ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৬
মুশফিকা রহমান মৈথি
অপারেশন থিয়েটরের বাহিরের বেঞ্চিতে ক্লান্ত, নিস্তেজ শরীরে বসে আছে কাঞ্চন। ভেতরে স্নিগ্ধের অপারেশন চলছে। এখনো ডাক্তার বের হন নি। কাঞ্চনের মুখ বিমর্ষ। চাহনি মূর্ছিত। হাতে সাদা ব্যান্ডেজ। ঠোঁটের কাছটায় একটা ছোট ট্যাপ। শরীরটা ভেঙ্গে আসছে। তার মনে হচ্ছে সে অনেকটা পথ হেটেছে। পাগুলো ক্লান্ত। শরীরের থেকেও বেশি ক্লান্ত মনটা।
আজকের দিনটা তার স্মৃতির সবথেকে বিশ্রী একটা দিন। কাঞ্চন এডভেঞ্চার পছন্দ করে, থ্রিল, উত্তেজনা তাকে আনন্দ দেয়। কিন্তু ওই গোলাগোলির মুহূর্ত, স্নিগ্ধের নির্মমভাবে একটা মানুষকে শ্যুট করা, অতঃপর নিজে গুলি খাওয়া প্রতিটা দৃশ্য তাকে পীড়া দিচ্ছে। মস্তিষ্কে তীব্র ভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। স্নিগ্ধকে যখন গুলি করা হলো কাঞ্চনের হৃদয় মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিলো। স্তব্ধ মূর্তি হয়ে গিয়েছিলো সে। পুরোটা রাস্তা এম্বুলেন্সে সে স্নিগ্ধের হাত ধরে ছিলো। লোকটার জ্ঞান তখনও ছিলো। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো কাঞ্চনের দিকে। দৃষ্টিটা গাঢ়, নরম, বিচিত্র। মানুষটা এমন পাগলামি কেন করছে তার মাথায় আসে নি। পটনভী পরিবারের বাহিরে তার একটা অন্যরুপ আছে সেটারও সাক্ষী হয়েছে কাঞ্চন। স্নিগ্ধের সেই ভয়ংকর রুপটাও হজম করতে পারছিলো না। তার চোখে কোনো মায়া ছিলো না ঐ মুহূর্তে। সবকিছু মিলে কাঞ্চনের গা থরথর করে কাঁপছিলো।
হাসপাতালে আসার পর-ই কাঞ্চন বমি করেছে। লটকনের মাটিতে লুটিয়ে পড়া ঘিলু ছিটকে যাওয়া, রক্তাক্ত দেহটার দৃশ্য তার মাথায় ছেঁপে আছে যেন। বমি করার ফলে চোখ মুখ একেবারেই বসে গেছে। হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে তাদের আনার পর স্নিগ্ধকে অপারেশন থিয়েটরে ঢোকানো হয়েছে আর কাঞ্চনের হাতের চিকিৎসা করা হয়েছে। হাতটা ব্লেডে বিশ্রীভাবে কেঁটেছে। ডাক্তার ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন কাঁটা অংশে। তাকে ড্রেসিং করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। হাত ভেজানো একেবারেই নিষিদ্ধ। একটা বমির ইঞ্জেকশনও দিয়েছে তাকে। জোর করে একটা স্যান্ডুইচ ধরিয়ে দিয়েছেন নার্স। কিন্তু সেটা এখনো কাঞ্চনের হাতেই ধরা।
স্নিগ্ধের তিন জন কলিগ করিডোরে উপস্থিত। পটনভী মঞ্জিলে ফোন করা হয়েছে। আয়েশা পটনভী ছেলের আহত হবার খবরে হুক্কা হুয়া শুরু করেছেন। চিৎকার করে বলেছেন,
“সব কটার নামে আমি মামলা ঠুকবো।“
তাকে বোঝানো হয়েছে অতিকষ্টে। তবুও কিন্তু শুনেন নি। তিনি বলেছেন,
“আমরা এখনই আসছি!”
হেডকোয়ার্টার এবং ব্যারাকে রিপোর্ট চলে গেছে। স্নিগ্ধের কলিগদের মধ্যে খুব একটা ভাবাবেগ নেই। কারণ এমন ঘটনা নতুন নয়। একজন কাঞ্চনের উদ্দেশ্যে বললো,
“ভাবী, কফি খাবেন?”
কাঞ্চন মাথা নাড়ালো। তার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। ক্ষুধা লেগেছে কিন্তু ইচ্ছে করছে না কিছু খেতে। কলিগেরা তাকে সান্ত্বনা দিতে বললেন,
“ভাবী ডোন্ট ওয়ারি, গুন্ডা উইল বি অলরাইট!”
কথাটা মিথ্যে নয়। স্নিগ্ধর ক্ষত গভীর, তবে খুব গভীর নয়। বুলেটপ্রুফ ভেস্ট ছিলো তার গায়ে। বুলেটটা তার পেট ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে। খুব চতুর ভাবেই শ্যুট করে হয়েছে যেন কোনো ড্যামেজ না হয়। আবার রিপোর্টে গুরুতর আহত লেখা যায়। স্নিগ্ধর অর্ডার ছিলো সে কাউকে শ্যুট করতে পারবে না। কিন্তু আত্মরক্ষা করতে পারবে না এমন কোনো অর্ডার ছিলো না। যতক্ষণ না তার উপর আক্রমণ হয়, সে তার বন্দুক চালাবে না। তাই যখন সে লটকনকে এনকাউন্টার করলো পরমুহূর্তে ইচ্ছেকৃতভাবেই নিজের গায়ে গুলি খেলো। এতে করে তাকে যদি জবাবদিহিও করা হয় সে নির্দ্বিধায় নিজের স্বপক্ষে উত্তর দিতে পারবে। বিষয়টা কলিগদের জানা। কিন্তু কাঞ্চন এই সূক্ষ্ণ, নিপুণ পরিকল্পনার কিছুই জানে না।
ডাক্তার বলেছিলেন, স্নিগ্ধের অপারেশনটা অনেক ছোট। বুলেট ছুঁয়ে যাওয়ায় ইন্টারনাল ড্যামেজ হয় নি। ভেস্ট পরে থাকায় খুব একটা ব্লাড লস বেশি হয় নি। তবুও ডাক্তারের বের হতে দেরি হচ্ছে। কাঞ্চন নির্জীব চোখে তাকিয়ে রয়েছে অপারেশন থিয়েটারের দিকে। তার অসহ্য লাগছে এই বেঞ্চে বসে থাকতে।
অপারেশন থিয়েটরের এই বেঞ্চিটা অনেক বেশি বিষাদময় এবং তিক্ত লাগে কাঞ্চনের। এখানে একবার বসেছিলো যখন তার বয়স পাঁচ বছর। স্মৃতিগুলো খুব ঘোলাটে হলেও সেই তিক্ত অনুভূতিটা এখনো মস্তিষ্কে ছেঁপে আছে। কাঞ্চনের আবছা স্মৃতিতে মনে আছে মেহরিনের ইউট্রাসে একটা টিউমার হয়েছিলো। সেই টিউমারটা ধরা পড়তেই দাদাজান তাকে হাসপাতালে ভর্তি করান। কিছুদিনের মধ্যেই অপারেশন হয়। সেই সময় ছোট কাঞ্চন বসেছিলো এই বেঞ্চিতে। অপেক্ষা করছিলো মা কখন ফেরত আসবে। মা ফেরত এলেন বটে, কিন্তু সুস্থ হয়ে নয়। মাস খানেকের মধ্যে ধরা পড়ে অপারেশন করায় ক্যান্সার জীবাণু সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। তাও থার্ড স্টেজ। টিউমারটা অনেক বড় ছিলো। এতো বড় টিউমার অজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা অপারেশন করা উচিত হয় নি। মেহরিনকে যে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয় নি এমনটা নয়। কিন্তু মেহরিনের মধ্যে বাঁচার তাগিদা ছিলো না। যখন ইন্ডিয়া নিয়ে যাওয়া হলো তাকে ডাক্তাররা হাত তুলে দিলেন। একটা বছর অমানবিক যন্ত্রণা সহ্য করেছে সে। বিছানায় শুয়ে কাঁতরাতো। কাঞ্চন তার কাছে এসে দাঁড়ালে কষ্টে মূর্ছিত চোখে তার দিকে তাকাত। যন্ত্রণা গিলে ব্যথিত হাসি ঠোঁটে ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“খেয়েছো মা?”
স্মৃতিগুলো আবছা কিন্তু সেই বিমর্ষ হাসিটা এখনো মনে আছে কাঞ্চনের। সালমান পটনভীকে সে কখনো দেখে নি। কিন্তু অব্যক্ত একটা ঘৃণা কাজ করে লোকটির প্রতি। জন্মদাতা এতো নিষ্ঠুর কেন হলো? তার জীবনে কি একটুও ঠাঁই ছিলো না মায়ের?
অপারেশন থিয়েটরের লাইটটা বন্ধ হলো। ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। স্নিগ্ধের কলিগরা এগিয়ে গেলো। সেই সাথে কাঞ্চনও। ডাক্তার খুব আশ্বস্ত গলায় বললেন,
“উনি ভালো আছেন, ইন্টারনাল ড্যামেজ হয় নি। ব্লাড লস খুব বেশি হয় নি। তবে তার রেস্ট প্রয়োজন। এর আগেও উনি অনেকবার আহত হয়েছেন। এক মাস ফুল রেস্টে থাকলে আগামীতে কোনো ঝামেলা হবে না। কয়েকদিন থাকুন হাসপাতালে। সেলাই খোলা হলে আমরা ডিসচার্জ দিব।”
ডাক্তারের কথাটা শুনতেই কাঞ্চনের গলা থেকে যেন ভার নেমে গেলো। কাঞ্চনের শরীর ছেড়ে ছিলো। সে ধপ করে বেঞ্চে বসে পড়লো। ডাক্তার চলে যাওয়ার পর স্নিগ্ধের কলিগ ক্যাপ্টেন মুত্তালিব শাওন কিছুটা মজার ছলে বললো,
“সরফরাজ পাগলাটে জানা ছিলো কিন্তু ওয়াইফের প্রতি এতোটা অবসেসড জানা ছিলো না। আমার মনে হচ্ছিলো আমি কোনো সিনেমার ড্রামাটিক সিন দেখছি। কি জানে একটা লাইন আছে না, “i will burn the world for you””
মুত্তালিবকে থামিয়ে দিলেন ক্যাপ্টেন কাইয়ুম শাহেদ। পুরুষটি বেশ ভারপুক্ত। অহেতুক মজা করাটা এড়িয়ে যায়। কাঞ্চনের উদ্দেশ্যে বললো,
“ইগ্নোর দেম ভাবী। আপনার রেস্টের প্রয়োজন। আমরা এখানে আছি। আপনি না হয় বাসা থেকে ঘুরে আসুন।”
স্বল্প করে ঠোঁট নাড়িয়ে কাঞ্চন উত্তর দিলো,
“না, ফুপুরা এখনই আসবেন।
কথাটা বলতে দেরি হলো কিন্তু পটনভীদের আসতে দেরি হলো না। হুরমুড়িয়ে ঢুকলো মোট তেরোজন পটনভী। জুলফিকার পটনভী, কাঞ্চনের বড় চাচা, মেজোচাচা, ফরহাদ চাচা, অঞ্জনার বাবা, বড় ফুপু, তাকবীর, রিদম, পৃথুলা, অঞ্জনা, তাশদীদ, ইকরাম এবং সানিয়া। এতো গুলো মানুষের আগমণে গমগম করে উঠলো অপারেশন থিয়েটরের করিডোর। আয়েশা পটনভী এসেই পুত্রবধূকে জড়িয়ে ধরলেন। অসংখ্য চুমু এঁকে বললেন,
“তুই ঠিক আসোস তো! জানোস কি ভয় পাইছিলাম আমি। আমার আত্মা খাঁচা ছাড়া হয়ে গেছিলো। দামড়াটারে কতবার বললাম, এই চাকরি ছাড়, ছাড়। শুনলোই না। ওর এই ছাতার চাকরির জন্য আমার মাইয়াডারে কি কষ্ট করতে হইলো। মাইরে কি করছে মুখটা!”
ফুপুর উষ্ণ আদরটা এতোটাই সংবেদনশীল ছিলো যে এতোসময় শুষ্ক চোখে বসে থাকা কাঞ্চন নিজেকে আর সামলাতে পারলো না। তার ঠোঁট কাঁপতে লাগলো। চোখ টলমল করে উঠলো। গা কাঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে,
“ফুপু আমার খুব ভয় লাগতেছিলো। ওরা খুব খারাপ। জানো, ওদের কাছে অনেক অস্ত্র ছিলো। ওরা বলছিলো আমাকে মেরে ফেলবে!”
কান্নার দমকে কথাগুলো জড়িয়ে যেতে লাগলো। আয়েশা পটনভী নিজের পুত্রবধূকে জড়িয়ে ধরলেন। ঠিক কতটা সময় মেয়েটা তার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকলো তার হিসেব নেই। অঞ্জনা এগিয়ে এসে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
কাঞ্চনের অবস্থা দেখে সবথেকে বেশি অনুশোচনাতে ভুগলো পৃথুলা। কাঞ্চনের গাল একপাশ ফুলে আছে। ঠোঁটের নিচে কালো হয়ে গেছে রক্ত জমাট বেঁধে। সে ওই সময় মোবাইলটা সাইলেন্ট না করে রাখলে ঠিক টের পেতো যে কাঞ্চন ফোন করছে। ফোনটা ধরলেই কাঞ্চনের সাথে কথা হত। ওই মুহূর্তে কাঞ্চনের কি অবস্থা ছিলো ভাবতেই গা শিউরে উঠলো। পৃথুলার মুখটা নত হয়ে গেলো। সবাই কাঞ্চনকে সান্ত্বনা বা সাহস দিলেও পৃথুলা এগুতে পারলো না। কথা বলার সাহস হলো না তার। তার গ্লানিতে আচ্ছন্ন চোখজোড়া কেউ না দেখলেও, তা দৃষ্টি এড়ালো না রিদমের। মেয়েটা যে আস্তে করে সবার মধ্য থেকে সরে এক কোনায় যেয়ে দাঁড়ালো ঠিক দেখলো সে।
পোস্ট অপারেটিভ রুমে স্থানান্তর করা হলো স্নিগ্ধকে। তার জ্ঞান ফিরে নি। কলিগেরা বিদায় নিলো। কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে কাঞ্চন। মাথাটা টনটন করছে। ঠোঁটের কাঁটা স্থান জ্বলছে। পেইন কিলার হিসেবে শুধু প্যারাসিটামল খেতেই বলেছে। জুলফিকার পটনভী আদেশের সুরে ভারী গলায় বললেন,
“এখন তো আলহামদুলিল্লাহ সব ঠিক আছে। আমরা বাসার দিকে যাই। কালকে সকালে স্নিগ্ধকে কেবিনে দিবে ওরা। আমরা কালকে সকাল সকাল না হয় চলে আসবো। রিদম আর তাশদীদ আজকে রাতটা এখানে থাকো। কোনো প্রয়োজনে ফোন কর!”
রিদম আর তাশদীদ একে অপরের দিকে চাইলো। তাশদীদ চোখের মাধ্যমে তাকে ইশারা করলো যেন এই রাতের বেলায় তাদের হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে না কাটাতে হয়। ফলে রিদম ফট করে বললো,
“নয়া দাদাজান, আমরা এই করিডোরে কি করে থাকবো? আই মিন ঘুমাবো কি করে? আমরা তো কিছু নিয়ে আসি নি।”
“যেভাবে মানুষ ঘুমায় সেভাবে। শুয়ে যাবে বেঞ্চে! ঘোড়ার মতো ঘুমাতে চাইলেও কোনো সমস্যা নেই”
স্নিগ্ধ ভাইয়ের প্রতি এতোটাও দরদ নেই এই দুজনার। ফলে তাশদীদ ইতস্তত স্বরে বলে উঠলো,
“মশা কামড়াবে, দাদাজান!”
“মশার কয়েল কিনবে!”
“এই বেঞ্চে মাজা ব্যাথা হয়ে যাবে।”
“হাসপাতালে আছো, ব্যাথা হলে ডাক্তার দেখিয়ে নিও।”
“স্নিগ্ধ ভাই তো হাই কেয়ারেই আছেন। এখানে আমাদের কি কাজ! আমরা তো ডাক্তার না।”
জুলফিকার পটনভী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইলেন দুই নাতীর দিকে। কিছুক্ষণ মৌন থেকে ভ্রু কুঞ্চিত করে গম্ভীর রাশভারী গলায় বললেন,
“তোমাদের যদি এতো সমস্যা হয় তাহলে তাকবীর আর ইকরাম থাকবে। তবে মনে রেখো সামনের মাসের পকেট মানির বিল পাশ করার সময় আমারও সমস্যা হবে।”
রিদম এবং তাশদীদ একপ্রকার বাধ্য হয়ে রাজী হলো। ব্যগ্র গলায় বলে উঠলো,
“না না, আমরা থাকছি।”
রিদম এবং তাশদীদের আমের মতো চুপসে যাওয়া মুখজোড়া দেখে অঞ্জনা বিদ্রুপ করে রিদমকে বলল,
“আহারে! সামান্য টাকার জন্য কি না এখন বেঞ্চে ঘুমাবি। ইশ! তোর জন্য একটা প্রবাদ বানিয়েছি,
“সঙ্গদোষে ভাগ্য ভাসে”
বলেই তাশদীদের দিকে তাকে আক্ষেপ করে চ সূচক শব্দ করলো। তাশদীদ দাঁত কিড়মিড়িয়ে তাকালো অঞ্জনার দিকে। কিন্তু অঞ্জনা তার ক্ষুব্ধ দৃষ্টিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জিভ বের করে ভেঙ্গালো। তারপর হিনহিনে গলায় বললো,
“একে বলে আল্লাহর বিচার। আমার বদদোয়া না লাগে। আগামীবার থেকে আমাকে বিরক্ত করতে এসো না কেমন।”
বলেই এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না। নিজের বাবার কাছে ছুটে চলে গেলো। ফরহাদ পটনভী ড্রাইভারদের ফোন করলেন। মোট দুটো গাড়ি নিয়ে এসেছেন তারা। সবাই একে একে গাড়িতে উঠতে শুরু করলো। কাঞ্চনের চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। অঞ্জনা পৃথুলাকে ডাক দিলো। পৃথুলা সেই যেই গাড়িতে উঠতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে রিদম পৃথুলার হাত টেনে ধরলো। একটা ড্রিংকোর বোতল ধরিয়ে বলল,
“এই শাকচুন্নী শোন!”
পৃথুলা মলিন চোখে তাকালো। রিদম সবার অগোচরে তার চোখ মুছে দিয়ে নরম গলায় বললো,
“লুকায়ে লুকায়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ না করে চাপামাসিকে জড়ায়ে ধর। দোষ একা তোর না। আমাদের সবার দোষ আছে। এমনেই তুই দেখতে শাকচুন্নীর মতো, কাঁদলে খবিসের মতো লাগে। আমার আমদানী ভয় পাবে।”
পৃথুলা হতভম্বের মতো চেয়ে রইলো রিদমের দিকে। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিলো সে। অঞ্জনা আবার ডাকলো,
“এই পৃথু আয়!”
পৃথুলা এক দৌড়ে গাড়িতে উঠে গেলো। তাশদীদ হতাশ গলায় বললো,
“শালা কই এসি ঘরে এমবাপ্পে আর হল্যান্ডের ম্যাচ দেখতাম তা না এখন ওই শালা র্যাবকে পাহারা দাও। আমি পাহারাদার হইতে এখানে আসছি। তাইলে তো বাপের মাথা ফাঁটার সময় ই আইতাম। ধুরু”
রিদম এক দৃষ্টিতে গাড়িগুলোর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। পৃথুলার মলিন মুখটা আজকে রাতে খুব পীড়া দিবে।
রাত গভীর। কয়টা বাজে জানা নেই। তবে কাঞ্চন ঘুমাতে পারছে না। এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করতে পারছে না সে। চোখ বন্ধ করলেই বীভৎস দৃশ্য চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। সে নিজের ঘরে যায় নি। স্নিগ্ধের ঘরে থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ হয় নি। অস্থিরতায় এপাশ ওপাশ করতে করতে উঠে বসলো সে। কি ভেবে ফোন করলো রিদমকে। রিদম ফোন ধরলো তিনবার বাজাতে,
“কিচ্ছে?”
“ঘুমাচ্ছিস?”
“না ভাই, কিতকিত খেলতেছি। রাত তিনটা বাজে চাপামাসি। কেন ফোন করছিস তুই?“
কাঞ্চন ইতস্তত করলো। তারপর বলল,
“না তোরা ঠিক ভাবে ঘুমাতে পারছিস কি না জানতে ফোন করলাম।“
রিদম ঘুম ঘুম স্বরে বললো,
“আমরা আরামে আছি ব্রো। মশা মনের আনন্দে দুটো ডোনারের রক্ত খাচ্ছে। আগামীকাল আমরা একশ বাচ্চা মশার জন্মের কারণ হব। আর কিছু জিজ্ঞেস করবি?”
কাঞ্চন ইতস্তত করে বললো,
“স্নি…স্নিগ্ধ ভাইয়ের জ্ঞান ফিরেছে?”
রিদম এবার চোখ মেললো। বাঁকা স্বরে বললো,
“জামাইয়ের প্রতি পীরিত জাগছে নাকি?”
“মোটেই না। রাখছি আমি।“
বলেই খট করে ফোন কেটে দিলো কাঞ্চন। গা এলিয়ে দিলো বিছানায়। রিদম হারামজাদা এখন সবাইকে বলে বেড়াবে কাঞ্চন স্নিগ্ধের খোঁজ নিতে রাত তিনটায় ফোন করেছে। ধ্যাত।
সকাল এগারোটা বাজতেই পটনভী পরিবার হাজির হলো হাসপাতালে। স্নিগ্ধের জ্ঞান ফিরেছে। তাকে এখন কেবিনে শিফট করা হবে। সেলাই না কাটা পর্যন্ত ডিসচার্জ দিবে না। আয়েশা পটনভী ছেলের শোকে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। তার কান্না দেখে তাশদীদ ফিসফিসিয়ে বললো,
“ফুপু কি আজকেই কান্নার ডোজ কমপ্লিট করে ফেলবে?”
“অনেক দিন কাঁদে না তো। চোখ পরিষ্কার করাও দরকার।“
মাঝ থেকে অঞ্জনা রাগী স্বরে বললো,
“তোদের উপর আল্লাহর গজব পড়বে। মা হইছিস জীবনে?”
“এমনে বলিস না, মা হইতে পারুম না ঐ ফিচার নেই। কিন্তু আমদানীর বাপ আমি হবই।“
রিদমের কথা পিঠে তাশদীদ হিসহিসিয়ে বললো,
“মা না হতে পারি, বানাতে পারবো। বিল্লি, আমার বাচ্চার মা হবি?”
অঞ্জনা কঠিন চোখে তাকাতেই তাশদীদ চোখ টিপ্পনী কাটলো। রফিকুল্লাহ চাচার ছেলে এতো জঘন্য কি করে হলো।
ঘরে মানুষ গিজগিজ করছে। নার্স এসে দুবার ওয়ার্নিং দিয়েছেন। কিন্তু কেউ শুনেন নি। ফলে স্নিগ্ধকেই বাধ্য হয়ে বলতে হলো,
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৫
“তোমরা বাসায় যাও। আমি ঠিক আছি এখন।“
“আমরা বাসায় গেলে এখানে তোর সাথে কে থাকবে?”
আয়েশা পটনভীর প্রশ্নে খুব নির্লিপ্ত ভাবে উত্তর দিলো স্নিগ্ধ,
“আমার ওয়াইফ থাকবে। এই মুহূর্তে আমার শুধু আমার ওয়াইফকেই প্রয়োজন।“
