Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৩

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৩

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৩
ছায়া

সকাল আটটা খান বাড়িতে একটা রণক্ষেত্রের মতো অবস্থা। আরিয়ান আর ইলা রেডি হয়ে তাদের ব্যাগ গুছিয়ে লিভিং রুমে এসেছে।আরিয়ানের হাতে পাসপোর্ট আর মালদ্বীপের টিকেট। ইলা একটা হালকা গোলাপি রঙের সালোয়ার কামিজ পরেছে, চোখেমুখে ভ্রমণের উত্তেজনা। কিন্তু তাদের সামনে যমদূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে রায়েদ,রায়েদ দুই হাত প্রসারিত করে সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে হালিমা বেচারি অপ্রস্তুত হয়ে মুখ টিপে হাসছে।
আরিয়ানঃ- রায়েদ রাস্তা ছাড়ো এভাবে পথ আটকে রেখেছ আমাদের এয়ারপোর্ট যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। দেরি হলে ফ্লাইট মিস হবে।

রায়েদঃ- (গম্ভীর স্বরে) ফ্লাইট মিস হবে না ভাই, ফ্লাইট আজ আকাশেই উঠবে না। কারণ আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তুমি আর ইলা কোথাও যাচ্ছে না।
আদিব আর পরিও ব্যাগ নিয়ে তৈরি হয়ে আছে বাড়ি যাওয়ার জন্য আদিব ভ্রু কুঁচকে বলল,
আদিবঃ- কি রায়েদ পাগল হয়ে গেলে নাকি? ওদের হানিমুন, ওরা যাবে তুমি কেন বাগড়া দিচ্ছ?
রায়েদঃ- বাগড়া দিচ্ছি না আদিব ভাই, আমি ডেমোক্রেসি রক্ষা করছি। কাল রাতেই আমি প্লান করেছি এদের যাওয়া কিভাবে ভেস্তে দেয়া যায়। এমনি এই রেডিও হালিমার সাথে বিয়ে দিয়ে জীবনের ১২ টা বাজিয়ে দিয়েছো। এখন ভাবো আমি যদি একা এই ‘রেডিও হালিমা’র সাথে যুদ্ধ করি আর আরিয়ান ভাই আর ইলা মালদ্বীপের বিচে ডাব খাবে এটা কি ইনসাফ? আই ডিক্লেয়ার এ ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি!
আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- তোমার এই ভূত তাড়ানোর জন্য ওঝা ডাকব, তোমার বিয়ের সাথে আমাদের মালদ্বীপ যাওয়া কেন বন্ধ হবে?

রায়েদঃ- কারণ আমি আপনাদের দুজনের পাসপোর্টের ওপর চা ঢেলে দিবো (বলেই এক গাল হাসল)
ইলা আঁতকে উঠে বলল,
ইলাঃ- কী তুমি আমাদের পাসপোর্টে চা ঢেলে দিবে।
রায়েদঃ- আরে না না ভয় পাস না চা ঢালবো না আসলে পাসপোর্ট দুটো আমি হালিমাকে দিয়ে লকারে সেভ করিয়ে রাখবো। আর তারপরে চাবি বাথরুমে ফেলে দিবো।আর তালা ভাঙতে ভাঙতে তোমাদের ফ্লাইট মিস হয়ে যাবে।
হালিমা ফিসফিস করে বলল,
হালিমাঃ- ইলা তোরা তারাতাড়ি যা ও সারা রাত প্ল্যান করেছে তোদের যেতে দেবে না।
রায়েদ হালিমার দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙালো।
রায়েদঃ- হালিমা বেগম, দলবদল করবে না তুমি এখন আমার লিগ্যাল ওয়াইফ, আমার সিক্রেট ফাঁস করা তোমার ডিউটির বাইরে।

আরিয়ান এবার রায়েদকে কলার ধরে টান দিল কানে ফিসফিস করে বলল
আরিয়ানঃ- তোমার মনে হয় মামা ডাক শুনা ইচ্চা নেই আমি বুঝতে চাচ্ছি।
রায়েদ কাঁদো কাঁদো মুখে বলল,
রায়েদঃ- ভাই আমি জাস্ট ভাবছিলাম… তোমরা মালদ্বীপ গিয়ে ফটো তুলবেন, আর আমি এখানে বসে হালিমার সাথে চিপস খাবো এটা সহ্য করার মতো না। আমাদের ও সাথে নিয়ে গেলে হয় আমাদেরও হানিমুন টা হয়ে যেত।
আদিব হেসে ফেলল।
আদিবঃ- ওহ তো এই হলো আসল উদ্দেশ্য চারজন মিলে ডাবল হানিমুন করতে চাও?
রায়েদ লাফিয়ে উঠে বলল,
রায়েদঃ- ইয়েস এটাকে বলে ‘জয়েন্ট ভেঞ্চার’ আরিয়ান ভাই রোমান্স করবে,আর আমি না হয় তাদের ব্যাগ বইবো আর আমি ফ্রীতে মালদ্বীপ ঘুরে আসব। যাওয়া তখনই কনফার্ম হবে যখন আমার আর হালিমার টিকেট কনফার্ম হবে।
আরিয়ান ইলার দিকে তাকাল ইলা হাসতে হাসতে শেষ।
ইলাঃ- ওদের কথা মেনে নিন নাহলে এই পাগল আজ এয়ারপোর্ট পর্যন্ত গড়াগড়ি খাবে।
আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন বের করল।
আরিয়ানঃ- তুমি একটা আস্ত বজ্জাত রায়েদ।ঠিক আছে ট্রাভেল এজেন্টকে কল দিচ্ছি।আরও দুটো টিকেট বাড়াতে বলছি এবার রেডি হও।

রায়েদঃ- এই তো আমার লক্ষ্মী ভাই হালিমা যাও তাড়াতাড়ি ব্যাগ গুছিয়ে নাও। আমাদের ‘ফ্রী-নিমুন’ শুরু হতে যাচ্ছে! মনে রেখো আমরা কিন্তু সেখানে ডিস্টার্ব করতে যাচ্ছি না, আমরা যাচ্ছি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিতে।
ইলা আর আরিয়ান একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। মালদ্বীপের যাত্রাটা যে শুধু রোমান্টিক হবে না, বরং রায়েদের বদৌলতে একটা কমেডি সার্কাসে পরিণত হবে, তা বলাই বাহুল্য।পুরো ড্রয়িং রুমে তখন হাসির রোল। বাড়ির বড়রা সবাই হাসছিলেন।
এয়ারপোর্টে পৌঁছেও রায়েদ থামছে না সে ইমিগ্রেশন অফিসারের কাছে গিয়ে বলছে
রায়েদঃ- অফিসার দেখুন তো আমাদের চারজনকে দেখে কি মনে হয় আমরা কোনো মিশনে যাচ্ছি? আসলে আমরা যাচ্ছি নীল পানির নিচে কে কতক্ষণ নিশ্বাস বন্ধ করে থাকতে পারে তার কম্পিটিশন করতে।
অফিসার অবাক হয়ে তাকাতেই আরিয়ান রায়েদকে টেনে নিয়ে গেল।
আরিয়ানঃ- ওর কথা কানে নেবেন না ও আসলে বিয়ের শক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
ইলা আরিয়ানের কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে

ইলাঃ- আমাদের জীবনটা সত্যিই একটা সিনেমার মতো হয়ে যাচ্ছে।
আরিয়ানঃ- সিনেমা এখনো বাকি আছে ইলাফুল মালদ্বীপের নীল পানিতে তোমার এই ভয়েজ কিং এর কণ্ঠ আরও বেশি মায়াবী হয়ে উঠবে শুধু আমার সাথে থেকো।
পেছনের সিট থেকে রায়েদ মাথা বের করে বলল,
রায়েদঃ- ভাই গানে কিন্তু আমার একটা তবলা সংগত লাগবে ভুলে যাও না।
রায়েদ আর হালিমা তখনো তাদের ‘ফ্রী-নিমুন’ জেতার আনন্দে আত্মহারা।রায়েদ বারবার তার টিকেটটা পরীক্ষা করছে আর আরিয়ানকে পিছন থেকে বলছে,
রায়েদঃ- ভাইয়া তোমার উদারতা দেখে আমার চোখে পানি চলে আসছে।সত্যি তোমার মতো বড় ভাই হয় না।
আরিয়ান মুচকি হেসে ইলার দিকে তাকাল ইলার চোখে তখন এক রহস্যময় ঝিলিক।ইলা বারবার তার ফোনের দিকে তাকাচ্ছে আর গেটের দিকে নজর রাখছে।
রায়েদঃ- ইলা তুই কি কারো জন্য অপেক্ষা করছি? নাকি এয়ারপোর্টের ডিউটি ফ্রি শপ থেকে কিছু কেনার ধান্দা করছিস?
ইলা বাঁকা হেসে বলল,

ইলাঃ- অপেক্ষা করো ভাইয়া আসল সারপ্রাইজ তো এখনো বাকি।
ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে একজনের গম্ভীর কিন্তু পরিচিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল
আদিবঃ- কি রায়েদ শুধু তোমার আরিয়ান ভাইয়ের উদারতা দেখলে? আমাদের কথা কি একদম ভুলেই গেলে?
সবাই চমকে পেছন ফিরল দেখল আদিব আর পরি হাতে ট্রলি ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে।পরির পরনে একটা ফ্লোরাল ড্রেস, আর আদিব একদম বিচ-লুকে তৈরি।রায়েদ চিৎকার করে উঠল
রায়েদঃ- অ্যাঁ আদিব ভাই পরি? তোমরা এখানে কেন? তোমরা কি আমাদের সি-অফ করতে এসেছ?
আদিব পকেট থেকে দুটো বোর্ডিং পাস বের করে রায়েদের নাকের সামনে দোলাতে লাগল।
আদিবঃ- সি-অফ করতে আসব কেন আমরাও তো মালদ্বীপ যাচ্ছি ইলা তো টিকেট কনফার্ম করে রেখেছিল। এটা ওর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটা গেট-টুগেদার সারপ্রাইজ।
আরিয়ান অবাক হয়ে ইলার দিকে তাকাল।

আরিয়ানঃ- ইলাফুল তুমি এসব কখন করলে? আমাকে তো কিছুই বললে না।
ইলা আরিয়ানের হাতটা আলতো করে চেপে ধরে বলল,
ইলাঃ- আপনি যখন রায়েদ ভাইয়ার কথা শুনে মাথা গরম করছিলেন, তখনই আমি ভাবলাম একা যাওয়ার চেয়ে সবাই মিলে গেলে আনন্দটা দ্বিগুণ হবে। আর পরি অনেক শখ মালদ্বীপ যাওয়ার তাই ভাবলাম এটাই সেরা সুযোগ। আব্বুর থেকে কার্ড নিয়ে টিকেট কনফার্ম করে নিলাম
রায়েদ তো খুশিতে আত্মহারা হয়ে আদিবকে জড়িয়ে ধরল।
রায়েদঃ- ওয়াও তার মানে এটা ডাবল হানিমুন না, এটা তো একদম ‘পারিবারিক মহাসম্মেলন’ হতে যাচ্ছে মালদ্বীপে! যাক, অন্তত আদিব ভাই সাথে থাকলে আমার আর ভয় নেই। আরিয়ান ভাই যদি আমাকে নীল পানিতে ফেলে দেয় আদিব ভাই তো আমাকে উদ্ধার করবে।
পরি হাসতে হাসতে ইলাকে জড়িয়ে ধরল।
পরিঃ- থ্যাঙ্ক ইউ ইলাপাখি তুই যে এত বড় একটা প্ল্যান করবি আমি ভাবতেই পারিনি। আদিব তো আমাকে বাসা থেকে বের করার সময়ও বলেনি কোথায় যাচ্ছি। বাসায় যাওয়ার পরে ব্যাগ গুছিয়ে বলে চলো এক জায়গায়।
আদিবঃ- সারপ্রাইজ দিতে গেলে একটু অভিনয় তো করতেই হয়।
সবাই মিলে যখন বিমানে উঠল তখন পুরো পরিবেশটা যেন উৎসবে মেতে উঠল।বিমানে পাশাপাশি সিটে বসল আরিয়ান-ইলা,তাদের পেছনে রায়েদ-হালিমা আর সবার শেষে আদিব-পরি।বিমানের ইঞ্জিন স্টার্ট নিতেই রায়েদ আবার শুরু করল

রায়েদঃ- শুনুন সবাই মালদ্বীপ নামার পর কিন্তু কেউ কারো মুখ দেখবেন না মানে সবাই সবার পার্টনারকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। কিন্তু ডিনারের সময় আমরা সবাই একসাথে বসে আদিব ভাইয়ের টাকায় খাওয়া-দাওয়া করব ঠিক আছে?
আদিব হেসে বলল,
আদিবঃ- তোমার দেখি ফাউ খাওয়ার স্বভাব গেল না আচ্ছা দেখা যাবে।
রায়েদঃ- আমি এখনো বাবা টাকায় খাচ্ছি তাই ফাও খেয়ে ঘুরে বেরাচ্ছি। যখন চাকরি করবো তখন না হয় তোমাদের খাওয়াবো।
Time skip……

নীল জলরাশির ওপর দিয়ে সি-প্লেন যখন তাদের রিসোর্টের দিকে এগোচ্ছিল, ইলা জানালার বাইরে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে রইল। স্ফটিক স্বচ্ছ পানি নিচ দিয়ে মাছের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে।
রিসোর্টে পৌঁছে আরিয়ান আর ইলা তাদের ওয়াটার ভিলায় ঢুকল।চারদিকে শুধু নীল পানি আর সমুদ্রের গর্জন। আরিয়ান পেছন থেকে ইলাকে জড়িয়ে ধরল।
আরিয়ানঃ- এতগুলো মানুষের মধ্যে থেকে আমাকে একটু সময় দিতে পারবে তো ইলাফুল?
ইলা ঘুরে আরিয়ানের গলায় হাত রেখে বলল,
ইলাঃ- সবাইকে নিয়ে এসেছি কারণ আমাদের আনন্দটা সবার সাথে ভাগ করতে চেয়েছি।কিন্তু আমার দিন আর রাত সবই তো আপনার ওই মায়াবী ভয়েজের জন্য তোলা রাখা।
আরিয়ান ইলার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
আরিয়ানঃ- তবে আজ রাতে শুধুই নীল সমুদ্র আর তোমার আমার ভালোবাসা।
এদিকে অন্য রুম থেকে রায়েদের চিৎকার শোনা গেল
রায়েদঃ- আরিয়ান ভাই পানির নিচে একটা অক্টোপাস দেখলাম এটা কি আমাদের ডিনারে খাবে নাকি আমাদেরই খেয়ে ফেলবে?
আরিয়ান কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করল,
আরিয়ানঃ- এই ছেলেটাকে নিয়ে কি আমি শান্তিতে একটু রোমান্সও করতে পারব না?

মালদ্বীপের নীল জলরাশি এখন চাঁদের আলোয় রুপোলি রঙ ধারণ করেছে।রিসোর্টের প্রাইভেট বিচে আরিয়ান ইলার জন্য এক চমৎকার ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের ব্যবস্থা করেছে।বালুর ওপর সাদা চাদর বিছানো টেবিল, চারপাশে ছোট ছোট হারিকেন আর সুগন্ধি মোমবাতি জ্বলছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ এক অপূর্ব আবহ তৈরি করেছে।
ইলা আজ একটা নীল রঙের গাউন পরেছে,চুলে একটা সাদা অর্কিড।আরিয়ান ধবধবে সাদা শার্টে পরেছ শার্টের হাতা গুটিয়ে রেখেছে কনুই পর্যন্ত। পরিবেশটা যতটা রোমান্টিক হওয়ার কথা ছিল পরিস্থিতি ঠিক ততটাই থমথমে।ইলা গাল ফুলিয়ে উল্টো দিকে মুখ করে বসে আছে।আরিয়ান অনেকক্ষণ ধরে খাবার এগিয়ে দিচ্ছে কিন্তু ইলা হাতও দিচ্ছে না।
আরিয়ানঃ- ইলাফুল প্লিজ আর কতক্ষণ? আমি তো জাস্ট মজা করছিলাম আদিবকে ওই ছবিটা পাঠানোর পেছনে আমার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না।
ইলা ঝট করে ঘুরে তাকাল তার চোখেমুখে অভিমান।
ইলাঃ- মজা আমার ওই কান্না করা অবস্থার ছবি আপনি আদিব ভাইকে পাঠালেন? আর আদিব ভাই সেটা আমাদের ফ্যামিলি গ্রুপে দিয়ে দিল বড় মা, বড় বাবা সবাই দেখেছে! আমি এখন মুখ দেখাবো কীভাবে? আপনি কি সবসময় আমার পেছনেই লেগে থাকেন?
আরিয়ান হেসে ফেলে বলল,
আরিয়ানঃ- আরে তুমি যখন এভাবে কান্না করো তখন তোমাকে একদম পিচ্চি বাচ্চাদের মতো লাগে। আমি তো ভালোবেসে তুলেছিলাম। আদিব যে ওটা গ্রুপে দিয়ে দেবে সেটা আমি জানতাম না। আমি ভেবেছিলাম পরিকে দেখাবে শুধু।

ইলাঃ- আপনি সব জানেন আপনি ইচ্ছে করেই করেছেন যাতে সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে।আমি আপনার সাথে ডিনারই করব না আর কথা তো বলবোই না।
ইলা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল আরিয়ান দ্রুত গিয়ে ওর হাত ধরল।
আরিয়ানঃ- আরে শোনো ইলাফুল সরি বলছি তো কান ধরবো? এই দেখো কান ধরছি।
ইলা হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিল।
ইলাঃ- ছাড়ুন আমাকে আমি রুমে যাচ্ছি।আপনার এই ক্যান্ডেল লাইট ডিনার আপনি একাই খান।
ইলা হনহন করে হাঁটতে শুরু করল আরিয়ান বুঝল এবারের রাগটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। সে পেছন থেকে ডাকল, কিন্তু ইলা থামার পাত্র নয়। আরিয়ান আর কোনো উপায় না দেখে দৌড়ে গিয়ে ইলার সামনে দাঁড়াল।
ইলাঃ- পথ ছাড়ুন।

আরিয়ানঃ- যাবে তো ঠিক আছে চলো আমি নিয়ে যাচ্ছি।
বলেই আরিয়ান কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে এক ঝটকায় ইলাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। ইলা চমকে উঠে আরিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল।
ইলাঃ- এ কি কি করছেন? নামান আমাকে মানুষ দেখছে তো আরিয়ান, অসভ্যতামি করবেন না নামান।
আরিয়ান মুচকি হেসে ইলার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- বউ রাগ করে হেঁটে রুমে যাবে আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখব? তা হয় না। এই ‘ভয়েজ কিং’ এর রাজ্যের রানির পা মাটিতে পড়া আজ নিষেধ। তুমি রাগ করে থাকো, আর আমি তোমাকে এভাবেই বয়ে নিয়ে যাবো সারাজীবন।

ইলা রাগে-লজ্জায় আরিয়ানের বুকে কিল মারতে লাগল, কিন্তু আরিয়ান নির্বিকার। সে গটগট করে রিসোর্টের কাঠের ব্রিজ দিয়ে ইলাকে নিয়ে নিজের ওয়াটার ভিলার দিকে এগোতে লাগল।
সেই মুহূর্তে অন্য ভিলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছিল রায়েদ আর হালিমা।হঠাৎ আরিয়ানকে ওভাবে ইলাকে কোলে নিয়ে আসতে দেখে হালিমা কফির মগটা প্রায় ফেলেই দিচ্ছিল।
হালিমাঃ- (চোখ বড় বড় করে) ওমা! রায়েদ ভাইয়া, এটা কি হচ্ছে? আরিয়ান ভাইয়া ইলা কে ওভাবে কোলে করে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? ইলার কি পা ভেঙেছে?
রায়েদ প্রথমে থতমত খেয়ে গেল, পরক্ষণেই পরিস্থিতি বুঝে ফেলল সে চট করে তার দুই হাত দিয়ে হালিমার চোখ একদম শক্ত করে চেপে ধরল।
হালিমাঃ- আরে কি করছেন? ছাড়ুন আমি তো কিছুই দেখতে পারছি না!
রায়েদঃ- (গম্ভীর গলায়) কিছু না, কিছু না!হালিমা বেগম, এগুলো দেখার মতো বয়স এখনো আমাদের হয়নি। আমরা এখনো ছোট নাবালক! আমাদের এখন চকলেট চিপস খাওয়ার বয়স। আর তুমি আমাকে ভাই বলছ কোন সাহসে।

হালিমা রায়েদের হাত সরানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
হালিমাঃ- আপনি পাগল নাকি আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে! আমি সব বুঝতে পারছি।
রায়েদঃ- খবরদার বড়দের রোমান্স ছোটদের দেখতে নেই। আরিয়ান ভাই এখন ‘অ্যাকশন মোডে’ আছে। তুমি এসব দেখলে একটু পরে আমার কাছেও এমন আবদার করে বসবে, আর আমার যা কোমর তোমাকে কোলে তুলতে গিয়ে আমি নিজেই মালদ্বীপের হাসপাতালে ভর্তি হবো। তাই চুপচাপ ঘরে চলো।
আরিয়ান ইলাকে নিয়ে তাদের রুমে দিকে যাচ্ছে। ইলা তখনো আরিয়ানের শার্ট খামচে ধরে আছে। রায়েদ হালিমার চোখ ছেড়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
রায়েদঃ- দেখলে তো একেই বলে পাওয়ার ফুল কাপল। আর আমাকে দেখো তোমার চোখ বন্ধ করতে গিয়ে নিজের কফিটাই গায়ের ওপর ফেলে দিয়েছি। হালিমা, চলো আমরা বরং রুমে গিয়ে লুডু খেলি ওতেই বেশি সেফটি!
হালিমা মুখ টিপে হেসে ভেতরে গেল।।

রুমের ভেতর আসতেই আরিয়ান লাথি দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ইলা তখনো আরিয়ানের কোলে ছটফট করছে।আরিয়ান ইলাকে বিছানায় না নামিয়ে সোজা জানালার ধারের ডিভানে নামিয়ে দিল।সামনেই দিগন্ত বিস্তৃত নীল সমুদ্র, যেখান থেকে চাঁদের রুপোলি আলো ঠিকরে ঘরে ঢুকছে।
ইলা সেখান থেকে উঠে চলে যেতে চাইলেই আরিয়ান ওর দুই হাত ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। ইলার দ্রুত হৃৎস্পন্দনের শব্দ আরিয়ানের কানে বাজছে।ইলা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল
ইলাঃ- আরিয়ান ছাড়ুন আমি এখনো আপনার ওপর রেগে আছি।ওই ছবিটা ডিলিট না করা পর্যন্ত আমি আপনার সাথে কোনো কথা বলবো না।
আরিয়ান একদম ইলার ঘাড়ে নিজের উষ্ণ নিশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল,

আরিয়ানঃ- রাগ করলে তোমাকে যে কত বেশি মায়াবী লাগে তা কি তুমি জানো ইলাফুল? নীল গাউনে তোমাকে নীল পরীদের মতো লাগছে। আর ছবির কথা বলছো? ওটা তো আমি ডিলিট করবোই না, বরং ফ্রেম করে বেডরুমে টাঙিয়ে রাখবো। আমার ইলাফুলের নিষ্পাপ মুখটা তো আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্প।
আরিয়ান ইলার কানের লতিতে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। ইলা শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ওর সমস্ত রাগ যেন মোমের মতো গলতে শুরু করেছে।ইলা কাঁপাকাঁপা স্বরে বলল
ইলাঃ- আপনি… আপনি খুব বজ্জাত। কথা দিয়ে কথা ভুলিয়ে দেন।
আরিয়ান ইলার হাত ছেড়ে দিয়ে ওর কোমরে নিজের হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ইলা বাধ্য হয়ে আরিয়ানের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। আরিয়ান ওর থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে সরাসরি চোখের দিকে তাকাল। সেই তীক্ষ্ণ আর নেশাগ্রস্ত দৃষ্টি!
আরিয়ানঃ- আমি কি শুধু বজ্জাত? আমি তোমার ‘ভয়েজ কিং’ও তো। যে ভয়েজের জন্য তুমি এত পাগল হয়েছিলে, সেই ভয়েজ কি আজ তোমার মান ভাঙাতে পারবে না?
আরিয়ান গাইতে শুরু করল খুব নিচু স্বরে, একদম ইলার কানে কানে

~”যদি সত্যি জানতে চাও তোমাকে চাই তোমাকে চাই” ~
~”যদি মিথ্যে মানতে চাও তোমাই চাই”~
গানের প্রতিটি শব্দে যেন প্রেম চুইয়ে পড়ছে। ইলা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।ও আরিয়ানের শার্টটা খামচে ধরে নিজের মুখটা ওর বুকে লুকাল।আরিয়ানের শরীরের পরিচিত সেই পারফিউম এর ঘ্রাণ আর সমুদ্রের নোনা হাওয়া মিলেমিশে এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করেছে।
আরিয়ান ইলার চুলে বিলি কাটতে কাটতে ওর কপালে একটা দীর্ঘ গভীর চুমু খেল।তারপর ইলার দুগাল নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- রাগ কমেছে আমার রাজ্যার রাজ রানির? নাকি আরও একটু ‘সার্ভিস’ দিতে হবে?
ইলা লাজুক হেসে আরিয়ানের দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় ওর ভেজা চোখের মণি দুটো হীরের মতো চিকচিক করছে।

ইলাঃ- আপনি হার মানতে জানেন না তাই না?
আরিয়ান বাঁকা হেসে ইলার ঠোঁটের খুব কাছে মুখ নিয়ে গেল।
আরিয়ানঃ- তোমার কাছে হার মানার মধ্যেই তো আমার সবথেকে বড় জয় ইলাফুল।
আরিয়ান আর এক মুহূর্ত সময় দিল না।আরিয়ান ইলার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।গভীর এক চুম্বনে ডুবে গেল দুজনে। বাইরে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আর ভেতরে দুই হৃদয়ের আদিম টান। নীল সমুদ্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট ভিলাটি আজ শুধু তাদেরই একান্ত গোপন ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে রইল।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫২

খানিকক্ষণ পর আরিয়ান ইলাকে কোল থেকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল
আরিয়ানঃ- আজ রাতের এই মায়াজালে আমি তোমাকে বন্দি করে রাখবো ইলাফুল। কালকের সূর্য ওঠার আগে এই রাজ্য থেকে তোমার মুক্তি নেই।
ইলা আরিয়ানের হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পরম তৃপ্তিতে চোখ বন্ধ করল। মান-অভিমানের পালা শেষ হয়ে শুরু হলো এক মায়াবী প্রেমের কাব্য।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৪