মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৮
তাসনিয়া নুর
আনোয়ার মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— এভাবে কান্নাকাটির কি আছে? মানুষ অন্তত হাত ধরে চেক তো করে নাকি?
— আপনি চুপ থাকুন নিজে গিয়ে চেক করতে পারেননি? এতক্ষণ এভাবে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে কেনো ছিলেন?
বউয়ের ঝাড়ি শুনে চুপ মেরে গেলেন আনোয়ার মির্জা। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলেন সবাই তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। এখন নিজের কপাল নিজে ফাটাতে মন চাচ্ছে কে বলেছিল বিয়ে করতে। না আজকে বিয়ে করত না এই মহিলার সামনে দিন রাত অবলা হয়ে থাকতে হতো।
পরিবেশ শান্ত করার জন্য গুলবাহার বানু বলেল,
— সেসব কথা থাক আগে বল তোরা সবাই নিচে কেনো শুয়েছিস?
এবার কিছুটা চিন্তিত দেখাল আবইয়াজদের । আবইয়াজের যতটুকু মনে পড়ে রাতে সবাই একসাথে সোফায় বসে ছিল। তারপর? তারপর? না আর কিছুই তো মনে পড়ছে না।
— আমার যতদূর মনে পড়ে আমরা একসাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। তারপর আর কিছুই মনে পড়ছে না।
আহিরের কথার সাথে আবইয়াজ সম্মতি জানিয়ে,
— আমারও কিছুই মনে পরছেনা।
ওদের উদ্বিগ্নতা দেখে আনোয়ার মির্জা আশ্বাস দিয়ে বললেন,
— হয়তো আড্ডা দিতে দিতে ঘুমিয়ে পরেছিলে।এমনিতে সারাদিনের কাজে কর্মে টায়ার্ড ছিলে। এসব নিয়ে আর ভাবতে হবে না। যে যার যার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হও। বিয়ে বাড়ি অনেক কাজ পরে আছে। যাও সবাই ।
আনোয়ার মির্জা কথায় সবাই আশস্ত হতে পারলেও আবইয়াজের মনে খটকা রয়েই গেল।কিছু তো একটা হয়েছে জানতে হবে। সবাই যার যার রুমে চলে যাবার পর আবইয়াজ দেরি না করে চলে গেল সিসিটিভি ফোটেজ চেক করতে । বিয়ের দুদিন আগে সেই লাগিয়েছিল হল রুমে ।
চরম বিস্মিতে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে আছে আবইয়াজ। কিছুক্ষন সেভাবে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়, হঠাৎ মুখে হালকা হাসি টেনে বিড়বিড়য়ে বলল,
— পিংকিস চুমু আই লাইক ইট।
দেরি না করে দ্রুত ফোটেজটা মেহুকে সেন্ড করে দিল । তারপর মেসেজ দিল “আমার রুমে আয় ফাস্ট” ।
পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে আবইয়াজ। মেহু ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষন পিনপিন নিরবতা ভেদ করে অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এল মেহুর কন্ঠস্বর,
— ফোটেজটা ডিলিট করুন।
— আমি কি পাবো তাহলে?
—- মানে!!
আবইয়াজ এবার ভাবলেশহীন উত্তর দিল,
— ভিডিও ডিলেট করলে আমি কি পাব? এমনি এমনি তো ছেড়ে দেওয়ার পাত্র আমি না ।
মেহু ভ্রু উচিয়ে জানতে চাইল,
— তাহলে কি চাইছেন আপনি?
— তেমন আহামরি কিছু না । শুধু আজ থেকে আমি যা বলব তোকে তাই করতে এবং শুনতে হবে।
— ব্লেকমেইল করছেন? লাভ নেই এই মেহু কারো ধার ধারেনা। যা ইচ্ছে করুন। আই ডোন্ট কেয়ার ।
আবইয়াজ এবার বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। মেহুর কাছে এগিয়ে এসে কানে হিসহিসিয়ে বলল,
— তাহলে সবাইকে দেখিয়ে দিব নাকি তোমার পিংকিস চুমু? আমার কিন্তু কোনো অসুবিধা নেই দেখাতে ।
আবইয়াজের তপ্ত শ্বাস মেহুর কানে আছড়ে পরছে। মেহু খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে আবইয়াজের চোখে চোখ রেখে চাপা রাগান্বিত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
— কি করতে হবে আমাকে?
আবইয়াজ বাঁকা হেসে মনে মনে বলল,
— জঙ্গলের মুরগি লাইনে এসেছে ।
আবইয়াজ নিজের হাত টানটান করে বলল,
— আপাতত আমার জন্য এক কাপ কফি নিয়ে আয়। আর অবশ্যই নিজ হাতে বানাবি।
মেহু কটকট দৃষ্টিতে আবইয়াজের দিকে তাকিয়ে হনহনিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আবইয়াজ তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে ,
— মজা হবে।
করিডরে দাঁড়িয়ে অবনির সাথে হেসে হেসে কথা বলছে আহির। দৃশ্যটা নজরে আসতেই মুখ বাঁকায় চিত্রা, ভিতরে ভিতরে কেনো যেনো প্রচন্ড হিংসে অনুভব হচ্ছে ।এভাবে হেঁসে হেঁসে কথা বলার কি আছে? মুখটা কালো করে ও তো কথা বলা যায় তাই না?
কথা বলার সময় আহিরের নজর যায় চিত্রার দিকে । আহির অবনিকে বাই বলে চিত্রার দিকে ছুটে এসে,
— কিরে চিত্রকর মুখটাকে এভাবে পেত্নীর মতো করে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?
চিত্রা পিছন দিকে হাত তাক করে,
— ওটা কি?
“কোনটা “ বলে আহির পিছন ঘুরতেই চিত্রা ধাম করে তার পিঠে মেরে উল্টো ভো দৌড় মারে । আহির ক্যাবলাকান্তের ন্যায় চিত্রার যাওয়ার পানে চেয়ে রইল।
বিয়ে বাড়ি চারদিকে শুধু হইচই। একদন্ড শ্বাস নেওয়ার ফুসরত নেই। এদিক সেদিক ছুটে চলেছে সবাই । দুতলায় সাইবাকে সাজানো হচ্ছে। বাড়ির সামনে প্যন্ডেলের ভিতর সকলকে খাবার খাওয়াতে ব্যস্ত আহির, মাহির, আবইয়াজ, আহনাফ । সব ছেলেদের পরনে কালো পাঞ্জাবী সাথে সাদা পায়জামা । মেয়েদের পরনে মেরুন রঙা শাড়ি । খাবার খাওয়ানোর সময় আহিরের নজর যায় চিত্রার দিকে ফর্সা বদনে মেরুন আভাটি বেশ মানিয়েছে। এক হাত দিয়ে বারবার কুচি সামলাতে ব্যস্ত অপর হাত দিয়ে খুলা চুলগুলো কানে গুজছে । আহির মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় সেদিকে তাকিয়ে আছে। আহিরের পাশাপাশি অপর দুজোরা চোখ চিত্রার দিকে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে আছে।
এদিকে একইভাবে মেহুর দিকে তাকিয়ে আছে আবইয়াজ ও আহনাফ । পৃথিবীর সকল শব্দ যেনো থমকে গেছে। হঠাৎ মেহুর নজর যায় আবইয়াজের দিকে। মেহু গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠে,
Mere kaan mein hain jo Baali
Maine tere khatir daali
Bohat Der ho gayi hai
Ab laut aa…..
আহনাফ হঠাৎ আবইয়াজের দিকে তাকিয়ে দেখে সে ও মেহুর দিকে তাকিয়ে আছে। আহনাফের সহ্য হলো না জিনিসটা , সে হাতে থাকা জগের সমস্ত পানি আবইয়াজের পেটে ঢেলে দেয়। হুট করে শরীরে পানির উপস্থিতি টের পেয়ে আবইয়াজ কটমট দৃষ্টিতে আহনাফের দিকে তাকাতেই আহনাফ চু চু শব্দ করে বলল,
— হাত থেকে কিভাবে যেনো পানিটা ফস্কে পড়ল।সরি ইয়ার।
আহনাফের মুখে অবজ্ঞা স্পষ্টভাবে টের পাচ্ছিল আবইয়াজ । আবইয়াজ কিছু না বলে আহনাফের পাশ কাটিয়ে যাবে এমন সময় হাতে থাকা ডালের বলটা একেবারে আহনাফের মাথায় ঢেলে আফসোসের স্বরে বলল,
— ইশশ হাত থেকে কিভাবে যেনো ফস্কে গেল । আই এম সরি ইয়ার।
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ২৭
আহনাফ রেগে কিছু বলতে যাবে তার আগে মেহু দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চুপ মেরে গেল। সবাই কেমধ তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আহনাফ সেখানে আর না দাঁড়িয়ে চলে যেতে নিলে পিছন ঘুরতেই আবইয়াজ তার পিছনের কলার ধরতেই টান পরার দরুন ঘাড় থেকে কোমর অবধি পাঞ্জাবি ফেটে গেল । চারদিকে পড়ে গেল আরেকদফা হাসির রুল। আবইয়াজ কোনো রকমে নিজের হাসি আটকে,
— এমন বস্তা মার্কা কাপড় পড়িস তুই ইউউউ । ধরতে না ধরতেই ফেটে তোর জলহস্তীর মতোন শরীরটা সকলকে দেখিয়ে দিল । সেম অন ইউ ব্রাদার।
