মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৬
তাসনিয়া নুর
মাহির, চিত্রা, আবইয়াজ, মাইরা দৌড়ে সিড়ি দিয়ে নেমেই ঢুকে পড়েছিলো মাইরার রুমে কেনোনা মাইরার রুম একেবারে সিড়ির সাথে । মাহির ঢুকেই নিচে ফ্লোরে শুয়ে পরে আবইয়াজ সোফায় আর চিত্রা মাইরা খাটে। কিছু মূহুর্ত পর চিত্রা খেয়াল করে আহির ছাড়া বাকি সবাই আছে। চিত্রা চিন্তিত কন্ঠে আওরায়
— আহির কোথায়?
চিত্রার কন্ঠে সকলে তার দিকে দৃষ্টি তাক করে তারপর চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে আসলেই তো আহির কই?
নাচ থামিয়ে আহির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেহুর দিকে তাকায় মেহুর দৃষ্টি তখনো তীক্ষ্ণ। আহির ভয়ে কাঁপছে দৌড়ে পালাতে ও ভয় করছে, আহির এবার শুষ্ক ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করে
— নাচ পছন্দ হয় নি আপনার ভূত আন্টি? দাঁড়ান আমি অন্যটা দেখাচ্ছি।
মেহু দুকদম এগিয়ে আসে । মেহুকে আগাতে দেখে আহির দুই হাত বুকের সামনে নিয়ে ক্লাসিকাল ডান্স শুরু করে দেয় আর গাইতে থাকে
…..আমাকে ছেড়ে দে ও ভূতনী
তুমি দেখতে অনেক সুন্দুলী পেত্নী
আজ আমি তোমার জন্য নাচি গো
তাক ধীন তাক ধীন, হু লা লা হু…..
আহির এর গান শুনে মেহু যে প্রচণ্ড বিরক্ত তা তার চেহারা দেখে স্পষ্ট। আহির নাচতে নাচতে দরজার কাছে পৌঁছাতেই সুযোগ বুঝে দিলো এক দৌড় যাওয়ার সময় দেয়ালে বারি খেতে ভুললোনা। মেহু আহিরের যাওয়ার পানে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে কিছু আওড়ালো ।
আহির বড় একটা দা নিয়ে মাইরার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে । হাতের দা আরেকটু শক্ত করে ধরে দরজাটা খুলে ফেলে রুমের ভিতর থাকা সকলে দরজার দিকে দৃষ্টি তাক করে অমনি এক এক জনের কলিজা ভয়ে কেপে উঠে । আহির দা হাতে নিয়ে চিৎকার করে বলে
— শালা ঘষেটি বেগমের জামাই মিরজাফরের বংশধর আমাকে একা ফেলে এসে তোরা এইখানে বসে মজা করছিস আজকে তোদের একটা কে ও ছাড়বো না আমি দারা শুধু।
— ভাইয়া মিরজাফর কবে ঘষেটির জামাই হলো? তুমি দেখি ইতিহাস ও জানোনা কি পড়াশুনা করো ছিহহহ।
মাইরার কথায় যেনো আহির আরও জ্বলে উঠলো সে শক্ত কন্ঠে বলে উঠে
— দাড়াঁ তোকে ইতিহাস কি বোঝাচ্ছি । আমি আহির তোদের মেরে আজকে নতুন ইতিহাস গড়ব ।
আহির কাছে আসতেই এক একটা পুরো রুম জুড়ে দৌড়াতে লাগলো কখনো খাটের উপরে দৌড়াচ্ছে তো কখনো খাটের নিচে। হুট করে আহির পায়ে স্লিপ খেয়ে চিত্রাকে নিয়ে খাটের উপর পরে যায়, আহির উপরে তার নিচে চিত্রা। চিত্রার বুঝি জীবন যায় যায় চিত্রা বহু কষ্টে গলা থেকে কথা বের করে বলে
— ওরে আলু – ময়দার বস্তার ভিতর জলহস্তী উঠ আমার উপর থেকে আমি মরে যাচ্ছি।
আহির চিত্রার মুখমোখি হয়ে বলে উঠে
— উঠবো না থাক আজকে এইভাবে ।
চিত্রা আর আহিরের মাঝে দুরত্ব একটু আহিরের নিশ্বাস চিত্রার মুখে আছড়ে পরছে । চিত্রা ভালো করে আহিরের দিকে খেয়াল করে ফর্সা চেহারা রাগের ফলে রক্তিম হয়ে আছে মাথার সিল্কি চুল গুলি কপালে এসে ঠেকেছে, ঘন ভ্রু আর চোখের পাপড়ি তার সাথে খোচা খোচা দাড়ি কি সুন্দর মানিয়েছে ছেলেটাকে। আহির চিত্রার ঘোর লাগা দৃষ্টি দেখে বলে উঠে
— আই নো আমি একটু বেশিই হেন্ডসাম তার মানে এই নয় যে তুই আমায় চোখ দিয়ে গিলে খাবি।
কখন থেকে এদের কাহিনী দেখেছে মাহির, মাইরা ও আবইয়াজ। মাহির এদের কাছে গিয়ে আহিরকে টেনে তুলে। আবইয়াজ সোফায় ধপ করে বসে বলে
— তোদের বাল সাল বুদ্ধির জন্য আমার আজকের ঘুম হারাম হয়ে গেসে। যা এখন সব নিজের রুমে ।
— শুনোনা আমার কাছে আরেকটা প্ল্যান আছে।
— আর আমার কাছে একজোড়া নতুন হকিস্টিক আছে । আশা করি এক বারিতে তোর তরমুজের মাথাটা ফেটে যাবে।
আবইয়াজে উত্তরে মুখ বাঁকালো চিত্রা। আজকাল তার মতো বুদ্ধিজীবী মানুষের কোনো দামই নেই কোথায় গেলো মানবতা কে জানে। চিত্রার অবস্থা দেখে আহির মিটিমিটি হাসছে একদম ভালো হয়েছে।
সকালে রান্না ঘরে বেশ তোড়জোড় চলছে তিন জা মিলে নাস্তা তৈরি করতে ব্যস্ত এদের দেখলে কেউ বলবেনা এরা জা। দেখে মনে হয় এক মায়ের পেটের আপন বোন ।
— ছোট যা গিয়ে দেখতো সবাই এসেছে কিনা । তাড়াতাড়ি নাস্তা দিতে হবে বাচ্চা গুলো আবার ভার্সিটি যাবে।
ফিরোজা কাজ সামলাতে সামলাতে কথাটা বলেন। তার কথায় সায় জানিয়ে মুন চলে গেলেন ডাইনিং টেবিলে ।
ঘুম জড়ানো চোখে ঢলোঢলো পায়ে সিড়ি দিয়ে নামছে মাহির । রাতে এত কাহিনীর ফলে ঘুমটাও ভালো মত হয়নি। হাই তুলতে তুলতে টেবিলে সামনে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে পরে । আহির ও ঢলোঢলো পায়ে নেমে আসে। সায়মা বেগম পিছন থেকে দুইজনের মাথায় চাটি মেরে বলেন
— তোরা কি এখনও বাচ্চা রয়ে গিয়েছিস? আমার কি এখনো তোদের ব্রাশ করার কথা বলতে হবে, ফ্রেশ না হয়ে প্রতিদিন নিচে চলে আসে।
— মেজো আম্মু ওদের কিছু বলে লাভ নেই এরা গরু ছাগল সো ব্রাশ করে এদের কি হবে?
চেয়ার টেনে বসতে বসতে কথাটা বলে চিত্রা। আহির গরম চোখে চিত্রার দিকে তাকায়। সেই সময় মেহু আসে নিচে পরনে তার কালো কালো চুরিদার। ফিরোজা বেগম মেহুকে দেখে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে দু হাত মেহুর গালে রেখে বলেন
— মাশাল্লাহ কি সুন্দর লাগছে আমাদের পরিটাকে। কারো নজর না লাগুক।
মেহু লজ্জায় মাথা নত করে ফেলে। ফিরোজা বেগম হেসে ফেলেন। ধীরে ধীরে বাড়ির সবাই টেবিলে উপস্থিত হয় শুধুমাত্র আবইয়াজ ছাড়া।
পুরনো ঢাকার ব্যস্ত রাস্তাগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় লাল ইটের দেয়াল, ভোরের প্রথম আলোয় চকচকে করিডোর, আর অবিরাম ছাত্রছাত্রীর হাঁটাচলা যেন পুরো ক্যাম্পাসটাকে জীবন্ত করে রাখে। চারদিকে চায়ের দোকান, বইয়ের স্টল, আর নদীর বাতাসে ভেসে আসে শহরের বিশেষ গন্ধ যা নতুন ছাত্র থেকে শুরু করে চতুর্থ বর্ষের সবার মনেই আলাদা টান জাগায়।
মাহির, আহির, চিত্রা আর আবইয়াজ চারজনই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। মাহির আর আহির দু’জনেই চতুর্থবর্ষে। আবইয়াজ মাস্টার্স প্রথম বর্ষের আর চিত্রা পড়ে ১ম বর্ষে।
আধঘন্টা যাবত গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে চিত্রা সাথে রয়েছে চিত্রার নিউ ফ্রেন্ড ইশরা। চিত্রা আর ইশরার যাওয়ার পথ একই তাই চিত্রা ইশরাকে জুড় করে নিজের সাথে নিয়ে এসেছে অথচ আজই বাড়ির গাড়ি আসার নামই নেই । ঠিক কিছুক্ষন পর একটা বাইক এসে ওদের সামনে থামে। চিত্রা বিরক্তি মাখা ফেস নিয়ে সেদিকে তাকায় কেনোনা তার ধারণা রয়েছে এইটা কে হতে পারে। আহির নিজের হেলমেট খুলে চিত্রার দিকে দৃষ্টি তাক করে বলে
— এই চৈত্রের আগুন এই কাঠফাটা রোদে নিজেকে না পুড়িয়ে চল আমার সাথে তোকে বাসায় নিয়ে এসির নিচে ঠান্ডা করি। তাহলে যদি তোর মাথার আগুন একটু ঠান্ডা হয়। বসে পর।
— যাবোনা আমি তোমার সাথে । যাওতো মাথা খেয়োনা ।
পাশে থাকা ইশরা হা করে আহিরের দিকে তাকিয়ে আছে এতো হ্যান্ডসাম ছেলে এর আগে দেখেছে কিনা তার সন্দেহ হচ্ছে আর চিত্রা কিনা এই ছেলেকে রিজেক্ট করছে। সে হলে এতক্ষণে উড়ে গিয়ে বসে পড়তো। একবার কি জিজ্ঞাসা করবে কে এই ছেলেটা? যেই ভাবনা সেই কাজ
— চিত্রা উনি তোমার কি হয়?
চিত্রা চোখ ছোট করে ইশরার দিকে তাকায় বিচক্ষণতার সাথে পর্যবেক্ষণ করে বলে
— এ হচ্ছে মানুষের বাচ্চা গাধা। দেখতে ফিটফাট কিন্তু ভিতরে সদরঘাট ।
— তোকে আমার ভিতর দেখায়ছিলাম নাকি?
চিত্রা ভড়কে যায় কোথায় ভেবেছিলো হয়তো আহির রেগে চলে যাবে কিন্তু এই নির্লজ্জতো কি সব বলছে। চিত্রা রেগে আঙুল তাক করে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আহির তাকে থামিয়ে দিয়ে আশার দিকে তাকিয়ে বলে
— হেই সুইট লেডি চলো তোমাকে একটা সুইট রাইড দেই ।
ইশরা খুশিতে গদগদ হয়ে উঠে এতক্ষণ এইটারইতো অপেক্ষা করছিলো। আহিরের দৃষ্টি তখনো চিত্রার দিকে নিবদ্ধ । পিছনে কেউ বসেছে বোঝতে পেরেই চিত্রার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে বাকা হাসি টেনে শাই শাই করে বাইক চলে যায়। এবার চিত্রার ঠোঁটে বাকা হাসি ফোটে তার ডান হাত ইশরার বাঁ হাতে নিবদ্ধ।
— এইটা তুমি কি করলে চিত্রা।
চিত্রা ভ্রু কুঁচকে বলে
— তুমি চুপ থাকো। অনেক শখ না সুন্দুরী মেয়ে নিয়ে ঘুরবে এইবার বুঝুক ঠেলা ।
ইশরা থমথমে আধার নামা মুখ নিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রয়।
আহির গুন্গুন্ করে গান গাইছে আহির। কিছু মূহুর্ত পর আহির পিছন না ঘুরে জিজ্ঞেস করে
— আপনার বাসা কোন দিকে বললেন না যে।
— সোজা গিয়ে লেফট তারপর রাইট।
নারী রিনরিনে শব্দের বিপরীতে শক্ত পুরুষালী লাজুক কন্ঠস্বর পেয়ে হঠাৎ ব্রেক কশে আহির । পিছন ঘুরে যেই অবস্থানরত ব্যক্তিকে দেখতে পেলো অমনি আহিরের দুনিয়া উল্টে উঠলো। মনে হলো বাংলা সিনেমার মতো চারদিকে বজ্রপাত হতে লাগলো। এইটা কি দেখলো সে তার পিছনে শাড়ি পরিহিত সর্ট হাতায় পুরুষয়ালী লোমগুলো ভাসমান , ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক কপালে বড় একখান টিপ আর গালে চাপ দাড়ি। আহিরের দিকে তাকিয়ে লাজুক লাজুক হেসে বলে
মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ৫
— হ্যালো আমি মিস রিফাত আহমেদ।
এমন সম্মোধনে আরেকটু ভড়কালো আহির। বলে কি মিস ও আবার রিফাত আহমেদ ও বলছে। আহির নিজের মাথা দু হাত চেপে ধরে এক পা এক পা পেছাতে পেছাতে দিলো উল্টো দিকে ভৌ দৌড়। আহিরকে চলে যেতে দেখে রিফাত বলে উঠে
— হ্যান্ডসাম কোথায় যাচ্ছো আমাকে একা রেখে? আমি এখানে থাকলে ছেলেরা আমাকে ডিস্টার্ব করবে তো।
— টাকা দিয়ে যদি বলে হালা তোরে ডিস্টার্ব করতে তাও কেউ তোর কাছেই আসবো না।
দৌড়াতে দৌড়াতে উত্তর দিলো আহির …….
