মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৭
তাসনিয়া নুর
খুব ভোর সকালে ঘুম ভেঙে যায় মাইরার। আজ বাড়িতে বিয়ে খুশিতে ঘুম ভেঙে গিয়েছে। মাইরার ছোটকাল থেকে স্বভাব কোনো প্রকার অনুষ্ঠান থাকলে ঘুম-ই আসে না তার। কখন সকাল হবে কখন তৈরি হবে এসব মনের মাঝে ঘুরতে থাকে। ঘুম ভাঙতেই ধপ করে শোয়া থেকে বসে পড়ে। খুশিতে চোখ চকচক করছে। শরীর থেকে ব্লেঙ্কেটটা সরিয়ে তরিগরি পায়ে কোনো রকমে পায়ে স্লিপার চরিয়ে দৌড় দেয় চিত্রার রুমে। কিন্তু বাহির থেকে চিত্রার রুম খুলা দেখে ভ্রু কুঁচকে যায়, রুমে ঢুকে বিছানা খালি দেখে আরও চিন্তিত হলো মাইরা। এত সকাল সকাল তো চিত্রা কোথাও যায় না। চিত্রার রুম থেকে বেরিয়ে মেহুর রুমে পা বাড়ায় কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো মেহু ও নিজের রুমে নেই। পর পর আহির, মাহির, আবইয়াজের রুমে ঘুরে আসলো কিন্তু কাউকে দেখতে না পেয়ে মাইরা ভেবেই নিল তাকে ছাড়া সবাই এই সাথ-সকালে ঘুরতে বেরিয়েছে । দুঃখে মাইরার ঠোঁট ভেঙে এলো যেই চোখ থেকে এক ফুটা পানি গড়িয়ে পরল অমনি তার নজর গিয়ে ঠেকলো ডাইনিং রুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা আবইয়াজ, মাহির, আহির, চিত্রা, ননী, মেহুর উপর। আবইয়াজ সোফার উপর দু হাত মেলে মরার মত ঘুমিয়ে আছে তার বুকের উপর মেহু গুটিগুটি মেরে গভীর ঘুমের তলদেশে ।
ফ্লোরে আহির, মাহির নিজেদের মধ্যে পা হাত ছড়িয়ে পড়ে আছে। আহিরের পায়ের কাছে চিত্রা ও ননী। সকাল সকাল এমন দৃশ্য দেখে মাইরা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয়। হুট করে মনের মাঝে কিছু একটা আসতেই আঁতকে উঠে । দ্রুত গতিতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে এসে দাঁড়াল। হাত পা এখনো অসম্ভবভাবে কাপছেঁ । এক কি দু সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠে। মাইরার চিৎকারে উপর থেকে একে একে সবাই নিচে দৌড়ে চলে আসে। নিচে নেমে এমন দৃশ্যের সম্মুখীন কেউ কেউ কল্পনা ও করতে পারে নি। ফিরোজা বেগম, মুন বেগম, বিলাপ করে কাঁদতে শুরু করেন।
সকাল সকাল কারো বিলাপ করা ফ্যাচ ফ্যাচ শব্দে ঘুম ভেঙে যায় আহির, মাহির, চিত্রার। আহির ঘুম ঘুম চোখে কপাল কুঁচকে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল,
— এতো সকালে এভাবে মরার মতো কান্না কে করছে। কে মরেছে?
— তোমরা সবাই মরে গিয়েছ তাই তো আমরা কাঁদছি ।
অপর প্রান্তের এমন কথা শুনে ঘুম উবে যায় আহির, মাহির, চিত্রার। মাহির শোয়া থেকে উঠে বসে নিজের সারা শরীরে হাত বুলাতে বুলাতে অস্থির কন্ঠে আওড়ালো,
— আমি মরে গেছি? কিভাবে? কখন? হায় হায় আমার সব শেষ আমার ফিউচার বাচ্চার কি হবে? আমার বউকে কে বলবে আমি তার স্বামী ছিলাম।
নিজের কথা শেষ করে আশেপাশে তাকিয়ে দেখে সবাই কেমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। মাহির নিজের জিহ্বায় কামড় দিয়ে নিজ মনে আওড়ায়,
— ইশ রে ভুল জায়গায় সঠিক কথা বলে ফেলেছি।
আবইয়াজ আস্তে ধীরে নিজের চোখ মেলে। বুকে ভারী কিছু অনুভব হতেই তাকিয়ে দেখে মেহু বিড়াল ছানার ন্যায় গুটিগুটি মেরে তার বুকে ঘুমিয়ে আছে । দৃশ্যটা দেখে আবইয়াজের ঠোঁটের কোনে হাসি খেলে যায়। কিন্তু পর মুহূর্তেই তার ভাবনার ছেদ ঘটে কথার আওয়াজে । সামনে তাকিয়ে দেখে হলে সবাই উপস্থিত। কি কি যেনো কথা বলছে কিন্তু কোনো কথা কাহিনী তার মাথায় ঢুকল না, শুধু এতটুকু বুঝতে পারছে মেহুকে উঠাতে হবে তার উপর থেকে । আবইয়াজ আলতো করে কয়েকবার মেহুর গালে থাপ্পড় দিতেই পিটপিট করে চোখ জুড়া খুলে সে। প্রথমে কিছু না বুঝলে ও যখন নিজের অবস্থান সম্পর্কে অবগত হলো অমনি হুড়মোড়িয়ে আবইয়াজের বুক থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। আবইয়াজ মুচকি। হাসে।
— কি হয়েছে এখানে?
আবইয়াজের প্রশ্নে চিত্রা হাসতে হাসতে প্রতিত্তর করল,
— মাইরা ভেবেছিল আমরা সবাই এখানে মরে পড়ে আছি তাই কাঁদতে কাঁদতে অবস্থা খারাপ । এদিকে আমাদের মা জননী কোনো কিছু ভালোভাবে চেক না করে মাইরার বাচ্চামিতে তারাও কাঁদা শুরু করে দিয়েছিল। আহারে
মাইরা আমাদের কতো ভালোবাসে।
মাইরা চোখের পানি মুছে নাক কুঁচকে বলল,
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৬
— কে বলেছে আমি তোমাদের জন্য কেঁদেছি? আমি তো এই ভেবে কেঁদেছি যে এতগুলো লাশ কবর দিতে কতো কষ্ট হবে। তার উপর আব্বু বড় ওদের কতো টাকা খরচ হতো তোমাদের পিছনে ।
মাইরার বক্তব্য শুনে সবাই ব্যাক্কল বনে গেল । এদিকে এক কোনে দাঁড়িয়ে থাকা আহনাফের মুখ কাদুকাদু হয়ে উঠে, ভেবেছিল আবইয়াজ মরে গেছে সেই খুশিতে চল্লিশ কেজি মিষ্টি অর্ডার দিয়ে ফেলেছিল পুরো গ্রামে বিলিয়ে দেবার জন্য। এখন তার এতগুলো টাকা জলে গেল।
