Home মন পবনে বৃষ্টি মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩১

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩১

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩১
তাসনিয়া নুর

দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপিয়ে উঠে আহির ও মাহির। হাঁপাতে হাঁপাতে ধপ করে পাশাপাশি বসে পড়ে দুজন। আহির হাত উচিয়ে বহু কষ্টে মুখ থেকে আওয়াজ বের করে বলল,
— থাম ভাই থাম আর দৌড়াতে পারছিনা। আমরা তোর মতো অলিম্পিকের উইনার না, এতো দৌড়াতে পারব না। রেহাই দে।
আহিরের কথা কুকুরটা কি বুঝলো কে জানে, কুকুরটা গিয়ে নিনজা নুনুর কাছে বসে পড়ল। সোফার সামনে থাকা টি-টেবিলের উপর থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে ঢকঢক করে এক নিঃশ্বাসে শেষ করল আহির। পানি পান শেষ করে কুকুরটাকে নিনজা নুনুর কাছে বসে থাকতে দেখে আহির ভ্রু কুঁচকে বলল,

— কুকুর হয়ে বিড়ালের সাথে সংসার করার স্বপ্ন দেখিস তুই? ভুলে যা নিনজা নুনুকে, আবইয়াজ কখনো তার মেয়েকে তোর মতো কাইল্লার কাছে বিয়ে দিবে না। আবইয়াজ দিলে ও আমি দিব না।
নিনজা নুনু এবার হালকা করে কুকুরটার গা ঘেঁষে দাঁড়াল । আহির তৎক্ষণাৎ চোখ বড় বড় করে,
— শেষমেষ তুই ও কিনা এই কাইল্লা ছাগলের পছন্দ করলি? সরি আই মিন কুত্তা । ছি নুনু ছি, আসলেই সুন্দরী মেয়েদের চয়েজ খারাপ।
নিজের কথা শেষ করতেই আহিরের মাথায় কিছু একটা বিকট ভাবে বারি খায়। সুন্দরী মেয়েদের চয়েজ ভালো না তার মানে সে যেহেতু এতো কিউট, হ্যান্ডসাম একটা ছেলে চিত্রা ওকে পাত্তা না দিয়ে অন্য কোনো কালো ছেলেকে পছন্দ করবে? ভাবতেই আহিরের বুক ছ্যাত করে উঠল। নাহ কিছুতেই চিত্রাকে কালা মানিকের কাছে যেতে দেয়া যাবে না তার আগেই তাকে নিজের মনের কথা চিত্রাকে জানাতে হবে।
আহির মনে মনে স্থির করে নেয় যেভাবেই হোক আজকেই চিত্রাকে নিজের অব্যক্ত অনুভূতির কথা বলতে হবে ।বেশি দেরি করা যাবে না।
আহির দ্রুত পায়ে সোফা থেকে উঠে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়, তাড়াতাড়ি রুমে গিয়ে ভাই প্ল্যান সারতে হবে। আহিরকে উঠে যেতে দেখে মাহির ভীত স্বরে আওড়ালো,

—এ্যাই আমাকে একা ছেড়ে কোথায় যাচ্ছিস?
প্রতুত্তর করার প্রয়োজন বোধ করল না আহির। আপন মনে হেঁটে চলে যাচ্ছে আর ভাবছে কিভাবে কি করতে হবে।
অপরদিকে আবইয়াজ ভেবে যাচ্ছে একই কথা অনেকদিন তো হলো এখন মেহুকে নিজের করার পালা। এমনিতে আহনাফ বলে রেখেছে যেভাবেই হোক মেহুকে নিজের করবে সে কিন্তু আবইয়াজ. তো সেই সুযোগ কুক্ষনে ও দিবে না তাকে।
কিন্তু কোন মুখে গিয়ে নিজের মনের কথা বলবে? মেহু যখন তার পিছন পিছন ঘুরত তুই আমার বোনের মতো বলে মেহুকে দূরে ঠেলে দিতো, এখন কিভাবে বলবে সে মেহুকে ভালোবাসে?
হুট করে আবইয়াজের মাথায় আসে একটা চিঠি লিখলে কেমন হয়? কিন্তু কখনো সে লাভ লেটার না লিখেছে না দেখেছে। কলেজ, স্কুলে মেয়েরা যখন তাকে লেটার দিতো আবইয়াজ সেগুলো খুলে ও দেখতো না। ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলত ।চিঠি গুলো পড়লে হয়তো আজ একটু আইডিয়া নিয়ে লিখতে পারতো। পরক্ষণেই আবার ভাবে সে কেনো অন্যজন থেকে কপি করবে? নিজ প্রতিভায় লিখবে । আবইয়াজের বিশ্বাস তার লেখা চিঠি পড়ে মেহু সাথে সাথে রাজি হয়ে যাবে।

অনেক ভাবার পর আহিরের মাথায় একটা দুর্দান্ত পরিকল্পনা আসে। খুব ইউনিক ভাবে আজ সে চিত্রাকে প্রোপোজ করবে, মেয়ে রাজি না হয়ে যাবে কই? নিজের পরিকল্পনা মোতাবেক আহির কাজে লেগে পড়ে।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে চারদিকে নিনজা নুনুকে খুঁজতে থাকে আবইয়াজ ।কিন্তু আশ্চর্য মেয়েটা কোথাও নেই। ড্রয়িং রুমে বসে চা পান করতে করতে আড্ডা দিচ্ছিলেন আনোয়ার মির্জা, সাফিন মির্জা, ও আয়ুব মির্জা। হুট করেই আবইয়াজ নিজের বাবার সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করে,
— আব্বু আমার নুনুকে দেখেছেন?
ছেলের এমন প্রশ্নে বড়সড় এক বিষম খেলেন আনোয়ার মির্জা ।আয়ুব মির্জা ও সাফিন মির্জা কেমন চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আবইয়াজ তাদের এমন দৃষ্টি বুঝতে পারলো না। সে ভ্রু কুঁচকে,
— আমি কিছু জানতে চেয়েছি আব্বু, আমার নিনজা নুনুকে দেখেছেন?
আনোয়ার মির্জা রেগে ঠাস করে চায়ের কাপটা টেবিলের উপর রেখে বললেন,
— বেয়াদপ ছেলে দিন দিন সভ্যতার লিমিট ক্রস করে একটা অসভ্যতে পরিনত হচ্ছো তুমি । নিজের বাপ চাচার সামনে এসব জিজ্ঞেস করতে তোমার মুখে আটকালো না?
আবইয়াজ বুঝতে পারলো না তার কথার এমন রিয়েক্ট করার কি আছে? যদি নিনজা নুনুকে না দেখে থাকে তাহলে না বলে দিবে।

— যদি আমার বিড়ালকে না দেখে থাকেন তাহলে না বলে দিবেন, অযথা চিৎকার চেঁচামেচি করার কি আছে?
— বিড়াল?!!
— হ্যাঁ বিড়াল ।
আনোয়ার মির্জা ভ্রু কুঁচকে,
— কোন বিড়ালের কথা বলছো তুমি?
— কেনো আমার বিড়াল নিনজা নুনুর কথা বলছি।
আনোয়ার মির্জা বুকে হাত দিয়ে ধ্বপ করে বসে পড়েন। আয়ুব মির্জা ও সাফিন মির্জা দৌড়ে ভাইয়ের কাছে এসে জানতে চান,
— ভাইয়া আপনি ঠিক আছেন? কি হয়েছে? বুকে বেশি ব্যাথা করছে?
আনোয়ার মির্জা বুকে হাত রেখেই বললেন,
— এই অসভ্য ছেলেটাকে বল আমার সামনে থেকে এখনই চলে যেতে, নাহলে নির্ঘাত এই ছেলে আমাকে হার্ট অ্যাটাক করিয়ে মারবে।
নিজের বাপের মুখে এমন কথা শুনে মুখটা তেতো হয়ে উঠল আবইয়াজ। এখন তো সে কিছুই করেনি তাহলে হিটলার বাপ এমন কেনো করছে। আবইয়াজ পা ঘুরিয়ে যেতে যেতে বলল,

— বললেই হয় আমার নুনুকে দেখেনি, অসভ্য অভদ্র এসব বলার কারণ তো আমি দেখছিনা। শুধু কিভাবে আমার পিছন লাগবে সেই ধান্দা।
আবইয়াজে প্রতুত্তর শুনে আনোয়ার মির্জা নিজের বুক আরেকটু চেপে ধরেন। ছোট ভাইদের চোখের দিকে তাকাতেই তার লজ্জা লাগছে শুধু মাত্র এই অসভ্য ছেলেটার জন্য।
দুহাত ঝেড়ে বিজয়ের হাসি লেগে আছে আহিরের মুখে। আজ সে সবচেয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে ইউনিক প্রপোজ করবে চিত্রাকে । আহির দাঁড়িয়ে আছে শুনশান একটা জায়গায়, আশেপাশে কেউ নেই বলতেই চলে। আহিরের সামনে বেটে একটা গাছ, গাছটির শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে আছে চারদিকে। উপরের দিকটা একেবারে গোল।প্রতিটি ডালে আহির খুব যত্ন করে সুতোঁ দিয়ে চকলেট বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছে পুরো গাছটায় । সবাই ফুল দিয়ে সাজায় আর সে চকলেট, নিজের কাঁধে নিজে চাপড়ে আহির গর্ব করে বলল,

— বাহ আহির বাহ কি সাংঘাতিক বুদ্ধি তোর। এতো বুদ্ধি নিয়ে রাতে ঘুমাস কিভাবে?
হাতের ফুলের বুকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আহির। বেশকিছুক্ষন হলো কিন্তু চিত্রার আসার নাম নেই। আহির পথ পানে চেয়ে বার বার দেখছে আর ভাবছে মেয়েটা এখনো কেনো আসছেনা । আহির আজকে স্কাই ব্লু শার্ট পড়েছে তার সাথে সাদা প্যান্ট, সিল্কি চুলগুলো কপালে পড়ে আছে। হাতে ব্ল্যাক লেদার ঘড়ি। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে চিত্রা আশপাশ ঘুরে ঘুরে দেখে এগিয়ে আসছে। চিত্রা পড়েছে স্কাই ব্লু শাড়ি তার সাথে ফুলহাতা সাদা ব্লাউজ । পিঠ সমান চুলগুলো কার্ল করে রাখা, মুখে তেমন সাজ নেই শুধু লিপগ্লস লাগিয়েছে । আহির বার বার বলে দিয়েছে সে যেনো শাড়ি পড়ে আসে। সবকিছু চিত্রার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে হঠাৎ আহির তাকে একা এভাবে কেনো ডাকলো?
চিত্রাকে দেখেই আহিরের হার্টবিট ফাস্ট হয়ে গিয়েছে । আহির বুকে হাত দিতে আপন মনে বলে ‘হায়’ । চিত্রা আহিরের সামনে গিয়ে এক ভ্রু উচিয়ে চেয়ে আছে। আহিরের হাবভাব ভালো ঠেকছেনা চিত্রার কাছে, তবে কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে। চিত্রার মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠে।
আহির জোড়ে ভিতরে শ্বাস টেনে পিছনে থাকা বুকেটটা চিত্রার সামনে নিয়ে বলতে আরম্ভ করল,

— আই লাভ ইউ চৈত্রের খরা আই লাভ ইউ। চৈত্রের খরা তোর উত্তাপ আমার হৃদয়ে এমনভাবে ছড়ালি চাইলেও আর ঠান্ডা করতে পারছিনা। তোকে এক মূহুর্ত না দেখলে হাঁপানি রোগীর মতো ছটফট করি। দেরিতে হলে ও বুঝতে পেরেছি আই লাভ ইউ মোর দ্যান মাইসেলফ ।
সবই ঠিক ছিল কিন্তু চিত্রা কেবল হা হয়ে আহিরের হাতে ধরে রাখা ফ্লাওয়ার বুকেটটার দিকে । মরিচের ফুল দিয়ে কে প্রপোজ করে? সাথে আবার দু-তিনটা মরিচ ও দেখা যাচ্ছে । চিত্রার ভীষণ রাগ উঠে যায় সে তিরিক্ষি স্বরে বলল,
— মরিচ ফুল দিয়ে কে প্রপোজ করে গাধা? কখনো কাউকে দেখেছো মরিচ দিয়ে প্রপোজ করতে? দেশে কি ফুলের ঠাডা পরেছিল?
চিত্রাকে রাগে ফুসতে দেখে আহির শুষ্ক ঢোক গিলে বলল,

— তোদের মেয়েদের তো সবকিছু ইউনিক পছন্দ তাই ভাবলাম একটু ইউনিকভাবে প্রপোজ করে ।
চিত্রা এখনো চোখ গরম করে তাকিয়ে আছে । আহির একটু এগিয়ে গিয়ে চিত্রার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
— ওরে আমার কাউয়া পাখি, হুতুম পেঁচা, কানা বগির ছানা, শকুনের লেদা বাচ্চারে রাগ করে না সরি আমার ভুল হয়ে গিয়েছে।
আহিরের এমন সম্বোধন শুনে চিত্রা অতিরিক্ত রেগে বলল,
— আমাকে দেখে তোর কাক, শকুন, পেঁচা এসব মনে হয়? শালা এই কারণেই তোর কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই।
চিত্রা আহিরের পিঠে কয়েক ঘা লাগিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে চলে যায় সেখান থেকে।আহির বোকা বনে তাকিয়ে আছে। আজব তো তার কি দোষ? মেয়েরা সব সময় ইউনিক ইউনিক বলে চিৎকার করে এখন যেই সব কিছু ইউনিক করল অমনি বিড়াল বেজার ।
আহির নিজ মনে ফিসফিস করে বলে,

— চায় ইউনিক যেই ইউনিক করলাম এভাবে রেগে গেল কেনো? মরিচ ফুল কি খারাপ এরা ফুল না? আর কাউয়া, পেঁচা, শকুন এরা কি পাখি না? এদের বেলায় এতো বৈষম্য কেনো? হুয়ায়।
চিত্রা যাওয়ার সময় একবার ছোট গাছটাকে দেখে নিল যে টাকে আহির চকলেট দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে ।এমন দৃশ্য দেখে চিত্রার আরো রাগ হলো, এভাবে কে সাজায়? পাগল কোন খানের।

দরজা লাগিয়ে রুমে ঢুকতেই মেহুর চোখ আটকায় বেডের উপর থাকা একটা প্যাকেট ও তার উপর হালকা ক্রিম কালারের একটা কাগজ। মেহু ভ্রু কুঁচকে প্যাকেটটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকে, কৌতহল বশত প্যাকেটটা খুলতেই তার ভিতর চিকেন ল্যাগ পিস ।মেহুর কুঁচ্‌কানো ভ্রু আরেকটু কুঁচকে গেল। প্যাকেটটা বেডের উপর রেখে মেহু এবার পড়তে আরম্ভ করল,
শুন জঙ্গলের মুরগি,

প্রথমেই বলে রাখি আমার চিঠির খুত ধরবি না।হৃদয় গহীন থেকে লিখছি প্রত্যেকটা লাইন মন দিয়ে অনুভব করবি। অবশ্য তুই চাইলে ও খুত ধরতে পারবি না কারন চিঠিটা আমি লিখেছি, আর আবইয়াজ মানেই সব দিক থেকে পারফেক্ট। এখন মেইন পয়েন্টে আসি প্রথমে তুই আমার কাছে করলা আর মুলার মতো ছিলি কিন্তু এখন হুট করেই কেমন সব পরিবর্তন হয়ে গেল ;এখন তোকে দেখতে আলুর মতো কিউট লাগে। তুই আমার কাছে বেড়ে উঠা সদ্য লাউ এর মতো, দেখতে সবুজ কিউট কচি । নিজের প্রেয়সীকে দেখলে নাকি সকলের মন ধুক ধুক করে হার্টবিট ফাস্ট হয়ে যায় কিন্তু তোকে দেখলে আমার পিঠে কাতাকুতু অনুভূত হয় কপালে কেমন চুলকাতে থাকে। তুই আবার মনে করিস না আমি বাকি সব ছেলেদের মতো যে একবার ইউজ করে ফেলে দিব, তুই আমার কাছে সেই ডায়াপার যাকে আমি বার বার ইউজ করতে রাজি আছি। তোকে সত্যি খুব ভালোবাসি যদিও ভালোবাসি শব্দেটা অনেক ছোট কিন্তু বাংলা ইংরেজি এর উর্ধ্বে কোনো শব্দ নেই নাহলে আমি ওটাই বলতাম। আমার চিঠি দেখে খুশিতে লাফিয়ে লাফিয়ে আবার খাটটা ভেঙে ফেলিস না। আর অবশ্যই ছুটে আসবি না আমার কাছে তোকে হুট করে সামলাতে না পেরে আমি নিচে পড়ে গেলে আমার কোমর ভেঙে যাবি, সো আস্তে ধীরে আসবি।
ইতি তোর আদুরে,

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩০

আবইয়াজ.
আবইয়াজের চিঠি পড়ে মেহু কিংকর্তব্যবিমূঢ় । চোখ এখনো বড় বড় করে চিঠির দিকে তাকিয়ে আছে। মেহু মনে মনে ভাবে এটা কি প্রেমপত্র ছিল নাকি অপমানপত্র ছিল? সে লাউ? মুলা? ডায়পার?
রাগে মেহুর মাথা চিরবিড়িয়ে উঠল । আবইয়াজকে জুতা পেটা করতে পারলে মনটা একটু শান্ত হতো।

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৩২