Home মন পবনে বৃষ্টি মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২২

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২২

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২২
তাসনিয়া নুর

শপিংমলের ভিড়ের মাঝে লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরছিল মেহু । হুট করে তার চোখ আটকে যায় কাঁচের ওপারে রাখা একটি শাড়ির উপর। একটি গাঢ় মেরুন রঙের শাড়ি । জর্জেট বা মিহি জমিন জুড়ে একই রঙের সুতোর নিখুঁত কাজ। শাড়ির পাড় থেকে শুরু করে আচঁল পর্যন্ত ছোট ছোট সিকুইনের কারুকাজ । মেহু মুগ্ধ নয়নে চেয়ে শাড়িটাকে নিজের গায়ে ধরল, তার ফর্সা গায়ের রঙের সাথে মেরুন আভাটি বেশ মানিয়েছে। মেহু ঘুরে ঘুরে আয়নায় নিজেকে দেখতে থাকে। মুখে তার মুচকি হাসি।
তার থেকে মেহুকে গভীর চোখে পর্যবেক্ষণ করছিল আবইয়াজ । সে নিঃশব্দে এসে মেহুর কাছে দাঁড়িয়ে বলল,

— তোর মতো পেত্নীর গায়ে এই শাড়ি মানাবেনা। তুই বরং একটা কাজ কর কমলা, টিয়া কালারের শাড়ি নে । একদম রিয়েল পেত্নী লাগবে ট্রাস্ট মি।
মেহু বাঁকা হেসে শাড়িটাকে হাতের ভাঁজে নিয়ে বলল,
— আপনার তো নিজের ভাগ্যের উপর খুশি হওয়ার দরকার। সাক্ষাত পেত্নী আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে । কজনের ভাগ্যে থাকে পেত্নীকে দেখার?
একবার শাড়িটার দিকে দৃষ্টি নামিয়ে ফের আবইয়াজের চোখে চোখ রেখে বলল,
— আর রইল শাড়ির কথা আপনি যখন নিতে নিষেধ করেছেন তাই এটাই নিব আমি।
মেহু মুখ ভেংচি কেটে সামনে চলে যায়। আবইয়াজ মুখ ভেংচি কেটে বিড়বিড় করে বলে,
— হুহ নিজের পছন্দ হয়েছে আর এখন বলে কিনা আমি না করাতে নিয়েছে। ঢং যে কত মানুষের।
মেহেদি রাতের জন্য মেয়েরা নিয়েছে ল্যাভেন্ডার শাড়ি আর ছেলেরা সাদা পাঞ্জাবি।
শপিং শেষে বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত দশটা বেজে গিয়েছে। বাহির থেকে খেয়ে এসেছে সবাই তাই ঘরে ঢুকেই যে যার রুমে চলে গিয়েছে। শরীর এক একজনের অনেক ক্লান্ত । সন্ধ্যার দিকেই ঢাকা থেকে লেবুতলা চলে এসেছেন মির্জা বাড়ির কর্তা গিন্নিরা ।

রাত দুইটা কি আড়াইটা। আফিয়া বেগমের তৃষ্ণায় ঘুম ভেঙে গেলো। সাইড টেবিলে হাত দিয়ে দেখলেন পানির জগটা খালি । বিরক্ত হয়ে জগটা হাতে নিয়ে মোবাইল ফ্লাস অন করে রুম থেকে বেরিয়ে পরেন তিনি। অন্ধকার চারপাশ। আফিয়া বেগম পানি পান করে যেই কিচেন থেকে বের হবেন সেই মুহূর্তে তার কানে এসে ভাসে কারো ফিসফাস কন্ঠস্বর । আফিয়া বেগম ভ্রু কিঞ্চিত বাঁকিয়ে ভেসে আসা শব্দের উৎসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আরেকটু সামনে যেতেই তিনি ডাইনিং রুমের লাইট জ্বালিয়ে দিলেন। সামনের দৃশ্য দেখতেই তিনি বিকট জুড়ে চিৎকার দিয়ে উঠেন। তার হাতে থাকা জগটা নিচে পরে গেলো।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কালো পোশাকধারী আটজন লোক । তাদের হাতে ধরে রাখা দাঁ, ছুরি।
আফিয়া বেগমকে চিৎকার করতে দেখে তাদের একজন দৌড়ে এসে আফিয়া বেগমের গলায় ছুরি বলে,

— চুপ একদম চুপ। আরেকবার চিৎকার করলে গলা কেটে ফেলে দিব ।
আফিয়া বেগম সাথে সাথে দুহাত দিয়ে মুখ চেপে ধরেন । অন্যদিকে আফিয়া বেগমের চিৎকার শুনে ইতোমধ্যে ঘুম ভেঙে গিয়েছে খলিল আহমেদের। তিনি বিছানা হাতড়ে আফিয়া বেগমকে খুঁজলেন । তবে বিছানা খালি পেয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেললেন । এত রাতে কোথায় গেলো? আর এত জোরে চিৎকার কে করল এত রাতে?
আনোয়ার মির্জা, ফিরোজা মির্জা বাকি সকলে চিৎকার শুনে বের হয়ে এসেছে।
আফিয়া বেগমের গলায় ছুরি ধরে রাখার দৃশ্য দেখে মুন বেগম চিৎকার করে উঠেন।
ডাকু সর্দার দুতলায় তাকিয়ে বলল,
— একদম চিৎকার চেঁচামেচি করবি না। নইলে এর গলা কেটে দিব । সবাই নিচে নেমে আয়।
আস্তে ধীরে সবাই নিচে নামতে থাকে। সবাই উপস্থিত থাকলে ও শুধু উপস্থিত ছিল না বাড়ির বাচ্চারা।
আনোয়ার মির্জা চিন্তিত হয়ে পরেন।. বাড়িতে উপযুক্ত মেয়ে আছে। তিনি মনে মনে দোয়া করে যাচ্ছেন বাচ্চা গুলো যেনো রুম থেকে বের না হয়।
ডাকু সর্দার সকলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

— স্বর্ন, গয়না, টাকা কোথায় রেখেছিস বল। নইলে সবকটাকে মেরে শুইয়ে দিব ।
আফিয়া বেগমের বুকটা ধ্বক করে উঠে । মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে টাকা গয়না রেখেছে এখন এরা সব নিয়ে গেলে কিভাবে হবে? না না কিছুতেই এমন হতে দেয়া যাবে না।
তিনি সাহস জুগিয়ে বললেন,
— কিছুতেই বলব না ।
— বলবি না? এই মাসুম এর গলাটা কাট তো ।
খলিল আহমেদের গলা শুকিয়ে এলো ।এই বয়সে কিছুতেই তিনি বউ হারাতে চান না। কেউ কিছু বলার আগেই সিঁড়ির উপর থেকে ভেসে এলো,
— নাআআআআআ। এটা হতে পারে নাআআ। এখন কি হবে? কে বাঁচাবে আমাদের?
সবাই সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে আহির এক হাত কপালে ঠেকিয়ে অপর হাত সাইডে রেখে নাটকীয়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে ।
আহির দৌড়ে এসে ডাকু সর্দারের কলার ধরে বলে,

— এতো বড় সর্বনাশ তুই কিভাবে করতে পারলি শয়তান? তুই আমার দেহ পাবি কিন্তু মন পাবিনা।
আহিরের কথায় তার বাবা আয়ুব মির্জা ধমকে বললেন,
— কি সব কথাবার্তা বলছ আহির?
বাবার কথা শুনে আহির বুঝতে পারে আবেগে একটু বেশিই এক্টিং করে ফেলেছে । আহির নিজের কাজে আবারও মনোনিবেশ করে ।
— এই রাতে তোদের এখানে আসা ঠিক হয়নি। সে চলে আসবে আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে।
আহির হাত দিয়ে গলা কাটার অভিনয় করে দেখালো। অথচ আহিরের কথার আগা মাথা কিছুই বুঝল না কেউ।
মাহির দুকানে হাত দিয়ে ‘নাআআ’ বলে চিৎকার দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছে । সবাই এবার মাহিরের দিকে তাকায়।
মাহির বুকে হাত দিয়ে নাটকীয় স্বরে বলল,

— এটা কি হলো? এখন কি হবে? কে বাঁচাবে আমাদের?
ডাকু সর্দার তিরিক্ষি মেজাজে নিয়ে সোফায় বারি দিয়ে বলল,
— এখানে হচ্ছেটা কি? সিনেমা চলছে? যে একজন একজন করে নাআআ করে চিৎকার দিয়ে এন্ট্রি নিচ্ছে।
আহির মাহির একসাথে ভুতুড়ে আওয়াজ বের করে বলল,
— এ বাড়িতে এ সময় বের হতে নেই। যার যার রুমে চুপটি মেরে বসে থাকতে হয়।
ডাকাত দলের একজন লোক লক জিজ্ঞেস করে,
— কেনো এ বাড়িতে কি আছে যে রাতে বের হওয়া যায় না?
আহির ভুতুড়ে আওয়াজ বের করে বলল,
— রমলার ভূত।
— রমলার ভূত?
— হ্যাঁ রমলার ভূত।
কেউ বুঝল না আহিরের কথা। কি বলছে এই ছেলেগুলো কিছুই তো বুঝতে পারছেনা। আহির মাহির চোখে চোখ রেখে বলতে আরম্ভ করে,

— এ বাড়িটা ছিল রমলার স্বামী করিমের। করিম প্রতিদিন রমলাকে মারধর করত । এমনি একদিন করিম ঘরে এসে রমলাকে মারতে মারতে এক পর্যায়ে বাথরুমে ডুবিয়ে দেয় । রমলার ও কম যায়না, সে হারপিকের বোতল দিয়ে বারি মেরে তার স্বামীকে মেরে ফেলে। সেদিন রাতে দুইজন মারা যায় ঠিকই। কিন্তু তাদের অতৃপ্ত আত্মা এই ঘরেই রয়ে যায় । প্রতিদিন রাতে রমলার মোমবাতি দিয়ে তার স্বামীকে খুঁজে তারপর দুইজন ঝগড়া মারামারি করে। এই সময় কেউ ঘর থেকে বের হলে রমলার ও তার স্বামী মানুষের নাক কেটে ফেলে দেয়।
আহির মাহিরের এমন মনগড়া কাহিনী শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সবাই । কিন্তু তার পুরো কথা ঠিকই বিশ্বাস করল ডাকু সর্দার ও তার দল । এক একজন কেমন ভয়ে ঢোক গিলছে । এদের অবস্থা দেখে আহির মাহির একে অপরের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসে।
এরমাঝেই হুট করে হলো লোড সেডিং । পুরো বাড়ি কেমন অন্ধকার রাজ্যে ডুব দিল । হঠাৎ শুনা গেলো নুপুরের রিনঝিন শব্দ । রাতের নিস্তব্ধতার ভিতরে নুপুরের রিনঝিন আওয়াজ আরো ভয়ংকর করে তুলছে।
হুট করে দেখা মেলে দুতলার করিডরে এক নারী অবয়বের। যে ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। খুলা চুল সারা মুখে আছড়ে পরছে। পরনে কুঁচকুঁচে কালো শাড়ি।
ডাকাত দলের এক লোক ডাকু সর্দারের কানে কানে বলে,

— সর্দার আগে তো জানতাম ভূত সাদা শাড়ি পরে আজকে কেন কালা শাড়ি পড়লো?
পাশে থাকায় কথাটা কানে যায় আহিরের। সে লোকটার মাথায় চাটা মেরে বলল,
— ভাই দুনিয়া আপডেট হয়েছে। আগের দিন বাঘে খেয়েছে। এখন হচ্ছে নিউ জেনারেশনের দুনিয়া । তাই ভূত ও আপডেট হয়েছে। আগে সাদা শাড়ি পরত এখন পরে কালো শাড়ি।বুঝেছিস?
লোকটা উপর নিচ মাথা ঝাঁকায়। আসলেই তো দুনিয়া আপডেট হয়েছে। তাহলে ভূত কেনো আপডেট হবে না?
ডাকু সর্দার তাকিয়ে আছে এখনো সেই মেয়ের দিকে । ভয়ে তার হাত পা কাঁপছে। হঠাৎ মেয়েটা তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে রাগী দৃষ্টিতে তাকায় । এতেই যেনো ভয়ে ডাকু সর্দারের জীবন যায় যায়।
ডাকুর দিকে তাকিয়ে হাঁটার ফলে শাড়িতে প্যাঁচ খেয়ে পড়ে যেতে নেয় মেয়েটা । কোনো রকমে সাইড ধরে নিজেকে সামলে নিল ।
মেয়েটি এবার দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২১

— শাড়িতে পা প্যাঁচ লেগে গিয়েছে। তাই ব্যালেন্স রাখতে পারিনি। বাই দ্যা ওয়ে ভয় পাওয়া কন্টিনিউ কর।
কথাটা শেষ করে মেয়েটা আবার রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সামনে হাঁটা ধরে ।
ডাকু সর্দার সবার দিকে তাকিয়ে বলে,
— এই সবাই আবার ভয় পাওয়া শুরু কর।
পাশ থেকে আহির কপালে হাত রেখে বলে,
— গাধা ।

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৩