ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৫
মুশফিকা রহমান মৈথি
অন্ধকার ঘর। স্যাঁতসেঁতে একটা গন্ধ নাকে আসছে। কানে আসছে টপটপ করে ছাঁদ থেকে পানি পড়ার শব্দ। খুব স্মিত কিন্তু তীক্ষ্ণ। ধীরলয়ে চোখ মেললো কাঞ্চন। মাথায় তীক্ষ্ণ ব্যথা প্রবলভাবে হানা দিলো। সেই সাথে গলায় বিঁধলো তীব্র ভয়। একটা নোংরা, স্যাঁতসেঁতে, শ্যাওলা পড়া অন্ধকার ঘরে সে রয়েছে। হাতে পায়ে বাঁধন। ঠিক কোথায় আছে বুঝতে পারছে না। তাকে কি কেউ কিডন্যাপ করেছে? কিন্তু কেন? কি চাই তাদের?
ঘরে বর্তমানে আলো নেই। বাহির থেকে আলো না আসায় আরো ঘুটঘুটে অন্ধকার লাগছে। ঘরে কোনো জানালা নেই হয়তো। প্রথমে ভয় লাগলেও, কিছুসময় পর অন্ধকারটা সয়ে গেছে। কাঞ্চন নিজেকে শান্ত করার জন্য বড় বড় নিঃশ্বাস ফেললো। মস্তিষ্ক উথাল-পাতাল হয়ে আছে। ভয়ে হাত পা ঘামছে। কোনো বুদ্ধি আসছে না। তার ফোন বা ব্যাগ কিছুই কাছে নেই। ফোনটা কি রাস্তায় পড়ে গেছে? ব্যাগটা? মাথায় বাড়ি খাবার পর সে জ্ঞান হারিয়েছিলো। তারপর কিছুই মনে নেই।
কাঞ্চন নিজেকে শান্ত করলো। এখান থেকে তাকে পালাতে হবে। বাসার কেউ কি তার খোঁজ করেছে? প্রীতির বিয়ে নিয়ে সবাই বেশ ব্যস্ত। ফলে এতো বড় বাড়িতে কাঞ্চন নেই, সেটা কারোর নজরে পরার কথা না। পৃথুলা কি মোবাইলটা চেক করেছিলো? কাজিন মহল কি একটিবারোও তার খোঁজ করেছে? বড় ফুপু প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই তার খোঁজ নেন। মাথায় তেল দেবার জন্য ডাকেন। তিনিও কি বুঝতে পারেন নি কাঞ্চন ঘরে ফিরে নি। বুঝতে পারলে ঠিক পটনভী মঞ্জিল এখন মাথায় উঠবে। কিন্তু তারা কি আদৌ জানতে পারবে কাঞ্চন কোথায়?
কাঞ্চন একটা সাধারণ মেয়ে, তার গন্ডি কেবল বাসা এবং ভার্সিটি। তাকে কিডন্যাপ করে কি লাভ? পটনভী পরিবার অনেক ধনাঢ্য না হলেও তাদের ব্যবসা অনেক। তাদের উপর মহল থেকে শুরু করে নিচমহল পর্যন্ত পরিচিতি। কেউ কি পটনভী পরিবারের উপর শোধ তুলতে বা টাকার জন্য তাকে কিডন্যাপ করেছে? করতেও পারে। কিডন্যাপাররা কি টাকা চেয়েছে? কত টাকা চেয়েছে? চাচারা কখনো রাজী হবে না। বড়চাচা উলটো বলে বসতে পারেন,
“ওকে তিনদিনের জন্য রেখে দাও। আপদ বিদেয় হয়েছে এটাই শান্তি।“
অসম্ভব কিছু না। দীর্ঘশ্বাস ফেললো কাঞ্চন। পায়ের জুতোটা খুলে নি। জুতোর সোলের ভেতরে একটা চিকন ব্লেড আছে। কাঞ্চন নিজের সুরক্ষার জন্য রাখে এটা। ব্লেডটা বের করা গেলে দড়ি খোলা যেত। কিন্তু হাত পেছন করে বাঁধা। ব্লেডটা বের করা সহজ হবে না। না দেখে ব্লেডটা বের করতে গেলে হাত কেটে যেতে পারে। তবুও রিস্ক তো নিতেই হবে। কাঞ্চন খুব সাবধান বা পায়ের জুতার ফিতে খুললো। পা বাঁধা থাকায় এবং কেডস জুতো হওয়ায় তা খুলতে খুব বেগ পেতে হলো। জুতোটা খোলার পর সে পেছনে ঘুরে সেটা হাতে নিলো। সোলটার কাটা অংশটা খুব ছোট। তাই ব্লেডটা বের করতে গেলে জুতোর সোলটা ছিঁড়ে ফেলতে হবে। কাঞ্চন অনেকটা সময় চেষ্টা করলো। হাত ব্যথায় টনটন করছে। দরদর করে ঘামছে সে। চুলগুলো খুলে থাকায় সব এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। অবশেষে জুতোর সোলটা খুলে ফেলতে সক্ষম হলো সে। চকচকে ব্লেডটা মেঝেতে পড়তেই শব্দ হল। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না। চোখ সয়ে গেলেও ব্লেডটা দেখতে পেলো না সে। ফলে হাতড়াতে থাকলো। একটা সময় ধারালো তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা অনুভব হতেই বুঝলো ব্লেডে হাত কেটেছে। কিন্তু যন্ত্রণার চেয়ে যেন আনন্দ বেশি হল।
কাঞ্চন সময় নিলো। আস্তে আস্তে হাতের দড়িটা কাটতে সক্ষম হলো। তখনই ঘরের দরজা খোলার শব্দ কানে আসছে। কেউ আসছে বুঝতে পেরে দ্রুত পায়ের দড়িটা খুলে একটা কোনায় লুকিয়ে পড়লো সে।
ঘরে প্রবেশ করলো একটা লোক। সে ঘরে প্রবেশ করেই সুইচ বোর্ড চিপে একটা সোডিয়াম বাল্ব জ্বালালো। ঘর আলোকিত হলো মুহূর্তেই। নোংরা ঘরটা উজ্জ্বল হয়ে গেলো। ইঁদুর ছুঁটে পালালো এক কোনা থেকে। কাঞ্চন দাঁড়িয়ে ছিলো দরজার পেছনে। হাত দিয়ে মুখ চেপে রইল সে। এক কোনায় কিছু জং ধরা রড দেখতে পেলো সে। লোকটা যখনই তাকে না পেয়ে ভেতরে খুঁজতে ঢুকলো সে দ্রুত রডটা হাতে দিয়ে তার মাথায় মেরে বসলো। লোকটা মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করলেই কাঞ্চন এক পায়ে জুতো ছাড়াই ছুটলো। লোকটা বেহুশ হয় নি, সে চিৎকার করে তার সঙ্গীদের জানালো,
“এই পালাচ্ছে, শাউয়ো বেডি পালাচ্ছে।“
কাঞ্চন পাগলের মতো ছুটতে লাগলো। ঘর থেকে বের হতেই অনুভব করলো এটা একটা আন্ডার কন্সট্র্যাকশনে থাকা একটি বহুতল বিল্ডিং। সিড়িতে রেলিং নেই। ফলে লুকানোর স্থান নেই। লোকটা বেড়িয়ে এলো পেছন পেছন। তার চিৎকারে সবাই সতর্ক হয়ে গেলো। আরোও কিছু লোক উঠে এলো। কাঞ্চন তাদের চোখ এড়িয়ে পালাতে চেষ্টা করলো বটে। সিড়ির নিচে লুকিয়ে থাকলো যেন তারা তাকে খুঁজে না পায়। যখন পায়ের আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে এলো তখন ছুটে মেইন গেটের দিকে ছুটতে গেলো কাঞ্চন ঠিক তখনই কেউ তার চুলের মুঠি ধরে টান দিলো। ব্যাথায় কুঁকিয়ে উঠলো সে। দেখতে পেলো বিশাল দেহী একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে। লোকটির পরণে কোন জামা নেই, আছে একটা নোংরা গেঞ্জি। পান খেয়ে দাঁত কালো হয়ে গেছে। একটা বিশ্রী গন্ধ আসছে নাকে। লোকটি প্রকান্ড একটা থাপ্পড় বসালো কাঞ্চনের নরম গালে। ঝনঝনিয়ে উঠলো কান। মাথাটা নিস্তেজ হয়ে গেলো। দাঁতে ঠোঁট লেগে কেঁটে রক্ত গড়াতে লাগলো। এতো নিষ্ঠুর থাপ্পড় কখনো খায় নি কাঞ্চন। লোকটির চোখে মায়া নেই। বরং কাঞ্চনের ভয়ে গা শিউরে উঠলো। লোকটি তার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে নিজের কাছে এনে ক্ষীণ স্বরে বললো,
“কই পালাচ্ছিস মা**, আমগোর কাম এখনো শেষ হয় নাই। কাম শেষ হইলে তোরে চিরতরে মুক্তি দিয়ে দিব। ওই গুন্ডাডারেও বুঝাইতে হইবে এক জায়গায় দুডা গুন্ডা থাকতে পারে না।“
কাঞ্চন কাঁপা স্বরে বলল,
“আমাকে যেতে দিন। আমি আপনাদের কোনো ক্ষতি করি নি।“
“তুই করস নাই, তোর স্বামী করছে। স্বামীর দোষের ভাগ ইস্ত্রীরে নিতি হয়। তুই হেডাই নিতেসোস।“
কাঞ্চনের বুঝতে বাকি রইলো না তাকে কেন অপহরণ করা হয়েছে। মাথা ছিড়ে যাচ্ছে চুলের ব্যথায়। চোখে পানি চলে এসেছে তার। ভয়ে বুক কাঁপছে। তার মুক্তি হবে তো?
পৃথুলা ক্রমাগত ফোন করছে কাঞ্চনকে, কিন্তু তার ফোন বন্ধ। মেয়েটি তাকে অনেকবার ফোন করেছে। সন্ধ্যা এখন রাতে পরিণত হয়েছে। ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে আটটা বাজে। কাঞ্চন এখনো ফিরে নি। আয়েশা খালা একবার তাকে জিজ্ঞেস করে গেছে,
“কাঞ্চন ফিরেছে? ওকে আমার ঘরে পাঠাইস তো।“
কাঞ্চনের এতো দেরি হয় না। ভার্সিটি দূর হলেও সাতটার মধ্যেই সে ঘরে ফিরে। অথচ এখনো ফিরে নি। রিদম এবং তাশদীদ কম্পিউটারে ফিফা খেলছিলো। পৃথুলা নক না করেই তাদের ঘরে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলো। রিদম উদোম গায়ে বসে ছিলো। পৃথুলা আসতেই খ্যাঁক করে উঠলো,
“এই শাকচুন্নী, পুরুষদের ঘরে নক করে ঢুকতে হয় জানোস না? যদি ন্যাংটা থাকতাম, শেম শেম হয়ে যেত! বিয়ের আগে আমি আমার সুন্দর দেহ কোনো পরনারীকে দেখাতে রাজী নই।“
তাশদীদ কিবোর্ড চিপতে চিপতে বলল,
“আসছে আমার লজ্জাবতী ন্যাটা, শালা তোরে ন্যাংটা দেখে নাই এই মঞ্জিলে কেউ নাই। ওই লাবুর মাও তোকে ন্যাংটা দেখছে।“
“ধ্যাত, চুপ কর তো। আমি মরতেছি আমার জ্বালায়।“
পৃথুলা ক্ষেপে গেলো। রিদম চাপা স্বরে বললো,
“তুই মরলে পৃথিবী আপদমুক্ত হবে।“
“লাথি খাবি রিদম, চোপায় তালা লাগা।“
“আমার চোপা চুমুতে বন্ধ হয়। দে চুমু।“
তাশদীদ পাশ থেকে বললো,
“আমি দিব নাকি?”
“ছিঃ আমি রংধনু না। আমার আমদানীর মা শুনলে কত কষ্ট পাবে জানিস।“
তারপর সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
“আমদানীর মা, তুমি কষ্ট পেও না। আমি একেবারে পিওর এবং ভার্জিন। যদিও পৃথুলা শাকচুন্নী আমার প্রথম চুমুটা জোর করে নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস করো আমদানীর মা, আমি বাকি একদম ভার্জিন।“
“আমদানীর মায়ে কি উপরে চলে গেছে।“
“চুপ কর হারামজাদা।“
পৃথুলা এবার অধৈর্য্য হয়ে চিৎকার করে উঠল,
“চুপ করবি তোরা। কাঞ্চন এখনো বাড়ি ফিরে নি। ওর ফোন অফ।“
এবার একটু নড়ে চড়ে উঠলো তাশদীদ এবং রিদম। ইতোমধ্যে তাকবীর এবং ইকরাম এলো ঘরে। তাদের চোখমুখ কেমন ভোঁতা হয়ে আছে। এসেই পৃথুলাকে শুধালো,
“কাঞ্চন কই?”
“ও বাড়ি ফিরে নি। কেন?”
“নিচে যাও। স্নিগ্ধ ভাই তোমাকে ডাকে। আর অঞ্জনা আপু কই? ওকেও নিয়ে যাও।“
বসার ঘরে একটা ছোটখাটো মিটিং ডাকলো স্নিগ্ধ। ঘরে এসেই সে নিজের রুমে কাঞ্চনকে পেলো না। মাকে জিজ্ঞেস করলো। মাও কাঞ্চনকে খুঁজছেন। মামীদের শুধালে তারাও কোনো খোঁজ দিতে পারলেন না। পৃথুলা একপ্রকার দৌড়ে নিচে নামলো। তাকবীর, ইকরাম, তাশদীদ এবং রিদমও এলো পিছু পিছু। স্নিগ্ধ খুব শান্ত স্বরে শুধালো,
“কাঞ্চন কোথায়?”
“জানি না ভাইয়া, ওর ফোন বন্ধ। ও আমাকে সাড়ে ছয়টার দিকে ফোন করেছিলো। কিন্তু আমি ফোন ধরতে পারি নি। এর পর থেকেই ওর ফোন বন্ধ। ও মঞ্জিলের কোথাও নেই। ও এখনো ফিরে নি।“
কথাটা বসার ঘরে আলোড়ন তৈরি করলো। আয়েশা পটনভী পুত্রবধূর এখনো না ফেরায় অস্থির হয়ে উঠলেন। স্নিগ্ধ দ্রুত তার মোবাইল বের করলো। কাঞ্চনের ব্যাগের জিপিএসটা এখনো অন। সে তার মায়ের উদ্দেশ্যে বললো,
“মা, তুমি শান্ত হও। আমি দেখছি।“
বলেই কাউকে ফোন করলো সে। একটু পর গাড়ি চলে এলো। ব্যারাকের জন্য বেরিয়ে পড়লো স্নিগ্ধ।
একটা চেয়ারে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে কাঞ্চনকে। হাত, মাথা, গাল ব্যথায় টনটন করছে। সামনে অচেনা মুখ। হিংস্র তাদের চাহনী। কুৎসিত সেই চাহনীতে গা শিরশির করছে কাঞ্চনের। গলা শুকিয়ে এসেছে। মদের আড্ডা বসেছে। একজন তার সামনে এসে বললো,
“নে কথা ক।“
“কি কথা?”
“বাঁচাও বাঁচাও।“
কাঞ্চন তর্ক না করেই বলল,
“বাঁচাও, বাঁচাও।“
“হয় নাই, আরোও হুন্দর করে। যেন মনে হয় তুই কষ্টে আসোস। বাংলা সিনেমা দেখোস নাই?”
কাঞ্চন গলা কাঁপিয়ে বলল,
“বাঁচাও, বাঁচাও”
লোকটি প্রসন্ন হলো। সে হাসি মুখে বললো,
“হইছে।“
এরা একটি ড্রাগ গ্যাং। কিছুদিন পূর্বে খিলগাঁও থেকে এদের সঙ্গীদের র্যাব ধরে দিয়ে যায়। এই গ্যাং এর নাম “দিলওয়ালা গ্রুপ”। এদের নাম হাস্যকর হলেও কাজ মোটেই হাস্যকর নয়। খুন করতে এদের হাত কাঁপে না। পেপারে কাঞ্চন পড়েছিলো এরা নাকি একবার মসজিদে ঢুকে গুলি করেছিলো তাদের শত্রুকে। কাঞ্চন কাঁপা স্বরে বললেন,
“আপনারা কি আমাকে মেরে ফেলবেন?”
“হ।“
“অহেতুক একটা মানুষকে মারবেন?”
“না, তুই মরলে ওই গুন্ডাডা শাস্তি পাইবো।“
“ভুল ধারনা। ও কখনোই আপনাদের সাথে নেগোসিয়েশন করবে না। মিলিয়ে নিবেন।“
কথাটা বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল কাঞ্চন। তার ভয় করছে। কোনো আশার আলো সে দেখতে পারছে না। সে কি মারা যাবে? কিভাবে মারবে এরা তাকে। মস্তিষ্কে কিছু জঘন্য চিত্র ভাসছে।
ব্যাটেলিয়ন হেডকোয়ার্টার
স্নিগ্ধ দাঁড়িয়ে আছে তার ব্যাটেলিয়ন অধিনায়কের সামনে। কোম্পানি থেকে হেডকোয়ার্টারে রিপোর্ট করা হয়েছে। এই মুহূর্ত থেকে কাঞ্চন মিসিং কেস সরাসরি হেডকোয়ার্টার থেকে পরিচালিত হবে এবং তত্ত্বাবধানে লেফটেন্যান্ট কর্ণেল ফারুক ওয়াসিফ। স্নিগ্ধ তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
এতোটা সময় পুরো কেসটা ম্যানুয়াল প্রটোকলে চলছিলো। কাঞ্চনের মোবাইল বন্ধ। ঠিক যে সময়ে ফোনটি বন্ধ হয়েছে তার পূর্বে সে পৃথুলা এবং কাজিনদের গ্রুপে কল করেছিলো। ঠিক তারপর থেকেই তার ফোন বন্ধ। শেষ সময়ের লোকেশন খিঁলগাওয়ের থেকে একশ মিটারের এরিয়াতে দেখাচ্ছিলো। কাঞ্চন তার ব্যাগের জিপিএস ট্র্যাকারটা ফেলে নি। ফলে সেই লোকেশন ট্র্যাক করা হয়েছে। অপহরণকারীদের থেকে তখনো কোনো নেগোসিয়েশন কল আসে নি। ফলে বিষয়টার গুরুত্ব ছিলো কম। স্নিগ্ধ নিজের মতো করেই তাকে খোঁজার চেষ্টা করছিলো।
ব্যাগের জিপিএস এবং মোবাইলের লাস্ট লোকেশন যেখানে বলছে সেখানে কাঞ্চনকে খুঁজে পাওয়া যায় নি। আশপাশের এরিয়াতে আন্ডারগ্রাউন্ড সোর্স লাগানো হয়েছে৷ ব্যাটেলিয়নের আন্ডারে এরিয়াটা পড়ায় পুরো এরিয়ার সিসিটিভি চেক করা হচ্ছে। কাঞ্চনের মোবাইলটা ঠিক যে সময়ে বন্ধ হয়েছে ঠিক সেই সময়ে ওই টাওয়ারের আশেপাশে কোন কোন মোবাইল নাম্বার চালু ছিলো সেটাও বের করা হয়েছে। বেশ কয়েকটা সন্দেহভাজন নাম্বার পাওয়া গেছে।
এর মধ্যেই একটা মেইল এলো ব্যারাকে। মেইলটি এমন ছিলো,
“আমাদের কাছে আপনাদের একটা মূল্যবান জিনিস আছে। আপনাদের কাছেও আমাদের মূল্যবান জিনিস আছে। এক্সচেঞ্জ করলেই মঙ্গল। নয়তো আগামীকাল কোনো নালায় বস্তারুপে পাবেন।”
তারপর কাঞ্চনের কণ্ঠ,
“বাঁচাও, বাঁচাও।“
সাথে সাথে মেইলের আইপি এড্রেস এবং লোকেশন ট্র্যাকিং শুরু হলো। কিন্তু ভিপিএন ব্যবহারের জন্য সেটা ট্রাডিশনাল পদ্ধতিতে ট্র্যাক করা যাচ্ছে না৷ কোম্পানি কোমান্ডার নিশ্চিত হন এটা অপহরণ কেস। তখন ই সরাসরি হেডকোয়ার্টারে রিপোর্ট করা হয়।
ফলে পুরো কেসটার মোড় ঘুরে যায়। ফারুক সাহেব গম্ভীর স্বরে আদেশ করলেন,
“আমাদের সাইবার ক্রাইম ইউনিট লোকেশন ট্রেস করার চেষ্টা করছে। পিন লোকেশন ট্রেস হলেই আমরা স্ট্রাইকে যাব। তুমি স্ট্রাইকিং টিমে থাকবে না। এই মিশনটা সাইফুর পরিচালনা করবে।”
“সরি স্যার, স্ট্রাইকটা আমি পরিচালনা করবো।”
খুব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললো স্নিগ্ধ। অধিনায়ক নড়েচড়ে উঠলেন। তার ভ্রু কুঞ্চিত হলো। প্রৌঢ় কপালে তীব্র ভাঁজ পড়লো। পটনভী মঞ্জিলের সবথেকে আভিজাত্যপূর্ণ পুরুষটির কাজের জায়গায় একটা নিকনেম আছে৷ তা হলো “গুন্ডা”। কোনো রুলসের ভেতর সে কাজ করে না। তার একটাই লক্ষ্য “মিশন কমপ্লিট”। ব্যাটেলিয়নে সরফরাজ পটনভীর মতো দক্ষ, কুশলী অফিসার খুব কম আছে। জিরো ক্যাজুয়ালটির বিষয়টা সে খুব সূক্ষ্ণভাবে পরিচালনা করে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ছেলেটার পদ্ধতি। তার চাকরিকালীন সময়ের তুলনায় তার এনকাউন্টারের সংখ্যা বেশি। ক্রিমিনালদের প্রতি কোনো দয়া মায়া নেই তার। সমস্যাটা এখানেই। যদিও তাকে এখন খুব নির্লিপ্ত, নির্বাধ দেখাচ্ছে কিন্তু এখানে তার স্ত্রী মিসিং। দূর্বৃত্ত কারা, কি চায় এখনো তা স্পষ্ট না। তবে তারা কি করতে পারে সেটার ধারণা আছে। সুতরাং একটা ভুল ব্যাটেলিয়নের জন্য কলঙ্ক প্রমাণিত হতে পারে। সেকারণেই প্রটোকলের বিরোধিতা তিনি করবেন না। দিয়ে আদেশের সুরে বললেন,
“প্রটোকল অনুযায়ী আমি তোমাকে কোনোভাবেই এই মিশনে রাখতে পারি না। তুমি যদি ইমোশনাল হয়ে যাও তাহলে শুধু তোমার ওয়াইফের ক্ষতি হবে বিষয়টা কিন্তু তা নয়, আমাদের উপর ব্লেম আসবে। আমি সেটা করতে পারি না। আমার অফিসারদের বিপদে ফেলতে পারবো না আমি। তোমাকে আমি আউট কর্ডনে অথবা ট্যাকটিক্যাল এডভাইসর হিসেবেই মোতায়েন করতে পারি। তবে এর থেকে বেশি আমি করতে পারবো না।”
স্নিগ্ধ খুব শান্ত গলায় উত্তর দিলো,
“সরি স্যার, আই কান্ট ট্রাস্ট ইউ। এখানে আমার ওয়াইফের লাইফ জড়িত।“
“তুমি প্রটোকল ভাঙ্গলে আমি তোমার বিরুদ্ধে একশন নিব।“
স্নিগ্ধ এবার শীতল, তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকালো। হীম গলায় বললো,
“স্যার, ক্যান ইউ এনশিওর মি আমার ওয়াইফের কিছু হবে না?”
থতমত খেলেন ফারুক ওয়াসিফ। কিঞ্চিত বিরক্ত গলায় বললেন,
“ইউ আর নট দ্যা বেস্ট।“
“বাট ফর দিস মিশন আই এম দ্যা বেস্ট।“
“কি গ্যারান্টি তুমি কোনো পাগলামি করবে না?”
“আমার ওয়াইফ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত আমি কোনো পাগলামি করবো না।“
“এজন্য আমি তোমাকে পাঠাতে চাচ্ছি না। আমাদের ওদের জ্যন্ত ধরা প্রয়োজন। পুরো র্যাকেটটাকে না ধরতে পারলে আমাদের বদনাম হবে। আমি প্রতিটাকে জ্যান্ত চাই সরফরাজ।“
স্নিগ্ধর মধ্যে কোনো ভাবের পরিবর্তন দেখা গেলো না। সে নির্লিপ্ত, বিকারহীন। তার দৃষ্টি এখনো প্রখর। ফারুক ওয়াসিফ বিরক্ত হলেন। এই ছেলেটাকে তার পছন্দ আবার অতি অপছন্দ। পছন্দের কারণ তার নিষ্ঠা, দক্ষতা, নিপুণতা, সাহস আর অপছন্দের কারণ গোয়ারামি, অহংকার, ইগো। ফারুক ওয়াসিফ হার মানলেন যেন। প্রটোকলের বিরুদ্ধে কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। নাকের চামড়া টেনে বললেন,
“আমাকে লিখিত দিতে হবে ইউ উইল নট শ্যুট।“
“ইফ দে এট্যাক?”
“হ্যা?”
“তারা এট্যাক করলে শ্যুট করার অধিকার কি আছে?”
“তুমি না। ফায়ারিং করলেও যেন তোমার বন্দুকের গুলিতে কেউ না মারা যায়।“
স্নিগ্ধ কিছুসময় নির্বাক রইলো। তারপর সটান হয়ে বললো,
“ওকে স্যার।“
“আমি তোমার বন্দুকের গুলি যেন কোনো লাশে না দেখি।“
“বাট স্যার ফায়ারিংয়ের মধ্যে আমি যদি পায়ে গুলি করি পরে যদি অন্য অফিসার তাকে বুকে গুলি করে তবেও কি সেটা আমার গুলি কাউন্ট হবে?”
ফারুক ওয়াসিফ এবার অধৈর্য্য হয়ে উঠলেন। বিরক্তি নিয়ে বললেন,
“যদি না তোমার গায়ে আক্রমন হয় ইউ কান্ট শ্যুট।“
“ওকে স্যার।“
স্নিগ্ধ স্যালুট করে বেরিয়ে গেলো। সাইবার ক্রাইম ইউনিট এখনো নির্দিষ্ট লোকেশনের খোঁজ করছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় মেইল চলে এসেছে,
“হারুন আর কালাম আর আমাদের দেড় কোটি টাকার মাল ছাড়লে আমরা গুন্ডার স্ত্রীরে ছাড়ব।“
সিগ্ধের বুঝতে বাকি নেই এই দলটা কে। সে হিনহিনে গলায় বললো,
“ওদের একটা মেইল পাঠান। আমার ওয়াইফের এক চুল পরিমান ক্ষতি হলে প্রতিটার ছবি কালকে পত্রিকায় থাকবে।“
সাইবার ক্রাইম ইউনিট আদেশ মান্য করলো। তারা অপেক্ষায় আছে একটা ভুলের। একটা ভুল আর তাদের লোকেশন সাইবার ক্রাইম ইউনিট বের করে ফেলবে। সাইবার ইউনিট তাদের মেইল এড্রেসে একটি স্প্যাম মেইল করলো। শুধু একবার মেইলটা অপেন করলেই তাদের কম্পিউটার তাদের আন্ডারে চলে আসবে।
কয়টা বাজে, কাঞ্চন জানে না। তার ক্ষুধা লেগেছে। ভয় করছে কিন্তু সেই ভয়টা মস্তিষ্ককে বশ করতে দিতে চাইছে না। হুমায়ুন আহমেদের বইতে একটা অদ্ভুত জিনিস পড়েছিলো। হুট করে সেটা মনে পড়লো। সে জিভ বের করে রাখলো। দিলওয়ালা গ্রুপের প্রধান ভোটকা হাসান তার দিকে চোখ কুঞ্চিত করে তাকালো। কৌতুহলে শুধালো,
“এই ছেড়ি কি করিস তুই?”
“মশা জিভের রক্ত খায় কি না টেস্ট করি।“
“তুই কি পাগল?”
“না তারছেঁড়া।”
“থাবড়া খাবি আরেকটা?”
“না থাপ্পড় মেরেন না। ব্যথা করে। তবে আপনারা একটা ভুল কাজ করেছেন। মানুষ মাত্রই তো ভুল। তাই আপনাদের আমি ক্ষমা করলাম।“
“কি কস তুই?
“আপনাদের সঙ্গীরা কখনো ছাড়া পাবে না। আমি এজ এ বেইট খুব জঘন্য। তবে ভাইজান ধরে যখন রেখেছেন আসেন গল্প করি”
“তুই আসলেই পাগল।“
“আপনারা অনেক ভালো। কিডন্যাপ করার পরও আমার গায়ে হাত দেন নি, ধন্যবাদ।“
হাসান একটু নড়ে চড়ে উঠলো। অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,
“আমরা ইজ্জত নেই না। শখ থাকলে বেশ্যার কাছে যাই।“
“তাহলে খুন করেন কেন?”
“খুন করি কামে। গাদ্দারি করলেই খুন করি।“
“প্রথম কবে খুন করেছিলেন?”
“তের বছর বয়সে।“
“স্ত্রী সন্তান আছে?”
কাঞ্চনের কথা শেষ হলো না তার আগেই আরেকটা চড় পড়লো তার গালে। মাথা ঝনঝন করে উঠলো। হাসানের চ্যালা তাকে মেরেছে। এই লোকটাই প্রথমে তাকে মেরেছিলো। নাম লটকন। খেঁকিয়ে উঠে বললো,
“চুপ কর মা**”
কাঞ্চন ভয়ে চুপ করে গেলো। ঠিক তখন ই একটা স্মোক বোমা এসে পড়লো জানালা দিয়ে। হঠাৎ ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে গেলো। চোখ মুখ জ্বলে যাচ্ছে। দিলওয়ালা গ্রুপ আন্দাজ করলো। হাসান নাক চেপে আদেশ করলো,
“এই তোরা অস্ত্র বাইর কর। ওরা চলে আইছে।“
কিন্তু তার আগেই একটা ছোট গুলি বিনা শব্দে তার কানে এসে লাগল। ধরাম করে দরজা খুললো। তীব্র গুলি বর্ষণ শুরু হলো। কালো ট্যাকটিকাল কমব্যাট পোশাক পরিহিত একদল র্যাব ঢুকে পড়লো ঘরে। ওপাশ থেকেও গুলি বর্ষণ হলো। ধোঁয়ার আস্তরণের মধ্যে একজোড়া কালো গ্লবজ পড়া হাত খুলে দিলো কাঞ্চনের বাঁধন। গুলির শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছে। এতো তীব্র শব্দ। মাত্র সাত মিনিটে ধরাশায়ী হলো দিলওয়ালা গ্রুপ। ধোঁয়া কমে যেতেই কাঞ্চন দেখলো একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখ। স্নিগ্ধ ভাই!
স্নিগ্ধ নামক মানুষটা সত্যি এসেছে? কালো বুলেটপ্রুফ হেলমেট, কালো ট্যাকটিক্যাল কমব্যাট ড্রেস, ট্যাকটিক্যাল বেল্ট, বুলেটপ্রুফ ভেস্ট, স্মোক মাস্ক, চশমার ভেতর শুধু এই তীক্ষ্ণ চোখজোড়া তার পরিচিত। মানুষটা তাকে গাঢ় স্বরে শুধালো,
“আর ইউ ওকে?”
কথাটা বলতে বলতেই সে তার চুল সরালো। তিরতির করে কাঁপছে গা। চোখে মুখে আতংকের ছাপ। এতোটা সময় ভয় করলেও এখন যেনো সেই ভয়গুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। উষ্ণ ছোঁয়ায় জমাট বাঁধা ভয়গুলো চোখে জলের রুপ নিয়েছে। স্নিগ্ধের কালো গ্লবস পড়া হাতটা খুব সাবধানে গালে রাখলো। খোলা চুলের আড়ালে গালের লাল দাগ, ঠোঁটের কাটা অংশ এবং জমাট বাঁধা রক্তটা ঢাকা পরে ছিলো। চুল সরাতেই তা উন্মুক্ত হলো। প্রায় সাথে সাথেই স্নিগ্ধর চোখ কঠিন হয়ে গেলো। ভারী স্বরে শুধালো,
“কে?”
“হ্যা?”
“কে করেছে?”
স্নিগ্ধ ঠোঁটের উপর হাত রাখলো। ফলে কাঞ্চন আঙ্গুল দিয়ে লটকনকে দেখালো। স্নিগ্ধ মিনিটের মধ্যে তার ওয়েস্ট হোলস্টার থেকে রিভালভারটা বের করে তিনটা শ্যুট করলো। একটা পায়ে, একটা মাথায়, একটা বুকে। লটকন জায়গায় লুটিয়ে পড়লো। রক্তে মেঝে ভেসে গেলো। খুলি উড়ে যাওয়ায় কিছুটা মগজ ছিটকে বেরিয়ে গেল। কাঞ্চন হাত দিয়ে মুখ চেপে রইল। এই প্রথম সে কাউকে খুন হতে দেখেছে। তার চেহারা কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে। অথচ বাকিরা নির্বিকার। কোম্পানি কোমান্ডার চেঁচিয়ে উঠলেন,
“ইউ কান্ট শ্যুট সরফরাজ।“
“সরি স্যার, আই হ্যাভ টু। অন্যের জিনিসকে কি করে যত্ন নিতে হয় এরা জানে না। অন্তত সরফরাজ পটনভীর জিনিসে হাত দিলে কি শাস্তি হয় তাদের জানা উচিত।“
“আমরা সিওকে কি জবাব দিব?“
স্নিগ্ধ কোম্পানি কমান্ডারের উদ্দেশ্যে খুব ঠান্ডা গলায় বললো,
“স্যার শ্যুট মি।“
কোম্পানি কোমান্ডার যেন বুঝলেন ইশারা। এক মুহূর্ত না ভেবে পেট বরাবর স্নিগ্ধকে লটকনের বন্দুক দিয়েই শ্যুট করলো। গুলিটা ঠিক তার পেট ছুঁয়ে বের হলো। কাঞ্চন মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলো। দিলওয়ালা গ্রুপের প্রতিটা সদস্য ভীত। তারা যেন মৃত্যুভয়ে কাঁপছে। সামনে যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের মধ্যে সামান্য মায়াদয়াও নেই। কোমান্ডার হতাশ স্বরে বললেন,
“ইউ আর হোপলেস সরফরাজ।“
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৪
স্নিগ্ধ আর কাঞ্চনকে ওই মুহূর্তে হাসপাতালে পাঠানো হলো। ব্যাটেলিয়ন অধিনায়কের কাছে রিপোর্ট গেলো,
“দূর্বৃত্তরা হামলা করায় আমাদের পালটা হামলা করতে হয়েছে। আমাদের কোম্পানি সেকেন্ড ইন কমান্ড সরফরাজ পটনভী গুরুতর আহত হয়েছেন। আত্মরক্ষার জন্য দূর্বৃত্তকে গুলি করতে বাধ্য হয় সে। ফলে একজন মারা গেছে। বাকিরা ইন্টেক আছে।“
