Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ১৫

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ১৫

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ১৫
ছায়া

লেকের পাড়ে হালকা বাতাস বইছে জলরাশির ওপরে ঝিকিমিকি করছে বিকেলের আলো। চারপাশে অদ্ভুত শান্ত একটা পরিবেশ কেবল মাঝে মাঝে কফি স্টলে কেটলির শব্দ আর দূরে কয়েকটা দম্পতির হাসি।
এক পাশে বেঞ্চে বসে আছে ইলা ও আর্কিন। দু’জনের হাতের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে চুপচাপ। কেউ কিছু বলছে না হাওয়ায় ইলার চুল আলগা হয়ে গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর্কিন একটু হেসে কাপটা নামিয়ে বলল,
আর্কিনঃ- তো বলুন মিস ইলা তালুকদার এখনো কি রাগ কমলো না আমার উপর থেকে?
ইলাঃ- রাগ না আমি কিছু বলতে চাই আপনাকে।
আর্কিনঃ- বলুন আমি শুনছি বিয়ের পরেও এমন মনোযোগ দিয়ে শুনবো ইনশাআল্লাহ।
ইলাঃ- আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই না।

আর্কিন চুপ হয়ে গেলো বাতাস কেমন জানি থেমে গেলো। দূরে এক কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। আর্কিন কাপটা নামিয়ে ইলার দিকে তাকালো তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, বরং অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
আর্কিনঃ- কারণ টা জানতে পারি আমার নামের খারাপ রিপোর্ট দেখেছেন কোনো?
ইলাঃ- না… তেমন কিছু না।
আর্কিনঃ- তাহলে কি আমার ইউনিফর্মে সমস্যা? না আমার জেদি হাসিটায়?
ইলা এবার মাথা তুলে তাকালো চোখে একটু ঝিলিক, কিন্তু ঠোঁট নিস্তব্ধ।
ইলাঃ- একটা সত্যি কথা বলতে চাই আপনাকে।
আর্কিনঃ- বলুন আমি শুনতে ভালোবাসি।

ইলা একটু নিঃশ্বাস ফেললো তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল ইলার জীবন কাহিনি
ইলাঃ- আমি কাউকে ভালোবাসি ওর নাম শাওন। কখনো দেখা হয়নি,শুধু ভয়েজ শুনে ভালোবেসে ফেলেছি। ওর প্রতিটা ভিডিও, প্রতিটা হাসি, প্রতিটা কথা আমি বুকের ভেতর জমিয়ে রেখেছিলাম। প্রতিদিন ঘুমানোর আগে তার ভিডিও দেখতাম, সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনতাম ওর ভয়েস।
জানেন একদিন ভেবেছিলাম ওকে না দেখেই যদি মারা যাই সমস্যা নেই। কারণ আমি জানবো আমি কারো প্রতি সত্যি কারের ভালোবাসা দেখিয়েছিলাম। ওর জন্য কাঁদতাম, হাসতাম, এমনকি আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম যেন ও সুখে থাকে। কিন্তু পরে জানতে পারলাম ওর জীবনে অন্য কেউ আছে…আমি যেন এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেলাম।
ইলার চোখে পানি চলে এসেছে আর্কিন চুপচাপ বসে শুনছে। তার চোখে এক অদ্ভুত আলো যেন হাসি আর করুণার মাঝামাঝি কিছু।

আর্কিনঃ- মানে ভয়েস শুনে ভালোবেসেছিলেন?
ইলাঃ- হ্যাঁ ওর মুখ দেখিনি কখনো, শুধু কণ্ঠ শুনেই মন হারিয়েছিলাম।
আর্কিনঃ- অবিশ্বাস্য… ভয়েসে প্রেম আজকাল মানুষ টাকার জন্য ভালোবাসে আর আপনি ভয়েজের মায়াজাল পড়ে গেছেন।
আপনি হয়তো বুঝতে পারেন না আপনি কতটা সৎ, আপনার মতো মানুষ বিরল মানুষ পাওয়া মুশকিল।
ইলাঃ- আপনি হাসছেন আমার কষ্টে।
আর্কিনঃ- না আমি অবাক হচ্ছি একটা মানুষকে না দেখে, না জেনে ভালোবাসা মানে কি জানেন? এক ধরনের আত্মার ভালোবাসা কিন্তু একটা কথা বলি?

ইলাঃ- জ্বি বলুন।
আর্কিনঃ- আপনি যাকে ভালোবেসেছেন সে যদি বিয়ের কথা লুকিয়ে রাখে?
ইলাঃ- মানে?
আর্কিনঃ- ডিফেন্সের ছেলেরা প্রায়ই এমন করে অনেকে বিবাহিত হয়েও বলে “আমি সিঙ্গেল।” হয়তো ওর জীবনেও এমন কিছু ছিল বা আছে।
ইলাঃ- না সে এমন না আপনি ওকে চেনেন না।
আর্কিনঃ- আমি তাকে চিনি না কিন্তু পৃথিবীটাকে চিনি।
ইলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে উঠে দাঁড়ালো চোখ লাল হয়ে গেছে।
ইলাঃ- আমি কিছু শুনতে চাই না আপনি এখন আমার পরিবারকে ফোন করে বলবেন আপনি আমাকে বিয়ে করবেন না। আমি চাই না আর কিছু এগোক।
আর্কিন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল যেন প্রতিটা শব্দ সে সংরক্ষণ করছে কোথাও।
আর্কিনঃ- আমি কি বলবো তাদের? যদি জিগ্যেস করে কেনো বিয়ে করবো না এটা বলবো যে ইলা এখনো একটা কণ্ঠের প্রতি অনুগত?

ইলাঃ- আপনি যা খুশি বলুন আমি শাওন ভুলবো না।
আর্কিনঃ- একটা সুন্দর মনের ভালোবাসায় একদিন আপনি ভুলবেন শুধু একবার বিশ্বাস করে হাত বাড়িয়ে দেখুন।
ইলা কিছু না বলে চলে যেতে লাগলো পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেলো কংক্রিটের ধারে। আর্কিন পেছন থেকে তাকিয়ে থাকলো চায়ের কাপের ধোঁয়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে নিজের মনে বলল,
আর্কিনঃ- রাগিনী ইলা তালুকদার তোমার চোখে এখনো শাওনের ছায়া আমি সেদিনি বুঝেছিলাম।
আকাশে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে লেকের জলে প্রতিফলিত হচ্ছে রঙিন আকাশ যেমন ইলার জীবনে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে নতুন এক ছায়া।
সন্ধ্যা নামছে আস্তে আস্তে তালুকদার বাড়ির উঠোনে হালকা বাতাস বইছে,আযানের সুর মিলিয়ে যাচ্ছে দূরের কোনো মসজিদ থেকে। ইলা ক্লান্ত মুখে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো হাতে ব্যাগ, চোখের নিচে ক্লান্তি। সাবিহা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে বলল,

সাবিহাঃ- এই ইলা এতক্ষণ কোথায় ছিলি? কলেজ শেষ হয়ে এত সময় লাগে বাড়ি আসতে?
ইলাঃ- (চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায়) আর্কিনের সাথে ছিলাম।
এক মুহূর্তে পুরো ঘরে নীরবতা নেমে এলো পরি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো, বড় মা আর মেঝো মা একে অন্যের মুখের দিকে তাকালো। সাবিহার মুখে হালকা বিস্ময়, তারপর এক অদ্ভুত হাসি।
সাবিহাঃ- তাই বল আর্কিনের সাথে ছিলি? বাহ তাইলে তো ভালো খবর আছে। আমি ভাবতেছিলাম তুই হয়তো এখনো মন খারাপ করে আছিস কিন্তু এখন বুঝতেছি আমার মেয়েটা বড় হইতেছে।
ইলা কোনো কথা না বলে সোজা নিজের রুমে চলে গেলো।রুমের দরজা বন্ধ করে দিলো জানালা খুলে দিলো, বাইরে আকাশে তখন হালকা অন্ধকার নেমেছে। বাতাসে কেমন এক ভারী নীরবতা। ইলা আয়নায় তাকালো নিজের মুখে কোনো হাসি নেই। ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,

ইলাঃ- “সবাই ভাবে আমি ঠিক আছি…কিন্তু আমি তো এখনো ঠিক হইনি।
রাত ৯ টা নাগাদ সবাই ডিনারের টেবিলে বসেছে রাশেদ তালুকদার, তার বড় ভাই, মেঝো ভাই সবাই আছে। খাওয়া শেষ হতে না হতেই রাশেদ গম্ভীর গলায় বলল,
রাশেদঃ- ইলা মা একটা কথা ছিলো আর্কিনের ব্যাপারে তোর কি মতামত?
ইলা চামচটা নামিয়ে রাখল এক মুহূর্ত নীরব তারপর নিচু গলায় বলল,
ইলাঃ- আমি বিয়ে করবো না আব্বু।
টেবিলের ওপর যেন মুহূর্তে একটা বজ্রপাত পড়লো সবাই অবাক কেউ কথা বলছে না। সাবিহা প্লেট সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো চোখ লাল।

সাবিহাঃ- আবার বল কি বললি তুই?
ইলাঃ- আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।
এরপর যা হলো তা কেউ ভাবেনি সাবিহা ইলার কাছে এসে ইলার গালে এক চড় বসিয়ে দিলো সবাই চমকে গেলো।
রাশেদঃ- সাবিহা থামো মেয়েটাকে…..
সাবিহাঃ- (রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে) তুমি চুপ থাকো রাশেদ।
এই তুই বিয়ে করবি না মানে কি? (আবার চড় মারে)
ইলাঃ- (চোখে পানি) আম্মু আমি…আমি এখন পারব না বিয়ে করতে…
কথা শেষ হওয়ার আগেই সাবিহা তার গালে আরো কয়েকটা চড় বসিয়ে দিলো।
সাবিহাঃ- তুই আমাদের জীবননের অভিশাপ তোর মতো মেয়েকে জন্ম দিয়ে আমি পাপ করেছি।তোর মাথায় কী ঢুকছে না বুঝি এই বাড়িতে কেউ না বলতে শেখেনি।

রাশেদ এগিয়ে এসে স্ত্রীর হাত থামাতে চাইলেও সাবিহা হাত ছুঁড়ে দূরে সরে গেলো।
রাশেদঃ- সাবিহা আমি বলছি থামো মেয়ে বড় হয়েছে, ওরও মতামত থাকতে পারে।
সাবিহাঃ- (রাগে কাঁপতে কাঁপতে) মতামত একটা মেয়ে বিয়েতে না বলবে এটাই তার মতামত? এই শিক্ষা দিয়েছি আমি ওকে? এই মেয়ে বল কোন ছেলের জন্য তুই এমন করছিস কে সেই ছেলে নাম বল।
ইলার চোখ দিয়ে পানি ঝরছে ঠোঁট কাঁপছে
ইলাঃ- আমি কাউকে ভালোবাসি না কিন্তু আমি এখন বিয়ের জন্য প্রস্তুত না।
কথা শেষ করার আগেই সাবিহা আবার চড় মারলো।
সাবিহাঃ- তুই মুখ বন্ধ রাখ নষ্ট মেয়ে ফোনের ছেলেদের সাথে ফসটি নস্টি করবি আর বিয়ের কথা বলল বলবি প্রস্তুত না।

করিম উদ্দিন তালুকদার রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে চিৎকার করল সবাই চুপ হয়ে গেলো
করিম উদ্দিনঃ- সাবিহা শান্ত হও এটা তোমার মেয়ে, পাড়ার মানুষ না যে এমন করবে এভাবে নিজের মেয়েকে মারে?
সাবিহা চুপচাপ পেছনে সরে গেলো কিন্তু রাগে নিশ্বাস ফেলছে দ্রুত দ্রুত। ইলা কোনো উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়ালো চোখের পানি মুছলো না।
ইলাঃ- আমি কারো ইজ্জত নষ্ট করিনি আমি শুধু নিজের মতো একটু সময় চেয়েছি আর এই বাড়িতে মনে হয় সেটা চাওয়া পাপ।

সবাই চুপ হয়ে যায়, ইলা ধীরে ধীরে রুমে চলে গেলো দরজা বন্ধ করে দিলো।ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শোনা গেলো রাশেদ তালুকদার চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইলেন। করিম উদ্দিন তালুকদার হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
করিম উদ্দিনঃ- মেয়েটা শুধু নিজের কথা বলেছে আমাদের তার কথা বুঝা উচিত।
বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে ইলা জানালার পাশে বসে আছে, চোখে পানি, হাতে ফোন। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখছে শাওনের পুরনো ডাউনলোড করা ভিডিও ইলার চোখ বেয়ে টুপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো স্ক্রিনের ওপর।
ইলাঃ-আমি এখন ভুলে গেছি কিভাবে হাসতে হয়…
রাতের কান্না শেষে সকালটা এসেছে অদ্ভুত নীরবতায় তালুকদার বাড়ির বারান্দায় সূর্যের আলো ঢুকেছে, পাখির ডাক ভেসে আসছে দূর থেকে। ইলার চোখে লালচে দাগ, কিন্তু মুখ শান্ত।রাশেদ তালুকদার ধীরে ধীরে মেয়ের রুমের দিকে এগোলেন। দরজায় হালকা টোকা দিয়ে ইলাকে ডাকলেন
রাশেদঃ- ইলা মা ভেতরে আসতে পারি?
ইলা বইয়ের পাতায় চোখ রেখেছিলো তবুও গলা ভারী হয়ে বলল,

ইলাঃ- আসো আব্বু
রাশেদ ভেতরে ঢুকে চেয়ারে বসলেন কিছুক্ষণ চুপ করে ইলার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নরম গলায় বললেন
রাশেদঃ- একটা কথা জিগ্যেস করবো ইলা মা… মন খুলে বলবি।
ইলাঃ- বলো আব্বু।
রাশেদঃ- তুই কি কাউকে ভালোবাসিস?
ইলা চুপ জানালা দিয়ে আলো এসে পড়েছে তার মুখে তারপর শান্ত গলায় বলল,
ইলাঃ- না আব্বু আমি কাউকে ভালোবাসি না,আমি শুধু এখন বিয়ে করতে চাই না আমি পড়াশোনা করতে চাই। অন্তত আমার HSC পরীক্ষাটা যেন দিতে পারি তারপর যা খুশি করো আমি আর কিছু বলবো না।
রাশেদ কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন চোখে গভীর চিন্তা। তিনি হালকা মাথা নেড়ে বললেন,
রাশেদঃ- ঠিক আছে মা চল আমার সঙ্গে চল।

ইলা অবাক হলো তবুও চুপচাপ বাবার পেছনে হাঁটতে লাগলো দুজন সোজা গেলেন ড্রইংরুমে। সেখানে তখন সবাই বসে আছে সাবিহা, পরি, বড় মা, মেঝো মা আর ইলার বড় বাবা, মেঝো বাবা চায়ের কাপ, সকালের আলো, তবুও ঘরে যেন আগুনের গন্ধ। রাশেদ চেয়ার টেনে বসলেন কণ্ঠ দৃঢ় করে বললেন,
রাশেদঃ- শুনো সবাই আজ আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
আজ থেকে এ বাড়িতে কেউ ইলার বিয়ে নিয়ে আর কোনো কথা বলবে না।
সাবিহাঃ- মানে কি, তুমি কি এখন ওর কথা শুনে বিয়েটা ক্যান্সেল করে করে দিবে। এত ভালো প্রস্তাব টা।
রাশেদঃ- আমি জানি আমি কি বলছি সাবিহা মেয়েটা পড়াশোনা করতে চায় ও পারবে আমি জানি।আমরা এতদিন যা করেছি সব সময় নিজের মতো করে ভেবেছি। এবার ওর কথাটাও শুনবো।
সাবিহাঃ- বিয়ের পড়ে কি পড়াশুনা করা যায় না।
রাশেদঃ- তোমাকে এই সব চিন্তা করতে হবে না আমার মেয়ে আমার বোঝা না। আজ থেকে ইলা মা যেভাবে চাইবে সে ভাবেই চলবে।
সবাই চুপ হয়ে গেলো ইলা স্তব্ধ দাঁড়িয়ে আছে তার চোখ ভিজে উঠলো অজান্তেই। রাশেদ এবার ইলার দিকে তাকালেন

রাশেদঃ- কিন্তু ইলা মা একটা শর্ত আছে তুমি যেহেতু পড়তে চাও তাহলে এখন থেকে তুমি পড়বে কিন্তু কোনো প্রকার ফোন ব্যবহার করতে পারবে না। তোমার ফোনের কোনো প্রয়োজন নেই। বই, ক্লাস, আর তোমার স্বপ্ন এই হোক তোমার জগৎ আজ থেকে।
ইলা চুপ করে বাবার চোখে তাকালো তারপর ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
ইলাঃ- ঠিক আছে আব্বু আমি রাজি।
রাশেদ হালকা হাসলেন কিন্তু সেই হাসিটা ছিলো গম্ভীর ও ভারি।ইলা আর কিছু না বলে চলে গেলো সেখান থেকে। সাবিহা পাশে বসে রাগে চুপচাপ চোখ ফিরিয়ে নিলো।
রাশেদ শান্তভাবে বললেন,

রাশেদঃ- সাবিহা তুমি বলেছিলে ইলার কারো সঙ্গে সম্পর্ক আছে।আমি ওকে নিজের মুখে জিগ্যেস করেছি।ও না বলেছে আমি আমার মেয়ের ওপর বিশ্বাস রাখি তবুও তোমার কথা ভুল প্রমান করার জন্য আমি ফোনটা নিয়ে নিলাম এখন দেখা যাক ও নিজের জীবনটা কিভাবে সাজায়।
সাবিহা কিছু না বলে মাথা নিচু করে রইলো রাগে ঠোঁট কামড়াচ্ছে চোখ লাল হয়ে উঠছে।রাশেদ উঠে দাঁড়ালেন তার পর ফোনটা হাতে নিয়ে আর্কিনের বাবাকে কল দিলেন।
রাশেদঃ- আসালামু আলাইকুম ভাই আমি রাশেদ তালুকদার বলছি।একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।
মাহফুজঃ- ওয়ালাইকুম সালাম ভাই বলেন। আপনাদের ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম।
রাশেদঃ- আমার মেয়ে এখন পড়াশোনার দিকে মন দিতে চায়, তাই আমরা আপাতত বিয়েটা আর আগাতে চাই না। আশা করি বিষয়টা বুঝবেন।
ওপাশ থেকে কিছু কথা শোনা গেলো, রাশেদ শান্তভাবে “জাজাকাল্লাহ” বলে কলটা কেটে দিলেন। ফোন নামিয়ে রেখে ধীরে ধীরে বললেন,

রাশেদঃ- এখন থেকে কেউ আর ইলার জীবনে বিয়ের চাপ দিবে না।
ঘরে চুপচাপ নীরবতা ইলা বাবার পায়ের কাছে এসে বসলো চোখে পানি জমে উঠেছে।রাশেদ ইলার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন
রাশেদঃ- তোর বাবা থাকতে আর তোর কোনো ভয় নেই মা।
ইলাঃ- আব্বু এভাবেই আমার মাথার উপরে বট গাছের মত ছায়া হয়ে থেকো।
রাশেদঃ- মেয়েরা যে শুধু সংসারের জন্য জন্মায় না নিজের স্বপ্নের জন্যও জন্মায় এখন সেটা তুই প্রমাণ করবি ইলা মা।
ইলার চোখে ঝিলমিল করছে পানি আর দৃঢ়তা দুটই।
বাইরে তখন বিকেলের আলো ফিকে হয়ে আসছে, আকাশে হালকা মেঘ। পরি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে।মনে মনে বলছে
পরিঃ- ইলা তুই আজ সত্যি বড় হইছিস।
ইলাঃ- এখন আমি শুধু নিজের জন্য বাঁচবো নিজের স্বপ্নের জন্য।
তার ফোনটা টেবিলে রেখে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।বাইরে হালকা বাতাস, আকাশে মেঘ, আর ভেতরে এক নতুন যাত্রার শুরু। সেই সময় একটা মেসেজ আসলো, ইলা ফোন হাতে নিয়ে দেখলো আর্কিন মেসেজ দিয়েছে।
আর্কিন এর মেসেজঃ-

আমার রাগিনি,
আমি দোয়া করি আপনি আপনার মায়াবিপুরুকে পান। আর আপনার সব ইচ্ছা যেনো পূরণ হয়। তবে আমি আপনার বিয়ের আগে পপর্যন্ত আপনার জন্য অপেক্ষা করবো। একটা রিকুয়েষ্ট আপনি যদি শাওনকে না বিয়ে করেন তাহলে সেই জায়গায় টা আমার জন্য রেখে দিয়েন। আপনার অপেক্ষায় থাকবো।
ভালো থাকবেন/আল্লাহ হাফেজ
আর্কিন🥀🙂
ইলা মেসেজটা পড়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলল তারপরে নিজের মনে বলল আমিও আজ লাস্ট একটা মেসেজ দিবো শাওন কে এর পর তো আর কোনোদিন বিরক্ত করবো না।আমি জানি এই মেসেজটার কোনো মানে নেই। তবুও আমি আমার আবেগ গুলো শেয়ার করবো।
সন্ধার পরে ইলা ফোন নিয়ে বসলো একটা নতুন জিমেল খুলে নতুন একাউন্ট খুললো তার পরে শাওনের প্রফাইলে ডুকে মেসেজ টাইপ করা শুরু করলো।

ইলার মেসেজঃ
ডিয়ার ভয়েজ কিং,
আপনি হয়তো এটা পড়েও হাসবেন হয়তো বলবেন “এই মেয়েটা পাগল” কিন্তু তারপরও লিখছি। কারণ আজ আমার শেষ দিন আপনাকে কিছু বলা,আপনাকে বিরক্ত করার।
আপনি জানেন ভয়েজ কিং আমি প্রথম দিন আপনার ভিডিও দেখেছিলাম একেবারেই অচেনা এক মানুষ হিসেবে। যিনি শুধু কণ্ঠে, চেহারায় নয়, নিজের ভেতরের গভীর দুঃখেও আলাদা ছিলেন। আমি জানি না কেন কিন্তু সেই দিন থেকেই একটা অদ্ভুত টান কাজ করেছিল। আপনি ছিলেন আমার কাছে এক অদ্ভুত রহস্য এক অসম্পূর্ণ গল্প। ধীরে ধীরে আমি আপনার হাসির মানে বুঝতে শিখেছি, আপনার রাগের পেছনের কষ্ট চিনেছি। আর ঠিক সেখান থেকেই আমার অনুভূতি জন্ম নেয় নিঃশব্দে, নির্লোভভাবে।
আমি কখনোই চাইনি আপনাকে বিরক্ত করতে শুধু চেয়েছিলাম আপনার একটুখানি সময়, একটুখানি মনোযোগ, একটুখানি হাসি দেখতে। আপনি যখন মেসেজ রিপ্লাই দিতেন না আমি ভেবেছি হয়তো ব্যস্ত আছেন। আপনি যখন রাগে উত্তর দিতেন তখন আমি নিজেকে দোষ দিয়েছি“হয়তো বেশি বলেছি” আর আপনি যখন মজার মজার ভিডিও আপলোড দিতেন তখন আমি হাসতাম।

আমি আপনার একটা নাম দিয়েছি Angry Man কারণ আপনি যে কোনো সময় রেগে যান আমার উপরে।জানেন আমি আপনাকে কখনো আমার জীবনের দাবি করতে চাইনি।
শুধু চেয়েছিলাম আপনি জানুন কোথাও এক কোণে, এক ছোট্ট মেয়েটা আছে যে আপনাকে চুপিচুপি ভালোবাসে,যে আপনার প্রতিটা ভিডিওর শব্দে নিজেকে হারিয়ে ফেলে,
যে আপনার হাসির ভেতরে নিজের পৃথিবী খুঁজে নেয়।
আমি জানি আপনি এগিয়ে গেছেন আপনার জীবনে হয়তো কেউ আছে আপনার সেই “মায়াবতী” আমি আজ জানি, তিনি আপনার অতীত আপনার ভালোবাসা। আপনার চোখের আপনি ওকে হারিয়ে কষ্টে বাঁচেন। আর আমি বুঝেছি আমার জায়গা সেখানে নেই। আমি শুধু ছিলাম একটা অচেনা নাম একটুখানি মনোযোগ পাওয়ার জন্য লড়াই করা এক বোকা মেয়ে।

আপনি জানেন আমি কাঁদতে পারি না কারও সামনে। কিন্তু আজ লিখতে লিখতে চোখে পানি আসছে,হাত কাঁপছে, বুকটা ভার হয়ে গেছে। কিন্তু তারপরও এই মেসেজের শেষে একটা কথা বলতে চাই
“আমি আপনাকে ভালোবাসি”
একটা পবিত্র, নিরব, অসমাপ্ত ভালোবাসা যার কোনো দাবি নেই,কোনো প্রতিদান নেই, কোনো অভিযোগ নেই। আপনি যেমন আছেন ঠিক তেমনই ভালো থাকুন।আপনার হাসিটা যেন হারিয়ে না যায়।আপনার রাগ যেন আপনাকে গ্রাস না করে, আর আপনার ভেতরের কষ্টটা যেন কোনো একদিন সত্যিকারের ভালোবাসায় মুছে যায়।
আজকের পর থেকে আমি আর থাকবো না না অনলাইনে, না আপনার কমেন্টে না কোনো ইনবক্সে। আজকের পর থেকে আপনি শান্তিতে থাকতে পারবেন আমি কথা দিচ্ছি। আমি আর কখনো আপনাকে জ্বালাবো না।
শুধু একটা জিনিস রেখে যাচ্ছি আমার দোয়া, যেন আপনি সব সময় হাসেন, সফল হন, ভালো থাকেন। আর যদি কোনোদিন হঠাৎ মনে পড়ে যায় “ইলা” নামের মেয়েটার কথা তাহলে মনে করবেন সে একসময় আপনাকে সত্যি সত্যি ভালোবেসেছিল কোনো স্বার্থ ছাড়াই।
এক নামহীন আপনার জন্য পাগল যাকে আপনি কোনো দিন বুঝেনি।

The End
ইলা তালুকদার
মেসেজটা লিখে ইলা চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে থাকলো আঙুলগুলো কাঁপছে চোখের পানি স্ক্রিনে পড়ছে শেষ লাইনটা পড়েই “Send” চাপলো। এরপর নিঃশব্দে ফোনের সব আইডি ডিলিট করে দিলো এক এক করে ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, টিকটক সব মুছে ফেললো। একবার শাওনের সব ছবি গুলো দেখে নিলো সেগুলো ইলা কালেক্ট করেছিলো সব জায়গা থেকে ডিলিট করে তারপরে ফোন টা রিসেট মেরে দিলো।
শেষে মোবাইলটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো তারপর নিঃশব্দে গিয়ে তার বাবার টেবিলের ওপর রেখে দিলো ফোনটা।

ইলাঃ- আব্বু যে আমার ফোন তোমাকে দিয়ে দিলাম।
ফোন দিয়ে ইলা চলে আসলো নিজের রুমে চুপচাপ এসে জানালার পাশে দাঁড়ালো ইলা। বাইরে চাঁদের আলো কিন্তু ভেতরে শুধু অন্ধকার। আজ সত্যিই শেষ হলো একটা অধ্যায় “ইলার ভালোবাসার শেষ মেসেজ”
ইলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ১৪

~হয়তো আপনি আমার থেকে দূরে অন্য শহর, অন্য ঠিকানা কিন্তু আমরা একি আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছি একই চাঁদ দেখছি দুজনি। আজ এই চাঁদ আমার বার্তা নিয়ে যাবে আপনার কাছে মনে রাখবেন ” ভালোবাসা কখনো থামে না, শুধু দূরত্ব বাড়ে যায়”~

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ১৬