ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬
ছায়া
রাত হয়ে গেছে আকাশে মেঘের আড়ালে চাঁদ লুকোচুরি খেলছে।তালুকদার বাড়ির সবাই যখন যার যার কাজে ব্যস্ত, ইলার ঘরে শুধু টেবিল ল্যাম্প জ্বলে আছে। সে বিছানার কিনারে বসে ফোন হাতে ধরে আছে কিন্তু মন যেন ভাঙা আয়নার টুকরো হয়ে গেছে। বিকেলের কথাগুলো তার মাথায় বারবার বাজছে।শব্দগুলো কানে লোহার হাতুড়ির মতো পড়ছে সে ভেবেছিল শাওন হয়তো অন্য সবার থেকে আলাদা কথা কম বললেও অন্তত রাগ দেখাবে না। কিন্তু আজকের কড়া উত্তর যেন ইলার ভিতরের রঙিন আশা ভেঙে দিয়েছে। সে ফোন হাতে নিয়েও কিছু লিখল না, শুধু চোখ বুজে কান্না গোপন করতে লাগল।
ঠিক তখনই রাত সাড়ে দশটার দিকে মোবাইলটা হালকা কম্পন দিল।নোটিফিকেশন বারে ভেসে উঠল শাওন মেসেজ করেছে ইলার বুক কেঁপে উঠল দ্রুত খুলে দেখল
শাওনঃ- সরি…আজ অনেক কাজের চাপ ছিলো মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল তাই হয়তো রাগ দেখায় ফেলেছি। এজন্য সত্যিই দুঃখিত।
ইলার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল শাওন নিজে থেকে সরি বলছে মনের গভীরে খুশির ঝড় বয়ে গেলেও অভিমানের দেয়াল তখনও অটুট। সে ভেবেছিল আজ আমি আর উত্তর দেব না বুঝুক সে কেমন লাগে। মেসেজটা দেখে সে ফোনটা টেবিলে রেখে দিল বুকের ভেতর থেকে চুপচাপ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। কিন্তু শাওনের দিকটা যেন ভিন্ন সে ইলার কোনো রিপ্লাই পেল না। প্রথমে ভেবেছিল হয়তো নেটওয়ার্ক নেই পরে দেখল মেসেজ সীন হয়ে গেছে। মনে মনে একটু অস্বস্তি হলো।
শাওন- এই মেয়েটা একেবারেই উত্তর দিচ্ছে না কেনো? আমি তো সরি বলেছি।
শাওন কিছুটা চিন্তা করল কিছুটা বিরক্তও হলো তারপর হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলো সে একটা ভিডিও বানাবে। তবে সেটি সিরিয়াস না বরং একদম ফানি। রাত ১১টার দিকে টিকটকে ভেসে উঠল শাওনের নতুন আপলোড। ভিডিওতে সে একটা মেয়ে পুতুল এর সাথে কথা বলছে আর সরি বলছে পুতুলকে বলছে যেনো রাগ করে না থাকে। ফানিভাবে পুতুলের রাগ ভাঙাচ্ছে।
তারপর পুতুলের সাথে নকল মারামারির ভঙ্গি করে শেষে হেসে বলল
শাওনঃ- কাউকে কষ্ট দিতে চাই না সবাই হ্যাপি থাকো।
এই ভিডিওটা আপলোড হতেই নেট ভরে উঠল লাইক আর কমেন্টে অনেক ফ্যান লিখতে লাগল “ভাইয়া আজকে একদম কিউট লাগছে পুতুল ভাবিকে আর আপনাকে” মাথা গরম ঠান্ডা করার নতুন ফর্মুলা এভাবে বলবো জামাইকে রাগ ভাঙাতে।
কিন্তু এদের ভিড়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শক ছিল ইলা বিছানায় শুয়ে থাকতেই ফোনে নোটিফিকেশন এলো। প্রথমে দেখে ভেবেছিল আবার একটা সাধারণ ভিডিও কিন্তু খুলেই তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। ইলার মনে হলো ও তো আমার কথাটাই পরোক্ষভাবে বলতে চাইছে। সরি তো বলেছিল এখন আবার এমন ভিডিও বানালো। তবুও আমি অভিমান ভাঙাবো না।
হাসতে হাসতে ইলা বালিশে মুখ লুকিয়ে ফেলল বুকের ভেতরটা খুশিতে কাঁপছে, অথচ বাইরে গম্ভীর মুখে ফোন রেখে দিল। রাতটা কেটে গেল এই টানাপোড়েনের মাঝেই একদিকে শাওন যিনি বুঝাতে চাইছেন তিনি সত্যিই দোষ স্বীকার করেছেন, অন্যদিকে ইলা যে খুশি হলেও নিজের অভিমান ভাঙাতে চাইছে না।
পরের দিন কলেজ থেকে ইলা দুপুরে একটু ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরলো। গরম রোদে হাঁটতে হাঁটতে ঘাম ঝরছিলো মাথা ভারী হয়ে গেছিলো ব্যাগটা এক কোণে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সোজা গিয়ে ফ্রেশ হলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটা দেখলো ম্লান হলেও একটা আলাদা উজ্জ্বলতা আছে কারণ তার মন এখন পুরোটা শাওনকে ঘিরেই।
ফ্রেশ হয়ে এসে হাতটা যেনো আপনিই ফোনের দিকে বাড়লো মনে মনে ভাবলো
ইলাঃ- আজ যদি শাওন একটু সময় দিয়ে কথা বলে তাহলে দিনটা সুন্দর হবে।
ফোন আনলক করে টিকটক এ ঢুকে দেখলো শাওন অনলাইন নেই তবুও সাহস করে একটা মেসেজ টাইপ করলো।
ইলাঃ- গুড আফটারনুন।
দশ মিনিট গেলো কোনো রিপ্লাই নেই আবার লিখলো
ইলাঃ- আপনি লাঞ্চ করেছেন?
কোনো উত্তর নেই তবুও ইলার ভিতরে হতাশার চেয়ে কেমন একটা আশার আলো কাজ করছিলো। হঠাৎ করেই স্ক্রিনে নোটিফিকেশন ভেসে উঠলো
শাওনঃ- হুম লাঞ্চ হয়ে গেছে তুমি?
ইলার চোখ চকচক করে উঠলো বুকের ভেতর ঢাকের মতো বাজতে লাগলো দ্রুত লিখলো
ইলাঃ- আমিও এখনই খেয়ে এলাম সারাদিন ক্লাসে আপনার কথা মাথায় ঘুরছিলো।
শাওনঃ- আরে এত ভাবার কী আছে পড়াশোনায় মন দাও।
ইলাঃ- মন তো যায় না আপনার ভিডিও দেখি তারপর মনে হয় আপনাকেই মেসেজ করি।
শাওনঃ- এই মেয়ে তুমি সারাদিন ফোন নিয়ে বসে থাকো নাকি পড়া লেখা নেই?
ইলার ঠোঁট ফুলে গেলো হালকা অভিমান জমলো ভেতরে। কিন্তু তবুও সে হাল ছাড়লো না লিখলো
ইলাঃ- পড়াশোনাও করি তবে আপনার সাথে কথা বললে ভালো লাগে।
শাওনঃ- আমি কিন্তু সিরিয়াস বলছি এভাবে সারাদিন ফোনে বসে থাকলে পরীক্ষায় ফেল করবে।
ইলাঃ- আপনি কি চান আমি ফেল করি?
শাওনঃ- আরে না আমি চাই তুমি ভালো করো এজন্যই বলছি।
ইলার মনে হালকা হাসি ফুটলো শাওন যতই রাগী হয়ে বলুক ভেতরে আসলে চিন্তা করে বলছে এটা সে বুঝে ফেলেছে। এদিকে ইলার মা রুমে ঢুকে দেখে ইলা আবার ফোনে ব্যস্ত চোখ কুঁচকে বললো
সাবিহাঃ- কিরে কলেজ থেকে এসে আবার ফোন বই কই?
ইলা আঁতকে উঠে ফোনটা চাদরের নিচে লুকালো
ইলাঃ- আম্মু একটু রিল্যাক্স করছি।
সাবিহাঃ- রিল্যাক্স নাকি ফোনে ছেলে মানুষের সাথে গল্প করছিস?পড়া লেখা সব শেষ করে দিবি এভাবে তুই।
ইলা চুপচাপ বসে রইলো মা ঝাড়ি দিয়ে চলে গেলো।ভেতরে রাগ জমলো আবার শাওনের কথাও মনে পড়লো।আবার ফোনটা তুলে ছোট্ট করে লিখলো
ইলাঃ- আম্মুও একই কথা বলে আপনিও তাই বললেন আমি তাহলে কি ফোনই ব্যবহার করবো না?
শাওনঃ- আমার কথার মানে খারাপ নিও না। আমি তো চাই তুমি ভালো কিছু করো আমার ফ্যান হয়ে শুধু ভিডিও দেখলে চলবে না।
ইলাঃ- তাহলে আমি আপনার সাথে কথা বলবো না?
শাওনঃ- আরে না গো বোকা কথা বলবা তবে পরিমাণ বুঝে।
ইলার মুখে লজ্জার হাসি ফুটলো মনে মনে ভাবলো “শাওন যতই রাগ দেখাক শেষমেশ তার খেয়াল রাখছে। এভাবে তাদের কথোপ কথন চলতেই থাকলো প্রায় আধা ঘণ্টা। এক দিকে ইলা লজ্জা, অভিমান, খুশি সব মিশিয়ে কথা বলছে অন্যদিকে শাওন রাগ দেখিয়ে আবার মিষ্টি করে কথার মাঝে হাসি ফুটিয়ে তুলছে। রাত নামলো ইলা আবার পড়ার বই খুললো কিন্তু মনে মনে ভাবতে লাগলো
ইলাঃ- আজও দিনটা শাওনকে নিয়ে পূর্ণ হলো।
পরের দিন বিকেলে ইলার ফোন হঠাৎ করে কেঁপে উঠল। ইলা চমকে উঠলো মনে হলো হূদপিণ্ড যেন লাফ দিয়ে বাইরে বের হয়ে আসবে “শাওন নতুন ভিডিও পোস্ট করেছেন” দুটো হাত কাঁপছে তবুও ভিডিও ওপেন করল ইলা। স্ক্রিনে হাসির কন্ঠ শাওনের আগের রাতের ডিউটির ক্লান্তি, কেউ না বুঝলেও ইলা ঠিক বুঝেছে ইলা ভিডিও টা প্লে করলো ভিডিও শুরু হতেই শাওন সালাম দিয়ে বলল “আজকে আমি আপনাদের একটা খুব স্পেশাল জিনিসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো” এই একটা লাইনই যেন ইলার বুকের ভিতর বাজের মতো পড়ল হাত কাঁপা শুরু মনে মনে বললো “স্পেশাল কিছু মানে… গার্লফ্রেন্ড?
আল্লাহ তবে কি সত্যিই…” এত দিন আমি ভুল মানুষকে সময় দিলাম। শাওন একটু থামলো গভীর নিঃশ্বাস নিল
শাওনঃ- সে আমার খুব কাছের খুব বিশেষ আজ তাকে আপনাদের সামনে আনছি”
ইলার বুক ধুকপুক করতে শুরু করলো চোখ ঝাপসা হয়ে গেল কেমন।মনে হলো পৃথিবীটা একটু টলে গেল
“হয়তো কোনো মেয়ে…ওর গার্লফ্রেন্ড…অবশ্যই… আমি বোকা ছিলাম” ইলা ফোনটা পাশে ছুঁড়ে দিল।
চোখে পানি এসে গেল নিজের অজান্তেই পরি এসে জিজ্ঞেস করলো,
পরিঃ- কি হলো আবার?
ইলা শুধু মাথা নিচু করে বলল
ইলাঃ- ওর special কেউ আছে ওর নিজের মানুষ… আমি তো বোকা ছিলাম।
পরি ফোনটা তুলে প্লে করে দেখল শাওনের ভিডিও শেষ হওয়ার আগেই ইলা রুম ছেড়ে চলে গেল।
Time Skip….
কিছু ঘণ্টা পরে আরেকটা নোটিফিকেশন হঠাৎ আবার ফোন ভাইব্রেট করল। পরি ছুটে এসে ইলার বিছানায় ফোনটা ধরিয়ে দিল
পরিঃ- দেখ আবার ভিডিও দিয়েছে
ইলাঃ- না দেখবো না
কিন্তু হাত নিজে থেকেই ফোন ধরল নতুন ভিডিও ওপেন হলো শাওন দাঁড়িয়ে আছে শুধু পা দেখা যাচ্ছে
শাওন হাসলো “Guys About last video আজ আমি সত্যিকারের ‘special’ জিনিসটা দেখাবো ইলার নিঃশ্বাস আটকে আছে তারপর শাওন ক্যামেরা ঘুরালো সামনে দাঁড়িয়ে আছে একদম সাদা, চকচকে R15 M একটা বাইক। সাদা রংয়ে সূর্যের আলো ঝলমল করছে। শাওন বাইকের ওপর হাত বুলিয়ে খুব মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল
“Introducing… আমার সাদা পরি”
আরেকবার বাইকের দিকে ক্যামেরা ঘুরিয়ে বলল
“হ্যাঁ মনে করেছিলেন হয়তো অন্য কিছু…কিন্তু না এটাই আমার ভালোবাসা আমার সাদা পরি।তারপর ক্যামেরা ঘুরিয়ে মুচকি হেসে যোগ করল “সাদা পরি ছাড়া আমার হৃদয়ের special জায়গায় আপাতত আর কেউ নেই” ভিডিও শেষ।
ইলা প্রথমে থম মেরে গেল তারপর মাথা নিচু করে নিজেই নিজের দিকে তাকাল একটা ছোট্ট হাসি এসে জমল ঠোঁটে মনে মনে ভাবলো “মানুষকে ভুল বোঝা সত্যিই সহজ কিন্তু ভুল বোঝার কষ্টটা খুব বড়” বুকের চাপ কমলো মনে হলো শ্বাস নিতে পারছে আবার।পরি পাশে বসে ঠাট্টা করে বলল
পরিঃ- তোর গার্লফ্রেন্ড ভয়ের দুঃস্বপ্নটা বুঝি এখন গেল?
ইলা মাথা নিচু করে হাসলো
ইলাঃ- হুম… কিন্তু ভয়টা সত্যিই লাগছিলো”
পরি তাকে জড়িয়ে ধরলো
পরিঃ- বোকা মেয়ে তোকে নিয়ে কেউ স্পেশাল ভিডিও বানাবে সময় লাগবে ধীরে ধীরে সবই বুঝবি।
ইলার মনে আবার এক ছোট্ট আলো জ্বলে উঠল একটা লজ্জামাখা হাসি থেমে থেমে উঠে এল তার ঠোঁটে।
রাত ৯:৪৭ ইলা রুমের লাইট বন্ধ করে বিছানায় বসে আছে।মনটা তখনো ভাঙা কষ্টে ভরা ঠিক তখনই নটিফিকেশন ইলার বুক ঢকঢক করতে লাগলো।হাত কাপতেছিলো তার মন বলে “নাহ… এবারও হয়তো কষ্টই পাবো শিওর” কিন্তু তবুও ভিডিও ওপেন করলো।
ভিডিওর শুরু ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই শাওন ফ্রেমে ঢুকল। হেলমেট মাথায় কালো শিল্ড নামানো।
সে ধীরে ধীরে ক্যামেরার দিকে এগিয়ে আসছে। তার গায়ে সাদা ক্রিস্প বডি-ফিট টিশার্ট, ফিটিংটা এমন একদম চেস্ট আর সল্ডার আলতো করে ধরে আছে।
হাওয়া লাগাতে কাপড়টা একটু কাঁপছে,বুকের ওপরের আউটলাইন স্পষ্ট হাতের ভেন্স বের হয়ে আছে যেন ঠিক সেই মুহূর্তে পুরো স্ক্রিনটাই তার উপর ফোকাস হয়ে গেছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব হালকা মিউজিক বাজছিলো। শাওন ক্যামেরার একদম সামনে এসে দাঁড়াল। হেলমেটের গ্লাসে সূর্যের আলো পড়ে চকচক করছে। সে হালকা মাথা নিচু করে একটা স্লো মোশন হ্যান্ডশেক এর মতো ক্যামেরার দিকে হাত বাড়ালো যেন বলছে “কাম উইথ মি” শেষে দাঁড়িয়ে নিজের বাইকে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিলো লাইট জ্বলে উঠলো
ভিডিওটা দেখতেই ইলার বুক কেঁপে উঠলো হৃদপিণ্ড যেন বাস্তবেই দ্রুত চলতে শুরু করল “আল্লাহ… এভাবে কেউ হট হতে পারে নাকি এই কাকে দেখে আমি কাঁদছিলাম…”
ইলার চোখে চমক বুকের ভেতর কেমন ধুকপুক গানট শাওনের এই ভিডিও দেখে ইলার গাল লাল হয়ে গেল।
সে ফোন বুকে চেপে ধরলো “এইটা কি ছিলো ভাই মানুষ এত কিউট কিভাবে হয় না কি… আমি আবার বেশি ভাবতেছি? নরম হাওয়ায় জানালার পর্দা নড়ছে,
ইলা হাত দিয়ে নিজের বুক চেপে ধরলো “ওহ আল্লাহ… হার্টবিট থামতেছে না কেনো ” ইলা হাতে ফোন নিয়ে ভিডিও টা দেখতে দেখতে গান বলা শুরু করলো
“Kuch toh hai tujhse raabta…”
“Kuch toh hai tujhse raabta…”
“Kaise hum jaane…hume kay oata..”
“Kuch toh hai tujhse raabta…”
Time skip…
এভাবে গত কয়েকদিন ধরে ইলার মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন সবাই টের পাচ্ছিলো।একসময় দিনে দিনে চঞ্চল মেয়েটা এখন অনেক চুপচাপ সারাদিন দিন ফোন নিয়ে ব্যস্ত মায়ের ডাকে আগের মতো পাল্টা উত্তর দেয় না, বাবার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলার সাহসও পায় না। এক সন্ধ্যায় ইলার মা রান্নাঘরে কাজ করতে করতে স্বামী রাশেদ তালুকদারকে বললেন
সাবিহাঃ- শুনছো আমি মেয়েটার ভিতরে বড় বদল দেখছি। সারাদিন একা একা বসে থাকে, মাঝে মাঝে ফোনে কেমন যেনো অস্থির হয়ে যায়। আমি তো বুঝি বয়স হয়েছে… এখন যদি ঠিক সময়ে বিয়ে না দিই পরে আফসোস করতে হবে।
রাশেদ একটু চুপ থেকে গম্ভীর গলায় বললেন
রাশেদঃ- তাহলে তুমি বলছো ওর সাথে আর কথা না বলে আমরা সরাসরি বিয়ের ব্যবস্থা করে ফেলি?
সাবিহাঃ- হ্যাঁ, যদি ছেলে পছন্দ হয়ে যায় তাহলে বিয়ে আর দিন কাল ভালো না আগে বললে যদি ঝামেলা করে। তাই আমি চাচ্ছি আমার বান্ধবীর পরিবারের সাথে কথা বলতে। ওরা ঢাকায় থাকে খুব ভালো ঘরের মানুষ তাদের ছেলেটাও পড়াশোনায়,রূপে-গুণে ভালো ইলার জন্য উপযুক্ত হবে।
রাশেদ মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন সিদ্ধান্ত পাকা হয়ে গেলো ইলাকে কিছু না জানিয়েই তার বিয়ের জন্য ছেলে দেখা হবে।
এই কিছু দিন ইলা একদম শাওনকে আর মেসেজ দেয়নি।শুধু ভিডিও দেখতো লাইক দিয়ে চলে আসতো। ইলা সকালে কলেজের জন্য রেডি হচ্ছিলো বই গুছাচ্ছিলো ব্যাগে ডুকানোর জন্য হঠাৎ মা এসে বললেন
সাবিহাঃ- আজকে কলেজে যেতে হবে না।
ইলা চোখ বড় বড় করে মায়ের দিকে তাকালো হঠাৎ এমন কথা বলাতে ইলা অবাক তবুও বলল
ইলাঃ- কেন সামনে পরীক্ষা আসছে ক্লাস মিস করবো কেন?
সাবিহাঃ- ঢাকা থেকে তোর আব্বুর বন্ধু তার পরিবার নিয়ে আসছে।
ইলাঃ- তো আমি কি পুজা দিবো নাকি তারা আসলে আমার কি করার আছে??( ভ্রু কুচকে বললো)
বলেই ব্যাগ কাঁধে তুলে বের হয়ে গেলো। কলেজ শেষে বাসায় ফিরে দরজা খুলেই দেখতে পেলো গেটের পাশে কিছু গাড়ি দাঁড়ানো।ভেতরে ঢুকতেই অতিথিদের হাসি, কোলাহল ভেসে এলো ড্রয়িং রুমে তার আব্বুর বন্ধু, তার বউ, মেয়ে বসে আছে। ইলা ভিতরে ঢুকে সালাম দিলো,তারপর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না সরাসরি নিজের রুমে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর মা এসে বললেন
সাবিহাঃ- শোন একটু সুন্দর করে ড্রেস চেঞ্জ করে আয় তোর জন্য নতুন জামা আছে আলমারিতে সেটা পরে আয়।
মা চলে গেলে ইলার বুক ধড়ফড় করতে লাগলো ঠিক তখনই পরি দরজা ঠেলে ঢুকে বললো
পরিঃ- কিরে ছেলে পছন্দ হয়েছে তোর?
ইলাঃ- কোন ছেলে কিসের ছেলে?
পরিঃ- আরে তোর বাবার বন্ধুর ছেলে যে তোকে দেখতে আসছে।
ইলার মাথায় যেনো বাজ ভেঙে পড়লো সে চিৎকার করে উঠলো
ইলাঃ- কি আমার বিয়ের জন্য ছেলে দেখতে এসেছে অথচ আমি কিছুই জানলাম না?
পরিঃ- আমি কি জানি আমি তোকে শুধু বললাম এখন তারাতাড়ি রেডি হয়ে নে।
ইলা কিছু না ভেবে চুপচাপ গোসল করে এল তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত হাসি দিলো। “আমাকে সুন্দর করে রেডি হয়ে পছন্দ করাবে ভেবেছো দেখাও আমি কিভাবে সাজতে পারি।” আলমারি থেকে লম্বা একটা শার্ট বের করলো, সাথে পরলো জিন্সপ্যান্ট। ঘাড় থেকে সামনের দিকে একটা ওড়না ঝুলিয়ে নিলো।তারপর মেকআপ বক্স খুলে মুখটা একেবারে ভূতের মতো সাদা করে ফেললো, ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। মাথার লম্বা চুল দুটো করে বেনি বানালো। আয়নায় নিজের রূপ দেখে ইলা নিজেই হেসে উঠলো।
ইলাঃ- এবার দেখুক কেমন লাগে ‘বিউটিফুল’ ইলাকে।
মা বারবার খাওয়ার জন্য ডাকছিলেন অবশেষে দরজা খুলে বের হলো ইলা। ড্রয়িং রুমে বসে থাকা অতিথিরা হঠাৎ চুপ হয়ে তাকিয়ে রইলো। যাকে তারা ভদ্র মিষ্টি মেয়ে হিসেবে আশা করেছিলো,তার বদলে সামনে দাঁড়িয়ে আছে যেনো সিনেমার কোনো ভূত চরিত্র।রাশেদের বন্ধু হকচকিয়ে গ্লাস নামিয়ে রাখলেন,তার স্ত্রী চোখ বড় করে তাকালেন ছেলেটি হালকা হাসি চেপে ফেললো,আর মেয়েটি মুখ ঢেকে ফিসফিস করে হাসলো ইলার মা রাগে গজগজ করতে করতে উঠে এলেন।
সাবিহাঃ- এটা কি করেছিস তুই?
ইলাঃ- তুমি তো সুন্দর করে রেডি হতে বলেছিলে তাই সুন্দর হয়ে এসেছি।
সাবিহাঃ- ছেলে দেখতে সুদর্শন পড়াশোনা করে বিদেশে। আর তুই এটা কি সেজে এসেছিস?
ইলাঃ- তাতে আমার কি আমি যেমন আছি তেমনি,
ইলার এই সাজ দেখে ঘরে হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো ছেলের মা একটু অস্বস্তিতে হেসে বললেন,
“ ছেলে মেয়ে তো একটু সরাসরি কথা বললে ভালো হত।
ইলাঃ- চলুন আপনাকে একটা জায়গা দেখাই (আমার আসল রূপ না দেখলে তো বুঝবেন না আমি কেমন)
সবাই ভেবেছিল হয়তো কোনো সুন্দর জায়গা দেখাতে নিয়ে যাবে। কিন্তু ইলা নিয়ে গেল পাশের নদীর ধারে যেতে যেতে ইলা বললো
ইলাঃ- আপনি কি সিরিয়াসলি আমাকে বিয়ে করার জন্য আসেছেন?
ছেলেঃ- হ্যাঁ,আর আমার তো তোমাকে পছন্দ হয়েছে।
ইলাঃ- কিন্তু আমি তো প্লেগার্ল অনেক ছেলের সাথে প্রেম করেছি, মারামারি করেছি, কলেজে স্যারও আমার কাছে শান্তি পায় না। এসব জানার পড়েও আমাকে ভালো লেগেছে আপনার?
ছেলে কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিন্তু ইলাকে কিছু বললো না গল্প করতে করতে নদীর ধারে চলে আসলো। নদীর ধারে গিয়ে ইলা ছেলেটার চোখের সামনে ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে মাটির ধুলো মেখে খেলতে শুরু করল।কখনো কাদামাটি দিয়ে পুতুল বানাচ্ছে, কখনো ধুলো ছুঁড়ে সবাইকে হাসাচ্ছে। মুখভর্তি হাসি,জামা একেবারে নোংরা।ছেলে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ পর তার মুখ বাঁকা হয়ে গেল।নাক সিঁটকাতে সিঁটকাতে বলল
ছেলেঃ- এই ধুলোবালি কাদামাটি এগুলো কি তোমার শখ?
ইলাঃ- হ্যাঁ এটাই আমার জীবন যে আমাকে বিয়ে করবে,তাদেরকেও আমার সাথে ধুলো বালি মেখে খেলতে হবে পারবেন তো সেটা করতে।
ছেলেটা এক মুহূর্তও দেরি না পরে নদীর থেকে চলে আসলো,আর ইলা হেসে বাচ্চাদের সাথে খেলা করতে করতে মনে মনে বলল
ইলাঃ- আমি এমন কাউকে বিয়ে করব না যে আমাকে বুঝবে না আমার নিজের ইচ্ছে আমি মাটি করতে পারবো না।
নদীর বাতাসে ইলার মুক্ত হাসি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে তারপরে ছেলের পিছু পিছু চলে আসলো।বাড়ি এসে ছেলে তার বাবা মাকে বললো
ছেলেঃ- চলুন এখানে কিছুই ঠিক নেই মেয়ে একটা সাইকো।
ছেলের এই কথা শুনে ঘরের পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠলো। অতিথিরা ভদ্রতার সাথে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু ইলার আচরণে তারা স্পষ্ট বুঝে গেলো এই বিয়ে সম্ভব নয়। তাই সবার সাথে ভালোভাবে কথা শেষ করে পাত্রপক্ষ দ্রুত গাড়িতে উঠে চলে গেল।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫
পাত্রপক্ষ চলে যাওয়ার পর ইলার মা রাগে কাঁপছিলেন কিন্তু কিছু বলার আগে ইলা চুপ চাপ নিজের রুমে চলে গেলো। দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে মেকআপ মুছতে লাগলো চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠলো। মনে মনে শুধু একটি কথাই বারবার বাজছিলো
ইলাঃ- আমার জীবনটা কি আমার নিজের হবে না?
