Home মন পবনে বৃষ্টি মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২১

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২১

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২১
তাসনিয়া নুর

গোডাউনের ভিতরে ঢুকেই সকলের চক্ষু চকড়গাছ । আবইয়াজের এই অবস্থা দেখে ননী আর নিজেকে সামলাতে না পেরে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। মাহির চোখ পাকিয়ে তাকাতেই তার হাসি নিভে গেলো ।
এতজনকে একসাথে আসতে দেখে ভয় পেলো মামুন । শুষ্ক ঢোক গিলে পা টিপে টিপে যেই পালাতে যাবে অমনি আবইয়াজ তার কলার ধরে বলে,
— তোর জন্য আজকে আমি পুরুষ হয়েও আমার পুরুষত্বরের বারোটা বেজে গেলো। তার উপর তোর জন্য এতগুলো মার খেলাম। আজকে তোকে বুঝবো মজা কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি।
এবার মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,

— মাহির দে তো।
মামুনের গলা শুকিয়ে গেলো। কি দিতে বলেছে ছেলেটা? তার গলা কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিবে না তো?
মামুন গলায় হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল । কিন্তু বেচারা কি আর জানতো এরা গলা কাটার চেয়েও বেশি ভয়ংকর?
মাহির আবইয়াজের হাতে একটা শপিং ব্যাগ ধরিয়ে দিতেই মামুনের ভ্রু কুঁচকে যায়।
আবইয়াজ এবার ব্যাগ থেকে একটা ব্ল্যাক ওয়েস্টার্ন ড্রেস বের করে মামুনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
— এটা পড়ে এখন নাগিন ডান্স করবি । না করলে তোর খবর আছে। তোর জন্য আমার এসব পরতে হয়েছে এখন তুই ও পরবি।
মামুন রাগ দেখিয়ে বলল,
— আমি কি মাইয়া মানুষ যে এইসব পরমু? কিছুতেই না ।
— মেহু তোর হাতের লাঠিটা দিয়ে একে কয়েক ঘা লাগাতো।
মেহু মারতে উদ্যত হতেই মামুন আহিরের পিছনে লুকিয়ে বলল,
— না না না এই মেইয়ারে আমার থেকে দূরে রাখ। এই মাইয়া বহুত ডেন্জারাস । আআআ খুব মারে।
দাড়াও দাড়াও আমি নাচতাছি
মামুন টান দিয়ে আবইয়াজের হাত থেকে কাপড়টা নিয়ে পরতে আরম্ভ করে । মামুনের হঠাৎ কান্ডে বাকরুদ্ধ সকলে । করছে কি এইসব?
চিত্রা, ননী, মাইরা, মেহু নিজেদের চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলে। আহিরে, মাহির, আবইয়াজ অন্য দিকে ফিরে যায়। আবইয়াজ বিড়বিড় করে বলে,

— শালা পাগল ।
মামুন কাপড়টা পরেই বলল,
— নেন ভাই পরা শেষ।
আহির মাথা নেড়ে মোবাইল বের করে নাগিন সং লাগিয়ে বলল,
— নে এবার নাচা শুরু কর। যতক্ষণ থামতে না বলব থামবিনা। আজকে থামলে তোর খবর আছে।
মামুন এবার গানের তালে তালে নাচতে থাকে। অপর দিকে আহির সেটা ভিডিও ধারন করছে।
একটা সময় মামুন হাঁপিয়ে উঠে বলল,
— ভাই এবারের মতো মাফ করে দেন। আর কোনোদিন কোনো মাইয়ার দিকে ভুলে ও তাকামু না।
আবইয়াজ এসে মামুনের কলার ধরে বলল,
— ঠিক আছে আজকে মাফ করলাম। আর যদি কোনোদিন দেখেছি কোনো মেয়ের দিকে তাকাতে বা এমন করতে সেদিন এমন শাস্তি দিব নিজের নামই ভুলে যাবি বাপের নাম তো মনে থাকবে দূরের কথা।
মামুন কে শাসিয়ে আবইয়াজ সহ বাকি সকলে বের হয়ে যেতে উদ্যত হয়। কিন্তু এত কিছুর ভিড়ে মেহুর মন ভরে নি তাই সুযোগ বুঝেই মামুনের গায়ে কয়েক ঘা লাগিয়ে দিল। মামুনের চিৎকার শুনে সবাই ফিরে তাকায়। এমন দৃশ্য দেখে আবইয়াজ দৌড়ে গিয়ে মেহুকে টেনে আনতে আনতে বলল,
— থাম মা দাম। আর নিজের শক্তি দেখাতে হবে না। আমরা জানি তুই শক্তিশালী। এবার থাম।

ডাইনিং রুমে উপস্থিত বাসার সবাই । গুলবাহার বানু নিজের চশমা খুলে বললেন,
— যা হয়েছে তা ভুলে যাও। দুদিন বাদে যেহেতু সাইবার বিয়ে তার উপর মার্কেট করা হয় নি তোমাদের। তাই এখন রেস্ট নাও। সন্ধ্যার দিকে মার্কেট যাবে তোমরা । তাহলে মাইন্ড ও ফ্রেশ হয়ে যাবে।
এবার মেহুর দিকে তাকিয়ে বলল,
— আর তুমি সকাল সকাল আর একা বের হবে না। ঠিকাছে?
মেহু উপর নিচ মাথা ঝাঁকায়।
সন্ধ্যায় রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আহির, আবইয়াজ, মাহির । অথচ মেয়েগুলো নিচে নামার নামই নিচ্ছে না। আবইয়াজের পরনে ডেনিম জ্যাকেট। চুল সেট করা। হাতে ব্ল্যাক লেদার ওয়াচ।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে চুল ঠিক করতে করতে নামছিল মেহু । কোমড় সমান চুলগুলো ছেড়ে রেখেছে । সিঁড়ি দিয়ে নামার চালের তালে চুল দুলে উঠছে। পরনে কুর্তি আর গলায় ওরনা পেঁচানো । মুখ একেবারে সিম্পল কোনোরূপ সাজে নি শুধু হালকা লিপস্টিক দিয়েছে এতেই যেনো অস্পরা লাগছে ।
আবইয়াজের মুখ থেকে আপনা আপনি বেরিয়ে আসে,

— মৃণালিনী ।
— কিরে আবইয়াজ চল।
আহিরের ডাকে ধ্যান ভাঙে আবইয়াজের।চারদিকে নজর বুলিয়ে দেখে সবাই তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ।আবইয়াজ গলা খাকারি দিয়ে,
— এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? চল যাই।
কথাটা বলে আবইয়াজ হনহনিয়ে চলে যায়। মাহির কাঁধ উচিয়ে হাঁটা ধরে ।
আস্তে ধীরে গাড়ির ভিতরে ঢুকে পরে সবাই। তাদের সাথে ফাহিম, জহির, জরিনা ও যাচ্ছে।
পর পর দুটা গাড়ি বেরিয়ে পড়ে।
শপিং মলে পৌছাতেই যে যার যার মতো ব্যস্ত নিজেদের কাপড় পছন্দ করতে। ননী ঘুরে ঘুরে কাপড় দেখছিল ঠিক সেসময় তার নজরে পরে একটা গোলোমলো কিউট বাচ্চা তার সামনে দিয়ে হেটে যাচ্ছে। ননীর বড্ড লোভ হলো ছেলেটার মাথায় হাত দেবার । যেই ভাবা সেই কাজ ননী দৌড়ে গিয়ে ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে সামনে হাঁটা ধরে ।
তবে ননীর এমন কাজ পছন্দ হয়নি পিচ্চি ছেলেটির। সে দৌড়ে গিয়ে ননীর হাত ধরে কামড় বসিয়ে দিতেই
— আরে পিচ্চি ছাড় ব্যথা পাচ্ছি।
কিন্তু ননীর আর্তনাদ ছেলেটি শুনলো না। ননী নিজের হাত ছাড়িয়ে দৌড় লাগায় তার পিছন পিছন ছেলেটা দৌড়ে যায়।
দৌড়াতে দৌড়াতে এক পর্যায়ে ননীর ধাক্কা খেলো মাহিরের সাথে।

— কি হয়েছে এমন ছাড়া গরুর মতো দৌড়চ্ছ কেনো?
— মাহির ভাই আপনি আমাকে গরু বললেন।
— মাঝ রাস্তায় এভাবে দৌড়ালে গরু বলব নাতো কি বলব?
ততক্ষণে পিচ্চি ছেলেটা তাদের কাছে চলে এসেছে। ননী মাহিরের পিছনে লুকিয়ে বলল,
— মাহির ভাই এই ছেলের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও।
মাহির একবার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে তার দিকে আঙুল তাক করে ননীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— লাইক সিরিয়াসলি? এই আন্ডা বাচ্চাকে তুমি ভয় পাচ্ছো?
মাহিরের কথা শেষ হতে দেরি তার হাতে ছেলেটার কামড় দিতে দেরি হলো না। মাহির হাত ছাড়াতে চাইছে তবে ছাড়লে তো?

—- আরে জাউড়া ছাড়।
মাহির নিজের হাত ছাড়িয়ে লাগায়। দৌড়াতে দৌড়াতে আহিরের সামনে পরে। আহির ঠোঁট কামড়ে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে এমন হাঁপাচ্ছিস কেনো?
মাহির সব ভেঙে আহিরকে বলতেই সে হাসতে বলল,
— ছি ছি একটা পিচ্চি ছেলেকে এভাবে ভয় পাচ্ছিস ।
হাসতে হাসতে কিছু একটার সাথে বারি খেলে আহির পিছনে ঘুরে দেখে এক বৃদ্ধা নারী তার দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । আহির ঢোক গিলে বলে,
—সরি, আমি খেয়াল করিনি।
বৃদ্ধা চোখ পাকিয়ে বলল,
— সুন্দরী মেয়ে দেখলেই গায়ে পরতে ইচ্ছে হয় হ্যাঁ? আবার বলে কিনা সরি। দাড়াঁ বেটা তোকে দেখাচ্ছি।
কথাটা বলে বৃদ্ধা হাতে থাকা লাঠিটা দিয়ে আহিরের পিঠে দুটা বারি দিতেই আহির, মাহির উল্টো দিকে ভোঁ দৌড় মারে।
হাতে সুন্দর একটা পাঞ্জাবি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফাহিম । ট্রায়াল রুমে গিয়ে পড়ে দেখতে হবে । পাঞ্জাবি নিয়ে ফাহিম ট্রায়াল রুমে ঢুকতে যাবে অমনি এক মহিলা বেরিয়ে আসে। ফাহিম কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটা কসিয়ে থাপ্পড় মেরে বলল,

—- অসভ্য ছেলে মেয়েদের ট্রায়াল রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ।
মহিলাটি হনহন করে চলে গেলো। ফাহিম সেখানে হতবুদ্ধির ন্যায় চেয়ে রইল ।
মনে মনে ভাবলো এখানে এখানে থাকলে যদি আবার থাপ্পড় খায়? তাই অন্য দিকে চলে গেলো।
সেখানে গিয়ে ট্রায়াল রুমে ঢুকতে নিলে সামনে একটি মেয়ে পরে। সে ও ফাহিমকে থাপ্পড় মেরে বলল,
— অসভ্য, নির্লজ্জ, অভদ্র, লুচ্চা মেয়েদের ট্রায়াল রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছিস। তোকে আজকে মেরে তক্তা বানাব।
ফাহিম ভালো করে তাকিয়ে দেখলো এখানে তো মেন লেখা আছে তাহলে মেয়েটা তাকে থাপ্পড় কেনো মারলো?
— কিন্তু এখানে তো মেন লেখা আছে।
মেয়েটি রেগে সেদিকে তাকিয়ে দেখলো আসলেই তো । তার মানে সে ভুল রুমে ঢুকে গিয়েছে। মেয়েটি বোকা হেসে বলল,

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২০

— আসলে মানে আমার ভুল হয়ে গিয়েছে সরি।
মেয়েটি দ্রুত পায়ে স্থান ত্যাগ করতে নিলে ফাহিম ভাবে মেয়েটা তাকে থাপ্পড় মারলো অথচ থাপ্পড় ফিরত যে নিলো না?
ফাহিম মেয়েটির পিছনে দ্রুত পায়ে হাটতে হাটতে বলল,
—- আরে আমারে থাপ্পড় যে মারলেন ওইডা ফেরত নিয়া যান।
মেয়েটা দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে বলল,
— আরে বলদ থাপ্পড় আবার ফিরত নেয় কিভাবে?

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২২