মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩
নূরায়েশা মাহনূর
ভোরের আলোর আভা এখনো আকাশের চূড়ায় পা রাখেনি, এর আগেই ঘুম ভাঙে দৃষ্টির। নিস্তব্দ সকালের নিস্তরঙ্গতায় সে নিজেই এক টুকরো ভোর। খুব ছোটবেলা থেকেই দিনের প্রথম আলোটা তার চেনা। ভোর হওয়া মানেই দৃষ্টির জেগে ওঠা। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
ধীরে ধীরে আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো দৃষ্টি। আলতো হাতে পরনের শাড়িটা গুছিয়ে নিলো । জন্ম থেকেই অভিজাত এক গ্রামীণ পরিবারের কন্যা দৃষ্টি। তাদের পরিবারে এক অলিখিত রেওয়াজ রয়েছে। দশ বছর পেরোলেই মেয়েদের পোশাকে শাড়ি বাধ্যতামূলক। শিশুকাল অবধি যদিও এই নিয়মে কিছুটা ছাড় থাকে, কিন্তু তারপর থেকে সেই রেওয়াজ শিকড়ের মতো গেঁথে যায় জীবনের সাথে। দৃষ্টি সে রীতি মেনে চলে ভক্তির মতো।
পায়ে পায়ে ধীরচালে নিজের কক্ষের দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে দৃষ্টি। চারপাশে এখনও নিস্তব্ধতার চাদরে মোড়া গ্রাম। মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে এসেছে কিছুক্ষণ আগে। কোমল এই ধ্বনি মনকে ছুঁয়ে যাওয়া এক ডাক। সময় ক্ষেপণের অবকাশ নেই কোনো। দ্রুত পায়ে পা মেলায় সে, সোজা কলঘরের দিকে এগিয়ে যায় ওজুর প্রস্তুতিতে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ঠান্ডা পানির স্পর্শে এক পশলা প্রশান্তি নামে শরীর জুড়ে। ওজু শেষ করে যখন নিজের কক্ষে ফিরবে ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে আসে অস্পষ্ট এক ফিসফিস শব্দ। নিস্তব্ধ ভোরে এমন শব্দ অনাহূত ঢেউ তোলে মনজুড়ে। থমকে দাঁড়িয়ে চারপাশে একবার ভালো করে নজর বুলানোর চেষ্টা করে দৃষ্টি। আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। আবছা আকাশে মিশে আছে অন্ধকারের শেষ ছায়া। শত চেষ্টা করেও আশেপাশে কিছু চোখে পড়লো না তার। অতঃপর আর দেরি না করে ভেতরে ফিরে যায় দৃষ্টি। নামাজের সময় আর সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যের চাইতে বড় কিছুই নয় এই মুহূর্তে।
দৃষ্টি ধীরে ধীরে পরম মনোযোগে নামাজ শেষ করে। প্রতি রাকাআতের পর সে আরও গভীরে ডুবে যায় এক আত্মিক নির্জনতায়। নামাজ শেষ হলে দু’হাত তোলে আকাশের দিকে। ভেজা চোখে মুনাজাতে ডুবে যায় সে। কণ্ঠে কোনো শব্দ নেই, শুধু হৃদয়ের কান্না আল্লাহর কাছে নিঃশব্দ নিবেদন।
কেঁদে কেঁদে নরম কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে তার মা-বাবার জন্য দোয়া করে। সেই প্রার্থনার শব্দহীনতা আকাশ ছুঁয়ে যায়। এরপর চুপিচুপি আরও কিছু বলে ফেলে সে, যা একান্তই তার নিজের, হৃদয়ের গোপন কোনে সযত্নে লুকানো এক প্রার্থনা।
সবশেষে দৃষ্টি নিজেকে সামলে নেয়। এসে ধীরে ধীরে বসে পড়ে পড়ার টেবিলটায়। বাইরের আলো তখন একটু একটু করে ফুটছে।
বেলা এখন সাতটা। আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। দৃষ্টি বইপত্র গুছিয়ে ধীরে ধীরে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। বারান্দায় পা রেখে থমকে দাঁড়ায় কিছুক্ষণ। তাজা সকালের হাওয়া আচল সরিয়ে মুখে এসে লাগলে সে চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস টেনে নেয়। একটু পর আচলটা গুছিয়ে নীরবে পা ফেলে সে চলে যায় রান্নাঘরের দিকে।
দৃষ্টি ছিলো তার মা-বাবার একমাত্র আদরের ধন। যতদিন তারা ছিলেন, আগুনের তাপে তার ছায়াও পড়তে দেয়নি কেউ। রান্নাঘরের দিকে চোখ তুলে তাকানোও ছিলো নিষেধের বৃত্তে বাঁধা। কিন্তু সময়… সে তো সবকিছু বদলে দেয়। আজ এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে আগুনের ধারে দাঁড়ানো তার কাছে এখন আপনতা।
শিখে নিয়েছে সে সবকিছু। চাল বাছা, সবজি কাটার ভঙ্গি, মশলার ঘ্রাণে বুঝে নেওয়া কখন কি দিতে হবে। গৃহস্থ পরিবারের গিন্নির মতোই সযত্ন হাতে সে সামলায় প্রতিটি কাজ। আর আশ্চর্যের বিষয়, কাজ করতে তার ভালোই লাগে। বিশেষ করে সকালের নাস্তা সব সময় সে নিজেই বানায়।
রান্নাঘরের দাওয়ায় পা রাখতেই মুখোমুখি দেখা হয়ে যায় মরিয়মের সঙ্গে। শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে, মাথায় আঁচল টেনে রাখা সেই চেনা মুখ, চোখে এখনও সকালের কুয়াশার মতো কোমলতা। মরিয়ম এই বাড়ির কাজের মানুষ, নামেই শুধু তাই। বাস্তবে সে এই বাড়িরই একজন। নিজের রক্ত না হলেও আত্মার আত্মীয়।
প্রায় দশ বছর ধরে এই বাড়িতে রয়েছে সে। সময়ের দীর্ঘ স্রোতে আপনজন হয়ে গেছে। নতুন আসা শিশু যেমন ঘরেই ঘর বাঁধে, মরিয়মও তেমনি নিজেকে এই সংসারের ছায়ায় মেলে ধরেছে। বয়স এখন বেয়াল্লিশ ছুঁয়েছে, তবু ক্লান্তির রেখা খুব একটা ধরা পড়ে না চোখে। দৃষ্টিকে দেখেই মুখটা জোছনার মতো উজিয়ে ওঠে মরিয়মের।
– আম্মা আইছো তুমি…
দৃষ্টিও হেসে ফেললো । চোখে মুখে ফুরফুরে একটা প্রশান্তি নিয়ে হালকা কণ্ঠে বলে উঠলো,
– কি করো তুমি খালা?
মরিয়ম শাড়ির আঁচলটা কোমরে আরও একবার গুঁজে নিয়ে ব্যস্ত হাত থামিয়ে জবাব দেয়,
– এই তো, নাস্তার লাইগা সব কিছু তৈয়ার করছি। আজকে তো মেলা কাম। বুচ্ছো না, উজান বাবার বন্ধুরাও আছে ঘরে…
শেষ কথাটার সঙ্গে সঙ্গে মরিয়মের মুখে বিশেষ ভঙ্গি দেখা গেলো। কথার ফাঁকে ফাঁকে কিছু না বলা কথা ঝরে পড়লো চোখের ভাষায়।
দৃষ্টি কিছু বললো না শুধু মৃদু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর আর কোনো কথা না বলে এগিয়ে গেলো চুলার দিকে। দু’হাত গুটিয়ে, চুলার পাশে দাঁড়িয়ে কাজে লেগে পড়লো। চিন্তাগুলোকে ছাঁকা আটার মতো মনের কোণায় সরিয়ে রেখে দিলো।
একে একে সজাগ হতে লাগলো সকলে। তুবা আর আফরাও উঠেছে। ও ঘর থেকে বেরিয়ে এলো নয়ন।ঘরের ভেতরে একটা ব্যস্ততার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে।মরিয়ম একে একে সবাইকে কলপাড় দেখিয়ে দিলো। আর এই ফাঁকে আগেভাগেই দৃষ্টি শেষ করে ফেলে সকালের নাস্তা বানানো। এরমধ্যেই কোনো রকমে এক টুকরো রুটি তুলে নিলো মুখে। খাবার শেষে আর কারো সঙ্গে কথা না বলে সোজা চলে গেলো নিজের ঘরে।
কলেজে যেতে হবে আজ। সময় বেশি নেই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে নিজের চারপাশে গড়ে তুললো এক পর্দার প্রাচীর। কালো বোরকাটা গায়ে জড়িয়ে নিলো প্রথমে। তারপর মাথায় জড়ালো এক লম্বা হিজাব । সবশেষে তুলে নিলো নিকাব, মুখটুকু ঢেকে নিলো নিপুণভাবে। এরপর ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে ধীরে পা ফেলে চললো অরুনার ঘরের দিকে।
অরুনার ঘরটা দিনের আলোয়ও খানিক নিস্তব্ধ অন্ধকারে ঢাকা। হার্টের অসুখ বহুদিনের সঙ্গী অরুনার তাই বেশি হাঁটাহাঁটি এমনকি হালকা পরিশ্রমও হয়ে উঠেছে তার জন্য বিপজ্জনক। নামাজ পড়ে শুয়ে পড়েছিল অরুনা। এখনো চোখে অবসাদের ছায়া, মুখে ক্লান্তির রেখা। দৃষ্টি চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে বসলো। নরম গলায় ডাক দিলো,
– বড় মা ওষুধটা খেয়ে নাও।
অরুনা চোখ মেলে তাকালো দৃষ্টির দিকে। এক চিলতে হাসি খেলে গেলো তার মুখে। ক্লান্ত হলেও সেই হাসির ভেতরে আছ এক অদ্ভুত মায়া।
দৃষ্টি হাত বাড়িয়ে ওষুধটা দিলো অরুনার হাতে, আরেক হাতে ধরে রাখলো পানির গ্লাস। অভ্যস্ত ভঙ্গিতে ওষুধ খাইয়ে দিলো। এটা প্রতিদিনকার এক অমোঘ নিয়ম। এই নিয়মের ভেতরে লুকানো অপরিসীম যত্ন, অভিভাবকতুল্য কোমলতা। ওষুধ খেয়ে আবার বিছানায় হেলান দিলো অরুনা। দৃষ্টি তার কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিলো আলতো করে। এরপর হেসে বিদায় নিয়ে চলে গেলো।
নাস্তার টেবিলে একে একে এসে বসেছে সকলে। ফ্রেশ হয়ে সকালবেলার ব্যস্ততায় মিলেছে এক চিলতে জমায়েত। কলপাড়ের পানি গড়িয়ে গেছে অনেক আগেই এখন চলছে রুটি-সবজি আর গরম চায়ের ঘ্রাণে মাখামাখি প্রাতঃভোজন। অরুনা আর মরিয়ম দু’জনে মিলে সবাইকে নাস্তা দিচ্ছে।
– মা এখনো রাগ করে থাকবে?
হুট করেই কথাটা বলে উঠলো উজান। কিন্তু অরুনা নিরুত্তর রইলো। শুনেও না শুনার মত করেই নিজের কাজ চালাতে লাগলো। অরুনাকে চুপ করে থাকতে দেখে উজান আবার বলে উঠলো,
– যদি কথা না বলো আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই কিছু খাবো না।
একটা মুহূর্তের নীরবতা। তারপর অরুনা হঠাৎ খুব গভীর কণ্ঠে বলল,
– মরিয়ম, আমি এখন খাবো না। ওদের খাওয়া হলে তুই খেয়ে নিস।
আর কিছু না বলে পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো অরুনা। ঘরের ভেতরটা হঠাৎ করে অদ্ভুত এক নীরবতায় ভরে গেলো। তার মাঝেই নীরবতা ভেঙে হঠাৎ জিদান চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে খেয়াল করে জিজ্ঞেস করলো,
– আচ্ছা দোস্ত, তোদের বাড়িতে আরেকজন কাজের মেয়ে আছে না? কোথায় গেলো সে?
জিদানের কথা শুনে হঠাৎ করেই কাশিতে আটকে গেলো উজান। মুখে থাকা পানির গ্লাসটা ধরে রেখেই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো। চুমুক দেবার মুহূর্তে এমন প্রশ্ন যে আসবে সেটা তার কল্পনাতেও ছিল না।
পাশ থেকে মরিয়ম থমকে গেলো। চোখের কোণে বিস্ময় আর গলায় এক পশলা রুক্ষতার ছায়া এসে ভেসে উঠলো।
– এই বাড়িতে আমি ছাড়া তো আর কোনো কাজের লোক নাই, বাবা। কার কথা কইতাছেন আপনি?
জিদান একটু থতমত খেয়ে বললো,
– আরেহ ওই মেয়েটা… শাড়ি পরে ছিলো। আমাদের সামনে ঘোমটা টেনে রেখেছিলো। একটু চাপা স্বভাবের… চুপচাপ।
মরিয়ম এবার মুখ তুলে সোজা তাকালো তার চোখে। গলায় ক্ষীণ বিষ্ময় নিয়ে বলে উঠলো,
– কার কথা কন আপনে? দৃষ্টি আম্মাজানের?
জিদান বোকার মতো মাথা নাড়তে নাড়তে বলে উঠলো,
– হ্যাঁ হ্যাঁ… ওই মেয়েটাই। দৃষ্টি…
মরিয়ম এবার জোরালো স্বরে বলে উঠলো,
– আম্মাজান তো কাজের লোক না। আপনাগো ভুল হইছে। উনি তো উজান বাবার খালাতো বোন।
মরিয়মের কথায় উপস্থিত সকলেই থমকে গেলো। নয়ন,আসিফ, আফরা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। আর জিদান বিষ্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে উজানের দিকে। নিজের খালাতো বোনকে শেষমেশ উজান কাজের লোক বলে তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, কেনো? এই জন্যই কি আর একবারও তাদের সামনে আসে নি দৃষ্টি!
ওদিকে উজান এখনো কেশেই যাচ্ছে।। ঘটনাটা এতটাই আকস্মিক ভাবে ঘটেছে যে মরিয়মকে থামানোর সুযোগ পর্যন্ত পেলো না উজান। তুবা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে উজানের পিঠে চাপড় দিতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর কিছুটা শান্ত হয়ে উজান বলে উঠলো,
– খালা তুমি এখন যাও নাহলে এরা বকবক করে তোমার মাথা খেয়ে ফেলবে।
মরিয়ম ও আর কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে সরে গেলো। মরিয়ম সরে যেতেই অবাকের স্বরে জিদান বলে উঠলো,
– এই মামা তুই আমাদের মিথ্যা বললি কেনো? আর নিজের খালাতো বোন কে কাজের লোক বললি কেনো? মেয়েটা কি পরিমাণে ইনসাল্টেড ফিল করেছে আমাদের সামনে!
এরপর রক্তচক্ষু নিয়ে জিদান তাকালো তুবার দিকে। কর্কশ স্বরে বলে উঠলো,
– কি রে তুবা কালকে যখন বললাম তখন খুব তো তেড়ে এসেছিস আমার দিকে এখন চুপ করে আছিস কেনো?
– জিদান তুই ওই মেয়ের জন্য এমন করছিস কেনো?
খানিক রাগত স্বরে কথাটা বলে উঠলো তুবা। জিদান আবার কিছু বলতে যাবে তার আগেই উজান সবাইকে থামিয়ে বলে উঠলো,
মাটির পিঞ্জর পর্ব ২
– ওই মেয়েকে নিয়ে কারো মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। তোরা নিজেদের মত ইনজয় কর। খাওয়া শেষ হলে আমরা বাহিরে যাবো।
উজানের কথায় কেউ আর কথা বাড়ালো না। চুপচাপ খাওয়ায় মনোযোগ দিলো।
