ভাব তরঙ্গ পর্ব ২১
বেলা শেখ
গত নিশীথে সব যখন ঘুমে অচেতন তখন মেয়ের হোস্টেলের ম্যাট্রন ফোন করেছিল। পত্রটার খুব জ্বর, জ্বরের ঘোরে আবোলতাবোল বকছে। সাথে পত্রলেখার পায়ে আঘাত লাগার কথাও জানান। তারপর থেকেই পপী চৌধুরী স্বস্তি পাচ্ছেনা। মেয়েটা অভিমান করে কিছু বলেও নি তাকে। মেয়েটার প্রতি তার অগাধ বিরক্তি, ভালোবাসা দুটোই হয়। বিরক্তি প্রকাশ করতে পারলেও ভালোবাসা কমই প্রকাশ করে সে। মেয়েটা পোড়া কপাল নিয়ে দুনিয়ায় আসলো কেন? আসলি তো তাও এই নিষ্ঠুর স্বার্থপর মায়ের পেটেই! কোনো ভালো মায়ের কোলেও তো ঠায় জুটতে পারতো।
“পপী, তুমি পত্রলেখাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসো। এই অবস্থায় হোস্টেলে একা কি করে থাকবে?”
স্বামী কারিম মোল্লার কথায় পাপী ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “এখানে কি করে আনি কারিম? জারিফকে তো চেনোই…”
“পত্রলেখা বাড়িতে থাকলে ও কিছু করার সাহস পাবে না। বরঞ্চ বাইরে থাকলে ভয় বেশি। ও মেন্টাল গোছের মানুষ। কখন কি করে বসে। ঘরে সবার মাঝে উল্টোপাল্টা কিছু করার সাহস পাবে না। আর তুমি যেই ভয়টা পাচ্ছো সেরকম জারিফ করবে না। জারিফ হয়তো হুমকি ধামকি দিয়ে পত্রলেখাকে কাজি অফিস…”
“আমি এটাও চাই না কারিম। জারিফ হয়তো পত্রলেখাকে বিয়ে করবে, ভালোবাসবে কিন্তু ওঁর ভালোবাসাটা সম্মানের কখনোই হবে না, অসুস্থ ভালোবাসা। আমি চাই আমার পত্রকে সম্মানের সাথে ভালোবাসবে এমন কেউ ওঁর জীবনে আসুক। তাছাড়াও জারিফ আমার দেবর হয় কারিম, এমনটা ভাবতেও কি করে পারো?”
“কি জানি, জারিফ প্রথমবার কোনো মেয়ের প্রতি ইন্টারেস্ট দেখালো। তাও এতোটা পাগলপণা। আই থিংক ও পত্রলেখাকে ভালো রাখতে পারতো। তাছাড়াও ও বলছিল, তোমার যেহেতু সম্পর্কে সমস্যা তাহলে না হয় ও অন্য কোথাও গিয়ে থাকলো পত্রকে নিয়ে।”
“প্লিজ কারিম, তুমি তোমার পাগল ভাইকে সাপোর্ট করা বাদ দাও। মেয়েটা আমার, ওঁর বিষয়ে আমাকেই না হয় ভাবতে দাও?”
কারিম মোল্লা এ বিষয়ে আর কথা বললো না। যার মেয়ে সেই ভাবুক। পপী চৌধুরী মেয়ের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়ে। বাগানে দেখা হয় জারিফ মোল্লার সাথে। তিনি উপেক্ষা করে চলে যেতে চাইলেন। কিন্তু জারিফ মোল্লাই এগিয়ে আসলো। কোনো প্রকার ভণিতা ছাড়াই বলল,
“দেখেন ভাবী, ভালোভাবেই প্রস্তাব রেখেছিলাম। যথেষ্ট অনুরোধ করা হয়ে গেছে। আপনারা আমার ভালোমানুষীর মান রাখেন নাই। এরপর যা হবে তার জন্য আপনারা দায়ী। আমার একটাই নীতিমালা, যা আমার পছন্দ তা আমি যেমনই হোক আমার করে ছাড়বো। আর তা আমার না হলে আর কারোরই হবে না। যাস্ট ওয়েট এন্ড সি।”
যেমন এসেছিল তেমনি ভাবে বাগান পরিষ্কার করতে চলে যায়। পপী চৌধুরী ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে তাকিয়ে রয়। কিসের ইঙ্গিত দিয়ে গেলো জারিফ?
“আব্বা, গফুরের বউ তো কেস তুলতে চাচ্ছে না। দেড় লাখ অফার করেছিলাম। ফিরিয়ে দিয়ে বলেছে, স্বামী হত্যার বিচার চায়, টাকা চায় না সে। স্বামীকে নাকি ভালোবাসে।”
“এতোই যখন ভালোবাসা, তারে খবর দেন যে সোহরাব আইতাছে। লাইলীরে মজনুর কাছে পাঠাবো। বারো বাড়ির বারো না*ঙ নিয়া ঘুরে আর গায়ে ফিরে, আমি সতি সাবিত্রী! গাড়ি পাঠান আব্বাজান। আমি আজকেই গাঁও যামু।”
“আরে আব্বা শান্ত হন। মাথা গরম করেন কেন? আমি দেখছি তো ব্যাপার খানা। আপনার আসার দরকার নাই। আপনার আম্মা আর আপারা আমার উপরে চিল্লাচিল্লি করবে। আর কটাদিন থাকেন সায়রার ওখানে। মামলা ডিসমিস হলে আমিই খবর দিবো। দুই দুইটা মার্ডারের মামলা, তাঁর উপর প্রত্যক্ষ সাক্ষী আছে কয়েকজন।”
“জলদি করেন আব্বা। আমার মাথা গরম হইলে কিন্তু সবকয়টার খবর কইরা দিমু। রাখি ফোন!”
ফোন কেটে পকেটে ঢুকায় সোহরাব। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের বাগানটা দেখে। বেশ দৃষ্টিনন্দন, দেশি-বিদেশি ফুলের হাঁট বসেছে যেন। সোহরাব ঝুঁকে একটা কাঠগোলাপ তুলে নেয়। হঠাৎ সোহরাবের মনে হলো পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে। সে পিছু ফিরতেই রসকষহীন গলা শোনা গেলো।
“হোয়াই ডিড ইউ পিক দ্য ফ্লাওয়ার্স ফ্রম মাই প্ল্যান্ট?”
সোহরাব কাঠগোলাপ নিজের কানে গুঁজে নিয়ে বলল, “বাংলায় বলেন ম্যাডাম। আমি গাঁওয়ের ক্ষ্যাত, ওত ইংরেজি বুঝি না!”
অরুণিতার কপাল কুঁচকে যায়। এমনিতে তো কালো ভাল্লুকের মতোই লাগে, কিন্তু কানে কাঠগোলাপ গোজায় একটু সুদর্শন লাগছে। মেয়েলী লাগছে না, বরং পুকি টাইপ কিছু একটা লাগছে। এন্ড ওল ক্রেডিট গোস ট্যু অরুণিতা সরকার। কারণ কাঠগোলাপ গাছটা তাঁরই। যাইহোক অরুণিতা এক কথা দুবার বলা পছন্দ করে না। তাই প্রসঙ্গ বদলে স্বভাব সুলভ রসহীন কণ্ঠে বলল,
“একটু আগে কার সাথে কথা বলছিলেন? আমি সব শুনে নিয়েছি। এ টু যেট।”
সোহরাবের মাঝে সেরকম কোনো ব্যাপার লক্ষ্য করা গেলো না। সে বুকে হাত ভাঁজ করে জানালার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নিষ্পলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো অরুণিতার উপর।
“কিছু বলতেন ম্যাডাম?”
অরুণিতার কপালের ভাঁজ দৃঢ় হয়। লেজ কাটা বাঁদর হঠাৎ ভালো মানুষ সাজছে যে? অরুণিতার মনোভাব বুঝে সোহরাব হেসে বলল, “ সিংহির ডেরায় এসে সিংহিকে বিরক্ত করার মতো সাহস সোহরাব শেখের নেই ম্যাডাম। তাছাড়াও আমি তো গাইয়া ভুত, ক্ষ্যাত, অভদ্র আরও কত কিছু। ভাবলাম একটু ভদ্র সাজি।”
অরুণিতা বাঁকা দৃষ্টি ক্ষেপন করে। নিশ্চয়ই মাম্মামকে বলা তাঁর কথা শুনে নিয়েছে! কষ্ট পেয়েছে কি? পাক, তাঁর কি?
“কিছু বলতেন ম্যাডাম জি?”
অরুণিতার ভোঁতা নাক সিকায় ওঠে। অতিরিক্ত জি হুজুরি যে চোরের লক্ষন। তবে সে ওতশত ভাবলো না। যা জানতে এসেছে তাই শুধালো,
“আপনি নাকি পাঁচ বোনের এক ভাই। সবাই আপনাকে অনেক ভালোবাসে।”
সোহরাব হাসলো, “ভালোবাসে মানে? জান হারায় আমার উপর। আমার গায়ে মশা পড়লেও সবাই ঢাল তলোয়ার কামান নিয়ে বেরোয় মশা নিধন করতে। আমাকে ছাড়া তাদের দিন শুরুই হয় না। আব্বাজান আম্মাজানের থেকে আপারা বেশি স্নেহ করে। তাদের সংসারে হাজারো ব্যস্ততা থাকলেও রোজ তিনবেলা ফোন করে হালচাল জিজ্ঞাসা করে, বাবু কি করছিস, বাবু খেয়েছিস, বাবু সজনে ডাঁটা দিয়ে শুঁটকি রেঁধেছি কষ্ট করে খেয়ে যা, না গেলে নিজেই হাজির তরকারি নিয়ে। আমি যদি ভুলক্রমেও হাঁচি দিই সবাই চিন্তার অতলে ডুবে যায়। ডাক্তার, ওষুধ পত্র, ফল পাকুর হাজির আমার সামনে। ওহ্ হ্যাঁ বলতে ভুলে গেছি বাবু আমার ডাকনাম। সবাই আদর করে ডাকে।”
অরুণিতা অনেকটা অবিশ্বাস্য মনে তাকিয়ে ছিলো। এমনও হয় নাকি! লোকটা বাড়িয়ে চড়িয়ে বলছে। সে সোহরাবের শেষোক্ত কথায় ঠেস মেরে বলে, “বুড়ো ঢ্যামনা অথচ ডাকনাম বাবু।”
সোহরাব ঠোঁট চেপে হেসে বলল, “আমিও এটাই বলতাম। তখন আপারা গাল টেনে দিয়ে বলে, তুই তো আমাদের কাছে এখনও সেই ছোট্ট বাবু সোনা।”
“আষাঢ়ে গল্প শোনানো বন্ধ করুন। আপনি হুট করে এসে বাবা মায়ের চোখের মণি হয়ে যাবেন আর আপনার বোনেরা আপনাকে মাথায় তুলে রাখবে, তাই না? পাগল ভেবেছেন আমাকে?”
সোহরাব যেন বুঝতে পারলো অরুণিতার মনোভাব। হাতে পায়ে বড় হলেও মনটা এখনো বাচ্চামোতে ভরপুর। সে খুবই সুক্ষ্মতার সাথে বলল, “ সব রিজিকের উপর নির্ভরশীল। যার রিজিক যতটুকুন সে ততটুকুনই পাবে। আমার রিজিকে আল্লাহ পাক বাবা মায়ের যতটা ভালোবাসা স্নেহ লিখে রেখেছেন, তা আমি পাচ্ছি। আবার আমার আপাদের ভাগের টুকু তাঁরা পেয়েছে। হয়তো কেউ কম, কেউ বেশি। তবে আমার জানামতে বাবা মা তাঁর সব সন্তানকেই সমান চোখে দেখে। হয়তো কারো ক্ষেত্রে প্রকাশ কম হয়, আবার কারো ক্ষেত্রে বেশি। আবার কেউ বাবা মায়ের থেকে বেশি ভালোবাসা আদায় করে নিতে পারে, কেউ জড়তায় কাছে ভীড়ে না। যে সন্তান বাবা মায়ের সাথে লেগে থাকবে সহজভাবেই বাবা মা তাঁকে একটু বেশি কাছে টানবে। কিন্তু তাঁর মানে এই না ওকে বেশি ভালোবাসে, আমাকে বাসেই না। ব্যাপারটা মানসিকতার উপর বর্তায়, হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করলে খারাপ দিকটাই আগে চোখে পড়বে। আর ভালোবেসে দেখলে ভালো দিক। আমার আপারা তো আমাকে ভালোবেসেই গ্রহণ করে নিয়েছে। হিংসে করেই বা কি করবে? তাদেরই তো আপনজন। একসময় বাবা মা থাকবে না, তখন তাদের আপন বলতে এই একটা ভাইই তো থেকে যাবে। একটা বিপদ হোক, সবার আগে ভাই হাজির হবে সেখানে। আবার ভাইয়ের কিছু হলে সবার আগে বোনের চোখেই জল চলে আসে। ভাই বোনের বন্ধনটা রক্তের সাথে আত্নারও বুঝলেন ম্যাডাম? দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্ক এটাই। ভাই মানেই ভরসার স্থান, সে হোক ছোট বা বড়।”
লম্বা ভাষণের পর সোহরাব হাততালির আশায় ছিলো। কিন্তু গোমড়া মুখো মেয়েটার হেলদোল নেই। মুখের ভাব দেখে মনবাড়ির হদিশ পাওয়া বড্ড মুশকিল। এতো কঠিন মেয়ে সে দুটো দেখে নি। এইটুকু মেয়ে অথচ ভাব দেখায় তিন চার বাচ্চার মা হয়ে গেছে। দুটো চটকানা দিলে একদম লাইনে এসে যেতো। তাদের নীরাবতার মধ্যেই হঠাৎ চপর চপর পায়ের শব্দে ভেসে আলো। সোহরাব বাম দিকে তাকায়। বাড়ির ছোট কর্তা হাজির।
প্রহর এগিয়ে আসে তাদের দিকে। বোনের হাতটা নিজ হাতের মুঠোয় ভরে সোহরাবের উদ্দেশ্যে বলল, “কালো ভাল্লুক, তুমি কি আমার আপুনিকে বিরক্ত করছো?”
“আমার ঠ্যাকা!” সোহরাব মুখ বিকৃত করে বলে উঠলো।
প্রহর চোখ পিটপিট করে প্রশ্ন করে, “ঠ্যাকা কি?”
“তোর আপার বোচা নাক।”
প্রহর বোনের দিকে তাকায়। অরুণিতার নাকের পাটা ফুলে যায়। রাগত স্বরে সোহরাবকে বলল, “আপনার নাক বোচা।”
সোহরাব নিজ কানের ফুল বিনা ছুঁয়ে অরুণিতার কানে গুঁজে দিয়ে বলল, “রাগলে খারাপ লাগে না। যাইহোক আজ ঝগড়ার মুড নাই। হয়তোবা এটাই শেষ দেখা। খুব শিগগিরই আপনাদের শহর থেকে চলে যাচ্ছি। শহরের কিছু মানুষ আমাকে সহ্যই করতে পারছে না। না পারুক, কিন্তু আমি তো আমার ছোট্ট গাঁওয়ের অঘোষিত নবাব সাব। যাকে দেখলেই কপালে হাত তুলে লম্বা সালাম দেওয়া হয়। আপনাদের কাছে গাইয়া ভুত, ক্ষ্যাত হলেও তাদের কাছে আমি মানেই গোটা কুন্তল গাঁও।”
অরুণিতার সুক্ষ্ম দৃষ্টি সোহরাব শেখের গমন পথে। নিজের ঢোল পেটা কেউ এর থেকে শেখো !
“আপুনি কালো ভাল্লুক চলে যাবে কেন? কালো ভাল্লুক বলে ডেকেছি বলে রাগ করেছে? আমি তো ভালোবেসে কালো ভাল্লুক ডাকি!”
অরুণিতো ছোট ভাইয়ের দিকে তাকায়, “ওনাকে ভালোবাসো তুমি?”
“কেন ভালোবাসবো না?”
প্রহরের পাল্টা প্রশ্ন আসতে দেরি হয় না। অরুণিতা বিড়বিড় করে বলে, “কেন ভালোবাসবে?”
“কালো ভাল্লুক তো আমার দুলাভাই হয়!”
অরুণিতার কি হলো কে জানে। দাঁত কটমট করে বলল, “খবরদার আমাকে আপুনি ডাকবি না। তুই আর তোর দুলাভাই দুটোই বদ।”
অরুণিতা ধপাধপ পা ফেলে চলে যায়। প্রহর হা করে তাকিয়ে রইল আপুনির দিকে। বকলো কেন তাঁকে?
ক্ষণিকের মেহমান খুব একটা দেরি করলো না। নাশতা খেয়েই সকলের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। মেহমান মূল ফটক পেরিয়ে না যেতেই পাতা মেহমানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এ যুগের ছেলে হয়েও কতটা বিনয়ী, ভদ্র আর সুন্দর মন মানসিকতার। অরুণাভ বিরোধীতা করতে গিয়েছিল কিন্তু কাজে দেয় নি। পাতা কিছুই শুনতে রাজি না। অরুণাভ অরুণিতা হতাশ হয়ে মায়ের দিকে তাকায়। জানে না ক্ষণিকের মেহমান তাঁদের মাকে কি এমন জাদু করে গেলো যে মুখ থেকে প্রশংসার ঝুলি ফুরোচ্ছেই না।
হাতে লাল রঙের বক্সিং গ্লাভস। হাতা কাটা লাল জার্সি ভিজে চিপচিপ। বাবড়ি চুল চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঘাম ঝড়ছে। চিকনা চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। ধারালো অস্ত্রের মতো চাহনি স্পিডি ব্যাগকে ক্ষতবিক্ষত করতে প্রস্তুত। কৎ শব্দে ঢোঁক গিলে নিলে অ্যাদম’স অ্যাপলের ওঠানামা রুদ্ধদ্বার নিস্তব্ধ কক্ষকে ভৌতিক অনুভূতি করায়। স্পিডি ব্যাগে অরুণাভ ভোর সরকারের বিরামহীন আঘাত, আঘাতের শব্দ পরিবেশকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে। হঠাৎ ফোনের রিংটোনে ভাটা পড়ে সবে। অরুণাভ তোয়ালে টেনে ঘাম মুছে। গ্লাভস খুলে রাখলো। ঝাঁপসা গ্লাস সরিয়ে নিজ ঘরে ফিরে এসে বিছানা থেকে ফোনটা তুলে। রিসিভ করে কানে ঠেকালো। কিছুই বলল না। ক্ষণপল পর ওপাশ থেকে চেনা পরিচিত কণ্ঠস্বর শোনা গেলো।
“ইচ্ছে করে ফোন টোন করি নি আমি। হাতে চাপ লেগে চলে গেছে।”
অরুণাভও গম্ভীর গলায় পাল্টা জবাব দিলো, “রিসিভ করি নি, চাপ লেগে হয়ে গেছে।”
“মা’কে মোরগ পোলাও রাঁধতে বলি নি। একাই রেঁধেছে। কেউ একজন এসে যেন খেয়ে যায়। নাহলে মা রাগ করবে।”
ওপাশ থেকে আবারও ভেসে আসে গোলা বারুদ। অরুণাভ কম নাকি! সেও ছুঁড়লো, “আন্টিকে বলা হোক অরুণাভ ডায়েটে আছে। কোচ ভাত অবদি খেতে দিচ্ছে না। মোরগ পোলাও সেখানে বিলাসীতা।”
“কি বলছিস? মোরগ পোলাওয়ের কি হবে এখন?”
“কি আর হবে! আন্টির সুপুত্র গিলবে সব।”
টুটুলের মনটা খারাপ হয়ে যায়। বন্ধুর সাথে ভাব জমাতে মাকে দিয়ে জোর করে মোরগ পোলাও রেঁধেছে। নেটফ্লিক্সে নতুন রিলিজ পাওয়া রোমান্টিক হরর মুভি সিলেক্ট করে রেখেছে। বন্ধুকে ডেকে জমিয়ে আড্ডা দিবে।
“কেউ একজন কি ফোনটা কাটতে ভুলে গেলো? আমি কাটবো?”
অরুণাভের ঠেস দেওয়া কথায় টুটুল জ্বলে পুড়ে উঠলো, “কাটবিই তো। এতো দিন আমাকে ছাড়া চলতো না। ক্রিকেট পাড়ায় গিয়ে নিত্যনতুন বড়লোক বন্ধু বানাইছোস। বেনিফিট পাস, এখন আমি কোন চ্যাটের বা*ল। আমারে তো আর ভাল্লাগবে না।”
অরুণাভ রাগলো না। অতি শান্ত সুরে বলল, “আমি তো স্বার্থপর মানুষ। তোর উপর অহেতুক অধিকার দেখাই। আমার সাথে বন্ধুত্ব করা তোর জীবনের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা গার্লফ্রেন্ড বানাতে পারিস না আমার জন্য। আমি কুফা তাই এদিক সেদিক হলেই বন্ধুত্ব ছিন্ন করার কথা ওঠাস। আমার ব্যবহারে ত্যক্তবিরক্ত হস। তাই ভাবলাম দুরত্বই সই। তোকে একা ছেড়ে দিই। অবশ্য একা কোথায় তুই? ওই চিঠিপত্র আছে না! ফ্রেন্ড উইথ লটস ওফ বেনিফিট!”
প্রথমে শান্ত থাকলেও শেষের দিকে নিজের ভেতরকার ক্ষোভ প্রকাশ না করে থাকতে পারলো না অরুণাভ। সেদিনের পর চার মাস! ১২০ দিন পর অরুণাভের কথা মনে পড়লো? নো ম্যাসেজেস, নো মিসড কল!
ফোনের ওপাশের টুটুলও চুপ থাকলো না। গর্জে উঠে বলল, “লিমিটে থেকে কথা বলবি অরু। পত্রলেখা আমার ফ্রেন্ড, যাস্ট ফ্রেন্ড।”
“যা…স্ট ফ্রেন্ড হুঁ? লাড্ডু ছিলি না ওঁর উপর? পটিয়ে বিয়ে করার ধান্দায় ছিলি…”
“ওটা আমি মজায় মজায় বলেছি। তোকে বিরক্ত করার জন্য। তাছাড়াও একটু একটু ভালো লেগেছিল কিন্তু মেয়েটা বোবা। তাই মনের ঘরে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছি।”
অরুণাভের কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হয়, “এটা কোনো রিজন হলো তালা ঝোলানোর?”
টুটুল দাঁতে নখ খুঁটতে খুঁটতে বলে, “আরেকটা আছে?”
“কি?” অরুণাভের কণ্ঠে কৌতুহল। টুটুল ভোঁতা মুখে বলে, “ব্রো, শি’জ গট আ ক্রাশ ওন ইয়্যু।”
“হোয়াট!”
অরুণাভ চেঁচিয়ে ওঠে। টুটুল দাঁত কেলিয়ে বলল, “বাকিটা জানতে গরীবের বাড়িতে বিনা পয়সায় ভিজিট করুন।”
টুট টুট টুট করে ফোন কেটে যায়। অরুণাভের ভ্রু কুঁচকে যায়। টুটুলের কথার মানে কি? এই চিঠিপত্র টা নিশ্চিত আরেকটা ঝামেলা পাকাবে। ডাঈনী একটা। যবে থেকে দেখা হয়েছে একটার পর একটা ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। কুফা মেয়ে! বিড়বিড় করতে করতে অরুণাভ কাপড় চোপড় নিয়ে ওয়াশ রুমে চলে যায়।
পাতা কোমড়ে হাত চেপে পায়চারি করছে। হাত পায়ে পানি ধরে ফুলে ফেপে আছে। ডাক্তার বলেছে নিয়ম করে হাঁটতে, টুকটাক কাজ করতে। অথচ সারাটাদিন পাতার শুয়ে বসে কাটে। করার মতো একটা কাজও নেই তার। অলস বসে থাকায় মেজজটাও খিটখিটে হয়ে গেছে। কেউ ভালো কথা বললেও সে খিটখিট করে। হুটহাট মেজাজ গরম হয়ে থাকে। এই তো সকালটা ফুরফুরে কাটলেও হুট করে কি হলো অফিস যাওয়ার সময় লোকটার উপর অহেতুক মেজাজ দেখালো। কি কি বলেছিল তা পাতার মাথায় নেই। তবে ভালো কিছুও বলে নি সে নিশ্চিত। লোকটা মুখ কালো করে কিছু না বলেই চলে যায়। ভাবতেই খারাপ লাগা কাজ করছে তার।
এখানেই শেষ নয়। মেয়েটা স্কুল যাওয়ার আগে কিছু বলার জন্য এসেছিল। পাতা বিরক্ত হয়ে বলেছিল তাঁর শরীর ভালো নেই পরে শুনবে। মেয়েটাও মুখ কালো করে বাড়ি ছাড়ে। ছোটজন তো ভয়ে কাছেই ভিড়ে না তেমন। পাতা নিজ পেটে হাত রাখে। বিড়বিড় করে বলে,
“বুঝতে পারছি তো সব। বাকি তিনটের থেকে বেশি বদের হাড্ডি হবি তুই। মাকে জ্বালিয়ে মারবি।”
অবাক করা বিষয় সাথে সাথেই পেটে লাথি অনুভব করে পাতা। কিঞ্চিত ব্যথা পায়। তবে পাতা হাসে। পেটে হাত রেখে বলে,
“তবে রে দুষ্টু! তর সইছে না? এখনি বেরিয়ে আসবি?”
আবারও বাচ্চা মুভ করে। পাতার চোখে পানি এসে যায়। কি সুন্দর অনুভূতি! পেটের ভেতরে থেকেও মাকে অনুভব করতে পারছে। মায়ের কথায় সাঁড়া দিচ্ছে। এমন যন্ত্রণাময় সুখানুভূতি শুধু গর্ভবতী মায়েরাই অনুভব করতে পারে। দুটো প্রাণ একসাথে জুড়ে থাকে কি-না। পাতা স্বীয় পেটে হাত বুলিয়ে বলে,
“জাদুসোনা, এই শেষ মুহূর্তে এসে মাকে যা লজ্জা দিলি! আসবি যখন, জলদি জলদি চলে আসতি। এই বুড়ো বয়সে মা তোর খেয়াল রাখবে কি করে? কতদিনই বা খেয়াল রাখবে। কখন ফিরে যাবার ডাক চলে আসে! তখন কে আদর সোহাগ দিয়ে বড় করবে শুনি?”
“আম্মুউউ, কার সাথে কথা বলছো?”
দোতলা থেকে বড়ছেলের ডাক শোনা গেলো। পাতা সোফায় বসে বললো, “দুষ্টুর সাথে।”
“ইজ দ্য বেবি মুভিং?”
পাতা লাজুক হাসলো। অরুণাভকে আর পায় কে। সে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে আসে। মায়ের সামনে বসে বাচ্চাদের মতো আবদার করে, “ক্যান আই টাচ হার…ওর হিম?”
পাতার গাল ভারী হয়। অস্বস্তি বোধ হয়। অরুণাভ কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে অনুনয় করে, “প্লিজ আম্মু?”
অস্বস্তিতে ঘাট হলেও ছেলের আবদার ফেলতে পারে না পাতা। ছেলের একহাত বাড়ন্ত পেটে রেখে মাথা নেড়ে বলে, “কথা বলো ওঁর সাথে। দেখবে রেসপন্স করছে!”
অরুণাভ পেটের কাছে কান ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে ডাকে, “হেয় লিটল বাডি! হোয়াটস আপ? ইজ দ্যাট এভরিথিং ওকে হেয়ার?”
পাতা চোখ পিটপিট করলো। বাচ্চা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে না। অরুণাভ আবারও ডাকে কিন্তু তাঁর অনাগত ভাই বা বোন সাঁড়া দিলো না। সে দুঃখী দুঃখী মুখ বানিয়ে মায়ের দিকে তাকায়। এবার পাতা ডাকলো,
“এই দুষ্টু, ভাইয়ের সাথে কথা বলবি না?”
আশ্চর্য একটু আগেই সাঁড়া দিচ্ছিলো। এখন দিচ্ছে না। পাতাও দুঃখী মুখ বানালো। অরুণাভ হেসে বলল, “মায় ব্যাড! কোনো ব্যাপার না। যখন আসবে ভাইকে ছাড়া কিছুই বুঝবে না।”
পাতা হাসলো। অরুণাভ উঠে দাঁড়ালো। অধিকারবোধের সাথে বলল,
“মনে রেখো আম্মু? ভাবনা, ওলাফের মতো এই বেবিও সবার আগে তাঁর বড় ভাইয়ের কোলে আসবে। নাহলে আমি কষ্ট পাবো।”
“আচ্ছা বাবা ঠিক আছে। কিন্তু এখন কোথায় বেরুচ্ছো? খবরদার! আমাকে একা বাড়িতে রেখে যাওয়ার প্ল্যান করলে কিন্তু ভালো হবে না।”
অরুণাভ অপ্রস্তুত হেসে বলল, “আসলে জরুরি কাজ আছে। যাবো আর আসবো।”
“নাহ্”
“আম্মু প্লিজ? ইটস্ ইমার্জেন্সি।”
“না বলেছি। আর কিসের ইমার্জেন্সি? ম্যাচ তো নেই আজ। তবে?”
অরুণাভ ঘার ডলে। কিছু বলতে নিবে এরইমধ্যে কলিং বেল বেজে উঠলো। পাতা ইশারা করে বলে, “যাও দরজা খোলো।”
অরুণাভ মূল ফটকের দিকে যেতে যেতে বলল, “একটু পরেই ভাবুক চড়ুই, ওলাফ চলে আসবে। আমি একটু টুটুলদের বাড়িতে যাবো। বেশিক্ষণ থাকবো না।”
“টুটুলকেই ফোন করে আসতে বলো।”
“ওঁর ঠ্যাং ভাঙা। আসতে পারবে না। আমাকেই যেতে হবে।”
অরুণাভ ক্ষণিকের মধ্যে বন্ধুর ঠ্যাংটাও ভেঙে দিলো। গলা খাঁকারি দিয়ে দরজা খুলে দেয়। দরজায় দন্ডায়মান মানবীকে দেখে মুখের আদল পরিবর্তন হয়।
“তুই এখানে?”
আনিকা ছোট ছোট চোখে চায়। বেইজ জিন্স, অক্সফোর্ড শার্ট। আধ ভেজা চুল থেকে ম্যান শ্যাম্পুর স্মেল আসছে। গম্ভীর গম্ভীর ভাবটা স্যুট করে বান্দার সাথে। আনিকা মুগ্ধ হলেও তা প্রকাশ করলো না। অরুণাভকে ধাক্কা দিয়ে বলল, “সর, তোকে পরে দেখে নিবো। আগে চাচিমণিকে বলি তার গুনধর ছেলের কীর্তন। কোথায় চাচিমনি?”
অরুণাভ দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। ছোট্ট করে বলে, “ড্রয়িংরুম।”
আনিকা তাঁর দিকে কড়ছা দৃষ্টি ফেলে ভেতরে চলে যায়। পাতা আনিকাকে দেখে ঝলমলে হাসি উপহার দিয়ে বলল, “আনিবুড়ি যে! কেমন আছো?”
বলেই উঠতে নেয় পাতা। আনিকা ছুটে এসে বাঁধা দেয়। নিজেও চাচির পাশে বসে বলে, “আমার কথা পরে বলি। আগে বলো তুমি কেমন আছো? ওলাফ, অরু আর বেবি কেমন আছে? এ বাড়িতে এসে আমাদের ভুলেই গেছো। একটা ফোনও করো না।”
পাতা ভাতিজি অভিমানে হাসে। আড়চোখে ছেলের দিকে তাকাতে ভুলে না। গম্ভীর মলিন মুখ খানা দেখলেই মায়া হয়। তাঁর হাসিখুশি চঞ্চল ছেলেটা এক রাতের ব্যবধানে কেমন বদলে গেছে। আগের মতো প্রাণ খুলে হাসে না, মজা করে না। তাঁর এই পরিবর্তনের পেছনে আনিকার হাত আছে সে জানে।
“ফোন করলে যদি বিরক্ত হও তাই করি না। তাছাড়াও রুবি আপু চাইছে না আমরা তোমার সাথে সেরকম যোগাযোগ রাখি।”
পাতা বলতে চায় নি। মুখ ফসকেই বেরিয়ে গেছে। সে আফসোস করলো। অরুণাভের মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে ওঠে। চাচিমণি আম্মুকে বলেছে এই কথা? হাউ ডেয়ার শি!
আনিকার চোখে মুখেও বিস্ময়। সে বিস্মিত সুরেই বললো, “আমি এটা বিশ্বাস করি না। আম্মু এটা কখনোই বলতে পারে না। আম্মু রোজ তোমাদের কথা বলে…”
অরুণাভ নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারলো না। তাজা ফুলে শোভা ছড়ানো ফুলদানি মেঝেতে আঁছড়ে ফেলে আনিকার উপর চেঁচিয়ে ওঠে, “তাহলে কি আম্মু মিথ্যে বলছে? আনিকা আমার মাথা খারাপ হওয়ার আগেই কেটে পর এখান থেকে। উনি নিজেকে ভাবেন কি হ্যাঁ? কিছু বলি না বলে মাথায় উঠে নাচবে? জনে জনে অপমান করে…”
“ভোর?”
মায়ের ডাকে কথা থামালেও মুহুর্তেই সেই ধারা ফিরিয়ে এনে বলে, “আম্মু প্লিজ। ওই মহিলার সাহস কি করে হয় তোমাকে অপমান করার? ওনার মেয়ের সাথে যোগাযোগ করার জন্য কে মরে যাচ্ছে শুনি? দুনিয়ায় মেয়ের অভাব পড়েছে নাকি? যে আনিকা সরকার না হলে দেবদাস হয়ে ঘুরে বেড়াবো।”
আনিকার মেঘ জমা চোখ দুটো টলমল করছে। বারিধারা ভুপতিত হতেই তা মুছে নেয় আনিকা। অপমানে থমথমে গলায় বলে, “আমার মা কিংবা আমি বলি নি আমার জন্য দেবদাস হয়ে ঘুরে বেড়াও। দুনিয়ায় আরও সুন্দর সুন্দর মেয়ে আছে। আর তুমি তাদের কোলে নিয়ে ঘুরেও বেড়াচ্ছো আজকাল। আর আমি বোকা অনুশোচনায় ছাই হচ্ছিলাম। যে আমি ফিরিয়ে দেওয়ায় ছেলেটা কষ্ট পেয়েছে, আমার উপর অভিমান করে দূরে দূরে থাকছে। অবশ্য আমি ফিরিয়ে দিই নি। যাস্ট সময় চেয়েছিলাম কিছুদিন। ভাগ্যিস চেয়েছিলাম। নইলে কি করে দেখতাম, মানুষ এতো দ্রুত রং বদলায়। কারো আবেগে গা ভাসাই নি, নাহলে নিজেই ভেসে যেতাম।”
অরুণাভ বিরক্ত মুখে বলে, “তুই না নিজের নাটক ওফ কর এখন…”
“ভোর একদম চুপ। কোথায় যাছিলে যেন? যাও?”
পাতা ভোরকে সরানোর চেষ্টা করে। অরুণাভ বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইলো। বলল, “আমি আছি, তুমি এটাকে বের করো।”
“থাকতে আসি নি এখানে। চলেই যাবো। তার আগে আমার চাচিমণির সাথে কথা আছে। চাচিমণি তোমার ছেলেকে সরাও এখান থেকে।”
আনিকা নাক টেনে টেনে দৃঢ়তার সাথে বলে উঠলো। ভোর তাঁর সাথে এরকম দুর্ব্যবহার করতে পারলো? সে ভোরের জন্য আব্বু আম্মু, নানু সবার সাথে তর্কবিতর্ক করেছে, স্টিল করে যাচ্ছে। বন্ধু বান্ধবদের কথায় কান দেয় নি। সবসময়ই চেয়েছে সে তাঁর পঁচা ভোরের লাল টুকটুকে বউ হবে। কিন্তু ভোর!
পাতা উঠে এসে ছেলেকে ঠেলে সরাতে চায়। অরুণাভ এক চুল পরিমানও সরলো না। থমথমে মুখে বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইলো। বিরক্ত পাতা বাহুতে ঘুষি মেরে বলে, “তোমাকে পরে দেখে নিচ্ছি। আর আনিবুড়ি কি বলবে? পার্সোনাল কিছু? তাহলে চলো ঘরে যাই।”
আনিকা উঠে দাঁড়ালো। অরুণাভের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বললো, “এখানে বললেও সমস্যা নেই। তোমার আদরের ছেলের ব্যাপারেই কিছু বলতে চাইছি। তুমি কি শুনবে?”
পাতা চিন্তিত হয়। কি বলবে আনিকা? আনিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভোরের সাথে আমার টম-জেরীর সম্পর্ক তা তো জানোই। তবুও কেন যেন আমার মনে অদ্ভুত ইচ্ছে জাগে। চাচ্চু সবসময় বলতো ভোরের জন্য লাল টুকটুকে বউ আনবে। আমি ভাবতাম লাল টুকটুকে বউ এলে তো ভোর আর আনির সাথে খেলবে না, ঝগরা করবে না, মারামারি করবে না। সারাক্ষণ বউয়ের সাথে থাকবে। তাই আমি বুদ্ধি খাটিয়ে চাচ্চুর কাছে বলি আমাকে ভোরের লাল টুকটুকে বউ বানিয়ে নাও। চাচ্চু শুধু হাসতো। বড় হওয়ার পরেও আমার এই ইচ্ছেটা রয়ে যায়। আম্মু ভোরকে তেমন একটা পছন্দ করে না। পছন্দ না করার একশ একটা কারণ আছে। কারণ গুলো কিন্তু ফেলে দেওয়ার মতো না। তবুও আমি ভোরের বউ হবার স্বপ্ন দেখে এসেছি। টুটুলের মাধ্যমে আমি জানতে পারি ভোর আমাকে ভালোবাসে। আমার তো খুশির অন্ত রইলো না। মেঘ না চাইতেই জল টাইপ কিছু। আমি চাইতাম ভোর আমাকে প্রপোজ করুক। কিন্তু ও এতো ভীতু, জানা ছিলো না। আমিই প্রেসার দিয়ে পেটের খবর বের করেছি। এরপর কি হয়েছে তোমরা তো জানাই। যা জানো না, তা হলো তোমার ছেলে গোপনে কোর্ট ম্যারেজ করতে চেয়েছিল। আমি শুরুতেই বিরোধীতা করেছিলাম। কিন্তু ওর আবেগভরা কথায় একসময় গলে যাই।”
পাতা অবাক দৃষ্টিতে তাকায় ছেলের দিকে, “কোর্ট…ম্যারেজ তোমার বাবা জানে?”
“না” অরুণাভের স্পষ্ট গলা। পাতা অশান্ত হয়ে বলল, “পরিবারকে না জানিয়ে তোমরা এটা কি করে করতে পারো? আই কান্ট বিলিভ! আমি নিজেই তো মানতে পারছি না। লোকটা জানলে…”
পাতা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। অরুণাভ মাকে বসিয়ে দেয়। ছুটে গিয়ে পানি আনে। আনিকা ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল, “চিন্তার কিছুই নেই চাচিমণি। আমরা সেরকম কিছুই করি নি। অবশ্য তোমার ছেলে জেঁকে ধরেছিল। কিন্তু আমি মনে শান্তি পাচ্ছিলাম না। বয়সই কত আমাদের? এই বয়সে বিয়ে! তাও পরিবারকে না জানিয়ে! আমি আগের দিন রাতে ওকে ডেকে বোঝাই। সময় চাই। তোমার ছেলে বলেছিল যত সময় লাগে নে। ও অপেক্ষায় থাকবে। কিন্তু তোমার ছেলে চারমাস না যেতেই অন্য জায়গায় পিছলে পড়েছে।”
“একদম ফালতু কথা বলবি না? এখানেই পুঁতে ফেলবো। নিজের মতো ভাবিস নাকি? আমার ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই। খাদ একটাই ভুল মানুষকে ভালোবেসেছি। ছলনা তুই করেছিস। কি ভেবেছিস টাকি তুই? আমি জানতে পারবো না? তৈমুর নেওয়াজের সাথে তোর ভেঙে যাওয়া বিয়ে আবারও জোড়া লাগানো হচ্ছে, খুব শিঘ্রই জুড়েও যাবে। এখন এখানে এসেছিস নাটক করতে।”
অরুণাভ এক চুল ছাড় দিলো না বলতে। আনিকা একদৃষ্টে পাতার দিকে তাকিয়ে। পাতা কি বলবে ভেবে পেলো না। তাঁর শরীর খারাপ লাগছে। প্রেসার বাড়ছে বোধহয়!
“চাচিমণি তোমার ছেলেকে চুপ করতে বলো। আমি কিছু বলছি না কি?”
পাতা ভোরকে থামিয়ে বলল, “আনিকাকে বলতে দাও। আনি তুমি বলো?”
আনিকা বরফ শীতল গলায় বলল, “আমি নিজ চোখে দেখেছি। এখন বলো, পত্রলেখার সাথে তোমার ছেলের কিসের সম্পর্ক? কেন সে আমাকে মিথ্যে বললো, মেয়েটা টুটুলের গার্লফ্রেন্ড। ওঁর কিছুই না। চেনেও না।”
পাতা মনে করার চেষ্টা করে। পত্রলেখা নামটা সে অনেকবার শুনেছে। কিন্তু কোথায় শুনেছে মনে করতে পারে না। তাঁর মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সে ছেলের দিকে তাকায়। অরুণাভ আনিকার দিকে তাকিয়ে। চোখে মুখে অবাকতার রেশ। আনিকা কাঁদছে। ভোরের দিকে আঙুল তুলে কান্না বিজরিত সুরেই বলল, “তুমি ওকে জিজ্ঞেস করো পত্রলেখার সাথে ওঁর কিসের সম্পর্ক। কেন ওকে বুকে আগলে রাখবে? কেন মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দেবে। আবার কোলেও নিয়েছিল।”
“আম্মু, মেয়েটা অসুস্থ হয়ে রাস্তায় পড়েছিল। আমি যাস্ট মানবতার খাতিরে হেল্প করতে এগিয়ে গিয়েছিলাম। তুমি প্লিজ ওর উল্টাপাল্টা কথায় কান দিও না। আর তোকে এসব কে বলেছে?”
অরুণাভ আনিকার উপর তেতে উঠলো। আনিকা তাঁকে অগ্রাহ্য করে পাতার উদ্দেশ্যে বলল, “চাচিমণি তুমি কি পত্রলেখার পরিচয় জানো?”
অরুণাভ হঠাৎ স্তম্ভিত হয়। অনুভূতিহীন চোখে আনিকার পানে তাকিয়ে। এই মেয়েটা এমন কেন? কি চাইছে ও? পাতা বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কে সে?”
“চাচ্চুর এক্স ওয়াইফ বর্ষা চৌধুরীর বোনের মেয়ে। আর সেই মেয়ের সাথে তোমার ছেলের ওঠাবসা। অথচ কি ফন্দিই না এঁটে বলেছিল টুটুলের গার্লফ্রেন্ড হয়।”
পাতা ছেলের দিকে তাকায়। অরুণাভের মস্তক নত হয়ে আসে। সে আনিকার আচরণে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। মেয়েটা চাইছে কি? মেয়েটা কি তাঁর সাথে চিঠিপত্রকে দেখে হিংসায় জ্বলছে? কেন জ্বলবে? তাঁর বুক ভরা ভালোবাসাকে নিয়ে এক্কাদোক্কা খেলে শেষ মুহূর্তে এসে বস্তা পঁচা আবেগ বলে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
পাতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনিকাকে বলল, “আমি জানি পত্রলেখার বিষয়টা। ভোর অনেক আগেই বলেছে আমাকে। মেয়েটা অসুস্থ ছিল, সেন্সলেস হয়ে পড়েছিল রাস্তায়। তাই হেল্প করেছে। ওর জায়গায় অন্যকেউ হলেও হেল্প করতো। তুমি বিষয়টা নিয়ে বেশি ভাবছো তাই তোমার কাছে দৃষ্টি কটু লাগছে। তাছাড়াও বর্ষা চৌধুরী যেমনই হোক, ভোরের জন্মদাত্রী সে। যতই আবেগ বিবেকের কথা বলা হোক নারি কাটা সম্পর্কটাকে ভুলে যাওয়া কষ্টকর। আর পত্রলেখাকে নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।”
আনিকা অবাক চোখে চাচির দিকে তাকিয়ে, “তুমি কিছু বলবে না?”
পাতা বিভ্রান্ত হয়ে বলল, “কি বলবো?”
“কি বলবে মানে? ও ওই মেয়ের সাথে কেন সম্পর্ক রাখবে হ্যাঁ? আমার সাথে রিলেশনে আছে ভুলে গেছে ও? আমি কিন্তু এসব সহ্য করবো না। তোমার ছেলেকে খুন করে ফেলবো।”
পাতা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাখলো। আনিকা রেগে ঘেমে অস্থির। ভোরের সাথে অন্য একটা মেয়েকে দেখে তাঁর কলিজা এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে যাবার উপক্রম। সে অনুভব করেছে ওই বদরাগী ছেলেটার প্রতি তাঁর ভালোলাগা ছাপিয়ে ভালোবাসাও আছে। ওকে ছাড়া তাঁর চলবে না। সে পুর্বের মতো তেজস্বী স্বরেই বলল,
“ওই মেয়ের আশেপাশে দেখলে ওঁর খবর আছে। আমি ফোন করে দেখা করতে বললে লুকোচুরি খেলবে আর অন্য মেয়েদের কোলে নিয়ে ঘুরবে? ওকে তো আমি…!”
আনিকা তেড়েফুঁড়ে যায় অরুণাভের দিকে। চুলের মুঠি ধরতেই নিবে অরুণাভ হাতের কব্জি চেপে ধরে মুচড়ে দেয়। আগুনঝরা দৃষ্টি ক্ষেপন করে বলে, “নিজের গন্ডিতে থাক আনি।”
“আমি নিজের গন্ডিতেই আছি। তুই পথ ভুলে অন্যদিকে ভিড়ছিস। আমার সাথে এমনটা করতে পারিস না তুই। আমাকে ধোঁকা দিতে পারিস না।”
আনিকা ধরা গলায় প্রত্যুত্তর করে। অরুণাভ আনিকার হাত ঝটকা মেরে ছেঁড়ে দিলো। গম্ভীর মুখে বলল, “আমি ধোঁকা দিচ্ছি? এখনি বিয়ে শাদিতে জড়াবি না। ক্যারিয়ার হ্যান ত্যান কত বুঝ! সময় নিলি। তারপর কি হলো? সেই বিয়ের পিঁড়িতেই বসছিস।”
কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলছে না। পাতা দুজনকে থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে দু’জনকে। দুটোই আগুনের গোলা! এদের ভাব অসম্ভব! এঁরা কেউ কাউকে বোঝার চেষ্টাই করে না।
ইদানিং অফিসে ব্যস্ততা বেড়েছে। অরুণ সরকার হাঁফ ছাড়ার ফুরসত পায় না। মধ্যাহ্ন গড়িয়ে অপরাহ্ন উঁকি দেয় অথচ কাজের চাপে মধ্যাহ্ন ভোজ গ্রহণ করা হয় নি। অন্ততপক্ষে ওষুধ গুলো খাওয়া উচিত ছিলো। সকাল ও রাতের ওষুধ পেটে গেলেও দুপুর বেলার ওষুধ অরুণ সরকারের ঘরের বিনে জমায়েত হয়। কবে যে পাতাবাহারের কাছে হাতেনাতে ধরা খায় কে জানে! এমনিতেই দিন দিন শরীরে নানান অসুখ বসতি গড়তে মরিয়া। নাহ্ শরীর চলছে না। পেটকে শান্ত করতে হবে। সুজনকে কল লাগানোর জন্য ফোন হাতে নেয়। তবে ফোন করার প্রয়োজন পড়ে না। সে হাজির। অরুণ ল্যাপটপের সাটার বন্ধ করে সুজনকে বলে,
“আসো, তোমাকেই কল করতে যাচ্ছিলাম।”
“আপনি কল করার আগেই আমি হাজির বস। কিছু বলতেন বস?”
“হুম হু!”
“সে না হয় বললেন, তাঁর আগে এই খামটা দেখুন তো। রানার দিয়ে গেলো! ই-মেইলের যুগেও রানার! আমি তো অবাক হয়েছি।”
অরুণ সরকারের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে, “কিসের খাম? কি আছে ওতে?”
ভাব তরঙ্গ পর্ব ২০
“আপনিই খুলুন বস। হয়তো কোনোকিছুর রিপোর্ট।”
অরুণ হাতে নেয় খামটা। প্রেরকের নাম দেখে খামটা ড্রয়ারে রেখে দিলো, “পরে দেখবো। আগে খাওয়ার মতো কিছু আনো তো! আ’ম হাঙরি!”
“জি বস! কি খাবেন?”
“যা কিছু, সাথে কড়া লিকারের চা।”
সুজন মাথা নেড়ে চলে যায়। অরুণ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। ড্রয়ার টেনে খুলে খামটা দেখে। বের করার সাহস হয় না। আবারও বন্ধ করে রেখে দেয়! কি আছে ওই খামে?
