Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১২

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১২

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১২
মুশফিকা রহমান মৈথি

খাওয়ার টেবিলে থমথমে পরিবেশ। ব্রেকিং নিউজ, সরফরাজ পটনভীর মুখে হাঁচি মেরেছে তার স্ত্রী পারিজাত পটনভী। অথচ সরফরাজ পটনভী শান্ত। রিদমের মনে হলো আজকের দিনটা ঝাকানাকা যাবে। যে কাজ কাজিনমহল স্বপ্নতে কল্পনা করতে পারে না, কাঞ্চন সেটা করেও ফেলেছে। যদিও কাঞ্চনের মধ্যে খুব একটা বিকার দেখা যাচ্ছে না। বরং মনে হলো কাজটা করায় সে কিঞ্চিত খুশি। তার ঠোঁটের কোন মৃদু মৃদু কাঁপছে।
স্নিগ্ধ ডাইনিং হলের চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকা লোকেদের পরোয়া করলো না। একটা টিস্যু বের করে বা হাতে কাঞ্চনের ঘাড়টা চেপে নিজের কাছে নিয়ে এলো। তারপর নিজ হাতে কাঞ্চনের নাক পরিষ্কার করে দিলো। একটু বেশি জোরেই ঘষা দিলো ফলে নাক টমেটোর মতো লাল হয়ে গেলো কাঞ্চনের। সে কিছুই বলতে পারলো না। কারণ সবার কাছে স্নিগ্ধের মতো ভালো ছেলে দুটো হয় না। মুখে হাসি মারার পর আবার বউয়ের নাক মুছিয়ে দেয়, এমন বর তো ভাগ্যবানেরা পায়।
কাঞ্চন নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। নাকে টিস্যু চেপে আরোও দু একটা হাঁচি দিলো। সাথে সাথেই স্নিগ্ধ কড়া স্বরে বললে উঠলো,

“লাবুর মা, একমগ আদা চা নিয়ে এসো!”
লাবুর মা, কাঞ্চনের ভাষ্যে ফকিন্নি মহিলা ঠিক সাত মিনিটে এক বড় মগ চা নিয়ে ছুটে ছুটে আসলেন,
“লন ভাইজান!”
“আমাকে না, আপাকে দাও!”
লাবুর মা মগটা কাঞ্চনের দিকে দিলো। বড় ফুপু ছেলের এমন কাজে যেন প্রসন্ন। গদগদ স্বরে বললেন,
“বাবু, বউপালা শিখে গেছে। যাক আমি নিশ্চিন্ত!”
কাঞ্চনের মুখ ভার। সে দাঁতে দাঁত পিষে তাকালো স্নিগ্ধের দিকে। স্নিগ্ধ নির্বিকার চিত্তে খেতে বসলো। কি নাটক! আস্তো নটকাবাজ! নাকটা জ্বালিয়ে দিয়েছে মোছার নাম করে। কাঞ্চন খ্যাটখ্যাটে স্বরে বললো,
“ওইটা আমার চেয়ার!”
স্নিগ্ধ শান্ত স্বরে বললো,
“আজকাল চেয়ারে নাম খোঁদাই করা থাকে নাকি পটনভী মঞ্জিলে!”
বড়চাচা কাগজের ফাঁক থেকে মুখ বের করে বলে উঠলেন,

“চেয়ারের কি অভাব, পাশে বয়। ছেলেটা বসেছে ওকে বসতে দে!”
কাঞ্চনের মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো। এই লোকটা ইচ্ছেকৃত ভাবে এই ঢংগুলো করে। তার চেয়ারটার ফোমটা মোটা কিন্তু নরম। অন্যচেয়ারগুলোর ফোম নষ্ট হয়ে গেছে প্রায়। জুলফিকার পটনভীর সেক্রেটারি মুহিব সাহেব একটা বিশাল চোয়াল্লিশ হাজার টাকার ফর্দ করেছেন। এখনো সেই ফর্দ পাশ হয় নি। কাঞ্চন ডাইনিং হলে খেলে এই চেয়ারটাতেই বসে। সিমেন্টের বস্তাটা তার সিমেন্টের মতো শরীর নিয়ে এখানেই বসেছে৷ কাঞ্চন বাধ্য হয়ে পাশের চেয়ারটা টেনে বসলো। কাঞ্চন বসতেই স্নিগ্ধ বাম হাতে তাকে সমেত চেয়ারটা টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো। তার এই কাজে কাঞ্চন কঠিন চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। স্নিগ্ধ ফিঁচেল হেসে বললো,
“এতো তাকিয়ে থাকলে তো মরে যাওয়া প্রেমটা কবর থেকে উঠে আসবে!”
“সত্যি সত্যি একদিন তোমারে আমি খু*ন করে ফেলবো৷”
“সেদিনের অপেক্ষায় আছি। হালাল বউয়ের হাতে খু*ন হলে কি তাকে শহীদ বলা হবে?”
কাঞ্চনের কপালের ভাঁজ আরোও ঘন হলো। এই লোকের নাম সরফরাজ পটনভী না হয়ে নটকাবাজ পটনভী হলে ভালো হতো। রিদম সূক্ষ্ণ চোখে দেখছে স্নিগ্ধ এবং কাঞ্চনকে। তার সকাল সকাল বিনোদনের কোটা পূর্ণ হয়ে গেছে। তারপর ফিসফিসিয়ে পৃথুলাকে বললো,
“ভাইরে পটনভী মঞ্জিল একটা জলজ্যান্ত নেটফ্লিক্স ভাই। এতো ড্রামা নেটফ্লিক্সেও হয় না।”
“তাহলে আজকে থেকে তোর প্রতিমাসের নেটফ্লিক্সের টাকাটা আমাকে দিবি?”
“লোভী, ফয়িন্নি মহিলা। যা ভাগ!”

কাঞ্চন আংটিটার দিকে এক মনে তাকিয়ে আছে। আংটিটা মোটেই পাতলা না। মনে হচ্ছে সাপ পেঁচিয়ে ধরে আছে তার আঙ্গুল। কি অসহ্য! মাথা ব্যথাটা বাড়ছে। জ্বর আসবে আসবে ভাব। মিডের পড়া শেষ হয় নি। ব্লগের ক্লিপ এডিট করাও বাকি।
কাঞ্চনের একটা ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেল আছে। এমনি পিনিকে পিনিকে খুলেছে। এখন সেটায় প্রতিদিন কিছু না কিছু আপলোড দেয়। খুব ই ফালতু জিনিসপত্র। রাস্তা দিয়ে হাটছে একটা সুন্দর গাছ দেখলো, একটা ভিডিও করে ক্যাপশন দিয়ে দিলো। মাঝে মাঝে একা একা বকবকও করে। বিয়ের পর থেকে অবশ্য করা হয় নি। সেই বিয়ের আগের ক্লিপগুলোই এখনো এডিট করা হয় নি। পেজটা কিছুদিন আগে মনেটাইজেশন পেয়েছে। ফলে এখন এই হাবিজাবি কাজগুলো করতে ভালো লাগে। পড়াশোনা শেষ করে ফুল টাইম কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হয়ে যাবে। নয়টা থেকে ছয়টার অফিস করার ইচ্ছে নেই তার। সে ট্রাভেল ব্লগার হবে। সারা দুনিয়া অবাধ্য পাখির মতো ঘুরে বেড়াবে। সেজন্য টাকাও প্রয়োজন৷ তাই বেশি বেশি ভিডিও বানাতে হবে। তারপর একটা ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু বিয়ের পর থেকে কিছুই করতে ইচ্ছে করছে না। সিমেন্টের বস্তাটা একটা স্পিড ব্রেকারের মতো জীবনে ঢুকে গেছে। ওর ঘরে যেতেও বিরক্ত লাগে। তাই পৃথুলাদের ঘরে এসে ভেটকি মাছের মতো শুয়ে আছে। আর একটু পর পর অঞ্জনা হা হুতাশ শুনছে।
অঞ্জনার অবস্থা বেগতিক। পড়তে পড়তে মাথা নষ্ট হয়ে যাবার উপক্রম। চায়ের কাপ মাথায় ঠেকিয়ে সে বসে আছে। মাথা সক্রিয় করার চেষ্টা করছে। ল এর স্টুডেন্ট। তাই পড়া বেশি। শুধু সংবিধান আর এক্ট পড়তে পড়তেই তার জীবন শেষ। এর মধ্যে পৃথুলা বই খুলে বললো,

“আজকে আমরা পইড়ে দুনিয়া ফাঁটায়ে দিবো। আজকে উই আর আনস্টপ্যাবল।”
পৃথুলার কথায় অঞ্জনার মুখ বিরক্তিতে ভার হয়ে গেলো। হতাশ গলায় বললো,
“ওইটা আনস্ট্যাবল হবে! যা এখন আমাদের হাল। ধ্যাত! এতো পড়া কেন ভাই? এই পড়ার চিন্তায় তো আমার মাথার পোকা বের হয়ে যাচ্ছে!”
রিদম একটা চেয়ার টেনে উলটো হয়ে বসলো। চেয়ারের ব্যাকসাইডে দু হাত জড়ো করে বসলো। একদম খোশমেজাজী গলায় বললো,
“চিন্তা তোদের মাথায়ই আসে। আমাকে দেখ, আমি কি চিল। আমার তো সব সেট। ইভেন বাচ্চাদের নামও ঠিক করে ফেলেছি। আমদানী আর রপ্তানি। হবি নাকি আমার আমদানীর মা?”
অঞ্জনা চোখের থেকে চশমাটা খুলে বললো,
“আমার কোনো শখ নাই ভাই। তুই আমার ভাই আছোস, ভাই থাক। আমার এই পটনভীদের মধ্যে বিয়ে করার ই শখ নাই। তুই পৃথুলার গলায় ঝোল যা!”
রিদম মুখটা বাঁকিয়ে বললো,
“আমার প্রোডাক্টদের সুন্দরও হতে হবে। সেই সাথে কোয়ালিটিফুল। ওই ফকিন্নি যে টক্সিক বাপরে বাপ। ও মেয়ে হয়ে রেড ফ্লাগ! ও আমার আমদানীর মা হতেই পারে না!”
রিদমের কথা শুনে পৃথুলা মুখ খিঁচিয়ে বললো,

“অঞ্জনা ঠিক কয়টা খুন করলে ফাঁসি হয়?”
“একটা করলেই হয় মাই কিউট লিটল রেড ফ্লাগ!”
অঞ্জনা উত্তর দিতেই কাঞ্চন মাথাটা উঁচু করে বলে উঠলো,
“ওই সিমেন্টের বস্তাকেও এড কর। শুধু রিদমের মতো চামচিকাকে মেরে ফাঁসিতে ঝুললে আফসোস তোর ই হবে।”
অঞ্জনা বিদ্রুপ করে বললো,
“কে জানে বলছিলো, তোরা বুঝিস না স্নিগ্ধ ভাইয়াকে। স্নিগ্ধ ভাই আসলে আমলকি। স্বভাব তেঁতো হলেও খেতে উপকারী।”
“ছোট বেলায় সবাই চুতিয়া থাকে। আর মানুষ ঠেকা খেয়ে শিখে। এমন হতেই পারে, পাঁচবছর পর আমি এখনের নিজেকে দেখে ক্রিঞ্জ খেয়ে বলব, কি চুতিয়া ছিলাম!”
রিদম মুখ বাঁকিয়ে বললো,
“এজন্য বলছিলাম চ্যুজ মি! এখনো সময় আছে, হবি নাকি আমদানীর মা!”
“সরি ব্রো, আমি পুরুষজাতকে ঘৃণা করি!”
“কবে থেকে এই মহাজাগরনী চিন্তার আবির্ভাব?”
“বিয়ের পর থেকে।”
পৃথুলা বই বন্ধ করে বললো,
“তাহলে সংসার করবি না বলছিস!’
“একদম। ভাই দেখ আমাদের মধ্যে সেতুবন্ধন হওয়া ইমপসিবল। মাঝে মাঝে কিছু বিয়ে দেখলেই মনে হয় না, “এটা টিকবে না”। আমরা সেই ক্যাটাগরির। আমি তো পালাবো। এই পটনভীদের শিকল ভেঙ্গে আমি পালাবো!”

পৃথুলার চোখের দৃষ্টি বদলালো। গলার স্বর একটু ভার হলো। হালকা হেসে বললো,
“আমাকেও নিয়ে যাস”
“তাহলের আমদানীর কি হবে? আমাদের চামচিকা তো দেবদাস হয়ে যাবে!”
পৃথুলা সাথে সাথে হাতের কাছের বালিশটা ছুঁড়ে মারলো কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চন হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়লো। ঠিক সেই সময় ঘরের দরজায় টোকা পড়লো। অঞ্জনা উঠে যেয়ে দরজা খুলতেই দেখলো স্নিগ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। অঞ্জনা ফটাফট বললো,
“আমরা গ্রুপ স্ট্যাডি করছি স্নিগ্ধভাই। আজকে কাঞ্চন আমাদের সাথে থাকবে।”
কথাটা মিথ্যে। রাত চারটের সময় ব্রাজিলের খেলা। কাজিনমহলের এই গ্রুপের মধ্যে চারটে আর্জেন্টিনা, কাঞ্চন জার্মানি এবং রিদম বেঁচারা একা ব্রাজিল। ওকে পঁচাতে সবার খুব ভালো লাগে। আজ রাতেও তাই হবে। কিন্তু কাঞ্চন এখন স্নিগ্ধের বউ। সুতরাং রাত বিরাতে তাকে ডেকে আনতে কেমন অস্বস্তি লাগে। তাই অঞ্জনা মিথ্যেটা বললো। স্নিগ্ধ একদম শান্ত কণ্ঠে বললো,
“ফেকুচন্দ্রটার কাছে দুটো অপশন আছে। এখন-ই আমার সাথে রুমে যাবে নয়তো আমি তাকে খেদমত করে রুমে নিয়ে যাবো!”
কাঞ্চন গলা উঁচিয়ে বললো,

“নবাবীপনা অন্যখানে দেখাতে বল। আমি তার কেনা গোলাম না!”
স্নিগ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ইশারা করতেই অঞ্জনা সরে পড়লো। স্নিগ্ধ লম্বা লম্বা পা ফেলে ভেতরে ঢুকলো। কাঞ্চন তখন চোখের উপর হাত রেখে শুয়ে আছে। স্নিগ্ধ কঠিন গলায় বললো,
“আমি শেষবারের মতো বলছি, রুমে আয়!”
“পারবো না। আমার তো আর বাপ নেই, তাই বাপের বাড়িও নেই। প্যারাসাইট আমি। এখন থেকে এই ঘর আমার বাপের বাড়ি। এখানেই থাকবো।”
স্নিগ্ধ কপালের চামড়া টেনে ধরলো। তার রাগ হচ্ছে স্পষ্ট৷ রিদম আস্তে করে উঠে যেয়ে পৃথুলাকে বলল,
“বাজি ধরবি?”
“এই যে আজকে ব্রাজিল হেরে যাবে?”

“আমদানীর মা, মুখ সামলায়ে কথা কবি। নয়তো কালা কুত্তার গুয়ে জুতা ভিজায়ে মারুম!”
“সেভেন আপ খেয়ে ঠান্ডা হ”
“শালা শাকচুন্নী। যাহ! তোর সাথে বাজি লাগুম না। এই অঞ্জনা বাজি লাগবি?”
অঞ্জনা চোখের চশমাটা ঠিক করে বললো,
“আমি লয়ার ব্রো। বাজি লাগা ইথিক্সের মধ্যে পড়ে না। তাও, তুই হারবি যখন লাগা!”
“স্নিগ্ধ ভাই এখন কাঞ্চনকে কাঁধে তুলে ঝুলাতে ঝুলাতে নিয়ে যাবে!”
“চিরন্তন সত্যের উপর আমি বাজি লাগাই না। সরি!”
“এখন যদি আমি বলতাম ব্রাজিল জিতবে তখন ঠিক লাগাতি।”
“অবশ্যই, ব্রো কারণ তোর টাকা খসানোতে একটা পৈশাচিক আনন্দ আছে।”
রিদম হতাশ গলায় বললো,
“শাকচুন্নীর সাথে থাকতে থাকতে তুইও কেমন টক্সিক হয়ে গেলি রে! আহারে একটাই ভালো প্রোডাক্ট ছিলি পটনভীদের মধ্যে।”

এর মধ্যেই স্নিগ্ধ সত্যি সত্যি ঘাড়ে তুলে নিলো কাঞ্চনকে। কাঞ্চনের মাথা ব্যথা তখন তুঙ্গে। চিৎকার করে বললো,
“নামাও স্নিগ্ধ ভাই আমাকে। নয়তো কামড়ে দিব কিন্তু তোমার ঘাড়!”
“প্লিজ বি মাই গেস্ট। তোকে আগেই ওয়ার্ন করেছি, তুই শুনিস নি।”
বলেই তাকে ঘাড়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। কাঞ্চন পুরোটা সময় ছটফট করলো। কিন্তু স্নিগ্ধকে এক চুল নড়াতে পারলো না। স্নিগ্ধ তাকে নামালো ঠিক নিজের ঘরে। কাঞ্চনের চোখ লাল হয়ে গেছে। অধৈর্য্য গলায় চিৎকার করে বললো,
“তুমি কি ভেবেছো, জোর করে আমার পাখা কেটে দিবে? আমি উড়ে যাবো। দেখে নিও!”
স্নিগ্ধ একটা গ্লাসে পানি ঢাললো। ঔষধের বক্স থেকে একটা ফেনাডিন এবং প্যারাসিটামল খুলে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“তুই উড়বি, কিন্তু শুধু আমার আকাশে!”
“স্বপ্ন দেখ!”
“দেখছি তো। এবার ঔষধটা খেয়ে আমাকে উদ্ধার কর!”
“নটকাবাজ লোক তুমি!”
স্নিগ্ধ জোর করে কাঞ্চনের হাতে ঔষধ ধরিয়ে দিতেই কাঞ্চন তা ছুড়ে ফেলে দিলো। স্নিগ্ধ তখন হিম গলায় বলল,

“এরপর মুখে চেপে ধরবো কিন্তু। এবং সেটা হাত নিয়ে না!”
“দয়া দেখাচ্ছো!”
“না তোর শরীরে শক্তি জোগাচ্ছি, যাতে আরোও বেশি আমাকে ঘৃণা করার এনার্জি পাস!”
কাঞ্চনের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। স্নিগ্ধ তাকে আবারোও ঔষধ খুলে হাতে দিলো। এবার কাঞ্চন সেটা ফেললো না। খেলে নিলো। তারপর উঠে দাঁড়াতেই স্নিগ্ধ হাত টেনে ধরলো,
“এখানে রেস্ট কর!”
“তোমার কথা শোনার ঠেকা নেই আমার।”
“ভুলে যাস না, এখন তোর ঠেকাই ঠেকা।”
কাঞ্চন একটা ঝটকা মেরে হাতটা ছাড়িয়ে বললো,
“ওই ঠেকা নিয়ে ডুগডুগি বাজাও। নটকাবাজ পুরুষ কোথাকার!”
বলেই হনহন করে হেটে চলে গেলো কাঞ্চন। স্নিগ্ধ প্রখর দৃষ্টিতে তার যাবার দিকে তাকিয়ে রইলো। ঠিক তখন ই ফোন এলো তার। ফোনে কথা বলেই ইউনিফর্ম বদলালো। গান লোড করলো। তারপর বেরিয়ে গেলো।

রাত চারটা। একটা প্রজেক্টর জোগাড় করেছে তাকবীর। মিউট করে খেলা দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাই। পটনভী পরিবারে খেলা দেখা হয় না। জুলফিকার পটনভীর হার্ট এট্যাক হয়েছিলো একবার উত্তেজনায়। তাই খেলা দেখা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে কাজিন মহল। সবাই যে যার পছন্দের দলের জার্সি পড়া। অঞ্জনা গায়ে বিছানার চাঁদর মুড়ে রেখেছে। তার বিশ্বাস এমন করলে ব্রাজিল হেরে যায়। রিদম বেশি এক্সাইটেড। তাকবীর, ইকরাম, পৃথুলা এবং অঞ্জনা শুধু রিদমকে পঁচানোর জন্য খেলা দেখছে। কাঞ্চনের ঘুমে চোখ জড়িয়ে যাচ্ছে। ফেনাদিন খাইয়ে সিমেন্টের বস্তাটা ওকে কুম্ভকর্ণ বানিয়ে দিয়েছে। এককাপ চা খেতে পারলে ভালো হত। কাঞ্চন উঠে দাঁড়াতেই রিদম বললো,

“কই যাস?”
“চা খাবো। ঘুম আসছে।”
“প্লিজ এই অভুক্ত শিশুদেরও একটু দিস চাপামাসি!”
“তোদের হাত পা নেই!”
“না আমরা ল্যাদা বাচ্চা! প্লিজ”
কাঞ্চন দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ডাইনিং হলে পিনপতন নীরবতা। ফজরের আযান দিবে একটু পর। তখন ঘুমন্ত পটনভী মহল জেগে উঠবে। তাই তার আগে চা বানাতে হবে। চুলায় পাতিল বসিয়ে পানি গরমে দিলো সে। ঠিক তখনই দেখলো ডাইনিং হলে একটা ছায়া। কালো ছায়াটা দীর্ঘ। চোখ পড়তেই সরে গেলো। এই সময় কে? মঞ্জিলে অনেক লোক। নিশ্চয়ই কেউ আযানের আগেই উঠে গেছে। কিন্তু একটু পরই কিছু একটা ঝনঝনিয়ে উঠলো। কাঞ্চন উঁকি দিতেই দেখলো কালো একটা ছায়াটা ফ্রিজের পেছনে লুকিয়ে গেলো। অমনি কাঞ্চনের বুক ধরাস করে উঠলো। চোর নাকি? রেলিং টপকে এসেছে? সাথে সাথেই ফোন দিলো সে পৃথুলাকে। পৃথুলা ফোন রিসিভ করেই বলল,

“কি হইছে ডার্লিং?”
“আমাদের ঘরে মনে হয় চোর ঢুকছে।”
ফিসফিসিয়ে বললো কাঞ্চন। হাতে একটা বেলন নিলো। টিপে টিপে হাটতে লাগলো সে। চোরের কথা শুনতেই পৃথুলা বললো,
“আমরা আসছি!”
কাঞ্চন পা টিপে টিপে ফ্রিজের কাছে গেলো। ফ্রিজের পেছনে কিছুই নেই। চোরটা গেলো কোথায়। কোনো শব্দ নেই মঞ্জিলে। কাজিনরা নেমে এলো সবাই। তাকবীর ভীত স্বরে শুধালো,
“চোর কই?”
“জানি না! তবে ঘরেই আছে।”
কাঞ্চনের গলা কাঁপছে। রিদম বিরক্তি নিয়ে বললো,

“আমার খেলা চলে যাচ্ছে!”
“দশমিনিটে বলও পায় নি। এর থেকে চোর ধরাটা বেশি জরুরি!”
পৃথুলার কথায় রিদম দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললো,
“শাকচুন্নী!”
অঞ্জনা থামালো তাদের। তারপর বিজ্ঞের মতো বললো,
“আমরা এখানে ছয়জন। এক কাজ করি, দুভাগে ভাগ হই।”
“সবাইকে জাগালেই তো হয়ে যায়!”
“এখন সবাই গভীর ঘুমে। অহেতুক ঝামেলা হবে। এর থেকে আমরা আগে কনফার্ম হই চোর কি না!”
“চোরের কাছে অস্ত্র থাকলে?”
অঞ্জনা দ্রুত খুন্তি, চুরি, ঝাড়ু নিয়ে এলো। সবার হাতে এখন অস্ত্র। মিশন চোর ধরা। এখন শুধু চোরকে ধরা বাকি। দুই দল দু দিকে গেলো। কাঞ্চনরা গেলো তৃতীয় তালায়। প্রতিটা কোনায় কোনায় দেখলো। চোরকে পাওয়া গেলো না। তবে সেই সময় কাঞ্চন দেখলো স্নিগ্ধের ঘর খোলা। লাইট জ্বলছে। কাঞ্চন তাকবীরকে বললো,

“সিমেন্টের বস্তা এসে পড়েছে?”
“না দেখি নি তো!”
“আমাদের ঘরের লাইট জ্বলছে!”
“চোর?”
কাঁপা স্বরে বললো পৃথুলা। পৃথুলার বুক কাঁপছে। ধীর পায়ে তিনজন রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। দরজাটা খুলে “চোর” “চোর” বলে চিৎকার করতেই যাবে অমনি স্নিগ্ধ তীর্যক চোখে তাকালো তাদের দিকে। স্নিগ্ধর গায়ে জামা নেই। তার পেটের কাছে একটা সতেজ কাঁটা। তা থেকে রক্ত পড়ছে। সে সেই ক্ষত পরিষ্কার করছিলো। কাঞ্চন একদৃষ্টিতে তার ক্ষতের দিকে তাকিয়ে রইলো। স্নিগ্ধ তখন ই হিম গলায় শুধালো,
“এই তোদের গ্রুপ স্ট্যাডি!”
পৃথুলা উত্তর দিতেই যাবে অমনি রিদম এবং ইকরামের চিৎকার কানে এলো,
“চোর, চোর, চোর!”
পৃথুলাও চিৎকার করে উঠলো,
“চোর, ধরা পড়েছে।”

স্নিগ্ধ দ্রুত একটা টিশার্ট গায়ে গলিয়ে তার গানটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। কাঞ্চন, পৃথুলা এবং তাকবীরও তার পিছনে ছুটলো। দ্বিতীয় তলার শেষ মাথায় চোর ধরা পড়েছে। রিদম তাকে অঞ্জনার গায়ে মুড়ানো চাদরটা দিয়ে পেঁচিয়ে ইচ্ছে মতো মারছে,
“শালা চুরি করার সময় পাও না। আজকে আমার ব্রাজিলের বিয়ে আজকেই তোমার চুরি করতে হবে৷”
বলেই ইচ্ছে মতো মারছে। পটনভী মঞ্জিল নড়ে চড়ে উঠেছে। প্রায় সব ঘরে লাইট জ্বলে উঠেছে। সবাই উঠে গেছে। বড় চাচা এসেই বললো,
“মুখটা খোল, চাঁদবদনটা দেখি!”
মেজো চাচা বললেন,
“এটাকে আম গাছে বেঁধে মারা উচিত। কি সাহস আমাদের পটনভী মঞ্জিলে চুরি করতে আসে!”
স্নিগ্ধ এসে বললো,
“সর তোমরা। মুখটা দেখি। আমি পুলিশে কল করেছি।”
যেই চাঁদরটা সরানো হলো অমনি সবার চোখ ছানাবড়া। এ তো চোর নয় বরং সানিয়া। সে নীরবে, আড়ালে ফোনে কথা বলতে এসেছিলো নিজের হবু বরের সাথে। সানিয়াকে দেখেই রিদম বললো,
“ছি: ছি: পটনভী বাড়ির মেয়ে হয়ে কি না তুই চুরি করতেছিস!”
সানিয়ার অবস্থা বেগতিক। চুল এলোমেলো, বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। তার সারা গায়ে ব্যাথা। তাই দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললো,

“চুপ কর, স্টুপিড। আমি চোর হব কেন? আমি তো এখানে কথা বলছিলাম। উফফ, আমার গা ব্যথা করে দিলি।”
কাঞ্চন, পৃথুলা, অঞ্জনা মিটিমিটি হাসছে। বড়চাচা খেঁকিয়ে উঠে বললো,
“তোরা মানুষ হবি না। রাত বিরাতে সবার ঘুম নষ্ট করেছিস। কার মাথায় এই চোরের চিন্তা এসেছে?”
“কাঞ্চন!”

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১১

তাকবীর এটা বলতেই সানিয়া ক্ষেপে তাকালো কাঞ্চনের দিকে। রাগী স্বরে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
“আমি জানতাম, এটা এই ফাজিলের কাজ। ও ইচ্ছে করে এগুলো করেছে!”
কাঞ্চন নিজের পক্ষে কিছু বলার আগেই একটা চিৎকার শোনা গেলো। চিৎকারটা বড়ফুপুর ঘর থেকে এলো……

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here