Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩৩ (২)

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩৩ (২)

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩৩ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি

দিব্যর গলা শোনামাত্রই ওরা দুজন যেন বিদ্যুৎপৃষ্টের মতো চমকে উঠল। লজ্জায় সিঁটিয়ে গিয়ে মারিশা আশফির বুকের ভেতর আরও গুটিসুটি মেরে মিশে রইল।
অন্যদিকে, আশফির মেজাজ তখন তুঙ্গে। মারিশাকে এক হাতে বুকের সাথে আগলে রেখেই সে চরম বিরক্তি আর হতাশায় আকাশের দিকে মুখ তুলল। বিড়বিড়িয়ে উঠল, “উফ আল্লাহ! কোথাও কি একটু শান্তিতে থাকার উপায় নেই?”

“আরে… চেতস ক্যান ভাই? আমরা কি সাধ করে তোদের চেরাগ জ্বালিয়ে খুঁজছি?” বলতে বলতে দিব্যর পেছন পেছন এবার দিশানও এসে উদয় হলো।
​হতাশা আর চরম অসহায়ত্ব নিয়ে আশফি শুধু একটাই প্রশ্ন করল, “পাঁচটা মিনিট! মাত্র পাঁচটা মিনিটও কি তোরা আমাদের একটু একা থাকতে দিবি না?”
​“এই, কিসের একা থাকা? কিসের প্রাইভেসি?” দিশান গলা চড়িয়ে টিটকারির সুরে বলল, “কালকের আগে তোদের এভাবে চিপকা-চিপকি করা একদম উচিত না। আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ!”
আশফি এবার চরম বিরক্তিতে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তোরা যে কালও আমার শান্তি হারাম করবি, সেটা এখন আর বুঝতে বাকি নেই। জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল তোদের মতো দুই আপদকে হেল্প করার জন্য ডাকা!”
​“বেশি কথা বলিস না কিন্তু!” দিব্য উল্টো ধমক দিয়ে উঠল। “তোদের এইসব আদিখ্যেতা দেখার বিন্দুমাত্র শখ নেই আমাদের। তোর বউয়ের জন্য যে পার্সেল আসার কথা ছিল, সেটা এসে পৌঁছেছে। শুধু সেই খবরটা দিতেই আসা। রিসিভ করার হলে কর, নয়তো বিদায় হতে বলি!”
কথাটা শোনা মাত্রই আশফির চেহারায় তড়িঘড়ি ভাবটা ফুটে উঠল৷ পাল্টা ধমক দিল ওদেরকে, ​“তা সেটা আগে বলবি তো!”

মারিশার দিকে তাকাল তারপর। পরম মমতায় ওর মুখটা দুহাতে তুলে ধরে চোখের জল মুছে দিল সে। তারপর মৃদু শাসনের সুরে বলল, “আমি যেন আর কান্নাকাটি করতে না দেখি, ওকে? এখন দিশানের সঙ্গে রুমে যাও। আমি কাজটা শেষ করেই ফিরছি।”
দিশান তখনই ফোড়ন কেটে বসল, “কাজ শেষ করে কোথায় ফিরছেন মিয়া ভাই? কানে কি কথা যাচ্ছে না? কালকের আগে আজ আর একসাথে থাকা চলবে না। না মানে এক্কেবারেই না! নট অ্যালাওড!”
​আশফি এবার মেজাজ হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “মানে কী? কিসের আলাদা থাকা? আমরা কি সদ্য বিবাহিত নাকি যে তোদের এইসব নিয়ম মানতে হবে? যতসব ফাজলামি! যা এখান থেকে!”
​দিব্য তখন তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “সদ্য বিবাহিত না হলে এত ঢং করে সারপ্রাইজ দেওয়ার ঘটা করছিস কেন? খামোখা আমাদের খাটিয়ে মারছিস! নিয়ম যখন করা হয়েছে, তখন মানতেই হবে।”
​“শোন, এত কথা খরচ করার সময় নেই আমাদের,” দিশান পাশ থেকে বলে উঠল আশফিকে, “সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। আজ রাতে তুই আমার সঙ্গেই থাকছিস। এটাই ফাইনাল।”
“তোরা কি পাগল হয়েছিস?” ​মারিশার দিকে ইশারা করে বলল আশফি, “ওর অবস্থা দেখতে পাচ্ছিস না? এই অসুস্থ অবস্থায় ওকে আমি একা রাখব?”

​“আচ্ছা, তোমরা থামো তো”, চোখদুটো মুছে এতক্ষণে মারিশা ওদের মুখোমুখি ফিরল।
আশফির অস্থিরতা দেখে ও শান্ত গলায় বলল, “একটা রাতেরই তো ব্যাপার। আমি ওষুধ খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ব, কোনো সমস্যা হবে না। তুমি যাও ওদের সাথে।”
​আশফি তবুও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই দিশান এগিয়ে এল। মারিশার হাতটা হালকা করে ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম করে বলল, “ব্যস! তর্কাতর্কি এখানেই শেষ। আমরা চললাম, তুই তোর কাজ শেষ করে আয়।”
​আশফি আর কোনো প্রতিবাদের সুযোগ পেল না। ভাইদের এই অদ্ভুত জেদের কাছে হার মেনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। তারপর চরম হতাশা নিয়ে দিব্যর পেছনে পেছনে পার্সেল রিসিভ করার জন্য পা বাড়াল।

ভোর সবে চারটে। সারংকোটের আকাশে এখনো রাতের শেষ অন্ধকার লেপটে আছে, তবে পুব আকাশে নীলচে একটা আভা ফুটতে শুরু করেছে। শেষ রাতের হিমেল বাতাস পাহাড়ের বুক চিরে কনকনে ঠান্ডার জানান দিচ্ছে। ঠিক এই সময়েই আশফি, দিব্য, দিশান আর হৃদয় এসে পৌঁছাল অন্নপূর্ণা ভিউপয়েন্টে।
​সারংকোটের মূল ভিউ টাওয়ারের চেনা ভিড় এড়িয়ে এই জায়গাটা একদম নির্জন। প্রশস্ত একটা পাহাড়ি ঢাল, যার একদিকে খাড়া পাহাড় আর অন্যদিকে পাইন আর ছাতিম গাছের ঘন জঙ্গল। এখান থেকে তাকালে দেখা যায় সামনেই অন্নপূর্ণা সাউথ, মাছাপুছরে আর ধবলগিরির তুষারশুভ্র চূড়াগুলো অন্ধকারের মাঝেও অস্পষ্ট রুপালি রেখার মতো জেগে আছে। পুরো দৃশ্যটা এতটাই মায়াবী যে মনে হয় চোখের সামনে কোনো স্বপ্ন ধীরে ধীরে সত্যি হয়ে ধরা দিচ্ছে।

​“উফ, যা ঠান্ডা! হাত-পা তো জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে”, হৃদয় কাঁপতে কাঁপতে বলল।
​“বেশি বকিস না তো, কাজ শুরু কর জলদি”, আশফি একটা ধমক দিল। হাতে ওর বড়ো একটা ফ্লাস্ক আর কিছু ডেকোরেশনের সরঞ্জাম।
​ওরা চারজন মিলে ঠিক বড়ো পাইন গাছটার নিচে টিমটিমে টর্চের আলোয় ব্যস্ত হয়ে পড়ল জায়গাটা সাজাতে৷ এখান থেকে সূর্যোদয়টা সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। পাহাড়ি নিস্তব্ধতার মাঝে শুধু ওদের ফিসফিসানি আর টেপ কাটার শব্দ শোনা যাচ্ছে। মই ছাড়াই দিব্য আর দিশান পাইন গাছের নিচু ডালগুলোতে ব্যাটারিচালিত নিওন লাইট আর ফেয়ারি লাইটগুলো পেঁচিয়ে দিতে লাগল। অন্ধকারের মাঝে হলদেটে এই নরম আলোটা পাইন গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে চুইয়ে পড়তে শুরু করতেই পরিবেশটা কেমন অদ্ভুত মায়াবী হয়ে উঠল যেন।
আশফি আর হৃদয় মিলে পাহাড়ের ঢালে ঝরা পাতার ওপর বিছিয়ে দিল একটা সাদা রঙের মোটা শতরঞ্জি। তার ওপর দুটো নরম কুশন রাখা হলো, আর মারিশার জন্য সযত্নে ভাঁজ করে রাখা হলো একটা কাশ্মীরি চাদর। সব শেষে শতরঞ্জির ওপর বসানো হলো ছোটো একটা কাঠের নিচু টেবিল। টেবিলের ওপর কিছু বুনো গন্ধরাজ আর লালিগুরাস ফুল সাজিয়ে রাখতেই পরিবেশটা স্নিগ্ধ হয়ে উঠল। শতরঞ্জির চারপাশ ঘিরে কাঁচের ছোটো ছোটো জারে রাখা হলো সুগন্ধি মোমবাতি। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় ওদের হাত দুটো জমে নীল হয়ে আসছিল, কিন্তু কারো থামার জো নেই।
​আয়োজনটা একবার দেখে হৃদয় নিচু গলায় বলে উঠল, “পুরাই অস্থির ভাই! এখান থেকে হিমালয়টা জাস্ট হ্যাভেনলি লাগছে।”

​কথাটা শুনে আশফি একবার মুখ তুলে দূর পাহাড়ের দিকে তাকাল। অন্নপূর্ণা রেঞ্জ এখনো নিস্তব্ধ। আকাশের নীল রংটা ধীরে ধীরে হালকা বেগুনি আর কমলায় রূপ নিচ্ছে। বাস্তবে এই জায়গাটার সবচেয়ে বড়ো জাদু হলো এর গভীর নির্জনতা। দূরে কোথাও কোনো পাহাড়ি পাখির ডাক আর গাছের পাতার সরসর শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। আশফি মনে মনে কল্পনা করল, সূর্যটা পুরোপুরি উঠলে যখন পাহাড়ের রং বদলাবে, মারিশা তা দেখতে দেখতে নিশ্চিত খুশিতে পাগল হয়ে যাবে! এমনিতেও তো বউটা ওর আস্ত এক পাগলই। কথাটি ভেবেই ওর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
​দিব্য তখন পাইন গাছের নিচু ডালগুলোতে ছোটো ছোটো চিরকুট আর আশফি-মারিশার কিছু পোলারয়েড ছবি ক্লিপ দিয়ে আটকাচ্ছিল। এক ফাঁকে ও জিজ্ঞেস করল, “এই দিশান, দ্যাখ তো অ্যাঙ্গেল ঠিক আছে কি না?”
​দিশান ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নিয়ে বলল, “একদম পারফেক্ট। গাছের এই ছায়াটাও ওদের দারুণ কাজে দেবে। দুপুরে রোদের ঝটকায় দুজনে অন্তত সেদ্ধ হবে না!”

​বলেই চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ও আবার বলল, “ভিউটাও হয়েছে ফাটাফাটি! একপাশে পাহাড় আর নিচে লেক। আমার ভাবি তো ভাবতেও পারছে না আমার ভাই কত বড় রোমান্টিক হাসবেন্ড!”
​অন্নপূর্ণা ভিউপয়েন্টের এই ঢালটা এমনভাবে তৈরি যে, সামনে তাকালে ধবল অন্নপূর্ণা আর একটু ডানে তাকালে নিচে সবুজাভ নীল ফেওয়া লেকের একটা অংশ স্পষ্ট দেখা যায়।
​দিশানের কথার জবাবে দিব্য হঠাৎ বাঁকা স্বরে বলে উঠল, “হুহ্! আগেরবারও তো কম রোমান্টিক সাজানো হয়নি। পালিয়ে যাওয়ার আগে তোর ভাবি সেটা দেখার প্রয়োজনও মনে করেনি।”
​আশফি তখন টেবিলের ওপর ফ্লাস্ক আর কিছু শুকনো খাবার সাজিয়ে রাখছিল। ওর চোখেমুখে ছিল চাপা উত্তেজনা আর ঠোঁটের কোণে সেই হাসিটা। কিন্তু দিব্যর কথাটা কানে আসতেই ওর হাতটা থেমে গেল, মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল হাসিটাও।
​দিশান তখন ভাইয়ের চেহারাটা খেয়াল না করলেও দিব্যর ওপর বেশ বিরক্ত হলো। ও কড়া গলায় ধমক দিয়ে বলল,

“তুই কি কোনোদিন ভালো হবি না? কখন কী বলছিস, আর সেটা শুনে কার কেমন লাগবে, তা ভাবারও প্রয়োজন মনে করিস না!”
​ছোটো ভাইয়ের ধমকে দিব্যর ভ্রু কুঁচকে এল, কিন্তু আশফির গম্ভীর মুখটার দিকে তাকিয়ে ও আর কথা বাড়াল না। আশফিও কোনো জবাব দিল না। চুপচাপ কাজ শেষ করে হাতের ঘড়িতে সময়টা দেখে নিল।
​সকাল সাতটা বাজার সাথে সাথেই পুরো জায়গাটা এক জাদুকরী রূপ নিয়েছে। পুব আকাশ থেকে সূর্যের প্রথম আভা তখন অন্নপূর্ণার চূড়ায় এসে পড়েছে। সাদা বরফের পাহাড়গুলো সোনার মতো জ্বলজ্বল করে উঠছে। পাহাড়ের গায়ে লেপটে থাকা কুয়াশাগুলো রোদের তাপে হালকা হয়ে নিচ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। ঠিক এই সময়েই ওদের কাজ শেষ হলো।
দিশান কোমরে হাত দিয়ে পুরো কাজটা একবার দেখে নিয়ে বলল, “ব্যস, আমাদের মিশন সাকসেসফুল। এবার গ্রুম সাহেব…”
বলেই আশফির দিকে তাকাল সে, “আপনি বিদায় হন। হাতে সময় খুব কম। মাহিকে নিয়ে আসার আগে তোকেও তো ড্রেস-আপ হতে হবে।”
আশফি শেষবারের মতো সাজানো জায়গাটার ওপর চোখ বুলিয়ে নিল। সবকিছু ঠিক যেমনটা চেয়েছিল, একদম তেমনটাই হয়েছে। তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল ওর ঠোঁটে। ওদের দিকে তাকিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে শেষে একটু অনুরোধের সুরে বলল, “আর হ্যাঁ, আশেপাশে ঘুরঘুর করিস আর যা-ই করিস, আজ আর আমাদের ধারেকাছেও কেউ আসবি না প্লিজ।”

​ওর কথা শুনে কেউ কোনো জবাব দিল না, শুধু মুখ টিপে হাসল দিশান আর হৃদয়। হাসতে হাসতেই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল ওরা। একটু পর দিব্যও ওদের পিছু নিল। ওরা চোখের আড়াল হতেই আশফি আরও একবার সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে সেও দ্রুতপায়ে রিসোর্টের দিকে রওনা দিল। হাতে একদম সময় নেই, পৌঁছেই তৈরি হতে হবে।
​এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। মিঠে রোদে যখন মারিশাকে নিয়ে এই পাহাড়ের চূড়ায় এসে দাঁড়াবে সে, তারপর ওর সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে নতুন করে ওকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে চাইবে, মেয়েটা কি ভীষণ চমকাবে তখন? নাকি খিলখিলিয়ে হেসে উঠবে?
​চার বছর আগে তো ঠিক এটাই চেয়েছিল মারিশা! কত আয়োজন করে ও চেয়েছিল আশফি যেন ওকে প্রপোজ করে। কিন্তু আশফিও ছিল একটা জেদি৷ সে চেয়েছিল মারিশাই প্রথম ওর কাছে হার মানুক। শেষমেশ হয়েছিলও তাই। কিন্তু আজ আর সেসব জেদ নেই। আজ এই পাহাড়ের নিস্তব্ধতা সাক্ষী রেখে আশফি নিজেই নিজেকে সঁপে দেবে ওর কাছে। চার বছর আগে মারিশার না পাওয়া সেই মুহূর্তটাও আজ খুব যত্ন করে সে পূর্ণ করে দেবে।

আশফি যখন হন্তদন্ত হয়ে রিসোর্টে ফিরে এল, ঘড়িতে তখন সোয়া সাতটা। শরীরটা ঠান্ডায় জমে গেছে যেন। কিন্তু মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা ওর। দিশানের রুমে না ফিরে সরাসরি চলে এসেছে সে নিজেদের রুমের সামনে। দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে ডাকল মারিশাকে, “মাহি? উঠেছ তুমি?”
​ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এল না। ও আবার একটু জোরে নক করল, ডাকল আরও কয়েকবার। কিন্তু ওপাশটা একদম নিঝুম। মেয়েটার তো কাল জ্বর লেগেছিল খুব। ঠিক আছে তো? দুশ্চিন্তাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল আশফির। ও আর দেরি করল না। পকেট থেকে মাস্টার-কি বের করে দ্রুত দরজাটা খুলল। রুমের চাবিটা ও নিজের কাছেই রাখে সব সময়।
ঘরে ঢুকে দেখল পর্দার আড়ালে ঘরটা এখনো আবছা অন্ধকারে ডুবে আছে। মারিশা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। গলার কাছ পর্যন্ত চাদর টানা, শুধু ওর ফর্সা মুখটুকু দেখা যাচ্ছে। ধীরপায়ে ওর শিয়রের কাছে এসে বসল সে। নিজের হাতদুটো তখনো বরফের মতো ঠান্ডা, তাই হাত না লাগিয়ে আলতো করে ঠোঁটটা ছোঁয়াল মারিশার কপালে। শরীরের তাপমাত্রা একদম স্বাভাবিক। যাক, মনটা একটু হালকা হলো ওর।
কপালের ওপর এসে পড়া অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘ চুমু খেল সে। ওর তপ্ত গালটার ওপর নিজের ঠোঁটটা একবার ছুঁইয়ে একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে আদুরে স্বরে ডাকল, “মাহি, ওঠো এবার। তাড়াতাড়ি ওঠো। একা একা এক্সাইটমেন্ট আর সামলাতে পারছি না।”

​মারিশার চোখের পাতাদুটো তখন একটু কেঁপে উঠল। তবে সে চোখ মেলল না, বরং হালকা একটু নড়েচড়ে আরও যেন কুঁকড়ে যেতে চাইল চাদরের ভেতর। আশফি ওর গালদুটোতে ছোটো ছোটো করে আরও অনেকগুলো চুমু খেল তখন। খসখসে দাড়ির ঘষা আর নরম আদরে মারিশার ঘুমটা এবার পুরোপুরি ছুটে গেল। এরপর এক ঝটকায় ওকে টেনে তুলে নিজের বুকের সাথে জাপটে ধরল আশফি।
এবার ধীরে ধীরে ঘুমের ঘোরটা কাটল। মারিশা আধবোজা চোখে ওর মুখের দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। নিষ্পলক সেই চাহনিতে একরাশ বিস্ময়। তারপর হঠাৎ ফিসফিস করে বলে উঠল, “তুমি আছ?”
​আশফি একটু হেসে ফেলল, “থাকব না কেন? যাব কোথায় তোমাকে রেখে?”
​মারিশা কোনো কথা বলল না, শুধু ওর উষ্ণ হাতটা বাড়িয়ে আলতো করে রাখল আশফির গালে। যেন ছুঁয়ে দেখে নিশ্চিত হতে চাইল মানুষটা সত্যিই সামনে আছে। তারপর ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলতে শুরু করল, “আশফি, আমি না একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছিলাম। জানো, মায়ের মুখটা আমি কোনোদিন স্বপ্নে স্পষ্ট দেখিনি! কিন্তু আজ দেখলাম।”
​গালে রাখা সেই নরম হাতটা টেনে নিয়ে হাতের তালুতে একটা চুমু খেল আশফি। মায়াবী চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তাই? কী দেখলে?”

​মারিশা আবার চোখ দুটো বুজে ফেলল। মনে হলো, ও আবার সেই স্বপ্নটার গভীরে হারিয়ে যেতে চাইছে। মানসপটে দৃশ্যগুলো ফিরে আসতেই ও বলতে শুরু করল, “রিজের সেই সবুজে ঢাকা আমাদের যে পাহাড়ের বাড়িটা … যার সামনের ঢালু জমিটা চা বাগানে মিশে গেছে। দেখছিলাম সেই বাগান থেকে মা হেঁটে আসছে আমার দিকে। মায়ের কোলে একটা ছোট্ট বেবি। ভীষণ চঞ্চল, সারাক্ষণ হাত-পা ছুড়ছিল। আমি বারান্দায় বসে ছিলাম। মা কাছে এসে মুচকি হেসে বেবিটাকে আমার কোলে দিয়ে দিল। আমি অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে! ওকে ছুঁতেই অনুভব করলাম, ও আমারই রক্ত, আমারই সন্তান। আর জানো, ওর চোখের মণি দুটো ঠিক তোমার মতোই ধূসর। আমি খুশিতে পাগল হয়ে তোমাকে দেখানোর জন্য ঘরের ভেতর ছুটলাম। কিন্তু সারা ঘর শূন্য, তুমি কোথাও নেই।”
​বলতে বলতে মারিশার কণ্ঠে বিষণ্নতা ফুটে উঠল। ও চোখ মেলে একরাশ হাহাকার নিয়ে আশফির দিকে তাকাল। ওর চাউনিতে যেন সেই না পাওয়ার কষ্টটা এখনো লেগে আছে, ​“আমি চিৎকার করে ডাকলাম তোমাকে, কিন্তু কোনো সাড়া পেলাম না। অথচ আমার বারবার মনে হচ্ছিল, তুমি যেন এই ঘরেই ছিলে। একটা সময় বুঝলাম, তুমি নেই। বুকটা কেন জানি যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছিল তখন, তবু আমি পাগল হয়ে তোমাকে খুঁজেই যাচ্ছিলাম। আর খুঁজতে খুঁজতেই আমার ঘুমটা ভেঙে গেল।”

আশফি ওকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল তখন, যেন এই আলিঙ্গন দিয়েই বুঝিয়ে দিতে চাইল, ও কোথাও হারিয়ে যায়নি। মারিশার মাথায় চিবুক ঠেকিয়ে আশফি ফিসফিস করে বলল, “ছিটিয়াল একটা! ওটা তো স্বপ্ন ছিল। মাত্র একটা রাত থাকিনি আমি। তাতেই কত মিস করেছ আমায়, দেখেছ?”
বলা শেষ করেই আশফি হালকা হাসল। কিন্তু মারিশার চোখেমুখে তখনো সেই বিষণ্ণতার রেশ লেগে আছে দেখে ও এবার বেশ নরম স্বরে আশ্বস্ত করল, “এই যে দেখো, আমি তো এখন তোমার একদম পাশেই আছি। আর কোনোদিনও তোমাকে একা রেখে কোথাও যাব না আমি। কক্ষনো না।”
​ওর চাঁদিতে একটা গাঢ় চুমু খেয়ে তারপর বলল, “এখন ওসব দুঃস্বপ্ন ভুলে ঝটপট রেডি হতে হবে তোমাকে। একটা ভীষণ সুন্দর জায়গা আজ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
​মারিশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এত সকালে? যাব কোথায় আমরা?”
​“অন্নপূর্ণা ভিউপয়েন্ট”, এতটুকু বলেই আশফি হঠাৎ ওকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই সোজা বাথরুমে পৌঁছে দিয়ে বলল, “এখন আর গোসল করতে হবে না। শুধু চটপট মুখ-হাত ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপরই একটা ছোট্ট গিফট হাজির হবে তোমার রুমে। আমি এখন যাই, দিশানের রুম থেকেই রেডি হয়ে নেব।”

​মারিশা তখনো অবাক হয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছিল। সে পালটা কিছু বলার আগেই আশফি বিদায় নিল৷ কিন্তু যেই না মারিশা বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করতে যাবে, অমনি ওপাশে আবার টোকা পড়ল। দরজা খুলতেই দেখল আশফি ওপাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে।
​“কী হলো আবার?” মারিশা খানিকটা বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
​আশফি দুষ্টুমিভরা হাসিতে জবাব দিল, “এতগুলো চুমু খেলাম, কিন্তু আসল জায়গায় একটাও খাওয়া হয়নি।”
​চোখের ইশারায় মারিশার ঠোঁটটা দেখাল সে। আর এবারও মারিশাকে কিছু বলার সুযোগ দিল না। এগিয়ে এসেই ওর মুখটা দুহাতে আগলে ধরল, তারপর ঠোঁটে একটা শক্ত চুমু খেয়েই হাসতে হাসতে বলল, “মর্নিং ফ্রেশনেস বলে কথা! এবার যাই।”

​মারিশার ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু আশফি ঘুরে এক পা বাড়াতেই সে হুট করে ওর জ্যাকেটের কলারটা চেপে ধরে নিজের দিকে টেনে আনল। সবটুকু জড়তা আর লাজুকতা ঝেড়ে ফেলে আজ সে পাগলের মতো আদর করতে শুরু করল ওকে। ওর সারা মুখে অগণিত চুমু খেয়ে শেষে খুব গাঢ় একটা চুমু খেল ওর ঠোঁটজোড়ায়।
​আশফির চোখেমুখে তখন একরাশ চাপা আনন্দ। আদর শেষে ও কৌতুক করে বলে উঠল, “উফ! তোমার এই আদরে তো আমার এখন বাথরুমে ঢুকে পড়তে মন চাইছে!”
​কথাটা শুনে মারিশা ঠোঁট চেপে হেসে ফেলল। আশফি ওর হাসিমাখা মুখটার দিকে তাকিয়ে আচমকা বলে বসল, “এত আদর তো আগে কখনো করোনি! আজ হঠাৎ করলে কেন? মনে হচ্ছিল যেন শেষ বিদায় দিচ্ছ আমাকে!”
​কথাটা কানে যেতেই মারিশার ঠোঁটের কোণ থেকে সবটুকু হাসি মুহূর্তে মুছে গেল। আশফি তা দেখে হাসতে হাসতেই ওর নাকের ডগাটা আলতো করে টেনে দিয়ে বলল, “আরে কী জ্বালা! সবকিছু আজকে এত সিরিয়াসলি নিচ্ছ কেন? যাও তো, এবার দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি গেলাম!”
মারিশা কোনো উত্তর দিল না। শুধু নিঃশব্দে চেয়ে রইল ওর চলে যাওয়ার পথের দিকে। ওর মনের ভেতরে হঠাৎ একটা অদ্ভুত কু ডাক দিয়ে উঠল যেন।

রুম সার্ভিসের ছেলেটা করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ দীর্ঘদেহী এক আগন্তুকের মুখোমুখি হলো। লোকটা প্রায় ছয় ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা, গায়ের রং জলপাই ঘেঁষা ফরসা আর চোখের মণি দুটো স্বচ্ছ নীল। দেখতে সে অদ্ভুত সুন্দর, কিন্তু তার সেই সৌন্দর্যের আড়ালে কোথাও যেন একটা অশুভ অন্ধকার লেপটে আছে। তার চোখের দিকে তাকালেই এক ধরনের শীতল অস্বস্তি শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে যায় যেন।
​লোকটা র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো একটা প্যাকেট ছেলেটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খুব ধীর গলায় বলল, “হেই, তুমি নিশ্চয়ই আশফি আনজারের রুম সার্ভিসার? এই ছোট্ট গিফটটা তাকে একটু পৌঁছে দেবে? বলবে তার খুব সাধারণ একজন ভক্ত পাঠিয়েছে।”
​লোকটা ইংরেজিতে কথা বললেও তার উচ্চারণে তুর্কিশ অ্যাক্সেন্টের প্রভাব স্পষ্ট। ছেলেটা কিছুটা দ্বিধা নিয়ে জবাব দিল, “আমি ওনার ফ্রেন্ডের রুমে সার্ভিস দিতে যাচ্ছি।”
​আগন্তুকের ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠল। সে মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল, “আচ্ছা। সেখানে পৌঁছালেও হবে।”

​“ঠিক আছে, দিন।”
প্যাকেটটা হাতে নিয়ে ছেলেটা দ্রুতপায়ে হৃদয়ের রুমের দিকে এগোতে লাগল। ও চলে যেতেই আগন্তুকের ঠোঁটে লেগে থাকা সেই মেকি হাসির রেখাটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সেই জায়গায় ফুটে উঠল এক কঠোর ও নিষ্ঠুর কাঠিন্য। তার নীল চোখজোড়া তখন তীক্ষ্ণ শিকারির মতো জ্বলছে।
​আগন্তুক শূন্য করিডোরের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু, ফিসফিসানি স্বরে বলে উঠল হঠাৎ, “আশকিম! তোমাদের নতুন শুরুটা আমার এই শুভেচ্ছা দিয়েই শুরু হোক। আমি খুব অপেক্ষায় আছি … কখন তোমায় সামনে পাব আমি!”
লোকটা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। দীর্ঘ পদক্ষেপে লবিতে গিয়ে পৌঁছাল। সেখানে আগে থেকেই ওর জন্য অপেক্ষা করছিল মাস্ক পরিহিত এক ব্যক্তি। এই সেই লোক, যে দুদিন আগে আশফির হাতের মার খেয়েছিল। তবে তার আরেকটি বড়ো পরিচয় হলো, ওসমান বারিশ সুলতানের পর সে ছিল মারিশারও ব্যক্তিগত সহকারী। এবং বিশেষ বন্ধুও।
হৃদয়ের ঘরের দরজাটা খোলাই ছিল। ভেতরে সোফায় বসে থাকতে দেখা গেল দিলিশাকে। কান্নাকাটি করে ওর চোখ দুটো ফুলে লাল হয়ে আছে, সারা মুখে ক্লান্তির ছাপ। একটু আগেই হৃদয়ের কাছ থেকে সে জানতে পেরেছে, ​আশফি আজ শুধু মারিশাকেই অবাক করবে না, চমকে দেবে সবাইকেই। আজ সে নিজেই নবদম্পতি সাজে যুগলবন্দি ছবি কিছু সংবাদকর্মীর কাছে পাঠিয়ে দেবে৷ যাতে পুরো বিশ্ব মারিশাকে ওর স্ত্রী হিসেবে চিনে নেয়। বিয়ের খবরটা এভাবে রাষ্ট্র করার পেছনে ওর আসল উদ্দেশ্য হলো মাহবুব চৌধুরী। খবরটা জানাজানি হয়ে গেলে তিনি চাইলেও আর বড়ো কোনো ঝামেলা করতে পারবেন না৷ বরং লোকলজ্জার খাতিরে আত্মীয়-স্বজনদের ডেকে ধুমধাম করে অনুষ্ঠান করতে বাধ্য হবেন।

​হৃদয়ের মুখে এই পরিকল্পনার কথা শোনার পর থেকেই দিলিশার সাজানো স্বপ্নগুলো সব চুরমার হয়ে গেছে। সবটুকু আশা হারিয়ে সে এখন কেবল এক বিষণ্ণ মূর্তি।
রুম সার্ভিসের ছেলেটা হৃদয়কে না পেয়ে উপহারের প্যাকেটটা দিলিশার হাতেই তুলে দিল। সেদিকে ফিরেও তাকাল না দিলিশা, যন্ত্রচালিত হাতে সেটা টি-টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেলল। ছেলেটা বেরিয়ে যেতেই হৃদয় বাথরুম থেকে বের হয়ে ওকে ওভাবে কাঁদতে দেখে বলল, “এজন্যই কাল বলেছিলাম দেশে ফিরে যাও। এখন কান্নাকাটি করে কী হবে? তোমাকে কাঁদতে দেখে আশফি কি মারিশাকে ছেড়ে দেবে?”
​দিলিশা নিশ্চুপ। হৃদয় ওর দিকে টিস্যু বক্সটা বাড়িয়ে দিল। কিন্তু ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার সময় নেই তার৷ সকালে এখনো নাশতা করা হয়নি। খেয়েই দিশানের সাথে বাইরে বের হতে হবে। অনেক কিছু কেনাকাটার আছে। আজ দ্বিতীয়বারের মতো আশফির বাসরঘর সাজাবে ওরা। যদিও রিসোর্ট ম্যানেজমেন্টই কাজটা করে দিতে পারত৷ কিন্তু বন্ধুর এই বিশেষ রাতটা সাজানোর যে আনন্দ আর লাভটা আছে, তা ওরা হাতছাড়া করতে চায় না কেউ।
দিলিশাকে জিজ্ঞেস করল, “ব্রেকফাস্ট করবে না? চলো।”

​“খাব না, তুমি যাও”, থমথমে গলায় জবাব দিল দিলিশা।
জবাবে শুধু কাঁধ ঝাঁকাল ​হৃদয়। তবে সে বেরিয়ে যাওয়ার আগে দিলিশা নিস্পৃহভাবে জানাল, “রুম সার্ভিসার এসে একটা গিফট রেখে গেছে আশফির জন্য৷ ওর এক ফ্যান পাঠিয়েছে।”
কথাটা শুনে হৃদয় ফিরে এল। প্যাকেটটা একবার হাতে তুলে নিলেও আবার রেখে দিয়ে বলল, “আজ ওসব দেখার সময় কই ওর? যে তাড়াহুড়ো করে রেডি হচ্ছে!”
বলেই সে চলে গেল৷ ​সে যাওয়ার পরও কতক্ষণ নিঝুম হয়ে বসে রইল দিলিশা। তারপর চোখদুটো মুছে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে হঠাৎ কী মনে করে প্যাকেটটা হাতে নিল সে। ভাবল, আজ ওদের বিশেষ দিন উপলক্ষেই হয়তো উপহারটা কেউ পাঠিয়েছর৷ তাই রাগে, ক্ষোভে টেনেটুনে ছিঁড়ে ফেলল মোড়কটা। আর তখনই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা চিরকুট আর কয়েকটা ছবি।

​ছবিগুলো হাতে নিতেই চমকে উঠল দিলিশা। প্রতিটি ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা গেল মারিশাকে। কোনোটা নাইটক্লাবে, কোনোটা লাক্সারি হোটেলের বিশাল সুইটের সোফাতে, আবার কোনোটা রেস্টুরেন্টে। সেসব দেখতে দেখতে দিলিশার হাতের বাঁধন যেন আলগা হয়ে এল। কাঁপা হাতে দ্রুত চিরকুটের ভাঁজটা খুলল সে। ইংরেজিতে লেখা মাত্র কয়েকটা বাক্য। কিন্তু সেগুলো পড়া শেষ হতেই দিলিশার বিষণ্ণ চেহারায় এক পৈশাচিক খুশির হাসি ফুটে উঠল। এ যেন রণক্ষেত্রে হারতে বসা কোনো যোদ্ধার শেষ মুহূর্তে জিতে যাওয়ার অট্টহাসি! তার চোখের সেই শূন্যতা নিমেষেই এক কুটিল তৃপ্তিতে ভরে উঠল।
এক মুহূর্তও দেরি করল না দিলিশা। দ্রুত হাতে ছবি আর চিরকুটটা প্যাকেটে পুরে নিয়ে ছুটল দিশানের ঘরের দিকে। কিন্তু ঘরে ঢুকে দেখল চারপাশ শূন্য। শুধু বাথরুম থেকে পানির আওয়াজ আসছে। হয়তো ভেতরেই আছে আশফি৷ ​মুহূর্তেই ওর ঠোঁটের কোণে সেই ধূর্ত হাসিটা আবার ফিরে এল। সন্তর্পণে প্যাকেটটা বিছানার ওপর রেখে দিয়ে ও দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল। মনের মধ্যে এক পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে ও নিচের দিকে পা বাড়াল। শান্তিতে নাশতা করাটা এখন ওর জন্য বড্ড প্রয়োজন। সেই সাথে যদি ওই উপহারদাতাকে একবার পেত, সীমাহীন এক কৃতজ্ঞতা আজ প্রকাশ করত তার কাছে।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে হাত মুছতে মুছতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াল আশফি। সাদা শার্টের বোতামগুলো এঁটে গলায় বো টাই’টা পরে নিল নিখুঁতভাবে। এরপর বিছানার কাছে ফিরে এসে কালো টাক্সিডোটা গায়ে চড়াতে যাবে, ঠিক তখনই নজর পড়ল রহস্যময় সেই প্যাকেটটার দিকে।
​একটু আগেও তো এটা এখানে ছিল না! কে রেখে গেল? দিশান? ওর জন্য কিছু এনেছে না-কি? টাক্সিডো পরা শেষ করে কৌতূহল নিয়ে প্যাকেটটা হাতে তুলে নিল আশফি। মোড়কটা খুলতেই সবার আগে বেরিয়ে এল একটা চিরকুট। কিছু ভাবার আগেই লেখাগুলোর ওপর ওর চোখ আটকে গেল।
​“হেই ম্যান, সেদিনের কথাগুলো শুনে খুব অবিশ্বাস করেছিলে। তোমার রিয়্যাকশনটা স্বাভাবিক ছিল ঠিকই, কিন্তু তোমার ফ্যান হিসেবে এই সত্যগুলো পাঠানো আমার কর্তব্য মনে হলো। শুনে রাখো, তুমি যাকে ভালোবেসে জীবনসঙ্গিনী করছ, সে একটা খুনি আর চতুর গোল্ড ডিগিং স্লাট ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ছবিগুলোর একটা মুহূর্তও মিথ্যা নয়। সাহস থাকলে তোমার ভালোবাসার মানুষটার সামনে দাঁড়িয়েই এই ছবিগুলো নিয়ে প্রশ্ন করো। আমি নিশ্চিত, সে অস্বীকার করার মুখ পাবে না।”

চিরকুটটা পড়ার সাথে সাথেই আশফির চোয়াল রাগে শক্ত হয়ে উঠল। এরপরই তার নজর পড়ল ছবিগুলোর দিকে। কিন্তু বেশিক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকার ক্ষমতা যেন তার নেই। স্তম্ভিত হয়ে সে শুধু শেষ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
​সেখানে মারিশাকে চেনা দায়। কড়া মেকআপে ঢাকা ললনাটি লাস্যময়ী ভঙ্গিতে এক মধ্যবয়সী পুরুষের গা ঘেঁষে বসে মুচকি হাসছে। পরনের পোশাকটা তার উগ্র আর খোলামেলা। লোকটা মারিশার অনাবৃত কাঁধে ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছে, আর মারিশার অভিব্যক্তিতে তার পূর্ণ প্রশ্রয়। দৃশ্যটা দেখা মাত্রই আশফির বুকের ভেতরটা ভীষণভাবে হাঁসফাঁস করে উঠল। মনে হলো, পায়ের তলার জমিনটুকু বুঝি সরে যাচ্ছে। নিজের শরীরের ভার বইবার শক্তিটুকু হারিয়ে সে ধপ করে বিছানার ওপর বসে পড়ল।
স্তব্ধ হয়ে কতক্ষণ ওভাবেই বসে রইল আশফি। বুকের ভেতর বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের এক ভয়াবহ লড়াই চলছে। কিন্তু বেশিক্ষণ নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। স্থির করল, মারিশার মুখোমুখি দাঁড়িয়েই এই নোংরামির শেষ দেখবে সে।

​ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে ধীর পায়ে মারিশার দরজার সামনে এসে দাঁড়াল আশফি। কিন্তু ঠিক তখনই মনের ভেতরে একটা সংশয় ধাক্কা দিল। আজকের দিনটা ওদের জন্য কতটা বিশেষ! এই সুন্দর একটা দিনে এমন কদর্য ছবি নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি ঠিক হবে? সব আনন্দ তো মুহূর্তে বিষে বিষিয়ে যাবে। মারিশা কতটা কষ্ট পাবে, পুরো দিনটাই নষ্ট হবে। এত বছর পর আজ যখন ওরা নতুন করে শুরু করতে যাচ্ছে, তখন সে কী করে নিজের হাতে সবটা ভেঙে দেবে? তার চেয়ে বরং অন্য কোনো সুযোগে শান্তভাবে এ নিয়ে কথা বলা যাবে।
বুকটা ভার হয়ে এলেও ​নিজেকে বুঝিয়ে যখনই ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল আশফি, ঠিক তখনই ভেতর থেকে ভেসে এল মারিশার কান্নাভেজা কণ্ঠ। একটা বিস্ময়কর বাক্য ওর পা দুটোকে যেন মেঝেতে গেঁথে ফেলল।
​“ওর কাছে সবটা আড়াল রাখা মানে তো ওকে ঠকানো, আন্টি! আমি … আমি ওকে দিনের পর দিন ঠকিয়ে যাচ্ছি! আর পারছি না আমি।”

দরজাটা কেবল ভেজিয়ে রাখা! আশফি তখন বেরিয়ে যাওয়ার পর সেটা বন্ধ করতে ভুলেই গিয়েছিল মারিশা। তাই কথাগুলো বাইরে আসতে অসুবিধা হলো না।
অস্বাভাবিক এক ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল আশফি। আড়িপাতা তার স্বভাব নয়, কিন্তু আজ অবশ মস্তিষ্ক তাকে দিয়ে সেটাই করাল। নিঃশব্দে ভেজানো দরজাটা ঠেলে ভেতরে পা রাখল সে। মারিশা তখনো পেছন ফিরে বসে। ওর হাতে ধরা আইপ্যাড, যেখানে ভিডিয়ো কলে আইলিন সুলতানের অশ্রুসিক্ত মুখটা ভেসে উঠেছে।
​মারিশার কান্নার জবাবে অপর প্রান্ত থেকে আইলিনের ধরা গলা ফিরে এল, “সোনা, আমার কথাগুলো মন দিয়ে শোনো৷ একদম ভেঙে পড়বে না৷ শক্ত হও৷ আমি জানি এটা ঠকানো। কিন্তু কিছু সত্য আড়াল করলে যদি একটা সম্পর্ক বাঁচে, যদি দুটো মানুষ সুখী হয়, তবে সেই সত্য আড়ালে থাকাই ভালো। আর দোষ তো তোমার ছিল না। দোষ ছিল আমার। আমিই তোমাকে বুঝিয়েছিলাম, আশফি ওর বাবার মতোই বেইমান হবে৷ আমি ভেবেছিলামও তাই-ই৷ ভেবেছিলাম ওর বাবা আমাকে বিয়ের আশ্বাস দিয়েও যেভাবে মাঝপথে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কেবল তার বাবার এক ডাকে। সেভাবে একদিন আশফিও তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে, যখন ওর পরিবার তোমাকে মেনে নেবে না৷ কিন্তু আমার ভাবনা সেদিন তোমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া আমার কত বড়ো ভুল ছিল, যে ভুলের খেসারত চারটা বছর ধরে তোমাকে দিয়ে যেতে হয়েছে শুধু৷ আমার রাগ, আমার কষ্টের ভারটা আমি অন্যায়ভাবে তোমার ওপর চাপিয়ে দিয়েছি। এই অন্যায়ের ভার শুধু আমার। তোমার না, সোনা।”

বলতে বলতে ওপাশে থাকা ভদ্রমহিলাও কান্নায় ভেঙে পড়লেন। চোখ মুছে আবার বললেন, “আজকের দিনটা নষ্ট হতে দিয়ো না। ওকে কিছুই জানানোর দরকার নেই। আমি মন থেকে শুধু এই দোয়াই করি, যেন বাকি জীবনটা আশফির পাশে তুমি খুব সুখে কাটাও। তোমাকে আর কোনো কষ্টে দেখতে চাই না আমি।”
জবাবে মারিশা কিছুই বলতে পারল না। পরনে তার শুভ্র বধূবসন৷ এই গাউনটাতে ওকে এক টুকরো সাদা মেঘের মতো লাগলেও আশফিকে তা আজ বিন্দুমাত্র মুগ্ধ করতে পারল না। সে কেবল এক পাথুরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। চোখের পলক স্থির, চেহারায় কোনো অভিব্যক্তি নেই। সেই স্তব্ধতা নিয়েই সে ধীর পায়ে মারিশার দিকে দু পা এগিয়ে এল।
​কান্নারত মারিশা হঠাৎ মাথা নিচু করতেই আইপ্যাডের ওপাশ থেকে আইলিন সুলতানের চোখ আটকে গেল আশফির ওপর। ওর ওরকম হিমশীতল অবয়ব দেখে মুহূর্তেই থমকে গেলেন তিনি। অস্ফুট স্বরে কেবল একবার ডেকে উঠলেন, “আশফি…!”

​সেই ডাক শুনে মারিশা তড়িঘড়ি স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখল সেল্ফ ভিউতে তার পেছনে আশফির ছায়া। প্রচণ্ড এক আতঙ্কে ওর হৃৎপিণ্ড যেন থমকে গেল। সে এক ঝটকায় ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল আশফির দিকে৷ ওর দুচোখে তখন তীব্র আতঙ্ক।
কিন্তু মারিশার দিকে ফিরেও তাকাল না আশফি। অস্বাভাবিক এক ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল স্ক্রিনের একদম সামনে। তারপর এক অদ্ভুত ভারী আর নিরেট কণ্ঠে পরিষ্কার ইংরেজিতে আইলিনকে প্রশ্ন করল, “ও আমাকে ছেড়ে গিয়েছিল আপনার কথা শুনে? তার মানে ওসমান বারিশের অসুস্থতা, এজেন্সির চরম বিপদ, এ সবই মিথ্যে ছিল? রাইট?”
​আইলিন সুলতানের মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মারিশার আসন্ন পরিণতির কথা ভেবে একরাশ কান্না আছড়ে পড়ল তার কণ্ঠে। তিনি ধরা গলায় পরিস্থিতিগুলো বুঝিয়ে বলতে চাইলেন৷ কিন্তু আশফি কোনো ব্যাখ্যা শুনতেই চাইল না।। ওর চোখে তখন হৃদয় ভাঙার আর্তনাদ কিংবা বিশ্বাসঘাতকতার যন্ত্রণার চেয়েও বেশি পাথুরে কঠোরতা।
আইলিনের কথার মাঝপথেই সে তীক্ষ্ণ স্বরে গর্জে উঠল, “আনসার মি ইন ওয়ান ওয়ার্ড। ইয়েস অর নো!”
​আশফির সেই ধমকে কেঁপে উঠল মারিশা। এর আগে সে কখনো ওকে এমন রণমূর্তি ধারণ করতে দেখেনি। প্রচণ্ড ভয়ে ওর শরীরটা থরথর করে কাঁপছে, কান্নার চোটে গলা বুজে এসেছে। তবুও কম্পিত হাতে আশফির কবজি ছুঁয়ে খুব আর্তস্বরে ডাকল, “আশফি…?”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩৩

​আশফি তখস এমন এক রক্তিম দৃষ্টি নিক্ষেপ করল যে মারিশা শিউরে উঠে হাতটা সরিয়ে নিতে বাধ্য হলো। তারপর সে আবার আইলিনের দিকে ফিরে তাকিয়ে সেই একই কর্কশ সুরে হুকুম দিল, “আই সেড, গিভ মি আ ওয়ান-ওয়ার্ড আনসার!”
ওর ওই একরোখা আর কঠিন জেদ দেখে আর কথা বাড়ানোর সাহস পেলেন না আইলিন। এক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকে শুধু মাথা নেড়ে ধরা গলায় বললেন, “ইয়েস।”

বুনো মেঘের হাতছানি শেষ পর্ব