ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৭
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
প্রণয়ের বুকে যেনো চৈত্রের খরা লেগেছে। অকাতর নয়ন জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখে দরজার পানে তাকিয়ে আছে কাঙ্ক্ষিত মুখখানি দেখার আকাঙ্খায়।
প্রণয় দেখার সামান্যতম সময়টুকু পেলো না। পলক ঝাপটানোর পূর্বে প্রবল সুনামির ন্যায় তপ্ত বুকের পাঁজরে আঁচড়ে পড়লো তুলতুলে একখানি নরম সত্তা। আরামের তোড়ে আপনাপনি চোখ দুটো বুঝে আসে প্রণয়ের। হাত দুটো আপনাআপনি চলে যায় পিঠে, আরো শক্ত করে বুকের মাঝে পিষে ধরে ননী মাখনের দেহখানা।
ঠোঁট কাঁপে। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে আসে একটা শব্দ—
— “জান।”
দুই হাতে মুঠোয় শক্ত করে প্রণয়ের শার্ট খামচে ধরে প্রিয়তা বুকের শক্ত পাঁজর ভেঙে ভেতরে নরম অংশে একদম সেঁধিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা চালায়। নাক মুখ ডুবিয়ে উন্মত্ত মাতালের মতো ঘ্রাণ নিতে থাকে। এই পুরুষের শরীরের ঘ্রাণ আফিমের নেশার মতো টানে তাকে। কী এমন মাখে শরীরে কে জানে কাছে আসলেই নিজেকে পাগল পাগল মনে হয় প্রিয়তার। এতো ভালো লাগে কেনো এই লোকটার সান্নিধ্য তাও জানে নাহ্ প্রিয়তা। কেবল জানে এই লোকটা চাই প্রতিটা নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে চাই প্রতিটা কদমে চাই চোখের পলক যতবার পড়ে হৃদপিণ্ড যতবার স্পন্দিত হয় ততবার চাই অনেক অনেক চাই। এই চাওয়া অনন্ত এই চাওয়া অসীম এই চাওয়ার কোনো শেষ নাই।
প্রিয়তার অপচেষ্টা দেখে মৃদু হাসে প্রণয়। নিচু হয়ে ঠোঁট চেপে ধরে প্রেয়সীর মাথায়। এই স্পর্শ এই গন্ধ এই আদর এই বাচ্চামো এই পাগলামি এগুলোর জন্য গত কয়েক ঘন্টা যে কতটা তড়পেছে প্রণয় বন্দী খাঁচায় তার প্রাণটা যে কতটা ছটফট করেছে সেটা কেবল সে আর তার আল্লাহই জানেন।
এই যে এক আত্মা এক প্রাণ হয়ে বুকের সাথে মিশে আছে ভালোবাসায় আর আদরে ভরিয়ে দিচ্ছে তপ্ত বুকটাকে চাতকে তার তৃষ্ণার পানি দিচ্ছে প্রাণ ভরে এই পাওয়ার অভ্যাস টুকুকে যে মনে প্রাণে আপন করে নিয়েছে প্রণয়। তাই এখন কয়েক মুহূর্তের দূরত্বকে ও জনম জনমের দূরত্ব মনে হয় এই মেয়েটাকে ছেড়ে একদম থাকতে পারে নাহ্ প্রণয় বড্ড কষ্ট হয়।
এই কষ্টটাকে একগুচ্ছ বাক্যের সমষ্টি দ্বারা কখনোই ব্যাক্ত করতে পারবে নাহ্ প্রণয় কাউকে বুঝাতে পারবে নাহ্ ঠিক কেমন কষ্ট হয়। কিন্তু কষ্ট হয় বুকের পাঁজরের ভেতর ঠিক কোনো এক নরম অংশে ২৪ ঘন্টা চিনচিন করে ব্যাথা করে কাছে পেলেও করে দূরে গেলে ও করে। পাগল পাগল লাগে নিজেকে। সব কাজকর্ম শিকেয় তুলে দিয়ে সারাদিন বুকে ধরে বসে থাকতে ইচ্ছা করে বুড়ো বয়সে এ কেমন ছেলেমানুষী বায়না বুঝতে পারে নাহ্। লোকে শুনলে পাগল বলে আখ্যায়িত করবে তাই কাউকে বলতে পারে নাহ্ প্রণয়। এতো ভালো লাগে মেয়েটাকে এতো মায়া লাগে একটা দিন একটু কম মায়া লাগতে পারে নাহ্ কিন্তু নাহ্ মায়াটা কমে নাহ্ বেবুঝ হৃদয়ের গভীর থেকে গভীরে কেবল শিকড় গাড়ে।
এভাবে একে অপরের মাঝে ভালোবাসার আবেশে আদরের আতিশয্যে কতক্ষন কাটে বলতে পারবে নাহ্ দুজনের একজন ও। হটাৎ বাহিরে ধারাম করে কিছু পড়ার শব্দে হুশ ফিরে আসে দুজনের।
কিন্তু প্রিয়তা তবু ও ছাড়ে নাহ্। বুকের ওমে লেপ্টে থেকে আহ্লাদী কন্ঠে বলে—
— “এভাবে আরেকটু থাকুন প্রণয় ভাই প্লিজ যাবেন না। আপনার বুকের ধুকপুক শব্দটা শিল্পীর গাওয়া শ্রেষ্ট সঙ্গীত মনে হচ্ছে আপনার বুকের উষ্ণতা এতো আরাম যে সুখের আবেশে নিজেকে কখন হারিয়ে ফেলি বুঝতেই পারি নাহ্। আপনার বুকে সবসময় এভাবেই থাকতে চাই।”
প্রেয়সীর প্রেমময় আবদারে মনে মনে আপ্লুত হয় প্রণয় তবে মুখে প্রকাশ করে নাহ্ খুঁচা দিয়ে বলে—
— “বাহ্ খুব তো পাকা পাকা কথা শিখেছো স্বামীর থেকে নিজের ভাগ বুঝে নিচ্ছো কিন্তু স্বামী যখন নিজের ভাগ নিতে চায় তখন অত্র এলাকায় গুনবতী স্ত্রীর টিকি ও পাওয়া যায় নাহ্।”
— “এখন থেকে পাবেন।”
— “কী পাবো?”
ভ্রু কুচকে গেলো প্রণয়ের।
লজ্জায় আরো গুটিয়ে গেলো প্রিয়তা মিন মিন করে বললো—
— “আপনার ভাগ।”
ঠোঁট কামড়ে হাসি রুধ করলো প্রণয় প্রেয়সীর লাজে রাঙা মুখখানা দেখার ভারী সাদ জাগলো মনে তাই লজ্জাবতীর লজ্জা বাড়িতে দিলো প্রণয়।
তর্জনী দ্বারা প্রিয়তার চিবুক তুলে ধরলো সম্মুখে। তৎক্ষণাৎ চোখাচোখি হয়ে গেলো দুজনের। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রিয়তা ফর্সা রঙা গাল দুখানিতে লজ্জার রক্তিম আভায় লালিত বর্ণ ধারণ করছে। প্রণয় ধরে রেখেছে বিধায় চোখ নামিয়ে নিতে পারছে নাহ্ প্রিয়তা আর নাহ্ পারছে ওই প্রাণঘাতী মারত্মক চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকতে। গলা শুখাতে শুরু করে প্রিয়তার। পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল দ্বারা শক্ত করে চেপে ধরে মার্বেল বসানো মেঝে।
মাথা নিচু করে প্রিয়তার মুখ বরাবর নামিয়ে আনে প্রণয় চোখে চোখ রেখে ঘোরলাগা কন্ঠে ফিসফিসায়—
— “শুনতে পাইনি আরেকবার বলো জান!”
পুরুষালী চোখ দুটো যেনো মরণ বাণ! দুর্বুদ্ধ নেশায় ডুবানো নীল বিষের সরোবর। কন্ঠটাও তেমন গলা শুকিয়ে যায় প্রিয়তার। সারা শরীর ঝাকি দিয়ে উঠে। হাতের বাধন ঢিলে হতে শুরু করে ধীরে ধীরে।
প্রিয়তার বেহায়া নজর চোখ থেকে সরে কখন ঠোঁটের উপর স্থির হয় নিজেই বুঝতে পারে নাহ্ প্রিয়তা নেশাতুর দৃষ্টিতে পলক না ফেলে দেখতে থাকে লোভনীয় ঠোঁট দুটোর অবিরাম নড়াচড়া।
— “বলো নাহ্ জান?”
প্রণয় কিছু বুঝতেই পারলো নাহ্ আচানক হামলাটা হলো অতর্কিত। রসগোল্লার মতো চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলো প্রণয়ের দ্রুত ঘটে যাওয়া ঘটনাটা ব্রেনে সিগন্যাল পাঠাতে আর প্রসেস হতে কয়েক সেকেন্ডে লাগলো। নিঃশ্বাস ঘনো হয়ে এলো প্রণয়ের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি লাফিয়ে বেড়ে গেলো কয়েকগুণ। চোখ দুটো আপনাপানি বুঝে এলো প্রণয়ের অবাধ্য হাত দুটো চলে গেলো সীমানা ছড়িয়ে। পুরুষালী শরীরে লাগাম টেনে রাখতে কতটা কষ্ট হয় বোকা নারী কী বুঝে? হয়তো বুঝে নাহ্! বুঝলে হয়তো যখন তখন এমন পাগল বানাতে পারতো নাহ্। অতঃপর…
লাক্ষাদ্বীপ পয়েন্ট নিমোর সব থেকে দূরের ভূখণ্ড যার দূরত্ব ষোলো হাজার কিলোমিটার। আরব সাগরের বুকে ভেসে থাকা ভারতবর্ষের ছোট্ট এক অংশ।
বেলকনিতে দাড়িয়ে এক দৃষ্টিতে সমুদ্রের অন্তহীন নীলিমার পানে তাকিয়ে আছে শুদ্ধ গোলাপি ওষ্ঠের ভাঁজে জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরে একের পর এক টান দিচ্ছে। বাতাসের সাথে বিষাক্ত ধোঁয়া টেনে নিচ্ছে ফুসফুস ভরে। সিগারেটের তিরতির করে জ্বলা আগুনে ঠোঁট পোড়াচ্ছে নাকি বুক পোড়াচ্ছে বুঝা দায় হয়তো বুক পোড়াচ্ছে ঠোঁট পোড়ানোটা হয়তো লোক দেখানো।
ঠায় দাড়িয়ে আছে শুদ্ধ। সমুদ্রের তটের হিমেল দমকা হাওয়া থেকে থেকে ছুঁয়ে যাচ্ছে তার লম্বা চওড়া গড়ন। লালচে চোখ দুটি কোঠর ভর্তি টলটলে পানিতে চিকচিক করছে। হয়তো ঝরতে চাচ্ছে? বর্ষা হয়ে ঝরতে চাওয়া জমে থাকা কান্নাগুলোকে ইচ্ছাকৃত দমন করছে শুদ্ধ। ঝরে পড়ার অনুমতি দিচ্ছে নাহ্ বিধায় চোখ দুটো কেবল জ্বালা করছে। মুছে ফেললেও বারবার ভরে উঠছে নতুন উদ্যম। কী জ্বালাতন।
— “কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো,
আমি বুক চিরিয়া?
অন্তরে তুষেরই আগুন জ্বলে,
রইয়া রইয়া।
কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো,
আমি বুক চিরিয়া?
অন্তরে তুষেরই আগুন জ্বলে,
রইয়া রইয়া।”
হটাৎ গানের দুটো লাইন কানে আসতেই থমকায় শুদ্ধ। আঙুলের ফাঁকে ধরে রাখা আধপুড়া সিগারেটটা যেনো জমে হয়ে যায় সেই মুহূর্তেই। বাতাসের তরঙ্গ দূর থেকে বয়ে আনে পরান জুড়ানো মাটির গান। বিষাক্ত অনুভূতির তীব্র দহনে পুড়তে থাকে শুদ্ধ চোখ দুটো বুঝে আসে আনমনে। নিরালায় দাড়িয়ে শ্রবণ করতে থাকে সুমধুর ধ্বনি। তার অন্তরের সাথে কার অন্তরের এতো মিল? জানার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা হয় নাহ্। কেবল সুরের টানে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সে।
সুরের উৎস ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে ব্যাপারটা অনুব হতেই ঝট করে চোখ মেলে তাকায় শুদ্ধ। অস্থির দৃষ্টিতে সমুদ্র তটের এদিক সেধিক নজর ঘুরাতেই কিছুটা দূরে দৃষ্টি আটকে যায় শুদ্ধের। সমুদ্রের পার ধরে আপন মনে হেঁটে চলেছে এক বাউল গীতিকার। পরনে ছেঁড়াফাটা ময়লা বস্ত্র মাথায় মলিন পাগড়ি কাঁধে ঝুলা আর হাতে একতারা পিছুটানহীন মুক্ত জীবন। চোখে এক অজানা উদাসীনতা আর কন্ঠে পরান জুড়ানো সুর।
শুদ্ধর প্রাণ আকুল হয়ে ওঠে ওই বাউলের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য। মনে উচাটন হয় আরো কিছুটা সময় নিভৃতে বাউলের উদাস কন্ঠে প্রাণ জুড়ানোর জন্য। এই দম বন্ধকর জীবন থেকে কিছুটা সময় মুক্তি পাওয়ার জন্য হলে ও তাকে ও বাউলের কাছে যেতেই হবে।
জ্বলন্ত সিগারেটের শেষ অংশটুকু পায়ের তলে ফেলে পিষে ফেলো শুদ্ধ। বেলকনিতে লাগোয়া সিঁড়ি বেয়ে হুড়মুড়িয়ে নিচে নেমে গেলো। এক ছুটে চলে গেলো বাউলের নিকট। পায়ে পা মিলালো।
বাউল লোকটি ভবঘুর কেবল এক নজর তাকালেন হটাৎ উড়ে আসা ছেলেটার দিকে। চোখে হাসলে ও মুখে কিছু বললেন নাহ্। আবারো পুরনো ছন্দে সুর তুললেন।
— “কথা ছিল সঙ্গে নিব,
সঙ্গে আমায় নাহি নিলো গো।
কথা ছিল সঙ্গে নিব,
সঙ্গে আমায় নাহি নিলো গো।
আমারে একলা থুইয়া,
আমারে একলা থুইয়া,
রইলো কোথায় গিয়া—
জ্বলে রইয়া রইয়া।
কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো,
আমি বুক চিরিয়া?
অন্তরে তুষেরই আগুন জ্বলে,
রইয়া রইয়া।
ঘর বাঁধিবো সখীর সনে,
কত আশা ছিল মনে গো।
ঘর বাঁধিবো সখীর সনে,
কত আশা ছিল মনে গো।
ভাঙিলো আদরের জোড়া,
ভাঙিলো আদরের জোড়া—
কি যে গেল হইয়া,
জ্বলে রইয়া রইয়া।”
গোধূলির আলো তখন নিভে আসছে। সমুদ্রের পাড়ে বালি বেয়ে নামছে নরম ছায়া। শুদ্ধ আর বাউল পাশাপাশি বসে আছেন সমুদ্রের দিকে মুখ করে। বাতাসে বাউলের পুরনো আলখাল্লাটা উড়ছে। চারপাশটা কেমন যেন থমথমে, কেবল ঢেউগুলোর একটানা ভেঙে পড়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।
— “আপনি অনেক সুন্দর গান করেন বাউল ফকির।”
— “তাই নাকি আমার গান তো অনেক পুরনো দিনের। আজকালকার পোলাপান তো খুব একটা পছন্দই করে নাহ্।”
— “জানি নাহ্ কেনো পছন্দ করে নাহ্, কিন্তু আপনার কন্ঠে প্রাণ আছে। আপনার গানের লাইনগুলো হুবহু আমার জীবনের বাস্তবতা।”
তবে শুনতে তো ভালোই লাগে, কিন্তু অনুভব করতে একটুও ভালো লাগে নাহ্ এই অনুভূতির পরতে পরতে বিষ। নিঃশ্বাসের সাথে যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়। দমটা ফুরিয়ে আসে মাঝে মাঝে, তবু বেঁচে থাকতে হয়।
কথাগুলো বলার সময় ছেলেটার উগড়ে আসা চোখের জল বাউলের চোখ এড়ালো নাহ্। ছেলেটার কন্ঠ না, যতো কথা বলছে তার থেকে অনেক বেশি কথা বলছে ছেলেটার চোখ।
বাউল সাথে সাথে কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি চুপচাপ এক মুঠো বালি হাতে নিলেন, তারপর আঙুলের ফাঁক দিয়ে বালিগুলো ঝরে পড়তে দেখলেন। বালিগুলো বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তিনি খুব সহজ গলায় বললেন—
— “মানুষের জীবন বড়োই জটিল, বাজান। জীবনের সব প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলে টিকে থাকা একটা যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত যে টিকে থাকে, সেই জয়ী হয়। এমন কোনো মানুষ নেই যার জীবনে দুঃখ নেই। কষ্ট সবারই আছে, বাজান। কেউ মুখে কয়, কেউ মনে কয়। হয়তো তোমাকে আশেপাশে যতজনকে চিনো, বা তুমি যাকে সব থেকে বেশি সুখী মনে করো, একটু ভাবতো—তার জীবনে কী সত্যি কোনো দুঃখ নেই।”
কয়েক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল শুদ্ধ। তার নজরে সব থেকে সুখী মানুষ প্রণয়। কিন্তু প্রণয়ের জীবনের দুঃখ তার দুঃখের হাজারগুণ তীব্র।
সে তো ভালোবাসা পায়নি বলে কষ্ট পাচ্ছে প্রতিনিয়ত আফসোস করছে। আর প্রণয় যে পেয়েছে, যে সুখী আছে তার এই সুখ কী স্থায়ী?
সবাই না-পাওয়ার কষ্টে দুঃখ বিলাস করে। কই, কেউ তো জানতে চায় নাহ্—পেয়ে হারানোর কষ্ট কতটা? যাকে এতো ভালোবাসি, তাকে পাওয়ার পর ছেড়ে থাকার কষ্ট কতোটা?
জন্মান্ধের দুনিয়ার প্রতি কোনো টান কাজ করে নাহ্, কারণ সে জন্ম থেকেই অন্ধ। কিন্তু অনেকগুলো বছর সূর্যকে নয়ন ভরে দেখার পর হঠাৎ একদিন সেই নয়নের আলো ফুরিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা কী জন্মান্ধ বুঝবে? না-পাওয়ার দুঃখ এক জন্মের। আর পেয়ে হারানোর দুঃখ জন্মান্তরের।
— “কী বাজান, প্রশ্নের উত্তর কী পাইছ?”
শুদ্ধ কাতর চোখে তাকায়। সম্মতিসূচক উপরে-নিচে মাথা দুলায়।
— “জীবনে যা আছে, তা নিয়ে আনন্দে বাঁচার চেষ্টা করো বাজান। জীবনটা বড়োই ক্ষুদ্র। কখন আল্লাহর ডাক চলে আসে, কেউ বলতে পারে নাহ্।”
— “আমার থেকেও অনেক কষ্টে মানুষ বাঁচে, বাউল ফকির। কিন্তু প্রতিনিয়ত মরার থেকে কী ভালো নয় একেবারে মরে যাওয়া? না-পাওয়ার তৃষ্ণা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা চেয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নেওয়া পুরষ্কার স্বরূপ।”
— “সান্তনা দিচ্ছি নাহ্, তবে তোমার শান্তি কামনা করছি। আল্লাহ্ তোমার মঙ্গল করুন।”
— “আপনি তো কত মানুষের কত গল্প জানেন, বাউল ফকির। আপনি কী আমায় একটা উপায় বাতলে দিতে পারেন? গায় আমার ভীষণ জ্বর গা পুড়ে যাচ্ছে, বাউল ফকির। এই চিরন্তন জ্বর কী আমার কোনোদিন সারবে না? এই জ্বরটা সারলে হয়তো আমার প্রাণটা বেঁচে যেতো।”
— “তোর গায়ে পিরিতির জ্বর, বাপ। এ বড়ো অশান্তির অসুখ। পিরিতির জ্বর সরানোর কোনো দাওয়াই আমার জানা নাই!”
“যেজন প্রেমের ভাব জানে নাহ্,
তার সনে নাই লেনাদেনা।
খাঁটি সোনা ছাইড়া যে নেয় নকল সোনা,
সেজন সোনা চিনে নাহ্।”
— “ওয়াক ও-ওয়াক ওয়াক!”
আস্তে আস্তে, ধীরে ধীরে। জান তোকে কতদিন বলেছি, একটু সবুর করতে, একটু রয়ে সয়ে ভালোবাসতে। আমি কী পালিয়ে যাচ্ছিলাম? এতো তাড়াহুড়োর কী ছিলো? প্রথমদিকের মাসগুলোতে এমন হয়—অল্পতেই গা গুলায়, বেশি শরীর খারাপ করে।
প্রিয়তার সামনের চুলগুলো জমিয়ে পেছনে মুঠো করে ধরে রেখেছে প্রণয়। বেসিনে দুই হাতে ভর দিয়ে গড়গড় করে বমি করে ভাসিয়ে দিচ্ছে প্রিয়তা। ওয়াক তুলতে তুলতে চোখে পানি চলে এসেছে। অনবরত পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে প্রণয়। তার চেহারায় অনুশোচনার ছাপ স্পষ্ট।
বমি করতে করতে নেতিয়ে পড়েছে প্রিয়তা। কোনো রকম ঘুরে প্রণয়ের বুকে মাথা এলিয়ে দেয়। নিজের দেহের সকল ভর ছেড়ে দেয় প্রিয় পুরুষের মাঝে। ঠোঁট উল্টায়, পেট জড়িয়ে ধরে, অভিমানী কণ্ঠে বলে—
— “শুধু শুধু বকছেন কেনো আমায়? আমার কী দোষ? আপনাকে দেখলেই আমার কী যে হয়ে যায়? আমার হাত-পা নিশপিশ করে আমি মঞ্জুলিকা হয়ে যাই।”
স্পষ্ট স্বীকারোক্তি প্রিয়তার।
— “তাই এতো যদি আমাকে গুলে খেতে মন চায়, তাহলে শরীরের এই বেহাল দশা বানিয়েছিস কেনো? হঠকারিতায় কেনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলিস? দেখ, কতো ঘন ঘন শরীর খারাপ করছে তোর। কোনো কাজ করার আগে যদি একটু আমার কথা ভাবতিস। তোর এতটুকু শরীরে এই দখল কী সহ্য হবে? দিন তো সব পড়েই রইলো। তুই আরেকটু বড়ো হলে নাহয় আমরা বাবু নিতাম। কী হতো, ৫-৬ বছর পর নিলে? কিন্তু নাহ্, ম্যাডামের উপর চালাকিতি দেখাতেই হবে। দেখি বেশি বমি পাচ্ছে? মাথা ঘুরছে? ডাক্তার ডাকবো?”
— “আবার বকছেন? নিকুচি করেছে আপনার ডাক্তারের?”
ঝামটা মেরে মুখ ঘুরিয়ে নেয় প্রিয়তা। ফুলকো গাল দুটো অভিমানে উঁচু হয়।
— “তো বকবো নাহ্। বাবুও চাই, আবার তোমাকে দেখলে আমার হুশ ঠিক থাকে নাহ্। খাওয়ার জন্য দাঁত নিশপিশ করে। দুটো কী একসাথে হয়?”
— “আমার দুটোই চাই।”
— “বেয়াদব বউ।”
বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে প্রণয়ের। অতি যত্নে পোষা পাখিটাকে নিজের বুকের গভীরে আগলে নেয় প্রণয়। পরম মমতায় জড়িয়ে নেয় নিজের মাঝে। ওম পেয়ে আরো মিশে যায় প্রিয়তা।
প্রিয়তার লম্বা চুলগুলো সাবধানে হাতে পেঁচিয়ে খোঁপা করে দেয় প্রণয়। আজল ভরে পানি তুলে কুলকুচি করিয়ে দেয়, মুখ ধুইয়ে আলতো করে টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দেয়। কোলে তুলে বিছানায় এনে আস্তে করে শুইয়ে শোয়ায়। গলার ওড়নাটা খুলে পাশে রাখে। মেয়েটার পুরো শরীর ঘামছে।
বালিশ দুটো পিঠের নিচে দেয় প্রণয়। কপালে হালকা টোকা দিয়ে শাসিয়ে বলে—
— “একদম নড়াচড়া করবি নাহ্, হাঁসের বাচ্চা। চুপটি করে শোয়ে থাক। প্যাক প্যাক করলে টুক করে গিলে ফেলবে। আসছি আমি এক্ষুনি।”
বলে টুপ করে কপালে একটা চুমু দেয় প্রণয়। উঠে যেতে গেলেই খপ করে হাত ধরে ফেলে প্রিয়তা।
ভ্রু নাচায় প্রণয়।
— “কী?”
হাত ধরে কাছে নিয়ে আসে প্রিয়তা। আবার প্রণয়ের ঠোঁটে চকাস করে একটা চুমু খায়। ভ্রুকুটি করে তাকায় প্রণয়।
প্রিয়তা ভেংচি কাটে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে—
— “হুহহ! আমি তনয়া শিকদার প্রিয়তা। করো ঋণ রাখি নাহ্। আপনি চুমু দিয়েছেন আমিও চুমু দিয়েছি হিসাব বরাবর।”
— “আমি তো আরো অনেক কিছুই দিয়েছি।”
— “ভয় দেখলেন? দুঃখিত ভয় পেলাম নাহ্! চাইলে ওগুলো ফেরত দিয়ে দেবো।”
বিস্ময়ে অবাক হতেও ভুলে গেলো প্রণয়। কোনোভাবে কী বউ তার পাল্টাপাল্টি হয়ে গেছে। সে যাই হোক। কথায় হেরে যাওয়া চলবে নাহ্।
— “পাই টু পাই ফেরত নেবো।”
— “এক্ষুনি নেবেন?”
দুষ্টু হাসলো প্রিয়তা।
— “সময় মতো হিসাব নেবো! তখন মনে থাকে যেনো এই কথা গুলো।”
ঘর থেকে বেরিয়ে যায় প্রণয়। বাহিরে এসে টাস্কি খায়। কপাল কুঁচকে আশেপাশে দৃষ্টি ঘুরাতেই কপালের সূক্ষ্ম ভাঁজগুলো আরো দৃঢ় হয়। ঘর থেকে বেরিয়ে একতলা বাড়ির বারান্দায় এসে পৌঁছেছে সে। তিন দিকে দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্র। চারপাশে কোথায় কেউ নেই। বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়ির কাছে চলে আসে প্রণয়। সমুদ্রের একদম কোল ঘেঁষে বাড়িটা। একটা-দুটো করে তিনটা সিঁড়ি পেরিয়ে মাটিতে পা রাখে প্রণয়। মাটি বললে ভুল হবে—বালি। কারণ কয়েক ফুট দূরেই সমুদ্র।
এটা কোন দেশের সমুদ্র, জানে নাহ্ প্রণয়। তার মতো মানুষের সব জায়গায় এমন অবাধ বিচরণ করা একদম নিরাপদ নয়। সে এখন একজন সাধারণ মানুষ, সাথে দাগী আসামী। কখন কী হয়। তার পাখিটা তো বোকা, কিছুই বুঝে নাহ্। কিন্তু কিছু যদি হয়ে যায়, তাহলে তার পাখিটাই সব থেকে বেশি কষ্ট পাবে।
প্রণয় সতর্ক চোখে আশেপাশে দৃষ্টি ঘোরায়। দূরে কিছু মানুষ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তাদের মধ্যে মুখোশধারী দুই-একজনকে ঠিক চিনে নেয় প্রণয়। চোখের ভাষা পাল্টে যায় প্রণয়ের। মসৃণ কপালে ফুটে ওঠে স্পষ্ট বিরক্তির রেখা।
প্রিয়তা বিছানায় পা ঝুলিয়ে শুয়ে শুয়ে গোপাল ভাঁড় দেখছে আর হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। সাইলেন্ট মুডে থাকা ফোনের উপর হঠাৎ একটা নাম্বার ভেসে ওঠে, সাথে দুটো অপশন—আনসার ওর ডিক্লাইন। ফোনটা দেখা মাত্রই মুখের হাসি মিলিয়ে যায় প্রিয়তার। চেহারা গম্ভীর হয়ে যায় মুহূর্তেই। প্রিয়তা ফোনটা রিসিভ করে, আশেপাশে সতর্কভাবে উঁকি দেয়। চাপা কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলে—
— “কী খবর?”
— “খবর ভালো নাহ্, ম্যাডাম। বিদেশি গ্যাংস্টার, মাফিয়া লিডার, বড়ো বড়ো র্যাকেট—সাপ্লাই বন্ধ করে দেওয়ার ফলে সবাই খুব ক্ষেপে আছে এএসআর-এর উপর। তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের লোকসান হয়েছে। তারা এটাও জেনে গেছে, এএসআর আর তাদের সাথে কাজ করবে নাহ্। সে এসব ছেড়ে দিয়েছে। গ্লোবাল গভার্নমেন্টের সাথে সাথে গ্লোবাল ডনরা সবাই পিছে পড়ে আছে। এএসআর-এর পরিস্থিতি খুব জটিল। এসব চক্রে একবার জড়িয়ে যাওয়া মানুষ কোনোদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে নাহ্। আর যদি চেষ্টা করে, হয় তারা নিজেদের লোকের হাতে খুন হয়, আর নাহলে সরকারের হাতে। হ্যালো, ম্যাডাম, আপনি কী শুনতে পাচ্ছেন?”
— “হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি!”
টেনশনে মাথা ছিড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে প্রিয়তার। তবুও নিজেকে শান্ত রাখে।
লোকটি আবারো গম্ভীর কণ্ঠে বলে—
— “সবকিছু খুব দ্রুতই হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে, ম্যাডাম। মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি সবাই এএসআর সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য জেনে যাবে। আমার কাছে খবর আছে—আপনাদের বাড়ির পুকুর থেকে নাকি একটা পেনড্রাইভ উদ্ধার হয়েছে।”
— “হোয়াট?”
কথাটা কানে পৌঁছতেই বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে যায় প্রিয়তা। যেন মাথার উপর মস্ত আকাশ ভেঙে পড়ে। উত্তেজিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে—
— “তুমি নিশ্চিত?”
— “ইয়েস, ম্যাডাম। ১০০% নিশ্চিত। ওই পেনড্রাইভের রিসেন্ট ৬৭টা কপি বেরিয়েছে, ম্যাডাম। যেগুলো খুব শীঘ্রই প্রত্যেকটা দেশের সরকারের হাতে পৌঁছে যাবে। শুধু তাই নয়—এএসআর-এর ল্যাপটপের আরো অনেক নথি ছিলো, যেগুলো অন্য একটা পেনড্রাইভে অনেক আগেই লোড করা হয়েছিল। সেটারও অনেকগুলো কপি বেরিয়েছে। এএসআর-এর ব্যক্তিগত নথি, তার আইডেন্টিটিও খুব তাড়াতাড়ি এক্সপোজ হয়ে যাবে। পরিস্থিতি খুবই বিপদজনক। ২৪ ঘণ্টা সাবধানে থাকতে হবে। আপনাদের ঘরে শত্রু আছে, ম্যাডাম। তাকে ঘরে রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাবেন নাহ্।”
নিজেকে ঠান্ডা রাখার অদম্য চেষ্টায় বারবার ব্যর্থ হচ্ছে প্রিয়তা। না চাইতেও প্যানিক অ্যাটাক আসছে।
লোকটি পুনরায় বলে—
— “আরেকটা কথা, ম্যাডাম।”
— “বলো!”
— “যা কিছু হচ্ছে, সব ঘটনার পাই টু পাই সবাই জানে। কিন্তু কেউ মুখ খুলছে নাহ্। সবাই এমন অভিনয় করছে যেন কিছুই হচ্ছে নাহ্। আপনি চোখ-কান সবসময় খোলা রাখবেন, ম্যাডাম। এএসআর কিন্তু সবই জানেন। তিনি এটাও জানেন যে পরিস্থিতি কেমন খারাপ হচ্ছে। তবুও তিনি সব বিজনেস বন্ধ করে দিয়েছেন। আর এখনকার সব কিছুই জানেন। ডক্টর চৌধুরীও কিন্তু সব জানেন। আপনি ঘাবড়াবেন নাহ্, ম্যাডাম। কেবল পুলিশ, সন্দেহজনক মানুষদের চোখ বাঁচিয়ে চলবেন। খবর আছে—আগামী এক সপ্তাহ অনেক জল ঘোলা হবে। সব রহস্যের উপর থেকে পর্দা সরে যাবে। এএসআরকে পাওয়া মাত্রই কেস শুরু হবে, কেস কোর্টে উঠবে। আর তারপর—”
— “তারপর? তারপর কী?”
হঠাৎ চিৎকার দিয়ে ওঠে প্রিয়তা। উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে বলে—
— “তারপর কী?”
— “আপনি শান্ত হন, ম্যাডাম। উত্তেজিত হলে দ্রুতই সব নষ্ট হয়ে যাবে। তারপর কী—সেটা আপনিও জানেন, আমিও জানি। আমি শুধু আপনাকে সতর্ক করছি। আর হ্যাঁ, আরেকটা কথা। আমি নতুন নতুন নাম্বার দিয়ে ফোন করবো এর পর থেকে। আমাকে পুলিশ খুঁজছে। আর হ্যাঁ, আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা—আপনি এখন যেখানে আছেন, ওখানে নিকোলাস পৌঁছে গেছে। নিকোলাসকে চিনেন তো আপনি? নতুন নতুন, ম্যাডাম, অনেক কিছু জানেন নাহ্ আপনি আন্ডারওয়ার্ল্ড সম্বন্ধে। আরো ভালো করে রিসার্চ করুন। তাড়াতাড়ি সবার ডিটেলস বলা সম্ভব নাহ্। নিকোলাস আন্ডারওয়ার্ল্ডের আরেক নামকরা মাফিয়া বস। ডিকে বসের পার্টনারের ছেলে। খুব বিষাক্ত আর সহিংস। এএসআর-এর নারী পাচার চক্রের এক মাথা। সে জেনে গেছে, এএসআর ডিকেকে মেরে ফেলেছে। সাথে মেয়ে সাপ্লাই বন্ধ করে দিয়েছে। ও খুব বিষাক্ত। ও পৌঁছে গেছে আপনাদের খুব কাছে। একটু সামলে। কখন কী হয়।”
হঠাৎ মাঝপথে কুটকুট শব্দে ফোন কেটে যায়। ফোনটা হাত ফসকে ধপ করে নিচে পড়ে যায়। এক মুহূর্তে পাগলপাগল হয়ে যায় প্রিয়তা। দিশেহারা হয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। হাত-পা কাঁপছে তার, নার্ভগুলো অবশ হয়ে আসছে উত্তেজনায়।
চুটার তালে চুল খুলে পিঠের উপর ছড়িয়ে গেলো প্রিয়তার। বাহিরে সমুদ্র পারে অস্থির দৃষ্টি বুলালো প্রিয়তা। দূরে কয়েকটা মাছ ধরার ট্রলার, কিছু জেলে আর তীরের দিকে কিছু মানুষ। বেলা বাড়ায় কিছু দোকানপাটও খুলছে।
কিন্তু সেই চেনা পুরুষালী অবয়বের কোনো হদিস পেলো নাহ্ প্রিয়তা।
বুকটা অস্বাভাবিক কাঁপছে প্রিয়তার। হৃৎপিণ্ডটা এতো জোরে লাফাচ্ছে, দম গলায় উঠে আসছে প্রিয়তার।
প্রিয়তা পাগলের মতো আশেপাশে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ একটা পিঠ দেখে থেমে যায়। খুশিতে চোখের কোনে পানি চলে আসে প্রিয়তার। গলার কাছে যেন এতক্ষন দমটা আটকে ছিল। সে দৌড়ে যায় মানুষটার কাছে, কম্পিত হাতটা পিঠে রাখে।
লোকটা পেছন ফিরে তাকায়। অপরিচিত মুখ চোখে ভাসতেই মুখের হাসি ম্লান যায় প্রিয়তার। অবাক বুকের ভেতর অসহ্য ধুকপুকানি শুরু হয়।
— “কিছু বলবেন?”
— “জান”
এই একটা মাত্র শব্দ প্রিয়তার দেহে দ্বিতীয়বারের মতো প্রাণ ফিরিয়ে দেয়। ঝড়ের বেগে পেছন ফিরে তাকায় প্রিয়তা। সেই চেনা চোখ, চেনা মুখ, চেনা অবয়ব তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জানে, জান আসে— প্রিয়তার বুকের উপর থেকে যেনো পাহাড় নেমে যায়।
সবার সামনেই বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে কেঁদে ফেলে প্রিয়তা। বাঁধনহীন ঝর্নার ন্যায় দৌড়ে গিয়ে আঁচড়ে পড়ে প্রিয় বুকে। বুকে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠে প্রিয়তা।
প্রণয়ের এক হাতে খাবারের প্যাকেট, অন্য হাতে বুকে আগলে ধরে প্রিয়তাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে অত্যন্ত আদুরে কণ্ঠে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে।
— “কী হয়েছে আমার বাচ্চার? আমার পাখিটা এভাবে কাঁদে কেনো? এইতো লক্ষ্মীটি, দেখো আমি তোমার কাছেই আছি।”
প্রিয়তা কিছুই শোনে নাহ্। আরো শক্ত করে ঝাপটে ধরে প্রণয়কে। সামনের লোকটা এসব দেখে হতবাক, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে দুজনের দিকে। শুধু ছেলেটা নয়, অনেক মানুষই আড়চোখে তাদের দিকে তাকাচ্ছে।
প্রণয় লোকটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসার চেষ্টা করে বলে—
— “সরি, মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং।”
লোকটা হ্যাঁসূচক মাথা দুলিয়ে চলে যায়। প্রণয় হুমকি দেয়—
— “চিনি হাঁসের বাচ্চা, আরেকবার প্যাক প্যাক করে কাঁদলে আমি এবার সত্যি সত্যি ফেলে চলে যাবো।”
যাওয়ার কথা শোনতেই আরো শক্ত করে চেপে ধরে প্রিয়তা। ভেজা কণ্ঠে হেঁচকি তুলে বলে—
— “নাহ্, আপনি আমাকে রেখে কোথাও যাবেন নাহ্। এক মুহূর্তের জন্যও নাহ্, কক্ষনো না, কোনোদিনও নাহ্। সব জায়গায় আমি আপনার সাথে যাবো।”
— “তাহলে চোখ মুছ। ওভাবে পাগলের মতো দৌড়ে আসছিলি কেনো? যদি পড়ে যেতি, যদি ব্যাথা লাগতো।”
— “তো কী হয়েছে? এসব ছোটখাটো ব্যাথা দেখার কী সময় আছে?”
— “মারবো, টেনে এক চড়!”
— “মারুন, কিন্তু এক মুহূর্তও আমার চোখের আড়াল হবেন নাহ্।”
মেয়েটার এতো ভালোবাসা আর এতো পাগলামি দেখে প্রণয়ের বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠে। না চাইতেও ভরে উঠে চোখের কোন। তারও খুব ইচ্ছা হয় তার প্রাণপাখিটাকে বুকে ঝাপটে ধরে হুহু করে কাঁদতে, কিন্তু এতে মেয়েটা আরো ভয় পেয়ে যাবে।
বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলায় প্রণয়। গালের দুপাশে হাত রেখে বৃদ্ধাঙ্গুল দ্বারা আলতো করে মুছিয়ে দেয় চোখের জল। আদুরে কণ্ঠে বলে—
— “চল!”
বিছানার উপর দু পা ভাঁজ করে বাবু হয়ে বসেছে প্রিয়তা। প্রণয়ের ফোনে গেম খেলছে। অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে কিছুটা শান্ত হয়েছে মেয়েটা। ফুলকো ফুলকো গাল দুখানি এখনো লাল। কান্নার রেখাগুলো গালে শুকিয়ে গেছে।
ওর সামনে আসন পেতে বসেছে প্রণয়। সামনে খাবারের থালা। পরোটা ছিড়ে তরকারিতে চুবিয়ে মুখে তুলে খাওয়াচ্ছে। গরম পরোটার আরেক লোকমা তরকারিতে চুবিয়ে ফুঁ দেয় প্রণয়। প্রিয়তার মুখে তুলে দিতে দিতে সন্দিহান কণ্ঠে শোধায়—
— “কী ব্যাপার বলতো? ওভাবে পাগলের মতো ছুটছিলি কেনো? এমনভাবে আমাকে খুঁজছিলি, মনে হচ্ছিল আমি মরে গেছি? কী ঘটনা, হুম?”
প্রশ্ন শোনে থতমত খেয়ে যায় প্রিয়তা। কেঁসে উঠে, গলার খাবার আটকে যায়। দ্রুত পানির গ্লাসটা মুখের সামনে তুলে ধরে প্রণয়। তাড়াহুড়োয় পানি খেতে গিয়ে মাথায় উঠে যায়, বিষম লেগে কাশি আরো বেড়ে যায়।
পিঠ ঠেলে দেয় প্রণয়। সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। আরো তীক্ষ্ণ কণ্ঠে শুধায়—
— “ধীরে ধীরে! একটা সাধারণ প্রশ্নে এমন চমকানোর কী আছে? আর যেভাবে আমাকে ধরে কাঁদছিলি!”
— “আমি… আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। অনেকক্ষণ হয়ে গেছিলো, আসছিলেন না তো, তাই।”
দ্রুত কথা কাটানোর চেষ্টা করে প্রিয়তা।
— “তাই নাকি? কিন্তু আমি তো মাত্র ১০ মিনিট হয়েছিল বেরিয়ে ছিলাম। আচ্ছা, এটা বাদ দিলাম। কিন্তু আমি মন্দারমনিতে আছি, এটা তুই জানলি কী করে? আর এলি বা কী করে?”
— “মা… মানে?”
প্রিয়তার ঘাবড়ে যাওয়া দেখে মনে মনে বাঁকা হাসলো প্রণয়। সে দেখতে চায় তার পাখি তাকে কতটা মিথ্যে বলতে পারে আর কতদূর যেতে পারে।
আরেক লোকমা মুখে তুলে দিলো প্রণয়।
— “এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিস কী? ওদিকে কী আমার প্রশ্নের উত্তর লেখা আছে?”
প্রিয়তা বেশ বুঝতে পারছে, প্রণয় ভাই তাকে কথার জালে ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন। কারণ তার কোনো বিষয়ে প্রণয় অজ্ঞাত, এটা হতেই পারে নাহ্। জেনে শুনে জেরা করতে লোকটা।
— “কী হলো, বল?”
— “শুদ্ধ ভাই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন।”
— “শুদ্ধ?”
— “হ্যাঁ। আপনি তো আমায় না বলেই লাপাত্তা হয়ে গেছিলেন, তাই শুদ্ধ ভাই আমাকে বলেন আপনি এখানে। তাই উনাকে নিয়ে আসতে বলেছি।”
— “বেশ।”
— “হ্যাঁ।”
— “আমার একটু পরেই বাড়ি ফিরছি।”
বাড়ির নাম শোনতেই প্রিয়তার মনে পড়ে যায় ওই লোকটার কথা—
— “শত্রু আপনাদের ঘরের লোক, ম্যাডাম। খুব সাবধান। বাড়িতেই বিপদ বেশি।”
লোকটার কথাগুলো মনে পড়তেই মনগহীনে ভয় জেঁকে বসে প্রিয়তার। যদিও বাড়ি যাওয়া প্রয়োজন! নাহলে আসল শত্রুকে কীভাবে চিহ্নিত করবে প্রিয়তা? যদিও ধারণা আছে এই কাজটা কার হতে পারে। সময় এসে গেছে, প্রহেলিকামতো তাকেও নিজের জায়গা দেখিয়ে দেওয়ার।
— “আমি বাড়ি যাবো নাহ্।”
সটান বলে বসে প্রিয়তা।
— “কেনো?”
— “এমনি। বাড়িতে ভালো লাগে নাহ্। আপনার সাথে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে চাই, প্রণয় ভাই!”
বলেই প্রণয়ের বুকে জড়িয়ে ধরে প্রিয়তা। বিড়ালছানার ন্যায় নাক-মুখ ঘষতে থাকে।
মায়া লাগে প্রণয়ের। আলতো হাতে নরম গালটা স্পর্শ করতেই দরজায় খটখট নক্কের আওয়াজ হয়।
— “আসতে পারি।”
দোয়ারে দাঁড়িয়ে আছে শুদ্ধ। এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেলে নজর লুকানোর চেষ্টা করছে।
শুদ্ধকে দেখে ঠিক হয়ে বসে প্রিয়তা।
— “আয়।”
হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে আসলো শুদ্ধ। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে তাড়াহুড়ো করে বলে—
— “এখান থেকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে আমাদের। তারাতারি চল, এখান থেকে।”
শুদ্ধর চোখ-মুখ অস্থির। কপালের পাশ দিয়ে নেমে আসা দুশ্চিন্তার স্বচ্ছ ঘামের বিন্দু তাদের দুজনের কারোরই চোখ এড়ালো নাহ্। প্রিয়তা মুহূর্তের মধ্যেই বুঝে গেলো ব্যাপারটা। লাফিয়ে নেমে এলো বিছানা থেকে। চোখের ইশারায় শোধালো—
— “কী হয়েছে?”
তেমন ইশারায় বুঝিয়ে দিলো শুদ্ধ। আতঙ্কে আবার জমে গেলো প্রিয়তা। খপ করে চেপে ধরলো প্রণয়ের হাত। এতো জোরে চেপে ধরলো যেনো ছেড়ে দিলেই পালিয়ে যাবে।
প্রণয়কে চেপে ধরে দরজার দিকে ছুট লাগাতে গেলেই বাদ সাধলো শুদ্ধ। দ্রুত সামনের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বললো—
— “এদিকে নয়। ওরা এদিকেই আসছে।”
ভয়ে নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে যায় প্রিয়তার। হাতের বাঁধন আরো শক্ত হয়, যেনো এই মুঠোর ভেতর বন্দী তার প্রাণভোমরা। প্রবল ভীতিতে দরদর করে ঘামতে থাকে মেয়েটা। প্রণয় কিছু বলে নাহ্, মিথ্যে উদ্বেগও দেখায় নাহ্। কেবল কাতর দৃষ্টিতে দেখতে থাকে তার ময়নাপাখিটাকে।
ঘরের বাতাস জমে যায়। কেবল তাদের তিনজনের ভারী ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ পরিস্থিতিকে আরো শ্বাসরুদ্ধকর করে তুলেছে।
— “এখন ক…কী ক…করবো, শুদ্ধ ভাই? ওই ম…মাফিয়াটা তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে।”
প্রিয়তার কণ্ঠের কাঁপন স্পষ্ট, শব্দগুলো ভাঙাচোরা।
— “বুঝতে পারছিনা।”
ওদের দুজনের কাঁপাকাপি দেখতে দেখতে একসময় বিরক্ত হয়ে যায় প্রণয়। দুটোই ভীতুর ডিম। সিনা টানটান করে দাঁড়ায় প্রণয়। পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় প্রিয়তার দিকে। তার জীবন-মরণের পরোয়া নেই কোনোকালেই, কিন্তু তার জানের এখানে থাকা মোটেও নিরাপদ নয়। হায়াতের মালিক আল্লাহ, রিজিক থাকলে বাঁচবে। কিন্তু এখন সময় তার প্রাণটাকে নিরাপত্তা দেওয়ার।
— “শুদ্ধ, রিভলবারটা কোথায়?”
গমগমে ভরাট আওয়াজে প্রশ্ন ছুঁড়ে প্রণয়।
— “আমার কাছে!”
— “এদিকে দে।”
শুদ্ধ বাক্যের অপচয় করে নাহ্। প্রণয়ের কথা মতো গানটা প্রণয়ের হাতে তুলে দেয়।
— “ওরা কোথায় এখন?”
— “এলো বলে। আমরা তিনজন বেরোতে গেলেই ওদের মুখোমুখি হবো। সমুদ্র সৈকত কিছু মুহূর্তে পুরো খালি হতে গেছে, বুঝতে পারছিস।”
— “কয়জন?”
— “হবে হয়তো ২০-২৫।”
— “পুলিশ আছে সাথে?”
— “নাহ্।”
— “ঠিক আছে।”
প্রিয়তার আতঙ্কে শুকিয়ে যাওয়া ফ্যাকাশে মুখটার দিকে মায়াভরা নয়নে তাকায় প্রণয়। শুদ্ধর উপস্থিতিকে গোনায় ধরে নাহ্। প্রিয়তার গালে হাত রেখে কপালে দীর্ঘ ভালোবাসার পরশ এঁকে দেয়। কপালে কপাল ঠেকিয়ে অত্যন্ত নরম কণ্ঠে বলে—
— “আমার জানপাখি, আমার তুলতুলে হাঁসের বাচ্চা, আমার বাবুই পাখি, আমার জান— তুমি একটু বাইরে অপেক্ষা করবে আমার জন্য?”
— “মা… মানে?”
প্রিয়তার চোখের পাপড়িগুলো কাঁপে বারকয়েক।
— “মানে আমি আসবো। কথা দিচ্ছি, ফাঁকি দেবো নাহ্ তোমাকে। তুমি শুদ্ধর সাথে বাইরে অপেক্ষা করো আমার। আমি তোমাকে নিয়ে একটু ঝুঁকি নিতে চাই নাহ্।”
প্রণয়ের কথায় আতঙ্কে উঠে প্রিয়তা। বিদ্যুতের বেগে ঝাপটে ধরে প্রণয়কে। ছোট্ট বিড়ালছানার ন্যায় মুখ লুকায়। প্রিয়তমার হৃৎপিণ্ডের ধুকপুক শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে প্রণয়। কথা বলার সময় নেই।
বুকে মুখ গুঁজে তীব্র বিরোধিতা জানায় প্রিয়তা। তেজী কণ্ঠে গর্জে উঠে—
— “আমি আপনাকে ছেড়ে এক সেকেন্ডের জন্যও যাবো নাহ্। আমি থাকবো আপনার সাথে। আমি কোথাও যাচ্ছি না, শুনতে পাচ্ছেন আপনি।”
— “শুদ্ধ।”
— “বল, ভাই।”
— “আমি না আসা পর্যন্ত আমার আমানত তোর কাছে গচ্ছিত রাখলাম। আশা রাখবো, তুই মরে যাবি, কিন্তু আমার ফুলের গায়ে ফুলের আঁচড় লাগতে দিবিনা।”
— “কিন্তু…!”
— “আমি যাবো নাহ্!”
প্রণয়ের বুকে মুখ গুঁজে চিৎকার করে কেঁদে উঠে প্রিয়তা। শরীরের যতটা শক্তি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে একজনকে জড়িয়ে ধরা যায়, তার থেকেও বেশি জোরে জড়িয়ে ধরেছে প্রিয়তা।
প্রণয় কোনো প্রকার তর্কে জড়ায় নাহ্, কথা বাড়ায় নাহ্। প্রিয়তার কানের নিচের রগটা কৌশলে চেপে ধরে কয়েক সেকেন্ডের জন্য। সাথে সাথেই সব চিৎকার, আওয়াজ, সব শব্দ নিরব হয়ে যায়। হাতের বাঁধন ছুটে যায়। নিঃশব্দে চেতনা হারায় প্রিয়তা। নিস্তেজ দেহখানা ঢলে পড়ে তার প্রিয় পুরুষটার বুকে— যাকে হারানোর ভয় আয়োজক।
প্রিয়তাকে শুদ্ধর কোলে তুলে দেয় প্রণয়। হাতের রিভলবারটা শুদ্ধর কপালে চেপে ধরে তির্যক কণ্ঠে শাসিয়ে বলে—
— “যদি সামান্যতম সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিস, গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেবো। কলে পড়েছি, তাই তোর হাতে দিতে বাধ্য হয়েছি। এবার তাড়াতাড়ি যা এখন থেকে।”
শুদ্ধ দাঁত কটকট করে সময়ের ওভাবে জবাব দিতে গিয়েও থেমে যায়।
— “কী মুখ দেখছিস দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে? যেতে বললাম তো, তারাতারি যা।”
শুদ্ধ যেতে চায় নাহ্, কিন্তু প্রিয়তার মুখ চেয়ে তাকে যেতেই হবে। ওরা প্রণয়ের সাথে প্রিয়তাকে দেখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
শুদ্ধ বেরিয়ে যেতে গেলে আবার পিছু ডাকে প্রণয়—
— “দাঁড়া!”
থেমে যায় শুদ্ধ। প্রণয় ছুটে এসে আবার প্রিয়তমার মায়াময় মুখপানে ব্যাকুল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। ললাটে তপ্ত চুম্বন এঁকে বলে—
— “তুমি চোখ খুলেই আমাকে দেখতে পাবে, জান। কথা দিচ্ছি। একদম চিন্তা করো নাহ্।”
— “কোথায় অপেক্ষা করবো?”
— “স্টেশনে অপেক্ষা কর।”
— “সত্যি আসবি?”
— “আসবো।”
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৬
আর কিছু না বলে বেরিয়ে যায় শুদ্ধ। ওরা বেরোতেই দুর্বলতার শেষ অনুভূতিটুকুও গায়েব হয়ে যায় প্রণয়ের। চেনা চোখ-মুখ বদলে যেতে থাকে। অবয়বে ফুটে ওঠে পুরোনো খুনখার হিংস্রতা। কালো মণির বাদামী চোখ দুটোতে প্রেমের নেশার বদলে এখন টাটকা রক্তের নেশা। স্নায়ুগুলো দপদপ করছে।
ডিভানের উপর পায়ের পা তুলে বসে প্রণয়— যেনো কোনো জংলী শিকারি অপেক্ষা করছে তার কাঙ্ক্ষিত শিকারের।
