মহামায়া পর্ব ৬৪
তুশকন্যা
‘কি বডি, কি ফিটনেস, কি স্ট্রাকচার, কি মাসেলস্….’
‘উফফ! পুরো মাখনের মতো ছিল!’
টপাটপ জলবিন্দু গুলো ফর্সা বলিষ্ঠ গায়ের উপর গড়িয়ে পড়ছে, ভিজে যাচ্ছে পুরুষের সর্বাঙ্গ, প্রতি মূহূর্তে তার সূক্ষ্ম নড়াচড়া, শরীরে জড়ানো একখন্ড টাওয়ালের উপরও নির্লজ্জের ন্যায় ঈর্ষা করে পরক্ষণেই আবার লজ্জায় কুঁকড়ে যাওয়া—দুচোখ বুজে পুরুষের মোহাবিষ্ট রূপের বর্ননা একে একে মন-মস্তিষ্কে গেঁথে নিচ্ছিল আনায়া। তার এই অকাজ আর স্বগত প্রলাপের মাঝেই আচমকা দরজায় সশব্দে ভেসে এলো ভারী ঠকঠক শব্দ!
মুহূর্তের মধ্যেই তার শরীরে আতঙ্কের এক তীব্র হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। হৃদপিণ্ডটা যেন এক লাফে একদম গলায় এসে ঠেকলো। ধরা পড়ে যাওয়ার চরম আশঙ্কায় তড়িঘড়ি করে ল্যাপটপের ঢাকনাটা সপাটে বন্ধ করল সে। হাত-পা কাঁপতে থাকা সত্ত্বেও এক প্রকার অতিমানবীয় গতিতে মোমবাতি স্ট্যান্ডটা হাতে তুলে নিয়ে বাকি সবকিছু ব্ল্যাঙ্কটের নিচে লেপে দিয়ে ঢেকে দিল।
গলা ভেজাতে শুষ্ক এক ঢোক গিলে, বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দরজার দিকে এগোলো আনায়া। ভেতরে অসীম ভয় লুকিয়ে রেখে, মুখের ওপর এক চিলতে অমায়িক নিষ্পাপ হাসি ফুটিয়ে দরজাটা সামান্য ফাঁক করল সে।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে আইজেল।
আনায়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। আইজেল তার দিকে পরখ করা নজরে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল,
”ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি? লাইট তো সব বন্ধ।”
—“আ… না মানে, ওই একটু ভাবছিলাম আর কি! কি যেন ভাবছিলাম…ওসব যাক,বলো কী বলবে?”
আনায়া তোতলে উঠে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল।আইজেল সন্দেহের এক ছায়া মুখে ফুটিয়ে বলল,
”ভাবছিলে মানে? তুমি কি কালকের টেস্ট এক্সামের কথা একদম ভুলে গেছ, আনায়া? জানো তো, এক্সাম কে নিবেন। প্রফেসর কিন্তু কাল কোনো এক্সকিউজ শুনবেন না। আমি জাস্ট রিমাইন্ডার দিতে এলাম, ওনার টেস্টের জন্য ঠিকমতো প্রিপারেশন নিচ্ছো তো?”
কথাটা শোনা মাত্রই আনায়ার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাওয়ার জোগাড়! এক্সাম? কোন এক্সাম? কিসের এক্সাম? তক্ষুনি তার মনে পড়ল, প্রফেসর ভিকে নামক এক মহাপুরুষ টেস্ট এক্সামের নামে তাদের গণধোলাইয়ের ব্যবস্থা করেছেন। অথচ সেই টেস্ট এক্সামের কথা তো এতসব ভক্করচক্করের মাঝে তার মাথা থেকেই একপ্রকার উবে গিয়েছিল!
আনায়া আমতা আমতা করে, বেশ কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে মুখে এক মেকি আত্মবিশ্বাসের হাসি ঝুলিয়ে বলল,
”আহ্ হ্যাঁ হ্যাঁ! ওসব প্রিপারেশন তো আমার একদম পানির মতো ঠোটস্থ! তুমি এত ভেবো না তো…ইজিই হবে এক্সাম। আমি তো এতক্ষণ ধরে এক্সামেরই প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম।”
আইজেল তার এই অস্বাভাবিক চটপটে ভঙ্গিতে খানিকটা সন্দেহজনক চোখে তাকাল। তবে কথা না বাড়িয়ে কেবল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ওহ তাই বলো! আচ্ছা তবে তুমি পড়ো, আমিও গিয়ে বাদবাকি পড়া কমপ্লিট করি। না জানি, পড়া শেষ হতে হতে আজ রাতে ক’টা বাজবে।”
আনায়া মুচকি হেসে বলল,
“অল দ্য বেস্ট, আইজেল!”
আইজেল করিডোর ধরে নিজের রুমের দিকে প্রস্থান করতেই আনায়া ঝটপট দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি তুলে দিল।
পর মুহূর্তেই তার পড়ার টেবিলের পড়াশোনা কিংবা কালকের এক্সামের প্রিপারেশন সব চুলোয় গেল! এক লাফে বিছানায় গিয়ে উঠে বসে আবার ব্ল্যাঙ্কেটের নিচ থেকে ল্যাপটপটা টেনে বের করল সে। টপাটপ আঙুল চালিয়ে স্ক্রিন অন করতেই তার হতাশ মুখ আবার চকচক করে উঠল।
বাথরুমের ফাঁকা ও খালি সিন পেরিয়ে এবার ক্যামেরা ফুটেজ শিফট হয়েছে কেনীথের সুবিশাল বেডরুমে। বাথরুম থেকে গোসল সেরে বেরিয়ে আসা কেনীথ তখন একদম শুকনো একটি কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরিহিত। তার ভেজা চুল থেকে পানির ফোঁটা ঝরে পড়ছে। স্ক্রিনের সামনে আনায়া হাত দুটো গালে ঠেকিয়ে, সম্পূর্ণরূপে টেস্ট এক্সামের চিন্তা উধাও করে দিয়ে, প্রকাণ্ড সেই ঘরে পুরুষের হাঁটাহাঁটি আর স্বাভাবিক কাজকর্মগুলোই অতি আগ্রহের সাথে বেহায়ার মতো গিলে গিলে দেখতে শুরু করল।
পরদিন পরীক্ষার হল। আনায়ার অবস্থা হচ্ছে চরম নাজেহাল!
গতকালের রঙতামাশার পর বেশ হাসিখুশি মনেই পরীক্ষার হলে পা রেখেছিল আনায়া। কিন্তু হলে ঢুকতেই পড়েছে এক মহাবিপদে। ক্লাসরুমে আজ গম্ভীর মূর্তিতে প্রফেসর রূপে ভিকে তথা কেনীথের উপস্থিতি ঘটামাত্রই, কোনো প্রকার সৌজন্যমূলক কুশলবিনিময় ছাড়াই সে সোজাসাপ্টা সিট প্ল্যান চেঞ্জ করার কড়া নির্দেশ দিল। এমন অদ্ভুত ও নিষ্ঠুর নিয়ম পুরো ভার্সিটিতে আর কোনো প্রফেসর করেন কিনা তা জানা নেই; তবে প্রফেসর ভিকে মানেই সবকিছু ব্যতিক্রম!লোকটা যা নিয়ম করবে, সবাইকে অম্লান বদনে সেটাই মেনে নিতে হবে।
সিট চেঞ্জ করার মুহূর্তেই আনায়া বুঝে গিয়েছিল—আজ তার কপালে বিশাল বড় শনি নাচছে! গতরাতে আইজেলের জবরদস্ত প্রিপারেশন দেখে সে মনে মনে একদম নিশ্চিন্তে ছিল; ভেবেছিল পরীক্ষার সময় আইজেলের খাতা দেখে হুবহু নিজের খাতায় ছেপে দেবে। কিন্তু বাস্তবতায় হলো তার চরম উল্টো। আইজেলকে গিয়ে শেষমেশ বসতে হলো আনায়ার থেকে প্রায় দশ সিট পেছনে, একদম বাঁ পাশের কোণায়! শেষ ভরসা হিসেবে লারিসা আর জেইন ছিল, কিন্তু কপাল খারাপ—তারাও ছিটকে গিয়ে ক্লাসরুমের অপর দুই কোণে স্থান পেল।
অতঃপর এক মুহূর্ত কালবিলম্ব না করে কেনীথ কোশ্চেন পেপার্স বিতরণ করে দিল এবং নিখুঁত সময়টাও বেঁধে দিল সুনির্দিষ্টভাবে। মুহূর্তের মধ্যেই প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে সবাই নিজের মতো লিখতে শুরু করল। কারো মুখে কোনো কথা নেই, পুরো হলে কেবল কলমের খসখস শব্দ আর তুমুল গতিতে হাত চলার আওয়াজ।
আর প্রফেসরের ডেস্ক থেকে মাত্র দুই বেঞ্চ পেছনে জায়গা পাওয়া আনায়া তখন চরম অসহায়ত্ব নিয়ে মুখের সামনে প্রশ্নটা ধরে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। এমনিতেই সে কিছুই পড়েনি, তার ওপর এমন নয় যে মাথা খাটালে সে কিচ্ছু পারবে না। কিন্তু আসল সমস্যা হলো—মাথা খাটানোর মতো সেই জ্ঞানটুকু তো এখন আর তার মগজে অবশিষ্ট নেই! পুরো মাথায় জাঁকিয়ে বসে আছে গতরাতের সেই গোপন কার্যকলাপের ঘটনাগুলো। চোখের সামনে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যগুলো এখনও ঝিলমিল করে ঘুরঘুর করছে। আর সারারাত না ঘুমানোর ফলে চোখের পাতা দুটোও ঢুলে ঢুলে নিচে নেমে আসছে।
আনায়া বিষণ্ন মুখে এলোমেলো ঢঙে মাথা চুলকাল। আচমকা পাশে বসা এক মেয়ের খাতার দিকে আড়চোখে একটু নজর দেওয়ার চেষ্টা করতেই, তার নজর গিয়ে ঠেকলো ঠিক সামনে।
ফর্মাল ব্ল্যাক সুট-বুটে সজ্জিত কেনীথ তখন বুকে দু-হাত গুঁজে, সরু ফ্রেমের চশমার আদলে সোজাসাপ্টা তার দিকেই তাকিয়ে আছে! পুরুষের সেই কঠিন গম্ভীর মুখাবয়ব আর ক্ষুরধার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির মুখোমুখি হতেই আনায়া আতঙ্কে এমন বেশম খেল যে এক ঝটকায় নিজেকে গুটিয়ে নিল। সে তড়িঘড়ি মাথা নিচু করে, ঘাড়ের ওপর ছড়িয়ে পড়া একঝাঁক চুলের আড়ালে মুখটা ঢেকে ফেলল। চোখ দুটো শক্ত করে খিঁচে পেন্সিল আর কলম হাতে খাতার ওপর একপ্রকার তাণ্ডব শুরু করল। ভাবসাব এমন দেখাল যেন সে লিখতে লিখতে আজ বিশ্বজয় করে ফেলবে! অথচ বাস্তবিক অর্থে তার ধবধবে সাদা খাতার পাতায় তখন কেবল অযথা অজস্র কলম-পেন্সিলের হিজিবিজি দাগ পড়ে চলেছে।
কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ সময় কাটানো যায়? সবাই যখন খাতা ভরিয়ে ফেলায় ব্যস্ত, রমণী তখন কেবল প্রহর গুনছে—কখন এই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তটুকু শেষ হবে!
আনায়া একসময় আনমনে জানালার বাইরের খোলা আকাশের দিকে মুখ ফেরাল। দেখতে দেখতে পুনরায় সে গতকালের সেই নিষিদ্ধ ভাবনায় তলিয়ে গেল। জানালার ওপাশে তাকিয়ে সে কিসব যেন মনে মনে চিন্তা করে মিটমিট করে হাসতে লাগল! পরক্ষণেই আবার ঘোর কাটলে চট করে মাথা নুইয়ে খাতার পাতায় নানান সব কাল্পনিক আঁকিবুঁকি কাটতে শুরু করল। রমণীর এই চরম আনমনা হাবভাব প্রফেসরের ডেস্ক থেকে আড়চোখে খুব সূক্ষ্মভাবে পরখ করে চলেছে কেনীথ। যদিও তার তীক্ষ্ণ মগজেও এখন বোধগম্য নয়—মেয়েটির মাথায় আজ ঠিক কী অঘটন ঘটছে!
এভাবে প্রায় অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পর, পরীক্ষার শেষ পাঁচ মিনিট বাকি থাকতে প্রফেসর তাদের গম্ভীর কণ্ঠে শেষ ওয়ার্নিং দিল। বাকি সবাই তাড়াহুড়ো করে আরও দ্বিগুণ গতিতে লিখতে শুরু করল। কিন্তু আনায়ার তখনও কোনো হুঁশ ফেরেনি! সে মাথা নুইয়ে খাতাটা আড়াল করে আনমনে ঠিক কী এঁকে চলেছে, তা বোধহয় সে নিজেও জানে না।
এরই মধ্যে পরীক্ষার নির্ধারিত সময় শেষ হতে না হতেই খাতা জমা দেওয়ার সময় হলো। সবাই একসঙ্গে সামনে এসে ডেস্কে খাতা জমা দিতে গেলে অযথা হট্টগোল বাঁধবে—তাই কেনীথ ক্লাসরুমের ছয়জন স্টুডেন্টকে দায়িত্ব দিল সবার খাতা তুলে নেওয়ার জন্য। তার আদেশ পাওয়ার সাথে সাথে তারা দ্রুত কাজে লেগে পড়ল। একে একে সবার খাতা তোলার পর এবার আনায়ার বেঞ্চের পালা এলো।
কিন্তু তখনও আনায়ার কোনো দুনিয়াদারি জ্ঞান নেই! পাশ থেকে খাতা তুলতে আসা মেয়েটি কয়েকবার ডেকে উঠতেই সে হঠাৎ এমনভাবে চমকে উঠল যেন সজ্ঞানে ভুত দেখেছে। আতংকে সবার আগে নিজের আঁকিবুকি করা এক্সাম খাতাটা দ্রুততর ঢেকে ফেলল।
তবে মুহূর্তের মধ্যেই সে থমকে গেল। পুরো ক্লাসরুমের সবকটা জোড়া চোখ তখন তার ওপর নিবদ্ধ! আনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই, মেয়েটি চট করে আনায়ার হাত সরিয়ে খাতাটা ছো মেরে তুলে নিয়ে বাদবাকি সবকটি খাতার সাথে একগাদা করে ফেলল। আর চোখের পলকে সেই পুরো খাতার স্তূপ পৌঁছে দেওয়া হলো কেনীথের ডেস্কে!
আনায়া তখন ফ্যালফ্যাল করে স্রেফ চারপাশটার দিকে তাকিয়ে রইল। তখনও তার অবোধ মস্তিষ্কে পুরোদমে খেলেনি যে—তার এই লাগামহীন খামখেয়ালিপনার পরিণতি আসলে কতখানি বিতিকিচ্ছিরি হতে চলেছে।
ঘড়ির কাঁটা রাত দুটোর ঘর ছুঁয়েছে। কেনীথের প্রকাণ্ড মাস্টার বেডরুমের মেঝেতে চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো ফাইলের স্তূপ। তার মাঝে বসে একনাগাড়ে স্টুডেন্টদের টেস্টের খাতা দেখে চলেছে কেনীথ। পরনে সাধারণ কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজার, চোখে চশমা। কপালে স্পষ্ট বিরক্তির ভাঁজ, আর প্রখর দৃষ্টি নিবদ্ধ খাতার পাতার ওপর। গা ঘেঁষে শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে ক্লারা। কেনীথ প্রতিটি খাতা দেখা শেষ করে বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করছে,
“গর্দভের দল!”
বলেই সে খাতাটা পাশে ছুঁড়ে ফেলে পরবর্তী খাতা টেনে নিচ্ছে। তার এই ব্যস্ততার মাঝেই ফোনের নোটিফিকেশন টোন একের পর এক বাজতে শুরু করল। বিরক্ত হয়ে ফোনটা সাইলেন্ট করতে গিয়েও স্ক্রিনের নাম দেখে থমকে গেল কেনীথ—‘জুলি দ্য আইসললি!’
ভারী এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেসেজগুলো চেক করল সে।
‘জান, কোথায় তুমি?
‘কী করো?’
‘আমার কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে?’ ‘একটুও মনে পড়ে না আমায়, হ্যাঁ?’
নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে ল্যাপটপে কেনীথের বেডরুমের ফুটেজ স্টক করতে করতেই টেক্সটগুলো পাঠিয়েছে আনায়া। এদিকে কেনীথ এসব চপলতায় সময় নষ্ট না করে সংক্ষেপে সোজাসাপ্টা টাইপ করল,
”গার্লফ্রেন্ড নিয়ে রুম-ডেটে আছি, ডোন্ট ডিস্টার্ব মি!”
ফোনটা সাইলেন্ট করে সোজা বিছানার দিকে ছুঁড়ে মারল কেনীথ। তারপর আবার ডুবে গেল নিজের কাজে। আদোও সে স্টুডেন্টদের খাতা দেখছে, নাকি গনহারে সবগুলো খাতার ওপর তান্ডব চালাচ্ছে—তা বোঝা মুশকিল।
এদিকে আনায়ার চোয়াল ঝুলে পড়েছে। হতভম্ব হয়ে চোখের সামনে সবটাই দেখল সে। হাতে থাকা মোবাইলের স্ক্রিণে ভেসে ওঠা মেসেজ আর ল্যাপটপের স্ক্রিনে চলমান দৃশ্যকে সে এক করতে পারল না। আনায়া হতভম্ব হয়ে আওড়াল,
“কী মিথ্যুক রে বাবা! বলে কিনা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে রুমডেটে আছে। এই তার ডেটের নমুনা? আর গার্লফ্রেন্ডটা কে? ওই কুকুরটা?”
প্রথমে বিরক্ত হলেও পরক্ষণেই ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করল আনায়া। বিছানায় গড়াগড়ি খেয়ে হাসতে হাসতে বিড়বিড় করল,
“থাক, আজ আর বিরক্ত না করি। মুরুব্বি এখন ভীষণ সিরিয়াস মুডে আছে।”
আনায়া ল্যাপটপ বন্ধ করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলেও ওদিকে কেনীথের মেজাজ ততক্ষণে তুঙ্গে। অর্ধেকের বেশি খাতা পরখ করার পর এমন একটি খাতা হাতে এলো, যা দেখে সে নিজেও স্তম্ভিত।
নাম চেক না করেই পাতা উল্টাতেই সামনে ভেসে উঠল কলম আর পেন্সিলে আঁকা অদ্ভুত সব চিত্রকর্ম। কেনীথ ভ্রু কুঁচকে মনে মনে ভাবল—‘এটা আবার কোন ডিপার্টমেন্টের খাতা এখানে চলে এলো?’
কিন্তু পাতাগুলো যত উল্টাতে লাগল, চিত্রকলার ধরন তত বদলে যেতে থাকল। কোনো অ্যানাটমি নয়, বরং পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে—এটা কোনো চরম বেহায়া স্টুডেন্টের কাণ্ড! কেনীথ আক্রোশে খাতাটির প্রথম পাতায় নামটা চেক করার জন্য উল্টাতেই বিড়বিড় করল,
”এত সাহস হয় কী করে এদের! কত বড় ইডিয়ট হলে টেস্টের খাতায় এমন সব…”
কথাটা আর শেষ করতে পারল না কেনীথ। খাতার কভারে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা—‘Anaya Ehsan’ এবং তার নিচে রোল নম্বর। কেনীথের আর আশ্বস্ত হতে বাকি নেই যে, খাতাটা কার। কিন্তু এই মেয়ে এমন আহাম্মকের মতো কাজটা কোন সাহসে করল, সেটাই সে বুঝে উঠতে পারছে না।
দুই দিন ধরে ভার্সিটিতে আনায়ার তেমন একটা আনাগোনা নেই। প্রথম দিন সে পরীক্ষার রেজাল্টের ভয়ে এক প্রকার আত্মগোপন করে বাড়িতেই কাটিয়েছে। কিন্তু একটা সময় পর নিজের স্বভাবসুলভ খামখেয়ালিপনায় রেজাল্টের চিন্তা মাথা থেকে একপ্রকার ঝেড়ে ফেলে দিয়ে, সে আজ আবার খোশমেজাজে ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।
সবকিছুই ঠিকঠাক আর স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। সকালে ক্যাম্পাসে এসে বন্ধুদের সাথে চুটিয়ে আড্ডা আর হাসি-ঠাট্টায় মেতে ছিল আনায়া। কিন্তু থার্ড পিরিয়ডেই হঠাৎ ক্লাসরুমে আগমন ঘটল প্রফেসর ভিকের।
আনায়ার তখনও খুব একটা খেয়াল ছিল না। তবে আজ কেনীথ ক্লাসের কোনো নামগন্ধ না নিয়ে, থমথমে এক বিষাদময় গম্ভীর মেজাজ নিয়ে হাতে থাকা ফাইলগুলো ডেস্কে ফেলে খতিয়ে দেখতে লাগল।
জেল দেওয়ার পরও খানিকটা অবিন্যস্ত হয়ে থাকা মেসি চুল, হাতে কালো গ্লাভস, হাইনেকের সোয়েটারের ওপর জড়ানো কালো অভারকোট মিলিয়ে সুদর্শন পুরুষের ডিসেন্ট লুক রমণীর অন্তরাত্মাকে মরি-মরি করলেও; পুরুষের চোখের কালো-সোনালী চিকন ফ্রেমের চমশা আদলে সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কিংবা শক্ত চোয়াল, ললাটে তিক্ততার ভাজ—সব মিলিয়ে আনায়া দূর থেকে তার চেহারার এমন অতিরিক্ত গম্ভীর ও কঠিন ভাবমূর্তি দেখে মনে মনে ভাবল,
‘ঘটনা কী! বড় আব্বুর বাচ্চার মেজাজ আজ এত বিগড়ানো কেন?’
কিন্তু আনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই যা ঘটার ঘটে গেল। ফাইলগুলো খতিয়ে দেখা শেষ করেই কেনীথ আচমকা স্পিকারের ন্যায় গমগমে গলায় বেশ কিছু রোল নম্বর টানা ডেকে যেতে লাগল এবং তাদের ক্লাসে দাঁড়িয়ে যেতে নির্দেশ দিল। পিনপতন নীরবতার মাঝে একে একে সেই রোল নম্বর অনুযায়ী স্টুডেন্টরা অজানা আশংকা নিয়েই দাঁড়িয়ে পড়তে লাগল। ক্লাসের প্রত্যেকের মনেই তখন এক তীব্র আতঙ্ক—দুদিন অপেক্ষা করেও রেজাল্ট আসেনি, না জানি আজ তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে!
ঠিক তখনই প্রফেসরের গম্ভীর কণ্ঠস্বরে খুব স্পষ্টতভাবে উচ্চারিত হলো আনায়ার রোল নম্বরটিও।
আনায়ার পুরো শরীর মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। পাশ থেকে আইজেল ব্যস্ত ঢঙে কনুই দিয়ে খোঁচা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
”আনায়া! এটা তো তোমারই রোল নম্বর, তাই না?”
আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলে কেবল অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। অতঃপর কাঁপাকাঁপা পায়ে ক্লাসের বাকিদের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল।
সব মিলিয়ে মোট ১৪ জন স্টুডেন্টকে দাঁড় করানোর পর, কেনীথ ফাইলটা এক হাতে শক্ত করে ধরে ডেস্কে রেখে সকলের উদ্দেশ্যে দৃঢ় ও আদেশসূচক গলায় বলল,
“তোমরা চৌদ্দ জন আমার সাথে এসো। আর বাকিরা কোনো রকম বিশৃঙ্খলা না করে সোজা আউটার নোটিশ বোর্ড থেকে নিজেদের টেস্টের রেজাল্ট দেখে নেবে।”
রেজাল্টের নাম শুনেই এক নিমেষে আনায়ার গলা শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেল! সেরেছে, আজ আর কোনো ছাড় নেই!—সংশয়ে আড়ষ্ট হয়ে আনায়া বাকি তেরো জন দুর্ভাগা স্টুডেন্টের সাথে মিলে অত্যন্ত ধীর পায়ে প্রফেসরের পেছন পেছন করিডোর ধরে এগোতে লাগল। আর মনে মনে ভাবতে লাগল—না জানি আজ কপালে কত বড় শনি অপেক্ষা করছে।
মস্ত বড় এক কেবিন। চারদিকে ফাইল আর বইয়ের পাহাড়। কেবিনের ভেতর চৌদ্দজন স্টুডেন্ট সুবিন্যস্ত সারিতে দাঁড়িয়ে আছে, আর তাদের ঠিক সামনে প্রফেসরের সুবিশাল ওক কাঠের ডেস্ক। কেনীথ ড্রয়ার থেকে তাদের টেস্টের খাতার স্তূপটা বের করতেই ঘরের বাতাস এক অদৃশ্য আশঙ্কায় ভারী হয়ে উঠল। আনায়ার পাশাপাশি বাকিদের মনেও এক তীব্র ভয়—নিশ্চয়ই তারা ফেল করেছে বলেই প্রফেসরের এই বিশেষ তলব।
কেনীথ শান্ত অথচ কঠিন স্বরে সবাইকে টেবিলের কাছাকাছি এসে দাঁড়াতে নির্দেশ দিল। অতঃপর আনায়াকে বাদ দিয়ে, সে একে একে তেরোজন স্টুডেন্টের হাতে তাদের নিজ নিজ পরীক্ষার খাতা ধরিয়ে দিল।
”ভালোভাবে নিজেদের খাতাগুলো চেক করো। ভুলগুলো ঠিক কোথায় হয়েছে, কেন মার্কস পাওনি—বুঝে নাও। যদি কোনো সংশয় থাকে এখনই জিজ্ঞেস করতে পারো, যাতে চ্যাপ্টারের সেই সম্পর্কিত টপিকগুলো এখনই বুঝিয়ে দেওয়া যায়।”
খাতার পাতা উল্টাতেই প্রত্যেকের মুখের রঙ চটে গেল। পুরো খাতা জুড়ে লাল কালির কাটাকুটিতে স্পষ্ট—তারা সবাই ফেল করেছে! একইসাথে এটাও ভাবছে, এইমূহূর্তে ক্লাসরুমে অবস্থান করা বাকিদের অবস্থাটা মূলত কি; যেভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খাতা দেখেছে, তাতে স্পষ্টত আন্দাজ করা যায় বাকিরা কেবল ফেল করতে করতে কানের পিঠ দিয়ে বেঁচে পাশ করেছে।
কিন্তু শুরুতে প্রফেসরের এমন কঠোর চড়া মেজাজ দেখে এসে এখন তার এই শান্ত ভাবমূর্তি সবাইকে আরও বেশি সন্দিগ্ধ করে তুলল। ঠিক তখনই তাদের আশঙ্কাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে কেনীথ ধারালো গম্ভীর স্বরে বলতে শুরু করল,
”সিম্পল একটা অ্যাসেসমেন্ট টেস্টে চৌদ্দজন ফেল। দ্যাটস মিন, ইটস টাইম ফর পানিশমেন্ট… অ্যাম আই রাইট? সো, টেল মি, হোয়াট কাইন্ড অভ পানিশমেন্ট উড ইউ প্রিফার?”
চোখে পরনে চিকন ফ্রেমের চশমাটা আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় একটু ওপরে ঠেলে দিল কেনীথ। তারপর হাতের সাইনপেনটা ড্রামবিটের মতো টেবিলে নাড়াতে নাড়াতে সবার দিকে চাইল।
স্টুডেন্টদের মুখগুলো ততক্ষণে শুকিয়ে গেছে। প্রফেসরের এমন রুক্ষ প্রশ্নের সামনে সবাই চুপসে দাঁড়িয়ে রইল। কেনীথ তাদের ভয়ার্ত চেহারাগুলোর দিকে তাকিয়ে হালকা মুচকি হাসল,
”থাক তবে, এবারের মতো না হয় ছেড়ে দিলাম।”
কথাটা শোনামাত্রই সবার বুকে যেন জমে থাকা বরফ গলে পানি হয়ে গেল। স্টুডেন্টরা ভেতরে ভেতরে চরম আনন্দিত হয়ে ওঠার উপক্রম করতেই, কেনীথ অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে পরবর্তী বাক্যটি যোগ করল,
”তবে… এবারের টেস্ট যে ক’টা চ্যাপ্টারের ওপর নেওয়া হয়েছিল, তার প্রত্যেকটি চ্যাপ্টারের মেইন থিওরি আর ক্যালকুলেশনগুলো পর পর একুশবার করে হাতে লিখে অ্যাসাইনমেন্ট আকারে রেডি করবে। আগামী তিন দিনের মধ্যে সব অ্যাসাইনমেন্ট আমার ডেস্কে জমা চাই।”
শাস্তির ধরন শুনেই পুরো কক্ষের আবহ থমকে গেল। সবার চোখ জোড়া কপালে উঠার জোগাড়। তিন দিনের মধ্যে বিশালাকার চ্যাপ্টারগুলো একুশবার করে হাতে লিখে শেষ করা স্রেফ অসম্ভব! এটা তো শাস্তি নয়, একপ্রকার হাত অবশ করে আধমরা বানিয়ে ফেলার সুপরিকল্পিত আয়োজন।
কিন্তু প্রফেসরের আদেশের ওপর কথা বলার মতো দুঃসাহস কারো নেই। কেনীথ তাদের হতভম্ব চাউনিকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে বলল,
”সবাই এখন আসতে পারো। ক্লাসে গিয়ে অপেক্ষা করো, দশ মিনিটের মধ্যে আমি আসছি।”
মনমরা ও বিষণ্ন মুখে সবাই একের পর এক প্রফেসরের কেবিন থেকে প্রস্থান করতে লাগল। এতক্ষণ হতে সবার পেছনে, এক কোণায় নিজেকে আড়াল করে রাখা আনায়াও ধীর পায়ে তাদের পিছু পিছু বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু ঠিক তখনই পেছন থেকে কেনীথের অদ্ভুত রসিকতামূলক বাজখাঁই ডাক ভেসে এলো,
”এই যে ম্যাডাম, দাঁড়ান, দাঁড়ান!”
আনায়ার পায়ের তলা থেকে যেন মেঝের স্পর্শ উধাও হয়ে গেল। থতমত খেয়ে সে সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখল—কেনীথ একটি খাতা হাতে নিয়ে অদ্ভুত এক কায়দায় হেলান দিয়ে নিজের এক্সিকিউটিভ চেয়ারে বসে আছে। তার চোখের প্রখর সেই অদ্ভুত দৃষ্টি সম্পূর্ণ আনায়ার ওপর স্থির।
আনায়া দ্রুত আড়চোখে নিজের চারপাশটা পরখ করে নিল। না, ঘরে আর একটা প্রাণীও অবশিষ্ট নেই! সে চরম সংশয় আর দ্বিধা নিয়ে নিজের ওপর আঙুল তাক করে বলল,
”কে? আমি?”
পুরুষ তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে আওড়াল,
”জ্বী আপনি। এদিকে আসুন।”
আনায়া চোখ দুটো ঘন ঘন পিটপিট করতে করতে অত্যন্ত ভীরু পায়ে প্রফেসরের ডেস্কের দিকে এগিয়ে গেল। ততক্ষণে কেনীথ খাতাটা হাতে নিয়ে স্বস্থান থেকে উঠে দাঁড়াল এবং নিজেই ধীর পদক্ষেপে আনায়ার দিকে এগিয়ে এলো।
আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলে নিজের আতঙ্ক সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাল। ঠিক তখনই কেনীথ তার হাতে ধরা খাতাটা এদিক-সেদিক করে দেখতে দেখতেই, শান্ত স্বরে বলল,
“এত কষ্ট করে টেস্ট দিলেন, চমৎকারভাবে ফেল করলেন, অথচ খাতাটা না দেখেই চলে যাচ্ছেন?”
হঠাৎ পুরুষের এতো ভণিতা আনায়ার ঠিকঠাক হজম হলো না। আনায়া শুকনো মুখে কেনীথের দিকে চেয়ে রইল। কেনীথ খাতাটা তার দিকে আরেকটু বাড়িয়ে দিল,
“নিন, নিন! নিজের চিত্রকর্ম দেখুন!”
এতক্ষণ যা-ও বা একটু স্থিরতা ছিল, এবার আনায়ার আসল হুঁশ ফিরল। তার তো মাথা থেকেই একপ্রকার উবে গিয়েছিল যে পরীক্ষার দিন সে খাতার পাতায় ঠিক কী তাণ্ডব চালিয়েছিল! ঝোঁকের বশে, মাঝরাতের স্মৃতি আর তন্দ্রাচ্ছন্ন মগজ নিয়ে সে না জানি খাতার ভেতর কী সব এঁকে দিয়ে এসেছে।
আনায়া তীব্র অপ্রস্তুত আর বিব্রত ভঙ্গিতে চট জলদি আওড়াল,
”চিত্রকর্ম মানে?”
টেবিলের প্রান্তে গা ঠেকিয়ে, বুকে দু-হাত শক্ত করে গুঁজে দাঁড়াল কেনীথ। বাঁ হাতের তর্জনী দিয়ে চোখের চশমাটা খানিকটা ওপরে ঠেলে দিয়ে অত্যন্ত ধীর ও ধারালো স্বরে বলল,
”সেটা তো আপনিই ভালো বলতে পারবেন, ম্যাডাম! ম্যাকানিক্যালের স্টুডেন্টরা কবে থেকে এক্সামের খাতায় বায়োলজিক্যাল স্ট্রাকচার আর অ্যানাটমি আঁকতে শুরু করল—সেটা আমিও একটু বিস্তারিত জানতে চাই!”
কেনীথের সহজ অভিব্যক্তি। অথচ আনায়া ভীষণ ইতস্তত করতে লাগল; চোখের পলকে তার মুখ-চোখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
ততক্ষণে কেনীথ তার কম্পিত হাতের মুঠোয় খাতাটা ধরিয়ে দিয়েছে। আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলে অতি কষ্টে চোখ নামিয়ে খাতার পাতা ওল্টাতেই সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল। স্বচক্ষে দেখা সত্যকেও যেন সে বিশ্বাস করতে পারছে না—কী সব আঁকিঝাঁকি করে রেখে এসেছে সে!
কোনো পৃষ্ঠায় প্রকাণ্ড পুরুষের অর্ধনগ্ন দেহের ছায়ামূর্তি, কোথাও আবার ক্ষুরধার বলিষ্ঠ মাসল আর ব্যাক-অ্যাবস, কোনো পেজে গভীর দৃষ্টিভঙ্গি সংবলিত চোখ-নাক, তো শেষের দিকটায় সোজা কাঁধ ছোঁয়া এলোমেলো চুলের কেনীথেরই নিখুঁত প্রতিকৃতি! বাদবাকি পাতাগুলো তো আরও বিপরীত আর আপত্তিকর ইঙ্গিতবাহী সব চিত্রে ভরা; যা নির্লজ্জতার চূড়ান্ত প্রমাণ ছাড়া আর কিছুই নয়।
আনায়ার আর সাহস হলো না পরের পাতাগুলো দেখার। সে অপরাধীর মতো কেনীথের দিকে চেয়ে অস্পষ্ট গলায় বলল,
”দেখুন… আমি আসলে…”
”জ্বী জ্বী বলুন, আমি শুনছি।”
কেনীথ হাত দুটো বুকে বেঁধে শান্ত কণ্ঠে সুযোগ দিল। কিন্তু কেনীথের চেহারায় এমন অদ্ভুত প্রশান্তি আর ছদ্ম রসিকতা দেখে আনায়া আরও বেশি ঘাবড়ে গেল। তোতলে উঠে বলে বসল,
”ইয়ে মানে… এটা আমার খাতা না!”
”তোর খাতা না?”
কেনীথ বাঁ-ভ্রু সামান্য উঁচিয়ে শুধাল। আনায়া তড়িঘড়ি করে খাতাটা কেনীথের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আপ্রাণ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুরে আবারও বলল,
”না!”
“ওহ্ আচ্ছা! তাহলে আরেকটু কষ্ট করে খাতাটা উল্টে দেখে বলুন তো, খাতার ওপর কার নাম লেখা?”
আনায়া তার কথায় পুনরায় চরম অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি খাতার ফ্রন্টপেজের নাম আর রোল নম্বর চেক করল। ধবধবে সাদা কভারের ওপর নিজের নাম ও রোল নম্বর স্পষ্টত জ্বলজ্বল করতে দেখে সে যেন আবার অস্বস্তির অতলে তলিয়ে গেল।
ততক্ষণে কেনীথ প্রখর দৃষ্টি রেখে ঠান্ডা গলায় আওড়াল,
—”কার নাম, ম্যাডাম?”
আনায়া এবার প্রায় কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
—”না মানে…”
—”জ্বী বলুন।”
—”খাতা আমারই… কিন্তু এগুলো…”
—”আপনি আঁকেননি, তাই তো?”
কেনীথ মাঝপথে তার কথা কেড়ে নিয়ে স্লেশের সুর মেলাল। আনায়া ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ঠোঁট কামড়ে ইতস্তত করল,
—”না মানে…”
—”জ্বী, জ্বী বলতে থাকুন। শুনছি।”
আনায়া এবার ভয় ও লজ্জায় চোখের জল প্রায় ফেলে দিয়ে, চটজলদি বলেই ফেলল,
”খাতা আমারই, ছবিগুলোও আমিই এঁকেছি! কিন্তু আমি ইচ্ছে করে আঁকতে চাইনি, বিশ্বাস করুন! ওগুলো একা একাই হয়ে গেছে!”
কথাটা শোনামাত্রই কেনীথের চোয়াল নিমেষে শক্ত হয়ে গেল। বুকের ওপর আড়াআড়ি রাখা হাতের ভাঁজ খুলে, গম্ভীর ভঙ্গিতে ফর্মাল প্যান্টের পকেটে দুই হাত গুঁজে দিল সে। অতঃপর চাপা থমথমে কণ্ঠে বলল,
”ফাইজলামি করিস আমার সাথে?”
আনায়া উত্তর দেওয়ার মতো কোনো যুক্তি খুঁজে না পেয়ে মাথা নিচু করে রইল। কেনীথ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কক্ষের বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দীর্ঘ দুই পা বাড়িয়ে বলল,
”চল আমার সাথে।”
আনায়া চরম বিস্ময় আর আতঙ্ক নিয়ে পেছন থেকে শুধাল,
”কোথায়?”
—“প্রফেসর গিলবার্টের কাছে।”
মুহূর্তেই যেন আনায়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল! প্রফেসর গিলবার্ট মানেই তো ভার্সিটির সবচেয়ে কড়া আর নির্দয় ব্যক্তিত্ব; ওনার কানে এই অসভ্যতার কথা গেলে তো আস্ত রাখবেন না! সে দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে কেনীথকে থামাতে তার কাছে ছুটে গেল। খপ করে কেনীথের কোর্টের হাতা আঁকড়ে ধরে কাকুতি-মিনতি করতে শুরু করল,
”না প্লিজ! এটা অন্তত করবেন না! যত বড় পানিশমেন্ট দেবেন আমি মাথা পেতে নেব, তবুও ওনার কাছে নিয়ে যাবেন না। উনি একদম আমায় ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবেন… একটু রহম করুন আমার ওপর!”
কেনীথ থমকে দাঁড়াল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চপল রমণীর দু-চোখ ভরা আকুলতা আর অশ্রু থৈথৈ চাউনি দেখে তার কঠিন ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে এলো।
আনায়া আবারও কেনীথের কোটের হাতাটা দু’হাতে টেনেটুনে, করুণ সুরে বলল,
”প্লিজ! আমায় ক্ষমা করে দিন। এটাই শেষ…আর কোনোদিন এমন ভুল কাজ করব না, সত্যি!”
কেনীথ চোয়াল শক্ত করে আচমকা তার দিকে সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়াল। কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই আচমকা আনায়ার দিকে এগোতে লাগল। তার এরূপ অদ্ভুত ভাবভঙ্গিতে আনায়া ঘাবড়ে গিয়ে দ্রুত পেছাতে লাগল। ভীত স্বরে আওড়াল,
“কি হলো…হঠাৎ… ”
আনায়ার পিঠ গিয়ে ঠেকল বুক সেলফের সাথে। আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলে চুপসে গেল। ততক্ষণে কেনীথ তার মুখোমুখি গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে, খানিকটা ঝুঁকে পড়েছে। আনায়া এদিক-সেদিক নজর দিয়ে পালানোর পথ খুঁজতেই, পুরুষ তার দুহাত সেলফের সাথে ঠেকিয়ে তাকে নিজের বাহুডোরের আদলে বন্ধী করে নিল।
আনায়া ঘাবড়ে গিয়ে বিস্ময়ের সাথে মুখ তুলে কেনীথের দিকে তাকাল। কক্ষের দুইকোণে সিসিটিভি, দরজাটাও খোলা; যখন-তখন কেউ চলে আসতে পারে। আনায়া হতভম্ব হয়ে অস্ফুটে আওড়াল,
“এসব কি করছেন? আমি কিন্তু কমপ্লেইন করে দেবো। তখন আপনার চাকরি চলে যাবে, দেইখেন!”
কেনীথ কাঁধটা কিঞ্চিৎ কাত করে, ভীত রমণীর দিকে আরেকটুখানি ঝুঁকে পড়ল। কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্য করে বলল,
“আমার চিন্তা না করলেও চলবে। তুই তোর চিন্তা কর।”
আনায়া চোখ পিটপিট করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। এই মানুষটা কেনো বোঝে না—তার অতি সংস্পর্শে ঘেঁষলেই সে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে ফেলে; মনে হয় চরম শ্বাসরোধ হয়ে সে জ্ঞান হারাবে। যথারীতি বেশিক্ষণ পুরুষের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে না পেরে চোখ নামিয়ে নিল আনায়া। ততক্ষণে কেনীথ কিঞ্চিৎ ভ্রু উঁচিয়ে তির্যক রুক্ষ স্বরে প্রশ্ন ছুড়ল,
“দিনদিন এতো অসভ্য হচ্ছিস কি করে? লজ্জা-শরম বলতে কিছু নেই?”
পুরুষের তীক্ষ্ণ প্রশ্নে আনায়া মুখ তুলল। মুখাবয়ব খানিকটা গোমড়া করে বলল,
“আমার কি দোষ,বলুন? লজ্জা শরমের সাথে আমার কথা হয়েছে। ওরা বলেছে, আমায়
মন দিয়ে স্বামীর সংসার করতে; আর ওদেরকে চিরতরে ভুলে যেতে!”
কেনীথ তার এহেন কথা শুনে, সহসাই দাঁতে দাঁত চেপে ধরল। চাপা আক্রোশ দেখিয়ে বলল,
“তোকে তো আমি…!”
আনায়া দুহাতে নিজের হুডি চেপে ধরে, চোখ-মুখ খিঁচে নিল। নূন্যতম অনুনয় করারও সুযোগ পেল না সে। আচমকা কেনীথ তার প্রকাণ্ড বলিষ্ঠ হাতের গ্লাভস পড়া তালু রমণীর মাথার ওপর রেখে, শক্তপোক্ত টানে আনায়াকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল।
আনায়া আকস্মিক এই সান্নিধ্যে এক লহমায় স্তব্ধ ও সংকুচিত হয়ে পুরুষের ওভারকোটের আদলে মুখ গুঁজে দিল। অন্যদিকে কেনীথ তার মাথার ওপর নিজের দৃঢ় চোয়ালখানা ঠেকিয়ে, গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীর-চাপা স্বরে বলল,
মহামায়া পর্ব ৬৩
“এতোবড় অসভ্য কি করে হলি তুই, বল তো? এই শিক্ষা দিয়ে বড় করেছি তোকে? তুই তো আমার মানসম্মান সব ডুবিয়ে ছাড়বি রে!”
