ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৩
মুশফিকা রহমান মৈথি
বড় ফুপুর ঘর থেকে তীব্র চিৎকার শোনা যাচ্ছে,
“কে কোথায় আছো! চোর! চোর! স্নিগ্ধ আব্বা তুই কই?”
স্নিগ্ধর চোখ সরু হলো। জুলফিকার পটনভী ততসময়ে উঠে পড়েছেন। চিরকালের নিয়ম ফজরের সময় উঠে যাওয়া। এখন আর এলার্ম ক্লোক লাগে না। শরীরটা একটা ঘড়ির মতো হয়ে গেছে। ওযু করে সাদা পাঞ্জাবি পরিধান করে প্রৌঢ় ঘর থেকে বের হতেই দেখলেন সবাই হুড়মুড়িয়ে উপরে আসছে। এদিকে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে কানের মেশিনটা খুঁজে পাচ্ছেন না। তাই কানে শব্দ আসছেন না। দৃশ্যটা মিউট সিনের মত হয়ে গেছে। কোন পাজি যে তার কানের মেশিন লুকিয়েছে কে জানে।
সবাই আয়েশা পটনভীর ঘরে হুড়মুড় খেলো। ঘরে ঢুকতেই সবার চোখে আতঙ্ক নেমে এলো। চোর একটা না, দুটো। একটা আয়েশা পটনভীর গলায় ছুরি ধরে আছে, আরেকটা তার আলমারী থেকে গয়না ব্যাগে পুরছে। অনবদ্য সাহস চোরের৷ সামনে এতোগুলো লোক অথচ সেই লোকের সামনেই আলমারী থেকে সব সোনার, রুপার গয়নাগুলো ব্যাগে ঢুকাচ্ছে। অবশ্য আয়েশা বেগমের গলায় ছুরি ধরা দেখে কারোর সাহস হলো না এক পা আগানোর। কাঞ্চনের মুখটা ভয়ে, আতঙ্কে সাদা হয়ে গেছে। আয়েশা পটনভী সম্পর্কে তার বড় ফুপু এবং শ্বাশুড়ি কিন্তু এই মহিলাটির প্রতি টান নাড়ির টানের মতো জোরালো। তাই তার গলায় ছুরির এই দৃশ্য তার কলিজায় খামচি বসালো। ইচ্ছে করলো একটা ফুলদানি নিয়ে শয়তানটার মাথা ফাটিয়ে দিতে। কিন্তু সে কিছুই করতে পারছে না।
আয়েশা বেগমকে যদিও খুব উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে না। তার গলায় ছুরি অথচ তিনি বসে আছেন আয়েশ করে। একটু পর পর বলছেন,
“গলায় কুতকুতি হচ্ছে!”
বড়চাচা যতই হম্বিতম্বি করুন না কেন তার মত ভীতু মানুষ পটনভী মঞ্জিলে দ্বিতীয়টা নেই। ফরহাদ চাচা মাথা ফাটানোর পর থেকে ভয় দ্বিগুণ এবং যখন তখন পেট কামড়ানোর ব্যামো হয়েছে। এই যে নিজের বড় বোনের গলায় ছুরি দেখে তার কপাল ঘেমে একাকার। আবার রাগও হচ্ছে। দারোয়ানটাকে কালকেই ছাটাই করতে হবে। এতো উঁচু পাঁচিল, কাঁটাতার পেরিয়ে দুটো চিকনা, প্যাটপ্যাটে চোর ঢুকে পড়লো কেউ টের পেলো না! রাগের সাথে সাথে পেটটা কামড়াচ্ছে। বাথরুমে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সে ঘরের বড়। বাবার পর তার একটা হ্যাডাম আছে ঘরে। সেখানে সে যদি এখন বাথরুমে ছুটে বিষয়টা লজ্জাজনক।
পৃথুলা সাহসী মেয়ে, কিন্তু আয়েশা খালার গলায় ছুরি দেখে তার হাত পা জমে গেছে। আয়েশা পটনভীর গলায় ধরা ছুরিটা চকচক করছে। একদম গলার নলির কাছটায় ধরা। একটু এদিক ওদিক হলেই ঘেচাং ফু। আর আয়েশা খালা এরমধ্যেও মশকরা করছেন,
“আরে ছ্যাড়া, গয়না নিতেছিস নে। আমার গলায় কুতকুতি দেস কেন!”
পৃথুলার ভয় করছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। ভয়ের কারনে সে শক্ত করে রিদমের হাতটা ধরলো। রিদম শান্ত চোখে তার দিকে তাকালো। শুভ্র মুখটাকে ফ্যাকাশে লাগছে। ঠোঁটের উপরে ঘাম জমেছে। শাকচুন্নীটাকে ভয়ে এমন জবুথবু হয়ে থাকতে দেখতে এতো ভালো লাগছে। চোখ সরাতে পারছে না রিদম। ইচ্ছে করছে বুকের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলতে। রিদম থমকালো। সাথে সাথে মাথায় চাটি মারলো সে। মনে মনে নিজেকে কঠিনভাবে শাঁসালো,
“শালা, চোখ কি গেছে? এই শাকচুন্নীরে তোর সুন্দর লাগতেছে? চুমু খাওয়ার মানুষের অভাব? হয় চোখে পেঁয়াজের রস দে নয় চোরের পাছা দেখ। শালা ছাগল!”
নিজেকে শাঁসালেও পৃথুলার হাত ছাড়লো না রিদম। শক্ত করে ধরে রাখলো। মেজো চাচা একটু সাহস করলেন, গলা চড়াও করে বললেন,
“এতো গুলো লোকের সামনে চুরি করে তোরা পার পাবি ভাবছিস? এটা পটনভী মঞ্জিল এখান থেকে বের হবার কোনো সুযোগ তোদের নেই। এখন ই পুলিশ আসবে আর ঘাড় মটকে তোদের জেলে পুরবে।”
“বেশি কথা কইস না বুড়ো। প্যাঁ পুঁ করলেই এই ভুসকির নলি কেঁটে দিব। তুই আমগোরে বাপ বাপ করে যেতে দিবে বুঝলে! পুলিশ আইলেই এই বেডি শ্যাষ”
কি সাহস! বড়ফুপুকে কি না অপমান করে? কাঞ্চনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। রাগ এবার নিয়ন্ত্রণ হারা হলো। তেড়ে যেতে গেলে স্নিগ্ধ তার হাত টেনে ধরলো। হিম স্বরে বলল,
“রাগ ঝাড়ার সময় এটা না, ব্রেইন খাঁটা!”
কাঞ্চন কঠিন খরখরে গলায় বললো,
“আমি না হয় ব্রেইনলেস, তোমার ব্রেইনটা কোথায়? ফুপুকে ওরা অপমান করছে!”
স্নিগ্ধ কিছুসময় শীতল চোখে তাকিয়ে রইলো। তারপর তাকবীরের কানে কানে কিছু বললো। তাকবীর ঘাড় কাত করতেই সে চলে যেতে পা বাড়ালো। কাঞ্চন সাথে সাথেই তার হাত ধরে কাঁপা স্বরে শুধালো,
“কই যাও?”
“আসছি!”
বাহিরে জুলফিকার পটনভী এতোটা সময় বেশ দায়সারা ভাবেই দাঁড়িয়েছিলেন। ভেতরে কি হচ্ছে তিনি জানেন না। পটনভী মঞ্জিলে হাঙ্গামা হরহামেশাই লেগে থাকে। কানের যন্ত্র না থাকায় ভেতরে ঠিক ই হচ্ছে তিনি শুনতেও পারছেন না কিছু। তাই নির্লিপ্ত চিত্তে পা বাড়ালেন নামায পড়তে।
স্নিগ্ধ চলে যাওয়ার পর কাঞ্চন তাকবীরের হাত টেনে ধরলো। ফিসফিস করে বললো,
“ওই সিমেন্টের বস্তা কি বলেছে তোকে? আর ও কোথায় গেছে?”
তাকবীর ফিসফিসিয়ে বললো,
“স্নিগ্ধ ভাই বলেছেন চোরগুলোকে শুধু ব্যস্ত রাখতে। চাপামাসি, লেগে পর। পটনভী বংশের অভিনেত্রী তুই। শুরু করে দে।“
কাঞ্চন বুঝে উঠতে পারলো না সিমেন্টের বস্তার মাথায় এখন কি চলছে। তবে বর্তমানে তার কথা মানা ছাড়া কোনো উপায় নেই। পুলিশকেও ফোন দেবার উপায় নেই। একটা ফোঁশ করে নিশ্বাস ছেড়েই সে হাউমাউ করে কাঁদা শুরু করলো। ঠোঁট বাঁকিয়ে চোখে অশ্রু এনে এক রকম চিৎকার কাঁদা,
“চোর ভাই! ও চোর ভাই!”
তার চিৎকারে পটনভী জনগণের সাথে সাথে চোরও কেঁপে উঠলো। যে চোরটা ঘরের দামী জিনিস ব্যাগে পুরছিলো তার হাত থেকে একটা দামী ফুলদানীও পড়ে যেতে যেতে কোনো মতে বাঁচালো। আয়েশা বেগমের গলায় ছুরি ধরা চোর খেঁকিয়ে উঠলো,
“এই শালি কি?”
“বলি কি চোর ভাই, আমার ফুপুরে ছাইড়ে দেন। দরকার হইলে আমার গলায় ছুরি ধরেন। আমার ফুপুটা নিরীহ। তাকায়ে দেখেন বেঁচারির ক্ষুধা লেগে গেছে এত সময় বসে থেকে৷ এর থেকে আমার গলায় ছুরি ধরেন। আমি আপনাকে মঞ্জিলের গুপ্তধনের সন্ধান দিব!”
গুপ্তধনের কথা শুনে চোখ চকচক করে উঠলো চোরেদের। এদিকে চাচারা বেশ নড়ে চড়ে উঠলেন। মেজোচাচা খ্যাঁক করে উঠে বললেন,
“মিছা কথা বলিস কেন? এই মঞ্জিলে কোনো গুপ্তধন নেই।“
“চাচা, এখানে ফুপুর গলা বেশি দরকার। এই গয়নাগুলো তো নকল, আসল গুপ্তধন ওই নবাব আসফ উদ দৌলার আমলের স্বর্ণমুদ্রাগুলো। ওমন দামী জিনিস কি এই জামানায় পাওয়া যায়? চোরভাইদের আমরা বরং ওই গুপ্তধনগুলোই দিয়ে দেই।“
“এই তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? কি বলতেছিস?”
মেজোচাচা খুব ক্ষেপে উঠলেন। পটনভী মঞ্জিলে সত্যিকারের গুপ্তধন আছে। কিন্তু সেটা বাচ্চাদের কথা না। মেজোচাচার গলা শুকিয়ে এলো। চোরগুলো সত্যি সত্যি ওই মুদ্রাগুলো নিয়ে গেলে? কাঞ্চন কাজিনমহলকে ইশারা করতেই তারাও যুক্ত হলো। রিদম বললো,
“হ্যা, এই গয়নাগুলো এমিটিশন। একটাও সোনার না। আপনারা আসল গুপ্তধন ছেড়ে নকল জিনিসের পেছনে কেন ছুটছেন? গাধা নাকি? আমরা হলাম নবাবের বংশ। আমরা আলমারীতে সোনা রাখবো? মাথায় কি তালা মারা নাকি?”
বড় চাচা পেট চেপে বললেন,
“হারামজাদা, চুপ থাক। লুটায়ে দিবি নাকি?”
“রফিকুল্লাহ চাচা, আপনার কাছে আয়েশা ফুপির থেকে ওই মুদ্রা বেশি জরুরী?”
চোরেরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। লোভ বিশ্রী জিনিস। মুহূর্তেই লোভে তাদের চোখ চকচক করে উঠলো। ধমক বসালো আয়েশা পটনভীর গলায় ছুরি ধরা চোরটা। ছুরিটা সরিয়ে পটনভীদের দিকে তাক করে বললো,
“আরেকটা কথা কবি এই ভুসকির ভুরি গেলে দিবো। এই চেংড়ি কই মুদ্রাগুলো? নিব যখন সব নিব। এই ল্যাটা, দড়ি দিয়ে আগে এই বুড়া গুলোকে বাঁধ। সবগুলোকে বাঁধবি। শালাগুলোর ভরসা নাই। আর ফোনগুলো আগে ল।“
কথাটা শেষ হবার আগেই একটা তীব্র লাথি তার হাত বরাবর পড়লো। অমনি ছুরিটা মেঝেতে পড়ে গেলো। চোরটা বোঝার আগেই তীব্র প্রহার তার ঠিক হাটুর পেছনে পড়লো। ফলে হাটু ভেঙ্গে বসে পড়লো সে। সেই সুযোগে তার মাথাটা সজোরে মেঝেতে আছাড় মারলো স্নিগ্ধ। যখন কথায় সব ব্যস্ত ঠিক সেই মুহূর্তে সে বারান্দা থেকে ঢুকে পড়েছে। এতোগুলো পটনভীর ভেতর কখন নিঃশব্দে সে সরে পড়েছে সেটা চোর তো দূর চাচারাও দেখে নি। একজনকে ধরাশায়ী করতেই রিদম চিৎকার করে বললো,
“হামলা।“
ব্যাস পটনভীরা একত্রে ঝাপিয়ে পড়লো আরেকটা চোরের উপর। স্নিগ্ধ যতসময় একটা চোরের মাথা মেঝেতে চেপে ধরে রাখলো পটনভীরা আরেকটাকে চালকুমড়ার মোরাব্বা বানিয়ে ফেললো। অবশেষে একটা প্রকান্ড পিলারের সাথে দুটো চোরকে বাঁধা হলো।
স্নিগ্ধ একটা চেয়ার টেনে বসলো তাদের সামনে। শুধু দুজনের এতো সাহস হবে না। এদের নিশ্চিত একটা গ্যাং আছে। তাদের খোঁজ পাওয়া দরকার। থানা থেকে পুলিশ আসছে। ততসময় কিছুক্ষণ না হয় সে হাত চালিয়ে নিক। চোরগুলো যখন কোনভাবেই মুখ খুললো না তখন সপাটে শুধু চড় বসালো। হিম স্বরে বললো,
“ভালোয় ভালোয় বলছি সত্যিটা বল, নয়তো রিমান্ডে স্পেশাল ডিম থ্যারাপি দেওয়াবো।“
চোরগুলোর মুখ ফুলে গেছে। ঠোঁট কেটে ঝুলে গেছে। রক্ত পড়ছে। কথা বলতে পারছে না। স্নিগ্ধ আবার চড় বসালো। তার চেহারা এখন একেবারেই ভিন্ন। কাজিনমহলের মনে হলো তারা কোনো হিংস্র হায়েনাকে দেখছে। যার মধ্যে কোনো দয়ামায়া নেই। সে শুধু জানে শিকার করতে। ঠান্ডা মাথায় সে শিকার করে। কাঞ্চনের চোরগুলোর জন্য মায়া হচ্ছে না। কিন্তু এভাবে মার খেতেও দেখতে ইচ্ছে করছে না। একটা মানুষ ব্যথায় ছটফট করছে। তার শরীর থেকে রক্ত পড়ছে বিষয়টা সহ্য করা একটু অস্বস্তিকর। ফলে আর না পেরে বলে উঠলো,
“আর মেরো না ওদের।“
“তো কি নাচবো মাথায় নিয়ে?”
তীক্ষ্ণ ঝনঝনে গলায় বললো স্নিগ্ধ। কাঞ্চন ভ্রুকুটি কাঁটলো। সেও তেজী গলায় বললো,
“আমি সেটা বলি নি। আমি শুধু বলেছি এখানে মেরো না। দেখতে অস্বস্তি লাগছে।“
“আরেকটু হলে আমার মায়ের গলায় ছুরি চলতো। আমি তো ওদের চামড়া খুলে নেই নি ওদের ভাগ্য ভালো। আপনার মতো আমার মনে দয়া আসে না মিসেস পটনভী?”
“আমি দয়া দেখাতে কখন বললাম। শুধু বলেছি আর মেরো না। তাদের মুখ দেখেছো? মরে যাবে তো!”
“গেলে যাবে।“
খুব ভাবলেশহীন চিত্তে বললো স্নিগ্ধ। কাঞ্চনের কপালের ভাঁজ তীব্র হলো। তীক্ষ্ণ গলায় বললো,
“তোমার মায়াদয়া একেবারেই নেই তাই না? হতেই তো পারে এই চুরিটা তারা তাদের পেট পালতে করছে। ঘরে বাচ্চাকাচ্চা অভুক্ত। কাজ পায় না বলে বাধ্য হয়ে চুরি করছে।“
স্নিগ্ধ প্রখর দৃষ্টিতে তাকালো কাঞ্চনের দিকে। পৃথুলা কাঞ্চনের হাত ধরে টানলো। ফিসফিসিয়ে বললো,
“থেমে যা”
“কেন থামবো? একটা অমানবিক মানুষের মারমুখো কর্মকান্ড দেখবো?”
কাঞ্চন এবার এগিয়ে আসলো। চোরদুটোকে নরম স্বরে বললো,
“দেখুন আপনারা যা করছেন তা ভালো নয়। হয়তো অভাবের তাড়নায় চুরির পথ বেছেছেন। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন তো আজ যদি আপনার হাতে আমার ফুপুর কিছু হত তাহলে আপনাদের ফাঁসিও হতে পারতো। আপনাদের বাচ্চা-বউ, বাবা-মার কি হত?”
“কি কন আফা? পাগলায় গেছেন? কিডায় কইছে অভাবের জন্য চুরি করি? আপনার একাউন্টে এতো টাকা নাই যা আমরা প্রতিদিন কামাই। আজকে ভাবছিলাম, এই জিনিস বেঁইচ্যা জুয়া খেলাম আর গাঞ্জা খামু। ধরা যখন পড়াম ই ওই ভুসকিরে হুদাই কিছু করলাম না। ভুসকি না চিল্লাইলে আজকেরা চুরি কইরা ঘর সাবার করে লাইতাম।“
চোরটা কথাটা শেষ করতে পারলো না। অমনি কাঞ্চন একটা ফুলদানি ঠাস করে তার মাথায় ভাঙ্গলো। তার গা রাগে কাঁপছে। এদিকে স্নিগ্ধ চোখে হাত চেপে হাসছে। কাঞ্চন আবার মারতে উদ্ধত হতেই সে তাকে টেনে ধরলো। গাঢ় স্বরে বললো,
“কি মাদার তেরেসা? মাদার আর তেরেসা উভয়ই উড়ে গেলো?”
ইতোমধ্যে পুলিশ এসেছে। এই চোরগুলো একটা কুখ্যাত গ্যাং সদস্য। বহুদিন যাবৎ পুলিশ এদের পিছনে। অবশেষে তারা দুটোকে ধরতে পেরেছে। অবশেষে পটনভীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। সকালের আলো ফুটেছে। ব্রাজিল ড্র করেছে। রিদম মুখ ফুলিয়েছে। অঞ্জনা ঘড়ি দেখলো। পড়া হয় নি কিছুই। ঘুমও পাচ্ছে, মনে হচ্ছে এবার রেজাল্ট গুল্টি খাবে। পৃথুলার ভয় কেটেছে। রিদমের মুখ ঝুলিয়ে রাখা তাকে কিছুটা স্বাভাবিক হতে সহায়তা করছে। ভয়গুলো সরিয়ে রিদমকে বললো,
“আরোও কর হারু পার্টির বন্দনা, এমন ই হবে।“
“ঠিক ই বলেছিস, শালা আমার মাথায়ই ক্রাক। হারু পার্টিকে সাপোর্ট করি, শাকচুন্নীরে…”
বলেই থেমে গেলো সে। কিছু না বলেই হনহন করে উঠে গেলো।
আয়েশা পটনভী চোর ধরা পড়ার পর বেশ উত্তেজিত হয়েছিলেন। এতোসময়ের চাঁপা ভয় অবশেষে প্রকাশিত হতে শুরু হয়েছে। তাকে একটা ঘুমের ঔষধ দিলেন অঞ্জনার বাবা। তিনি ঘুমিয়ে পড়লেই কাঞ্চন পা বাড়ালো অঞ্জনার রুমের দিকে। কিন্তু ঠিক তখনই স্নিগ্ধ তার হাত টেনে ধরলো। গাঢ় স্বরে বললো,
“কোথায় যাচ্ছিস?”
“তোমাকে বলবো কেন?”
স্নিগ্ধ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। তারপর আদেশের সুরে বললো,
“আমার ঘরে আয়”
“তোমার চাকর আমি?”
“না আমার বউ। আপাতত নিজের আহত স্বামীর শুশ্রূষা করা দায়িত্ব আপনার।“
কাঞ্চন থমকালো। স্নিগ্ধের হাত তার পেটের কাছে। সে কিছু না বলেই নিজের ঘরে চলে গেলো।
কাঞ্চনের মন খচখচ করছে। যাবে কি যাবে না দ্বন্দ্বে অনেকটা সময় ভেবে অবশেষে সে স্নিগ্ধের ঘরে গেলো। স্নিগ্ধর পরণে একটা কালো হাতকাটা ট্যাংক টপ। বুক অবধি তোলা। তলপেটের কাছটায় একটা চিকন কাঁটা। তা থেকে গলগলিয়ে রক্ত পড়ছে। চোর ধরার আগে জায়গাটা পরিষ্কার করেছিলো স্নিগ্ধ। হয়তো বারান্দায় উঠার সময় আর চোরের সাথে মারামারির সময় আবার ঘা তাজা হয়ে রক্ত পড়ছে। স্নিগ্ধ মাথা না তুলেই বললো,
“দরজা আটকা।“
“মেহেদী চাচাকে বললেই সে ড্রেসিং করে দিবেন। ইনফেকশন হবে তো!”
“আমার বলার হলে আমি শুধু তোকে একা ডাকতাম না। এই নোংরা তুলা আর ব্যান্ডেজ ফেলে আমাকে পরিষ্কার ব্যান্ডেজ কেটে দে।“
কাঞ্চন সরু চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। নড়লো না। স্নিগ্ধ ঘাড় বাকিয়ে তাকালো তার দিকে। গাঢ় স্বরে শুধালো,
“স্বামীর যত্ন করা স্ত্রীর জন্য ফরজ।“
“যেই বিয়েই মানি না, সেখানের স্বামীকে মানার প্রশ্নই আসে না।“
কাঞ্চন রক্তে লাল ব্যান্ডেজ এবং তুলাগুলো ফেলে দিলো। বসলো ঠিক স্নিগ্ধের পাশে। স্নিগ্ধের কাঁটাটা গভীর না হলেও ফাঁক হয়ে মাংসের লাল অংশ দেখা যাচ্ছে। স্নিগ্ধ খুব দক্ষ হাতে তার পেটের রক্তগুলো পরিষ্কার করলো। ঔষধ দিলো। তারপর ব্যান্ডেজ করলো। কাঞ্চনের তাকানো দেখে বাঁকা হাসলো সে। তারপর গাঢ় স্বরে বললো,
“আমার প্রফেশনটাই এমন। একটু অসাবধানতায় অনেক বড়কিছু ঘটে যেতে পারে। সুতরাং একটা মিথ্যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে দূর থেকে সেটা বোঝা যায় না।“
“আমি তো একটা ব্র্যাট, আমি এমনেও বুঝবো না।“
স্নিগ্ধ একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো। তার ব্যান্ডেজ করা শেষ। কাঞ্চন সবকিছু গুছিয়ে ফেললো। তারপর সে চলে যেতে নিলে স্নিগ্ধ তার হাত টেনে বললো,
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১২
“স্বামীকে এমন অবস্থায় ছেড়ে যাবি?”
“এতো নাটক করো কেন তুমি? নটকাবাজ কোথাকার। আরেকবার স্বামী বলো আমি তোমার মুখ ভেঙ্গে ফেলবো। তোমার মত নার্সেসিস্ট মানুষকে স্বামী ভাবতেও আমার গা গুলায়। আমার স্বামী হবে লাখে একটা, আর সেটা তুমি তো অন্তত না। জাস্ট ডিভোর্স মি, মুক্তি দাও। মামলা ডিসমিস, আসামী খালাস।“
বলেই হাত ছাড়াতে নিলে স্নিগ্ধ তার হাতটা টেনে তাকে নিজের কাছে নিয়ে এলো। কাঞ্চনের দু হাত নিজের হাতের মুঠোয় করে বুকের কাছে আটকে রেখে খুব গাঢ় স্বরে বললো,
“তুই শিওর কি করে হচ্ছিস আমি ভালো হাসবেন্ড হতে পারবো না? হাওয়ায় হাওয়ায় গুল না মেরে, Try me গুলবাহার”………
