Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪২

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪২

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪২
jannatul firdaus mithila

আকাশপট কাঁপছে! গুড়গুড় শব্দ তুলছে উপস্থিত মেঘ। ঝড়ো হাওয়ায় কুপোকাত ধরণী। সেইন্ট পিটার্সবার্গের ব্যস্ত রাস্তায় নেমেছে তুমুল বর্ষণ। হাওয়ার সনে পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছে — মাফিয়া শ্যাডো মনস্টারের কাওয়াসাকি নিনজা এইচটুআর বাইক! বাইকের সে-কি বেগ। তার দু-চাকার রুষ্ট চাপে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির ছিটেফোঁটা। সুদর্শনের গা ভিজে জবুথবু অবস্থা। পরনের কালো রঙা শার্টখানা সিক্ত হয়ে লেপ্টে আছে বলিষ্ঠ দেহে। ডানহাতে বাইকের থ্রটল ঘুরিয়ে যুবক ফের গতি বাড়ালো বাইকের। তার পেছন পেছন এগোচ্ছে বইভর্তি ট্রাক দু’টো। নিজেদের সর্বোচ্চ বেগ কাজে লাগিয়েও ট্রাক দু’টো কেমন পিছিয়ে পড়েছে দেখো! কিছুতেই নাগাল পাচ্ছে না — মাফিয়া বিস্টের।

“ মনস্টার’স প্যারাডাইস!”
প্যালেসের সুউচ্চ মূল ফটকের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে এলেক্স, কব্জি উল্টে তাকিয়ে আছে ঘড়ির কাঁটার পানে। গম্ভীর মুখো’র মুখাবয়বে ফুটেছে চিন্তিত ছাপ। কপালে পড়েছে গোটাকতক চাপা বিরক্তির ভাঁজ। চোয়ালের পেশী শক্ত তার। দাঁত কিড়মিড় করে চিড়বিড়িয়ে বিড়বিড় করছে,
“ অন দ্য ওয়ে থেকে ব্যাক করার মানে কী? মনস্তার তো এর আগে কখনো এমনটা করেনি। তার কাছে সবার আগে কাজ তারপর অন্যকিছু, তাহলে আজ কেনো…”
কথাটুকু পূর্ণ করবার ফুরসত মিলেনি এলেক্সের, তার আগেই পেছন থেকে দু-কদম এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন এডউইন। দু’হাত পকেটে গুঁজে জনাব ভাব ধরেছে গম্ভীর! চোখেমুখে এক অদ্ভুত দীপ্তি তার। ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক চিলতে রহস্যময় বাঁকা হাসি। সে কেমন হুট করেই বাঁকা কন্ঠে ঠেস দিয়ে বলল,
“ কি এলেক্স? এবারের বাজিটা তাহলে আমিই জিতলাম। তাই না বলো?”
তক্ষুনি শক্ত চোয়ালে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় এলেক্স। নাকের পাটা ফুলিয়ে ফোঁস ফোঁস করে ওঠে সাপের ন্যায়। অথচ তার এরূপ দৃষ্টি অবলোকন হওয়া মাত্রই তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল এডউইনের ঠোঁটের কোণে। এতে বোধহয় রাগ বাড়ল এলেক্সের। যুবক কেমন চিড়বিড়িয়ে বলে ওঠে,

“ ইউ্য ডাম্ব! তুই হয়তো ভুলে যাচ্ছিস, ক্ষনিকের মোহে ডুবে থাকার স্বভাব মনস্তারের নেই। যেদিন তার মোহ কাটবে সেদিন সে তোকে সহ ঐ মেয়েকে ছিড়েখুঁড়ে ফেলবে। তাছাড়া এতো সহজে আমি হারছি না এডউইন! মনস্তারকে তোমার পাতানো জাল থেকে খুব শীঘ্রই বের করে আনব আমি। তুই জাস্ট দেখতে থাক।”
এহেন কথায় সহসা ঘাড় কাত করে তাকায় এডউইন। সরু দৃষ্টে এক-আধবার আপাদমস্তক পরোখ করে নেয় এলেক্সকে। পরক্ষণে গালের ভাঁজে খানিক জিভ ঠেলে হাসল গম্ভীর পুরুষ। রয়েসয়ে জবাবে বলল,
“ কোনটা ক্ষনিকের মোহ আর কোনটা অবসেশন, তার পার্থক্য তোর মতো অবোধের হবে না এলেক্স। তুই জাস্ট দেখতে থাক, একদিন ঐ সাধারণ মেয়েটাই আমাদের রুশদী কিংয়ের বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ হবে।”
মাত্রাতিরিক্ত রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য এলেক্স। মুখাবয়বে রঙ ফুটেছে লালাভ আবরণ। সে তক্ষুনি হামলা বসালো এডউইনের ওপর। শক্তপোক্ত হাতের হিং স্র বগল থাবায় আঁকড়ে ধরল এডউইনের ঘাড়। হাতের জোর বাড়িয়ে কটমট ধ্বনিতে আওড়াল —

“ রুশদী কিংয়ের অর্ধেকটা জীবন যেভাবে দূর্বলতা ছাড়া কেটেছে, তার বাকিটা জীবনও ঠিক একইভাবে দূর্বলতা ছাড়া কাটবে। রুশদী প্যারাডাইসের কিং ওরফে শ্যাডো মনস্টার আগেও হার্টলেস ছিলো, পরবর্তীতেও হার্টলেস থাকবে। রুশদী প্যারাডাইসের ভবিষ্যতের জন্য মনস্টারের হার্টলেস থাকা অতীব প্রয়োজন বাস্টার্ড। ঠিক এ কারণে উনার জীবনে আমি কোনো ধরনের দূর্বলতা আসতে দিব না। দরকার হয় ঐ দূর্বলতাকে আমি নিজ হাতে উচ্ছেদ করব, তারপরও ঐ দূর্বলতার কোনো স্থান থাকতে দিব না মনস্টারের লাইফে। এন্ড ইট ইজ ফরমোস্ট ডিউটি। আর আমার ডিউটির মাঝখানে বাঁধা হয়ে যে বা যারাই আসবে — তাদের সবক’টাকে নিঃশেষ করে ফেলব আমি। মাইন্ড ইট।”

কাশছে এডউইন। দু’হাতে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত সে। ঘাড়ের ওপর আঁটকে রাখা শক্তপোক্ত হাতখানার সে-কি জোর! ধীরে ধীরে পিষে নিচ্ছে এডউইন বেচারার ঘাড়ের হাড়। এলেক্স থামছেনা আজ। শক্ত চোয়ালে হাতের জোর বাড়াতেই অদূর থেকে ভেসে এলো বাইকের ভ্রুমভ্রুম শব্দ। তৎক্ষনাৎ স্থবির হলো এলেক্স। তার কুঁচকান দৃষ্টি গিয়ে আচানক ঠেকল সম্মুখে। অদূর থেকে এগিয়ে আসছে এক ছটাক আলো, সঙ্গে রয়েছে কনক্রিটের রাস্তার ওপর গাড়ির চাকার জোরালো ঘর্ষণে উৎপন্ন রুষ্ট আওয়াজ। হতভম্ব এলেক্স। হতবিহ্বলতায় অজান্তেই খানিক ঢিলে হলো তার শক্ত হাতের বাঁধন। তক্ষুনি সুযোগটুকু কাজে লাগায় এডউইন। সহসা এলেক্সের হাতের বাঁধন হতে আলগোছে নিজ ঘাড় ছাড়িয়ে সরে দাঁড়ায় দু-কদম। অতঃপর কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়া আচানক নিজ শক্ত হাতের বলিষ্ঠ পাঞ্চ বসিয়ে দেয় এলেক্সের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে আবৃত ডানগাল বরাবর। ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কায় এলেক্স। সহসা গাল বাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল গম্ভীর মানব। পরক্ষণে মস্তিষ্ক খানিকটা সচল হতেই যেইনা চোয়াল শক্ত করে সটান হয়ে দাঁড়াবে ওমনি সম্মুখ থেকে ধেয়ে আসে মনস্টারের বাইক। হাওয়ার গতিতে সকলকে উপেক্ষা করে ছুটে যায় প্যালেসের ড্রাইভ ওয়ে দিয়ে। পেছন পেছন ট্রাক দু’টোও ছুটল একই গতিতে। এলেক্স ডুবেছে হতভম্বতায়। চোখদুটো বিস্ময়ে গোল হয়েছে তার। হতবাক কন্ঠফুড়েঁ অস্ফুটে বেরুলো —
“ মনস্তার! আবারও ট্রাকভরে কি নিয়ে এসেছে?”

দীর্ঘ বৃক্ষশোভিত প্রশস্ত ড্রাইভ ওয়ে পেরিয়ে দ্রুত বেগের বাইকটা আচানক এসে থামল প্যালেসের প্রবেশদ্বারে। মুহূর্ত ব্যয়ে বাইকের গা হতে নেমে এলেন মনস্টার মহাশয়। কালবিলম্ব না করে ছুট লাগালেন প্যালেসের অভ্যন্তরে। পায়ের গতি নিরবিচ্ছিন্ন যুবকের, ছুটছে জোরালো ভঙ্গিতে। মাথার ওপর বসে আছে হেলমেট, পরনের শার্টখানার আধভেঁজা অবস্থা। দ্রুত পদে গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসে পা রাখতেই পেছন থেকে ছুটে এলো এডউইন। সব জান্তা বিচক্ষণী পুরুষ ভাব ধরলেন অজানার। ব্যস্ত মনস্টারের পিঠের পানে নজর রেখে কপট সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ মনস্তার! আপনি আবার চলে এলেন যে? ইজ এভরিথিং ওকে?”
তৎক্ষনাৎ জবাব দেয়নি রূঢ় মানব। পায়ের গতি এলিভেটরের পানে এগিয়ে নিয়ে গমগমে গলায় শুধালেন,
“ খাবার নিয়ে আয়।”
থমকায় এডউইন! পাদু’টোয় তার আচানক ভর করল রাজ্যের সব ভার। চোখদুটোয় নেমেছে হতভম্বতার ছাপ। কানে ভুল শুনল কি-না যাচাই করতে হতবাক কন্ঠে আরেকবার প্রশ্ন তুলতেই যাবে তার আগেই দেখা গেল — মনস্টার প্রবেশ করেছে এলিভেটরে। ব্যগ্র হাতে আঙুল চাপছে সুইচবোর্ডে। হতভম্ব এডউইনের সম্মুখেই ধীরে ধীরে বন্ধ হলো এলিভেটরের দুয়ার। আড়াল হলো রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ দেহখানা। এডউইন তখনো দাঁড়িয়ে আছে ঠায়। তার অবাক কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো —
“ মুনবার্ড খায়নি এখনো?”

অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষ! মেঝেতে নিরবে বসে আছে সপ্তদশী। বুকের কাছে গুটিয়ে রেখেছে দু’পা। মুখ লুকিয়ে রাখা পায়ের ভাঁজে। ক্ষনে ক্ষনে কাঁপছে সপ্তদশীর ক্ষুদ্র বদন। বিদঘুটে অন্ধকারেও ভেসে আসছে তার ফোপাঁনোর শব্দ। একজোড়া দাম্ভিক কদম তক্ষুনি এসে দাঁড়ালো বিদঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত কক্ষের দুয়ার পানে। কদম জোড়ার মালিক বড্ড অস্থির। বুকের ওঠানামার গতি জোরালো তার। হন্যে চোখদুটো অন্ধকার হাতড়ে খুঁজছে বোকা মানবীকে। কিয়তক্ষন বাদেই মানবীর আঁধারে ছেয়ে থাকা বদনখানি ধরা পড়ল রূঢ় মানবের দৃষ্টিপটে। ওমনি পায়ে গতি টানল মুগ্ধ। তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে একহাঁটু গেঁড়ে ধপ করে বসল সপ্তদশীর সম্মুখে। হুটহাট কারো উপস্থিতি টের পেয়ে আলগোছে মাথা তুলে মাহি। ফোলা ফোলা চোখদুটো পিটপিট করে সম্মুখে তাকাতেই ভড়কায় বোকা মানবী। সহসা চেঁচিয়ে ওঠে ভয়ে! ভয়াল আবহে দেহখানি পিছিয়ে নিতে উদ্যোত সে। ঠিক তখনি সম্মুখে হাঁটুগেড়েঁ বসে থাকা রূঢ় মানব কেমন তড়িঘড়ি করে ব্যস্ত হাতে নিজ মাথা থেকে হেলমেট একটানে খুলে এনে ভরাট কন্ঠে শুধালো,

“ হেই চাশমিস! ইট’স মি, মুগ্ধ। আর ইউ্য ওকে?”
প্রথমবার! হ্যাঁ ঠিক প্রথমবার রূঢ় মানব আগ বাড়িয়ে নিজ পরিচয় দিলো, তাও আবার সপ্তদশীর কাছে। মাহি কেমন হা করে তাকিয়ে আছে মানবের পানে। মেয়েটার চোখেমুখে হতভম্বতার ছাপ স্পষ্ট! বিস্ময়ে চোখ উঠেছে ললাটে। বিস্ময়ের রেশে তুলতুলে অধরযুগলের ফাঁক বেড়েছে একটুখানি। জিভের ডগা দিয়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ আপনি?”
রূঢ় মানব গম্ভীর! হুটহাট মুখাবয়বে নরম ভাবভঙ্গিমা ধরার স্বভাব নেই তার। আজও ব্যাতিক্রম ঘটেনি সে স্বভাবে। অস্থির বাদামি চোখজোড়ায় এতক্ষণে নামল খানিক শিথিলতা। গোটানো ললাটের চামড়া হাল ছেড়েছে নিজেদের। চিরায়ত স্বভাবের বশিভূত হয়ে, ঘনকালো ভ্রু-দ্বয়ের মাঝে মেকি ভাব ধরে আঁটকে আছে দু-তিনটে ভাঁজ। হালকা খাঁজযুক্ত চোয়ালখানা ফুটে আছে শক্তভাবে। যেন কোনো নিখুঁত ভাস্কর্যের নিদর্শন! বাদামী ঠোঁটদুটোর নিম্নাংশে ঝুলন্ত প্লাটিনাম রিংটা কেমন চকচক করছে দেখো! সপ্তদশীর অপেক্ষায়িত নজর দীর্ঘ হলো। উত্তরের আশায় এখনো চেয়ে আছে একদৃষ্টে! গম্ভীর পুরুষ এতক্ষণে দৃঢ় চোয়ালখানা নাড়লেন তার। গমগমে গলায় কেবল প্রতিত্তোরে বললেন,
“ হুম! ওঠ।”

মুহুর্তেই টনক নড়ে ওঠে মাহি’র। যুবকের উপস্থিতি নিশ্চিত হতেই কপাল কুঁচকে গেল মায়াবিনীর। এক আকাশসম রাগে – ঘৃণায় ছেয়ে গেল তার সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানা। শক্ত হলো নরম চোয়াল! তীরের ফলার ন্যায় খাঁড়া নাকের ডগাটা মুহুর্তেই ঝংকার দিয়ে লাফিয়ে উঠল কেমন। তিতিবিরক্ত কন্ঠে শুধালো,
“ কেনো? আবার কোন অঘটন ঘটাতে চাচ্ছেন?”
কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো মুগ্ধের। চোয়ালের রেখা টানটান! যুবক আলগোছে উঠে দাঁড়ালো বসা ছেড়ে। ততক্ষণে কক্ষের দুয়ারের কাছে মেইড ট্রলি ভর্তি খাবার নিয়ে হাজির। ভেতরে ঢোকবার অনুমতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে নিরবে। রূঢ় মানব তখন আওয়াজ তুললেন কন্ঠায়। সপ্তদশীর পানে ঠায় দৃষ্টি বজায় রেখে, মেইডের উদ্দ্যেশে গমগমে গলায় বললেন,

“ ভেতরে আন সব! এন্ড টার্ন অন দ্য লাইটস।”
সহসা হুকুম তামিলে মত্ত হলেন মেইড। নতমুখে কাঁপা কাঁপা হাতে ট্রলিখানা ঠেলেঠুলে নিয়ে ঢুকলেন কক্ষে। অতঃপর পদযুগলের গতি টানলেন ডিভান অব্দি। সেথায় ট্রলিটা দাঁড় করিয়ে রেখে আলগোছে পা ঘোরালেন সুইচবোর্ডের দিকে। দু-আঙুল নাড়িয়ে সুইচবোর্ডের সবগুলো সুইচ চাপতেই মুহুর্তে আলোকিত হলো বিদঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত কামরাটি। কাজ শেষ! বাধ্য মেইড তক্ষুনি পা ঘুরিয়ে চলে গেলেন কক্ষ ছেড়ে। রূঢ় মানব এবার ফের বাঁকালেন নিজ মেরুদণ্ডের হাড়। সামান্য ঝুঁকে এসে আগ বাড়িয়ে সপ্তদশীর কনুই আঁকড়ে ধরতে গেলে তার হাতখানা এক ঝটকায় সরিয়ে দেয় রাগিণী মানবী। তিরস্কারের সুরে ঝাঁঝাল কন্ঠে বলে বসে,
“ ছোঁবেন না আমায়!”
সহসা দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো মুগ্ধের। মাথাটায় আবারও রাগ বাড়ছে তরতর করে। তবে যুবক এবার সামলালো নিজেকে। ঠোঁট গোল করে খানিক জোরালো নিঃশ্বাস ফেলে গুটিয়ে নিলো নিজ হাতখানা। পরক্ষণে নিজ চিরায়ত স্বভাবের রূঢ় কন্ঠে আওড়াল,
“ এই বান্দীর মেয়ে ওঠ! নাকে কান্না বাদ দিয়ে খাবারগুলো গেল।”
নাক ফুললো মাহি’র। ঘৃণায় জমে গেল অন্তর! কপালে ঝাঁঝাল প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে গমগমে গলায় প্রতিত্তোরে আওড়াল,

“ খাব না আমি!”
যুবকের রাগের পারদ তরতর করে বিপদসীমা অতিক্রম করবার পায়তারা চালাচ্ছে। অস্থির হয়েছে নিশ্বাস! রাগের পরিতুষ্টিতে যুবকের হাতদুটো তক্ষুনি উঠে গেল কোমরে। উপরিভাগের দাঁতকপাটি আলগোছে চাপ বসালো নিম্নাংশের ঠোঁটের মাঝে। সেথায় কিয়তক্ষন দাঁত কপাটির রুষ্ট স্পর্শ বসিয়ে দিতেই মুগ্ধ আলগা করল নিজ অধর। পরক্ষণেই কেমন হুংকার ছুঁড়ে শুধালো,
“ দেখ দেড়ব্যাটারী! মেজাজ কিন্তু এমনিতেই ভীষণ খারাপ আমার। সো আ’ম ওয়ার্নিং ইউ্য, নতুন করে রাগাস না আমায়। তারাতাড়ি উঠে খাবারগুলো খেয়ে নে।”
শুনল সপ্তদশী! তবে গা করল না সে বাক্যে। ঘাড়ত্যাড়ামির জোরে ঠায় বসে রইল মেঝেতে। এদিকে রাগী মানব দাঁত কিড়মিড় করছে ফের। মেয়েটার পানে আরেকবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে বলল,
“ কি হলো ওঠ!”
এবারে গা করল মাহি। তক্ষুনি নিজের অগ্নিদৃষ্টিযুগল একযোগে তাক করল রূঢ় মানবের পানে। চোয়াল শক্ত করে ঝাঁঝাল কন্ঠে তৎক্ষনাৎ আওড়াল —

“ আপনি আমার দু-চোখের সামনে থেকে সরুন নির্দয় বিস্ট! জুতো মে’রে গরুদান করা আপনার স্বভাবে থাকলেও, তা আমার ধাঁচে নেই।”
নির্দয় মানবকে এবার পায় কে? সে কেমন গজগজ করতে করতে গোটাতে লাগল নিজ ভেজা শার্টের হাতা। কন্ঠে একরাশ রূঢ়তা ঢেলে শুধালো,
“ তোর কোন গালটা বেশি চুলকাচ্ছে বান্দীর মেয়ে?”
অবোধের ছাপ ফুটলো সপ্তদশীর মুখাবয়বে। কপালে মিললো দু’টো গাঢ় ভাঁজের ছাপ! ফোলা ফোলা চোখদুটো সংকুচিত হয়েছে খানিক। কিয়তক্ষন চুপ থেকে পরক্ষনেই সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ মানে?”
তক্ষুনি সপ্তদশীর সম্মুখে মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে সামান্য ঝুঁকে আসে মুগ্ধ। শক্ত চোয়ালে কটমট শব্দ তুলে তর্জনী ছোঁয়াল মাহি’র তুলতুলে গালে। তৎক্ষনাৎ নাকমুখ কুঁচকে নেয় মাহি। রাগে ক্ষোভে দাঁত করছে কিড়মিড়। রূঢ় মানব গভীর দৃষ্টে দেখল তা। মাহি’র ডানগালে খানিকটা আঙুল নাড়িয়ে ক্রুর গলায় আওড়াল,

“ বহুদিন আমার হাতের জোরালো আদর না পেয়ে তোর গালদুটো বড্ড চুলকাচ্ছে। তাই না বান্দীর মেয়ে? তাই তারাতাড়ি বলে দে, কোন গালটায় বেশি চুলকানি হচ্ছে। সেখানে দুয়েকটা কষিয়ে থাপ্পড় বসালেই দেখবি — শান্তি!”
নাক টানল মাহি। ধীরে ধীরে পর্দা সরালো অক্ষিপুটের সম্মুখ হতে। সুদর্শন নির্দয় মানবের পানে কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই উঠে পড়তে উদ্যোত হলো। মুগ্ধ সরে গেল তক্ষুনি। নজর অন্যত্র সরিয়ে বাজখাঁই কন্ঠে বলল,
“ তারাতাড়ি খেয়ে নে।”
মাহি শুনল সব! নতমুখে নাক টেনে টেনে এগুলো খাবার ট্রলির দিকে। তবে মেয়েটা আজ বড্ড সাহসী বোধহয়। ট্রলির পানে এগিয়ে এসে খাবার খাওয়া তো দূর, সে উল্টো শক্ত চোয়ালে তেজী ভাব ধারণ করে তক্ষুনি একহাতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো ট্রলিভর্তি খাবার। মুহুর্তেই ঝনঝনিয়ে উঠল চারপাশ! কাঁচের বাসনকোসন সব কেমন গুড়িয়ে গেল নিমিষেই। এহেন কান্ডে আচানক ঘাড় বাকিয়ে তাকায় মুগ্ধ। রাগে থরথর করে কাঁপতে থাকা সপ্তদশীর পানে সরু দৃষ্টে নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল কিয়তক্ষন। অতঃপর ঠোঁটের কোণে হুট করে ঝোলালো এক অদ্ভুত বাঁকা হাসির রেশ। মুখাবয়বে এক আকাশসম নির্লিপ্ততা বজায় রেখে হুংকার ছুঁড়ে ডাকল,

“ গার্ডস!”
ভড়কায় মাহি। লোকটা আবার তাকে উত্তম-মধ্যম দিয়ে বসবে কি-না সে চিন্তায় চিন্তিত বেচারি। এরইমধ্যে কক্ষে ছুটে এলেন দু’জন গার্ড। হুকুমের আদেশে নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকতেই মনস্টার কেমন গমগমে গলায় আদেশ ছুঁড়ল,
“ ডাইনিং থেকে ক্রোকারিজ নিয়ে আয়! আমার বান্দীর মেয়ের রাগ উঠেছে আজ। যা তারাতাড়ি নিয়ে আয় সব।”
সহসা ঘাড় নাড়িয়ে চলে গেলেন গার্ড দু’জন। মুগ্ধ তখনো একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে মাহি’র পানে। সপ্তদশী কাঁপছে। তার ক্ষুদ্র বদনের কম্পন আদৌও রাগের জন্য, না-কি ভয়ে তা কে জানে! যুবক বাঁকা হেসে আচানক দুপা পিছিয়ে গিয়ে, বলিষ্ঠ দেহখানা এলিয়ে দিলো কাউচের কোলে। দু-পা দু’দিকে ছড়িয়ে রেখে হাতদুটো উঁচিয়ে রাখল কাউচের কাঁধে। তার দৃষ্টি এখনো অনড়! মেয়েটাকে দৃষ্টি দিয়েই মে’রে ফেলার এক অদ্ভুত প্রচেষ্টা তার মধ্যে চলমান।

ঘরভর্তি বিদেশি দামী দামী ক্রোকারিজ এনে হাজির করা হয়েছে। সপ্তদশীর হাতে দেওয়া হয়েছে একখানা হকিস্টিক! তবুও হতভম্ব মাহি, বোকার ন্যায় চেয়ে আছে রূঢ় মানবের পানে। মুগ্ধ কেমন ঘাড় কাত করে তাকিয়ে আছে দেখো। নিখাঁদ সৌন্দর্যের প্রতীকী ভ্রু-দ্বয় খানিক উঁচিয়ে, সুদর্শন আচানক বলল,
“ নে ভাঙ! যত ইচ্ছে ভাঙ। শেষ হলে আবার আনব।”
সপ্তদশী চিবুক নামালো গলার কাছে। অপরাধীত্বে ছেয়ে গিয়েছে তার মুখ। এতক্ষণের রণচণ্ডী ভাবখানা কোথায় যে উড়ে পালালো কে জানে! সে কেমন মিনমিনে স্বরে বলে ওঠে,
“ পারব না আমি।”
সহসা পায়ের ওপর পা তোলে মুগ্ধ। এদিক-ওদিক ঘাড় নাড়িয়ে ফোটালো শব্দ করে। অত্যন্ত ঠান্ডা অথচ নিরেট কন্ঠে আলটিমেটাম ছুঁড়ে বলল,

“ এগুলোর গায়ে হকিস্টিক চালাতে না পারলে, ঐ স্টিক আমি তোর গায়ে ভাঙব। মাইন্ড ইট!”
আঁতকে ওঠে মাহি। ভয়ে কেঁপে ওঠে তার সর্বাঙ্গ। কাঁপা কাঁপা হাতে শক্ত করে চেপে ধরল হকিস্টিকটা। পরক্ষণেই শরীরে এক অদ্ভুত তেজ জ্বালিয়ে ইচ্ছেমতো হকিস্টিক চালালো ক্রোকারিজ গুলোর ওপর। সপ্তদশী থামছে না আজ। ছলছল চোখে নিজ মনের সকল বিষ ঢেলে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে নির্জীব কাঁচের বাসনকোসন। পুরো ঘরময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে কাঁচের চূর্ণ!
প্রায় মিনিট দশেক ধরে চলল সপ্তদশীর প্রলয়ঙ্কারী অভিযান। তবুও ঘরের চারভাগের একভাগ ক্রোকারিজ ভাঙার সাধ্যি হয়েছে তার। বাকি গুলো পড়ে আছে ঠায়! মাহি বড়ো ক্লান্ত। বুক ফুলিয়ে হাঁপাচ্ছে ভীষণ! হাঁপাতে হাঁপাতে আলগোছে চোখ তুলে তাকাল মুগ্ধের পানে। মুহুর্তেই দৃষ্টিগোচর হলো — যুবকের অনড় বাদামী চোখদুটো। সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামায় মাহি। রূঢ় মানবের চোখের পানে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকবার সাহস হয়না তার। আজও হলোনা তেমন! সপ্তদশী থেমে যেতেই আচমকা বস ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মুগ্ধ। দু’হাত পকেটে গুঁজে নির্বিকার ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মাহি’র মুখোমুখি। অতঃপর ঠোঁটের আগা বাকশূন্য রেখে মেয়েটার হাত থেকে হকিস্টিকটা আলগোছে নিয়ে নিলো নিজ হাতে। এরূপ কান্ডে ভড়কায় মাহি। সহসা সন্দিষ্ট দৃষ্টি উঁচিয়ে তাকাতেই দেখল — যুবক কেমন ক্রুর হাসছে। নিজ পাহাড়সম উঁচু ঘাড়টা সামান্য নুইয়ে এনে মাহি’র মুখের কাছে মুখ এনে হিসহিসিয়ে বলছে,

“ শেষ? এটুকু ভেঙেই মাথা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে? বোকা মেয়ে! ওয়েট, আমি দেখাচ্ছি, রাগ উঠলে কিভাবে ভাঙতে হয়।”
সহসা চোখদুটো ছানাবড়া হয়ে গেল মাহি’র। এক অজানা ভয়ে কেঁপে ওঠে তার ক্ষুদ্র তনু। ভড়কানো কন্ঠফুঁড়ে কিছু আওড়াতেই যাবে তার আগেই ঘটে গেল বিরাট অঘটন! নির্দয় মানব কেমন বাঁকা হেসে শুরু করল তার ধ্বংসযজ্ঞ। নির্দয়তার স্পষ্ট ছাপ ফুটিয়ে শক্তহাতের জোরালো কায়দায় হকিস্টিক চালাতে লাগল ঘরভর্তি ক্রোকারিজের গায়ে। সে-কি বিকট শব্দে মেতেছে কক্ষ! চূর্ণবিচূর্ণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে চারদিকে। ভয়াতুর সপ্তদশী হাত চেপেছে কানে। তটস্থ হয়েছে তার বদন। কুঁচকে গিয়েছে চোখমুখ! অথচ রূঢ় মানব থোড়াই থামল! এক আকাশসম রাগে গুড়িয়ে দিচ্ছে সব।

সম্পূর্ণ কক্ষ জুড়ে আপাতত নিরব শান্তি বিরাজমান। যুবক থেমেছে। চোখের পলকে গুড়িয়ে ছেড়েছে ঘরভর্তি কাঁচের বাসনকোসন। আপাতত রূঢ় মানব দাঁড়িয়ে আছে কাউচের সম্মুখে। জানালার দিকে মুখ করে সিগার ফুঁকছে অনবরত। সপ্তদশী কাঁদছে! ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদার দরুন হেঁচকি তুলছে বারংবার! নির্দয় মানব তখন আচানক দাঁতে দাঁত পিষে বিরক্তভরা কন্ঠে বলল,
“ এ্যাই বান্দীর মেয়ে! ফ্যাচফ্যাচ করা বন্ধ কর।”
সহসা থেমে গেল মাহি। ছলছল দৃষ্টিযুগল বলিষ্ঠের পিঠ বরাবর তাক করে, আলগোছে চোখদুটো মুছে নিলো হাতের উল্টোপিঠে। ভগ্নহৃদয়ে ভঙ্গুর কন্ঠে বলে ওঠে,
“ আপনি ঠিক কবে আমায় একটু শান্তি দিবেন বিস্ট?”
থামল মুগ্ধের ব্যস্ত হাত। মুখাবয়বে এক পশলা শ্লেষাত্মক ভঙ্গিমা ফুটিয়ে শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়াল সে। ফের সিগারে লম্বা একখানা টান বসিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল আপনমনে। রয়েসয়ে শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলল,
“ অতিরিক্ত শান্তি পেলে মানুষ ম’রে যায় বান্দীর মেয়ে! আর তুই এখনি ম’রে গেলে আমি জ্বালাব কাকে বল?”
তৎক্ষনাৎ মুখাবয়বে রাগ ফুটল মাহি’র। চপল পায়ে দ্রুত পদে এগিয়ে এলো দু-কদম। চোখদুটোর বাঁধ ভাঙিয়ে কাঁদতে কাঁদতে জবাবে বলল,

“ যা করার জন্য এনেছেন তা করে আমায় নিস্তার দিচ্ছেন না কেনো?”
দৃষ্টি সরু হলো মুগ্ধের। চেয়ে রইল মেয়েটার ক্রন্দনরত মুখপানে। পাহাড়সম দেহটা কাউচের গায়ে ফের এলিয়ে দিয়ে টান বসালো সিগারের শেষ ভাগে। সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ কি বলতে চাইছিস?”
ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টানল মাহি। বুকের ওপর এক অদৃশ্য পাথর বসিয়ে উদ্যোত হলো এক দুঃসাহসিক কর্ম সম্পাদনে। দু’হাতে আলগোছে পরনের জামাটার পেছন ভাগের চেইনখানা টেনে নামালো সপ্তদশী। চোখদুটোতে অবাধ লজ্জাদের জলাঞ্জলি দিয়ে দৃষ্টি নোয়ালো কাপত্রয়ী। সপ্তদশীর পেল্লব মুখখানায় নিরব আর্তনাদ স্পষ্ট! থরথর করে কাঁপছে তার ক্ষুদ্র বদনখানি। একবুক কষ্ট নিয়ে নিজ উদ্যোগে কাঁধ থেকে নামিয়ে দিলো পরনের কুর্তার একাংশ। ফলে দৃশ্যমান সপ্তদশীর নরম মসৃণ বক্ষ বিভাজিকার সম্মুখভাগ। বাহ্যিক পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কালো রঙা অন্তর্বাসের ফিতেটা বড্ড স্পষ্ট এখন। আজ স্বেচ্ছায় নিজ সম্ভ্রম বিসর্জন দিতে প্রস্তুত সপ্তদশী! ঠোঁট কামড়ে কাঁদছে অনবরত। ভঙ্গুর কন্ঠে সম্মুখের নির্দয়কে আহবান জানিয়ে বলল,

“ নিন! ভো’গ করে ফেলুন আমায়। এর জন্যই তো আমায় জোর করে তুলে এনেছিলেন তাই না? তাহলে আর দেরি করছেন কেনো? করে ফেলুন সব। শেষমেশ নিজের এই পশুত্বটাও দেখিয়ে ফেলুন। শত হলেও, চরিত্রহীনদের কাছে নীতিবাক্য মানায় না মিঃ বিস্ট। আপনার মতো চরিত্রহীনের মুখে তো আরও আগে মানায় না।”
দু’হাত দুরত্বে থাকা কাউচের নরম গদিতে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে মুগ্ধ নামক নির্দয় মাফিয়া বিস্ট। সপ্তদশীর এহেন দুঃসাহসিক কর্মে নির্লিপ্ত সে। মুখটা বড়ো গম্ভীর তার, নিষ্পলক চোখদুটোর ভাষা অনুভূতিশূন্য। যুবক কেমন নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় তাকিয়ে আছে সম্মুখে। আশ্চর্য! তার নিখাঁদ দৃষ্টিযুগল কেমন আঠার ন্যায় আঁটকে আছে ক্রন্দনরত মাহি’র মুখপানে। সপ্তদশীর লাল হয়ে যাওয়া মুখ, ফোলা ফোলা অধরযুগল! তা হতে নজর সরছেনা রূঢ় মানবের। অথচ সপ্তদশী যে নিজেকে অনাবৃত করেছে তার জন্য, সেদিকে থোড়াই খেয়াল আছে তার! ওদিকে মাহি’র কান্না বেগতিক! দাঁতের রুষ্ট চাপে ক্ষত হয়েছে তুলতুলে অধরযুগল। ক্ষতস্থান থেকে নির্বিকারে গড়াচ্ছে লহু। যুবকের নিষ্প্রাণ দৃষ্টি বারংবার ছুটছে সেদিকে।

একহাতে তার ধরে রাখা জ্বলন্ত সিগার। ধোঁয়ারা উড়ছে নির্বিকারে! নির্দয় যুবক কেমন নড়েচড়ে উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। হাতের সিগারটা তক্ষুনি অন্যত্র ছুঁড়ে ফেলে, পায়ে ধীর গতি টেনে মাহি’র পানে এগোচ্ছে সে। বাহাতে ধীরে ধীরে খুলছে নিজ শার্টের বোতাম। সপ্তদশী আড়দৃষ্টে দেখল তা। লজ্জায়, কষ্টে একাকার হয়ে চোখমুখ খিঁচে নিল পরক্ষনেই। মুগ্ধ এখনো এগোচ্ছে! শার্টের সবগুলো বোতাম খোলার দরুন উম্মুক্ত হয়েছে তার ফর্সা পেটানো। যুবকের ব্যস্ত পদযুগল তখন হুট করেই এসে দাঁড়ালো কুন্ঠায় বেঁকে দাঁড়িয়ে থাকা মাহি’র একদম মুখোমুখি। চোখ খিঁচে রাখা মাহি স্পষ্ট অনুভব করছে যুবকের উপস্থিতি।

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪১ (২)

ধীরে ধীরে নিশ্বাসের গতি বাড়ছে তার। সর্বাঙ্গে ছেয়েছে হিমশীতলতা। ঘৃণায় তিক্ত হচ্ছে তার তন-মন। ঠিক তখনি যুবক ঘটালো এক অদ্ভুত কান্ড! নিজ গা থেকে একটানে আধভেজা শার্টটা খুলে এনে, সপ্তদশীকে এক আকাশসম হতবাকতায় ডুবিয়ে দিয়ে শার্টখানা আলতো করে জড়িয়ে দিলো সপ্তদশীর অনাবৃত গায়ে। তক্ষুনি কপাল গোছায় মাহি। এক ঝটকায় চোখদুটো অনাবৃত করে সম্মুখে তাকাতেই যাবে তার আগেই টের পেল — তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনেছে মুগ্ধ! সেথায় যুবকের উষ্ণ নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে নির্বিকারে। মাহি স্থির হয়ে গেল তৎক্ষনাৎ। শীরঁদাড়া সোজা করতেই ভারী অথচ বড্ড শান্ত কন্ঠে মুগ্ধ আওড়াল,
“ আমি চরিত্রহীন হলে তুই এখনো আমার কাছে পবিত্র রইলি কি করে বান্দীর মেয়ে? হিং স্র পশুরা তো শিকার দেখলে স্থান-কাল বিবেচনা করেনা!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪২ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here