভব করতে পারেনি আশফি? পেরেছে … নিশ্চয়ই পেরেছে৷ তবু আমাকে একটুখানি ভালোবাসল না ও৷ কেন বাসল না, বলো তো?”

​হৃদয় কিছু বলতে চাইল, কিন্তু দিলিশা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে চলল, “দশটা বছরেও আমি ওকে কখনো এক পলকের জন্য আমার দিকে বিশেষ নজরে তাকাতে দেখিনি। সেখানে মাত্র এক মাসের পরিচয়ে মারিশার জন্য ও এমন পাগল হলো যে, পরিবারের অমতে গিয়ে গোপনে বিয়েটাও সেরে ফেলল। অথচ সেই মেয়েটা ওকে মাঝপথে ছেড়ে চলে গেল। ওই বিচ্ছেদের কঠিন দিনগুলোতে আমি ছায়ার মতো ওর পাশে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বন্ধু আর বোনের তকমা ছাড়া ও আমাকে এক চুল বেশি জায়গাও দেয়নি। কতটা নির্দয়ের মতো ও আমার ভালোবাসাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, মনে আছে তোমার?”
​দিলিশার কণ্ঠস্বর এবার কান্নায় বুজে এল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য চোখে সামনের দিকে তাকিয়েই বলল, “মারিশা ওকে চার বছর যে অসহ্য যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে রাখল, সেই অন্যায়ের কাছে কি দিব্যর সঙ্গে করা আমার ভুলটা খুব বড়ো ছিল?”

হৃদয় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষণ্ণ চোখে পাহাড়ের খাঁজের দিকে চাইল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত স্বরে বলল, “ভালোবাসার পুরো ব্যাপারটাই ভীষণ অদ্ভুত, দিলিশা৷ কখন, কাকে, কী জন্য ভালোবেসে ফেলি আমরা — তার কোনো নির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করা যায় না সব সময়। তবে তোমার আর আশফির মাঝে সবচেয়ে বড় দেয়ালটা ছিল ওই বোন শব্দটা। ছোটোবেলা থেকে এক বাড়িতে বড়ো হওয়ার কারণে ও তোমাকে অন্য কোনো নজরে দেখতেই শেখেনি।”
​একটু থেমে হৃদয় ওর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে যোগ করল, “আর আরেকটা ব্যাপার বলি। দিব্যর সাথে যে ঘটনাটা ঘটেছিল, সেটা তুমি আশফির কাছে অন্যভাবে প্রেজেন্ট করেছ। নিজেকে ভিক্টিম সাজিয়ে দিব্যকে কালপ্রিট প্রমাণ করার চেষ্টা করেছ। ওটা ও একদম পছন্দ করেনি। আশফি ধোঁকা আর লুকোচুরি দুচোখে সইতে পারে না, দিলিশা। ওর কাছে স্বচ্ছতা সব। হয়তো সেজন্যই মারিশার অনুপস্থিতিতেও ও তোমাকে ওর হৃদয়ের ধারেকাছে ঘষতে দেয়নি।”

​তার এই রূঢ় সত্যটা তীরের মতো বিঁধল দিলিশার বুকে। ও আর কোনো পালটা যুক্তি খুঁজে পেল না। নিজের ভুলটা আজ আয়নার মতো চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠায় ভেজা চোখে শুধু মাথা নিচু করে রইল।
মারিশা ওদের থেকে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও পাহাড়ি পথের স্তব্ধতায় হৃদয়ের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট ওর কানে আসছিল। ‘আশফি ধোঁকা আর লুকোচুরি দুচোখে সইতে পারে না’, হৃদয়ের বলা এই কথাটা শুনে ওর মনে হলো কেউ ওর কলিজাটা খামচে ধরেছে। ​সেও তো একটা পাহাড়সম সত্য গোপন করে আশফিকে ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে। সেটা জানার পর কি ওকেও নিজের জীবনে আর জায়গা দেবে না?
​এক চরম নিরাপত্তাহীনতা আর আতঙ্কে মারিশার গলা বুজে এল। ভীত চোখে সে দেখল সামনে হেঁটে যাওয়া সেই চওড়া পিঠের মানুষটাকে, যাকে হারানোর ভয়ে ওর বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। বুকটা হালকা করার জন্য যে সত্যটা একটু আগেও বলে দিতে চেয়েছিল, সেই সত্যটাই এখন ওর গলার ফাঁস হয়ে ওকে শ্বাসরুদ্ধ করে দিচ্ছে। নিমিষেই কান্না উঠে এল গলায়। দ্রুত নিজের মুখটা চেপে ধরল ও, যাতে কান্নার কোনো আওয়াজ কারো কানে না যায়।

ঘড়ির কাঁটা তখন আটটার ঘর ছুঁয়েছে। দুপুর থেকে গোধূলি, পাহাড়ের বুকে আঁধার নামা পর্যন্ত আশফির কোনো পাত্তাই ছিল না। দিশান, দিব্য আর হৃদয়কে নিয়ে সে ঠিক কোথায় উধাও হয়েছিল, তা জানা গেল না। মারিশার অস্থিরতা যখন ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে, ঠিক তখনই হুট করে ঝড়ের মতো ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল সে।
​মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মারিশাকে দেখেই আশফি থমকে গেল। রক্তিম দুটো চোখ, চোখের কোণে কান্নার শুকিয়ে যাওয়া দাগ, মুখটা কেমন ফ্যাকাশে আর বিবর্ণ। আশফি কোনো কথা না বলে চট করে ওর কাছে এগিয়ে এল। হাতের তালুটা ওর কপালে ছোঁয়াতেই শিউরে উঠল সে। গায়ের তপ্ত আঁচটা টের পেয়ে ওর কণ্ঠস্বরে ফুটে উঠল তীব্র উদ্বেগ, “আশ্চর্য! এইটুকু সময়ের মধ্যেই জ্বরটা বাড়ালে কী করে?”
​মারিশা কোনোমতে ক্লান্ত চোখের পাতা মেলল। খুব দুর্বল আর ভাঙা স্বরে জবাব দিল, “দুপুরে ঘরে ফিরে বারান্দায় বসেছিলাম। কখন যে চোখ লেগে এল, টেরই পাইনি। তুমি এসে ডাকার পর ঘুমটা ভাঙল। বোধ হয় গরম কাপড় ছাড়াই অতক্ষণ ওখানে ছিলাম, পাহাড়ি বাতাসেই জ্বরটা বেড়েছে।”
“আর এত সময়ের মাঝে কিছু খাও-ওনি, রাইট?”

কোনো উত্তর দিল না মারিশা৷ শুধু একটুখানি হাসল৷ ​আশফি তখন ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। ওর চোখের মণি দুটো যেন মারিশার মনের গভীর অবধি খুঁড়ে দেখতে চাইছে। মুহূর্তেই ওর চেহারায় এক পাথুরে গাম্ভীর্য নেমে এল। ও বুঝতে পারল, মারিশার ভেতরে কোনো এক চরম অস্থিরতা উইপোকার মতো ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। নিশ্চয়ই সেই স্বীকারোক্তিটা ওকে দিতে গিয়েই ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়েছে। দুশ্চিন্তা করতে করতেই মেয়েটা নিজেকে অসুস্থ করে ফেলছে। কিন্তু কিসের এত চিন্তা, কিসের এত ভয়? ওর ওপর কি এতটুকু ভরসা নেই? অতীতে যা কিছুই ঘটুক, সেই পুরনো ক্ষত কি তাদের বর্তমানের চেয়েও বড়ো হয়ে দাঁড়াবে? আশফির বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল শুধু।
​নিস্তব্ধতা ভেঙে মারিশা আলতো করে ওর জামার হাতা ধরল। ম্লান গলায় জিজ্ঞেস করল, “এখন তুমি বলো, এই সাত-আট ঘণ্টা কোথায় ছিলে? কী এমন জরুরি কাজে ডুবেছিলে যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা কল করার সময়টুকুও তোমার ছিল না?”

​আশফি কোনো কৈফিয়ত দিল না। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। এক অদ্ভুত অধিকারবোধ আর গাম্ভীর্য নিয়ে ও হঠাৎ মারিশাকে একরকম টেনেই বাইরে বেরিয়ে এল৷ সরাসরি হাজির হলো ডাইনিং হলে, যেখানে দিশানরা ততক্ষণে রাতের আড্ডা আর খাবারে মজেছে।
​খাওয়ার পুরোটা সময় আশফির মাঝে এক গম্ভীর নিস্তব্ধতা কাজ করছিল। মারিশা বারবার ওর চোখের দিকে তাকাতে চাইলেও আশফি একবারের জন্যও ওর দিকে চোখ তুলে তাকাল না। কিন্তু সে যে মারিশার প্রতি উদাসীন নয়, তা বোঝা যাচ্ছিল ওর বারবার দেওয়া তাগিদগুলোতে। মারিশা জ্বরের অরুচিতে খাবার সরিয়ে রাখতে গেলেই আশফি কঠোর গলায় বলে উঠছিল, “পুরোটা শেষ করো।”

ওর সেই শাসন মেশানো গলার স্বরে এমন কিছু ছিল যে, মারিশা মুখ ফুটে একটা প্রতিবাদ করার সাহসও পেল না।
তারপর দ্রুত ডিনার শেষ করে মারিশার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে পিষে ধরল সে। সবাইকে রেখে ওকে নিয়ে রিসোর্টের নির্জন পথের দিকে পা বাড়াল।
​কিন্তু আশফির এই থমথমে নীরবতা মারিশাকে ক্রমেই কোণঠাসা করে দিচ্ছিল। ও আর সহ্য করতে পারল না। মাঝপথেই দাঁড়িয়ে পড়ে আশফির হাতটা প্রাণপণে চেপে ধরল। বিচলিত স্বরে প্রায় মিনতি করে উঠল, “কী হয়েছে তোমার? এভাবে পাথরের মতো চুপ করে আছ কেন? তোমাকে দেখে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। প্লিজ আশফি, আগের মতো নরমাল হও!”
​আশফি গাল ফুলিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল, যেন ভেতরের সবটুকু গুমোট বাতাস একবারে বের করে দিতে চায়। ধীরপায়ে মারিশার সামনে এসে দাঁড়াল। ওর দুগালে হাত রেখে গভীর মায়া নিয়ে নিষ্পলক চেয়ে রইল এক মুহূর্ত। এরপর সবটুকু গাম্ভীর্য বিসর্জন দিয়ে খুব আদুরে আর নরম গলায় বলল, “এত ভয় পাচ্ছ কেন? আমি একদম ঠিক আছি। চলো আমার সাথে, খুব জাদুকরী একটা জায়গা খুঁজে রেখেছি তোমার জন্য। সেখানেই আমাদের সব কথা হবে।”

রিসোর্টের মূল কোলাহল ছাড়িয়ে আশফি ওকে নিয়ে এল একদম শেষ প্রান্তে। এখানে পাহাড়ের ঢালটা আচমকা খাদের গভীরতায় মিশেছে। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার নয়, বরং এক মায়াবী নীলচে আস্তরণে ঢাকা। দূরে পোখারা শহরটাকে মনে হচ্ছে অন্ধকারের বুকে কেউ এক মুঠো জ্বলন্ত হিরে ছড়িয়ে দিয়েছে। সেই আলোকবিন্দুগুলো পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে মিটমিট করছে। অন্ধকারে লেকের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে ঠিকই। কিন্তু নিচ থেকে ধেয়ে আসা হাড়কাঁপানো হিমেল স্রোতটাই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, শান্ত এক বিশাল জলাশয় এই নির্জনতার সাক্ষী হয়ে নিচে প্রহর গুনছে।
ঘাড় ঘোরাতেই মাথার ওপরের আকাশটা যেন এক বিশাল নীলচে মখমলের চাঁদোয়ার মতো ছড়িয়ে আছে। অমাবস্যার কাছাকাছি হওয়ায় চাঁদটা অনুপস্থিত। কিন্তু নক্ষত্রের মেলা বসছে যেন। অগণিত তারাগুলোর আলোয় দূর অন্নপূর্ণার চূড়াটা বরফে ঢাকা হয়েও এক অদ্ভুত রহস্যময় আভা ছড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন কোনো এক অলৌকিক আলো তাকে ছুঁয়ে আছে। যার কোনো উৎস নেই।

​পাইন বনটা এখন এক কালো প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। যখনই ঝোড়ো বাতাস সেই বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, পাতার ফাঁক দিয়ে এক তীক্ষ্ণ শিস দেওয়ার মতো আওয়াজ ভেসে আসছে৷ যেন নির্জন পাহাড়ের কোনো এক বিষণ্ণ বাঁশি। বাতাসের সেই ঝাপটার সাথেই ভেসে আসছে ভিজে মাটি আর পাহাড়ি লতাগুল্মের একটা বুনো সুবাস।
​এই গভীর নৈঃশব্দ্য আর প্রকৃতির বুনো ঘ্রাণের মাঝে দাঁড়িয়ে মারিশার মনে হলো, সময়টা যেন এখানে থমকে গেছে। ওরা যেন এই চেনা পৃথিবীর কেউ নয়, বরং অন্য কোনো এক অচেনা জগতের প্রথম দুই বাসিন্দা। প্রকৃতির এই আদিম বিশালতা আর চারপাশের নিবিড় স্তব্ধতা ওকে এমন এক ঘোরে আচ্ছন্ন করে ফেলল যে, ওর মনের গভীরে জমে থাকা পাহাড়সম ভয়, অপরাধবোধ আর আগামীর সব দুশ্চিন্তা মুহূর্তের জন্য হলেও কোনো এক অতল গহ্বরে হারিয়ে গেল। ওর অস্তিত্ব জুড়ে এখন কেবল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা আর এই পরম প্রশান্তি।
ঠিক সেই মুহূর্তে আশফি রেলিং ছেড়ে ঘুরে দাঁড়াল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ঝটকায় সে মারিশাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল।
আকস্মিক এ কাণ্ডে মারিশা খানিকটা চমকে উঠলেও পাহাড়ের কনকনে হাওয়ার মাঝে আশফির শরীরের এই ওমটুকু ওকে এক নিমেষে শান্ত করে দিল। এই বৈরী শীতের মাঝে ওর জন্য এর চেয়ে বড়ো কোনো রক্ষাকবচ আর হতেই পারে না।

হঠাৎই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে কোনো এক সমতল থেকে গিটারের ঝঙ্কার ভেসে এল। মারিশা একটু ঝুঁকে দেখল, দূরে অন্ধকারের মাঝে কয়েকটা আগুনের কুণ্ডলী জ্বলছে। হয়তো কোনো পর্যটক দল সেখানে ক্যাম্পিং তাবু গেড়ে আড্ডায় বসেছে। সেই ক্যাম্পফায়ারের দিক থেকেই এখন মিউজিকটা পাহাড়ের নিস্তব্ধতা চিরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোনো এক পরিচিত ইংরেজি ব্যলাডের চেনা সুর ভেসে আসছে সেখান থেকে।
আশফি কান পেতে সুরটা শুনল। তারপর মারিশার কাঁধের ওপর চিবুকটা ঠেকিয়ে বলে উঠল, “দলটা আমাদের কাছাকাছি থাকলে ভালো হত খুব। আমাদের পছন্দের একটা গান গাওয়ার জন্য তাহলে রিকোয়েস্ট করতে পারতাম!”
মারিশা আচমকা তার পুরনো স্বভাব অনুযায়ী আচমকা আশফির পেটে একটা শক্ত চিমটি কেটে বসল। তারপর দুষ্টুমিভরা হাসিতে বলল, “কেন? নিজের কণ্ঠ কি খুব একটা সুবিধের না? অন্যকে দিয়ে গাওয়ানোর শখ কেন? তুমি নিজে গেয়েই তোমার বউকে ইমপ্রেস করো না!”

​আশফি তখন ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে পেটের ওপর হাত বোলাতে বোলাতে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল মারিশার দিকে। খানিকটা বিরক্তির সঙ্গে প্রশ্রয়ও মিশিয়ে বলল সে, “আমার গলায় গান শোনার শখ হলে সেটা তো স্বাভাবিকভাবে বললেই হতো। এভাবে চিমটি কাটার মানে কী, ছাই? এই বিচ্ছিরি অভ্যাসটা কি কোনোদিনই যাবে না তোমার?”
​হাসিটা কোনোমতে চেপে কপট দুঃখ পাওয়ার ভান করল মারিশা। মুখটা মেঘাচ্ছন্ন করে কিছুটা আহ্লাদী সুরে জবাব দিল, “বাপরে! সামান্য একটা চিমটি কেটেছি বলে এত রেগে যাওয়ার কী আছে? আমি কি রোজ কাটি? সেই পোখারা আসার দিন গাড়িতে বসে একবার দিয়েছিলাম, তারপর তো আজই কাটলাম! কিন্তু এমনভাবে রিয়্যাক্ট করছ যেন চামড়া খসে পড়েছে তোমার। যাও তো! আর কোনোদিন তোমার এই মোমের শরীর টাচই করব না।”
ব্যথাটা ভুলে আশফি কয়েক মুহূর্ত থমকে রইল। তারপর হুট করেই শব্দ করে হেসে উঠল সে। হাসিটা এতটাই অপ্রত্যাশিত আর সংক্রামক ছিল যে, মারিশার কাছে সেটা উপহাস মনে হলো। ভ্রু কুঁচকে যেই না আবার তাকে চিমটি কাটতে হাত বাড়াল, অমনি আশফি খপ করে ওর হাতটা চেপে ধরল। পরক্ষণেই দু’হাতসহ ওকে এমনভাবে নিজের বাহুডোরে জাপ্টে ধরল যে, ওর আর নড়চড় করার সুযোগটাও রইল না।
​আশফি তখনো হাসছিল। সেই হাসি মাখা গলাতেই বলল, “আরে আরে, থামো! আসলে তোমার এই ন্যাকামো সুরে কথা আর আহ্লাদী ঢংটা কতদিন পর দেখলাম বলো তো? হঠাৎ দেখে এত অদ্ভুত লাগল যে, হাসিটা আর আটকে রাখতে পারলাম না। সরি সরি, আর হাসব না!”

কথাগুলো বললেও আশফির ঠোঁটের কোণে একটা আলতো হাসি লেগেই রইল। মারিশাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে ওর গালের সাথে গালটা একটু ঘষল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলে উঠল, “কিন্তু সিরিয়াসলি, তুমি আমাকে একটুখানি নস্টালজিক করে দিয়েছ। এতদিন পর আজ কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো, আমি যেন ওসমান বারিশের সেই অতি আহ্লাদী মেয়েটাকে একঝলক দেখতে পাচ্ছি। যে মেয়েটা খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে আমার আহ্লাদী বউও হয়ে গিয়েছিল। আর কথায় কথায় যে মিষ্টি ওভার-অ্যাক্টিং আর বাঁকা বাঁকা কথা দিয়ে আমাকে রাগানোর চেষ্টাও করত।”
মুচকি হেসে ফেলল মারিশা, মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল, “মিস করো সেই মেয়েটাকে?”
“হুঁ, সব সময়ই করি”, বলতে বলতে মারিশার ঘাড়ের ভাঁজে আলতো করে নাক ঘষল আশফি।
সেই স্পর্শে একটু যেন কেঁপেও উঠল মারিশার শরীরটা। প্রশ্ন করল সে, “কিন্তু তোমার না সেই মেয়েটাকে তখন বিরক্ত লাগত?”

অনুযোগের সুরে বলল আশফি, “আরেহ! সেটা কখনের কথা? যখন তুমি শুধু সুযোগ খুঁজতে কখন, কীভাবে আমাকে সবার সামনে অপমান করা যায়, সেই সময়ের কথা।”
স্মৃতিগুলো মনে পড়তেই মারিশার ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে নিচের সেই পর্যটক দলটার আড্ডা থেকে আশফির খুব প্রিয় একটা গানের সুর ভেসে এল। গিটারের চড়া ঝঙ্কার আর নেশা ধরানো ছন্দটা বাতাসের ঢেউয়ে চড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল যেন। আশফি তখন আলতো করে মারিশাকে সামনের দিকে ঘুরিয়ে দিল। ওর পিঠটা নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর ওর কাঁধে থুতনিটা রেখে ফিসফিসিয়ে বলল, “শুনছ মিউজিকটা? জাস্ট ফিল ইট।”
বলেই ওর কানের একদম কাছে খুব নিচু, দরদমাখা আর কিছুটা খসখসে পুরুষালি গলায় সে গুনগুনিয়ে গানটা ধরল—
Hey baby, when we are together, doing things that we love.
Everytime you’re near I feel like I’m in heaven, feeling high
I don’t want to let go, girl.
I just need you to know, girl.

গানের প্রতিটি শব্দ যেন মারিশার কানের লতিতে উষ্ণ নিঃশ্বাসের মতো আছড়ে পড়ছিল। সেই সাথে গিটারের সুরটা তখন আরও করুণ আর মোহময় হয়ে উঠেছে।
এক হাত দিয়ে ওর হাতের আঙুলগুলো নিজের হাতের ভেতর শক্ত করে জাপটে ধরল আশফি। চোখদুটো বুজে গেয়েই চলল সে। গানের কলিগুলো যেন ওর মনের একদম গভীর থেকে উঠে আসছিল—
​“I don’t want to run away, I want to stay forever, through Time and Time…
No promises…”
​গিটারের সেই দূরের সুর আর আশফির কাছের এই মোহময় কণ্ঠটা মিলে মারিশার চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি করল। কিন্তু এই গভীর ভালোবাসার চাদরে ঢাকা পড়ে ওর অপরাধবোধের দহনটা যেন আরও তীব্র হতে শুরু করল। আশফি যখন ওর ঘাড়ে মুখটা গুঁজে শেষ লাইনটা গাইল—
Baby, now I need to hold you tight, I just wanna die in your arms
Here tonight.

মারিশা তখন চোখ বন্ধ করে শুধু অনুভব করল, সকল মিথ্যার পাহাড় ডিঙিয়েও এই মানুষটার বাহুবন্ধনে সে সারাজীবন এভাবে বন্দি থাকতে চায়। কোনো কিছুর বিনিময়েই সে আর এই মানুষটাকে হারাতে চায় না।
সহসা ঘুরে দাঁড়িয়ে দুহাতে আশফিকে জড়িয়ে ধরল সে। আশফিও ওকে বুকের মাঝে পিষে ধরে আকাশের দিকে মুখটা তুলে চোখদুটো বুজল। তারপর এক গভীর স্বীকারোক্তির সুরে বলতে লাগল, “মাহি, মাত্র এ কদিনেই আমি তোমার জন্য ঠিক আগের মতোই আবার পাগল হয়ে উঠছি। একটা দিনও এখন তোমাকে ছাড়া কাটানো আমার জন্য কঠিন। আমি বোধ হয় সারাজীবন তোমার জন্য এমন পাগলই থেকে যাব। প্লিজ, কখনো বিরক্ত হয়ে আমাকে আবার ছেড়ে চলে যেয়ো না যেন। তোমাকে হারানোটা আমার কাছে এখন মৃত্যুর চেয়েও ভয়ানক। আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমাকে আমার কাছে চাই৷ থাকবে তো?”

​এরপর নিজেকে আর কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারল না মারিশা। ওর এই নিখাদ ভালোবাসার সামনে এতটা অসহায় অনুভব করল যে, আশফির বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে বুক ফেটে আসা কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।
ওর ওই বাঁধভাঙা কান্না দেখে আশফি বিচলিত হয়ে পড়ল। দ্রুত ওর মুখটা তুলে ভীষণ যত্নে চোখের পানি মুছে দিতে লাগল৷ তারপরই কণ্ঠে এক ধরণের শাসনমাখা দৃঢ়তা ফুটিয়ে খুব গম্ভীর কিন্তু নরম গলায় বলল, “আজকের পর থেকে আমি তোমার আর কোনো কনফেশন শুনতে চাই না, বুঝেছ? অন্তত যতদিন না তুমি আমাকে আগের মতো ভরসা করতে পারো, ততদিন না।”
​খানিকটা থামল সে। তারপর আবার বলতে শুরু করল, “শোনো, আমার কাছে তোমার কনফেশনের চেয়ে তোমার সুস্থতা আর তোমার ভালো থাকাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যে কনফেশন দিতে গিয়ে আমার বউয়ের এমন করুণ দশা হবে, তাকে অসুস্থ হয়ে পড়তে হবে, আমার সেই কনফেশনের একদমই প্রয়োজন নেই।”
মারিশা তখনও কান্না সামলাতে পারছিল না। কাঁদতে কাঁদতেই সে কোনোমতে বলতে চাইল নিজের সেই গোপন অপরাধের কথা, “আশফি, প্লিজ শোনো… আমি তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম কেবল বাবার অসুস্থতার জন্যই নয়৷ আমি আসলে…”

​এতটুকু বলতেই কান্নার তোড়ে ওর দমটাই যেন আটকে আসতে চাইল। কথাগুলো গলায় দলা পাকিয়ে এল ওর। তা দেখে আশফি এবার আলতো ধমকের সুরে বলে উঠল, “চুপ! আর কখনো আমার সামনে এভাবে কান্নাকাটি করবে না। আমার কিন্তু সহ্য হচ্ছে না, ভালো লাগছে না এসব।”
​মারিশা তবু হার মানতে চাইল না। আজ যদি না বলতে পারে, তবে আর কখনোই হয়তো বলার সাহসটা করে উঠতে পারবে না সে। ডুকরে কেঁদে উঠে আবারও নিজের কথাটা শেষ করার চেষ্টা করল, “আমি তখন আইলিন আন্টির কথাতে…”
কিন্তু আশফি দেখতে পেল শুধু কান্নার দমকে ওর বুকটার ঘন ঘন ওঠানামা … ওর অস্থির হয়ে ওঠাটা। সামান্য কথাগুলো বলতে গিয়ে রীতিমতো অসুস্থই হয়ে পড়ছে যেন। তাই এবার আর ওকে কোনো সুযোগই দিল না। কেবল ওকে শান্ত করতেই এক নিমিষেই ওর ঠোঁটদুটো নিজের ঠোঁটের ভাঁজে আঁকড়ে ধরে ওর সব কথা থামিয়ে দিল।
চারপাশের পাহাড়ি নিস্তব্ধতা আর গিটারের দূরবর্তী সুরের মাঝে মারিশার অব্যক্ত অপরাধবোধটুকু মুহূর্তেই যেন আশফির ভালোবাসার অতলে তলিয়ে যেতে লাগল।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩২ (২)

তবে ওদের সেই মোহাবিষ্ট আবেশটুকু বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারল না। অন্ধকার চিরে হঠাৎই দিব্যর বিদ্রূপাত্মক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “আহা… এই নাকি আমাদের চৌধুরী বংশের সব থেকে ডিসেন্ট, পোলাইট ম্যান আশফি আনজার? যে কিনা লং টাইম অ্যাব্রোড কাটিয়েও নিজের রক্ত থেকে বাঙালি কালচারকে ধুয়ে মুছে যেতে দেয়নি! এই বুঝি তার নমুনা?”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩৩ (২)