Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৬

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৬

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৬
ছায়া

৫ বছর পর…
বাংলোর চারপাশটা এখন আগের চেয়েও বেশি শান্ত।পাহাড়ের গায়ে কুয়াশার আনাগোনা বেড়েছে।কিন্তু এই পাঁচ বছরে বাংলোর ভেতরের মানুষগুলোর পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেছে।বড় জানালার পাশে একটা ইজি চেয়ারে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে ইলা। তার চোখ দুটো খোলা,কিন্তু সেখানে কোনো পৃথিবীর আলো নেই।
হ্যাঁ ইলা এখন অন্ধ।আরিয়ানের সেই পুরনো ভিডিওগুলো দিনরাত ফোনের স্ক্রিনের খুব কাছ থেকে দেখতে দেখতে আর তার শোকে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে চোখের স্নায়ুগুলো জবাব দিয়ে দিয়েছে। গত এক বছর ধরে ইলা শুধু শব্দ আর স্পর্শের পৃথিবীতে বাস করছে।
সাড়ে ছয় বছরের ইলিয়ানা এখন সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখে। সে এখন বুঝতে শিখেছে তার মায়ের চোখে আলো নেই। সে দৌড়ে এসে ইলার কোলে মাথা রাখল।
ইলিয়ানাঃ- “মা.দেখো আমি আজ ড্রয়িং খাতায় একটা বড় পাহাড় আর একটা সূর্য এঁকেছি।তুমি হাত দিয়ে দেখো না মা।

ইলা ম্লান হাসল সে হাত বাড়িয়ে ইলিয়ানার মাথায় হাত বুলালো, তারপর খাতার ওপর হাত রাখল। সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু মেয়ের স্পর্শে তার হৃদয়ে রঙের ছটা খেলে যায়।
শাহরিয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখছিল।তার চোখে এখন অনেক গভীরতা, আর একরাশ ক্লান্তি। সে ভেতরে ঢুকে ইলার সামনে এসে দাঁড়াল। তার হাতে একটা রিপোর্ট।
শাহরিয়ারঃ- বনু আজ ডাক্তার সেনের সাথে কথা বললাম। উনি বলছেন তোর কর্নিয়া রিপ্লেসমেন্ট করলে তুই আবার দেখতে পাবি। এখনো সময় আছে কেন তুই জেদ করছিস বল তো? তোর এই ছোট্ট মেয়েটার মুখটা দেখার জন্যও কি তোর ইচ্ছা করে না?
ইলা জানালার দিকে মুখ ফেরাল, যেখান থেকে পাহাড়ি বাতাস আসছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল
ইলাঃ- কেন দেখব ভাইয়া? এই পৃথিবীতে দেখার মতো আর কী বাকি আছে আমার? আমার পৃথিবী তো আরিয়ানের মধ্যেই থমকে গেছে।
শাহরিয়ার রেগে গিয়ে বলল,

শাহরিয়ারঃ- তোর মেয়ে আছে ইলা, ইলিয়ানার জন্য হলেও তোকে দেখতে হবে।
ইলা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।
ইলাঃ- ভাইয়া আমি যদি আবার এই দুনিয়ার আলো ফিরে পাই, তবে আমাকে তো অন্যদের দেখতে হবে। আমি অন্য কাউকে দেখে আরিয়ানের সেই ঝাপসা হয়ে যাওয়া মুখটাকে ধুয়ে ফেলতে চাই না। আমার অন্ধকার চোখের ভেতরে এখন শুধু আরিয়ানের প্রতিচ্ছবি ভাসে।আমি চোখ এর আলো ফিরে পেয়ে যদি আরিয়ানকে না দেখি, তবে সেই দেখার চেয়ে এই অন্ধত্ব অনেক বেশি সুখের ভাইয়া।
শাহরিয়ার স্তব্ধ হয়ে গেল ইলা আবার বলল
ইলাঃ- জানো ভাইয়া ডাক্তাররা বলে আমার চোখ নষ্ট হয়েছে এক বছর আগে । কিন্তু আমি জানি আরিয়ান চলে যাওয়ার দিনই আমার চোখের আলো অর্ধেক নিভে গিয়েছিল।বাকিটা আমি নিজেই খরচ করেছি ওকে হাতড়ে বেড়াতে।এখন আমি চোখ বন্ধ করলেই ওকে দেখতে পাই।অপারেশন করলে যদি ওই স্মৃতিগুলো মুছে যায়? আমি চাই না এই কৃত্রিম আলো আমার আরিয়ানের স্মৃতিকে ম্লান করে দিক।

শাহরিয়ারের বুকটা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছিল। সে ইলার পায়ের কাছে বসে ওর হাত দুটো ধরল।
শাহরিয়ারঃ- কিন্তু বনু ইলিয়ানা বড় হচ্ছে। ও যখন স্কুলে পুরস্কার পাবে,ও যখন কনে সেজে দাঁড়াবে তখন কি তুই অন্ধকারেই থাকবি? আরিয়ান স্যার কি কখনো চাইতেন উনার ইলাফুল এভাবে অন্ধ হয়ে থাকুক?
ইলা ফিসফিস করে বলল
ইলাঃ- আরিয়ান থাকলে আমার চোখে কখনো জল আসত না ভাইয়া, আর জল না আসলে আমার দৃষ্টিও যেত না। উনিই তো আমার আলো ছিলেন।এখন তো তুমি আছো। আমার হয়ে তুমিই তো ইলিয়ানাকে দেখছো। তুমিই তো আমার চোখ এখন।

রাত বাড়ছে ইলা তখনো চেয়ারে বসে ফিসফিস করে আরিয়ানের নাম জপছে। আর বাইরে পাহাড়ি অরণ্যে শাহরিয়ার বসে ইলিয়ানাকে ঘুম পারাচ্ছে।
গত ৫ বছরে ঝোড়ো হাওয়ার মতো অনেক কিছু বদলে গেছে। সম্পর্কের সুতো ছিঁড়েছে, আবার নতুনের আবাহন ঘটেছে। ইলা আরিয়ানের বাংলোটি এখন আর শুধু ইলার ঘর নয়, এটি এখন মিডিয়া পাড়ায় ‘ভালোবাসার তীর্থস্থান’ হিসেবে পরিচিত। দেশের বড় বড় পরিচালক আর সেলিব্রিটিরা এখানে আসে শুটিং করতে ইলা বাধা দেয়নি কখনো। সে ভাবে তার আর আরিয়ানের এই না পাওয়া ভালোবাসার গল্প গুলো সবার স্ক্রিনে ফুটে উঠুক।
এই পাঁচ বছরে মেহেরাব খানের সংসারে বড় ধরনের রদবদল হয়েছে। মেহেরাব খান তার দুই মেয়েরই বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন।কিন্তু সবচেয়ে বড় বিচ্ছেদটা ঘটেছে শাহরিয়ার এর জীবনে। নোহা অনেক চেষ্টা করেছিল মেহেরাব খানকে রাজি করাতে। সে বলেছিল শাহরিয়ারের কথা, তার সততার কথা। কিন্তু মেহেরাব খান এক কথাতেই অটল ছিলেন
“আমি আমার একমাত্র ছেলেকে আর্মিতে পাঠিয়ে হারিয়েছি। আর কোনো আর্মি অফিসারকে আমি এই বাড়ির জামাই করব না।আমি আর কাউকে হারানোর ভয় সইতে পারব না।

নোহা শাহরিয়ারকে বলেছিল, “চলো না কাবির আমরা পালিয়ে যাই? আব্বু পড়ে ঠিক মেনে নিবে।
কিন্তু শাহরিয়ার তখন শান্ত চোখে নোহার দিকে তাকিয়ে বলেছিল
“নোহা আরিয়ান স্যার আমাকে নিজের ভাইয়ের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করতেন। উনার অবর্তমানে উনার বাবার সম্মান নষ্ট করে আমি নিজের সুখ খুঁজতে পারি না। আমি চাই না তোমার বাবা আবার বুক ফেটে কান্না করুক।তুমি তোমার বাবার পছন্দে বিয়ে করে নাও।
অগত্যা নোহার বিয়ে হয়ে যায় অন্য এক ব্যবসায়ীর সাথে।শাহরিয়ার সেদিন আড়ালে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছেছিল, কিন্তু তার কর্তব্যবোধ তাকে দুর্বল হতে দেয়নি। সে নিজেকে সঁপে দিয়েছে ইলা আর ইলিয়ানার সুরক্ষায়।
ইলা এই কয়েক বছর অনেক চেষ্টা করেও শাহরিয়ার কে বিয়ে জন্য রাজি করাতে পারেনি। ইলা এখনো যানে না শাহরিয়ার নোহাকে এক আকাশ পরিমান ভালোবাসতো। শুধু আরিয়ানের কথা রাখার জন্য তার ভালোবাসাকে বলিদান দিয়ে দিছে।

অন্যদিকে আদিব্দের বাড়িতে এখন ছোট বাচ্চার চিৎকার আর কান্না। আদিব আর পরি এখন এক কন্যা সন্তানের বাবা-মা। তাদের মেয়ের নাম রেখেছে ‘আদিবা খান’। আদিবা একদম তার মায়ের মতোই শান্ত আর মিষ্টি হয়েছে। এই কয়েক বছর পরি অনেক ভাবে চেষ্টা করেছে ইলাকে খুজার কিন্তু বারবার ফলাফল জিরো।
অন্যদিকে তালুকদার বাড়িতে হালিমা আর রায়েদের ঘর আলো করে এসেছে এক পুত্রসন্তান।নাম রাখা হয়েছে ‘রায়ান তালুকদার’ রায়ান একদম তার বাবার কার্বন কপি। বয়স মাত্র চার বছর কিন্তু সারা বাড়ি মাথায় করে রাখে। দুষ্টুমিতে সে যেন ছোটবেলার রায়েদকেও হার মানায়। সে সুযোগ পেলেই আদিবা নানুবাড়ি আসলে আদিবার খেলনা লুকিয়ে রাখে আর হালিমা রায়ানকে দৌঁড়ানি দেয়।
রায়েদ তিন বছর আগে চায়না চলে গেছে হালিমাকেও সাথে নিতে চেয়েছিলো কিন্তু ইলার অভাবে রাশেদ তালুকদার সাবিহা বেগম হালিমাকে আর রায়ান কে যেতে দেয়নি। রায়ান হালিমাকে ক্লান্ত করে ছাড়ে গোটা তালুকদার বাড়ি সে একাই মাথায় করে রাখে।
হালিমা প্রায়ই দীর্ঘশ্বাস ফেলে রায়েদকে বলে

হালিমাঃ- রায়েদ তোমার ছেলে তো বড় হয়ে ‘দুষ্টুমির রাজা’ হবে। আমাকে পাগল বানায় ফেলছে। তুমি তোমার ছেলেকে নিয়ে যাও তোমার সাথে।
সেই সময় ছোট রায়ান এসে কোমড়ে হাত দিয়ে বলে
রায়ানঃ- আম্মু তূমি তো খুব পোচা হয়ে গেছো বাবার কাছে আমার নামে বিচার দিচ্ছো।
রায়ান এর এই ছোট দুই বাক্য শুনে রায়েদ হেসে দেয়। এটা দেখে রায়েন ফোনের দিকে তাকিয়ে দাত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে
রায়ানঃ- তুমিও অনেক পোচা তুমি কবে থেকে আসতে চেয়েও আসো না। আমি কারো সাথে কথা বলবো না কেউ আমাকে ভালোবাসে না। আমি এই বাড়ি থেকে চলে যাবো।

কিছুদিন পড়ে ইলার বাংলোতে একটা মিউজিক ভিডিওর শুটিং চলছে। নামী এক গায়ক গান গাইছেন সাথে সেও আসছে
শুটিংয়ের কোলাহলের মাঝেও ইলা তার ইজি চেয়ারে স্থির হয়ে বসে আছে। তার চোখ দুটো খোলা কিন্তু সে চোখের মণি নড়ছে না।
শাহরিয়ার আর ইলিয়ানা দূর থেকে শুটিং তদারকি করছিল।ইলিয়ানা দেখল একজন নামকরা গায়ক যার ঘারের পিছনে একটা বাটারফ্লাই ট্যাটু আছে। দেখতেও অনেক সুন্দর ইলিয়ান বলল
ইলিয়ানাঃ- ওয়াও মামা এই গাওক দেখো ঠিক যেনো k-pop আইডলদের মত। আর দেখো জাংকুক এর মত ট্যাটুও আছে।

শাহরিয়ারঃ- রাজকন্যা তুমি কিন্তু একটূ বেশি ফোনের প্রতি এডিক্টেড হয়ে গেছো। তোমার মামুনি জানলে তোমাকে আমাকে দুইজনকেই বের করে দিবে।
ইলিয়ান তার ছোট দুইহাত মুখে চেপে হেসে বলল
ইলিয়ানাঃ- আচ্ছা ফোন দেখা বাদ দিতে পারি যদি তুমি আমাকে এই সিংগ্যার এর সাথে আমার একটা ছবি আর অটোগ্রাফ এনে দাও তাহলে।
শাহরিয়ার মাথা চুলকে বলল
শাহরিয়ারঃ- তুই বড্ড পাকনা হচ্ছিস রাজকন্যা দিন দিন। আচ্ছা চল তোর আলাদিন তোর এই ইচ্ছাও পূরোন করে দিবে।

( এই বয়সে বাচ্চারা যা দেখে তাই ভালোলাগে তাই এটা কেউ সিরিয়াস নিবেন না)
দুইজন চলে গেলো সিংগ্যার এর কাছে। শাহরিয়ার ডাকার সাথে সাথে সেই গায়ক পিছন ফিরে তাকালো।
শাহরিয়ারঃ- বিরক্ত করার জন্য সরি আসলে আমার ভাগনি আপনার সাথে সেল্ফি তুলতে চায়।
সিংগার ইলিয়ানার কিউটনেস দেখে ইলিয়ানকে কোলে তুলে নিলো সিংগ্যার ইলিয়ানকে তার নাম জিজ্ঞেস করলো ইলিয়ানা তার ফুল নাম বলল।
ইলিয়ানা নিজের নাম বলে সিংগ্যার কে তার নাম জিজ্ঞেস করলো। সিংগ্যার একটু হেসে বলল
“আমার নাম লিয়ান চৌধুরী “
ইলিয়ানাঃ- ওয়াও আপনার নাম ও তো আপনার মত সুন্দর। আচ্ছা এখন আমাকে অটোগ্রাফ দিন।
লিয়ান যখন ইলিয়ানার ডায়রিতে অটোগ্রাফ দেয়ার জন্য ডায়রি খুলল তখন দেখে ইলিয়ানার আর ইলার একটা ছবি। সেটা দেখে লিয়ান বলে উঠে ইলা

ইলিয়ানাঃ- আরে ইলা না ইলিয়ানা আমার আম্মুর নাম ইলিয়ানা।
লিয়ান নাদিয়া নাদিয়া করে জোরে জোরে চিতকার দিতে লাগলো। একটু পরেই নাদিয়া চলে আসলো।
নাদিয়াঃ- কি হয়েছে লিয়ান আনিথিং রোং??
লিয়ানঃ- ইলাকে খুজে পেয়েছি কতই না খুজেছি এই সাত বছর।
শাহরিয়ার এদের কথা শুনে এতক্ষনে বুঝতে পারলো আরিয়ান তাকে একবার বলেছিলো লিয়ান এর কথা। তাহলে কি ইলার আবার কোনো বিপদ হবে।
এদিকে নাদিয়া লিয়ানকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
নাদিয়াঃ- লিয়ান প্যানিক হইও না কুল ডাউন হানি কুলডাউন। আমরা অবশ্যই দেখা করবো ইলার সাথে তার আগে তুমি শান্ত হও।

নাদিয়া লিয়ানকে শান্ত করে শাহরিয়ার এর সাথে কথা বলা শুরু করলো। কিভাবে ৭ বছর আগে লিয়ান অসুস্থ হয়েছিলো। তারপরে মালদ্বীপ এ গিয়ে ইলার সাথে দেখা হওয়া এর পরে আরিয়ানের মৃত্যুর খবর পেয়ে লিয়ান ইলাকে দেখার জন্য তার শশুর বাড়ি পর্যন্ত যায়।কিন্তু সেখানে গিয়ে শুনে ইলা হারিয়ে গেছে এর পর থেকে লিয়ান অনেক খুজে কিন্তু পায়না।
শাহরিয়ারঃ- কিন্তু ইলাকে খুজার কারণ কি??
নাদিয়াঃ- লিয়ান ইলাকে সরি বলতে চায়। অসুস্থ থাকার কারণে লিয়ান অনেক খারাপ কিছু করে ফেলেছে ইলার সাথে তাই সে সরি বলতে চায়।
ইলার এত কষ্ট কাছ থেকে সব শোনার পর লিয়ানের বুকের ভেতরটা অপরাধবোধে ছিঁড়ে যাচ্ছিলো। যে ইলার জীবন সে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, যার প্রতি তার একতরফা আসক্তি আর অসুস্থ আচরণ আরিয়ানের সাজানো সংসারকে বারবার হুমকির মুখে ফেলেছিল আজ সেই ইলার সামনে দাঁড়ানোর সাহস সঞ্চয় করে যখন দেখা করতে গেছিলো তখন আর সে ইলাকে পেলো না।
শাহরিয়ার সব কথা শুনে লিয়ানকে আর নাদিয়াকে নিয়ে গেলো ইলার সাথে দেখা করতে বাড়ির ভিতরে।শাহরিয়ার আগে আগে হেঁটে গিয়ে ইলার ইজি চেয়ারের সামনে দাঁড়াল।
শাহরিয়ারঃ- বনু তোর সাথে কেউ দেখা করতে এসেছে।
ইলা একটু চমকে উঠল সে শূন্য চোখে তাকিয়ে অস্পষ্টভাবে হাসার চেষ্টা করল।
ইলাঃ- কে এসেছে ভাইয়া? রুপনগর থেকে কি আমার হবুভাবি এসেছে?
লিয়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল ইলার কাছে
লিয়ানঃ- ইলা… আমি লিয়ান।

ইলা কণ্ঠস্বরটি চিনে উঠতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। স্মৃতি হাতড়ে সে সাত বছর আগের সেই বিভীষিকাময় সময়ের কথা মনে করল। ইলার বুক একটু কেঁপে উঠল।
ইলাঃ- লিয়ান? লিয়ান চৌধুরী?
লিয়ান হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে ইলার চেয়ারের পাশে বসল। তার চোখে তখন জল।সে ইলার পায়ের কাছে হাত রেখে ভাঙা গলায় বলল
লিয়ানঃ- ইলা আমাকে কি মাফ করা যায়? আমি জানি আমি তোমার আর আরিয়ান ভাইয়ের জীবনে কত বড় কাটা ছিলাম। আমার সেই অসুস্থ ভালোবাসা আর জেদ তোমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছে। আমি শুধু তোমাকে একটা ‘সরি’ বলার জন্য এই সাত বছর হন্যে হয়ে খুঁজেছি।
ইলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
ইলাঃ- লিয়ান আরিয়ান আমাকে শিখিয়ে গেছে ক্ষমা মহত্ত্বের লক্ষণ। আমার মনে তোমার জন্য কোনো ঘৃণা নেই। আরিয়ান বেঁচে থাকলে হয়তো তিনিও তোমাকে মাফ করে দিতেন। তুমি তো এখন ভালো আছো? এটা জেনেই আমি অনেক খুশি।
তখন নাদিয়া এগিয়ে এল।সে লিয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে কোলে থাকা এক বছর বয়সী ছোট্ট শিশুটিকে ইলার কোলের কাছে নিয়ে এল।

নাদিয়াঃ- ইলা আমি ডাক্তার নাদিয়া লিয়ানের স্ত্রী। লিয়ান আজ সাত বছর ধরে তোমার কথা ভেবে অনুশোচনায় ভুগেছে। আমাদের ঘর আলো করে এই রাজকন্যা এসেছে এক বছর আগে। ওর নাম কী রেখেছে জানো?
ইলা হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটিকে স্পর্শ করার চেষ্টা করল। লিয়ান বাচ্চাটিকে ইলার কোলে আলতো করে বসিয়ে দিল।
লিয়ানঃ- ওর নাম রেখেছি ‘ইলা’। আমার জীবনের করা সব ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে আমি চেয়েছি আমার মেয়েটা যেন তোমার মতো পবিত্র একটা মনের অধিকারী হয়। আর ইলা নাম এই জন্য রেখেছি যাবে আমার ভিতরে পশুটা যে না বের হতে পারে।
ইলার ঠোঁটে এক স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল সে ছোট্ট ইলার তুলতুলে গাল স্পর্শ করে বলল
ইলাঃ- অনেক সুন্দর নাম ও যেন ওর বাবার মতো জেদি না হয়ে মায়ের মতো ধৈর্যশীল হয়।
কথার মাঝখানে লিয়ান হঠাৎ খেয়াল করল ইলা বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে আদর করছে ঠিকই, কিন্তু সে বাচ্চার দিকে তাকাচ্ছে না। লিয়ান নিজের হাত ইলার চোখের সামনে নাড়াল, কিন্তু ইলার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। লিয়ান চমকে উঠে শাহরিয়ারের দিকে তাকাল।

লিয়ানঃ- শাহরিয়ার ভাই, ইলার চোখের কি হয়েছে? ও কি… ও কি আমাদের দেখতে পাচ্ছে না?
শাহরিয়ার মাথা নিচু করে বড় একটা নিশ্বাস নিল।
শাহরিয়ারঃ- না ইলা এখন অন্ধ আরিয়ান স্যারের শোকে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে ও নিজের চোখের আলো হারিয়েছে। আমি অনেকবার বলেছি অপারেশন করতে, কিন্তু ও রাজি হয় না। ওর এক কথা ও আরিয়ান ছাড়া আর কাউকে এই চোখ দিয়ে দেখতে চায় না।
লিয়ান স্তব্ধ হয়ে ইলার দিকে তাকিয়ে রইল। সে বিড়বিড় করে বলল “এত ভালোবাসা একটা মানুষের জন্য একটা মানুষ নিজের চোখ বিসর্জন দিতে পারে!”
লিয়ান নাদিয়ার দিকে তাকাল। নাদিয়াও তখন ফুঁপিয়ে কাঁদছে লিয়ান আবার কাছে বসলো।
লিয়ানঃ- ইলা আমি আজ গায়ক হিসেবে এখানে আসিনি, এসেছি তোমার বন্ধু হিসেবে। আমি জানি আমি অপরাধী, কিন্তু এই বন্ধুর একটা আবদার কি রাখবে?তুমি প্লিজ অপারেশনটা করো। তোমার মেয়ের জন্য হলেক করো,আমাদের জন্য করো।
ইলা মাথা নাড়ল সে শান্ত গলায় বলল
ইলাঃ- আমি তো বলেছি লিয়ান ভাইয়াকে আমার আরিয়ানের মুখটা আমার অন্ধকারেই বেশি স্পষ্ট। আলো আসলে যদি ছায়াগুলো হারিয়ে যায়?
এভাবে লিয়ান আর নাদিয়া ইলার সাথে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে একরাশ মন খারাপ আর অপরাধবোধ নিয়ে বিদায় নিল। যাওয়ার সময় লিয়ান শাহরিয়ার এর সাথে কথা বলে গেলো সে বড় বড় চোখের ডাক্তারদের সাথে কথা বলবে যাতে ইলার এই অন্ধকার কাটানো যায়। কিন্তু ইলা সেই আগের মতোই অনড় তার অন্ধকারেই তার আরিয়ান সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট।

ইলিয়ানা এখন স্থানীয় একটি নামী স্কুলে প্রথম গ্রেডে ভর্তি হয়েছে পাহাড়ের নিচে শাহরিয়ার তাকে প্রতিদিন সকালে স্কুলে দিয়ে আসে।আবার নিয়ে আসে।আজ টিফিনের বিরতি সময় ইলিয়ানা এক কোণে বসে একা একা টিফিন খাচ্ছিল, ঠিক তখনই ক্লাসের এক ডানপিটে ছেলে ‘আরিফ’ তার সামনে এসে দাঁড়াল।
আরিফঃ- এই যে ইলিয়ানা আমি তো শুনেছি তোর বাবা নেই তুই তো এতিম তাহলে তুই এই স্কুলে ভর্তি হলি কিকরে।
ইলিয়ানার হাতের চামচটা থেমে গেল। তার বুকটা অভিমানে ফেটে যাচ্ছিল। সে তার বাবার গল্প শুনে বড় হয়েছে, সে জানে তার বাবা একজন বীর।
ইলিয়ানাঃ- মিথ্যা কথা আমার বাবা আছে। আমার বাবা আম্মুর কাছে ফিরে আসবে আমি জানি।
আরিফ খিলখিল করে হেসে উঠল
আরিফঃ- আরে পাগল যার বাবা মরে যায়, সে কোনোদিন ফেরে না। তুই একটা ফাদারলেস চাইল্ড!
কথাটা সহ্য করতে পারল না ছোট ইলিয়ানা। সে ঝাপিয়ে পড়ল আরিফের ওপর। শুরু হলো ধস্তাধস্তি। কিন্তু আরিফ বয়সে একটু বড় হওয়ায় সে ইলিয়ানাকে জোরে এক ধাক্কা দিল। ইলিয়ানা ছিটকে গিয়ে সিমেন্টের বাঁধানো চত্বরে পড়ে গেল। তার কপালটা ঘষটে রক্ত বের হতে শুরু করল।ইলিয়ানা অসহ্য যন্ত্রণায় আর ভয়ে চিৎকার করে উঠল “ইস বাবা”

ঠিক সেই মুহূর্তে স্কুলের করিডোরে এক দীর্ঘ ছায়া পড়ল। ভারী শু এর শব্দে চারপাশটা যেন কেঁপে উঠল। সেই ছায়াটি দ্রুত এসে ইলিয়ানার সামনে দাঁড়াল। ছেলেটি ইলিয়ানাকে আলতো করে মাটি থেকে তুলে নিল।
ইলিয়ানা যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে কাঁদছিল, কিন্তু হঠাৎ এক জোড়া বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শে সে শান্ত হয়ে গেল। মানুষটি খুব সন্তর্পণে ইলিয়ানার স্কুল ড্রেসের ময়লা ঝেড়ে দিল। নিজের ধবধবে সাদা রুমালটা বের করে ইলিয়ানার রক্তাক্ত কপালটা চেপে ধরল সে।
ইলিয়ানা ধীরে ধীরে চোখ মেলল তার সামনে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে, তাকে দেখে সে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি হবে। গায়ের রঙ দুধে-আলতা ফর্সা। পরনে নেভি ব্লু রঙের একটি শার্ট, যা তার সুঠাম বডি-ফিট শরীরের সাথে দারুণ মানিয়েছে। চোখে একটি চিকন ফ্রেমের চশমা, যার আড়ালে থাকা তীক্ষ্ণ চোখ দুটোতে এখন একরাশ মমতা আর গভীরতা। তার চুলের কাট অত্যন্ত পরিপাটি, আর চোয়ালের হাড়গুলো ধারালো পৌরুষের পরিচয় দিচ্ছে। তাকে দেখতে ঠিক যেন কোনো রূপকথার রাজপুত্র কিংবা কোনো অভিজাত ব্যক্তিত্বের মতো।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৫

ইলিয়ানা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, এই মানুষটির সুগন্ধটা খুব পরিচিত। ঠিক যেন তার মায়ের ঘরে থাকা পুরনো পারফিউমের মতো।যেটা ইলা কাউকে নারতে দেয়না।পুরুষটি নিচু স্বরে বলল
“ভয় পেয়ো না ছোট প্রিনসেস কিচ্ছু হয়নি তোমার।
কণ্ঠস্বরটি এতটাই গম্ভীর এবং মায়াবী যে ইলিয়ানার কান্না মুহূর্তেই থেমে গেল। সে তার ছোট্ট হাত বাড়িয়ে লোকটির চশমাটা একটু ঠিক করে দিল।
ইলিয়ানাঃ- “আপনি কে আপনাকে আমার অনেক কাছের কাউকে মনে হচ্ছে।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৭