Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ২৩

মহামায়া পর্ব ২৩

মহামায়া পর্ব ২৩
তুশকন্যা

ফিটার হাতে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে আনায়া, কেনীথের রুমে প্রবেশ করে। আলতোভাবে দরজাটা ঠেলে দিয়ে রুমের ভেতরে এগিয়ে যায়।পরনে লাল টুকটুকে হাঁটু সমান গাউন।আর নিচে সাদা রঙের ডাইপার পড়া। আঙুল সমান চুলগুলোকে একসাথে করে, মাথার দুপাশে দুটো তালগাছের ন্যায় ঝুটি বাঁধা।
রুমে প্রবেশ করতেই আনায়া দেখে, উন্মুক্ত গায়ে শুধু মাত্র একটা কালো রঙের টাওজার পরে—বিছানায় উপর হয়ে শুয়ে আছে ভিভিয়ান। হাতদুটো বিছানা হতে নিচের দিকে ঝোলানো। বিছানা আর জামা নষ্ট হওয়ায়, ভিভিয়ান তখন তখনই গোসল সেরেছে। কাশফিয়াও ভালোমতো ছেলের ঘরটা পরিষ্কার করে দিয়ে গিয়েছে।
আনায়া কিঞ্চিৎ কপাল কুঁচকে আরেকটু সামনে এগিয়ে যায়। গিয়ে দেখে, কেনীথ এভাবে উপর হয়ে ভিডিও গেইম খেলছে।

হাত দুটো ফ্লোরের সাথে ঠেকানো। আর ওভাবেই ফোনের মাঝে ঝড় তুলে দিয়ে গেইম খেলতে ব্যস্ত সে। আনায়া কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভাবতে লাগল। ভাবনা শেষে পরক্ষণেই আবার মুচকি হাসল। তার হাসিতে ফর্সা গাল দুটোর একপাশটায় একটা ছোট টোল, ও অপর পাশটায় খানিকটা বড় টোল ফুটে উঠল। আনায়া আর বেশিকিছু না ভেবে, ভিভিয়ানের দিকে ছুটে এগিয়ে যায়।
তবে বিছানার কাছে আসতেই যেন বিপত্তি বাঁধে। তার উচ্চতার তুলনায়, বিছানার উচ্চতা যথেষ্ট বেশি। সে তো উপরে উঠতেই পারবে না। আনায়া কিছুটা হতাশ হয়ে, নিজের বাম হাতে থাকা ফিটারের দিকে ঠোঁট উল্টে তাকিয়ে রইল। আর ঠিক তৎক্ষনাৎ একটা বলিষ্ঠ হাত তার দিকে এগিয়ে এলো।
আচমকা নিজের সামনে কারো হাত দেখে সে কিঞ্চিৎ চমকায়। পরক্ষণেই মাথা উঁচিয়ে দেখতেই বোঝে এটা তার ভিভান ভাইয়ার হাত।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ভিভিয়ান একহাতেই তুমুল গতিতে ভিডিও গেইম খেললেও, অন্যহাতটা আনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ তার নজর এখনো স্থির হয়ে রয়েছে, ফোনের স্ক্রিনে। ওদিকে আনায়া যেন এটা দেখেই প্রচন্ড খুশিতে মুচকি হেসে উঠল। একটুও সময় নষ্ট না করে ভিভিয়ানের হাতের সাহায্যে সহজেই বিছানায় চড়ে বসল। আর ভিভিয়ানও যেন নিজের দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটিয়ে পুনোরায় গম্ভীরমুখে দু’হাতে গেইম খেলতে লাগল।
—“ডাইপার পরে এসেছিস? আজও আমার বিছানা নষ্ট হলে কিন্তু তোর খবর আছে।”
আচমকা ভিভিয়ানের গম্ভীর কন্ঠের প্রশ্নের জবাবে,ছোট্ট আনায়া শুরুতেই খানিকটা হকচকিয়ে যায়। পরক্ষণেই সে আবার আধোআধো স্বরে বলতে লাগল,
“হুম,মাকে বলেচিলাম তোমার রুমে আছব। এইজন্য দাইপার পড়িয়ে দিয়েসে।”

ভিভিয়ান আর কিছু বলে না। এদিকে ছোট্ট আনায়া ভাবছে, বিছানায় তো চড়ে গিয়েছে—কিন্তু এখন সে করবেটা কি? তার ভিভান ভাই তো খুব বেশি কথা বলে না। আবার সে কথা বললেও, ভিভান বিরক্ত হয়। আনায়া স্থির হয়ে বসে, নজর এদিক সেদিক ঘুরিয়ে আবারও কিছু একটা ভাবতে শুরু করে।
ভিভিয়ানের ধ্যান তার দিকে নেই। এখন পর্যন্ত একবারও আনায়ার দিকে ফিরেও তাকায়নি। এই ভেবেই আনায়া কিছুটা হতাশ। হতাশায় নিমজ্জিত হয়েই সে ভারী শ্বাস ফেলে মলিনভাবে মুচকি হাসে। ফিটার মুখে নিজের খাবার খেতে খেতেই, আচমকা তার নজর এক বিশেষ জিনিসের দিকে পড়ে।

আনায়া তখন ভিভিয়ানের উন্মুক্ত প্রশস্ত পিঠ ও বলিষ্ঠ বাহুর সংযোগস্থলে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। সামনেই দৃশ্যমান ভিভিয়ানের সুগঠিত বলিষ্ঠ বাইসেপ। নিয়মিত জিম করে যে বলিষ্ঠ শরীর বানিয়েছে, তা এই বয়সেই যথেষ্ট আকর্ষণীয়।আনায়ার নজরও এই আকর্ষণীয় জিনিসটাকে অতিক্রম করতে পারল না।
তবে তার চিন্তাভাবনা নিত্যন্তঔ স্বাভাবিক ও শিশুসুলভ দুষ্টমিতে ভরা। ভিভিয়ানের এই ফোলাফোলা ম্যাসেলস্ তার কাছে কিছুটা মজাদার খেলনা বস্তুর মতোই লাগল। কেনো যেন এটা দেখে সে নিজের হাসিই থামাতে পারছে না।
আনায়া কুটিকুটি করে হাসতে হাসতেই, ভিভিয়ানের ফোলা ফোলা মাংসপেশীতে নিজের ছোট্ট হাতের তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে একটা গুঁতো দিল।মুহূর্তের মাঝেই সেই সুদৃঢ় পেশিটি আঙুলের চাপে খানিকটা ভেতরে ডেবে গিয়ে পরক্ষণেই আবার আগের মতো সমান্তরাল হয়ে এল।এটা দেখে আনায়ার মুখে এক বিস্তৃত হাসি ফুটে উঠল। সে আগ্রহী হয়ে, পুনোরায় তর্জনী আঙুল দিয়ে একইস্থানে গুঁতো দেয়। আবারও সেই একই ফলাফল। আনায়া যেন আর হেসে বাঁচে না। সে অচিরেই খিলখিলিয়ে হেঁসে ওঠে। তার হাসির তালে ছোট্ট ছোট্ট দাঁতগুলো ও গালের ছোট-বড় টোলদুটোও ফুটে ওঠে।

তবে তার এই হাসি, খুশি, আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না। বরং তার আগেই আচমকা ভিভিয়ানের গম্ভীর নিরেট কন্ঠস্বরে সে কেঁপে ওঠে। ওর কাজকর্মে ভিভিয়ান বিরক্ত হচ্ছিল বিধায়,সে হালকা ধমকের সুরে বলে,
“আহ্ তারা! বিরক্তি করিস না!”
ব্যাস! শুধু এই সামান্য কথাতেই আনায়া সম্পূর্ণ চুপসে যায়। মাথা নুইয়ে বসে থাকে আরো মিনিট খানেক সময়। এর পরপরই আবার সে মুচকি হেসে ফেলে। কেননা এই সময়টুকু সে, অতিযত্নের সাথে তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিন্তায় ব্যবহার করে ফেলেছে। ফলাফলস্বরূপ, সে তার ভিভান ভাইয়ার কথায় অসন্তুষ্ট নয়। আর হবার প্রশ্নও ওঠে না।
এই কারণে সে একটুও মন খারাপ না করে, সুন্দর মতো ভিভিয়ানের উন্মুক্ত পিঠের উপরে চড়তে লাগল। এটার অনুমতি সে আগেও পেয়েছে। তাই সে জানে—এতে ভিভিয়ান তাকে কিছু বলবে না। অবশ্য ভিভিয়ান সেভাবে কখনো তাকে কিছু বলেও না। বরং তার গম্ভীর কন্ঠ ও সামান্য ধমকেই সে কুপোকাত। অথচ দিনশেষে তার পিছুও ছাড়তে পারে না।

ভিভিয়ানের মস্ত বড় পিঠটায় চড়তে আনায়ার বেশ বেগ পেতে হলো। সে যেন কোনো মানুষের পিঠে নয়, বরং সে মাউন্ট এভারেস্টে চড়েছে। যার বলিষ্ঠ পৃষ্ঠদেশের উঁচু নিচু স্থান গুলো, আনায়ার কাছে একেকটা বৃহৎ আকারের ঢালের ন্যায়।
পিঠের ঠিক মাঝবরাবর উঠে সে চুপটি করে বসল। অতঃপর ভিভিয়ানের এলোমেলো চুলগুলো দেখে নিমিষেই তার চোখমুখ নিমজ্জিত হলো আবারও এক গভীর চিন্তাভাবনায়। তার এই ভাইয়ের চুলগুলো নিজের চুলের চেয়েও বড়। অথচ তার মা তার চুলের কত যত্ন করে দেয়, আবার ভিভিয়ানও তার চুলের কত যত্ন নেয়—অথচ সে নিজের চুলগুলো সবসময় এই হাল করে কেনো রাখে?
আনায়া জানে না এই প্রশ্নের উত্তর। কারো কাছে জিজ্ঞেস করারও সুযোগ হয়নি। তবে সে এখন এসব নিয়ে না ভেবে, সরাসরি ভিভিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল,

“বিবান বাইয়া,তোমার…”
আনায়ার কথা শেষও হয়না। বরং তার আগেই আচমকা ভিভিয়ান গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“বিবান না ভিভান হবে। ডাকলে ঠিকমতো ডাক, নয়তো ডাকার প্রয়োজন নেই।”
ভিভিয়ানের এহেন অভিব্যক্তিতে আনায়া আবারও চুপসে যায়। নিমিষেই তার মন খারাপ হলে ভাবে—সে কেনো এখনো আর সবার মতো ঠিকঠাক ভাবে কথা বলতে পারেনা। তার মা,বাবা,বড়-মা,বড়-বাবা সবাই তো বলে—বড় হলেই নাকি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তাহলে সে কবে বড় হবে?
তবে আপাতত এসব বিষয় রেখে আনায়া তার উদ্দেশ্য বলে,
“একতা কতাহ বলতাম।”
—“হু।”
—“তোমার চুনগুলো চিনুনী করে দেই?”

আনায়ার প্রশ্নের উত্তরে ভিভিয়ান একটা শব্দও করল না। উল্টো তার এই নিঃশব্দতায় যেন আনায়া তার যথাযথ উত্তর পেয়ে যায়।সে একটুও সময় নষ্ট না করেই, বিছানার পাশেই ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে—বহু কষ্টে একটা হেয়ার ব্রাশ খুঁজে আনে। পরক্ষণেই সে ভিভিয়ানের পিঠে চড়ে, আলতোভাবে কেনীথের মাথার একাংশ একহাতে জড়িয়ে—উলোটপালোট করে অন্যহাত দিয়ে চুলে চিরুনী করে দেয়। আর ভিভিয়ানও এতে কিছুই বলে না। তার সম্পূর্ণ নজর, ফোনের স্ক্রিনের দিকে।

এদিকে আনায়া এইকাজ করতে গিয়েই যেন হাঁপিয়ে উঠেছে। ভিভিয়ানের এই বড় বড় কাঁধ অব্দি ছুঁয়ে যাওয়া, একঝাঁক চুলের আড়ালেই যেন তার ছোট্ট দেহটাই হারিয়ে যাবে। তবে হাল ছেড়ে না দিয়ে সে যথাসাধ্য নিজের চেষ্টা চালিয়ে গেল। তবে এরইমাঝে তার নজর পড়ল আচমকা ভিভিয়ানের ফোনের দিকে। ফোনের স্ক্রিনে একটা চমৎকার সুন্দরী মেয়ের ছবি জ্বলজ্বল করছে। যা দেখে আনায়ার কিছুটা আগ্রহ হয়। সে তার আগ্রহের উদ্বেগে সোজা ভিভিয়ানের মাথার উপরে এলোমেলো অবিন্যস্ত ভঙ্গিতে করে চড়তে লাগল—শুধুমাত্র মেয়েটিকে ঠিকমতো দেখার জন্য। তবে তার এই পদক্ষেপে যেন ভিভিয়ানের মেজাজ নিমিষেই খারাপ হয়। সে প্রচন্ড বিরক্ত নিয়ে বলে ওঠে,
“উফ!তারা, এসব কি শুরু করেছিস?”
নিমিষেই যেন আনায়ার হুঁশ ফিরে আসে। তবে তার কৌতূহল মেটে না। সে একটুও দেরি না করে, দ্রুতস্বরে বলে ওঠে,

“বাইয়া এই আন্টিতা কে?”
আনায়ার কথায় ভিভিয়ান কিছুটা বিরক্ত হলেও, মেয়েটির বিষয়ে প্রশ্ন করায় তাকে যেন যথেষ্ট খুশি মনে হলো। সে একটুও সময় না নিয়ে, মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই—খানিকটা নিরেট কন্ঠে বলল,
“আন্টি না,তোর ভাবী হবে.. ভাবী বলে ডাক।”
আনায়া যেন তার কথাটা স্পষ্টত ঠিক বুঝতে পারল না। সে আবারও জিজ্ঞেস করল,
“মানে?”
—“মানে আমার হবু বউ, আর তোর ভাবী।”
ছোট্ট আনায়া ভিভিয়ানের চুলের উপর দুহাত বিছিয়ে, প্রায় শুয়ে পড়ে—মেয়েটিকে আরো ভালো ভাবে দেখার প্রচেষ্টায়। কপালটা কিঞ্চিৎ কুঁচকে মনে মনে আওড়ায়,
“মা তো সেদিন বলনো, ভিবান বাইয়ার বউ আমি হবো। কিন্তু বাইয়া তো বলচে, এই আন্টিতা তার বউ। তাহলে… ধুর, কিছুই তো বুজনাম না৷ মাকে তবে আবার জিগগেছ কততে হবে।”

দুপুর বেলায় এহসান মঞ্জিলে খাওয়াদাওয়া পর্ব চলছে। দীর্ঘ মেহগনি কাঠের টেবিল ঘিরে পরিবারের সবাই মধ্যাহ্নভোজের জন্য জড়ো হয়েছে। থমথমে গাম্ভীর্য আর কাঁচের বাসনের ঠুনঠুন শব্দ ছাড়া ঘরে আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। ভিভিয়ান আর পাভেল দুজনেই মাথা নিচু করে নিজেদের মতো খেয়ে যাচ্ছে; কারো মুখেই কোনো কথা নেই।
​কাশফিয়া অত্যন্ত নিপুণ হাতে সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। অনিমা বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা থাকার তার স্ফীত উদর নিয়ে চঞ্চল আনায়ার পেছনে ছুটে তাকে খাওয়ানো এখন দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কাশফিয়া নিজেই আনায়াকে কোলে নিয়ে আলতোহাতে লোকমা মুখে তুলে দিচ্ছে।

তবে এই ঘরোয়া আবহের মাঝেও, ডাইনিংয়ের দুই প্রান্তে প্রধান চেয়ার দুটিতে বসে থাকা দুই ভাই তথা—ভাহিদ এহসান আর তারেক এহসানের মুখাবয়বে ফুটে থাকা কঠোর গাম্ভীর্য পুরো পরিবেশকে কিছুটা গুমোট করে রেখেছে।
​খাবার খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ ভাহিদ তার গম্ভীর দৃষ্টি ছেলের দিকে নিবদ্ধ করল। নীরবতা ভেঙে তিনি সরাসরি ভিভিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল,
​”পড়াশোনা কেমন চলছে তোমাদের? আর ভিভান, তোমার ফাইনাল পরীক্ষা কবে? কলেজে উঠেছো সে কতকাল হতে চলল, অথচ পরীক্ষারও কোনো খবর শুনি না আর রেজাল্টের তো কোনো নামগন্ধও নেই। ব্যবসার ব্যস্ততার কারণে ঢাকায় তোমাদের দিকে ঠিকমতো নজরই দিতে পারছি না।”

​বাবার এই আচমকা আর সরাসরি প্রশ্নে ভিভিয়ানের খাবারের প্লেটে চলমান হাতটি এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। বুকের ভেতর এক অজানা অস্বস্তি মোচড় দিলেও সে অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেকে স্বাভাবিক রাখল। ওপাশে বসে থাকা পাভেল আড়চোখে বড় ভাইয়ের দিকে তাকাল; তার মনে তখন তীব্র কৌতূহল আর সংশয়—ভিভিয়ান এবার এই প্রশ্নের কী উত্তর সাজাবে? কারণ সে জানে, ভিভিয়ানের বর্তমান জীবন আর পড়াশোনার সমীকরণটা এখন কতটা জটিল।

পরিস্থিতি কিছুটা তপ্ত হওয়ার আগেই কাশফিয়া হঠাৎ খাবারের প্রসঙ্গ তুলে ভাহিদকে থামিয়ে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে তারেক এহসানও হাসিমুখে ভাতিজার পক্ষ নিয়ে বলে উঠল,
​”বড় ভাই, ওসব নিয়ে অত চিন্তা কোরো না। ভিভান-পাভেন…ওরা বরাবরই ভালো ছাত্র, ওরা যাই করবে জীবনে ভালো কিছুই করবে। এই বয়সে ছেলেদের ওপর একটু ভরসা রাখতে হয়।”
​চাচা আর মায়ের এই সময়োচিত হস্তক্ষেপে টেবিলের গুমোট ভাবটা যেন মুহূর্তেই কিছুটা হালকা হয়ে এল। ভিভিয়ান আর পাভেল মনে মনে এক দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। পাভেল অন্তত এই যাত্রায়, বড় ভাইয়ের বিপদে পড়ার আশঙ্কা থেকে নিশ্চিন্ত হলো। তবে ভিভিয়ান কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করায় মনোযোগ দিল। ভাবগাম্ভীর্য স্বাভাবিক রইলেও,তার মনের কোণে বাবার এই প্রশ্নটি এক প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তার মতো রয়ে গেল।

বিকেলের মিঠে রোদে এহসান মঞ্জিলের অন্দরমহল তখন এক অলস নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। কালো রঙের টিশার্ট-প্যান্ট পড়ুয়া ভিভিয়ান, বিছানার মাঝবরাবর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। মুখের উপর একটি ডার্ক ফিকশনের বই দিয়ে তীব্র বিরক্তির সাথে ঢেকে রেখেছে। হাতে কালো বেল্টের ব্র্যান্ডের ঘড়ি—কোথাও যাওয়ার জন্য তৈরি হতে চেয়েও আর যাওয়া হয়নি। চুলগুলোও এলোমেলো, মেজাজটাও বেশ খিটখিটে। বিরক্তি-রাগে পেশীবহুল হাতদুটো কিঞ্চিৎ ফুলে উঠেছে।
ভিভিয়ানের জন্য সময়টা ছিল প্রচন্ড অসহ্যকর রকমের ধীর। কোনোকিছুতেই মন বসছে না। সারাদিন চার দেয়ালের মাঝে বন্দি থাকা তার স্বভাববিরুদ্ধ; তদুপরি ছোট্ট আনায়ার অবিরাম চঞ্চলতা আর বিচিত্র সব আবদার সামলাতে সামলাতে তার ধৈর্য যেন শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। ঠিক এই গুমোট মুহূর্তেই তার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল—একটি নতুন মেসেজ!

​মেসেজের বার্তাটি পড়া মাত্রই ভিভিয়ানের চোখের মণি স্থির হয়ে গেল, কপালে ফুটে উঠল বিস্ময়ের রেখা। মাওরা ওয়াসিম বর্তমানে চট্টগ্রামেই অবস্থান করছে। ছুটির অবসরে সে তাকে কিছু না জানিয়েই চট্টগ্রামের এক আত্মীয়র বাসায় গিয়ে উঠেছে।
ভিভিয়ানের বন্ধুদের একজন অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এই খবরটি জোগাড় করে তাকে পাঠিয়েছে।সেই অনাকাঙ্ক্ষিত চড় আর তন্ময়কাণ্ডের পর থেকে মাওরার সাথে তার দূরত্ব ঘোচেনি; বরং মাওরা তাকে কৌশলে বারংবার এড়িয়ে চলছে। কিন্তু মাওরা ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রামে এসেছে, অথচ সে যে চট্টগ্রামেই আছে এটা জানার পরও একবার তাকে জানানোর প্রয়োজনও মনে করেনি কিংবা সে বিন্দুমাত্র টের পাবে না—এই অপ্রত্যাশিত বিষয়টি সরাসরি ভিভিয়ানের দম্ভে গিয়ে বেশ আঘাত হানল।
​মিনিট কয়েকের মধ্যেই মাওরার সেই আত্মীয়র ঠিকানাটিও তার নাগালে চলে এল। ভিভিয়ান আর এক মুহূর্ত কালবিলম্ব করার প্রয়োজন বোধ করল না। বাড়িতে বাবা-চাচা না থাকার সুযোগে, কোনো ঝামেল ছাড়াই সে গ্যারেজ থেকে নিজের বাইকটা বের করে নির্দিষ্ট গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

​চট্টগ্রামে ফুপির বাসায় মাওরার দিনগুলো কাটছিল এক অদ্ভুত দোটানায়। সে কেনো ভিভিয়ানকে বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত না দিয়ে এখানে চলে এল, তার সঠিক উত্তর হয়তো তার নিজের কাছেও নেই; এক ধরনের অভিমান নাকি ভিভিয়ানের সেই অদৃশ্য ছায়া থেকে নিজেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা? সে জানে না!
​বিকেলের মিঠে রোদে মাওরা তার ছোট ফুপাতো বোনের সাথে বাসার কাছের একটি পার্কে হাঁটতে বেরিয়েছিল। এখানে আগে কখনো তেমন আসা হয়নি। ছোট বেলায় হয়তো দু-এক বার এসেছিল,এই যা! এতোবছর পর নতুন রূপে চারপাশটা উপভোগ করতে তার ভালোই লাগছিল।
কিন্তু এরিমধ্যে তার সেলফোনটা বারবার বেজে উঠতে লাগল। স্ক্রিনে ভিভিয়ান নামটা দেখে মাওরার হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে বিরক্তি আর কিছুটা ভয় নিয়েই ইচ্ছাকৃতভাবে কলটা উপেক্ষা করল এবং ফোনটা ভাইব্রেশনে রেখে দিল।

​কিন্তু ভিভিয়ান দমে যাওয়ার পাত্র নয়। প্রায় ষোলো-সতেরো বার কল করার পর, মাওরা যখন বুঝল এই নাছোড়বান্দা লোকটিকে থামানো অসম্ভব, তখন সে অতিষ্ঠ হয়ে ফোনটা রিসিভ করল। পাশে তার কাজিন দাঁড়িয়ে, তাই সে নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। বয়সে ছোট হলেও, কখন কি বুঝে নেয় কে জানে!
কিন্তু ফোনটা কানে তোলা মাত্রই ওপাশ থেকে ভেসে আসা ভিভিয়ানের সেই নির্লিপ্ত গম্ভীর কণ্ঠস্বর তাকে জ্যান্ত মূর্তির ন্যায় স্তব্ধ করে দিল।
—“কোথায় তুমি?”
—“আমি বাসায়… হঠাৎ ফোন দিয়েছো কেনো?”, কিছুটা দ্বিধা নিয়েই মাওরা মিথ্যে বলল। কিছুক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ না মিললেও, পরক্ষণেই মাওরাকে সম্পূর্ণ স্তম্ভিত করে দিয়ে ভিভিয়ান বলল,
​”তোমার কাজিনকে বাসায় পাঠিয়ে দাও। আই নিড সাম স্পেস উইথ ইউ।”
​মাওরা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে বলে উঠল,

“ভিভিয়ান! তু… তুমি কোথায়?”
​”এইতো, বাইকের ওপর বসে থেকে শুভ্র সাদা রঙের পোশাক জড়ানো একটা পরীকে দেখছি।”
​ভিভিয়ানের কথায় একাধারে অধিকারবোধ আর চিরচেনা গাম্ভীর্যের ছোঁয়া। মাওরা নিজের দিকে তাকাতেই দেখল, সে আজ সাদা রঙের কুর্তি আর পায়জামা পরেই বাসা থেকে বেরিয়েছে। সে আতঙ্কিত হয়ে হন্যে হয়ে আশেপাশে তাকাতেই দেখল, পার্কের সীমানা ঘেঁষা কিছু আম গাছের ছায়ায় একটি গাঢ় লাল-কালো বাইক দাঁড় করানো।
বাইকের ওপর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে থাকা সেই দীর্ঘদেহী মানুষটিকে চিনতে তার এক মুহূর্তও সময় লাগল না।
​মাওরা অপ্রস্তুত স্বরে বিড়বিড় করল,

“তুমি এখানে কী করছ? তুমি কীভাবে জানলে আমি এখানে…”
​ভিভিয়ান তাকে কথা শেষ করার সুযোগ না দিয়েই বলে উঠল,
“তোমার বোনকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে এদিকে এসো। আর যদি এটা করতে না পারো, তবে মাথায় রেখো—এই মুহূর্তে আমি এমন কিছু করে বসব যা তুমি কখনোই চাইবে না।”
​মাওরা শুকনো ঢোক গিলল। ভিভিয়ানের হঠকারিতা তার ভালো করেই জানা আছে। সে অসহায় হয়ে তার ক্লাস সেভেনে পড়ুয়া বোনটির দিকে তাকাল। মণি তখন আপনমনে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছিল। মাওরা তার কাছে গিয়ে কিছুটা মিনতির সুরে বলল,

“মণি! তুমি বাসায় চলে যাও তো লক্ষ্মীটি, সন্ধ্যা হয়ে আসছে।”
​মেয়েটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কিন্তু তুমি আসবে না?”
​”আ… আমি আসছি, আর কিছুক্ষণ পরেই আসব…” মাওরা কথাগুলো সাজিয়ে বলতে হিমশিম খেল।
​—“কিন্তু আম্মু তো বলেছে তোমাকে সাথে নিয়ে ফিরতে, তুমি যদি পথ হারিয়ে যাও?”
মণির যুক্তিতে মাওরা আরও বিচলিত হলো।
​—“না না, ওসব নিয়ে চিন্তা কোরো না। আমি কিছুক্ষণ বাদেই চলে আসব।”
​মণি কিছুক্ষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে থেকে শেষমেশ মাথা নেড়ে একা বাসার দিকে পা বাড়াল। মাওরা একটা দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ওদিকে ফোনের ওপাশে থাকা ভিভিয়ান তাদের কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ শুনতে পাচ্ছিল।
তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় তির্যক হাসি ফুটে উঠল। যেন সে ভালো করেই জানত,এমনটাই হওয়ার ছিল। পার্কের সেই নির্জনতায় সাদা কুর্তি পরা মাওরা যখন ধীর পায়ে তার দিকে এগোচ্ছিল, ভিভিয়ানের চোখে তখন এক অদ্ভুত নেশাতুর দৃষ্টি—যা কেবল প্রেম নয়, একচ্ছত্র আধিপত্যেরও দাবি রাখে।

‘Aasaan nahi yahaan,Aashiq ho jaana
Palkon pe kaanton ko sajaana___
Aashiq ko milti hai,Gham ki saugaatein
Sabko naa milta yeh khajaana____
Wo o o o…Wo o o o…
Wo o o o…Wo o o o…’

মাওরা ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। ভিভিয়ান গুনগুন করে শিষ বাজিয়ে একটি গানের কিছু পঙক্তি গাইছে। আমগাছগুলোর আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সেই লাল-কালো বাইকটার সামনে এসে দাঁড়াল মাওরা। তার বুক ঢিপঢিপ করছে। কালো টিশার্ট পড়া ভিভিয়ান তখনো বাইকের ওপর হেলান দিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে আছে, ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ তির্যক হাসি। যেন সে জানত মাওরা শেষ পর্যন্ত আসবেই।
মাওরা কাছে গিয়েই কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কীভাবে জানলে আমি এখানে আছি? আর হুট করে এখানেই বা কেনো এসেছো?”
​ভিভিয়ান এসবের কোনো উত্তর দিল না। তার শান্ত প্রখর দৃষ্টি জোড়া মাওরার ফ্যাকাশে মুখে নিবদ্ধ। সে কেবল সংক্ষেপে হুকুম দিল,

“বাইকে ওঠো।”
​মাওরা আশেপাশে ভীতু নজরে তাকাল। নির্জন পার্ক, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে—এই অবস্থায় বাইকে ওঠা তার জন্য কতটা নিরাপদ সে বিষয়ে সে যারপরনাই শঙ্কিত। সে আমতা-আমতা করে বলল,
“দেখো ভিভিয়ান, আরেকটু পর সন্ধ্যা নামবে। আমি এই মূহুর্তে কাউকে কিছু না জানিয়ে,কোথাও যেতে পারব না। আর ফুপি জানলে অনেক ঝামেলা হবে। তুমি যা বলার এখানেই বলো, প্লিজ…”
​মাওরার কথা শেষ হতে না হতেই,ভিভিয়ান গুরুগম্ভীর স্বরে আওড়ায়,
“বাইকে ওঠো মাওরা!”
ভিভিয়ানের কণ্ঠের দৃঢ়তায় মাওরার সব প্রতিবাদ যেন একনিমিষেই ফিকে হয়ে গেল। সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাইকের পেছনের সিটে গিয়ে বসল। অস্ফুটস্বরে আওড়াল,

“বেশিদূর যেয়ো না প্লিজ, ফুপি চিন্তা করবে।”
​ভিভিয়ান কোনো কথা না বলে সজোরে বাইক স্টার্ট দিল। চাকার ঘর্ষণে ধুলো উড়িয়ে বাইকটা তীরের মতো এগিয়ে গেল পার্কের বাইরে এক অজানা নির্জন রাস্তার দিকে। বাতাসের তীব্র ঝাপটায় মাওরার ওড়না উড়ছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি কাঁপছে তার মন।
মাওরা লক্ষ্য করল সে ঘটনার পর থেকে, ভিভিয়ান রহস্যজনক ভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তার চোখমুখের সেই শান্ত গম্ভীর্য এখন এক বিধ্বংসী উন্মাদনায় রূপ নিয়েছে। এই ভিভিয়ান যেন তার চেনা সেই মানুষটি নয়।
​রাস্তা ক্রমশ নির্জন হচ্ছে। দুপাশে ঝোপঝাড় আর অন্ধকার। মাওরা আতঙ্কিত হয়ে অপ্রস্তুত স্বরে বলল,
“ভিভিয়ান, তুমি আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? পাগলামি কোরো না, আমাকে বাসায় যেতে হবে!”
​আচমকা এক ঝটকায় ভিভিয়ান ব্রেক কষল। রাস্তার এক অন্ধকার মোড়ে বাইক থামিয়ে সে কঠোর স্বরে বলল,
“নামো।”
​মাওরা হকচকিয়ে গেল।

— “মানে? এখানে কেন নামব?”
“বাইক থেকে নামতে বলেছি আমি।”, ভিভিয়ানের কাঠখোট্টা সংক্ষিপ্ত জবাব।
​মাওরা বেশ ভীতিগ্রস্ত হয়েই বাইক থেকে নামল। চারপাশের নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করতে চাইছে। ভিভিয়ান বাইকের সিটে নিজের অবস্থান থেকে কিছুটা পিছিয়ে বসল এবং মাওরাকে তার কাছে আসতে ইশারা করল। মাওরা দুই পা এগিয়ে যেতেই ভিভিয়ান আচমকা তার বলিষ্ঠ দুই হাত বাড়িয়ে মাওরার কোমর জাপটে ধরল। মাওরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে পাজাকোলা করে বাইকের ফুয়েল ট্যাঙ্কের ওপর নিজের মুখোমুখি করে বসিয়ে দিল।
​মাওরা স্তম্ভিত। তার দুই হাত আপনা আপনিই ভিভিয়ানের কালো টিশার্টের বুকের অংশটুকু আঁকড়ে ধরল। সে আর্তস্বরে বলে উঠল,

“পাগল হয়ে গিয়েছো? তুমি জানো আমি এসবে অভ্যস্ত নই! কেন করছো এসব?”
​ভিভিয়ান তার কথায় কর্ণপাত করল না। সে তার বলিষ্ঠ হাত দিয়ে মাওরার পা দুটো টেনে, নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। অতঃপর বাম হাত দিয়ে তার কোমর পেঁচিয়ে ধরে ডান হাতের আঙুলের ডগায় মাওরার কপালের অবিন্যস্ত চুলগুলো সরিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিল। অতি শান্ত গলায় সে বলল,
“নাও, এবার বলো কী বলবে।”
​মাওরার চোখজোড়া অচিরেই ভিজে উঠেছে। সে চাপা রাগ নিয়ে বলল,
“তুমি তোমার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছো, ভিভিয়ান। আমি এসব পছন্দ করি না, তবুও কেন বারবার…”
—“কি সুন্দর করে মিথ্যে বলতে শিখেছো জান! আই’ম রিয়েলি ইমপ্রেসড!”, তার কথার প্রসঙ্গে হঠাৎ ভিভিয়ানের এহেন অভিব্যক্তিতে মাওরা সম্পূর্ণ থমকে গেল। কিছুটা ভয়-সংশয় নিয়ে আওড়াতে চাইল,
“ভি..ভিভিয়ান আমি…”

​কথাটা শেষ হলো না। ভিভিয়ান তাকে মুগ্ধ-শীতল চাহুনিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। কিন্তু আচমকাই নিজের ভাবমূর্তি পাল্টে ফেলল সে। ভিভিয়ান তার ঘাড়-গলা পেছন দিক থেকে শক্ত করে চেপে ধরল। এতোটাই আক্রোশে-তীব্রতায় সে চাপ দিল যে, মাওরার সরু পিঠ আর মাথাটা পেছনের দিকে বেশ কিছুটা হেলে গেল। চুলে টান লাগায় আর গলার চাপে তার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। চোখের কার্নিশ বেয়ে দুফোঁটা নোনাজলও গড়িয়ে পড়ল। অথচ ভিভিয়ানের মাঝে কোনো ভাবান্তর নেই। সে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত।
​মাওরা অস্ফুট স্বরে গোঙাতে লাগল,

“ভিভিয়ান, কী করছো… আমার… আ… ব্যাথা লাগছে!”
দুহাতে ভিভিয়ানের হাতটা সরানোর চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হলো। ভিভিয়ান আরও জোরে চাপ দিয়ে মাওরার ব্যথাতুর মুখটার দিকে নিজের মুখটা এগিয়ে নিল। তার চোখ দুটো এখন র”ক্তবর্ণ। চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“কই, আমিও তো বলেছিলাম—পড়াশোনা আর আমি ছাড়া যেন অন্য কোনো কিছুতে মাথা না ঘামাতে। যা আমার পছন্দ নয়, তা না করতে। কিন্তু তুমি তো আমার কোনো কথাই শুনলে না।”
​মাওরা কান্নারত স্বরে আওড়ায়,
“কী বলতে চাইছো? আমি কী করেছি?”
​ভিভিয়ান আক্রোশে ঠোঁট কামড়ে খানিক তির্যক হাসল।পরক্ষণেই নিজের সর্বশক্তি দিয়ে একহাতে মাওরার কোমড় ও অন্যহাতে ঘাড়-গলা চেপে ধরে, দাঁতে দাঁত পিষে আওড়াল,

“গত কয়েকদিন ধরে তোর ফোনের কল লিস্টে ঐ একই আননোন নাম্বারটা কি করছে? রাত-দিনে চৌদ্দ বার করে ঐ নাম্বার থেকে কল আসছে,তুইও ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলছিস, নিজেও আবার কল দিচ্ছিস। কই, তখন তোর পড়াশোনা-ব্যস্ততা কোথায় থাকে? আর আমি তিনদিন ধরে পাগলের মতো একটানা তোকে কল দেওয়ার পরও, তুই একবারের জন্যও আমার কল রিসিভ করতে পারিস না। তোর পড়ার বাহানা, এই বাহান, সেই বাহানা, কত কি!”
মাওরার গাল বেয়ে অচিরেই নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে। যে মানুষটা তার চোখে একফোঁটা জল পছন্দ করেনা, সে নিজেই তাকে পৈশাচিক যন্ত্রণায় কাঁদাচ্ছে। বিষয়টা যেন তার কল্পনাতীত।
ভিভিয়ানের বলিষ্ঠ হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। মাওরা তার রক্তিম চোখজোড়ার দিকে তাকাতে পারছে না। এ ভিভিয়ান নয়, এ অন্যকেউ। অনেক বেশি অচেনা কেউ নয়তো এটা হতে পারে যে—সে ভিভিয়ানের এমন রূপের সাথে আগে কখনো পরিচিত হয়নি।
মাওরা বহু কষ্টে আওড়াল,

“ভিভিয়ান তুমি ভুল বুঝছো, আমি…”
“হ্যাঁ, বল! কী বলবি? তুই আজ স্পষ্ট করে বল তো, তুই আসলে কী চাস!”, ভিভিয়ান আরও শক্ত করে তার কোমর আর ঘাড় চেপে ধরল। পুনরায় দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে উন্মাদের ন্যায় আওড়াতে লাগল,

মহামায়া পর্ব ২২

“বিয়ে করতে বললাম—তুই করবি না। তোর এতেও বিরাট সমস্যা। বয়স হয়নি,ফ্যামিলি মানবে না, হ্যানত্যান ব্লা ব্লা… আরো কত কি! যা ওসবও মেনে নিলাম। তোকে আরো সময় দিলাম। শুধু বললাম, পড়াশোনা আর আমার দিকে তোর সব মনোযোগ দে। কিন্তু তুই ওটাও করতে পারছিস না। আমি যা যা চাইছি, তার কোনোটাই যখন তুই করতে পারিস না—তাহলে তুই কি চাস ওটাই বল।…
বিশ্বাস কর,জান! আমি সারাজীবনের জন্য তোর সব কষ্ট,সব সমস্যা,সব বাহানা চিরতরে শেষ করে দেবো। এখানেই মেরে,এখানেই মাটিতে গেঁড়ে রেখে যাবো। মরার ভয় যে আমি করিনা, সেটা তুইও ভালো করেই জানিস।”

মহামায়া পর্ব ২৪