ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৬
ছায়া
সকালের সেই ঘটনার পর রিসোর্টের পরিবেশে যেন একটা অদৃশ্য মেঘ জমেছে।ইলা রুমে এসে পাথরের মতো বসে আছে তার দুশ্চিন্তা একটাই লিয়ান কি তবে আবার তাদের জীবনে বিষ ঢালতে ফিরে এলো? আরিয়ান ইলার কপালে হাত রেখে আশ্বস্ত করল, তারপর রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তার চোখে এখন ডিটেকটিভের তীক্ষ্ণতা।
আরিয়ান সোজা চলে গেল রিসোর্টের অ্যাডমিন অফিসে। সেখানে গিয়ে সে নাদিয়া এবং লিয়ানের পাসপোর্ট আর ট্রাভেল ডিটেইলস চেক করতে শুরু করল।আরিয়ানের পরিচিত এক ইনভেস্টিগেশন অফিসারের মাধ্যমে সে দ্রুত কিছু তথ্য বের করে আনল।আধঘণ্টা পর আরিয়ানের ল্যাপটপ স্ক্রিনে ভেসে উঠল লিয়ানের সাম্প্রতিক মেডিকেল হিস্ট্রি।
তদন্তের ফলাফল:
আরিয়ান যা জানতে পারল তাতে সে কিছুটা অবাক হলো। লিয়ান ইলার বিয়ের খবর জানার পরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল।তার মধ্যে এক ধরনের ‘অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার’ এবং ‘অ্যাগ্রেসিভ বিহেভিয়ার’ ধরা পড়েছিল। ডক্টর হিয়ালা ইবনাত নাদিয়া শুধু একজন গাইনোকোলজিস্টই নন সাথে তিনি লিয়ানের আপন খালাতো বোন। লিয়ানের মা অনুরোধে নাদিয়া লিয়ানকে মালদ্বীপে নিয়ে এসেছে একটি বিশেষ মেন্টাল রিহ্যাবিলিটেশন সেশনের অংশ হিসেবে। লিয়ানকে এখানে ‘শক থেরাপি’ এবং প্রকৃতির মাঝে রেখে সুস্থ করার চেষ্টা চলছে।
আরিয়ান একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মনেই বলল,
“তাহলে লিয়ান এখানে শিকারি হিসেবে আসেনি এসেছে রোগী হিসেবে? কিন্তু ওর চোখের সেই ধূর্ত হাসি তো অন্য কিছু বলছিল।
বিকেলে আরিয়ান ডক্টর নাদিয়ার সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল।রিসোর্টের ক্যাফেটেরিয়ায় নাদিয়া একা বসে কফি খাচ্ছিল।আরিয়ান গিয়ে তার সামনের চেয়ারে বসল।
আরিয়ানঃ- ডক্টর নাদিয়া সকালের ব্যবহারের জন্য আমি দুঃখিত।তবে লিয়ানের সাথে আমাদের অতীতটা জানলে আপনি হয়তো আমাকে দোষ দিতেন না।
নাদিয়া চশমাটা ঠিক করে শান্ত গলায় বলল,
নাদিয়াঃ- আমি জানি মেজর আরিয়ান খালামুনির থেকে সব শুনেছি ,লিয়ান ইলার সাথে যা করেছে তা কোনোভাবেই ক্ষমাযোগ্য নয়।আমি লিয়ানকে ছোট থেকে ভালোবাসি বলেই আমি ওর চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছি। ওর ব্রেনের একটা অংশে ছোট একটা টিউমারের মতো গ্রোথ পাওয়া গেছে যা ওর আবেগ আর রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে দিচ্ছে না। আমি ওকে এখানে এনেছি যাতে ও পুরনো স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ও এখানেও ইলাকে দেখে ফেলেছে।
আরিয়ানঃ- আপনি কি নিশ্চিত ও বদলেছে আজ সকালে ও যেভাবে কথা বলছিল তাতে মনে হয়নি ও কোনো রোগী।
নাদিয়া একটু চিন্তিত হয়ে বলল,
নাদিয়াঃ- সেটাই সমস্যা লিয়ান যখন ইলাকে দেখে ও তখন ওর পুরনো ‘অবসেশন’ ফিরে পায়।আমি ওকে কড়া নজরদারিতে রাখব। কথা দিচ্ছি আপনাদের হানিমুনে ও আর কোনো ঝামেলা করবে না।
আরিয়ান নাদিয়ের সাথে কথা শেষ করে রুমে ফিরে এলো এসে দেখল রায়েদ আর হালিমা সেখানে বসে আছে।রায়েদ তখন ইলাকে হাসানোর চেষ্টা করছে।
রায়েদঃ- আরে ইলা লিয়ানকে দেখে ভয় পাওয়ার কী আছে? এবার যদি ও কাছে আসে আমি আমার ওই প্লাস্টিকের গোলাপটা ওর নাকে ঢুকিয়ে দেব দেখব কেমন ম্যাজিক এর মত তোকে ভুলে যাবে।
হালিমা রায়েদের হাতে একটা চিমটি দিয়ে বলল,
হালিমাঃ- আপনি কি সব জায়গায় ইয়ার্কি করেন?বেচারি ইলা কত ভয় পেয়েছে দেখেছেন?
আরিয়ান ভেতরে ঢুকে সবটা খুলে বলল লিয়ানের অসুস্থতা আর নাদিয়ার দায়িত্বের কথা শুনে সবাই কিছুটা শান্ত হলো, কিন্তু ইলার মন থেকে ভয় কাটল না।
Time skip….
রাত নেমে এল মালদ্বীপে আরিয়ান ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখছিল।হঠাৎ দেখল নিচে বালুর ওপর লিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। সে একদৃষ্টিতে আরিয়ানের রুমের দিকে তাকিয়ে আছে। লিয়ানের মুখে সেই অদ্ভুত হাসি সে কি সত্যিই রোগী, নাকি নাদিয়ার আড়ালে সে নতুন কোনো মায়াজাল বুনছে? এটা আরিয়ান বুঝতে পরছে না।আরিয়ান বিড়বিড় করে বলল,
আরিয়ানঃ- লিয়ান তুমি যদি সুস্থ না হও তবে এবার তোমাকে জেল নয় কবরে পাঠানোর ব্যবস্থা আমি নিজেই করব।
এদিকে হালিমা রায়েদ কে খুজে বেড়াচ্ছে কিন্তু রায়েদকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল ন ইলা আর হালিমা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। কারণ রায়েদ যখন অতিরিক্ত শান্ত থাকে বা হঠাৎ গায়েব হয়ে যায় তখন বুঝতে হবে সে বড় কোনো ‘অঘটন’ ঘটাতে যাচ্ছে।
এদিকে রিসোর্টের পেছনের বাগানে যেখানে লিয়ান একাকী দাঁড়িয়ে তার পুরনো ডায়েরি দেখছিল সেখানে হঠাৎ উদয় হলো রায়েদ।পরনে তার ঢিলেঢালা হাওয়াই শার্ট আর চোখে একটা বড় কালো সানগ্লাস।
রায়েদঃ- কী খবর ওস্তাদ?মালদ্বীপের বাতাস কি খুব বেশি গায়ে লাগছে?
লিয়ান বিরক্ত হয়ে তাকাল
লিয়ানঃ- তুমি কে এখানে কী চাও?
রায়েদ দাঁত বের করে হাসল
রায়েদঃ- আমি হলাম রায়েদ ইলার ভাই এবং অফিশিয়াল বডিগার্ড (পার্ট টাইম)।শুনলাম আপনার মাথায় নাকি টিউমার হয়েছে? তা ডাক্তার আপু কি আপনার ব্রেন ঠিক করছে নাকি ঘিলু সব বের করে আইসক্রিম বানিয়ে ফেলেছে?”
লিয়ান রেগে গিয়ে বলল,
লিয়ানঃ- মুখ সামলে কথা বলো চেনো আমাকে?
রায়েদ পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের সাপ বের করল (যা সে সকালে সুভ্যেনির শপ থেকে কিনেছে)।সেটা লিয়ানের উপরে ছুড়ে মারে আর বলতে লাগে
রায়েদঃ- চেনার তো বাকি নেই ভাই আপনি তো সেই ভিলেন যে আমার বোনের সংসার নষ্ট করতে চাইছিলেন।শুনছি আমি নাকি মারামারি তে খুব এক্সপার্ট তা আজ কি আপনি কুংফু দেখাবেন নাকি আমি শুরু করব?
লিয়ান এবার রায়েদকে ধাক্কা দিতে গেল কিন্তু রায়েদ এর বডি ফিট থাকায় রায়েদের কিছু হলো না রায়েদ লাফ দিয়ে সরে গিয়ে লিয়ানের পায়ের নিচে একটা কলার খোসা ফেলে দিল। লিয়ান তাল সামলাতে না পেরে “আ আ আ” করে বালুর ওপর ধপাস করে পড়ে গেল।
রায়েদ হাততালি দিয়ে উঠল
রায়েদঃ- আরে সাবাস প্রথম রাউন্ডেই কুপোকাত?এটাকে বলে ‘ব্যানানা টেকনিক’
লিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে রায়েদকে মারার জন্য তেড়ে এল। রায়েদ তখন চিৎকার করে উঠল,
রায়েদঃ- হালিমা বেগম জলদি আসো হাঙ্গর ডাঙায় উঠে এসেছে দেখলে তাড়াতাড়ি এসো।
লিয়ান থমকে গেল সে ভাবল সত্যিই কেউ আসছে।সেই সুযোগে রায়েদ তার হাতের পানির বোতলটা লিয়ানের মুখে স্প্রে করে দিল।লিয়ান চোখ মুছতে মুছতে গালি দিতে লাগল।
রায়েদঃ- রাগ করবেন না ওস্তাদ এটা তো স্রেফ দোয়া আপনার ব্রেন গরম হয়ে গেছে তো, তাই একটু কুলিং সিস্টেম চালু করে দিলাম।
ঠিক তখনই ডক্টর নাদিয়া সেখানে উপস্থিত হলেন।লিয়ানকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে তিনি অবাক হলেন।
নাদিয়াঃ- লিয়ান কী হচ্ছে এখানে? আর আপনি কে?
রায়েদ এবার খুব বিনয়ী হওয়ার ভান করল
রায়েদঃ- ডাক্তার আমি আসলে উনাকে সাহায্য করছিলাম। দেখলাম উনি একা একা দাঁড়িয়ে ঘামছিলেন তাই একটু মুখে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছিলাম। আর উনি তো খুশিতে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন।
লিয়ান রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
লিয়ানঃ- নাদিয়া এই ছেলেটা একটা আস্ত পাগলও আমাকে কলার খোসায় ফেলে দিয়েছে।
রায়েদ (নিষ্পাপ) মুখ করে বলল,
রায়েদঃ- ছি ছি আমি কেন কলার খোসা ফেলব? মালদ্বীপের কলা তো খুব পিচ্ছিল, হয়তো উনি নিজেই পা হড়কে পড়েছেন। ডাক্তার উনার চেকআপটা একটু বাড়াতে হবে, উনার চোখেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে
নাদিয়া লিয়ানকে টেনে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় আরিয়ানের দিকে তাকালে আরিয়ান দূর থেকে সবটা দেখে মুচকি হাসছিল। রায়েদ লিয়ানের পেছনে পেছনে চিৎকার করে বলতে লাগল,
রায়েদঃ- পরের বার কিন্তু প্লাস্টিকের সাপ না অরিজিনাল হাঙ্গর নিয়ে আসব ওস্তাদ আমার বোনের সংসার ভাঙতে আসলে তাই সাবধানে হাঁটাচলা করবেন।
হালিমা আর ইলাও আড়ালে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে শেষ। লিয়ানের মতো বিষাক্ত মানুষকেও যে রায়েদ হাসির পাত্র বানিয়ে ছাড়বে তা কেউ ভাবেনি।রায়েদ আরিয়ানের কাছে এসে কলার ঠিক করে বলল,
রায়েদঃ- আরিয়ান ভাই ভিলেনের ব্রেন ওয়াশ করতে হলে একটু বোকামি ওয়াশও করতে হয়।আজ থেকে লিয়ান তোমাকে আর ইলাকে দেখলে তোমাদের ভুলে কলার খোসার কথা ভাববে।
আরিয়ান রায়েদের কাঁধে হাত রাখল
আরিয়ানঃ- তুমি সত্যিই পারো বটে রায়েদ আজ অন্তত ইলার মন থেকে ভয়টা হাসিতে পরিণত হলো তোমার জন্য।
রাতের ডিনার শেষে সবাই যখন আগামীকালের ভ্রমণের পরিকল্পনা করছিল, ঠিক তখনই আরিয়ানের ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ‘ক্যান্টনমেন্ট হেডকোয়ার্টার’ লেখা দেখে আরিয়ানের মুখভঙ্গি এক সেকেন্ডে পাল্টে গেল।সে সবার থেকে একটু দূরে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করল ওপাশ থেকে আসা কমান্ডিং অফিসারের কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত গম্ভীর।
আরিয়ানঃ- ইয়েস স্যার জি স্যার না বুঝতে পেরেছি।পরিস্থিতি কি খুব বেশি অবনতি হয়েছে? ঠিক আছে স্যার আমি কাল সকালেই প্রথম ফ্লাইটে দেশে ফিরে জয়েন করছি।
ফোনটা রেখে আরিয়ান যখন ফিরে এল তার চোয়াল শক্ত। ইলা তার চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝে গেল কিছু একটা বড় সমস্যা হয়েছে।
ইলাঃ- কী হয়েছে আপনি এমন গম্ভির হয়ে গেলেন কেনো?
আরিয়ান ইলার হাত ধরে শান্ত গলায় বলল,
আরিয়ানঃ- ইলাফুল আমার ছুটি শেষ দেশের অবস্থা হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠেছে বর্ডারে টেনশন বাড়ছে। উপর থেকে সব অফিসারের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।আমাকে কাল সকালেই ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হবে।
খবরটা শুনে আদিব আর রায়েদের মুখের হাসিও মিলিয়ে গেল রায়েদ আমতা আমতা করে বলল,
রায়েদঃ- আরিয়ান ভাই তাহলে আমাদের মালদ্বীপের বাকি ঘোরাঘুরি? হাঙ্গর দেখা তো বাকিই রয়ে গেল।
আরিয়ান দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
আরিয়ানঃ- দেশের টানে যখন ডাক আসে রায়েদ তখন হাঙ্গর বা সমুদ্রবিলাস সবই তুচ্ছ।আদিব তুই এখনই অনলাইনে দেখ তো আগামীকালের ভোরের ফ্লাইটে দুইটা টিকেট পাওয়া যায় কি না।
আদিব দ্রুত ল্যাপটপ খুলে চেক করতে লাগল।কিছুক্ষণের মধ্যেই সে জানাল,
আদিবঃ- ভাগ্যের জোরে কাল সকাল ৬ টার ফ্লাইটে ছয়টা টিকেট পাওয়া গেছে আমি এখনই কনফার্ম করছি।
ইলার মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল স্বপ্নের মতো কাটানো এই দিনগুলো হঠাৎ এভাবে শেষ হয়ে যাবে সে ভাবেনি।কিন্তু সে জানে সে একজন মেজরের স্ত্রী হতে হবে অনেক কিছু সেক্রিফাইস করতে হবে দেশের নিরাপত্তা আগে।
আরিয়ান ইলার মুখের দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
আরিয়ানঃ- সরি ইলাফুল আমি কথা দিচ্ছি আমি খুব তারাতাড়ি তোমাকে আবার অন্য কোথাও নিয়ে যাবো।
ইলা আরিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল,
ইলাঃ- আমি বুঝতে পারছি আপনাকে কিছু বলতে হবে না আমাদের ঘুরাঘুরির থেকে দেশের নিরাপত্তা আগে।আপনি তৈরি হন আমি,পরি আর হালিমা ব্যাগ গোছাতে সাহায্য করছি।
সবাই সারা রাত কেউ ঠিকমতো ঘুমাতে পারল না রায়েদ তার সেই প্লাস্টিকের সাপ ভরতে ভরতে বিড়বিড় করছিল,
রায়েদঃ- লিয়ান ব্যাটাকে তো একটা উচিত শিক্ষা দিতে পারলাম না তার আগেই বিদায় নিতে হচ্ছে।মালদ্বীপ তোমায় মিস করব।
পরদিন ভোরে যখন আকাশের রঙ তখনও হালকা নীল তখন তারা রিসোর্ট থেকে বিদায় নিল।এয়ারপোর্টের দিকে যাওয়ার সময় আরিয়ান ইলার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
আরিয়ানঃ- মন খারাপ করো না ইলাফুল পরিস্থিতি শান্ত হলে আমরা আবার আসব।
ইলা আরিয়ান এর কাধে মাথা রেখে আছে কিন্তু তার মনের কোণে একটা অজানা শঙ্কা উঁকি দিচ্ছিল।নীল আকাশ ভেদ করে প্লেন যখন ঢাকার দিকে রওনা দিল আরিয়ানের মনে তখন শুধু একটিই চিন্তা দেশের মাটি আর মানুষের সুরক্ষা।
হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে যখন আরিয়ানরা ঢাকায় পৌঁছালো, আরিয়ান সময় নষ্ট না করে ইলাকে আত্রাইতে পাঠিয়ে দিলো আদিব পরির সাথে আর আরিয়ান সরাসরি ক্যান্টনমেন্টে চলে গেল।
ইলা চেয়েছিল আরিয়ানকে আরও কিছুক্ষণ ধরে রাখতে ভেবেছিলো হয়তো সে বাড়ি পর্যন্ত ইলাকে দিয়ে আসবে। কিন্তু ইলার একটু মন খারাপ হলো কিন্তু আরিয়ানের চোখের সেই দেশপ্রেমের কঠোরতা দেখে সে আর মন খারাপ করতে পারলো না।
ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছাতেই আরিয়ানকে জরুরি ব্রিফিং রুমে ডাকা হলো।সেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে আরিয়ান জানতে পারল পরিস্থিতির ভয়াবহতা।ভারতের সেভেন সিস্টারস সীমান্তের সাথে সিলেট বিভাগের সীমান্তবর্তী এলাকায় বড় ধরনের অনুপ্রবেশ আর সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে।আরিয়ানকে এই স্পেশাল মিশনের নেতৃত্ব দিতে হবে এবং আজ রাতেই তাদের সিলেটের দুর্গম সীমান্তের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে।
আরিয়ান তার ইউনিফর্ম পরে তৈরি হয়ে নিল , সীমান্ত রক্ষা আর দেশের সার্বভৌমত্ব এখন তার কাছে প্রধান।তবে যাওয়ার আগে একটিবার ইলার সাথে কথা বলা প্রয়োজন মনে করে সে ফোনটা হাতে নিল।ওপাশে ফোন বাজতেই ইলা রিসিভ করল। ইলার গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছিল সে কাঁদছে।
আরিয়ানঃ- ইলাফুল কান্না করো না আমাদের জন্য দোয়া করো।
ইলাঃ- আপনারা কোথাও যাচ্ছেন নাকি?
আরিয়ানঃ- হ্যাঁ ইলাফুল আমাদের এখনই সিলেটের বর্ডারে যেতে হবে পরিস্থিতি ভালো নয়।হয়তো বেশ কিছুদিনের জন্য যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
ইলা এবার ডুকরে কেঁদে উঠল সে নিজেকে আর সামলাতে পারল না।
ইলাঃ- কেন বারবার এমন হয় আমরা তো মাত্র কালও মালদ্বীপের সমুদ্র সৈকতে একসাথে স্বপ্নের কথা বলছিলাম। অথচ আজ আপনি আমাকে একা ফেলে এমন এক জায়গায় যাচ্ছেন যেখান থেকে মানুষ ফিরে আসবে কি না তার গ্যারান্টি নেই।
আরিয়ানঃ- ইলাফুল শান্ত হও আমি একজন দেশের সৈনিক। আমার প্রথম ভালোবাসা আমার দেশ তুমি আমাকে সাহস দাও তুমি আমার সাহস হও।
ইলাঃ- আমি আপনার সাহস হতে পারি কিন্তু পাথর তো নই তাই না আপনার ইউনিফর্মের প্রতিটি বোতাম যখন আপনি লাগান,আমার মনে হয় আপনি আমার থেকে দূরে যাওয়ার দেয়াল তুলছেন।
আরিয়ানের চোখের কোণেও এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল,কিন্তু সে তা গলার স্বরে প্রকাশ পেতে দিল না।
আরিয়ানঃ- তোমার মায়াজাল ছিন্ন করে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই কথা দিচ্ছি ইলাফুল আমি আসব। তুমি নিজের খেয়াল রেখো।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৫
ফোনটা কেটে দিয়ে আরিয়ান আকাশের দিকে তাকাল বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।ওদিকে ইলা ফোনের ওপর মাথা রেখে অঝোরে কেঁদে চলেছে।তার মনে হচ্ছে আরিয়ানের ইউনিফর্ম আর এই কর্তব্য যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু।একদিকে আরিয়ানের কাঁধে দেশের স্বাধীনতা আর অন্যদিকে ইলার চোখের পানি শুরু হলো জীবনের এক কঠিন পরীক্ষা।
