Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২০

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২০

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২০
মুশফিকা রহমান মৈথি

“আমার হালাল ওয়াইফ আমার কাছে থাকলে আমার সব কব্জা নড়ে যায়। It’s hard to control”
কাঞ্চন থমকালো। হৃদয়টা হুট করেই ধক করে উঠলো। অথচ সরফরাজ পটনভীর খুব একটা ভাবান্তর হলো না। তার মুখশ্রী বিকারহীন। কণ্ঠ স্বাভাবিক কিন্তু গাঢ়। স্নিগ্ধের গলার স্বর বরাবরই ভারী, মোটা। তবে আজ খুব বেশী ভারী লাগছে। তাকে আস্তে করে কথা বলছে বিধায় এমন পুরোনো ওয়াইনের মতো মাদকতা ছড়াচ্ছে? কাঞ্চন তার চোখের থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। এই লোকের চোখের দৃষ্টি ভীষণ ভয়ংকর লাগছে। কুচকুচে কালো চোখজোড়া শান্ত সরবরের মতো কিন্তু তলহীন গভীর। যখন তখন ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
কাঞ্চন নিজের বালিশটা বগলের নিচে নিয়েই উঠে যেতে নিলো। সাথে সাথেই স্নিগ্ধ তার হাত খপ করে ধরে বললো,

“যাচ্ছিস কোথায়?”
“আমি সারারাত ঘোড়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকবো তাও তোমার মতো ফাজিল আর অসভ্য লোকের সাথে এক বিছানায় থাকবো না।”
স্নিগ্ধ হাসলো যেন। তার হাতটা একটু টেনে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে মৃদু স্বরে বললো,
“ভয় পাস নাকি? আমি রাতের বেলায় এই কাঁটা পেট নিয়ে তোকে কামড়ে ধরবো?”
“তোমার কি ভরসা!”
“আমি যেদিন কামড়াবো, একেবারে তোর সবটুকু শুষে নিব। আমি নেকড়ের মতো শিকার করি না। সিংহের মতো করি।”
কাঞ্চন মাথা নুইয়ে গা দুলিয়ে হাসলো। টিটকারির ছাপ তার হাসিতে। গলা খাঁদে নিয়ে বললো,
“ভয় দেখাচ্ছো!”
“বউকে ভয় দেখানোর মত পাপ আমি করতে পারি? ছিঃ ছিঃ”
“নটকা পুরুষ কোথাকার! সিংহের মুখের থেকে যেভাবে শিকার পালায়, আমিও তোমার মুখের ভেতর থেকে পালাবো!”
“আমি তোকে খুঁজে নিবো। একটাই তো বউ আমার, তাকে নিজের কাছে বেঁধে না রাখতে পারলে কি পুরুষ হলাম!”

তীব্র আত্মবিশ্বাস ঠিঁকড়ে উঠলো স্নিগ্ধর কণ্ঠে। কাঞ্চন উঠে যেতে নিলো। অথচ তার হাত এখনো স্নিগ্ধের হাতের মধ্যে বাঁধা। ফলে উঠতে পারলো না। স্নিগ্ধ নরম স্বরে বললো,
“কিছু করবো না, প্রমিস। এখানেই ঘুমা। তুই ক্লান্ত তোর ঘুমের প্রয়োজন।”
“আমাকে নিয়ে তোমার না ভাবলেও হবে।“
কটাক্ষ করে কথাটা বলেই কাঞ্চন ভুট হয়ে শুয়ে পড়লো। স্নিগ্ধ কোনো প্রত্যুত্তর করলো না বরং শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো। অন্তঃস্থল থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। রাত গভীর থেকে গভীর হচ্ছে। একটা সময় কাঞ্চনের শ্বাস ভারী হয়ে গেলো। স্নিগ্ধ খুব সতর্কতার সাথে তাকে বুকে মিশিয়ে নিলো। সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুমে কাঁদা কাঞ্চন। স্নিগ্ধ ধীর স্বরে বললো,
“আমি ছাড়া তোকে নিয়ে ভাবার কেউ নেই শ্বেতকাঞ্চন।“
সকালবেলা কাঞ্চনের ঘুম ভাঙ্গলো নার্সের টোকায়। ঘুম তার বরাবর ই প্রচন্ড গাঢ়। অঞ্জনার ভাষায়,
“তোর পাশে কেউ মরে পড়ে থাকলেও তুই টের পাবি না। এমনে ভেটকি মাছের মত ঘুমায় কি করে মানুষ?”
অথচ হাসপাতালের এই কয়েকদিনে কাঞ্চনের ঘুমের মধ্যে একটা ব্যতিক্রম এসেছে। ঠিক সকাল ছয়টা নার্স আসে স্নিগ্ধকে ঔষধ দিতে। কাঞ্চন নার্সের সামান্য টোকায় সেই সকালেই উঠে পড়ে। রোগীর যত্ন নেওয়া চারটেখানি কথা নয়। তার উপর যদি রোগী হয় সিমেন্টের বস্তা, তবে তো কথাই নেই। একবিন্দু বসার উপায় নেই। নবাব সাহেবের ফাইফরমাশের অন্ত হয় না। একবার বাড়ি যাক, টানা এক সপ্তাহ ঘুমাবে সে। তখন আর কাউকে দেখবে না। ডাকলেও উঠবে না।

চোখ মেলতেই একটা বড়োসড়ো ধাক্কা খেলো কাঞ্চন। নাকে এসে ভিড়লো স্নিগ্ধর গায়ের গন্ধ। সে রীতিমত স্নিগ্ধকে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছিলো। স্নিগ্ধের এডামস আপেলের সাথে নাক ঘষে ছিলো সে। স্নিগ্ধের বলিষ্ট বামহাতটা তার চুলের ভেতর। স্নিগ্ধ তখনও ঘুম। কাঞ্চন লজ্জা, রাগে লাল হয়ে উঠলো। রাগটা নিজের উপর। সে জানতো তার ঘুমের কোনো ছিড়ি নেই। উলটা পালটা যেমন মর্জি সে ঘুমায়। তাই বলে শত্রুকে এভাবে জড়িয়ে ঘুমাবে। নিজের পায়ের দিকে খেয়াল করলো সে, না পা গায়ে তুলে দেয় নি। ভাগ্যিস। নয়তো স্নিগ্ধের সেলাই ফুটো হয়ে যেত। নার্স আবার ব্যস্ত ভঙ্গিতে কড়া নাড়ছে। কাঞ্চন একপ্রকার ছিঁটকে উঠে বসলো। স্নিগ্ধ নড়েচড়ে উঠলো। কপালে ভাঁজ পড়লো। কিন্তু চোখ মেললো না।
কাঞ্চন দরজা খুললো। নার্স এসে দাঁড়িয়ে আছেন অনেক সময়। হাই তুলছেন ঘুমে। দরজা খুলতেই তিনি প্রবেশ করলেন। কাঞ্চনকে বললেন,

“উনাকে উঠান, ক্যানোলা করবো।“
“আবার?”
“তিন হয়ে গেছে ম্যাডাম। স্যার দশটায় আসবেন। সেলাইয়ের পজিশন দেখে কবে খুলবেন তার ডিসিশন নিবেন। উনার ঔষধগুলো দেখিয়ে দিব। নাস্তা করিয়ে খাইয়ে দিবেন। আর কি জ্বর এসেছিল?”
কাঞ্চন মাথা নাড়ালো। সে এগিয়ে গিয়ে স্নিগ্ধকে ডাকলো,
“স্নিগ্ধ ভাই, স্নিগ্ধ ভাই?”
স্নিগ্ধ এবার চোখ খুললো। ঘুম জড়ানো স্বরে বললো,
“কি?”
“ক্যানোলা করবেন। উঠো।“
“করে বিদায় হতে বল।“

বলেই হাত বাড়িয়ে দিল। নার্সরা এই রোগীর উপর বিরক্ত। লোকটি অত্যন্ত দেমাগী। কোনো নার্সের কিছুই তার পছন্দ না। বিশেষ করে হাতের শিরায় সুই ফোঁটানোর সময় খুব রেগে যান। স্নিগ্ধের শিরা ফোলা ফোলা। নার্স খুব সতর্কতা দেখায় যা এই লোকের একটুও পছন্দ নয়। এবারও মেয়েটা খুব সাবধানতা অবলম্বন করতে চাইলো। কিন্তু এই খচ্চর রোগীর তার ক্ষোভ জাহির করতে পিছপা হলেন না। রোবটের মতো ভারী স্বরে বললো,
“আপনাকে নার্স বানিয়েছে কি দেখে? একটা সুই ফোঁটাতে এতো সময় লাগে?”
“দেখুন শিরার ব্যপার, উলটোপালটা হয়ে গেলে ভুগতে আপনার হবে। আমাকে আমার কাজ করতে দিন।“
“অকর্মণ্যদের রাখলে এমন ই হয়।“

স্নিগ্ধের ভাব দেখলেই কাঞ্চনের গা কিড়মিড় করে। নবাবী ভাবের দমকে তার মাটিতেই যেন পা পড়ে না। অসহ্য লোক একটা। কাঞ্চন না পেরে স্নিগ্ধর হাতে একটা ধাক্কা দিলো। ধাক্কা খেয়ে স্নিগ্ধ তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই কাঞ্চন চোখ গরম করে তাকালো। যদি কাউকে চোখের দৃষ্টিতে ভস্ম করা যায় তবে সে স্নিগ্ধকে করতো। নার্স খুব সাবধানে ক্যানোলা বদলালো। এন্টিবায়োটিক ঔষধটা ক্যানোলায় লাগিয়ে স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে সে বেরিয়ে গেলো। নার্স যেতেই কাঞ্চন কঠিন গলায় বললো,
“তোমার সমস্যা কি? এতো রওয়াব ঝাড়ো কেনো সবার সাথে!”
“ওই মেয়েটা একটা আস্তো বেহতার। বেহতারদের সাথে এভাবেই ব্যবহার করতে হয়।”
“হ্যা, তুমি তো খুব হতার!”
স্নিগ্ধ ঘাড় বাঁকিয়ে তীর্যক দৃষ্টিতে তাকালো কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চন চোখ কুঁচকে শুধালো,
“কি?”
“তুই ঘরের শত্রু বিভীষণ।”
“ঘরের না তোমার শত্রু!”
“মাই সল্টি এনিমি!”

সকাল এগারোটায় প্রীতির ঘরে কাজিনমহলের জরুরি সভা বসলো। “পটনভী’স নিউ জেনারেশন” গ্রুপে সবাইকে ট্যাগ করে প্রীতি লিখলো,
“সকাল এগারোটায় মিটিং। বিষয়: আমার হলুদ। যারা আসবে না তারা কেউ আমার হলুদ এবং বিয়ের বিরিয়ানি পাবে না”
সাথে সাথে ম্যাসেজটা কপি করে ইকরাম “নেই কাজ তো পটনভী ভাঁজ” গ্রুপে সেন্ড করলো। অমনি এক্টিভ থাকা পটনভীগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়লো। তাবাসসুম লিখলো,
“ও কোন জায়গায় নবাব যে ওর হুকুম মানতে হবে? একে ভেগে বিয়ে করেছিস, তোকে যে মেনে নিয়েচহে সেই খুশীতে হুজুর, জি হুজুর করা উচিত ওর। তা না করে কি পার্ট দেখাচ্ছে!”
মোট ১৬ টা হাহা পড়লো। রিদম ম্যাসেজে লিখলো,

“বেটি কি না বিরিয়ানির ব্লাকমেইল করলো! মনে হচ্ছে বিরিয়ানি ওর বাপের!”
পৃথুলা টাইপ করলো,
“বাপের-ই বিরিয়ানি। রান্না হবে তো পটনভী ব্রান্ডের মশলা দিয়ে।”
“চুপ কর শাকচুন্নী। ওই মশলাতে আমার বাপেরও অধিকার আছে। তাই বিরিয়ানিতে আমারও অধিকার আছে। সবার অধিকার আছে!”
তাশদীদ লিখলো,
“বেশি বকো না ব্রো! একেই বিয়েতে কামলা দিবো। বিরিয়ানি না পেলে হবে না। তাই চলো দেখি আমাদের ডেইলি সোপ নায়িকা কি চায়।”
“ওয় কি স্টেজ বাদ দিয়ে বিরিয়ানির হাড়ি পাহাড়া দিবে?”
“বিয়ে তো হয়েই গেছে এখন তো কবুল পড়ার প্যারা নেই। হতেই পারে প্রীতি আপু বিরিয়ানির থালার উপর বসে থাকবে। জাস্ট ভাব নিজের বরকে একটা গামছা পড়ায়ে বিরিয়ানি পাহাড়াতে বসিয়ে দিলো!”
অঞ্জনা লিখলো,
“এতো বকর বকর না করে গিয়ে দেখলেই হয়!”
তাকবীর বললো,

“প্রীতির আপুর ভরসা নেই, ও দেখা যাবে দাদাজানের কাছে বিচার দিলো। অহেতুক ঝামেলা!”
“কি বিচার দিবে? আমাকে কেউ পছন্দ করে না, উউউউউউউ।”
তাশদীদের ম্যাসেজে ১৯ টা হাহা পড়লো। অবশেষে বাধ্য হয়েই প্রীতির ঘরে জড়ো হলো সব কয়টা। সবার মুখে অনিচ্ছার ছাপ। ঘর গমগম করছে। বাচ্চা থেকে শুরু করে মোট তেরোজন এখানে উপস্থিত। রিদম বিরক্ত স্বরে বললো,
“এবার নবাবজাদী ফরমাইশ করুন। আমরা দাসেরা প্রস্তুত।”
তাশদীদ দু পা ফাঁক করে বিছানায় গা এলিয়ে বসলো। তার বসার ভঙ্গি দেখেই অঞ্জনার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। ছেলেটার বিন্দুমাত্র কোনো ম্যানারস নেই। এই ছেলে কিছুদিন পর পটনভী বংশের হোতা হবে। রাগেই গা কিড়মিড় করে উঠলো তার।
প্রীতি একটা চেয়ার টেনে বসলো। একদম রানীর মতো লাগছে তাকে। বিয়ের জন্য মনে হয় জেল্লা দ্বিগুণ হয়েছে। সানিয়া আগ্রহের সাথে বললো,

“বলো, প্রীতি আপু।”
“আমার হলুদ নিয়ে তোদের কোনো প্রিপারেশন দেখছি না কেন?”
প্রীতির কথায় একটা জেরা ছিলো। তাশদীদ বেপরোয়া স্বরে বললো,
“তোমার হলুদ নিয়ে আমরা কি করবো? আমরা তো হলুদ বাটবো না। হলুদ হলুদের মতো হবে!”
“তোরা নাচবি না?”
সাথে সাথেই রিদম বলে উঠলো,
“আমরা কি বাইজি? তুমি নিজেকে সত্যি সত্যি নবাবজাদী ভাবছো নাকি? তুমি বলবে, “নাচ মেরে সিমরান” আর আমরা “মার ডালা” গানে নাচতে লাগবো? তোমার প্রথম হতে যেয়েও না হওয়া বিয়েতে তো নেচেছি!”
“তখন তো আমার বিয়ে হয় নি। হয়েছে কাঞ্চনের।”
রিদম চেয়ারে গা এলিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বললো,
“কিন্তু হলুদ তো তোমার ছিলো। “আজ প্রীতি ও স্নিগ্ধের গায়ে হলুদ”। আমরা নেচেছি। উদযাপন করেছি। ব্যাস, খাতাম। এখন আর আমরা “নাচ বাসান্তি” হতে পারবো না। আর তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। এখন এসব ঢং করো না তো!”
সানিয়া খুব ক্ষেপলো। সে রাগী স্বরে বলে উঠলো,

“আজীব তো! ওর বিয়ে হয়েছে তাতে কি, অনুষ্ঠান যখন হচ্ছে সুন্দর ভাবেই হবে। আর ওর হলুদ ভাইয়ার সাথে হয়েছে। কিন্তু বিয়ে তো আফনান ভাইয়ার সাথে হয়েছে। দ্যাটস ডিফারেন্ট কেস। তোরা এতো স্বার্থপর কেন? এখানে হলুদ কি শুধু প্রীতি আপুর একার? আফনান ভাইও থাকবেন। আমরা যদি না নাচি, প্রীতি আপুর প্রথম হলুদের মতো উদযাপন না করি, আফনান ভাইয়া লেফটাউট ফিল করবে না? প্রীতি আপুর নাক কাটা যাবে।”
পৃথুলা ফট করে বলে উঠলো,
“এজন্য আমাদের মুজরা করতে হবে, তাই তো?”
“বোনের জন্য এটুকু করবি না তোরা? আমার বিয়ের অনুষ্ঠান শুধু পেছাচ্ছে আর পেছাচ্ছে। একটা প্রোপার বিয়ে কি আমি ডিজার্ভ করি না। স্নিগ্ধ ভাইয়াকে আমি পছন্দ করতাম না, তাই ঐ বিয়েতে জাঁকজমক থাকলেও আমি খুশী ছিলাম না। যখন নয়া দাদাজান বললো আমার আবার অনুষ্ঠান হবে তোরা জানিস আমি কতটা আনন্দিত ছিলাম। এই বিয়েটা নিয়ে আমার কত আশা ছিলো!”
বলতে বলতেই প্রীতির গলা ধরে এলো। চোখ ছলছল করে উঠলো। সে রীতিমত নাক টানছে। অঞ্জনা পৃথুলার বাহু চেপে বললো,

“ইশ! প্রীতি আপু কাঁদছে।“
“আসল না নকল?”
“নকল কেমনে কাঁন্দে?”
“যেমনে আমাদের চাপামাসি কান্দে।“
“ধুর, প্রীতি আপু কাঞ্চনের মতো নটাঙ্কি পারে নাকি?”
“ভাই আমার কাউকে বিশ্বাস হয় না।“
সানিয়া এর ফাঁকে বলে উঠলো,
“তোরা যদি ইফোর্ট না দিস তাহলে তোদের বিরিয়ানির প্লেট বাতিল। প্লেট গোনার দায়িত্ব চাচা আমাকে দিয়েছেন। আমি তোদের সব কয়টাকে বাদ দিয়ে দিব।“
তাশদীদ এবার উঠে বসলো। ব্যগ্র স্বরে বললো,
“ইটস নট ফেয়ার! বিরিয়ানির জন্য এখন আমাদের নাচতে হবে?“
“এই ফয়িন্নি আমাদের কি বিরিয়ানি কেনার টাকা নেই নাকি? খামুই না তোর বিরিয়ানি। ওই বিরিয়ানিতে আমি ফেরদৌস পটনভী রিদম মুতি!”
রিদম ফট করে বলে উঠলো। তার আঁতে ঘা লেগেছে। সানিয়াকে সে একেই পছন্দ করে না। চোর কান্ডে সে সেদিন ইচ্ছে করেই সানিয়াকে দু ঘা দিয়েছিলো। রিদমের কথায় তাশদীদ তাকে চেপে ধরল। মুখ আঁটকে বললো,

“ও প্রীতি আপা কান্না থামাও। আমরা নাচুম প্রমিস।“
রিদম তাশদীদের থেকে নিজেকে ছাড়াতে চাচ্ছে। অঞ্জনাও তাশদীদের সাথে রিদমকে চেপে ধরেছে। এই ছেলের সকাল থেকে মেজাজ খারাপ। রাতে আবার ব্রাজিলের খেলা আছে। তাও ওই হাল্ক মার্কা হ্যালান্ডের দলের সাথে। রিদমের মেজাজ সেকারনে আরোও খারাপ। সে বসে বসে হ্যাল্যান্ডের খেলা দেখেছে। শালা একটা দানব, যেভাবে ছুটে ওই দেখেই রিদমের আত্মা উড়ে যাবে শিওর। এর উপর থেকে প্রীতি আপুর নাটক। তার একমাত্র কাঞ্চনের নাটক সইতে মন্দ লাগে না। মেয়েটাকে বড্ড বেশি আদর করে সে। ফ্লার্টিং করার বিষয়টি রিদমের একটা অন্যতম স্বভাব। সে এটা সবসময় করে। কিন্তু সেটা বরাবরই একটা সীমার মধ্যে। কাঞ্চন সবসময় তার আদুরে ছোট বোন। তার ন্যাকামি, চাপাবাজি, নাটক সবকিছুই রিদম সহ্য করতে পারে, কিন্তু এই প্রীতি আপুরটা সহ্য হচ্ছে না। সে খাবে না বিরিয়ানি। তবুও নাচবে না।
তাশদীদ এবং অঞ্জনা রিদমকে টেনে বের হলো প্রীতির ঘর থেকে। পৃথুলাও বিরক্ত মুখে বের হলো। তাকবীর এবং ইকরাম এখন বসে আছে। প্রীতি আপু তাদের একটা খাতা ধরিয়েছেন। ঠিক কি কি পারফরম্যান্স হবে সেটার লিস্ট করা হচ্ছে।
রিদমের মুখ থেকে তাশদীদ যেই হাত সরালো অমনি রিদম ফেঁটে পড়লো,

“এই আহাম্মকের দল আমাকে থামালি কেন?”
“ব্রাজিল হারবে তোর কষ্ট হচ্ছে বুঝছি। কিন্তু প্রীতি আপুর উপর চোটপাট করতেছিস কেন?”
“ওই মহিলার ঢং আমার মাথায় আগুণ ধরাচ্ছিলো। হারামি কি না কয় বিরিয়ানি দিবে না। খামু না তোর বিরিয়ানি।“
অঞ্জনা এবার তার চশমা ঠিক করে বিজ্ঞ স্বরে বললো,
“তুই শুধু ব্রাজিলের টেনশনেই এতো অস্থির? কাহিনী কি ঝেড়ে কাশ তো।“
“আইছে আমার শার্লোক, যা ভাগ।“
রিদম রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেলো। তাশদীদ কপাল চুলকাচ্ছে আর হাসছে। অঞ্জনা বিরক্ত গলায় বললো,
“এই তুই জানিস তাই না?”
“কি জানি?”
“রিদম চটে আছে কেন?”
“জানি কিন্তু তোকে বলবো না বিল্লি। হ্যা, তবে তুই যদি আমার সাথে একটা রোমান্টিক ডান্স পারফরমেন্স দিস তো, আমি কনসিডার করতে পারি।“
“বেয়াদ্দব।“
বলেই অঞ্জনা হনহন করে হাটা শুরু করলো। তাশদীদ তার পিছু ছাড়লো না। পেছন থেকে ডাকলো,
“বিল্লি, বিল্লি। শুনে যা। যা ১ মিনিট নাচবো। প্রমিস।“

বাগানের পাশটায় খুব বেশি আগাছা হয়েছে। ম্যানেজার সাহেবের সেদিকে কোনো নজর নেই। বড্ড বেশি কেয়ারলেস একটা মানুষ সে। বৃষ্টির জন্য আগাছাগুলো খুব দ্রুত বড় হচ্ছে। তার উপর কাদা কাদা। কাদা রিদমের ভালো লাগে না। তবুও সে লনে না যেয়ে এসে বসলো বাগানের এই ভাঙ্গা ফাউন্টেইনের গোঁড়ায়। সাদা কেডস এ কাদা লাগছে। সিগারেটটা বের করে ধরালো সে। প্রচন্ড আগ্রাসনের সাথে টান দিলো। চোয়াল শক্ত। কপালে ভাঁজ। পৃথুলা এসে দাঁড়াতেই সে প্রচন্ড রাগী চোখে চাইলো তার দিকে। থমথমে গলায় সে বললো,
“এখানে কি চাই তোর?”
ঠোঁটের ফাঁকের জ্বলন্ত সিগারেটটা এক টান দিয়ে নিয়ে ফেলে দিলো পৃথুলা। রিদমের মুখ আরো রক্তিম হয়ে উঠলো রাগে। ক্ষিপ্র স্বরে বললো,
“কি সমস্যা তোর?”
“একবার বলেছি না সিগারেট খাবি না”
“আম্মা হইছিস তুই আমার? এত অধিকার দেখাবি না। তোর এই কন্ট্রোলিং স্বভাব আমার ভালো লাগে না। ভুলে যাস না আমরা শুধু কাজিন এখন।“
“তাও খাবি না।“

খুব শান্ত স্বরে পৃথুলা কথাটা বললো। রিদমের চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেলো। চোখের দৃষ্টিতে হিংস্রতা প্রকাশ পেলো। খপ করে সে পৃথুলার বাহু চেপে ধরে বললো,
“আমাদের ব্রেকাপ হয়ে গেছে পৃথুলা। ঐ সাতদিন তোকে আমার জীবনের ছুরি ঘোরানোর অধিকার দিয়েছি। এখন পারভেজের জীবনে ছুরি ঘোরা, যা।“
পৃথুলা হাসলো। তার ঠোঁটের সেই মিষ্টি হাসিটা গা জ্বালিয়ে দিলো রিদমের। পৃথুলা আলতো হাতে তার গাল ছুঁতেই সে কেঁপে উঠলো,
“সহ্য করতে পারছিস না? কষ্ট হচ্ছে?”
“আমাকে দেখে কি মনে হয় আমি পাগল? তোর মত শাকচুন্নি অন্যের ঘাড়ে উঠবে আর আমি শোক পালন করবো? রিদমের এতোও খারাপ দিন আসে নি। ওই ব্যাটা তো জানে না তুই যে কত টক্সিক।“
পৃথুলা হাসছে। রিদম তার হাসি সহ্য করতে পারছে না। থরথর করে কাঁপছে রাগে। তার রাগ আরোও বাড়িয়ে পৃথুলা একটা সাংঘাতিক কাজ করলো। রিদমের গালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। রিদম চমকে উঠলো। তার শিরদাঁড়া বেয়ে উষ্ণ রক্তস্রোত বয়ে গেলো। শিরা উপশিরার রক্ত টগবগ করে উঠলো। নিজেকে সামলাতে প্রচন্ড বেগ পেতে হলো। পৃথুলা হৃদয়হীনার মতো হাসলো উপহাস করে। মৃদু স্বরে বললো,
“তুই লয়াল হলে, আমাকে এতো টক্সিক লাগলো না। যখন সময় ছিলো, তুই গায়ে হাওয়া লাগিয়েছিস। এখন ঢং করছিস কেন? আমার বিয়েতে দেবদাস হবার ইচ্ছে আছে নাকি?“
রিদমের চোখ কঠিন। পৃথুলার বাহু আরোও জোরে চেপে ধরলো সে। পৃথুলার মুখে ব্যাথার ছাপ ফুটে উঠলেও সে মুখে শব্দ করলো না। রিদম হিসহিসিয়ে বললো,

“তোর মাথায় সমস্যা বলেই তোর কাছে আমার লয়ালিটিকে লয়ালিটি মনে হয় নি। তুই একটা কন্ট্রোলিং, ডমিনেটিং রেড ফ্লাগ। তুই কাউকে ট্রাস্ট করতে জানিস না।“
পৃথুলা এবার হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
“যদি আমার হতে চাস, তবে আমারই হবি। আমি কারোর সাথে আমার মানুষকে শেয়ার করি না।“
বলেই রিদমের হাত ছাড়ালো সে। একরকম ছিঁটকে সরিয়ে দিলো রিদমের হাত। রিদম দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
“পারভেজকে বোরখা পড়ায়ে রাখিস।“
“আই ডোন্ট কেয়ার এবাউট হিম। সবাই আমার কেয়ার পাওয়ার যোগ্য না।“
রিদম টিটকারির সাথে বললো,
“তোর আধিপত্যকে কেয়ারিংয়ের নাম দিস না।“

“তুই সুযোগ কোথায় দিলি? সাতদিনে আমার কেয়ার কি বুঝবি তুই? সেটার জন্য ঘটে বুদ্ধি থাকতে হয়।“
বলেই মঞ্জিলের দিকে পা বাড়ালো পৃথুলা। পৃথুলার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো রিদম। মেয়েটি তাকে পাগল করে দিবে। পৃথুলা তার জীবনের সেই নিষিদ্ধ মাদকতা যাকে না পেলে সে পাগল হয়ে যাবে আর পেলে মৃত্যু হবে। পৃথুলার সাথে তার প্রেমের সময়কাল এক সপ্তাহ ছিলো। এই একটা সপ্তাহে পৃথুলা তাকে সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরেছিলো। তার কোনো মেয়ের সাথে কথা বলা অবধি সে সইতে পারতো না। একটা সময় অসহ্য হয়ে উঠেছিলো রিদম। তার উপর পৃথুলা একটা সাংঘাতিক কাজ করে বসেছিলো। ফলে বাধ্য হয়েই ব্রেকাপ করেছিলো রিদম। মেয়েটার প্রতি তীব্র অনুভূতিগুলো এখনো শেষ হয় নি রিদমের। কিন্তু সে পৃথুলার সাথে জড়াতে চায় না। সে তার সৌরভময় অনুভূতিগুলোকে তিক্ত করতে চায় না।

ডিসচার্জ হবে স্নিগ্ধের। অবশেষে তার সেলাই খোলা হয়েছে। সকাল এগারোটার সময় ব্যাটেলিয়ন অধিনায়ক এবং দুজন কলিগ শাওন এবং কাইয়ুম আসলো স্নিগ্ধকে দেখতে। অধিনায়ক ফারুক ওয়াসিফ আসতেই স্নিগ্ধ সটান হয়ে বসলো। ফারুক ওয়াসিফ একবার তাকালো কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চন খুব বিব্রতবোধ করলো। তার পরণে একটা হ্যালো কিটি টিশার্ট এবং স্ট্রবেরি প্রিন্টের প্লাজো। ফারুক সূঁচালো চোখে তাকে এমন ভাবে দেখছেন যেন পরখ করছেন। তার সেরা অফিসারের সাথে এমন একটা মেয়ে কি মানায়। স্নিগ্ধ নিজ থেকে বলে উঠলো,
“শি ইজ মাই ওয়াইফ স্যার।“
কাঞ্চন লজ্জিত গলায় সালাম দিলো। ফারুক সাহেব মৃদু হাসলেন। তারপর চোখ ঘুরিয়ে স্নিগ্ধর দিকে তাকালেন। রোবটিক স্বরে শুধালেন,

“হাউ আর ইউ অফিসার?”
“আই এম অলরাইট স্যার।“
“তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো। কনফিডেনশিয়াল।“
স্নিগ্ধ তাকালো কাঞ্চনের দিকে। শাওন তখন বললো,
“ভাবী, চলুন কফি খেয়ে আসি।“
কাঞ্চন বুঝলো এখানে তার স্থান নেই। সে মাথা নাড়িয়ে ইশারা বুঝলো। দরজাটা ভালো করেই আঁটকে কাইয়ুম এবং শাওনের সাথে কাঞ্চন বেরিয়ে গেলো। ফারুক সাহেব এবার গলা কঠিন করে বললেন,
“ইউ ডিডেন্ট লিসেন টু মি।“
“আমি আত্মরক্ষার জন্য শ্যুট করেছি স্যার। আমি আহত হয়েছি।“
“তুমি কি মনে কর, তোমার ট্রিক আমি বুঝি নি?”
স্নিগ্ধর মুখ শক্ত। সে কোনো কথা বললো না। ফারুক সাহেব হতাশার নিঃশ্বাস ফেললেন,
“আমি তোমাকে এবার কোনো পানিশমেন্ট দেব না যদি তুমি আমাকে প্রমিজ করো, তুমি আর রুথলেস হবে না। ইউ ওন্ট বি ইমোশনাল। ইন্সটেড ইউ উইল বি র‍্যাশনাল।“

স্নিগ্ধ খুব শান্ত চোখে তাকালো ফারুক সাহেবের চোখে। এই ছেলেটার মধ্যে কোনো অনুতাপ কিংবা গ্লানি খুঁজে পেলেন না। বরং সে নিজের উপর যেন গর্বিত। অহং এর দাপট সে অটুট রেখে অমলিন, দৃঢ় স্বরে বললো,
“আপনার শাস্তি আমি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত স্যার। তবে আপনাকে কিছুই প্রমিজ করতে পারবো না। When it comes to my wife, I will be uncompromising”
ফারুক সাহেবের চোয়াল কঠিন হলো। যেন কিঞ্চিত অপমানিত হলেন। কড়া স্বরে বললেন,
“তুমি প্রথম নও। আমাদের প্রতিটা ফ্যামিলি প্রতিদিন এই বিভীষিকার পথ মারায়। ইউ হ্যাভ টু ডিল উইথ ইট।“
“আই উইল স্যার। বাট মাই ওমেনস’ লাইফ ইজ নট আপ ফর নেগোশিয়েশন।“
ফারুক সাহেব এবার যেন হাসলেন। তার হাসিতে কপালে সুক্ষ্ণ ভাঁজ পড়লো স্নিগ্ধের। তিনি পায়ের উপর পা তুললেন। হাটুতে আঙ্গুল ঘষতে ঘষতে বললেন,
“লাইফ ইজ নট লাইক ড্রামা। তোমার হাতে যে সব কিছু থাকবে সেটার গ্যারান্টি কি? ইউ হ্যাভ টু চ্যুজ।“
“আই উইল চ্যুজ হোয়াট ম্যাটারস টু মি।“
“তারপর? মরে যাবে?”

স্নিগ্ধ এবার হাসলো মৃদু। তার মুখশ্রী থেকে অহংকার সরলো না। খুব দৃঢ় স্বরে বললো,
“আমি যদি আমার পরিবারকেই প্রটেকশন না দিতে পারি তবে আমার থেকে অযোগ্য অফিসার পৃথিবীতে নেই। আমি অযোগ্য হতে চাই না।“
ফারুক ওয়াসিফ শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো স্নিগ্ধের দিকে। ছেলেটির মধ্যে একটা প্রখর পরিবর্তন তিনি লক্ষ করলেন। দায়িত্ববান, কর্মনিষ্ঠ ছেলেটিরও একটি দূর্বলতা থাকতে পারে বিষয়টি তাকে আহত করলো। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে স্ট্যান্ডের দিকে হাত বাড়িয়ে স্যালাইনের প্যাকেটটা নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখতে দেখতে বললেন,
“তোমার দূর্বলতাকে লুকিয়ে রাখো। মনে রেখো, সবচেয়ে বড় যোদ্ধাও কিন্তু একটা ক্ষুদ্র দূর্বলতায় বধ হয়। শত্রু তোমার দূর্বলতা টের পেলে সেটাকেই তোমার বিরুদ্ধে হাতিয়ার বানাবে।“
স্নিগ্ধ স্থির চোখে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। ফারুক সাহেব একটা খাম রাখলেন মেডিসিন টেবিলে। হালকা গলায় বললেন,

“তিনমাসের ডিটেনশনে থাকবে তুমি। এই সময় ইঞ্জয় কর। সামনে একটা মারাত্মক মিশন লিড করতে হবে।“
“ইয়েস স্যার।“
“আমি তখন কোনো ভুল বরদাস্ত করবো না।“
“ইয়েস স্যার।“
এর মধ্যে কাঞ্চনেরা ফিরে এলো। ফারুক সাহেব এবং বাকিরা বেরিয়ে গেলো। কাঞ্চন সোফায় বসতে বসতে বলল,
“উনি কি তোমাকে পানিশ করবে?”
“তিনমাসের ডিটেনশন দেওয়া হয়েছে। বউয়ের জন্য গুলি খেলাম এবং শাস্তিও পেলাম। কাঞ্চনজঙ্ঘা, এই দায় তোর!”
“এহ! আমি বলছিলাম? বরং আমি কিডন্যাপ হয়েছি তোমার জন্য। কার্মা ইজ এ বিচ বুঝলা।“
বলেই মোবাইলে মনোযোগী হলো। স্নিগ্ধ মৃদু হাসলো। বালিশে গা এলিয়ে দিলো সে। তারপর চোখ বুজলো।

সেলাই কাঁটার পর স্নিগ্ধ অবশেষে বাড়ি ফিরলো। আয়েশা পটনভী ছেলের ঘর একেবারে পরিষ্কার ঝকঝকে করে তুলেছেন। বিয়ের আয়োজনের মধ্যেও ছেলের যেন যত্নের ত্রুটি না হয় সেদিকেই তার খেয়াল।
বিয়ের আয়োজন ধুমছে শুরু হয়েছে। হলুদ আগামীকাল বিকেলে। সকাল বিকাল ডান্স প্রাকটিস হচ্ছে। প্রীতির হলুদে পটনভীর ছেলেগুলো আফনান অর্থাৎ বরপক্ষ থেকে নাচবে। এবং মেয়েগুলো প্রীতি অর্থাৎ কনে পক্ষ থেকে নাচবে। শুধু কাঞ্চন বলে দিয়েছে সে আফনান ভাইয়ের পক্ষে। মিথ্যেবাদী নটাঙ্কি মহিলার পক্ষে সে নেই। গান বাজছে,

“Chunari Chunari…
Chunari Chunari…
Teri Chunari Lipat Lipat
Ke Paagal Mujhe Banaye
Pehle Se Hi Tadap Raha
Tha Aur Mujhe Tadpaye”
তাকবীর মাথায় লাল ওড়না দিয়েছে। তাশদীদ এবং রিদম তাকে টানাটানি করছে। একটা সময় তার ওড়নাটা রিদম তার গলায় পরে নিলো। নাচার মধ্যেই রিদম বললো,
“পটনভী বংশের মহিলাগুলো আজীব। মহিলার একবার হলুদ হলো তাও তার পুষালো না। প্রথমবারের মতোই তার দ্বিতীয়বার হলুদ হওয়া চাই। তা তুই প্রথমবার আমাদের এমনে নাচালি কেন! না পালালে তো বিশ্বাস ই হইতো না বেটির বিয়েতে মত নাই!”
তাশদীদ নাচতে নাচতে বললো,
“আর আমরাও কি পরিমাণ বেশরম ভাব, সামান্য বিরিয়ানির লোভে দ্বিতীয় বার আবার প্রথমবারের মতোই হাত পা ছুড়ে নাচছি, তাও একই গানে যেন আফনান ব্রো লেফটআউট ফিল না করে। পটনভী মঞ্জিল মানে রঙ্গ।”

নাচ মোট আটটা তোলা হচ্ছে। কাঞ্চন বরাবর ভালো নাচে। তার সাথে নাচবে তাশদীদ। রিদম আগের থেকে হাত তুলে ফেলেছে। স্নিগ্ধ ভাইয়ের ওই ভয়ংকর দৃষ্টির সম্মুখীন সে হবে না। তবে তাশদীদ নির্লজ্জ। সে কাউকে পরোয়া করে না। তাই কাঞ্চন যখন-ই বললো,
“তুই আমার সাথে নাচবি?”
তাশদীদ রাজি হয়ে গেলো। কাঞ্চন প্রীতির হলুদে নাচছে এটাও কাজিনমহলের কাছে অনেক বিস্ময়ের ব্যাপার। পৃথুলা তাকে চেপে ধরে বললো,
“তুই এতো আগ্রহী কেন রে এই বিয়েতে?”
কাঞ্চন হাসতে হাসতে বললো,
“আমি তো প্রীতি আপুর জন্য একটা চরম উপহারও বেঁছে নিয়েছি। সময় হলেই দেখবি।“
পৃথুলার কেন যেন সন্দেহ হচ্ছে। অঞ্জনা একেবারেই শিওর এই নারী কোনো একটা আকাম নিশ্চিত করবে।

হলুদের সন্ধ্যা। পটনভী মঞ্জিল মরিচবাতির আলোয় জ্বলজ্বল করছে। ফুল দিয়ে স্টেজ সাজানো। উপরে লেখা “প্রীতি এবং আফনানের হলুদ সন্ধ্যা”। ফটোগ্রাফার ছবি তুলছে। স্টেজটা দারুন ভাবে সাজানো হয়েছে। স্টেজে গদি বসানো হয়েছে। মখমলের লাল বালিশ সুসজ্জিত করে রাখা। এখানে বর এবং বউ একত্রে বসবে। চাচারা সবাই ব্যস্ত। মেজো চাচা বেশি ব্যস্ত। ফ্লাশের তীব্র আলোর সামনে সবাই হাত নেড়ে নেড়ে পোজ দিচ্ছে।
কাঞ্চন নিজের ঘরে। একটা মেজেন্টা রঙ্গের আনারকলি পড়েছে সে। সবাই সারারা, গারারা পড়েছে। তার ওগুলো ভালো লাগে না। প্রীতির লেহেঙ্গা হলুদ। তাই সবার জামার রঙ মেজেন্টা। ছেলেটা মেজেন্টা রঙের পাঞ্জাবি আর মেয়েরা গারারা, সারারা, আনারকলি। কাঞ্চন খুব একটা সাজে নি। শুধু ঠোঁটে একটা কড়া রঙের লিপস্টিক দিয়েছে। হাতে মেজেন্টা রঙের একটা ব্যাঙ্গল। চুড়িতে তার হাত চুলকায়।
আয়নায় চুল আছড়ানোর সময় দেখলো স্নিগ্ধ ঠিক তার পেছনে একটা মেজেন্টা রঙ্গের পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে আছে। পাঞ্জাবিটা বেশ ফিটিং। বুকের দুটো বোতাম খোলা। ফলে উন্মুক্ত বুক দেখা যাচ্ছে। ফোলা ফোলা বাহু জোড়াকে খুব কষ্টে পাঞ্জাবিটা ডেকে রেখেছে। সে গভীর চোখে কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে আছে। এই দৃষ্টিতে গায়ে কাঁটা লাগলো কাঞ্চনের। সে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। চুল ঠিক করে সে যেতে নিবে স্নিগ্ধ তার হাত টেনে ধরলো। অনামিকা আঙ্গুলটা কাঞ্চনের চোখের সামনে ধরে শুধালো,

“তোর আঙ্গুলে আমার আংটিটা নেই!”
কাঞ্চন নির্লিপ্ত স্বরে বললো,
“খুলে রেখে দিয়েছি। সাপের মতো আঙ্গুলে পেঁচিয়ে থাকে। জঘন্য লাগে।”
“ডিল অন হয়ে গিয়েছে ওয়াইফি, ইউ হ্যাভ টু ফুলফিল দ্যা অবলিগেশন।”
স্নিগ্ধের স্বর অসম্ভ প্রগাঢ় শোনালো। কাঞ্চন একটা শুকনো ঢোক গিললো। তারপর উপহাসের স্বরে বলল,
“রিং পড়ে সং সাজা তোমার বউ হবার অবলিগেশন নাকি? একপাক্ষীক হয়ে যাচ্ছে না স্নিগ্ধ ভাইজান? সেক্ষেত্রে আমার হাসবেন্ড হবারও কিছু অবলিগেশন আছে। আমার ভেড়া মার্কা স্বামী ভালো লাগে, যার মাথায় আমি রাজ করবো। এসব তো তোমার দ্বারা সম্ভব নয়। তাই আমার দ্বারাও তোমার ওই সাপের মতো রিং পড়া সম্ভব নয়। কখনো যদি আমার সামনে হাটু ভাঙ্গো তাও পুরো পরিবারের সামনে, আমি ভেবে দেখলেও দেখতে পারি।”

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৯

স্নিগ্ধের মুখোভাব বদলে গেলো যেন। কেমন ধারালো এবং শীতল চাহনিতে সে তাকিয়ে আছে। তার পাহাড়সম দর্পে যেন আঘাত হানলো কাঞ্চন। কাঞ্চন জানে এই ব্যক্তি মরে গেলেও হাটু ভাঙ্গবে না। কাঞ্চন তার হাতটা ছাড়ালো। তার মুখে বিজয়ের হাসি। তবে হাসিটা খুব বেশিক্ষণ টেকসই হল না। স্টেজের সামনে ডান্স ফ্লোর। সামনে পটনভী বংশ বসে আছে। সবার সামনে হাটু গেড়ে রয়েছে স্নিগ্ধ…

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here