ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩১
ছায়া
ইলা ফজরের নামাজ শেষ করে সেই শান্তভাবে জানালার পাশে বসে আছে কখন বেলা হয়েছে সেটার খেয়াল নেই। দূরের গাছের পাতাগুলো দুলছে কিন্তু তার মনে কোনো নড়াচড়া নেই। চোখের নিচে কালো দাগ ঠোঁটে শুকনো ফাটল মাথায় ঘোমটা যদিও আজ আর বিয়ের সাজ নেই কেবল একটা সাদা সালোয়ার কামিজে ঢাকা এক নিঃশব্দ ক্লান্ত মুখ দরজায় হালকা টোকা পড়ল হালিমা ঢুকে বলল,
হালিমাঃ- ইলা নাস্তা রেডি নিচে সবাই বসেছে।
ইলা ধীরে ধীরে উঠল আয়নায় নিজের দিকে শেষবার তাকালো মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই শুধু নিঃশব্দ একটা শূন্যতা। হালিমা আরিয়ান কেও ডেকে নিচে চলে গেলো।
ডাইনিং টেবিলে বসে আছে সবাই কিন্তু
নিঃশব্দ কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে কিন্তু পরিবেশে ঠান্ডা জমে আছে। মেহেরাব খান গম্ভীর গলায় বললেন,
মেহেরাবঃ- বিয়েটা হয়ে গেছে এখন আর কষ্ট করে লাভ নেই ওদের সামনে অনেক পথ। আমি চাই সবাই বিয়েটা মেনে নিয়ে ওদের জন্য দোয়া করুক।
রাশেদ চুপচাপ মাথা নেড়ে বললেন,
রাশেদঃ- হ্যাঁ ভাই আল্লাহ ওদের ভালো রাখুক। তাদের চোখে অদ্ভুত এক বেদনা।
আরিয়ান একবারও ইলার দিকে তাকায়নি চা নেড়ে চেড়ে নিচু স্বরে বলল,
আরিয়ানঃ- আব্বু আজ আমাদের ফিরতে হবে।
সবাই থমকে গেল মেহেরাব খান ভুরু কুঁচকে তাকালেন রাশেদ তালুকদার, সাবিহা সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
সাবিহাঃ- আজই কেনো আর কয়টা দিন থেকে যাও এখন বিয়ের পরের দিন সবাই এমনি অনেক ক্লান্ত সবাই কিছুটা বিশ্রাম নিক।
আরিয়ান ঠান্ডা গলায় বলল,
আরিয়ানঃ- না সময় নষ্ট করে লাভ নেই আমার এখানে দম বন্ধ হয়ে আসছে। আজ রাতের ট্রেনে ফিরে যাবো।
এই প্রথম ইলা মুখ তুলল চোখে এক মুহূর্তের জন্য ভয় আর কষ্ট ঝলকে উঠল ও কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেলো রাশেদ তালুকদার ভারী কণ্ঠে বললেন,
রাশেদঃ- বাবা অন্তত আজকের দিনটা থেকে যাও না মেয়েটা তো আমার…..
আরিয়ান রাশেদ তালুকদার এর দিকে তাকো কড়া গলায় বলল,
আরিয়ানঃ- না আজ রাতেই ফিরতে হবে।
তারপর একটু থেমে একরকম জোর করে স্বাভাবিক গলায় বলল,
আরিয়ানঃ- চিন্তা করবেন না ইলাকে ওর হোস্টেলে নিয়ে রেখে আসবো আমি।
ঘরটা এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেলো চায়ের কাপের টুং শব্দটাও ভারী লাগছে।সাবিহা বেগম হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে ফেললেন চোখে জমে থাকা জল লুকাতে পারলেন না।
সাবিহাঃ- বাবা বিয়েটা যেভাবেই হোক কিন্তু তুমি আমার মেয়েকে মেনে না নিয়ে হোস্টেলে রেখে আসবা এটা কেমন কথা।
রাশেদ ধীরে ধীরে বললেন,
রাশেদঃ- তুমি ওরে নিয়ে যাও বাবা তোমাদের বাড়ি কিন্তু খেয়াল রাখো। মেয়েটা এখন অনেক ভেঙে গেছে একা কিছু বুঝতে পারবে না।
আরিয়ান মাথা নিচু করে বলল,
আরিয়ানঃ- জি আমি ওর খেয়াল রাখবো। আমি অকে অবশ্যই বাড়ি নেয়ে যাবো কিন্তু কিছু দিন পড়ে এখন আমার একটা কাজ আছে। হুট করে আব্বু আম্মুর সাথে নতুন বউ গেলে গ্রামের লোকজন অনেক কথা বলবে সেটা আমি চাই না।
কিন্তু সেই কণ্ঠে ছিলো না কোনো উষ্ণতা ছিলো শুধু দায়িত্বের ভার।ইলা চুপচাপ নিজের নাস্তার প্লেটটা সরিয়ে রাখলো।চোখের কোণ ভিজে গেছে কিন্তু সে চুপ।ওর মনে একটাই শব্দ বাজছে “আজই এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি”
মেহেরাবঃ- তুই কোথায় যাবি যা আমি আমার ছেলের বউকে কোনো হোস্টেলে নিয়ে যাবো না। আমি বাড়ি নিয়ে যাবো তোর যেদিকে মন চায় তুই যেতে পারিস।
রাশেদঃ- রায়েদ তুই তাহলে রাতের টিকেট কেটে নিয়ে আসিস যেহেতু জামাইর কাজ পরে গেছে।
রায়েদঃ- ঠিক আছে চাচ্চু আমি একটু পরে গিয়ে টিকেট নিয়ে আসবো।
সবাই খাবার শেষ করলো সবাই চুপ কারো মুখে কোনো কথা নেই। হালিমাও আজ চলে যাবে রংপুর এ ঐখানে কিছু দিন থেকে তার পরে ঢাকায় ব্যাক করবে।
দুপুর ১ টা ইলা নিজের ঘরে বসে ছোট একটা ব্যাগ গুছাচ্ছে হালিমা এসে পাশে বসে কাঁপা গলায় বলল,
হালিমাঃ- তুই সত্যি চলে যাচ্ছিস শশুর বাড়ি
ইলা নিচু স্বরে বলল,
ইলাঃ- হ্যাঁ আমি তো এত দিন এ বাড়ির বোঝা হয়ে ছিলাম এখন থেকে এ বাড়িতে অতিথি হয়ে আসবো হয়তো এখন সবাক খুশি।
পরি দরজায় এসে চুপচাপ দাঁড়ালো তার চোখে কান্না, মুখে কোনো শব্দ নেই শেষে মৃদু স্বরে বলল,
পরিঃ- এ সব কি বলছিস ইলা তুই কেনো বোঝা হবি সবাই ভুল বুঝেছে তাই এমনটা করেছে। তুই দেখিস একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
ইলা ওদের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসার চেষ্টা করল,
ইলাঃ- তোমরা দুইজন আমার এখন ভরসা তোমরা দুইজন ছাড়া আমার আর কেউ নেই।
হালিমাঃ- তুই তো চলে যাবি তাই আমিও এখন বের হবো। আবার দুইটায় বাস আমিও বাসায় চলে যাচ্ছি।
হালিমা ইলা পরি তিনজন তিনজনকে জরিয়ে ধরলো কেউ জানে না কার সাথে কবে আবার দেখা হবে। তিনজন এর চোখে জল হালিমা উঠে বের হলো পরি আর ইলা পিছন পিছন।
হালিমা তালুকদার বাড়ির সবার থেকে বিদায় নিলো যাওয়ার সময় রায়েদ কে খুজলো মনে মনে কিন্তু পেলো না।হালিমা বের হয়ে আসলো মেইন গেটে গাড়ি তে উঠে সবাইলে সালাম দিলে দিলো।হালিমা গাড়িতে বসে ফোন দেখছে।ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে হঠাৎ গাড়ি ব্রেক করলো হালিমা চমকে ড্রাইভারের দিকে তাকালো দেখে রায়েদ বসে আছে। হালিমা ভয় পেয়ে বলল
হালিমাঃ- আপনি এখানে কিভাবে ড্রাইভার কোথায়?
রায়েদঃ- চাচা চাচির সাথে দেখা করতে গেছে তাই আমি ডিউটি করতেছি।
হালিমাঃ- ভন্ডামি করবেন না কেনো এসেছেন সেটা বলুন।
রায়েদঃ- আরে মেরি মা চাচ্চু বললো না টিকিট কাটতে তাই এসেছি।
হালিমাঃ- ও আচ্ছা তো গাড়ি থামালেন কেনো?
রায়েদঃ- আমার ফুসকা খেয়ে মন চাইলো তাই।
হালিমা জানালা দিয়ে দেখে একটা ফুসকার দোকান, হালিমার ফেবারিট খাবার হলো ফুসকা কিন্তু এখন রায়েদ এর সামনে নিজের ইমোশন কন্ট্রোল করছে।
রায়েদ গাড়ি থেকে নেমে গেট খুলে দিলো হালিমা চুপচাপ আছে রায়েদ ও দাড়িয়ে আছে।
হালিমাঃ- আপনি তাড়াতাড়ি খেয়ে আসুন আমার লেট হয়ে যাচ্ছে।
রায়েদঃ- আপনিও সাথে চলুন এটা আপনার ট্রিট আমাকে লবণ চা খাওনোর জন্য।
হালিমা আর কিছু না বলে রায়েদ এর সাথে ফুসকা খেলো তারপরে রায়েদ হালিমার থেকে পারমিশন নিয়ে দুইটা ছবি তুলে নিলো।
রায়েদঃ- আমি সামনের সপ্তাহে চলে যাবো, আর হয়তো আপনার সাথে দেখা হবে না।
হালিমাঃ- এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন?
রায়েদঃ- আমি তো থাকতে চাই কিন্তু নিয়তি আমাকে বেধে রেখেছে।
হালিমাঃ- মানে বুঝলাম না।
রায়েদঃ- কিছু না চলুন আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
রায়েদ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বাস টার্মিনালে নিয়ে গিয়ে বাসে উঠিয়ে দিলো।বাস ৩০ মিনিট পড়ে ছাড়বে তাই হালিমা রায়েদ কে চলে যেতে বলে। রায়েদ দেখে বাসে মেয়ে মানুষ অনেক কম বেশির ভাগ ছেলে। তাই রায়েদ চুপচাপ বসে থাকে।একটু পরে কন্ডাক্টর কে ডেকে হালিমার পাশের সিটের ও টিকিট কেটে দেয়। একটু পরে গাড়ি ছারবে সেই সময় রায়েদ বিদায় নিয়ে নিচে নেমে গেলো।
রায়েদঃ- ভালো থাকবেন আর আমার কথায় কষ্ট পেয়ে থাকলে সরি।আর সেদিনের রাতের কথা গুলো মজা ছিলো।
হালিমা কিছু বলল না বাস ছেরে দিলো রায়েদ বাসের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।বাস চলে যাওয়ার পরে গাড়ি ঘুড়িয়ে দিনাজপুর রেল স্টেশনে গিয়ে ৬ টা টিকেট কেটে নিলো।
Time….skip….
বিকেলটা নরম আলোয় ঝলমল করছে আকাশের কোণে হালকা লালচে আভা।বাড়ির ভেতরে নীরবতা শুধু ঘড়ির কাঁটার শব্দটা স্পষ্ট শোনা যায়।আরিয়ান সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে চোখ ফোনের স্ক্রিনে অচেনা দৃষ্টিতে কিছু স্ক্রোল করছে যেন মন নেই কোনো কিছুর দিকেই।কালো রঙের সাদামাটা শার্ট,উপরের বোতাম খোলা,চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।কিন্তু তবুও সেই চেহারায় এমন এক আকর্ষণ, যেন রাগের ভেতরেও একরকম শান্ত সৌন্দর্য আছে।
ইলা ঘর থেকে বেরিয়ে এল হালকা নীল রঙের কামিজ,মাথায় ওড়না,চোখের নিচে কালি। ইলার বেড়িয়ে যাচ্ছিলো হঠাৎ বের হওয়ার সময় সাবিহা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
সাবিহাঃ- ইলা কোথায় যাচ্ছিস?
ইলা মৃদু স্বরে বলল,
ইলাঃ- নদীর ধারে যাচ্ছি বাবলাদের সাথে লাস্টবার দেখা করতে।
সাবিহা একটু ভেবে বললেন,
সাবিহাঃ- আরিয়ানকে সাথে নিয়ে যা।
ইলা এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল তারপর ধীরে ধীরে আরিয়ানের দিকে গেলো।আরিয়ান তখনো ফোন হাতে বসে আছে ইলা বলল,
ইলাঃ- আপনি কি যেতে ইচ্ছুক আমার সাথে নদীতে?
এক মুহূর্তের নীরবতা তারপর আরিয়ান ফোন টা পকেটে রেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। শরীরটা সোজা কিন্তু মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই কালো শার্ট, জিন্স, ঘড়ির চকচকে স্টিল ব্রেসলেটের ঝলক,আর চোখের গভীরে যেন জমে থাকা কোনো ঝড়।সে কিছু না বলে ইলার পিছু পিছু হাঁটতে লাগলো।
সূর্যের আলো পানিতে ঝিকমিক করছে বাতাসে পাটগাছের গন্ধ,পাশে দুলছে কচুরি পানার ফুল।দূর থেকে এক ঝাঁক ছোট ছোট বাচ্চা চেঁচিয়ে দৌড়ে আসছে “ইলা আপু…ইলা আপু” ইলাকে ঘিরে ধরলো ২০-২৫ টা বাচ্চা তাদের মুখে সরল উচ্ছ্বাস চোখে মায়া বাবলা বলল,
বাবলাঃ- ইলা আপু শুনেছি তোমার কাল বিয়া হইছে তোমার জামাই নাকি অনেক সুন্দর গ্রামের লোকজন বলা বলি করতিছে।
ইলা লজ্জা পেয়ে নিচে তাকালো আর ঠিক তখনই বাচ্চারা হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।তাদের চোখ পড়লো পিছনের দিকে।আরিয়ান শান্ত ভাবে ইলার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সূর্যের আলোয় তার মুখে ঝলক,গম্ভীর চোখে বাচ্চারা একসাথে বলল
“এটা কি তোমার জামাই”??
ইলা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল আরিয়ান হালকা হাসল সম্মানের ভঙ্গিতে বলল,
আরিয়ানঃ- তোমরা সবাই কেমন আছো?
সব বাচ্চা একসাথে হাত তুলে সালাম দিলো “আসসালামু আলাইকুম দুলাভাই” আরিয়ান মিষ্টি হেসে বলল,
আরিয়ানঃ- ওয়ালাইকুম সালাম ছোট্ট “সেনাবাহিনীরা” কেমন আছো সবাই?
তার কণ্ঠে এমন এক কোমলতা ছিলো যা সবাইকে থমকে দিলো।সবাই এক সাথে বলল “আলহামদুলিল্লাহ ” আমরা সবাই অনেক ভালো আছি দুলাভাই। আরিয়ান তাদের থেকে দুলাভাই ডাক শুনে হেসে দিলো তারপর বলল,
আরিয়ানঃ- তোমরা দাড়াও আমি পাঁচ মিনিটে আসছি।
আরিয়ান দ্রুত হেটে একটা দোকানে চলে গেল বাবলা তখন বলল,
বাবলাঃ- আজ খেলবা না আপু? আজ তো তোমার বর আছে সাথে।
ইলা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল,
ইলাঃ- না রে বাবলা আজ খেলবো না। আজ তো আমি শ্বশুরবাড়ি চলে যাবো… তাই তোদের সাথে দেখা করতে আসলাম।
ইলার কণ্ঠ কাঁপছে চোখে পানি জমে গেছে। ওর কান্না দেখে বাচ্চারাও চোখ মুছে ফেলছে মামুনি বলে উঠল,
মামুনিঃ- তুমি গেলে আমাদের কে ভালোবাসবে আপু? আমাদের সাথে কে খেলবে?
ইলা ওদের জড়িয়ে ধরে বলল,
ইলাঃ-তোরা আমার অনেক আদরের রে আমি দূরে থাকলে ও তোদের মনে রাখবো।
সবাই ইলাকে জরিয়ে ধরে কান্না করা শুরু করে দিলো বাচ্চারা দেখে বলল” দুলাভাই আসছে….. দুলাভাই আসছে” সবাই ঘুরে তাকালো আরিয়ান ফিরে আসছে নদীর পথ ধরে।তার হাতে এক গোছা চিপস চকলেট তার গলায় চিপসের মালা।
ছোট ছোট প্যাকেট জোড়া দিয়ে বানানো একদম হাস্যকর অথচ আদুরে মালা যেটা পরে সে যেন এক মুহূর্তে বদলে গেল গম্ভীর মানুষটা হঠাৎই হয়ে গেলো এক নরম মিষ্টি হাসির চরিত্র।
বাচ্চারা হেসে দৌড়ে গেলো নদীর পাশের পুকুরের দিকে। ওরা সেখানে কচুরিপানার ফুল ছিঁড়ে আনল গন্ধে মাটির ছোঁয়া।ফুল নিয়ে এসে সবাই এসে আরিয়ান কে ঘিরে ধরলো একেকজন ফুল বাড়িয়ে বলল,
“দুলাভাই আপনি আমাদের ইলা ফুলকে কখোনো কষ্ট দিবেন না”
শব্দটা যেন বাতাসে ঝুলে রইল “ইলা ফুল…” সব বাচ্চার চোখে জল। আরিয়ান তাকিয়ে রইলো সেই দৃশ্যের দিকে কচুরিপানার ফুল, ইলার ভেজা চোখ,আর নির্দোষ ভালোবাসার সেই দৃশ্য।
ধীরে ধীরে আরিয়ান হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ওদের সামনে। সব ফুল একে একে নিজের হাতে নিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- আমি তোমাদের কথা দিলাম… কখনো তোমাদের ইলা ফুলকে কষ্ট দিবো না।
আরিয়ানের কণ্ঠ ভারী কিন্তু কোমল একটা প্রতিজ্ঞা, একটা দায় একটা নীরব অনুশোচনা বাচ্চারা একসাথে তালি দিয়ে উঠল “দুলাভাই বেস্ট”
ইলা পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখছে হয়তো প্রথমবার তার মুখে একটা আসল হাসি ফুটলো অতি ক্ষণিকের জন্য হলেও।
রাত ১০ টা তালুকদার বাড়িতে আজ অদ্ভুত নীরবতা অথচ চারপাশে মানুষে ভরা। কিন্তু কারও মুখে কোনো শব্দ নেই, শুধু কানে আসে নিঃশব্দ কান্নার আওয়াজ।
গেটের সামনে গাড়ি চারপাশে আলোর ঝলক কিন্তু আলোয়ও আজ যেন একটা ভারী দুঃখ।।ইলার পরনে হালকা ক্রিম কালারের শাড়ি চোখে কাজল লেগে থাকলেও কান্নায় সব ঝাপসা।ঠোঁট কাঁপছে হাত কাঁপছে আর বুকের ভেতরটায় এক অজানা ভয় নতুন জীবনের অজানা পথের।
পরি, রায়েদ, সাবিহা,তাসলিমা বেগম সবাই পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। সাবিহা একবার এগিয়ে এসে ইলার মাথায় হাত রাখলেন
সাবিহাঃ- মা রে রাগ করিস না আমি যা বলেছি, যা করেছি, সবই রাগে…কষ্টে। তুই আমার মেয়ে আমার বুকের এক মাত্র টুকরা আল্লাহর দোহাই লাগে শ্বশুর বাড়ি গিয়ে মুখ ভার করে থাকিস না, হাসিস মা…তুই হাসলে বাড়িটা সুন্দর লাগে।
ইলা কিছু বলতে পারছে না কেঁদে ফেললো। সাবিহা বেগম ওকে জড়িয়ে ধরলেন চুলে চুমু খেয়ে চোখ মুছে দিলেন পরি এগিয়ে এসে বলল,
পরিঃ- তুই যা ভালো থাকিস ফোনে কথা বলবি। আমি আসব দেখা করতে খুব তারাতাড়ি।তুই কাঁদিস না নয়তো চাচ্চু ভেঙে পড়বো।
ইলা কাঁপা গলায় বলল,
ইলাঃ- তুই আমার সবকিছু রে..এখন তুই আমার সাথে থাকবি না আমি কাকে বলবো আমার কষ্ট গুলো?”
দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।রায়েদ পাশে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছে।
রায়েদঃ- ইলা… তুই যা আল্লাহর নামে বল, নিজের যত্ন নিবি।আরিয়ান ভাই যতই রাগী হোক তুই উনার মন জয় করবি। আমি জানি উনি তোকে কষ্ট দিবেন না।
বাতাস থেমে গেছে শব্দ থেমে গেছে, শুধু চোখের পানি বয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে। এই সময় রাশেদ তালুকদার একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন চুপচাপ। সাদা পাঞ্জাবি পরা চোখে ভারী দুঃখের ছাপ হঠাৎ তিনি আরিয়ানকে ডাকলেন,
রাশেদঃ- আরিয়ান বাবা একটু কথা ছিলো এদিকে আসবা।
আরিয়ান এগিয়ে গেল মাথা নিচু মুখে একটাও কথা নেই। রাশেদ হাতের রুমাল দিয়ে চোখ মুছে ধীরে বললেন,
রাশেদঃ- বাবা জানো আমি ছোটবেলা থেকে মেয়েটাকে অনেক আদরে বড় করেছি কখনো মারিনি একটা জোরে কথা বলিনি।আমি একটা স্বপ্ন দেখতাম আমার মেয়ের বিয়েতে হাসির শব্দে বাড়িটা ভরে উঠবে। কিন্তু ভাগ্য হয়তো আমার সেই হাসি কেড়ে নিল।আমি জানি যা কিছু হয়েছে তা কেউ চায়নি, কিন্তু এখন যেহেতু আল্লাহর লিখন তাই আমি কিছু বলবো না আমি শুধু একটাই অনুরোধ করবো আমার মেয়েটাকে কষ্ট দিও না।
রাশেদ থেমে গেলেন গলার স্বর ভারী হয়ে আসছে।
তিনি আরিয়ানের হাত দুটো জরিয়ে ধরে আরিয়ানের চোখে রাখলেন,
রাশেদঃ- তুমি পুরুষ মানুষ রাগ তোমাদের রক্তে থাকে। কিন্তু তোমার রাগ এর কারণে যেন আমার মেয়ের গায়ে আচর না লাগে বাবা। ও খুব ভেঙে গেছে হাসি মুখে থাকলেও বুকের ভিতরটা ছাই হয়ে আছে। ওকে আগলে রাখো তুমি যদি চাও ওকে নতুন করে হাসাতে পারবে আমি জানি তুই পারবে।
আরিয়ান চুপ করে শুনছে তার চোখে ভাসছে অদ্ভুত এক নীরবতা।একটা মুহূর্ত পর সে ধীরে মাথা নিচু করে বলল,
আরিয়ানঃ- আমি কথা দিচ্ছি ওকে কষ্ট দেবো না।যতই ভুল বোঝাবুঝি হোক ও আমার দায়িত্ব আমি ওর পাশে থাকবো সারাজীবন।
রাশেদ হালকা হাসলেন কিন্তু চোখের পানি গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে।
রাশেদঃ- এই কথাটাই আমার আশ্বাস বাবা।
দূর থেকে নাফিযা বেগম ডাকলেন,
নাফিযাঃ- ইলা মা ওঠ গাড়িতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।
ইলা এগিয়ে এল পা ভারী হয়ে আসছে।প্রতিটা পদক্ষেপে যেন বুকের ভেতর ছিঁড়ে যাচ্ছে কিছু একটা।বাড়ির গেটের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ছে শৈশবের দিন এই বাড়িতে দৌড়ানো, হাসি, তার মায়ের কোলে ঘুমানো বাবার আদর বাচ্চাদের সাথে খেলা। সবই যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে গোধূলির আলোয়।
আরিয়ান গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়ালো ইলা ধীরে ধীরে বসে পড়ল। পরি রায়েদ দৌড়ে এসে শেষবারের মতো ইলার হাত ধরল,
পরিঃ- যখন কষ্ট পাবি ভাববি আমরা আছি।
ইলা চোখ বন্ধ করলো কিছু না বলে মাথা নাড়লো।গাড়ির দরজা বন্ধ হলো হালকা শব্দ যেন সম্পর্কের এক দরজাও চিরদিনের জন্য বন্ধ হলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো দাঁড়িয়ে সবাই কাঁদছে। রাশেদ তালুকদার এক হাতে চোখ মুছে অন্য হাতে দোয়া করলেন
রাশেদঃ- আল্লাহ আমার মেয়ের জীবনটা সহজ করে দিও আরিয়ান যেন ওর আসল আশ্রয় হয়।
গাড়ির জানালা দিয়ে ইলা শেষবার তাকাল বাবা, মা, বড় বাবা, বড় মা, মেঝো বাবা, মেঝো মা, রায়েদ, পরি সবার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আরিয়ান পাশে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য ইলার দিকে চাইল ওর মুখে কোনো কথা নেই।
গাড়ি মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেলো সন্ধ্যার আলোয়।বাড়ির উঠোনে তখন শুধু বাতাস বইছে আর অশ্রুর গন্ধে মিশে আছে বিদায়ের ভার।
রাশেদ তালুকদার কিছু একটা ভেবে রায়েদ কে বাইক নিয়ে বের হইতে বলল। রায়েদ গাড়ি নিয়ে আসলে রাশেদ তালুকদার বাইকের পিছনে উঠে বসলো।
আরিয়ানরা স্টেশনে এসে পৌঁছায় প্ল্যাটফর্মে জনতার ভিড়,ট্রেনের হুইসেল,ঠান্ডা বাতাসে মিশে আছে এক অদ্ভুত বিদায়ের গন্ধ। ইলার মুখে নিঃশব্দ একটা ভার, চোখের নিচে কালি চুল গুলো উড়ছে পাশে আরিয়ান কালো শার্ট, জিন্স, মুখে ঠান্ডা ভাব, কিন্তু চোখে লুকানো ঝড়।
হঠাৎ পিছন থেকে রাশেদ তালুকদার ইলাকে ডাকলো ইলা পিছনে ঘুরে দেখে তার বাবা দাঁড়িয়ে রাশেদ তালুকদার মেয়ের দিকে তাকাচ্ছেন যেনো চোখ সরাতে পারছেন না।আরিয়ান আর ইলা রাশেদ তালুকদার এর কাছে আসল।
রাশেদ তালুকদার আরিয়ানের হাত নিজের হাতে নিয়ে কাঁপা গলায় বলল
রাশেদঃ- বাবা আমার মেয়ে ছোটবেলা থেকেই একটু নরম… জেদি নয় কেবল ভালোবাসা চায়। ওকে কষ্ট দিয়ো না আরিয়ান। মেয়েটা আজ থেকে তোমার দায়িত্ব ওর চোখে যেন কোনোদিন জল না আসে। তুমি যদি ওর পাশে থাকো আমি নির্ভয়ে মরতে পারবো।
আরিয়ান নিচু মাথায় বলল ধীরে,
আরিয়ানঃ- আমি এটা প্রতিশ্রুতি দিতে পারবো না। কিন্তু একটা কথা দিতে পারি অন্য কেউ যদি ওকে কষ্ট দেয় আমি ওর পাশে থাকবো সবসময়।
রাশেদ তালুকদার এর চোখ ভিজে যায় কণ্ঠ কাঁপে রাশেদঃ- ওর জীবনে তুমি যদি শান্তি এনে দিতে পারো আল্লাহ তোমাকে সুখী রাখবেন।
ইলা চুপচাপ সব শুনছিলো চোখে অশ্রু জমেছে বিদায়ের সময় যখন ট্রেনের হুইসেল বাজলো, তখন পুরো প্ল্যাটফর্মে একটা ভারী নিস্তব্ধতা। রাশেদ তালুকদার কান্না করছে ইলা বাবার দিকে একবার তাকিয়ে হাত নেড়ে দিলো তারপর মুখ ফিরিয়ে ফেললো কারণ সে জানে আর একবার তাকালে হয়তো নিজেকে সামলাতে পারবে না।
ট্রেনের উঠে দেখে ট্রেনের ভেতর ঠাসাঠাসি মানুষে সিট গুলা একটু এলো মেলো হয়ে কাটা হয়েছে। দুইটা সিটের জানার পাশে নোহা আর নেহা বসে পরলো নাফিযা আর ইলা তাদের পাশের সিটে বসে পড়লো বাকি দুই সিট এর চেয়ার আরিয়ান জানালার পাশে গিয়ে বসল।জানালা দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকছে, বাইরের আলো-আঁধারি মিশে তার মুখে অদ্ভুত এক শান্ত অস্থিরতা আর তার পাশে বসলেন মেহেরাব খান।
ইলা চুপচাপ দূর থেকে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। ঠিক ট্রেন ছাড়ার আগ মুহূর্তে আরিয়ানের ফোনে একটা মেসেজ আসে। স্ক্রিনে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থেমে যায় আরিয়ান মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে যায়।তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলে নিচু গলায়
আরিয়ানঃ- আব্বু…আপনি ঐখানে গিয়ে বসেন ইলাকে এখানে পাঠিয়ে দেন।
মেহেরাবঃ- তোর বউ তুই গিয়ে নিয়ে আয় আমি কেনো বলবো?
আরিয়ান কিছু বলে না কিন্তু চোখে হালকা বিরক্তি দেখা যায় ফোনটা পকেটে রেখে উঠে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে গিয়ে ইলাদের সিটের সামনে থামে। ইলা তাকায় না কেবল শুনতে পায় সেই গভীর গলা
আরিয়ানঃ- ঐ সিটে চলুন।
নোহা চওড়া হাসি দিয়ে আরিয়ান কে বলল
নোহাঃ- বাহ বাহ ভাইয়া এখনি ভাবিকে এত মিস করছিস প্রথম দিনেই রোমান্স শুরু?
আরিয়ান ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলে,
আরিয়ানঃ- নোহা একটু বেশি কথা বলছিস।
নোহা মুখ গোমড়া করে নেয় ইলা নিচু স্বরে বলে,
ইলাঃ- না আমি এখানেই ঠিক আছি আপনি আব্বুর সাথে বসুন।
আরিয়ান এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে শান্তভাবে বলল,
আরিয়ানঃ- আব্বুর নাকি আম্মুর সাথে কিছু কথা আছে।তাই আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে ঐ সিটে।
ইলা একটু চমকে তাকায় ঠোঁটে হালকা লজ্জার রেখা। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় নিজের শাড়ি ঠিক করে ঐ সিটে গিয়ে বসবে ঠিক সেই সময়
আরিয়ানঃ- জানালার পাশের সিটে বসুন।
ইলা কিছু বলে না শুধু নিঃশব্দে জানালার পাশে গিয়ে বসে পড়ে।জানালার বাইরে রাতের হাওয়া বইছে ট্রেন ধীরে ধীরে গতি নিচ্ছে। আরিয়ান তার পাশে বসে চুপচাপ ফোন বের করে একটা কনট্যাক্ট নাম্বার সেভ করে। “Abbu 2″।নিচে টাইপ করে “Second Home” ইলা দেখলো নাম্বার টা তার আব্বুর। ইলার চোখে জল চলে আসে কিন্তু সে মুখ ঘুরিয়ে নেয় যাতে কেউ না দেখে।( পরে রাশেদ তালুকদার আরিয়ান মেসেজ দিয়ে বলে ইলা জানালার পাশে বসতে ভালোবাসে তোমরা হয়তো নতুন তাই কিছু বলবে না তাই আমি তোমাকে জানিয়ে দিলাম)
অন্যদিকে এদিকের সিটে হালকা হাসির আবহ।নাফিযা মেহেরাব খান কে ডেকে বলল
নাফিযাঃ- শুনেছি আমার সাথে নাকি আজ বড় গল্প আছে?
মেহেরাবঃ- কই কিসের গল্প?
নাফিযাঃ- আরিয়ান না বলল আমার সাথে তোমার কথা আছে নাকি তাই বউমাকে ঐ সিটে নিয়ে গেলো।
মেহেরাব হাসতে হাসতে বলল
মেহেরাবঃ- আরে না ও মজা করে বলছে।
নাফিযাঃ- ইতর ছেলে নিজের বউকে নিজের কাছে নিয়ে যাবে বলে বাবাকেই কেস খাওয়াইলো, বাহ বাহ”
নেহা হেসে গড়াগড়ি খায় সিট থেকে উঠিয়ে দারিয়ে বলল
নেহাঃ- একদম সিনেমার মতো হচ্ছে আম্মু।
মেহেরাব খান হেসে বলেন,
মেহেরাবঃ- আমি চাই ওরা দুইজন এবার এক হয়ে যাক ইলাই পারবে আরিয়ান এর রাগ কমাতে আরিয়ানের মতো জেদি ছেলের জন্য এক ইলা তালুকদার যথেষ্ট।
চারজনই একটু হেসে নেয় কিন্তু সেই হাসির আড়ালে একটা নীরবতা জমে থাকে একটা চাপা উদ্বেগ, একটা অনিশ্চয়তা একটা অজানা যাত্রা।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৩০
ইলা মুখ ফিরিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে ট্রেন ছুটে।চলেছে রাতের অন্ধকার ভেদ করে। দূরে এক টুকরো চাঁদ উঠেছে তার আলো পড়ছে ইলার চোখে।
আরিয়ান একবার তাকালো ইলার দিকে তারপর চোখ ফিরিয়ে নিলো।দুজনের মাঝে শুধু একটা নিঃশব্দ দূরত্ব না রাগ না ভালোবাসা শুধু এক বোঝা-না-পারা অনুভব।
হঠাৎই ট্রেনের বাঁক ঘুরলো জানালার বাতাসে ইলার চুলগুলো উড়ে এসে আরিয়ানের গালে লাগলো।আরিয়ান মুহূর্তের জন্য চুপ করে গেলো।কিছু না বলে জানালাটা একটু নামিয়ে দিলো যেন সেই বাতাসে তার বুকের ভেতরের ঝড়টা থেমে যায়।
চাঁদের আলোয় ইলার মুখ পড়ছে।আর ট্রেনের টুংটাং শব্দে বাজছে একটা শুরু হওয়া গল্পের নিঃশব্দ প্রথম অধ্যায় শুরু হলো।
