তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫১
নওরিন মুনতাহা হিয়া
পড়াশোনা শেষ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে শরীর ছেড়ে দেয় মেঘ। সারাদিনের ক্লাস আর ঝামেলায় ভীষণ ক্লান্ত সে এখন তার বিশ্রামের প্রয়োজন। আর পড়াশোনা করা সম্ভব হচ্ছে না। আদ্রিয়ান বিছানায় বসে ফোনে ফেসবুক ইসক্লল করছিল! মেঘ একবার তাকায় আদ্রিয়ানের দিকে! এরপর চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে আসে বিছানার কাছে। মেঘকে দেখা মাএ আদ্রিয়ান ফোন পাশের টেবিলে রেখে দেয়, এরপর বিছানার চাদর সরিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ইশারা করে তার কাছে আসার জন্য।
মেঘ মৃদু হেঁসে বিছানায় বসে একটু নিকট বর্তী হয় আদ্রিয়ানের। এরপর তার হাত দিয়ে কাঁধ জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখে আদ্রিয়ানের, যেন ক্লান্ত শরীর অবশেষে তার নিজস্ব ঠিকানায় ঠাঁই খুঁজে পেয়েছে। আদ্রিয়ান শরীর থেকে বয়ে আসা মিষ্টি সুঘ্রাণে তার সমস্ত নারী সত্তাকে বিলীন করে দেয়। শরীর ছেড়ে দেয় দিয়ে মিশে যায় আদ্রিয়ানের বুকের সাথে, যেন একটু শান্তি চাই তার, সকল চিন্তা ভাবনা থেকে মুক্তি চাই! আদ্রিয়ান হয়ত বুঝল মেঘের হৃদয়ের কামনা! তাই সে নিজ বাহুদ্বয়ের শক্ত বাঁধনে পুনরায় জড়িয়ে ধরল মেঘের শরীর! এরপর ঠোঁট এগিয়ে ছুঁয়ে দেয় মেঘের কানের পিঠ আর মাথায় থাকা লম্বা এলোকেশী চুল! আলতো হাতে ভাঁজ করা চুলের মাঝে হাত বুলিয়ে দেয়। মেঘ দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে শান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমানর চেষ্টা করে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
___ বেশ কিছুক্ষণ পর আদ্রিয়ান অনুভব করে মেঘের নিঃশ্বাস গম্ভীর হয়ে গেছে। বুকের উঠানামা শান্ত হয়ে গেছে! আদ্রিয়ান তাকায় মেঘের ঘুমন্ত মুখশ্রীর দিকে এরপর হাত দিয়ে তার নাকের ডগায় ছুঁয়ে দেয়‚ ঠোঁটে উষ্ণ আঙুল দিয়ে স্লাইড করে! গোলাপি রাঙা দুই অধরে আদ্রিয়ান তার বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে নাড়াচাড়া করে! তার বড্ড লোভ ওই দুই অধর জুড়া নিজের উষ্ঠের ভাঁজে নেওয়ার মৃদু কামঁড় দিয়ে লাল রক্তিম করে দেওয়ার! কিন্তু আদ্রিয়ান তার লোভ সংযত রাখল ‚ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজের মনের বাসনার উপর নিয়ন্ত্রণ করল! তার বউ এখন ঘুমিয়ে পড়েছে তাই কোন প্রকার দুষ্টামি সে করবে না। বউয়ের ক্লান্ত শরীরের উপর নিজের চাহিদা চাপিয়ে দিবে না।
ঘুমন্ত মেঘের নিথর শরীর আঁকড়ে ধরে তার মাথা নিচুঁ করে বালিশে রাখে। এরপর দুইজনের শরীরে উষ্ণ চাদর জড়িয়ে দেয়! মেঘ গুটিশুটি মেরে আদ্রিয়ানের বুকে ঘুমিয়ে পড়েছে! বেশ আদুরে লাগছে তাকে। স্বামীর বুকে ঘুমন্ত স্ত্রীকে বডই মোহনীয় লাগছে! দীর্ঘ নয় বছরের বিবাহিত জীবনে আজ দুইজন অজ্ঞানে একে অপরের কাছাকাছি এসেছে! প্রথমবার মেঘ তার স্বামীর বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে আজ। এই সামান্য সুখই তো মেঘ চেয়েছে সারাজীবন! অপূর্ণতা বলে কোন শব্দ রইল না তার জীবনে ‚ সে আদ্রিয়ানের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। আদ্রিয়ানও নিজ প্রিয়তমার স্ত্রীকে বুকে জড়িয়ে ঘুমের অতল গভীরে হারিয়ে যায়!
___ তালুকদার বাড়ির বিছানায় বসে আরাম করে শুয়ে ব্যবসার কাগজপত্র দেখছিল জামান সাহেব। তার চোখে কালো ফ্রেমে সাদা চমশা ‚ গম্ভীর চোখ _ মুখ নিয়ে কাগজের উপর স্থির দৃষ্টি তার। শার্লিন বেগম বেশ কয়েকবার রাতের খাবার খাওয়ার জন্য তাড়া দিয়েছেন‚ কিন্তু “এখন খুদা নাই” বলে জামান সাহেব তাকে বিরক্ত করতে নিষেধ করছেন। হঠাৎ কাগজপত্র দেখার মাঝে টেবিলে থাকা ফোন শব্দ করে বেজে উঠে। কাজের মধ্যে বিরক্ত করার নাক _ মুখ কুঁচকে টেবিলে থাকা ফোন হাতে নেয়! কিন্তু ফোনের স্কিনে হঠাৎ ফারহানের নাম্বার দেখে বেশ অবাক হয়! জামান সাহেব দ্রুত ফোন রিসিভ করে‚ অপর পাশ থেকে ফারহান যথেষ্ট বিনয়ের সহিত সালাম দেয়
“আসসালামু আলাইকুম জামান আঙ্কেল”
জামান সাহেব সালামের উত্তর দিয়ে বলেন
“ওয়ালাইকুম সালাম। ফারহান তুমি হঠাৎ এতো রাতে ফোন করলে? আমেরিকায় কি তোমার মেঘের সাথে দেখা হয়েছে?
জামান সাহেবের সব প্রশ্নের উত্তর ফারহান দেয় না। শুধু ছোট করে নিজ মনের কৌতূহল আর রাগ মিটাতে প্রশ্ন করে উঠে
“জামান আঙ্কেল‚ ডক্টরঃ আদ্রিয়ান রোদায়ান কি আপনার সন্তান? চৌদ্দ বছর বয়সে মেঘের সাথে যার বিয়ে হয়েছে!তার নাম কি আদ্রিয়ান? আমেরিকার বিখ্যাত হার্ট সার্জান ডক্টর : আন?”
ফারহানের প্রশ্ন শুনে জামান সাহেব চমকায়! আদ্রিয়ানের পরিচয় কি করে জানল ফারহান? তবে কি আমেরিকায় গিয়ে আদ্রিয়ানের সাথে তার দেখা হয়েছে! আর মেঘ তারও কি আদ্রিয়ানের সাথে পরিচয় হয়েছে? আদ্রিয়ান কি জানে মেঘই তার বউ? জামান সাহেব তার মনের অস্থিরতা প্রকাশ করল না কণ্ঠে গম্ভীরতা নিয়ে এসে উত্তর দেয়
“হ্যাঁ। আদ্রিয়ান আমার সন্তান। তালুকদার বাড়ির বড় ছেলে। আর মেঘের প্রাত্ত্বন স্বামী।”
জামান সাহেবের কথা শুনে ফারহান নিশ্চিত হয়। আদ্রিয়ানের সাথেই নয় বছর আগে মেঘের বিয়ে হয়েছিল! কিন্তু মেঘ যে এখনও আদ্রিয়ানকে ভালোবাসে তা জামান সাহেব কেন বলেনি ফারহানকে? তাছাড়া আমেরিকায় এসে তারা একসাথে সংসার করছে এই কথাও বলেনি? তারা উভয়ই একে অপরের ভালোবাসে, তবে কেন ডিভোর্সের কথা বলল জামান সাহেব! কেন মেঘের স্বামী থাকার পরও তার সাথে বিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি করল। তিলতিল করে ঘোরে তোলা তার সব স্বপ্ন আজ মিথ্যা হয়ে গেল। তাদের উভয়কে ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত একসাথে দেখার পর, ফারহানের যে কষ্ট হয়েছিল তার মূল্য কে দিবে? ফারহানও রাগী কণ্ঠে বলে
___ প্রাত্ত্বন নয় বরং বর্তমান স্বামী হয় আদ্রিয়ান, মেঘের। মেঘ যে আদ্রিয়ানকে ভালোবাসে? তা কেন বলেনি আপনি আঙ্কেল? __.
ফারহান চৌধুরীর প্রশ্নের উত্তরে জামান সাহেব বলেন
“ হ্যাঁ‚ মেঘ আদ্রিয়ানকে ভালোবাসে! বাঙালি নারীদের স্বামী‚ সংসার এইসবের প্রতি আলাদা এক টান থাকে। কিন্তু খুব শ্রীঘ্রই মেঘ আর আদ্রিয়ানের ডিভোর্স হবে যাবে। এরপর তোমার সাথে বিয়ে হবে!
জামান সাহেবের কথা শুনে ফারহান শব্দ করে হেঁসে উঠে। ডিভোর্স হবে? কার মেঘ আর আদ্রিয়ানের! যারা এখন আমেরিকায় একসাথে সুখে‚ শান্তিতে সংসার করছে! আর মেঘ স্পষ্ট বলে দিয়েছে সে‚ আদ্রিয়ানকে ভালোবাসে! তাকে ছাড়া অন্য কোন পুরুষকে স্বামী রূপে গ্রহণ করবে না। তবে জামান সাহেবের এই মিথ্যা বলার মানে কি? ফারহান বলে
“জামান আঙ্কেল‚ মিথ্যা কথা কেন বলছেন আপনি? আমেরিকায় মেঘ আর আদ্রিয়ান একসাথে সংসার করছে! এক বাসায়‚ এক বিছানায় থাকছে দুইজন। অথচ আপনি বলছেন‚ তারা একে অপরকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে?”
ফারহানের মুখে “একসাথে সংসার ” করার কথা শুনে জামান সাহেব বাকরুদ্ধ হয়ে যান! আমেরিকায় তারা দুইজন একসাথে থাকছে মানে? মেঘের সাথে কি তবে আদ্রিয়ানের দেখা হয়েছে? তার বউয়ের পরিচয় কি দিয়েছে? কিন্তু আদ্রিয়ান কখনও মেঘকে দেখেনি! জামান সাহেব বলে
“ফারহান তুমি কি বললে? মেঘ আর আদ্রিয়ান একসাথে সংসার করছে আমেরিকায়? কিন্তু আদ্রিয়ান মেঘকে ঘৃণা করে! তাছাড়া আদ্রিয়ানের সাথে মেঘের কখনও দেখায় হয়নি। ও জানে না মেঘ তার বউ!”
___ রেস্টুরেন্টের অপমানের কথা মনে পড়ে ফারহানের? রাগে তার শরীর জ্বলে উঠে। ফারহান বলে
“ আদ্রিয়ান খুব ভালো করে জানে! মেঘই তার বউ। আমার সামনে রেস্টুরেন্টে দাঁড়িয়ে সে মেঘকে ভালোবাসি বলেছে!
যদি আদ্রিয়ান মেঘকে ভালোবাসে? তবে কেন একমাস পর তাকে ডিভোর্স দিতে চাইল? আর মেঘও কেন রাজি হল? আমেরিকায় গিয়ে তাদের দুইজনের দেখা হয়েছে! এই কথা একবার ও বলেনি কেন মেঘ জামান সাহেবকে বলেনি! জামান সাহেবের ভাবনার মাঝে কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দিয়ে বলে উঠল
“আঙ্কেল‚ ওরা দুইজন যদি আমেরিকায় একসাথে সংসার করে থাকে। তবে আপনি কেন? আমার সাথে মেঘের দিলে ঠিক করলেন? বলুন? জামান তালুকদার এক কথার মানুষ! তবে কেন আপনি মিথ্যা কথা বললেন? আমার সাথে মেঘের বিয়ে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিলেন? উত্তর দেন আঙ্কেল ”
জামান সাহেবের এইবার হুঁশ ফিরল! ভাবনার জগৎ থেকে বের হয়ে আসে। ফারহানের বলা সব কথায় সে শুনল! ফারহান যথেষ্ট অপমান করে বলেছে প্রতিটা কথা। কিন্তু জামান সাহেব সত্যি জানত না এইসব? আদ্রিয়ান অন্য কাউকে ভালোবাসে বলে মেঘকে তালাক দিতে চাই। এই কথায় সে বলেছে! তাছাড়া মেঘও বলেছে ডিভোর্সের পর সে তার বন্ধুর ছেলেকে বিয়ে করবে! এই কথার ভিত্তিতে জামান সাহেব উঁকিল দিয়ে দ্রুত ডিভোর্স পেপার রেডি করিয়েছে। তার বন্ধুর ছেলে ফারহানের সাথে বিয়ে ঠিক করেছে। মেঘের বিয়ে ফারহানের সাথেই হবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে! তবে এখন মেঘ আর আদ্রিয়ানের একসাথে সংসার করার মানে কি? তারা কি বিয়ে বা তালাক এই দুইটাকে মজা ভাবে! ফারহানের রাগ করা স্বাভাবিক! জামান সাহেব বলে
“ফারহান‚ আমি সত্যি দুঃখিত। তোমার সাথে মেঘের বিয়ে ঠিক করে ভুল করেছি আমি। কয়েকদিন আগে আদ্রিয়ান বলেছিল‚ সে মেঘকে ডিভোর্স দিতে চাই! আমেরিকার এইসব ঘটনার কথা আমি সত্যি জানতাম না৷ তোমার আব্বুর কাছে আমি ক্ষমা চেয়ে নিব।”
জামান সাহেবের ক্ষমার স্বীকারক্তির পর যেন‚ ফারহানের প্রতিশোধ পরায়ণ মনোভাব শান্ত হয়না। ফারহান বলে
“জামান আঙ্কেল‚ আপনার দুঃখিত বলা কথায়। সব শেষ হয়ে যাবে না! আমার বাবার কাছে করা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন আপনি? যদি কথা দিয়ে রাখতেই না পারেন তবে বলতে কেন যান? তালুকদার বংশের মানুষজন যে এমন ভন্ড আর প্রতারক হতে পারে তা জানা ছিল না! মিথ্যাবাদী। আপনি আর আপনার ছেলে দুইটাই ভন্ড! ছেলে বিয়ে করে বউকে রেখে বিদেশ চলে যায় তাকে ঘৃণা করে দূরে থাকে। এরপর হঠাৎ করে বউয়ের প্রতি তার ভালোবাসা উদয় হয় ‚ ইডিয়েট! আর বাবা নিজের বন্ধুর ছেলের সাথে তার আপন পূএবধূর বিয়ে ঠিক করে! অথচ তার ছেলে সেই বউয়ের সাথে একই বিছানায় থাকছে! মানে সিরিয়াসলি? আপনাদের তালুকদার বংশের রক্ত এমন বাজে কেন? বাবা আর ছেলে এই দুইজন বাটপার‚ প্রতারক‚ আর মিথ্যাবাদী!
[ Farhad Rocked Jaman Chowdhury shocked 😂😂😂😂]
জামান সাহেব কোন কথা বলতে যাবে তার আগেই ফারহান ফোন কেটে দেয়! রাগে‚ অপমানে‚ জামান সাহেবের শরীর জ্বলে উঠে! পাশের টেবিলে শব্দ করে ফোন রেখে দেয় জামান সাহেব। এতো বছরের জীবনে এর আগে তাকে কেউ অপমান করার সাহস দেখায়নি! একমাত্র এই ফারহান ছাড়া? অবশ্য ফারহানের কথা ভুলও নয়! এই সব হয়েছে শুধুমাএ আদ্রিয়ান আর মেঘের জন্য!
___ জামান সাহেবকে বেশ দীর্ঘক্ষণ ধরে খাবার খাওয়ার জন্য ডাকছে শার্লিন বেগম। কিন্তু জামান সাহেবের কোন সাড়াশব্দ শব্দ নাই দেখে‚ ওনি বাধ্য হয়ে রুমে যায়! দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে শার্লিন বেগম তাড়া দিয়ে বলে উঠে
“এই আদ্রর বাবা‚ তুমি এখনও রুমে বসে আছো? রাতের খাবার খাবে না? কতো রাত হয়ে গেছে! প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ডেকে যাচ্ছি তোমায়!
শার্লিন বেগম রুম প্রবেশ করে বিছানায় বসে থাকা জামান সাহেবের চোখ_মুখ দেখে ভয়ে আঁতকে উঠে! দুই চোখ রাগে লাল হয়ে গেছে! সারা শরীর বেয়ে ঘাম বয়ে যাচ্ছে! মুখে গম্ভীরর্যতার পাশাপাশি ভয়ংকর রাগ ফুটে উঠছে। কিছুক্ষণ আগেই যে‚ মানুষ শান্ত হয়ে বই পড়ছিল হঠাৎ তার কি হল! শার্লিন বেগম বলে
“কি হয়েছে তোমার? এমন রাগী মুখ নিয়ে বসে আছো কেন? কাগজপএে কোন সমস্যা হয়েছে? দোকানের হিসাবে কি গড়মিল হয়েছে কোন?”
শার্লিন বেগমের উপর সব রাগ ঝেরে দেয় জামান সাহেব। হাতে থাকা কাগজ ছুঁড়ে মারে ফ্লোরে! জানালা দিয়ে আসা বাতাসে কিছু কাগজ উড়ে যায়! আর কিছু মুখে এসে পড়ে শার্লিন বেগমের! শার্লিন বেগম পুনরায় ভয়ার্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করে
“রাগ না দেখিয়ে! কি হয়েছে বলবে তো?”
জামান সাহেব খেপে থাকা বাঘের মতো গর্জন করে বলে উঠে
“কি শুনতে চাও কি তুমি শার্লিন? আমেরিকায় তোমার ছেলে আর মেঘ একসাথে সংসার করছে! একই বাড়িতে থাকছে! অথচ আমি কিছুই জানি না। তোমার ছেলে কিছুদিন আগে ফোন করে বলেছে সে‚ মেঘকে ডিভোর্স হবে! এরপর যখন আমি ফারহানের সাথে বিয়ে ঠিক করেছি তখন তোমার ছেলে। আবার ফারহানের সামনে মেঘকে ভালোবাসি বলেছে! ফারহান ফোন করে‚ আমার বংশ আর আমায় কতো অপমান করল জানো? তোমার ওই ছেলের জন্য আর কি কি সয্য করতে হবে আমায়?”
জামান সাহেবের সম্পূর্ণ কথা শার্লিন বেগম শুনলেন না। এর আগেই ওনি উৎসুক কণ্ঠে বলে উঠে
“তুমি সত্যি বলছ জামান? আমেরিকায় আদ্রিয়ান আর মেঘ একসাথে সংসার করছে! আদ্রিয়ান নিজ মুখে স্বীকার করছে সে মেঘকে ভালোবাসে? আল্লাহ‚ আমার কথা শুনছে! আমার ছেলের মাথায় সুবুদ্ধি দিচ্ছে।
শার্লিন বেগম খুশি দেখে জামান সাহেব তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল! ওনি ধমক দিয়ে বলে উঠল
“শার্লিন‚ তুমি কি চুপ করবে? খুব খুশি লাগছে তোমার! শুনে রাখো শার্লিন। তোমার ওই ছেলের জন্য আজ আমায় এতো অপমানিত হতে হল। এর শোধ আমি তুলব! খুব ইচ্ছক না তোমার ছেলের বউকে ডিভোর্স দেওয়ার ওই ইচ্ছা আমি পূরণ কর। মেঘের সাথে আদ্রিয়ানের ডিভোর্স হবে! অবশ্যই হবে। আর এরপর দ্বিতীয়বার মেঘের বিয়ে হবে ফারহানের সাথে! তোমার ছেলের থেকে প্রতিশোধ না নিয়ে এই জামান তালুকদার শান্ত হবে না।”
জামান সাহেব কথাটা বলে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়! এরপর বড় বড় পা ফেলে গটগট করে বের হয়ে যায়। শার্লিন বেগম পিছন থেকে ডাক দিয়ে বলে
“আরে এতো রাতে কোথায় যাও তুমি? খাবার খাবে না? টেবিলে খাবার সাজান আছে। শুনো খাবার খেয়ে যাও।”
অন্ধকার আচ্ছন্ন রাত হারিয়ে যায় দূরে আকাশে। সূর্যের মিটমিট আলোয় ভুবন রঙিন হয়ে উঠে। জানালা ভেদ করে আসা সূর্যের আলোয় ঘুম ভাঙে মেঘের পিটপিট করে চােখ খুলে তাকায়। মুখে হায় তুলে যখন ঘুম থেকে উঠতে যাবে তখনই চোখ যায় অপর পাশে শুয়ে থাকা এক ঘুমন্ত পুরুষের উপর। যার পুরুষালি শক্ত বাঁধনে তার সমস্ত শরীর এখন বন্ধ, বেশ অধিকার নিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। মেঘের মধ্যে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার বিন্দুমাত্র তাড়া দেখা গেল বরং তার ঠোঁটের কোণায় মৃদু হাসির ঝলক ফুট৷ উঠল।
বালিশের কনুই দিয়ে ভর দিয়ে মাথা উঁচু করে তাকায় ঘুমন্ত সেই পুরুষের দিকে। যার পরিচয় সে মেঘের স্বামী! ঘুমন্ত অবস্থায় আদ্রিয়ানকে বেশ সুন্দর লাগে‚ গম্ভীর মুখের আদলে এক নিষ্পাপ বাচ্চার ছাপ ফুটে উঠে! মেঘ তার সুক্ষ দুই চোখ জোড়া দিয়ে বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মনোযোগ সহকারে দেখে আদ্রিয়ানকে। পুরুষ মানুষের রূপের বর্ণনা কোন কাব্য সাহিত্যক করে নাই‚ তবে যদি করত তবে হয়ত তার স্বামীর সৌন্দর্যর বর্ণনায় এক উপন্যাস লেখা যেত! মেঘ আলতো হাতে আদ্রিয়ানের কপালে হাত রাখে, সযত্নে তার মুখশ্রীর উপর হাত বুলায়। নাক‚ মুখ‚ ঠোঁট প্রতিটা জায়গায় তার হাতের ছোঁয়া দেয়! বেশ কিছুক্ষণ নিলিপ্ত চোখে পলকহীন নয়নে তাকিয়ে থাকে এরপর মিষ্টি হাসে! পুরুষ মানুষ যে এতো সুন্দর হয় তা হয়ত আদ্রিয়ানের সাথে দেখা হওয়ার পর মেঘ বুঝল।
[ নতুন নতুন বিয়ে হলে এমন-ই মনে হয়! যতসব আদিখ্যেতা! সিঙ্গেল হয়ে এইসব লিখতে কষ্ট লাগে ]
ঘড়ির কাঁটার উপর চোখ পড়তেই মেঘের হুঁশ হয়। সকাল নয়টা বাজে। যদিও আজ কলেজ বন্ধ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। কিন্তু বাসায় অনেক কাজ রয়েছে দ্রুত রান্না শেষ করে সম্পূর্ণ বাসা পরিষ্কার করতে হবে। তাছাড়া রাতে খুব হালকা খাবার খাওয়া হয়েছে‚ আদ্রিয়ানের হয়ত ঘুম থেকে উঠলে খুদা লাগবে। মেঘ যখন তড়িঘড়ি গড়ে বিছানা থেকে উঠতে যাবে তখন হঠাৎ পিছন থেকে কেউ তার উড়না টেনে ধরে। মেঘ অবাক হয়ে পিছনে ঘুরে তাকায়‚ আদ্রিয়ান ঘুম ঘুম কণ্ঠে তার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে! মেঘ ভ্রু কুঁচকে তাকায় আর বলে
“আপনি না ঘুমিয়ে ছিলেন? কখন উঠলেন?”
___ আদ্রিয়ান হাত বাড়িয়ে মেঘের ওড়নার আড়ালে থাকা তার হাত ধরে। বিছানায় তার উপর ফেলে দেয়! মেঘের লম্বা চুল এসে পড়ে আদ্রিয়ানের মুখের উপর। আদ্রিয়ান সযত্নে তা সরিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দেয়। এরপর মেঘের করা প্রশ্নের উত্তরে বলে উঠে
“আমার বউ যখন তার আদুরে হাত। আমার সারা মুখে ছুয়িঁয়ে দিচ্ছিল তখন উঠেছি।”
আদ্রিয়ানের কথায় মেঘ বেশ লজ্জা পায়! মেঘের গাল টেনে ধরে শব্দ করে চুমু খায় আদ্রিয়ান। হঠাৎ মেঘের মনো পড়ে তাকে রান্না ঘরে যেতে হবে! সকালের খাবার খাওয়ার সময় হয়ে গেছে ‚ মেঘ তাড়াহুড়ো করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে
“আদ্রিয়ান‚ ছাড়ুন আমায় গোসল করে। রান্নাঘরে যেতে হবে।”
মেঘের মুখে গোসল শব্দটা শুনে আদ্রিয়ান দুষ্ট হেঁসে বলে
“মেঘ‚ এতো সকালে গোসল করবে কেন? আমরা কি রাতে কিছু করেছি?”
আদ্রিয়ানের কথার মানে মেঘ বুঝতে পারে। আলতো করে থাপ্পড় বসায় আদ্রিয়ানের বুকে। এরপর বলে
“আদ্রিয়ান ‚ আপনি না খুব দুষ্ট হয়ে যাচ্ছেন।”
“বউয়ের সাথে দুষ্টামি করব না তো। কার সাথে করব শুনি ”
“অনেক দুষ্টামি হয়েছে এখন ছাড়ুন। আমি রান্না করব। খুদা লাগেনি?”
“না‚ তুমি দশটা বিশটা চুমু দাও। পেট ভরে যাবে।”
তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫০
আদ্রিয়ানের কথায় মেঘ হাসে। তারা দুইজনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে! এরপর মেঘ আদ্রিয়ানের থেকে ছাড়া পেয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ওয়াশরুমের দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার আগে বলে উঠে
“আদ্রিয়ান‚ দ্রুত ঘুম থেকে উঠুন? সকালের নাস্তা করতে হবে? ফ্রেশ হবেন না আপনি?”
আদ্রিয়ান বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে শুয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দিয়ে বলে
“মেঘ‚ তুমি কি চাও আমরা একসাথে শাওয়ার নেই? অবশ্যই আমার কোন অসুবিধা নেই। দেখ আমি ঘুম থেকে উঠে পড়েছি।”
আদ্রিয়ানের এমন কথা শুনে মেঘের কান গরম হয়ে যায়। বাথরুমের দরজা লাগিয়ে দিয়ে শব্দ করে বলে উঠে
“অসভ্য পুরুষ”
