Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৫

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৫

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৫
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

দেখতে দেখতে নিঝুম অন্ধকারে তলিয়ে গেল প্রণয়। স্নায়ুযুদ্ধে হেরে গেল তার প্রকৌশলী মস্তিষ্ক।
আধ-বোঝা চোখ দুটি মেলে রাখার দুর্বুদ্ধ প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়লো।
ধপ করে ভারী দেহখানা আঁচড়ে পড়লো মার্বেল বসানো শীতল মেঝেতে।
শিরা বেয়ে গলগল করে বেরিয়ে আসা উষ্ণ স্রোতে ভেসে যেতে লাগল সাদা ফ্লোর।
হিমালয়ের ন্যায় প্রভাবশালী দেহখানা মুহূর্তেই পরিণত হলো এক ভঙ্গুর ধ্বংসস্তূপে।
দূর হইতে খুব ক্ষীণ স্বরে ভেসে আসছিল নারী কণ্ঠের আর্ত চিৎকার।
ব্যাস, এতোটুকুই। সম্পূর্ণ চেতনা হারানোর আগমুহূর্তে কেবল এতটুকুই মনে আছে প্রণয়ের।
বর্তমান।

গতরাতে প্রহেলিকার সমস্ত ক্রিয়াকলাপ স্মৃতির পাতায় স্পষ্ট হতেই প্রচণ্ড রাগে শরীরের পেশীগুলো টানটান হয়ে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো প্রণয়ের। শরীরের লোহিত তরল টগবগ করে ফুটতে লাগলো।
তীব্র ক্রোধের রোষানলে শরীরের সমস্ত যন্ত্রণা যেন গায়েব হয়ে গেল নিমিষেই।
এই মুহূর্তে বিভৎস খুনের নেশা চেপে আছে মাথায়, তাই অন্য কোনো অনুভূতি টের পেলো নাহ্ প্রণয়।
চেহারার ভাব মূর্তি হিংস্র জানোয়ারের থেকেও ভয়ানক।
জানালায় টানানো মোটা মোটা চারকোল কালারের পর্দার ফাঁক গলিয়ে এক ফালি মৃদু রোদ্দুর এসে আঁচড়ে পড়ছে বিছানায়।
সূর্যের আলোয় প্রণয়ের বাদামী চোখে রিফ্লেক্ট করছে। বিধায় চোখের হিংস্রতা আরো কয়েক গুণ বেশি ইন্টেন্স লাগছে।
নিঃশব্দ ক্ষোভ ফেটে পড়লো প্রণয়। বুকের ভেতর জমে থাকা শতাব্দীপ্রাচীন সমস্ত ঘৃণার সক্রিয় আগ্নেয়গিরি তীব্র এক বিস্ফোরণে গলা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো। সিলিংয়ের ওই ধূসর ফ্যাকাসে রঙের পানে চোখ রেখে এক বিকট পৈশাচিক চিৎকার দিয়ে উঠলো—

— “আহহহহহহহহহহহহহহহ্!”
অমানবিক চেপে গলার রগ ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো প্রণয়ের। আর্তনাদে উৎপন্ন প্রবল শব্দতরঙ্গ চারপাশের সাউন্ড-প্রুফ দেয়ালে বাড়ি খেয়ে আরো চারগুণ বিকট শব্দ উৎপন্ন করলো।
আশেপাশের বাতাস জমে গেল মুহূর্তেই।
নিজের উন্মুক্ত শরীরের পানে চোখ পড়তেই গা পিত্তি জ্বলে উঠলো প্রণয়ের। প্রচণ্ড ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো অন্যদিকে।
মনে হলো তার গায়ের চামড়াগুলো কেউ জ্বলন্ত আগুনের শেকে দিচ্ছে।
নিজেকে অস্পৃশ্য মনে হচ্ছে প্রণয়ের।
পুরুষালী ইগো আজ ভেঙে খানখান।
শরীরে অ্যাসিড ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার প্রবল বাসনা উদ্যত হচ্ছে প্রণয়। বুকের ভেতরটা কী অসহনীয় যন্ত্রণায় জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে, তা কী কাউকে দেখাতে পারবে প্রণয়?
তার সাজানো বাগান তছনছ হয়ে গেছে, সুখের আকাশটা আজ ঢেকে গেছে বিষাদের কালো মেঘে।
পুরুষের দেহ কখনো অপবিত্র হয় কি না, জানা নেই প্রণয়ের। কিন্তু আজ তার নিজেকে বড্ড অশুচি মনে হচ্ছে।

নিজের দেহের পানে তাকাতে রুচিতে বাঁধছে প্রণয়ের। ব্যক্তিত্বের প্রবল ঘা লাগছে।
সে নিজেই যেখানে মানতে পারছে নাহ্, তাহলে তার জান কি মেনে নেবে? হয়তো মেনে নেবে। কিন্তু আগের মতো ভালোবাসবে কি?
তার কলুষিত দেহে আগের মতো শান্তি খুঁজে পাবে? তাকে অবাধে কাছে যেতে দেবে আগের মতো?
ক্লান্তিতে চোখ দুটো বুজে আসে প্রণয়ের। সে আর ভাবতে পারে না— কোন মুখে সে নিজের জানের সম্মুখে দাঁড়াবে, চোখের পানে তাকিয়ে কী জবাব দেবে? তার কাছে কি কোনো সৎ উত্তর আছে?
প্রণয় তো শিকদার, তো এতো ক্ষমতাধর সাম্রাজ্য গড়তে জানে, কিন্তু কোনো বলেই সে গতরাতটাকে বদলে ফেলতে পারবে না। পারবে না সময়টাকে মুছে ফেলতে। পারবে নাহ্ তার চরিত্রের দাগটা মিটিয়ে ফেলতে।
প্রহেলিকা তার নিষ্কলঙ্ক চরিত্রের একটি চিরস্থায়ী কালো দাগ টেনে দিয়েছে।
চোখের কোটরে উপচে তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। প্রণয় বুকের বা পাশে হাত চেপে ধরে কাতর কণ্ঠে বলে—

— “জান, আমি বেইমানি করে ফেলেছি তোর সাথে। আমি সৎ থাকতে পারিনি পাখি, তোর প্রণয় ভাই তোকে ঠকিয়েছে। তোর হকের যথাযথ হেফাজত করতে পারেনি… এই অক্ষমতা আমি কী দিয়ে ঢাকবো জান, বলতে পারিস।”
প্রণয়ের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। বুকের ভেতর ভরে উঠলো অনুশোচনা ও অপরাধবোধের নীল বিষে।
হঠাৎ খট করে ঘরের দরজায় শব্দ হয়। চকিতে ফিরে তাকায় প্রণয়।
ধোঁয়া ওঠা কফির মগ হাতে, পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে প্রহেলিকা। পরনের ল্যাভেন্ডার কালারের হালকা সিফন শাড়ি। শাড়ির আস্তরণ এতই হালকা যে শাড়ীর ভেতর দিয়ে পেট-বুক সব দৃশ্যমান।
কোমরের নিচে দুলতে থাকা ভেজা চুলের গুচ্ছ থেকে ঝরে পড়ছে টুপটাপ জলের বিন্দু।
প্রহেলিকা কক্ষে প্রবেশ করতেই বুনো ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণে মুখরিত হয়ে গেলো পরিবেশ।
আগন্তুকের উপর দৃষ্টি পড়তেই বিতৃষ্ণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো প্রণয়।
গরম কফি মগটা বেডসাইড টেবিলের ওপর রেখে কুটিল হাসলো প্রহেলিকা। সুমধুর কণ্ঠে বললো—

— “বাহ্, এতো তাড়াতাড়ি উঠে গেছো প্রণয় বেবি! তা বেশ করেছো। গুড মর্নিং। ঘুম ভালো হয়েছে তো? অবশ্য খারাপ হওয়ার চান্স নেই।”
নিজের প্রশ্ন করলো, আবার নিজেই জবাব দিলো প্রহেলিকা। তার চেহারার প্রতিটা ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে এক অমোঘ সন্তুষ্টির চাপ।
সে যেন প্রচণ্ড উত্তেজিত। কথা বলতে বলতে প্রণয়ের একদম নিকটে চলে এলো। প্রহেলিকা গা ঘেঁষে বসে পড়লো বিছানায়।
খুব মনোযোগ দিয়ে ঠায় পলক না ফেলে তাকিয়ে রইলো তার প্রিয় পুরুষটার দিকে। এই দেখার যেন কোনো শেষ নেই।
দেখতে দেখতে আচমকা প্রণয়ের এলোমেলো অবিন্যস্ত চুলে আঙুল গলিয়ে দিলো প্রহেলিকা। আর কাছ থেকে দেখার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠলো তার চোখের চাহনি— এমন এক অদ্ভুত তৃষ্ণা, যার পিপাসা নিবারণে সাগরের পর সাগর উজাড় হয়ে যাবে, তবুও প্রাণে শান্তি মিলবে নাহ্।
আবেগী কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হলো প্রহেলিকার—

— “আজকের মর্নিং ভিউটা ঠিক তেমন, যেমন আমার বত্রিশ বছরের কল্পনা। আমার স্বপ্নগুলো কোনোদিন এভাবে সত্যি হবে ভাবিনি প্রণয়।”
প্রহেলিকার প্রথম স্পর্শেই গা জ্বলে গেল প্রণয়ের। তার উপর প্রহেলিকার স্পর্শগুলোকে মনে হচ্ছে কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা।
দপদপ করে জমা রাগ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে প্রণয়ের। হাতের মুঠো শক্ত, দাঁত কিড়মিড় করে বললো—
— “জাস্ট এক সেকেন্ডের জন্য আমার হাত দুটো মুক্ত করে দে, তোকে ভিসা ছাড়াই নরকে পাঠিয়ে দেবো।
ঠিক কোন নরকে আছিস বুঝে উঠার আগেই নিজেকে আল্লাহর ডেগে আবিষ্কার করবি।”
ঠোঁট কামড়ে হাসলো প্রহেলিকা।
আবেগীয় মুহূর্তে প্রণয়ের বিষাক্ত বাগ্ধারায় মোটেও ব্যথিত হলো নাহ্। ভালোবাসার মানুষটার থেকে তিরস্কার পেতে পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
তাই ভয়ও পেলো না। আরো নিবিড়ভাবে লেপ্টে রইলো।
কাত হয়ে মাথা এলিয়ে দিলো প্রণয়ের নগ্ন বুকে। সুখের আবেশে দু’চোখ বুজে এলো। তার নিচু কণ্ঠে বিড়বিড় করে গাইলো—

— “লিখবো তোমার হাতে আমি আমার মরণ।”
রাগে দাঁতে দাঁত পিষলো প্রণয়। কটমট করে বললো—
— “মানুষকে কবরে ডাকলে যেমন মানুষের মরণের চুলকানি উঠে, তোরও তাই হয়েছে। সীমা ছাড়ানোর হিসাব তোকে খুব বাজেভাবে দিতে হবে।”
মঞ্জুর।
— “আমার গা গুলাচ্ছে তোর এই নোংরা শরীরটা নিয়ে। আমার উপর থেকে সর। তোর থেকে ডাস্টবিনকে আমার বেশি পরিচ্ছন্ন মনে হয়।”
— “তাই আমার শরীরের প্রতি এতো ঘৃণা? তাহলে কাল রাতে…”
প্রহেলিকা কোথায় মধ্যিখানে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো প্রণয়—
— “Just Shut your fucking mouth!”
প্রণয়ের এই জোরদার ধমকে যেন এক ধাক্কায় ঘরের তাপমাত্রা নেমে গেলো কয়েক ডিগ্রি।
তবে প্রহেলিকার চোখে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে সম্পূর্ণ নির্ভীক। ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো প্রহেলিকা। ক্রুর কণ্ঠে বললো—

— “Okay Okay Cool। প্রণয়, ধীরে বললেও আমি শোনবো। কিন্তু তুমি যদি এভাবে চিৎকার করো, মানুষ তোমার উপরেই সন্দেহ করবে।”
— “You are fucking prostitute! তুই আমার ভালোবাসার দূর! তুই আমার দয়ারও যোগ্য না। তুই আমার রক্তের তাই তুই এতো কিছু করার পরেও তোকে মারিনি, বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি— বিষধর সাপ পুষতে নেই।
জন্মাতেই মেরে ফেলতে হয়।
তোকে যদি সঠিক সময় মেরে ফেলতাম, তাহলে আজ আমার জীবনের এমন দশা কি হতো।
আমার জীবনের অমাবস্যার কালো রাত তুই।
আমার জীবনের গ্রহণ তুই।
তোকে একটা উপদেশ দেই— তুই আমাকে একদম ছাড়িস না। বাঁচতে চাইলে এখুনি মেরে ফেল আমায়। পরে আমি বাঁচলে কিন্তু তুই বাঁচবি না।”

প্রণয়ের চোখের রঙ ভয়াবহ লাল। বাদামি বৃত্তের আশেপাশে যেন রক্তের মেঘ জমেছে। প্রণয়ের কণ্ঠের থমথমে ভাব দুজনের মধ্যেকার পিনপতন নিরবতা যেন ঘরের বাতাসকে জমিয়ে দিয়েছে মুহূর্তেই।
নিজের ভালোবাসার মানুষের মুখ থেকে এমন সম্বোধন শুনে ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেল প্রহেলিকার। শরীরে লড়াই করার জোর যেন ধীরে ক্ষয় হতে লাগলো।
প্রণয়ের বাক্যগুচ্ছে সতর্কবাণী ছিল না— ছিল এক দৃঢ় নিশ্চয়তা, যেটা হবেই।
অপমানে সুন্দর মুখটা কালো হয়ে গেলো প্রহেলিকার। সে প্রণয়ের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বসল। সোজা তাকালো প্রণয়ের চোখের গভীরে— যেখানে নিজের জন্য ভালোবাসা বা ঘৃণা কোনো অনুভূতিই দেখতে পেল না। কেবল পুরনো সেই বিষাক্ত শূন্যতা।
ঘৃণাও এক ধরনের অনুভূতি, কিন্তু প্রণয়ের চোখে সেটাও নেই। কেবল শূন্য নির্লিপ্ত এক চাহনি, যা প্রহেলিকার আত্মসম্মানকে নীরবে বেত্রাঘাত করে।
হুট করেই নিজেকে অসহায় লাগতে শুরু করলো প্রহেলিকার। ভালোবাসার মানুষটা তাকে শেষ পর্যন্ত “বেশ্যা”-র সাথে তুলনা করছে। ভালোবাসার মানুষের নিকট তার মূল্য ফুটো শিকে বরাবরও নয়।
সচ্ছ পানিতে চোখ টলমল করে উঠলো প্রহেলিকার। দুই হাতের আঁজলে প্রণয়ের খোঁচা খোঁচা দাড়িযুক্ত মুখটা আকড়ে ধরলো। অসহায় আকুল কণ্ঠে বললো—

— “দোহাই লাগে, এভাবে আমাকে বলো নাহ্ প্রণয়। কতো কষ্ট হয় আমার। একটু তো বুঝো। তুমি তো জানো, ভালোবাসে মানুষের মুখে কটু বাক্য বুকের ঠিক কোন খানটায় লাগে।
আর আমি তো আজ পর্যন্ত ভালো-মন্দ যাই করেছি, শুধু তোমাকে ভালোবাসি বলে করেছি, তোমার একটুখানি মনোযোগ, একটুখানি ভালোবাসা পাওয়ার আশায় করেছি। আমাকে কি আপন করে নেওয়া যায় না, প্রণয়? ভিক্ষা চাচ্ছি তোমার কাছে। প্লিজ…”
প্রহেলিকার এমন আকুল কণ্ঠে পাথরের মন গলতে বাধ্য, কিন্তু প্রণয় নিষ্ঠুর। তার মধ্যে বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখা গেলো নাহ্।
ঝটকা মেরে মুখ সরিয়ে নিলো প্রণয়। ক্ষোভে ফেটে পড়লো। কণ্ঠে তীব্র অবজ্ঞা মিশিয়ে বললো—
— “তোর ভালোবাসবো? আমি? ছিঃ! লজ্জা করে না আমাকে এই কথাটা বলতে? আমার জীবনটা ঘেঁটে দিয়ে, আমার সবকিছু শেষ করে দিয়ে আশা রাখিস আমি তোকে ভালোবাসবো।
মাটিতে পা রেখে আকাশে চাঁদে হাত বাড়ানোর স্বভাব আজ তোর নতুন নয়।
কিন্তু আমার ভালোবাসার আশা করা? মানুষ এতো নির্লজ্জ হয় কীভাবে। আমাকে ফাঁসির আসামী বানিয়েছিস। আমার ভালোবাসা কেড়ে নিয়ে নিজস্ব করে দিয়েছিস। তোর জন্য ভালোবাসা থেকে দূরে ছয়টা বছর আমি যন্ত্রণায় ধুকে ধুকে মরেছি। আমাকে একটা দিন একটু সুখে থাকতে দিসনি তুই। তাহলে বল— তোকে ঠিক কী কারণে ভালোবাসবো? তোর প্রতি কী ভালোবাসা আসবে?”

— “আর দেখ, কতো কষ্টের পর, কতো যুদ্ধের পর, যতো যন্ত্রণায় ভরা রজনী শেষে আমার ভালোবাসাকে ফিরে পেলাম।
সুখ আমার দরজায় এসে কড়া নাড়ল, ঠিক তখন তুই আবার ঝড়ের মতো এসে আমার গোছানো ফের একবার আউলিয়ে দিলি।
চেতনা নাশক সেডেটিভ দিয়ে, যৌন উত্তেজক ড্রাগ দিয়ে তোর শরীরের জ্বালা মিটালি। আমার জীবনে তুই কী বাকি রাখলি? শেষমেশ আমার চরিত্রকেও কলঙ্কিত করলি। আমার নিজের বলে আর কিছুই রইল না। তুই আসলে একটা ডাইনি— যার উপর তোর নজর পড়বে, তার জীবনটা বিষিয়ে দিবি তুই।”
বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো প্রহেলিকা।
তবুও এতো কাঠখড় পুড়িয়ে যাকে পেয়েছে, তাকে আর কিছুতেই হাতছাড়া করবে না।
দুই হাতের উলটো পিঠে চোখ মুছে নিলো প্রহেলিকা। উঠে দাঁড়িয়ে ধাতস্ত কণ্ঠে বললো—

— “আমার তোমার জীবনে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, জানি। কিন্তু এসবে তোমার ভূমিকাও কিছু কম ছিল না, প্রণয়।”
— “মানে?”
— “মানে— এই সবকিছুর সূত্রপাত তুমিই করেছ। তোমার সব অভিযোগ মেনে নিচ্ছি আমি। আমি মানছি আমি খারাপ। কিন্তু আজকের এই প্রহেলিকা শিকদারের জন্ম তুমি দিয়েছো, মিস্টার শিকদার প্রণয়।
আজকের প্রহেলিকা আর বিশ বছর আগের প্রহেলিকা কিন্তু এক না। একটা বাচ্চা মেয়ের নিষ্পাপ মনটাকে বিষিয়ে দিয়েছো তুমি। এক বাড়ন্ত বয়সী কিশোরীর মনে প্রতিহিংসার প্রথম বীজটা রোপণ করেছো তুমি। আর আজ সব দায়ভার আমার একার।”
প্রণয়ের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে বললো প্রহেলিকা—
চোখ দুটো শান্ত, কিন্তু কণ্ঠস্বর তলোয়ারের ন্যায় ধারালো।

— “ওই সরল মনের সিধে সাদা মেয়েটাকে কুচক্রী হতে উস্কেছ তুমি! তোমার দ্বিচারিতা আর পক্ষপাতিত্ব প্রতিমুহূর্তে আমার ইন্ধন জুগিয়েছে। তোমার জীবন ধ্বংসের পিছনে যদি আমার অবদান থাকে, তাহলে আমার জীবন ধ্বংসের পিছনে তোমার অবদানও সমান্তরাল।”
— “তোমার জীবনে তো প্রথমে আমি এসেছিলাম। দেখতে গেলে তোমাকে প্রথম ভালোবাসা ব্যক্তিটা আমি। তাহলে তোমার ভালোবাসার উপর সর্বোচ্চ অধিকার কার থাকার কথা? তোমার বউ কার হওয়ার কথা? তোমাকে কার পাওয়ার কথা?
তোমার সন্তানের মা হওয়ার অধিকার কার, আর তুমি দিয়েছো কাকে?
তোমাকে সর্বপ্রথম আমি ভালোবেসেছি। আর সর্বোচ্চ ভালো আমিই বেসেছি।
আজও অবধি এই পৃথিবীতে এমন কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্ম হয়নি, যার ভালোবাসা হবে আমার থেকে বেশি।
এই প্রহেলিকা শিকদারের থেকে অধিক ভালো এ পৃথিবীতে তোমাকে কেউ বাসতে পারবে না, প্রণয় শিকদার। আমার থেকে বেশি ভালো তোমায় কেউ বাসতে পারবে না।”
— “তাই আমি বেঁচে থাকি কিংবা মরে যাই— আমার ভালোবাসা তোমার পিছু ছাড়বে না। আমার ভালোবাসা মৃত্যু অবধি পিছু করবে তোমার। আমার ছায়া থেকে মুক্তি নেই।”
প্রহেলিকার এসব ভারিভারি যুক্তিকথার কোনো প্রভাব প্রণয়ের মুখাবয়বে দেখা গেলো নাহ্। তার চেহারায় স্পষ্ট বিরক্তি।

প্রণয়ের নির্লিপ্ততা বরাবরের ন্যায় এবারো ঝলসে দিলো প্রহেলিকাকে। আজকের দিনে কিছুতেই মন খারাপ করতে চায় নাহ্, তাই বড় বড় নিশ্বাস ফেলে বুকের ভারটা ঝেড়ে ফেলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো প্রহেলিকা।
ঘরের এক কোণে থাকা ওয়ার্ডরোব খুলে বিয়ের শেরওয়ানি বের করলো। সাদা রঙের জরির কাজ করা বস্ত্রটা নিয়ে রাখলো প্রণয়ের সামনে।
কাপড়টার দিকে চোখ পড়তেই কপাল কুঁচকে গেল প্রণয়ের। চোখ উঠিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো।
প্রণয়ের চোখের প্রশ্ন মুহূর্তেই পড়ে নিল প্রহেলিকা। চমৎকার হাসলো। পাঞ্জাবিটা প্রণয়ের গায়ের উপর ধরে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো। উত্তেজিত কণ্ঠে বললো—
— “বাহ্! এক্কেবারে আমার কল্পনার বাস্তব প্রতিচ্ছবি।”
প্রহেলিকার এসব ফালতু আদিখ্যেতা নিরীক্ষণ করে তেতে উঠলো প্রণয়। ঝাড়ি মেরে বললো—
— “সকাল সকাল কী হালকা করে গাঁজা ফুঁকে এসেছিস? আমাকে দেখে কী তোর জোকার মনে হয়— যে এসব পরে যাত্রা করবো?”
কণ্ঠস্বর কেমন ক্ষ্যাপাটে শোনালো প্রণয়ের। ধৈর্যের সব বাঁধ একে একে ধ্বসে পড়ছে।
পুরুষালী ধমকে হালকা কম্পিত হলো প্রহেলিকা। একটু দূরে সরে গেলো, কিন্তু দমে গেলো না। উল্টো বাচাল ভঙ্গিতে বললো—

— “এই শেরওয়ানি একদম তোমার সাইজের। একদম পারফেক্ট। তোমার মেজারমেন্টের সাথে একদম মানানসই।”
প্রহেলিকা খুব মনোযোগ সহকারে চেয়ে আছে প্রণয়ের মুখের পানে— বোঝার চেষ্টা করছে তার চেহারার বদলে যাওয়া অভিব্যক্তি, যাতে পদক্ষেপগুলো নিরাপদ হয়। কিন্তু সামনে বসা পুরুষটার জোড়া ভ্রুয়ের সংকোচন কিংবা প্রসারণ অবলোকন করা কী এতই সোজা। তাই প্রহেলিকা প্রণয়ের ভাবটা ঠিক বুঝতে পারলো না। তাই আরেকটু উস্কাতে বললো—
— “কি? বিশ্বাস হচ্ছে না? কিন্তু এটাই সত্যি। আমি তোমার মাথার চুল থেকে পায়ের নখটা পর্যন্ত সবকিছু আমার নখদর্পণে। প্রিয়তা কোনোদিন এভাবে তোমার প্রত্যেকটা পদক্ষেপ মুখস্ত রাখতে পারবে নাহ্।
তোমার…
Height: 6’1″ / 185 cm
Weight: 85 kg
Body Fat: ~10–12%
Chest: 44″ / 112 cm
Shoulder width: 20″ / 51 cm
Waist: 32″ / 81 cm
Biceps: 17″ / 43 cm
Forearms: 14″ / 36 cm
Thighs: 25″ / 64 cm
Calves: 16.5″ / 42 cm
Neck: 17″ / 43 cm
আররররর…”
— “Shut up!”

ঠোঁট কামড়ে হাসলো প্রহেলিকা। সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ভণিতা ছেড়ে এবার সরাসরি বললো—
— “আজ সন্ধ্যায় আমাদের বিয়ে। আমার স্বপ্ন পূরণের দিন।”
প্রহেলিকার বক্তব্যটা ছিল বিস্ফোরক। কিন্তু প্রণয়কে সামান্যতম উত্তেজিত হতে দেখা গেল না। সে ধীর, স্থির, শান্ত আচরণে— কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
ব্যাপারটা লক্ষ্য করে ব্যাপক আশ্চর্য হলো প্রহেলিকা। কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করলো—
— “তোমার রাগ হচ্ছে না?”
— “পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে। কেউ যেচে আগুনে ঝাঁপ দিতে চায়, আমি কী করতে পারি। আর এমনিতেও মরণ তোমার দোরগোড়ায় কলিং বেল বাজাচ্ছে। — হয় আমার হাতে, নাহয়…”
সময় এসে গেছে, তাই শেষ সময় একটু আল্লাহ আল্লাহ্ করো।
নির্লিপ্ত জবাব প্রণয়ের।

— “নাহয় কী?”
— “তোমার মৃত্যু বোধহয় আমার হাতে নেই মানে।”
— “মানে?”
— “মানে চার কালিমা জানিস? মুখ দেখে মনে তো হয় না জানিস— সন্ধ্যার আগে চ্যাট জিপিটি দেখে চার কালিমা দ্রুত মুখস্ত কর। সঠিক সময় ঠিকঠাক বলতে হবে। নাহলে আসল জায়গায় এন্ট্রি পাস মিলবে নাহ্। আমি আবার তোকে কালিমা শোনাতে করবো নাহ্।”
— “এ্য্যহ্!”
— “আর হ্যাঁ, পানি খেতে ভুলবি না। কে জানে কখন কী হয়।”
প্রহেলিকার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেল। অজানা আশঙ্কায় প্রণয় কীসের ইঙ্গিত করছে—
— “তুমি আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছো, প্রণয়?”
হাই তুললো প্রণয়। দায়সারা কণ্ঠে বললো—
— “Your countdown starts now.
Just wait and see. Only 9 hours, 48 minutes, and 36 seconds.”
— “Whatt…”

৫ ঘণ্টা আগে—
ইনায়ার থেকে সবটা শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায় প্রীতম। তার মুখাবয়বে তীব্র অবিশ্বাস।
এমনটা কখনোই হতে পারে নাহ্। কিন্তু কখনো কখনো এমন ঘটনাও ঘটে যায়, যায় কথা আমরা কল্পনাও করতে পারি নাহ্। আচমকা ঝড়ের মতো এসে আমাদের জীবন লণ্ডভণ্ড করে চলে যায়।
শিকদার বাড়ির পরিবেশে নিঝুম। পাকা বাড়ির কোনায় কোনায় ভূতুড়ে নিস্তব্দতা বিরাজ করছে। দূরের আম গাছ থেকে ভেসে আসছে নিশাচর পেঁচার ভীতি জাগানো কান্নার আওয়াজ। যেনো আসন্ন কোনো মহাপ্রলয়ের আগাম অশনি সংকেত।
ঘরের এক কোণে জমাট বাঁধা অন্ধকারের মাথা চেপে ধরে চুপচাপ বসে আছে প্রীতম। তার পাশে বসে একা একা বিড়বিড় করছে ঈনায়া। টেনশনে টেনশনে যেনো আরো দুই ইঞ্চি ফুলেছে মেয়েটা।
দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে গভীর চিন্তায় তলিয়ে গেলো ইনায়া। প্রীতমের বাহু ঝাকিয়ে শুধালো—

— “এখন কী হবে প্রীতম? প্রিয়তা তো একদম চুপ মেরে গেছে। আমার কিন্তু এসব একদম বিশ্বাস হচ্ছে না। বড়ো ভাইয়ার দ্বারা এমন ভুল কোনোদিনও হতেই পারে নাহ্।”
মাথা ঝাঁকালো প্রীতম। স্ত্রীর মন্তব্যে সম্মতি জ্ঞাপন করে বললো—
— “জানি, বড়ো দাদনের দ্বারা সজ্ঞানে এমন হওয়া অসম্ভব। কিন্তু…”
— “কিন্তু…”
— “ঘটনার সত্য মিথ্যা যাচাই করার সময় নেই এখন ইনু। এখন মাথার উপর বিপদের বড়ো খাড়া ঝুলছে। যতো সময় যাবে, বিপদ ততই বাড়বে। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পূর্বে আমাদের বড়ো দাদানকে খুঁজে বের করতে হবে।”
— “কিন্তু তাকে কোথায় খুঁজব আমরা?”
— “জানি নাহ্। কিন্তু খুঁজে পেতেই হবে। নাহলে শিকদার বংশে মৃত্যু মিছিল শুরু হয়ে যাবে। যাই হোক, বোন কোথায়?”
— “ওর ঘরে চলে গেলো।”
কপাল কুঞ্চিত হয়ে গেলো প্রীতমের। নারাজ কণ্ঠে বলল—

— “আর তুমি যেতে দিলে?”
মুখটা চুপসে গেল ইনায়ার। নিচু স্বরে বলল—
— “কী করতাম? তোমার বোনকে ভয় লাগছিল। কেমন চুপচাপ মৃত মানুষের মতো। চটে আছে নাকি ফুলে আছে, কিছুই বুঝতে পারছিলাম নাহ্।”
— “ইনু, আমার মন বলছে বড়ো কিছু হবে।”
— “আমারও।”
দুশ্চিন্তায় নিজেকে পাগল মনে হচ্ছে প্রীতমের। দুই হাতে নিজেই নিজের চুল টেনে ধরলো প্রীতম।
— “প্রহেলিকা কোথায় নিয়ে যেতে পারে?”
— “বুঝতে পারছি নাহ্। তোমাদের এই ৩২ বছরের কচি বোনকে আমার প্রথম থেকেই সুবিধার লাগে নাহ্। কেমন শকুনি দৃষ্টিভঙ্গি। আমার ভাসুরকে দেখলে জিভ দিয়ে লালা ঝরে। আমার ভাসুরকে সবসময় মাংসের টুকরো হিসেবে দেখে। তাই সুযোগ পেয়ে থাবা মেরেছে।”

ঠক ঠক ঠক—
পরপর তিনবার দরজায় ঠুকা পড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে সম্পূর্ণ সজাগ হয়ে উঠলো শুদ্ধ। তার ঘুম বরাবরই হালকা। মস্তিষ্ক সবসময় সতর্ক।
ঘুমোঘুমো চোখ মেলে তাকালো শুদ্ধ। কপাল জুড়ে অবিন্যস্ত বিরক্তির রেখা। হাতড়ে বালিশের পাশে থাকা ফোনটা তুলে নিলো। অটো সেন্সর লাগানো ফোনটা মুখের সামনে ধরতেই ধপ করে জ্বলে উঠলো স্ক্রিন। তীব্র আলোকছটায় চোখ দুটো পুনরায় কুঁচকে বন্ধ করে নিল শুদ্ধ। পুনরায় ধীরে ধীরে চোখ মেলে ফোনে সময় দেখল— রাত ৪টা বেজে ৫৩ মিনিট।
এই কাকডাকা ভোরে দরজায় কড়াঘাতের শব্দে বিরক্তি তুঙ্গে উঠে গেলো শুদ্ধের। তীব্র আলস্য ঝেঁকে বসলো শরীরের প্রতিটি ইঞ্চিতে। উঠলো নাহ্ শুদ্ধ। বিছানায় পড়ে থেকে হাক ছেড়ে শুধালো—
— “কে?”
ওপর প্রান্ত থেকে কোনো জবাব আসলো নাহ্। পরিবর্তে পুনরায় দোয়ারে কড়াঘাত পড়লো। আগের থেকে দ্রুত, আগের থেকে জোরে।
এবার বেজায় চটে গেলো শুদ্ধ। খেক করে উঠলো—

— “আরে বাবা, কে বলবে তো?”
ওপাশে এবারো নিরবতা। পরিবর্তে দরজায় পুনরায় করাঘাত।
— “ধুর বাবা।”
আর শুয়ে থাকতে পারলো নাহ্ শুদ্ধ। বাধ্য হয়ে সুখসজ্জা ছেড়ে উঠে পড়ল। বিছানার পাশে পড়ে থাকা সফেদ শার্টটা তুলে নগ্ন গায়ে জড়িয়ে নিল।
দূরের মসজিদ থেকে আযানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। শুদ্ধ একটা অলস হাই তুলে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে দরজার ছিটকিনি খুলে দিল।
এতক্ষণ ঘুমে টলছিলো। কিন্তু দুয়ারে দাঁড়ানো মানবীর মায়াবী প্রতিচ্ছবি দৃশ্যপটে আঁচড়ে পড়তেই চোখে ঘুম নিমেষে গায়েব হয়ে গেলো শুদ্ধের। চেহারার লেপ্টে থাকা বিরক্তির আস্তরণ সরে গিয়ে চোখ দুটোতে সীমাহীন মুগ্ধতা ভরে উঠলো। শুষ্ক ঠোঁটজোড়া সামান্য নড়লো পুরুষের। অস্ফুটে বেরিয়ে এলো—
— “প্রিয়া।”

প্রিয়তার মাঝে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে সরাসরি চোখ উঠিয়ে তাকালো শুদ্ধের ধূসর চোখের মণিতে।
নাহ্, ওই মৃগনয়নে প্রাণনাশী নীল বিষের সরোবরে আজও নিজের জন্য কোনো অনুভূতির অঙ্কুর দেখতে পেলো নাহ্ শুদ্ধ। তবে আগের মতো আর হতাশ হলো নাহ্।
এটাই চিরন্তন বাস্তব আর তার নসিবের অপরিবর্তনীয় ভবিতব্য।
হালকা হাসলো শুদ্ধ। তার নিজের শুরুটা এতো মধুর হবে ভাবেনি। দরজায় হেলান দিয়ে সামান্য ঝুঁকে এলো রমণীর মুখের উপর। রঞ্জিত মাদকের পেয়ালার পানে তৃষ্ণার্ত চোখে চেয়ে রইলো কিয়ৎক্ষণ। লাল টসটসে যেনো তাজা আনারসের দানা। রমণীর শোভাবর্ধনকারী বড়ো বড়ো পাপড়ি যোগল আসতে ফু দিয়ে শুদ্ধ।
চোখ বুঝে ফেললো রমণী।
ধ্বনিত হলো এক চমৎকার কণ্ঠ।

— “আজকের সূর্যটা বুঝি দক্ষিণে উদিত হতে চলেছে। আমার আকাশের চাঁদ আজ নিজে হেঁটে আমার দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে।”
লোকটার এমন অদ্ভুত চাহনিতে অপ্রস্তুত হয়ে গেলো প্রিয়তা। দ্রুত দৃষ্টি নত করলো। সে এখানে হিসেব-নিকেশের হালখাতা খুলতে আসেনি। তাই ভণিতা ছেড়ে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়লো—
— “প্রহেলিকা শিকদার এখন কোথায়?”
প্রশ্ন শুনে সুঘটিত ভ্রূদয়ের আড়াআড়ি ভাঁজ পড়লো পুরুষের। এই প্রশ্নের যথার্থ সময় কী এখন? প্রিয়তা হালকা উত্তেজিত হয়ে গেলো। দ্রুত ফের একই প্রশ্ন করলো—
— “প্রহেলিকা শিকদার কোথায়?”
শুদ্ধ বিচক্ষণ। কিন্তু এমন সময় প্রহেলিকার কথা জানতে এতো উতলা হওয়ার কারণ ধরতে পারলো নাহ্। প্রিয়তার গতিবিধি বুঝতে চুপ করে ঠায় চেয়ে রইলো।
প্রিয়তার অস্থিরতা বেশ নজর কাড়ছে শুদ্ধের। ব্যাপারটা তো জানতে হচ্ছে।
— “শুদ্ধ ভাই, প্লিজ বলুন, প্রহেলিকা শিকদার কোথায়?”
— “আমি কী করে জানবো প্রহেলিকা শিকদার কোথায়?”
ছোট উত্তর শুদ্ধের। কিন্তু জবাব পছন্দ হলো না প্রিয়তার।

— “মিথ্যে বলার চেষ্টা করবেন নাহ্ শুদ্ধ ভাই। আপনি সব জানেন। এই বাড়িতে আপনি একমাত্র ব্যক্তি, যার সাথে প্রহেলিকা শিকদারের সম্পর্ক গলায় গলায়।”
চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলো শুদ্ধর।
— “আমার সাথে গলায় গলায় সম্পর্ক?”
— “হ্যাঁ।”
— “ও আমার মিউচুয়াল ক্রাইম পার্টনার? তোমার স্বামীরও মিউচুয়াল ক্রাইম পার্টনার। তোমার স্বামীর সাথেও গলায় গলায় সম্পর্কটা নেহাত কম নয়? তাহলে সব দোষটা আমার একার কেনো?”
— “ঠিক আছে। এসব কাসন্দী শুনতে আমি ইন্টারেস্টেড নাহ্। আপনি জাস্ট বলুন, প্রহেলিকা শিকদার কোথায়।”
— “আমি সত্যি জানি নাহ্।”

শুদ্ধর বাক্যের দৃঢ়তা প্রিয়তার পায়ের নিচের জমিন কেড়ে নিচ্ছে। তার ভেতর আগ্নেয়গিরি ফুটছে রীতিমতো। সামনে দাঁড়ানো পুরুষটার দৃষ্টিতে মিথ্যের কোনো চাপ নেই। নিরাশ হলো প্রিয়তা। আশার শেষ আলোটুকুও ধপ করে নিভে গেলো।
প্রিয়তার মনে হচ্ছে সে কোনো গহীন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সে তার ভালোবাসা থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে।
শুদ্ধ খুব মনোযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করলো প্রিয়তার পরিবর্তনশীল এক একটা মুখভঙ্গি। তার সন্দেহের বীজকে উস্কে দিল।
প্রিয়তা নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে নিলেই পেছন থেকে গমগমে ভরাট কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—

— “প্রিয়া।”
প্রিয়তার পদযুগল থমকে দাঁড়ালো সেখানেই।
ট্রাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে এগিয়ে এলো শুদ্ধ। সামনে দাঁড়ানো ছোটখাটো গড়নের নারীমূর্তিটির মাথা থেকে পা পর্যন্ত নিরীক্ষণ করে হাসলো। একটা চমৎকার অফার ছুড়ে দিল রমণীর পানে—
— “আমি জানি নাহ্ প্রহেলিকা শিকদার কোথায়। কিন্তু…”
চট করে মাথা তুলে তাকালো প্রিয়তা। শুদ্ধ খুব সূক্ষ্ম নজরে দেখলো রমণীর চোখের মণি স্থির নেই। সামান্য বড় হয়ে গেছে তার আশ্বাসবাণীতে। যার অর্থ রমণীর মনস্তত্ত্ব স্থির নেই।
প্রিয়তার নীলাভ চোখ ঝিলিক দিয়ে উঠলো।

— “কিন্তু…”
— “কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।”
— “কী?”
— “কী হয়েছে, কী সমস্যা, কী বৃত্তান্ত, কেনো প্রহেলিকা শিকদারকে দরকার— শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটা আমাকে বলতে হবে উইদাউট ক্রপ।”
প্রিয়তা প্রথমে ইতস্তত করলো। কিন্তু প্রণয় ভাইয়ের সুরক্ষা সবার আগে। তাই বিনা বাক্যে রাজি হয়ে গেল।
সব বললো।
মৃদু হাসলো শুদ্ধ।
— “ওকে, ভেতরে চলো।”
শুদ্ধর ঘরের ডিভানে মাথা নত করে বসে আছে প্রিয়তা। মুখোমুখি বসলো শুদ্ধ। গ্লাসে পানি ঢেলে এগিয়ে দিল সামনে বসা রমণীর নিকট। নরম আওয়াজে বললো—
— “পানিটা খাও।”
প্রিয়তা কোনো বিবাদে জড়ালো নাহ্। গ্লাস তুলে ঢক ঢক করে তরলটা গলায় ঢাললো। তবে জীবনদায়ী শীতল পানীয়টুকুও নিদারুণভাবে ব্যর্থ হলো তরুণীর অন্তরের উৎকণ্ঠা দমনে।
শুদ্ধ চুপচাপ দেখলো। অতঃপর শান্ত কণ্ঠে বললো—

— “এবার বলো, ঘটনা কী।”
প্রিয়তা ইতস্তত করতে লাগলো।
চোখ সরু হয়ে গেলো শুদ্ধ। সতর্কবাণী ছুঁড়ে দিয়ে বললো—
— “সময় নষ্ট হচ্ছে কিন্তু।”
বুক ভরে লম্বা একটা নিঃশ্বাস টানলো প্রিয়তা। অতঃপর সাবধানে সত্যের অধিকাংশ গোপন করে কেবল প্রণয়ের কিডন্যাপ হওয়ার কথাটা বললো।
তবে শুদ্ধ যেমন চতুর, তেমন কুটিল। সবাইকে টুপি পড়ানো গেলেও শুদ্ধকে উহু। সে নীরব নিশ্চুপ। কিন্তু খুব সহজেই পড়ে নিল প্রিয়তার চোখের ভাষা।
সে মেয়েটার অর্ধসত্য বেশ ধরতে পারলো। তবে দ্বিতীয় প্রশ্ন করলো নাহ্। পকেট থেকে ফোন বের করে ‘বিষেভরা নাগিন’ নামে সেভ করা নাম্বারটাতে ফোন লাগালো।
ফোনটা কানে ধরতেই ওপাশ থেকে যান্ত্রিক নারীকণ্ঠ ভেসে এলো কয়েক লাইন—
— “আপনি যেই নম্বরটিতে ফোন করেছেন, সেটি পরিষেবা সীমানার বাইরে আছে। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পরে চেষ্টা করুন।”

শুদ্ধর সন্দেহ এবার বিশ্বাসে পরিণত হলো। সে চোখ তুলে চাইল সামনে বসা বিশ বর্ষীয়া রমণীর পানে।
রমণীর সুশ্রী মুখখানা তমসাচ্ছন্ন— হয়তো দুশ্চিন্তায়, নয়তো ভয়ে। ভালোবাসে যে খুব। শুদ্ধর বড়ো আফসোস হলো। এই আকুলতাটা তো তার জন্যও হতে পারতো।
প্রিয়তার বড়ো বড়ো চোখ দুটো উজ্জ্বল, যেখানে আশার শেষ আলো জ্বলছে ধিকি ধিকি।
প্রিয়তা উত্তেজনা চেপে শুধালো—
— “ধরেছে বড়ো আপু? কোথায় ও? আমার প্রণয় ভাইকে কোথায় আটকে রেখেছে? আমার প্রণয় ভাই ঠিক আছেন তো?”
— “ফোনটা নট সুইচেবল বলছে।”
আশার শেষ বিন্দুটাও ধপ করে নিভে গেলো প্রিয়তার। সুন্দর মুখটা মলিনতার অতলে ঢাকা পড়লো।
বুকের ভেতর কেমন কাঠপিঁপড়ে কামড়ানোর মতো কুটকুট করে ব্যথা করছে শুদ্ধের। কই, কোনোদিন তো তাকে হারানোর ভয়ে এমন কুঁকড়ে যেতে দেখেনি। মানুষের কপাল এতটা পোড়া হয় কীভাবে?
ঠোঁট ঠেলে একটা মলিন হাসি বেরিয়ে এলো শুদ্ধের। সে হয়তো জীবন্ত কয়লা, যার জীবনের লক্ষ্যই নিজেকে পুড়িয়ে অন্যকে সুখ দান করা।
প্রিয়মুখে অমাবস্যার ঘনঘটা একদম ভালো লাগলো নাহ্ শুদ্ধের। প্রিয়তমার হাতের উপর হাত রেখে আলতো স্পর্শে স্নেহ বিতরণ করার অদম্য ইচ্ছা বুকে চেপে বসলো। কিন্তু অধিকারের সীমাবদ্ধতা তাকে থামিয়ে দিল মাঝপথেই।

নিষিদ্ধ জিনিসের আসক্তি মানুষকে নীচ হতে শেখায়, ক্রূর চক্রান্তকারী হতে শেখায়— কেবল তীব্র আকাঙ্ক্ষিত দুর্লভ দুষ্প্রাপ্য জিনিসটাকে একটুখানি পাওয়ার আশায়।
নিজের অদম্য অনুভূতি চিবিয়ে গিলে নিলো শুদ্ধ। প্রহেলিকার সিক্রেট নম্বরে ডায়াল করতেই রিং হলো— একবার, দুইবার, তিনবার। পঞ্চম বারের বেলায় ফোন রিসিভ করলো প্রহেলিকা।
শুদ্ধ তাকালো প্রিয়তার দিকে। ফোন স্পিকারে দিয়ে রাখলো সেন্টার টেবিলের উপর।
প্রিয়তার চোখ দুটো জ্বলছে— ক্ষোভে নাকি ক্রোধে, ঠিক বোঝা যায় নাহ্ শুদ্ধ। কেমন অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে ফোনটার দিকে।
চোখের ইশারায় প্রিয়তাকে চুপ থাকতে বললো শুদ্ধ।
ওপর প্রান্ত থেকে প্রহেলিকার বিক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর—
— “কী জ্বালাতন! এটা কী ফোন করার সময়? কেনো ফোন দিয়েছ? এখন ব্যস্ত আছি আমি।”
— “তাই নাকি? এই শেষ রাতে কী এমন ব্যস্ততা শুনি যে এতো তাড়াহুড়ো করছো? লটারি জিতেছ নাকি?”
— “বলতে পারো, জীবনের সব থেকে বড় লটারিটা আমি জিতে গেছি। জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছে গেছি। উদ্দেশ্যে শিকড় ছুঁয়ে ফেলেছি।”

— “ওয়াট? কীভাবে?”
— “তুমি তো আর দিতে পারলে নাহ্। তাই আমি নিজের ভাগটা নিজেই বুঝে নিয়েছি।”
— “সিরিয়াসলি? তুমি এসআরকে পেয়ে গেছো? হাউ ইটস পসিবল?”
— “সব পসিবল। একদিন সবার সময় আসে। আজ আমার এসেছে।”
— “বড়কথা সেটা নয়। বড়ো কথা হলো তুমি মুরগি হয়ে শিয়ালকে খাঁচায় পুরলে কী করে? আবার যে সে শিয়াল নয়, সাক্ষাৎ খেকশিয়াল। ও মাই গড।”
ওপর প্রান্ত থেকে প্রহেলিকার কুটিল হাসির শব্দ ভেসে এলো। যা শুনতে পেলো প্রিয়তা আর শুদ্ধ দুজনেই।
— “আমার ডিকশনারিতে impossible বলে কোনো ওয়ার্ড নেই, ডক্টর চৌধুরী। ইম্পসিবল নিজেই বলে আই এম পসিবল। সেখানে আবরার শিকদার প্রণয় তো মানুষ। বলো কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়।”
— “তোমার কনফিডেন্স দেখি আকাশ ছুঁয়ে গেছে। কিন্তু ওই শিয়াল ভেজিটেরিয়ান জানো তো। নিজের মুরগি ছাড়া অন্য মুরগির ঠ্যাঙে নজর দেওয়া তো দূর, চোখ উঠিয়ে দেখে নাহ্।”

— “না দেখে যাবে কোথায়?”
— “তাও ঠিক। পাগলা ঘোড়া জব্দ করেছো। অসম্ভবকে সম্ভব করেছো। কংগ্রাচুলেশন। খাও দাও এশ করো। তা সেফ জায়গায় আছো তো? ধরাটরা পড়ে যাবে নাহ্ তো? কারণ এখানে প্রীতম, প্রেম, জাভেদ এরা হন্যে হয়ে খুঁজছে প্রণয়কে। আর প্রণয় নিজেও কম বিদঘুটে নয়, একাই এক হাজার। একবার তোমায় বাগে পেলে হালাল করে দেবে।”
— “প্রণয় কিছুই করতে পারবে নাহ্। কারণ খাঁচায় বন্দী সিংহ গর্জন দিতে পারে, কিন্তু আক্রমণ করতে পারে নাহ্। প্রণয় শিকদারের বিষদাঁত আমি উপড়ে ফেলেছি। আর অন্যরা সাত জন্ম খুঁজলেও আমাকে পাবে নাহ্। প্রহেলিকা শিকদার মিলিয়ে গেছে।”
— “তাই নাকি? তা কীভাবে মিলিয়েছ শুনি? মাটি খুঁড়ে পাতালে চলে গেছো নাকি, আসমান ছিড়ে উপরে উঠে গেছো— যে তোমাকে কেউ খুঁজে পাওয়া যাবে নাহ্?”

— “আমি আছি, আবার নেই ও।”
— “কোথায় আছো?”
শব্দ করে হেসে উঠলো প্রহেলিকা। কৌতুক করে বললো—
— “নাইস ট্রাই ডক্টর চৌধুরী। কোথায় আছি সেটা তোমাকে বলে দেবো? তুমি যে কী চিজ, সেটা কী আমার চিনতে বাকি?”
— “তুমি আমাকে সন্দেহ করছো?”
— “সন্দেহ নাহ্, পূর্ণ বিশ্বাস আছে যে তুমি আমার পিঠে ছুরি মারবেই। অন্য কাউকে একবার বিশ্বাস করে নেবো কিন্তু তোমাকে নো ওয়ে।”
— “আরে, কী যে বলো। আমি কেনো তোমার পিঠে ছুরি মারবো? প্রণয়কে সরিয়ে তুমি তো আমার রাস্তা ক্লিয়ার করে দিয়েছো। তোমাকে তো আমার বিশাল ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। আগে প্রণয় ছিলো বলে আমি আমার ভালোবাসা পাইনি। এখন তুমি আমার পথের কাঁটাও উপড়ে ফেলেছো। এখন প্রণয় নেই। তাই প্রিয়তা আমার। তুমি আর আমি পার্টনার।”

— “দেখো, এইসব ধাপ্পাবাজি আমাকে দিয়ে লাভ নেই।”
— “আমাকে বিশ্বাস না করলে তোমার লস।”
— “লাভও বিশেষ নাই।”
— “ঠিক আছে, রাখছি।”
বলেই কট করে ফোন কেটে দিলো প্রহেলিকা।
মুহূর্তেই কক্ষ জুড়ে ভূতুড়ে নিরবতা নেমে এলো।
দুই পক্ষ চুপ।
কাচের টেবিলে আলতো করে ফোন রাখার শব্দটাও প্রতিফলিত হলো বিকটভাবে।
জহুরী চোখে সামনে বসা দীর্ঘ নয়নের রমণীর পানে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো শুদ্ধ। রমণীর নীলাভ চোখ দুটি এখন শান্ত ও স্থির। সেখানে আর কোনো অযাচিত উদ্বেগ নেই, নেই কোনো অস্থির ছটফটানি।
চোখের ভাষা ও ঝাপসা ঠিক প্রণয়ের মতো। প্রহেলিকা উল্লাসে ক্ষিপ্ত হয়েছে কিনা, বুঝতে পারলো না শুদ্ধ।
— “কোথায় আছে, বললো না তো? এবার কী হবে?”
— “আপনার ফোনটা দিন।”

শুদ্ধ অযাচিত প্রশ্ন করলো না। নিজের ফোনটা বাড়িয়ে দিলো প্রিয়তার পানে। সে দেখতে চায় তার বোকা হরিণীর হাত আসলে কতটুকু। সে কি এখানেও মানুষ চিনতে ভুল করেছে? মনে তো হচ্ছে তাই।
প্রিয়তা ফোন নিয়ে ডায়াল প্যাডে ওপেন করলো। একদম উপরে জ্বলজ্বল করছে একটা নাম্বার—২৪০১১৩০৯৫৬। নাম্বারের নিচে লেখা উঠছে—2 minutes ago।
প্রিয়তা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। পেছন ঘুরে বেরিয়ে যেতে নিলেই ফের পেছন থেকে ডেকে উঠলো শুদ্ধ।
— “কোথায় যাচ্ছো?”
— “আপনি চাইলে আসতে পারেন।”
বলে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল প্রিয়তা।
ভাবনায় পড়ে গেলো শুদ্ধ। এই মেয়ে কি সত্যিই কিছু করতে পারবে? জানার কৌতুহল হলো।
অধৈর্য হলো শুদ্ধ কৌতূহল চাপতে না পেরে পিছু নিলো প্রিয়তার।

শুদ্ধর ফোন হাতে নিজের ঘরে ফিরে এলো প্রিয়তা। বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ার খুলে প্রণয়ের ল্যাপটপ বের করলো। কালো মেটালের উন্নতমানের ল্যাপটপটা চোখের সামনে ধরতেই সাইন করে উঠলো।
ল্যাপটপ আর ফোন নিয়ে বিছানার উপর আসন পেতে বসলো প্রিয়তা। উন্নতমানের ডিভাইসটা ওপেন করে সিক্রেট কোড দ্বারা স্বামীর ন্যায় নিজেও ঢুকে পড়লো অপরাধজগতে অন্ধকার গলিতে।
চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকলো হাজার হাজার এনক্রিপ্টেড ফাইল, লকড ডেটাবেস—প্রিয়তা ল্যাপটপের কিবোর্ডে দ্রুত আঙুল চালাতে লাগলো। অবৈধভাবে ডিকোড করতে করতে লাগলো প্রহেলিকার জিপিএস, এন্ড আইপি অ্যাড্রেস—সব কিছু। ট্রেনের থেকেও দ্রুত গতিতে চলছে তার আঙুল। চোখ একদম ফোকাসড ডিজিটাল স্ক্রিনে। এক সেকেন্ডের জন্য মনোযোগ এদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছে না।
এসব পার্সোনাল নথি কেবল ইনভেস্টিগেশন পারপাসে সরকারি কর্মচারীদের ডিকোড করার পারমিশন রয়েছে। সাধারণ জনগণের পক্ষে এসব আনলক করা অসম্ভব চেষ্টা করাও বেআইনি দণ্ডনীয় অপরাধ।
কিন্তু আবরার শিকদার প্রণয়ের জন্য এসব দুধভাত। সে অনেক আগেই টেলিকম কোম্পানির পুরো ডেটাবেস হ্যাক করে নিয়েছে। এক্সেস বহু বছর পুরন।
শুদ্ধ চোখ বড়ো বড়ো করে একবার প্রিয়তার দিকে তাকাচ্ছে, তো আরেকবার স্ক্রিনের দিকে। তার নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না। তার এক্সপ্রেশন লাইক OMG। সত্যি বলতে, প্রিয়তা তার থেকেও ভালো, তার থেকেও দ্রুতগতিতে কোডিং করবে।
শুদ্ধ বিস্ময়ের সপ্তম আসমানে উঠে গেলো চোয়াল ঝুলিয়ে বললো

— “তুমি এসবও পারো? কই, কই কোনোদিন তো বলনি! এতো ভালো কোডিং শিখলে কবে”
— “Don’t disturb me.”
স্ক্রিনে চোখ রেখেই বললো প্রিয়তা।
— “তুমি হ্যাকিং জানো?”
এবার জবাব দিলো না প্রিয়তা।
শুদ্ধ গালে হাত দিয়ে কেবল চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলো তার সামনে বসা অসম্ভব রূপবতী নারীটিকে। শুধু রূপবতী নয়—তুখোড় মেধাবীও। সমান তালে গুণবতী সাথে অসম্ভব রহস্যময়ী।
শুদ্ধর কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো এই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ মুখোশদারি আর সে কেবল হাতেগোনা কয়েকজনকেই চিনতে পেরেছে।
মনে মনে হাসলো শুদ্ধ। বিড়বিড় করে বললো—

— “বিউটি উইথ ব্রেইন… ইন্টারেস্টিং। আমি এতদিন জানতাম মেয়ে সুন্দরী মানে টপ ফ্লোর পুরো ফাঁকা। কিন্তু শিকদার বাড়ির রমণীরা আমার সেই ধারণা সম্পূর্ণ চূর্ণ করে দিয়েছে। শিকদার বংশোভূত প্রতিটি বংশধর যেমন সুন্দর, তেমন বিষাক্ত, তেমন মেধাবী, তেমন চক্রান্তকরি সাথে নামকরা ক্রিমিনাল।”
Shift+F10 ক্লিক করে আচমকা হাত থামিয়ে দিলো প্রিয়তা। মুখের ভাব মূর্তি পরিবর্তন হলো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য তরপর পুনরায় গম্ভীর।
শুদ্ধ দেখতে পেলো চিরচেনা মায়াবী চোখ দুটো কেমন অচেনা হিংস্রতায় চকচক করছে।
বেজির ন্যায় জ্বলজ্বল করছে আধো আলো আধোঅন্ধকারে। ফর্সা চামড়ার অপারে সবুজ শিরাগুলোর উত্তেজনা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে শুদ্ধ। তার সূক্ষ্ম দৃষ্টি সতর্ক চোখে পর্যবেক্ষণ করলো রমণীর প্রতিটি পদক্ষেপ, পরিবর্তিত প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি।
রমণীর নীলাভ নেত্রযুগল এখন আর মোটেও মায়াবী লাগছে না তার নিকট। চাহনি কেমন বিপদজনক এই দৃষ্টি শুদ্ধর চেনা শিকদার বংশের বড়ো ছেলের চোখে কতবার দেখেছে। এই চাহনি চিনতে কোনোদিন ভুল করবে নাহ্ শুদ্ধ—

বিষয়টা ভাবতেই গায়ের পশম দাঁড়িয়ে যায়।
প্রিয়তা বিছানা থেকে উঠে একটা পেনড্রাইভ নিয়ে এলো। পেনড্রাইভটার দুপাশ ভালো মতো একবার দেখে ইমপোর্ট করে দিলো ল্যাপটপের ইউএসবি পোর্টে।
মুহূর্তের মধ্যে ল্যাপটপের সমস্ত ডেটাবেজ, হাজার হাজার এনক্রিপ্টেড ফাইল, অবৈধ লেনদেন, অপরাধের প্রতিটি প্রমাণ, প্রতিটি নথি, প্রতিটি সাক্ষ্যর সজ্ঞানে সচেতন ভাবে পেনড্রাইভে লোড করে নিল প্রিয়তা। এই পেনড্রাইভ ব্যতীত আর কোনো প্রমাণ অবশিষ্ট নেই যা সাক্ষ্য দিতে পারে তার স্বামীর বিরুদ্ধে।
প্রিয়তা ল্যাপটপ পুনরায় অফ করে বেরিয়ে গেলো ঘর ছেড়ে। আবারো পিছু নিল শুদ্ধ।
হাতের মুঠোয় ছোট্ট চিপটা শক্ত করে ধরে শিকদার বাড়ির চৌকাঠ ডিঙিয়ে বেরিয়ে গেলো প্রিয়তা।
অন্ধকার কাটিয়ে ধরনীতে নতুন দিনের সূচনা হচ্ছে।

ধীর কদমে হেঁটে এসে দাঁড়ায় পেছনের পুকুরপাড়ে—শত বছরের প্রাচীন আমগাছটার তলে।
ভোরের তাজা বাতাস প্রিয়তার তনুশরীর স্পর্শ করে ছুটে যাচ্ছে অদূরে। চোখ বুজে লম্বা নিঃশ্বাস টানলো প্রিয়তা। কিন্তু অস্বস্তিকর ব্যাপার হলো—এই গভীর নিঃশ্বাস তার কলিজা শান্তি দিতে পারলো না। চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে প্রিয়তার। সে এখনই রেগে যেতে চায় না। রাগটা জমিয়ে রাখতে চায়, বাঁচিয়ে রাখতে চায়—যাতে বিস্ফোরণটা হয় চিরস্মরণীয়।
হাতের মুঠোয় ধরে থাকা পেনড্রাইভটা চোখের সামনে মেলে ধরলো প্রিয়তা। ছোট্ট যন্ত্রটার কালো অংশ ঝিলিক দিয়ে উঠলো রোদের আলোয় প্রমাণ লোপাটের এই অসম্ভব সংগ্রামে এটাই তার প্রথম পদক্ষেপ।
হাতের মুঠোয় থাকা ছোট্ট তথ্যসংগ্রহকারী যন্ত্রটা সর্বশক্তি দিয়ে চারশো ফুট গভীর পুকুরে ছুড়ে মারলো প্রিয়তা। মুহূর্তেই পুকুরের গভীরতায় তলিয়ে গেল হাজারো পাপের অকাট্য প্রমাণ।
হাতের মুষ্টি পুনরায় শক্ত হয়ে গেলো প্রিয়তার।

— “আমি আসছি, প্রহেলিকা শিকদার। তোমার সাথে আমার পুরোনো হিসেবটা এখনো বাকি। তাই তোমার
হিসাব আমি অন্য কাউকে নিতেই দেবো না। এক এক করে পাই টু পাই প্রত্যেকটা মিনিটের হিসাব তুলবো তোমার থেকে। এতদিন তুমি আমার জিনিস কেড়েছ এবার তোমার পালা। আমার পার্সোনাল জিনিসে অনধিকারচর্চা করার মূল্য তোমাকে এমনভাবে চুকাতে হবে—তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।”
— “তনয়া শিকদার প্রিয়তা পৃথিবীর সব কিছু লুটিয়ে দেবে সিভায় এক। আজকের দিনটা তোমার জন্য খুব বিশেষ হবে কথা দিচ্ছে তোমার বোন—আমার প্রণয় ভাইকে স্পর্শ করার মূল্য তোমাকে চুকাতে হবে খুব খারাপভাবে। আমি উগ্র নই, কেবল শান্ত থাকতে পছন্দ করি। কিন্তু তুমি তো আমাকে দুর্বলই ভেবে বসলে।”
প্রিয়তাকে অনুসরণ করে পুকুরঘাটে এসে দাঁড়ালো শুদ্ধ। পদ্মপুকুরের টলটলে কালচে সবুজ জলে ভেসে আছে টকটকে লাল রঙের পদ্ম। কতটা শান্ত, স্নিগ্ধ, মনোরম! বাহির থেকে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না এই পুকুরের গভীরতা কতটা সর্বগ্রাসী কত কিছু গ্রাস করে নিয়েছে আজ পর্যন্ত—ঠিক যতটা সুন্দর, তার থেকেও দ্বিগুণ সর্বনাশা।
ঠিক পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীটির মতো—সুন্দর কিন্তু গভীর রহস্যময়, যা খালি চোখে দেখা যায় না।
পকেটে হাত গুঁজে প্রিয়তার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ালো শুদ্ধ। তার বিশাল ছায়ামূর্তি নিমিষেই আড়াল করে ফেললো রমণীর সর্বকায়া। তেজস্ক্রিয় সূর্য ধীরে ধীরে নিজের উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
প্রিয়তা পেছনে কারো অস্তিত্ব অনুভব করলো। তবে কিছু বললো না।

— “এখন কী করবে? লোকেশন এখান থেকে ৩৫,০০০ কিলোমিটার।”
— “জানি।”
— “কী করবো তাহলে?”
— “যা করার আমিই করবো।”
— “কিভাবে?”
জবাব দিলো না প্রিয়তা।

সূর্য ডুবেছে কিছুক্ষণ আগে।
বঙ্গোপসাগরের পশ্চিম দিকে টলটলে নীলচে জলে দিনের অন্তিম ভাগের সূর্যের শেষ কিরণ জলরঙে আলপনা এঁকেছে। দিনের শেষে পরিযায়ী পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরছে নীড়ে।
বিশাল খরজলরাশির মাঝখানে ছোট্ট একটা সবুজ প্রবল দ্বীপ। চারদিকে যতদূর চোখ যায়, কেবল উত্তাল সমুদ্র! নিস্তব্ধ পরিবেশে সমুদ্রের গর্জন মনোরম লাগছে। ক্ষণে ক্ষণে প্রবল স্রোত এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চল।

চারপাশে মানবজাতির কোনো নামও নিশান নেই। এই জায়গাটার নাম পয়েন্ট নিমো—দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের এমন এক জায়গা, যেখান থেকে একদম নিকটবর্তী ভূমিও ২,৬৮৮ কিলোমিটার দূর। এখনকার সবথেকে কাছের প্রতিবেশী মাটিতে নয়, বরং মহাকাশে। এই জায়গা থেকে ভূমির দূরত্ব অসীম। তবে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন (আইএসএস) মাত্র চারশো কিলোমিটার উপরে। জায়গাটা ভয়ানক বটে।
আর এই জায়গাতেই আস্তানা গেড়েছে প্রহেলিকা শিকদার। যেখানে সাধারণ মানুষের কল্পনাও পৌঁছাবে না। যেখানে সাধারণ মানুষের ভাবনা সমাপ্ত হয়, সেখান থেকেই শিকদারদের ভাবনা শুরু হয়।
সবুজে ঢাকা ঘন অরণ্যের ভেতর একটি মাঝারি গড়নের কাঠের বাড়ি। খুব সাধারণ। গেট থেকে শুরু করে বাড়ির চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে কালো পোশাক পরিহিত হাট্টাগাট্টা গড়নের রাইফেলধারী শতাধিক গার্ড।
— “ম্যাম, ইউ আর লুকিং গর্জিয়াস।”
স্পেনিশ পরিচারিকাটি প্রহেলিকাকে উদ্দেশ্য করে বললো।
চোখ নামিয়ে লাজুক হাসলো প্রহেলিকা। হাতে সোনার চুড় পড়তে পড়তে ধীমি আওয়াজে বললো—

— “কী যে বলো না, নেন্সি।”
— “নো ম্যাম, আই অ্যাম নট জোকিং। ইউ আর সাচ এ প্রিটি লেডি।”
খুশি হলো প্রহেলিকা। পরিচারিকার উপর বেজায় সন্তুষ্ট হলো। তাই ইনামস্বরূপ নিজের পার্স খুলে কচকচে একশো ডলারের একটি নোট বাড়িয়ে দিলো পরিচারিকার দিকে।
একশো ডলারের নতুন নোটটা দেখে চোখ চানা বড়ো হয়ে গেলো মেয়েটার। খপ করে নোটটা নিয়ে নিলো মেয়েটা। আরো তেল দেওয়া শুরু করলো।
দুধে আলতাবরণে লাল বেনারসি জড়িয়েছে প্রহেলিকা। গা ভর্তি স্বর্ণের অলংকার। নিজের দিকে নিজেই মুগ্ধ চোখে তাকালো প্রহেলিকা। খানিক অবাক হলো বটে—বউ সাজলে যে তাকে এতো সুন্দর লাগবে, সে কল্পনাই করতে পারেনি।
৫’৫” উচ্চতার ত্রিশোর্ধ্ব রমণীর দৈহিক গঠন, মসৃণ ত্বক আর তারুণ্যের জৌলুশে তাকে দেখে মনেই হয় না ত্রিশ পেরিয়ে গেছে। যে কেউ প্রথম দেখাতেই বলবে—বয়স বেশি হলে হবে হয়তো পঁচিশ। কিন্তু সার্টিফিকেট ব্যতীত বত্রিশ কাউকে বিশ্বাস করানো যাবে না। এই একই সূত্র শিকদার বাড়ির প্রত্যেক সদস্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তারা যেন চিরসবুজ। বাবা-ছেলে পাশাপাশি দাঁড়ালে কোনটা বাবা আর কোনটা ছেলে বোঝা দায়।
সাদমান শিকদার ও প্রণয় শিকদারকে পাশাপাশি দাড়ালে বাবা ছেলে কখনোই মনে হবে নাহ্।
প্রত্যেকটি পুরুষ এখনো তরুণ।

শত চেষ্টা করেও প্রণয়কে শেরওয়ানি পড়াতে পারেনি প্রহেলিকা। পাঞ্জাবি পড়াতে গেলে হাতের বাঁধন খুলতে হয়। আর হাতের বাঁধন এক সেকেন্ডের জন্যও উন্মুক্ত হলে কী হবে, সেটা সবার জানা। তাই প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাঁধন খোলার সাহস করতে পারেনি প্রহেলিকা। তাই অগত্যা পুরনো সেই শার্ট গায়ে পড়ে বিবাহের আসরে বসেছে প্রণয়। তবে চটফট করছে না মোটে। একদম শান্ত।
সমুদ্রপাড়ে বালির উপর রঙিন কাপড় আর গোলাপের মিশেলে আকর্ষণীয় বিবাহমণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে। ফেয়ারি লাইটের হলদে আলোয় ঝলমল করছে সি বিচ।
বিবাহআসর ঘিরে একশত দেহরক্ষী রাইফেল হাতে পাহারা দিচ্ছে। মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে প্রণয়ের পাশে বসে আছে প্রহেলিকা। চোখে রঙিন স্বপ্নের আস্তরণ। শরীর শিহরিত হচ্ছে বারবার। বুকের ভেতরের ধুকপুক শব্দ যেন উপস্থিত সবাই শুনতে পাচ্ছে। শতাব্দীপুরনো মৃতপ্রায় স্বপ্নগুলো আবার যেন জীবিত হচ্ছে।
পাশে একজন কাজী ও একজন উকিল।
কাজী সাহেব এতোগুলো বন্দুক দেখে ভয় পাচ্ছেন। তাই হড়বড়িয়ে বললেন—

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৪

— “এখন কি বিয়ে পড়ানো শুরু করবো? মা, দেখো চারপাশের আবহাওয়া ভালো না। যখন-তখন ঝুমবৃষ্টি নামবে।”
প্রহেলিকা ধীরে মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো। কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৬