Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৯ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৯ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৯ (২)
jannatul firdaus mithila

“ লিসেন বাস্টার্ড! কাল থেকে ঐ বান্দীর মেয়েকে যথাসম্ভব আমার দৃষ্টি থেকে দূরে দূরে রাখবি। ভুলক্রমেও ও যদি আমার সামনে পড়ে দ্যান আই সয়্যার — আমি তোকে শূলে চড়াব। আই রিপিট আই উইল কিল ইউ্য বাস্টার্ড! ঐ বান্দীর মেয়ে যেন ভুলেও আমার চোখের সামনে না আসে।”
মাথার ওপর অদৃশ্য বাজ পড়ল এডউইনের। অক্ষিপুট ছুঁয়েছে কপাল! কন্ঠনালীর উঁচু হাড়খানা নড়ে উঠল অস্থিরতায়। চাপ বাড়ল মস্তিষ্কে। ঘাড় ঝুঁকিয়ে গম্ভীর মুখো এডউইন বিড়বিড়িয়ে আওড়াচ্ছে —

“ কিসব ভয়ংকর কাজ দিচ্ছেন আমায় মনস্তার! মুখে বলছেন, মুনবার্ড যেন আপনার সামনে না আসে। বাট আ’ম ড্যাম শিওর, আপনি তাকে একবেলা না দেখলে নিজেই পাগলামি শুরু করবেন! আপনার মতো ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়কে নতুন করে ক্ষ্যাপানোর সাধ্যি আছে কোন মানবের?”
রাগে গজগজ করছে মাফিয়া বিস্ট! দু’হাতে নিজের উম্মুক্ত কোমর আঁকড়ে দাঁত কিড়মিড় করে যাচ্ছে একাধারে। ওদিকে এডউইন যে বিড়বিড়িয়ে কিসব বলে যাচ্ছে, তা থোড়াই কানে ঢুকল মাফিয়া বিস্টের! ঢুকলে এতক্ষণে বেচারা এডউইনের প্রাণ নিয়ে টানাটানি হতো না? তবুও বিচক্ষণি পুরুষ সহসা ঘাড় বাকিয়ে তাকালেন পেছনে। গৌরবর্ণ মসৃণ ললাটে গোটাকতক সন্দেহের ভাঁজ ফেলে রূঢ় কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে শুধালেন,

“ ডিড ইউ্য জাস্ট সে সামথিং?”
আঁতকে উঠে এডউইন! মনস্টারের ওমন হুংকারে তার দেহ খাচাঁয় লুকায়িত আত্মাটা বোধহয় মাত্রই গলার কাছে এসে ঠেকল। সে ত্বরিত গতিতে দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে হকচকান কন্ঠে বলে ওঠে,
“ নো, নো মনস্তার! কিচ্ছু বলিনি তো।”
মুহুর্তেই ক্লিন শেভের দৃঢ় চোয়ালখানা তীক্ষ্ণ হলো মুগ্ধের।শুভ্র ললাটে তুলির দক্ষ টানে অঙ্কিত ঘন ভ্রুযুগল বেঁকে গেল খানিক। সুস্পষ্ট, সুগঠিত থুতনিটা শক্ত হয়েছে পরমুহূর্তেই। হাতের বাঁধনে জোর বাড়ল বেশ। যুবক পা ঘোরালো উল্টোপথে। এরইমধ্যে একজোড়া শক্তপোক্ত ব্যুটপরিহিত কদম এসে দাঁড়ালো টপ ফ্লোরের বরফে ঢাকা মেঝেতে। কদমের মালিক বড়ো শান্ত! তার মুখাবয়বে তীক্ষ্ণ ভাব স্পষ্ট। গায়ে একখানা কালো রঙা স্যুট, সঙ্গে মিলিয়ে পড়েছে ব্যুটজুতো। চোখে আটাঁ রিমলেস চশমা! কানের পেছন দিয়ে একখানা সরু পাতলা তারের ন্যায় কিছু একটা ঝুলছে তার। কর্ণের মধ্যিখনে দাবিয়ে রাখা ব্লুটুথ। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ সুদর্শন নতমস্তকে গম্ভীর মুখে খানিকটা এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন। পায়ের চলন্ত তাল রুখে দিয়ে, মনস্টারের প্রতি ভীষণ বাধ্যতা দেখিয়ে একহাঁটু গেঁড়ে কুর্নিশ জানিয়ে বললেন,

“ হোলা মনস্তার!”
(হ্যালো মনস্তার)
মনস্টারের দাম্ভিক কদম আগের ন্যায় ব্যস্ত! সে এগিয়ে আসছে ধুপধাপ পায়ে। একটিবারও সম্মুখের শ্যামবরণ সুদর্শনের পানে দৃষ্টিপাত না করে উল্টো বাজখাঁই কন্ঠে আদেশ ছুড়েঁ বলল,
“ এলেক্স! টর্চার সেল খুলে দে। আই নিড টু কুল অফ রাইট নাও।”
এলেক্স বাধ্য মানব! শত হলেও দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের চিফ অফ গার্ডস বলে কথা। বাধ্যতা যেন তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মনস্টারের আদেশ পাওয়া মাত্রই যুবক নড়েচড়ে দাঁড়ালেন। ডানহাতখানা তক্ষুনি মুষ্টিবদ্ধ করে বুকের বাঁপাশে ঠেকিয়ে গুরুগম্ভীর মুখে শুধালেন,
“ কমান্ড এক্সেপ্টেড মনস্তার!”

বলেই যুবক পা ঘোরালো উল্টোপথে। সঙ্গে সঙ্গে পায়ের গতিতে টান না বসিয়ে, লাগাম টেনে দাঁড়িয়ে রইল কিয়তক্ষন। মনস্টারের আগে স্থান ত্যাগ করার সাধ্যি নেই তার, আর না আছে এরূপ অবাধ্যতা! পেছন থেকে মনস্টার ধুপধাপ পায়ে এগিয়ে এসে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই এলেক্স গতি টানল পায়ের। তবে এবার আর সম্মুখে নয়, বরং এগিয়ে গেল পেছনে। বরফের পুরু আস্তরণে ঢেকে থাকা সুইমিংপুলের অতি সন্নিকটে বসে আছে এডউইন, মুখটা কেমন শক্ত হয়ে আছে মানবের। তীক্ষ্ণ দৃষ্টে নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে সম্মুখে। এলেক্স হাসলো! চকচকে দাঁতের ধারালো চাপে পিষ্ট করল বাদামী ঠোঁটযুগল। মুখাবয়বে ফুটালো এক অভিন্ন ধূর্ততার ছাপ! পায়ের ব্যুটজুতোর শক্ত পাটাতনের নিচে রুক্ষ ভঙ্গিমায় পিষতে লাগল তুষারের নরম-সরম গা। সে এগুলো, লম্বা লম্বা পাঁচটে কদমে এগিয়ে এসে দাঁড়াল এডউইনের ঠিক মুখোমুখি। বেশ দাম্ভিকতার সঙ্গে দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রহস্যময় বাঁকা কন্ঠে আওড়াল,

“ অবশেষে তুমি তোমার আসল জায়গা অব্দি পৌঁছে গেলে এডউইন। ট্রাস্ট মি, নাও ইউ্য আর লুকিং ফার বেটার।”
সরু নাকের পাটাটা তৎক্ষনাৎ ফুলে উঠল এডউইনের। শুভ্র মুখখানা রঙ পাল্টালো অচিরেই। সেথায় আবার ফুটে উঠেছে একরাশ চাপা ক্ষোভের ছাপ। যুবক তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায়। দু’হাতে গা থেকে ছোট ছোট তুষারকণা ঝাড়তে ঝাড়তে কটমট দৃষ্টে তাকায় এলেক্সের পানে। অথচ এলেক্স কেমন গাল বাঁকাল তার ওমন দৃষ্টি দেখে। একপ্রকার গা-ছাড়া ভাব ধরে চোখদুটো উল্টে তাকাল অন্যত্র। এডউইন চোয়াল শক্ত করল এবার। কাঠকাঠ কন্ঠে আওড়াল,
“ মুখ সামলে কথা বলো এলেক্স। আদারওয়াইজ…. ”
বাকিটা শেষ হবার পূর্বেই ঘাড় কাত করে সম্মুখে দৃষ্টি তাক করল এলেক্স। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত বাঁকা হাসির রেশ ফুটিয়ে, গমগমে গলায় শুধালো,
“ আদারওয়াইজ?”

তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো না এডউইন। উল্টো মুখাবয়বে আগুনসম রাগের পরিতুষ্টি বাড়িয়ে আচমকা শক্ত হাত এগিয়ে দিতেই এলেক্স খামচে ধরল সে হাত। খসখসে হাতের রুক্ষ মুঠোয় চাপ বাড়াতেই এডউইন কামাল দেখাল পায়ের। তক্ষুনি এক শক্তপোক্ত লাথি বসাল এলেক্সের হাঁটু বরাবর। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় সামান্য দুলে উঠল এলেক্স। হাতের বাঁধন একটুখানি আলগা হতেই সম্মুখ থেকে ধেয়ে এলো এডউইনের হিং স্র থাবা। এক ঝটকায় যুবক চেপে ধরল এলেক্সের কন্ঠনালী! তবে এলেক্সও যে কম যায় না। সে-ও একই ভঙ্গিমায় হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল এডউইনের কন্ঠা। দু-মহারথীর এরূপ আগাম সতর্কসংকেত ছাড়া যুদ্ধ যে আজ নতুন নয়। বরং দু’জন সাপেনেউলে একে-অপরের মুখোমুখি হলেই বেঁধে যায় মহাপ্রলয়। আজও যেমন বাঁধল! আজকের যুদ্ধে কে বিজয়ী হবে তা আপাতত মূখ্য নয়, বরং মূখ্য হচ্ছে — কে আগে দূর্বল হবে। একদিকে গৌরবর্ণ বিদেশি এডউইন, কন্ঠায় অতিরিক্ত চাপ বেড়েছে বলে মুখ হয়েছে লাল টকটকে। যেন যেকোন মুহুর্তেই যুবকের সনে ঘটে যাবে যেকোনো অঘটন। অথচ যুবকের শক্তপোক্ত বাহুতে শক্তির খামতি নেই!

আরেকদিকে শ্যামবর্ণ স্প্যানিশ যুবক, ললাটে তার মোটা মোটা রগ ইতোমধ্যেই স্পষ্ট! লম্বাটে মুখে লালাভ আবরণ সুস্পষ্ট। যুবকের নিশ্বাস প্রায় আঁটকে আঁটকে যাচ্ছে। তবে শেষমুহুর্তে এসে মোমবাতির শেষ বাতিটুকু যেমন ধড়ফড়িয়ে উঠে ঠিক তেমনি এলেক্সও বুঝি ধড়ফড়িয়ে উঠল পরক্ষণে। চোয়ালের অভ্যন্তরণে দাঁত কপাটিকে একে-অপরের সনে রুষ্টতার সঙ্গে পিষে নিয়ে, যুবক মাথা এগিয়ে আনে খানিকটা। অতঃপর নিজ কপাল দিয়ে সম্মুখে থাকা এডউইনকে পরাস্ত করার জন্য অভিনব কৌশল অবলম্বন করে, এডউইনের নাকমুখ বরাবর আঘাত করে বসে সজোরে। এহেন অতর্কিত আক্রমণে হাতের বাঁধন ঢিলে হলো আহত এডউইনের। বেচারা তৎক্ষনাৎ ছিটকে গেল দু-কদম। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়েছে তার, নাক থেকে গরম কিছু গড়িয়ে পড়ছে তা স্পষ্ট টের পাচ্ছে সে। যুবক এদিকওদিক মাথা নাড়িয়ে নিজেকে সামলানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত। এরইমধ্যে সম্মুখ থেকে ধেয়ে এলো এলেক্সের শক্তপোক্ত হাতের থাবা। শ্যামবর্ণ সুদর্শন কেমন এক লহমায় আঁকড়ে ধরল এডউইনের চুল। অতঃপর হাতের জোর বাড়িয়ে বেচারার চুলগুলো টানতে তৎপর সে। এদিকে চুলের ব্যথায় দাঁতে দাঁত চাপছে এডউইন। আহত হওয়া স্বত্বেও বাহাতের কনুই দিয়ে একের পর এক আঘাত করে যাচ্ছে এলেক্সের পেটে অথচ এলেক্সকে দেখো! যুবকের দেহ যেন ইস্পাত-দৃঢ়। পেট বরাবর ওতো আঘাত পাওয়া স্বত্বেও সে কেমন অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শক্ত হাতে এডউইনের চুল টেনে তার মুখখানা সামান্য উঁচিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো,

“ ভুলে যাস না এডউইন, তোর হম্বিতম্বি জাস্ট প্যালেস অব্দি সীমাবদ্ধ। তুই যদি হোস প্যালেসের চিফ, তাহলে আমি হচ্ছি — প্যান্ট হাউজের চিফ। সো আমার দায়রায় এসে হম্বিতম্বি চালানোর মতো দুঃসাহস দেখাবি না ব্লা’ডি মোরন। কজ ইউ্য নো না? মনস্টার বাদে সাইকিকে ভয় না পাওয়া ব্যক্তিটা একমাত্র আমি। তাই সাবধান!”
নিরব এডউইন! পরাস্ত সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে কেবল। চোখদুটোর দৃষ্টে নামিয়েছে আগুন, পারছেনা সে আগুনেই জ্বলসে দিতে এলেক্সকে। এলেক্স স্পষ্ট দেখল সে দৃষ্টি! পরক্ষণে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বেশ রহস্যময় বাঁকা কন্ঠে বলল,
“ শুধরে যা এডউইন! দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের আগেও কোনোদিন কোনপ্রকারের দূর্বলতা ছিলো না, ভবিষ্যতেও থাকবে না। ইনফ্যাক্ট, আমিই মনস্টারের লাইফে কোনো দূর্বলতাকে থাকতে দিব না। দ্য গ্রেট রুশদী কিং উইল অলওয়েজ রিমেইন আ হার্টলেস মাফিয়া। এন্ড আ’ল মেক শিওর অফ ইট।”
সহসা ভ্রুযুগল কুঁচকে গেল এডউইনের। মুখভঙ্গিতে ফুটলো একরাশ সন্দিগ্ধতা। ললাটের মসৃণ চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে ইতোমধ্যেই। হতবাকতায় চিবুক নেমেছে তার। অধরযুগলের সামান্য ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ মানে? কোন বিষয়ে বলছিস তুই?”

এলেক্সের মুখাবয়বে রহস্যময় ভাব স্পষ্ট। প্রসঙ্গ এড়ানোর ন্যায় শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলল,
“ বৃষ্টিতে ভিজে মনস্তারের পা ধরে একটা সামান্য মেয়েকে বাঁচানোর জন্য নিজ প্রাণ সপে দিতে চাওয়ার মতো দয়ালু মানুষটা তো তুই না এডউইন। আমি জানি, ঐ কাজের পেছনেও তোর সার্থ লুকিয়ে আছে। কজ যে ব্যাক্তি ক্ষমতার লোভে নিজের গার্লফ্রেন্ডকে শত্রুর বেডে পাঠাতে পারে, সে যে কতটা ভালো মনের মানুষ তা আমার জানা বাকি নেই। তুই হয়তো ভেবেছিস, মনস্তার এ বিষয়ে কিছুই জানে না, তাই না?”
চমকপ্রদ তথ্য বোধগম্য হতেই চোখদুটো বিস্ময়ে গোল হয়েছে এডউইনের। ঠোঁট দুটোর মধ্যকার দুরত্ব বেড়েছে কয়েকগুণ। বিস্ময়ে ভ্রুযুগল ছুঁয়েছে কপাল। হতভম্বতায় কন্ঠরুদ্ধ তার! এলেক্স এবারেও ঠোঁট পিষে হাসল। তক্ষুনি এডউইনের চুলগুলো এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে সটানভাবে দাঁড়াল। আগের ন্যায় দাম্ভিকতা বজায় রেখে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজল নিরবে। অতঃপর উল্টোপথে পা বাড়িয়ে গমগমে গলায় বলে গেল,
“ মনস্তার লাভস টু চেস হিজ এনিমিস। তোকেও ছাড় দিয়েছে, হয়তো দেখতে চাচ্ছে — তুই আর তোর সো-কলড গার্লফ্রেন্ড, কি যেন নাম? ওহ ইয়েস — মিলা! মিলা রোস্তাগিজ। তোরা কতটুকু বাড়তে পারিস। ট্রাস্ট মি এডউইন, যেদিন মনস্টার তোদের ধরবে — একদম ছিড়েখুঁড়ে ফেলবে। এন্ড আমি সেদিনটার অপেক্ষায় আছি।”
দ্বিধায় জর্জরিত দৃষ্টে চেয়ে আছে এডউইন। ব্যস্ত কদমে চলন্ত এলেক্সের বলে যাওয়া প্রতিটি বাক্য যেন একেকটা বিকট বজ্রপাতের ন্যায় পড়ল তার মাথার ওপর। বেচারা ডুবেছে এক ভিন্ন চিন্তায়! মনে মনে আওড়াচ্ছে —
“ এই মিলা আবার আমার গার্লফ্রেন্ড হলো কবে থেকে? হোয়াট দ্য হেল ওয়াজ হি টকিং এবাউট?”

বিদঘুটে অন্ধকারে আবদ্ধ একখানা বিশালকার কামরা। যেথায় জানালার উপস্থিতি নামেমাত্রও নেই। একপ্রকার ভ্যাপসা গন্ধে মুদে আছে চারপাশ! গরমে নাজেহাল অবস্থা কয়েদীদের। অন্ধকারে স্পষ্ট নয় কামরায় উপস্থিতি কয়েদীদের সংখ্যা। প্রত্যেকের পাদু’টোয় মোটা মোটা শিকল বাঁধা, হাতদুটো ঝুলে আছে শূন্যে। বোধহয় সিলিংয়ের সনে শিকল ঝুলিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে তাদের। মুখের ওপর কালো স্কচটেপ! ফলে গোঙানির শব্দ বাবদ শোনা যাচ্ছে না আরকিছু।
মাত্রাতিরিক্ত কষ্টে ডুবে থাকা কয়েদীরা যখন নিজ শিকলে বাঁধা ঠিক তখনি বিশালাকার কক্ষে আচমকা দেখা গেল এক ছটাক আলো। বিদঘুটে অন্ধকারে থাকতে থাকতে অভস্ত্যতা জড়িয়ে গিয়েছে কয়েদীদের ঘোলাটে দৃষ্টে, ফলে হুটহাট আলোর ছটা চোখে পড়তেই কুঁচকে গিয়েছে প্রত্যেকের চোখ। কেউ কেউ আবার সিটকে নিয়েছে নাক-মুখ। কেউ আবার ধীরে ধীরে চোখের পর্দা সরিয়ে তাকিয়েছে সম্মুখে। কয়েদীদের নিবুনিবু দৃষ্টিতে ধরা দিয়েছে এক বলিষ্ঠ অবয়ব, আলোর বিপরীতে এগোচ্ছে। সে-কি পাহাড়সম উঁচু দেহ তার! গুনে গুনে পা ফেলে এগোচ্ছে অন্ধকার ভেদ করে। গায়ে বোধহয় কাপড়ের উপস্থিতি নেই তার। কোমরের বড্ড নিচে ঝুলছে ট্রাউজারের আগা। একহাতে তার একখানা জ্বলন্ত সিগার। অন্ধকারে সিগারের জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ বেশ স্পষ্টতর। অন্যহাতে ধরে রাখা লম্বাটে ধাতব নল জাতীয় কিছু একটা, কাঁচের মেঝেতে গড়াচ্ছে তার আগা। লম্বাটে ধাতব নলের খ্যাচখ্যাচ শব্দে ধুকপুকানি বাড়ছে প্রত্যেকের, কেউ কেউ সিটিয়ে যাচ্ছে ভয়ে। যুবক এগোচ্ছে। তার পায়ের গতিতে আজ কেন যেন বিলকুল তারাহুরো নেই। যেন আজ বড্ড বেশি শান্ত সে। প্রায় মিনিট দুয়েক পর, বলিষ্ঠ পুরুষ নিরবে এসে দাঁড়ালেন সম্মুখের এক কয়েদীর নিকট। অতঃপর হাতে থাকা সিগারটায় লম্বা এক টান বসিয়ে গমগমে গলায় শুধালেন,

“ কার খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে?”
নিঃশব্দ কামরায় যুবকের এহেন গমগমে গলার স্বর যেন বড্ড ভয়াল শোনালো সকলের নিকট। ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলতে ব্যস্ত তারা। তন্মধ্যেই একজন কেমন দূর্বল কন্ঠে গুঙিয়ে গেলেন জোরেশোরে। বোধহয় মুখ উম্মুক্ত থাকলে চেঁচিয়ে বলতেন,
“ আমি, আমি! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।”
যুবক আলগোছে ঘাড় কাত করে তাকালো সেদিকে। অন্ধকার কক্ষের বাঁদিক থেকে ভেসে এসেছে আওয়াজ। যুবকের ব্যগ্র কদম সেদিকে ছুটলো। সিগারে লম্বা একটা টান বসিয়ে মুখভর্তি সিগারের কলুষিত ধোঁয়া আটকে রাখল কিয়তক্ষন। পরক্ষণে মুখের বদলে নাসারন্ধ্রের সরু ছিদ্র দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এগোলো কয়েদির পানে। অতঃপর ব্যস্ত পা যখন কয়েদির একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল, ঠিক তখনি যুবক ঠোঁটের ফাঁকে সিগার চেপে ডানহাতের বৃদ্ধা এবং মধ্যমার সহযোগ ঘর্ষণে চুটকি বাজালো একবার। আর ওমনি সম্পূর্ণ অন্ধকার কক্ষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল লাল রঙা বিদঘুটে মৃদু আলোর ঝলকানি! সে আলোর উপস্থিতিতে সকলের দৃষ্টি গেল পাহাড়সম বলিষ্ঠদেহী পুরুষের পানে। মুহুর্তেই ভড়কায় সবাই। সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে এক বলিষ্ঠ পুরুষ, গায়ে কাপড়ের উপস্থিতি নেই। মাথার ওপর ফেলে রাখা একখানা লাল রঙা সিল্ক কাপড়। মুখ ঢেকে আছে কাপড়ের আড়ালে। যুবকের বাহাতে কোনো ধাতবাকার নল নয়, বরং সেটি একখানা ধারালো তলোয়ার। তা অবলোকন হওয়া মাত্রই আঁতকে ওঠেন সবাই। ভয়ে জড়সড় ভাব নিয়ে অন্যত্র ছুটতে চাইলেই আটকা পড়লেন পায়ের শিকলের টানাটানিতে। এদিকে মনস্টারের সম্মুখে থাকা ব্যক্তি যেন ভাষা হারিয়েছেন নিজের। লোকটা বোধহয় নিজ ভবিষ্যত নিয়ে বড্ড চিন্তায় পড়লেন এপর্যায়ে। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানব এতক্ষণে ফের মুখ খুললেন। বাহাতের তলোয়ারটা উঁচিয়ে গমগমে গলায় আওড়ালেন,

“ এক কো পে মা থা আলাদা করব! একদম নড়াচড়া করবিনা। আমার মাথা গরম আছে এখন, যতক্ষণ না অব্ধি কারো শরীরের তা জা র- ক্তে পা না ভেজাব ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা ঠান্ডা হবে না আমার। সো ডোন্ট মুভ!”
ভয়ার্ত আর্তনাদে ছেয়ে গিয়েছে কয়েদীর চোখদুটো। মুখে বেরুচ্ছে না বাক! অন্যরা ইতোমধ্যেই জুড়ে দিয়েছে ম’রা গোঙানির শব্দ। অথচ রূঢ় মানব সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন। সে বাহাতের ধারালো তলোয়ারটা উঁচিয়ে আচমকা আড়া আড়ি ভঙ্গিতে আঘাত বসালো ক য়ে দির ঘা ড় বরাবর। ঠিক পরমুহূর্তেই অদূরে ছিটকে গেল কয়েদির বিছিন্ন ম স্ত ক। ছিন্ন দেহখানা কাতরাচ্ছে! তাজা লহুর উষ্ণতায় ছেয়ে গিয়েছে স্বচ্ছ কাঁচের মেঝে। কাতরাতে থাকা দেহটা মিনিট পাঁচেক পর শান্ত হলো। নিরবে বেঁকে পড়ল মেঝেতে। তার উষ্ণ লহু ততক্ষণে গা ছেড়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। বাঁধহীন ভঙ্গিমায় গড়াতে গড়াতে লহু গিয়ে আলগোছে ভিজিয়ে দিলো নির্দয় মাফিয়া মনস্টারের পদতল। এতক্ষণে পরম প্রশান্তিতে চোখদুটো বুঁজল মাফিয়া বিস্ট! শরীরের উত্তপ্ত আগুনে বোধহয় এক বালতি জল ঢালল কেউ। সে কেমন দাঁড়িয়ে আছে নিরবে। ধারালো দাঁতের রুষ্ট চাপে আঁটকে রেখেছে বাদামি ঠোঁটজোড়া। সর্বাঙ্গ তার লোহুতে মাখামাখি! এতে বুঝি প্রশান্তি আরও বাড়ল তার।

ভোর চারটে বেজে ১ মিনিট!
এতক্ষণ ভারী তুষারপাত হলেও এখন আকাশভাগ কেমন ডেকে যাচ্ছে একাধারে! নেভা নদীর আশেপাশে গড়ে ওঠা সেইন্ট পিটার্সবার্গের আবহাওয়া কুল-কিনারাহীণ! এই তুষারপাত হচ্ছে, তো এই আবার ভারী বৃষ্টিপাত। আকাশ ডাকছে ভীষণ! চারিদিকে ছুটেছে শীতল হাওয়ার বেগ। নিজ কামরায় ঘুমে আচ্ছন্ন সপ্তদশী মাহি। কিন্তু মেয়েটা ঘুমের ঘোরেও বড়ো অস্থির! পত্রপল্লবের ন্যায় টানা মুখখানা থরথর করে কাঁপছে তার, বন্ধ হরিণী অক্ষিপুটের পর্দার আড়াল দিয়েই নড়ছে চোখ। ওমন এক ঠান্ডা পরিবেশের মাঝেও দরদর করে ঘামছে মাহি। অস্থির হচ্ছে তার ক্ষুদ্র বদন। কাঁপা কাঁপা হাতদুটো সজোরে চেপে ধরেছে বিছানার একাংশ। মেয়েটার এহেন বেগতিক দশা স্পষ্ট জাহির করছে — ঘুমের ঘোরে সে এক দুঃস্বপ্নে আটকা পড়েছে। দুঃস্বপ্নের প্রখরতা ক্রমশঃ বাড়ছে তার। সপ্তদশীর বদ্ধ চোখের পাতায় দৃশ্যমান হয়েছে অতীতের একফালি তিক্ত স্মৃতি।

★ অতীত ★
দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া একঝাঁক কিশোরী! ঘুরতে এসেছে সিলেটের মাধবকুণ্ডে। গোটা কয়েক দায়িত্বশীল শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে দেখতে এসেছে মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত। সেই কিশোরীদের ঝাঁকে উপস্থিত এহসান পরিবারের জমজ দু-রত্ন, আহিরা এহসান এবং মাহিরা এহসান। দুজন দেখতে একই হলেও ছোট থেকেই দু’জনার ব্যাক্তিত্বে রয়েছে বেশ বড়সড় পার্থক্য। যেখানে চঞ্চলা কিশোরী আহি, বান্ধবীদের সাথে হৈ-হুল্লোড়ে মত্ত, সেখানে আদুরে চশমাপরুয়া ভীতু মাহি জলপ্রপাতের কাছ থেকে বড্ড দূরে গা বাঁচিয়ে বসে আছে। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেশ টেনে একমনে দেখে যাচ্ছে সকলের আনন্দ।

আকাশ আজও বড়ো উদাসীন। গোমড়ামুখী বউয়ের ন্যায় মুখাবয়বে নামিয়েছে রাজ্যের আধার। বোধহয় যেকোনো সময় নিজের ভেতরটা উজাড় করে দিবে ধরণীর গায়ে। হৈ-হুল্লোড়ে মত্ত চঞ্চলা আহি’র অবচেতন মনের কোণে হুট করেই উত্থাপিত হলো এক দুঃসাহসী চিন্তা। মেয়েটা বড়ো কৌতুহলী কি-না! তার আবার বড্ড শখ, জীবনে একবার হলেও জলপ্রপাতের ওপরে থাকা পাহাড়ের টিলায় উঠা। এহেন ইচ্ছের পরিক্রমায় সে তৎক্ষনাৎ পা ঘোরায় সকলের অলক্ষ্যে। ধীরে ধীরে ছোট ছোট পাথরে পা ফেলে এগোয় অন্যত্র। এদিকে তার এহেন কান্ড আর কেউ পরোখ না করলেও মাহি বেশ দেখল। মেয়েটা তক্ষুনি কন্ঠ উঁচিয়ে বোনকে ডেকে আওড়াল,
“ আহি! ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস? আহি!”
শুনছেনা আহি! ওতো ভিড়ের মধ্যে তার কান অব্দি হয়তো সে ডাক পৌঁছায়নি তেমন। আহি ধীরে ধীরে দৃশ্যপটের বাইরে যাচ্ছে! মাহি তৎক্ষনাৎ বিচলিত হলো উড়নচণ্ডী বোনকে নিয়ে। সাতপাঁচ না ভেবে মেয়েটা নিজেই পা বাড়াল বোনকে আনতে।

ওপর থেকে প্রবাহিত হওয়া ঝর্ণার একপাশে সময়ের বিবর্তনে তৈরী হয়েছে একখানা প্রশস্ত খাঁজ যুক্ত রাস্তা। উঁচু নিচু অসংখ্য পাথর সেজে আছে চারপাশে। পানির পরশে পিচ্ছিল চারপাশ! মাহি এক কদম এগোলে আছাড় খেয়েছে চারবার। তার পরনের কাপড়ের জবুথবু অবস্থা, স্লাইড কেটে আঁচড় লেগেছে গায়ের বেশকিছু জায়গায়। তবুও তার কদম চলন্ত! বোনকে একাধারে ডাকছে আর এগোচ্ছে সম্মুখে। প্রশস্ত খাঁজের রাস্তাটা ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। বোকা মানবী নিজেও অবগত নয় সে কোন পথে এগোচ্ছে। সে শুধু দেখেছে — তার বোন এ পথে এগিয়েছে। সে এতক্ষণে নিশ্চয়ই চলে গিয়েছে অনেকটা ওপরে। মাহি’র চিন্তা বাড়লো বেশ। মনের কোণে একরাশ সাহস সঞ্চয় করে মেয়েটা কেমন উদ্বিগ্ন কদমে ছুটল ওপরের দিকে।

প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে খাঁজকাটা রাস্তা ধরে এগোচ্ছে মাহি। ধীরে ধীরে পথ হয়েছে সংকুচিত। সম্মুখের চিপা রাস্তায় মানুষ ঢোকবার জো নেই! বাঁদিকে খোলা একখানা রাস্তা। অদূর থেকে ভেসে আসছে জলপ্রপাতের বিকট গর্জন। কিশোরী মনে দোলা লাগল এহেন শব্দে। তার অবচেতন মন ধরেই নিয়েছে — আহি এ পথ ধরে এগিয়েছে। অতঃপর ভীতু কিশোরী কোনোরুপ কালবিলম্ব না করে কাঁপা কাঁপা কদম বাড়ালো সে পথে। ছোট একখানা সরু রাস্তা। গা বাঁকিয়ে ঢুকতে হয় সে পথে। চিকন-চাকন পাতলা গায়ের গড়ন হওয়ায় মাহি অনায়াসে ঢুকে গেল সে পথে। এতক্ষণের অন্ধকার ছাপিয়ে হুট করেই আকাশ খোলা আলো পেয়ে কুঁচকে গিয়েছে কিশোরীর চশমাপরা মায়াবী চোখদুটো। সে তৎক্ষনাৎ একহাতে আড়াল করল দৃষ্টি। সরু দৃষ্টে টুকটুক করে সম্মুখে তাকাতেই স্তব্ধ হলো মাহি! সম্মুখের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে জুড়িয়ে গিয়েছে তার তন-মন। চারিদিকে সবুজ আবহ, মাথারওপর কালো মেঘেদের আকাশ! পায়ের নিচে হলদেটে-সবুজ রঙা পাথর। যার ফাঁক ফোকর দিয়ে গড়াচ্ছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পানি। মুহুর্তেই ঠোঁটের কোণে এক ঝলক পরিতুষ্টির ছাপ ফুটলো মাহি’র। ধীরে ধীরে গাল ভরে গেল আত্মতৃপ্তির হাসিতে। ভীতু মেয়ের এখন আর ভয় করছে না।

সে কি সুন্দর প্রজাপতির মতো দু’হাত ছড়িয়ে দিয়েছে দুপাশে। চোখদুটো বুঁজে লম্বা এক নিশ্বাস টানতেই আচানক কিশোরীর কর্ণকুহরে ভেসে এলো কারো মৃদু গোঙানির শব্দ। তক্ষুনি চোখ খুলল মাহি! বোনের চিন্তায় অস্থির হয়ে কদম ছোটালো শব্দের উৎসের দিকে। অদূরের বিশালকার পাথর দুটোর ফাঁক থেকে ভেসে আসছে গোঙানির শব্দ। ভীতু কিশোরীর অদক্ষ কদম বারবার হোঁচট খেয়েও এগোচ্ছে সেদিকে। ধীরে ধীরে পায়ের গতি কমালো মাহি। ভয়ে ঠান্ডা হয়েছে তার সম্পূর্ণ বদন। কন্ঠায় নেমেছে শুষ্কতা! জিভের সিক্ত ডগা ঠেলে শুকনো অধর ভেজাচ্ছে কিশোরী। কাঁপা কাঁপা বদনে পাথরের ফাঁকের কাছে কদম থামিয়ে, মাথাটা আলতো করে বাড়িয়ে উঁকি দিলো মাহি। তবে পরক্ষণেই ভয়ে জমে গেল বেচারি! কন্ঠরুদ্ধ হয়ে গেল চিরচেনা ভীতু স্বভাবের জন্য। সর্বাঙ্গ জুড়ে বয়ে গেল ভয়াতুর ঝংকার। পাথরের ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে এক বলিষ্ঠ পুরুষ! গায়ে কালো রঙা হুডি। তার হাতে একখানা ধারালো চা কু। তা দিয়েই সে অনবরত এলোপাথাড়ি আঘাত করে যাচ্ছে সম্মুখে নিষ্প্রাণ আকারে পড়ে থাকা এক মধ্যবয়স্ক লোকের বুক বরাবর। লোহুতে একাকার আহতের শরীর! চোখদুটো বদ্ধ! নিশ্বাস নেই লোকটার। তবুও নির্দয় মানব কেমন উম্মাদের ন্যায় এলোপাতাড়ি আঘাত করে যাচ্ছে তাকে। ভয়ার্ত মাহি প্রতিক্রিয়া শূন্য!

হাত-পা অনবরত কাঁপছে তার। কাঁপা কাঁপা পাদু’টো টলতে টলতে হুট করেই ভেঙে পড়ল কেমন! পাথরের গায়ে কিশোরীর ক্ষুদ্রকায় দেহখানা পড়তেই ধপ করে শব্দ হলো। সে শব্দে হাত থামল নির্দয় মানবের। মুহুর্ত ব্যয়ে সে আচানক ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পেছনে। তার সম্পূর্ণ মুখ ঢেকে আছে পাতলা সফেদ রঙা ফুল মাস্কে। সে যেন এক ভয়ানক অশরীরী! মাথার ওপর হুড ফেলে রাখা। মাস্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একজোড়া বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ বাদামী দৃষ্টি ছোট্ট কিশোরীর পানে পড়তেই টানাটান ললাটে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল যুবকের। শরীর ঘুরল কিশোরীর পানে। র ক্তে ভেজা হাতদুটো থেকে এখনো চুইয়ে পড়ছে লহু। যুবক আলগোছে ঘাড় কাত করে তাকাল মাহি’র পানে। ভয়ার্ত মাহি তক্ষুনি পেছাতে লাগল শরীর। যুবক তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে। মাস্কের আড়ালে তার দৃষ্টি অনুভুতিশূন্য। হাতটা নিশপিশ করছে মেয়েটাকে এক্ষুণি মে’রে ফেলতে।

সে কদম বাড়ায় সম্মুখে। ভয়ার্ত মাহি তৎক্ষনাৎ দু’হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় কোনরকমে। টলমল কদমে ছুটে জলপ্রপাতের কাছে। এদিকে যুবক নিরুত্তাপ! তার কদমে ব্যস্ততা নেই। হাতে থাকা চা কু টা উল্টেপাল্টে দেখছে সে। ছুটন্ত কিশোরীর পদযুগল হুট করেই থেমে গেল সম্মুখে গিয়ে। সামনে পালানোর রাস্তা নেই! আছে কেবল পড়ন্ত ঝর্ণা। এখান থেকে লাফ দিলে পাথরের হাত থেকে বেঁচে ফিরতে পারলেও, সাঁতার না জানার অপরাধে প্রাণ যাবে নিশ্চয়ই। ভীতু কিশোরী পা থামায় তক্ষুনি। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলছে মেয়েটা, পেছনে তাকানোর সাহস যোগাতে অপারগ সে। ভয়ানক লোকটা নিসন্দেহে এতক্ষণে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বোকা কিশোরীর মস্তিষ্ক হুট করেই কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। শরীরে ছড়িয়েছে নিস্পৃহতা। কাঁধদুটোতে ভর করেছে পরম ক্লান্তি। মানবী নিজেকে বাঁচানোর বৃথা প্রয়াসে তক্ষুনি লাফ দিলো সম্মুখের জলপ্রপাতের সঙ্গে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানব কেমন দৃষ্টি কুঁচকে দেখল সবটা। সে নিরুত্তাপ! চোখেমুখে এক আকাশসম তিতিবিরক্তিতা লেপ্টে দু-কদম এগিয়ে এসে নিচে উঁকি দিতেই দেখল — কিশোরী ডুবে যাওয়ার পথে। যুবক বিরক্ত হলো! পিয়ার্সিং করা ভ্রুযুগল কুঁচকে দাঁত খিঁচে আওড়াল,

“ হোয়াট দ্য ফা’ক!”
মেয়েটা তার কর্মকাণ্ডের একমাত্র প্রতক্ষ্যদর্শী। একে কি আর ওতো সহজে ছেড়ে দেয়া যায়? যুবক তক্ষুনি দাঁতে দাঁত পিষে লাফ দিলো জলপ্রপাতের নিচে। দূরদর্শি এথলেটিকের ন্যায় শরীর বাকিয়ে লাফ দিয়েছে যুবক। হাত থেকে চাকুটা পড়ে গিয়েছে কোথায় যেন! বড্ড উচুঁ থেকে লাফ দেয়ায় তৎক্ষনাৎ শরীরটা শীতল পানির গভীরতায় তলিয়ে গেল যুবকের। তবুও সে সাঁতরে উঠে আসতে চাইল ওপরে। তবে এরইমধ্যে সে পরোখ করল — পাশ থেকে কিশোরীর নিস্তেজ দেহ পানির গভীরতায় তলিয়ে যাচ্ছে। খোলা চুলগুলো ভাসছে এদিকওদিক।

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৯

হাতদুটো ওপরে ওঠার চেষ্টায় এখনো মত্ত। কিশোরীর ডুবন্ত শরীর দেখে আচমকা সেদিকে হাত বাড়ায় যুবক। এক শক্ত থাবায় তক্ষুনি আঁকড়ে ধরে ডুবন্ত কিশোরীর ডানহাত। অতঃপর এক হেঁচকা টানে মেয়েটার নিস্তেজ শরীরটা নিজের দিকে টেনে এনে পানির উপরে মাথা তোলে যুবক। অচেতন নিস্পৃহ কিশোরীর ঠান্ডা শরীরটা নিজের বুকের সঙ্গে লেপ্টে রেখে বাদামী চোখদুটোর মালিক আচমকা প্রশ্ন ছুড়ঁল —
“ হু আর ইউ্য পিচ্চি?”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here