Home মন পিঞ্জিরা মন পিঞ্জিরা শেষ পর্ব

মন পিঞ্জিরা শেষ পর্ব

মন পিঞ্জিরা শেষ পর্ব
শ্যামলী রহমান

আজ আশ্বিনের বিশ তারিখ।ইংরেজি ক্যালেন্ডারে পাঁচ অক্টোবর।আজকের দিনটি একটু বেশিই সুন্দর।অক্টোবর মানেই বিষণ্ন সুন্দর একটা মাস।আকাশের বুকে নরম রোদ,বাতাসে হালকা শীতলতা,আর আকাশে ভেসে বেড়ায় একরাশ সাদা নীল প্রশান্তির মেঘ।গাছের পাতায় মৃদু হলুদ ছোঁয়া,বিকেলগুলো যেন হাওয়ায় ফুরায়। মন চায় আরও কিছুক্ষণ আলো ধরে রাখলে ভালো হতো।

আজকের দিনটা অন্যসব দিনের চেয়ে একটু বেশিই সুন্দর লাগছে।মিথি একা ঘরে শুয়ে আছে।শুয়ে বসে থাকা কাজ নেই।এই শহরে একলা বন্ধি জীবন খুব একটা ভালো লাগে না।প্রহর দশটায় অফিসে যায় ফিরে সন্ধ্যে হলে।সারাটি দিন একা থাকতে হয়।পাশের বাসায় পরিচয় হয়েছে মাঝে মধ্যে ওই বাসার মেয়েটা এসে গল্প করে।
কিন্তু এই একলা সময় যেন কাঁটতে চায় না। মনে পড়ে যায় বাবা মা আর রিতির কথা।বাড়ির কথা মনে পড়লেই চোখে জল টলমল করে।পুরো গ্রাম চষে বেড়ানো মেয়েটাকে আজ একলা থাকতে হয়।অথচ এক সময় ঘরে তাকে পাওয়া যেত না।মাঠে ঘাটে ছুটে বেড়াতো।

এই ছয় মাস বিবাহিত জীবনে সুখে থাকলেও একাকিত্ব মনে হলেই ভালো লাগে না।প্রহর কষ্ট পাবে বলে তাকে কিছু বলেও না।বললে হয়তো বাড়ি পাঠাবে কিন্তু সে তো তাকে ছাড়াও থাকতে পারবে না।মানুষটা তার অভ্যাসে পরিনত হয়েছে।শহরে অন্য সমস্যা নেই,সমস্যা শুধু একা ঘরে থাকাটা।কেমন খাঁচায় বন্ধি পাখির মতো লাগে।রিতি কে ভীষন মনে পড়ে,পুকুর পাড়ে বসে থাকা দিনগুলো,একসাথে পুরো গ্রাম চষে বেড়ানো,হাত হাত রেখে চলা সময় গুলোও।এই ছয় মাসে বাড়ি গিয়েছিলো একবার। সেবার প্রীতি, মোবিন আর তার মেয়েকে নিয়ে গেছিলো প্রহর। চোখের সামনে কতদিন পর মেয়েকে দেখে সুচরিতা বেগম আবেগে কেঁদে দিয়েছিলো।সোলাইমান দেওয়ান দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো।প্রহর শমসের দেওয়ান কে বুঝিয়েছিলো।প্রীতি আপা ভীষণ ভালো আছে। কার বংশ আগে কি করেছে তা কি অত্যাবশকীয়?কোনো কাজ ছোট নয়।ছোট তো আমাদের মতো মানুষের মনমানসিকতা।

সে এখন সরকারি চাকরি করে।
প্রহর এবং সকলের বুঝানোতে আট বছর পরে মেনে নিয়েছিলো।আট বছর পর আবারো চেনা বাড়িতে পা রাখেছিলো প্রীতি। মা বাবা ভাই বোন বাড়ির সকল কে দেখে তার খুশি এবং কান্নায় সকলে কেঁদে ফেলেছিলো।সেই সময় পাঁচদিন থেকে এসেছে তার পর আর যাওয়া হয়নি।অফিস থেকে কম ছুটি।মোহনিয়া বেগমের সাথে একটু আগে কথা হয়েছে।মানিক সাহেব ভালো হয়েছেন।প্রহর কে মেনে নিয়েছে আগের ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চেয়েছে।তার সাথে কথা বলে প্রায়ই।

সময়ের সাথে কত কিছুর পরিবর্তন হয় তাই না?
এর মধ্যে আরো একটা কাহিনি হয়েছে।
একমাস আগে পাভেল আর হিমির বিয়ে হয়েছে।
হিমির বাবা মেনে নেয়নি।প্রহর আসিফ আর কিন্তু বন্ধু মিলে বিয়ে দিয়েছে।পাভেল এখন বেসরকারি কোম্পানিতে জব করে।তাদের সংসার ও ভালোই চলছে।দুইদিন আগেই এসেছিলো।আসিফ সে একা হয়ে গেছে।বিয়ে মানুষ কে বন্ধ বান্ধবীর কাছ থেকে দূরে সরায়,সম্পর্কে ফিকে হয়ে যায় এ কথা আসলেই মিথ্যে নয়।
চাইলেও আগের মতো হয়ে উঠে না।সংসার জীবনে দায়িত্ব, ব্যস্ততা বেড়ে যায়। এটা একজন নয় সবার জীবনেই হয়।

বিছানা থেকে উঠলো।প্রহর অফিসে যাওয়ার পর থেকে শুয়ে আছে। কাজ ও তেমন কিছুই নেই।
মিথির কি যেন মনে হলো শার্লিন কে ফোন দিলো।
প্রহর এখানে আসার পর ফোন কিনে দিয়েছে।
কল দিতেই শার্লিন রিসিভ করলো।ফোনের স্কিনে ভেসে উঠলো শার্লিনের হাঁসি মাখা মুখটি।
“কেমন আছো আপা?
“আমি তো সব সময় ভালো থাকি।
“পিয়াস ভাই কি মন থেকে মেনে নিয়েছে?
শার্লিন হেঁসে ফেললো।পাশেই পিয়াস বসা।তার হাঁসি দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“তাকেই জিজ্ঞেস কর ফোনটা পিয়াসের দিকে ঘুরালো।পিয়াস স্বাভাবিক ভাবে তাকালো মিথির একটু কেমন লাগলেও পিয়াসের কথায় ধারণা পাল্টে গেলো।

“কি জিজ্ঞেস করবি?বাড়ি আসবি না?পেয়ারা গাছে পেয়ারা সব পাখিরা খেয়ে নিচ্ছে,রিতি রোজ তোর কথা ভেবে মন খারাপ করে পুকুরপাড়ে একা বসে থাকে।দাদা তো তোর কথা সারাদিন বলে তার গানের সঙ্গী হারিয়ে গেছে।
মিথির মন খারাপ হলো।তার ও সবার কথা মনে পড়ে।ফোনে দেখলে কথা বললে তো মন ভরে না।মন চায় ছুঁটে চলে যাই।
শার্লিন এবার ফোন নিজের সামনে ধরলো।মিহির আঁধার মুখ দেখে বলল,
“প্রহর ভাই বলল একলা থাকতে নাকি ভালো লাগে না তোর?তাহলে একটা বুদ্ধি দেই শোন।
মিথি আগ্রহ নিয়ে চেয়ে থাকলো।শার্লিনের কথা শুনে মিথি চোখ বড় বড় তাকালো সাথে লজ্জা পেলো। পাশে পিয়াস আছে সেও তাকালো শার্লিনের দিকে।

“ভুল বলেছি?একটা বাচ্চা থাকলে তাকে নিয়ে সময় কাঁটতো।বলেন পিয়াস ভাই ঠিক বলেছি না?
মিথি লজ্জায় পড়লো।উত্তর না দিতে পেরে হুট করে ফোন কেটে দিলো। এদিকে শার্লিন হেঁসে চলেছে।ওর হাঁসি দেখে পিয়াস বাঁকা চোখে তাকালো।বলল,
“এসব ফাউল বুদ্ধি কই পাস?
“আপনার থেকে।
পিয়াস অবাক করা চাহনি নিয়ে তাকালো।জানতে চাইলো,
“আমার থেকে মানে?জানিস আমি ভদ্রলোক।এমন দুষ্টু বুদ্ধি আমার মাথায় ঘোরে না।যারা তোর মতো দুষ্টু বাঁদর তাদের মাথায় ঘুরে।

“হ্যাঁ এজন্যই তো আপনি একটা….
শার্লিন কথা খুঁজে পাচ্ছে না।
“আমি একটা কি বল?
“মনে পড়লে বলবো হু।মুখ বেঁকিয়ে উঠে পড়লো।
দরজার দিকে পা বাড়ালে পিয়াস ওড়না টেনে ধরলো।শার্লিন থেমে গেলো। পিছনে তাকানোই আগেই জোরে টান দিলো।সে ধাক্কা সামাল দিতে না পেরে পিয়াসের দিকে এগিয়ে গেলো।ওর উপর পড়তে গিয়েও পড়লো না।আঁটকে রইলো দু’হাতের মাঝখানে।পিয়াস শার্লিনকে দুহাতে জড়িয়ে রেখেছে।ছাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। পিয়াস শুধু হাঁসছে আর তার কাহিনি দেখছে।

“ছাড়ুন!আপনি না ভদ্রলোক?
“হ্যাঁ ভদ্রলোক।তাতে কি?ভদ্রলোকের প্রমাণ কি বউয়ের কাছে দিতে হবে?
“ন না মানে। আম্মা ডাকছে।
“ভালো না বাসলেও মুখ ভার থাকতি, এখন ভালোবাসার কথা বললেও লজ্জায় পালাস?আসলে চাস কি?অথচ মানুষ কে দুষ্টু বুদ্ধি দিচ্ছিস।প্রহর ফোন করলে ওকে বলবো তুই মিথিকে কিসব বুদ্ধি দিস।তোকে থাপ্পড় মেরে সোজা করবে।

“এই না এসব বইলেন না। আমার লজ্জা লাগবে।প্রহর ভাই না।
“ওরে লজ্জাবতী। কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে বলল কথাটা।
শার্লিন থেমে গেলো।বুক ধুকপুক করছে।অনুভূতিরা ডানা মেলে মন আকাশে উড়ছে।
শার্লিনের মুখের দিকে চেয়ে হুট করে পিয়াস ওকে ছেড়ে দিলো। ছাড়া পেতেই শার্লিন বাহিরে ছুটলো।
পিয়াস পিছন থেকে শব্দ করে হেঁসে উঠলো।
সময়ের সাথে আসলেই অনেক কিছু বদলায়।একটা মানুষের সাথে এক ঘরে থাকতে থাকতে মায়া জন্মায়।ভালোবাসা না হোক ভালোলাগা জাগে।সেই ভালোলাগা থেকে ভালোবাসার পরিনত হয়।তাদের সম্পর্ক ঠিক তেমনই হয়েছে।আজ ভালো লাগা তৈরি হয়েছে কাল ভালোবাসা।

ধরনীতে সন্ধ্যে নেমেছে।সূর্য ডুবেছে একটু আগেই।মিথি প্রহরের আসার অপেক্ষা করছে।বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।মিথির কাছে দিনের সবচেয়ে আনন্দময় সময়টা এই সন্ধ্যেবেলা।
পাখিরা যেমন সন্ধ্যে হতেই ফিরে যায় নীড়ে,তেমনই প্রহর ও আসে তার ভালোবাসার গন্তব্যস্থলে।
অপেক্ষা ফুরলো দূর থেকে প্রহর কে রিকশায় করে আসতে দেখলো।অফিস বেশি দূরে না কাছেই।দুপুরে খেতে আসে তবে আজ আসেনি।কাজের চাপ বেশি ছিলো সেখানে খেয়ে নিয়েছে।
মিথি ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার কাছে দাঁড়ালো।
প্রহর রিকশা থেকে নেমে বাড়ির ভেতরে আসতেই নিত্যদিনের ন্যায় প্রিয় হাঁসি মাখা মুখটা দেখতে পেলো।ক্রান্তির শহরে মায়াবী হাঁসিটা তাকে তৃপ্তি দিলো। মিথি এসে প্রহরের হাত থেকে অফিসের ব্যাগটা নিয়ে ঘরে গেলো দুজনে। এক গ্লাস ঠান্ডা পানি সামনে ধরলো।প্রহর খেয়ে নিয়ে হাঁসলো।ওড়নায় মুখ মুছে বলল,

“স্বপ্ন এখন সত্যি হয়েছে।আমাদের ছোট্ট সংসারে ভালোবাসার ঢেউ খেলছে।
“দুপুরে আসেননি যে?
“আজ কাজ ছিলো তাই আসিনি।তোমাকে বললাম না দুপুরে?
“হুম।
প্রহর ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বাহির করলো।মিথি দেখছে শুধু। প্যাকেট থেকে বেলি ফুলের গাজরা আর কয়েকটা শিউলি ফুল মিথির হাতে দিলো।
মিথি যেন খুশিতে নেচে উঠলো।শিউলি ফুল তার ভীষণ পছন্দ।এক সময় এই শিউলির সাথে প্রহরের তুলনা করতো।বছরের একবার দেখা মিলতো বলে।আজ মানুষটা প্রতিদিন তার পাশে থাকে। চোখ বন্ধ করে বেলি ফুলের ঘ্রাণ নিলো। বেলির মাতাল করা ঘ্রাণে মুগ্ধ হতে বাধ্য সবার মন।
প্রহর মিথির হাত থেকে একটি শিউলি ফুল নিয়ে কানে গুঁজে দিলো,বলল,

“আমার শিউলি ফুলকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।
অক্টোবরে মতোই শুদ্ধ তার মন।যে মনে আমার জন্য চিরকাল ভালোবাসা বহাল থাকুক।”
মিথি অবাক হলো।আজ পাঁচ অক্টোবর তার জন্মদিন তারই মনে নেই। অবশ্য এসব জন্মদিন কোনো কালে পালন করা হয়নি তাই মনেও রাখেনি।
প্রহর আরো একটা ছোট কাগজে মোড়ানো জিনিস বাহির করে মিথির হাতে দিলো।
মিথি ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“এটায় কি?
“খুলে দেখো।
মিথি পেপারে মোড়ানো জিনিসটি খুললো।
চকচকে এক ডর্জন নীল চুড়ির দেখা পেলো।ঠোঁটের হাঁসি যেন আরো শিথিল হলো।
মিথির সেই মেলার দিনের কথা মনে পড়লো।এমনভাবে পেপারে মোড়ানো চুড়ি ছিলো।

“একদিন লুকিয়ে দিয়েছিলাম আজ নিজ হাতে দিচ্ছি।এমন একটা সময় আসবে জীবনে কখনো কি ভেবেছি?
মিথি প্রহরের দিকে হাত এগিয়ে দিলো।প্রহর বুঝতে পারলো সে চায় কি।কাঁচের চুড়িগুলো মিথির হাতে পরিয়ে দিলো।বেলি ফুলের গাজরা টা চুলের খোঁপায় সাজিয়ে দিলো।তার পর মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকলো।
মিথি তার দৃষ্টি লক্ষ্য করে লজ্জা পেলো।তার এই তাকিয়ে থাকার অভ্যাস যেন গেলো না।
“আপনি এখন আমাকে এতো ভালোবাসেন যে,শেষ পর্যন্ত এরকমই ভালোবাসা থাকবে তো?নাকি গ্রামে বলা প্রবাদ বাক্য ভালোবাসা একদিন জানালা দিয়ে পালাবে?
প্রহর মুঁচকি হাঁসলো।সামান্যতম দূরত্ব টুকু ঘুচিয়ে ফেললো।মিথির হাতটা ধরে চোখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে গাইলো,

তুমি আমার এমনই একজন
যারে এক জন্মে ভালোবেসে ভরবে না এ মন।
এক জনমের ভালোবাসা,এক জনমের কাছে আশা,
এক জনমের ভালোবাসা, এক জনমের কাছে আশা,
একটি চোখের পলক পড়তে লাগে যতক্ষণ।
তুমি আমার এমনই একজন…..
যারে এক জন্মে ভালোবেসে ভরবে না এ মন।
প্রহর থামলো।মিথি মুগ্ধ হয়ে শুনলো তার গান।মানুষটার মধ্যে তাকে মুশগুল করার কত অভিনব গুন রয়েছে।
“আপনি কবিতার সঙ্গে গান ও সুন্দর গাইতে পারেন কবি সাহেব।
“তোমার জন্য কবি গায়ক সবই না হয় হলাম।
মিথি একটু দূরে গেলো।চুড়ি পরা হাত দুটো প্রহরের সামনে ধরলো।হাত নাড়িয়ে রিনিঝিনি আওয়াজ তুললো।তার পর নিজে নিজে খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠলো।প্রহর বরাবরের ন্যায় সেই হাঁসিতে মুগ্ধ হলো।নেশাক্ত চোখে তাকিয়ে,কন্ঠে মাদকতা মিশিয়ে বলল,

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৯+৩০

“তোমার মুখে এই হাঁসি দেখার জন্য,
তোমার সঙ্গেই অনন্তকাল বেঁচে থাকতে চাই।”
“আর আমি আপনার সঙ্গেই মৃত্যু বরণ করতে চাই।”
প্রহর এগিয়ে আসলো।মিথির কপালে গাঢ় চুমো এঁকে দিলো।গালে হাত রেখে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“চলো হারিয়ে যাই এই শহরের কিনারায়,
জীবন,মরণ পরের হিসাব,যতদিন বেঁচে আছি, সুখে-অসুখে একসাথে থাকি।

সমাপ্ত